আল কুরআন


সূরা সোয়াদ (আয়াত: 25)

সূরা সোয়াদ (আয়াত: 25)



হরকত ছাড়া:

فغفرنا له ذلك وإن له عندنا لزلفى وحسن مآب ﴿٢٥﴾




হরকত সহ:

فَغَفَرْنَا لَهٗ ذٰلِکَ ؕ وَ اِنَّ لَهٗ عِنْدَنَا لَزُلْفٰی وَ حُسْنَ مَاٰبٍ ﴿۲۵﴾




উচ্চারণ: ফাগাফারনা-লাহূযা-লিকা ওয়া ইন্না লাহু ‘ইনদানা-লাযুলফা-ওয়া হুছনা মাআ-ব।




আল বায়ান: তখন আমি তাকে তা ক্ষমা করে দিলাম। আর অবশ্যই আমার কাছে তার জন্য রয়েছে নৈকট্য ও উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৫. অতঃপর আমরা তার ক্ৰটি ক্ষমা করলাম। আর নিশ্চয় আমাদের কাছে তার জন্য রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তখন আমি তার সে অপরাধ ক্ষমা করে দিলাম। তার জন্য আমার কাছে অবশ্যই আছে নৈকট্য আর উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।




আহসানুল বায়ান: (২৫) অতঃপর আমি তার অপরাধ ক্ষমা করলাম।[1] নিশ্চয় আমার নিকট তার জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা ও শুভ পরিণাম ।



মুজিবুর রহমান: অতঃপর আমি তার ক্রটি ক্ষমা করলাম। আমার নিকট তার জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা ও শুভ পরিণাম।



ফযলুর রহমান: আমি তার সে অপরাধ ক্ষমা করলাম। আর তার (দাউদ) জন্য তো আমার কাছে নৈকট্য (মর্যাদা) ও উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল (জান্নাত) আছেই।



মুহিউদ্দিন খান: আমি তার সে অপরাধ ক্ষমা করলাম। নিশ্চয় আমার কাছে তার জন্যে রয়েছে উচ্চ মর্তবা ও সুন্দর আবাসস্থল।



জহুরুল হক: কাজেই এই ব্যাপারে আমরা তাঁকে পরিত্রাণ করেছিলাম। আর নিশ্চয়ই তাঁর জন্য আমাদের কাছে তো নৈকট্য রয়েছে, আর রয়েছে এক সুন্দর গন্তব্যস্থল।



Sahih International: So We forgave him that; and indeed, for him is nearness to Us and a good place of return.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৫. অতঃপর আমরা তার ক্ৰটি ক্ষমা করলাম। আর নিশ্চয় আমাদের কাছে তার জন্য রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৫) অতঃপর আমি তার অপরাধ ক্ষমা করলাম।[1] নিশ্চয় আমার নিকট তার জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা ও শুভ পরিণাম ।


তাফসীর:

[1] দাঊদ (আ)-এর এই কাজ কি ছিল, যার জন্য তাঁকে ত্রুটি স্বীকার এবং তওবা, ক্ষমাপ্রার্থনা ও অনুতাপ প্রকাশ করার অনুভূতি হল এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন। কুরআন কারীমে এর বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায় না এবং কোন সহীহ হাদীসেও এ বিষয়ে কোন স্পষ্ট বর্ণনা নেই। ফলে কোন কোন তফসীরবিদ ইস্রাঈলী বর্ণনার উপর ভিত্তি করে এমনও কথা লিখেছেন, যাতে একজন নবীর মর্যাদাহানি হয়। কোন কোন তফসীরবিদ; যেমন ইবনে কাসীর (রঃ) এ বিষয়ে এই নীতি অবলম্বন করেছেন যে, যখন কুরআন ও হাদীস এ বিষয়ে চুপ আছে, তখন আমাদেরও এর পিছনে পড়া উচিত নয়। তফসীরবিদদের এক তৃতীয় দল, যারা উক্ত ঘটনার কিছু বর্ণনা দিয়েছেন, যাতে কুরআনের অস্পষ্ট বিষয়ের কিছু ব্যাখ্যা হয়ে যায়। এর পরেও তাঁরা কোন এক রকম ব্যাখ্যায় সর্বসম্মত নন। সুতরাং কেউ কেউ বলেন যে, দাউদ (আঃ) কোন এক সৈনিককে তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার আদেশ করেছিলেন। এটা ঐ সময়ে কোন দোষের বিষয় ছিল না। দাঊদ (আঃ) সেই মহিলার গুণাবলী ও চারিত্রিক পরিপূর্ণতার কথা জানতেন। যার ফলে তাঁর মনে এই ইচ্ছার সঞ্চার হয়েছিল যে, সাধারণ নারী না থেকে তাকে একজন রাণী হওয়া দরকার। যাতে তার গুণাবলী ও চারিত্রিক পূর্ণতা দ্বারা পুরো দেশ উপকৃত হতে পারে। এ রকম ইচ্ছা যতই ভাল চিন্তা-ভাবনা নিয়ে করা হোক, কিন্তু প্রথমতঃ একাধিক স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় এ কাজ এক প্রকার অশোভনীয়।


দ্বিতীয়তঃ এই কথা বাদশার পক্ষ থেকে প্রকাশ করাতে এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করার শামিল হচ্ছে। ফলে দাউদ (আঃ)-কে অভিনীত ঘটনা দ্বারা তা অশোভনীয় হওয়ার উপলব্ধি প্রদান করা হল এবং সত্য-সত্যই তিনি সতর্ক হয়ে গেলেন। অনেকে বলেন, মুকাদ্দামা নিয়ে আগত ব্যক্তিদ্বয় ফিরিশতা ছিলেন, যাঁরা একটি কাল্পনিক মুকাদ্দামা নিয়ে এসেছিলেন। এখানে দাউদ (আঃ)-এর ভুল এই ছিল যে, তিনি বাদীর কথা শুনেই ফায়সালা করে দিলেন এবং বিবাদীর কথা শোনার প্রয়োজন মনে করলেন না। আল্লাহ তাআলা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য এই রকম পরীক্ষা করলেন। এই ভুল উপলব্ধি করতে পেরেই তিনি বুঝতে পারলেন যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর পরীক্ষা ছিল। অতএব তিনি আল্লাহর দরবারে মাথা নত করলেন। অনেকে বলেন যে, আগত ব্যক্তিদ্বয় ফিরিশতা নয়, মানুষ ছিল এবং এটা কাল্পনিক ঘটনা নয়, বরং সত্য ঝগড়াই ছিল; যার ফায়সালা নেওয়ার জন্য তারা এসেছিল। এইভাবে তাঁর ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। কারণ উক্ত ঘটনাতে অসহনীয় ও ক্রোধ-উদ্রেককর বেশ কিছু আচরণ ছিল। প্রথমঃ অনুমতি ছাড়াই প্রাচীর ডিঙিয়ে প্রবেশ করা। দ্বিতীয়ঃ ইবাদতের বিশেষ সময়ে এসে বাধা সৃষ্টি করা। তৃতীয়ঃ তাদের ধৃষ্টতাপূর্ণ ভঙ্গিতে কথাবার্তা (অবিচার করবেন না ইত্যাদি) যা তাঁর বিচারীয় মর্যাদার জন্য হানিকর ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি অনুগ্রহ করেন, ফলে তিনি ক্রোধান্বিত না হয়ে পরিপূর্ণ ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেন। কিন্তু তার অন্তরে যে প্রকৃতিগত সামান্য বিরাগ সঞ্চার হয়েছিল, তাকেই তিনি আপন ভুল ভেবেছিলেন। যেহেতু এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ছিল, সেহেতু এরূপ প্রকৃতিগত বিরাগ সঞ্চার না হওয়াই উচিত ছিল। যার জন্য তিনি আল্লাহর দিকে রুজু করেছিলেন এবং ক্ষমা প্রার্থনায় রত হয়েছিলেন। আর আল্লাহই ভালো জানেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৭-২৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কাফির-মুশরিকদের অশোভনীয় কথায় ধৈর্য ধারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন যেমন পূর্ববর্তী নাবীগণ ধৈর্য ধারণ করেছেন। তাদের কথা সত্যের কোন ক্ষতি করতে পারবে না এবং তোমারও কোন ক্ষতি করতে পারবে না, বরং এসব কথা তাদের নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর। তাই ইবাদতের মাধ্যমে ধৈর্য ধারণের সহযোগিতা কামনা করার নির্দেশ দিয়ে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(فَاصْبِرْ عَلٰي مَا يَقُوْلُوْنَ وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوْعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوْبِهَا ج وَمِنْ اٰنَآئِ اللَّيْلِ فَسَبِّحْ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ تَرْضٰي)‏



“সুতরাং তারা যা বলে, সে বিষয়ে তুমি ধৈর্য ধারণ কর‎ এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর‎ এবং রাত্রিকালে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর‎, এবং দিবসের প্রান্ত‎সমূহেও, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পার।” (সূরা ত্ব-হা ২০ : ১৩০)



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় নাবী দাঊদ (আঃ) ও তাঁকে যে সকল মু‘জিযাহ দান করেছিলেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।



দাঊদ (আঃ)-এর সাহস ও বীরত্ব সম্পর্কে সূরা বাক্বারার ২৪৬-২৫২ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। বিপুল শক্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী ছিলেন দাঊদ (আঃ)। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে নবুওয়াত ও মানুষের মাঝে বিচার-ফায়সালা করার প্রজ্ঞা দান করেছিলেন। বর্তমান ফিলিস্তীনসহ সমগ্র ইরাক ও শাম (সিরিয়া) এলাকায় তাঁর রাজত্ব ছিল। পৃথিবীর অতুলনীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তিনি ছিলেন সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি অনুগত ও সদা কৃতজ্ঞ। দাঊদ (আঃ) হলেন আল্লাহ তা‘আলার সেই বান্দা যাকে খুশী হয়ে পিতা আদম (আঃ) স্বীয় বয়স থেকে ৪০ বছর কেটে নিয়ে দান করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট সুপারিশ করেছিলেন এবং সেই হিসেবে দাঊদের বয়স ৬০ হতে ১০০ বছরে বৃদ্ধি পায়। (তিরমিযী, মিশকাত হা. ১১৮, হাসান সহীহ)



আলোচ্য আয়াতগুলোতে দাঊদ (আঃ)-এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হয়েছে। যেমন-



(১) আল্লাহ তা‘আলা দাঊদ (আঃ)-কে আধ্যাত্মিক ও দৈহিক শক্তিতে বলিয়ান করে সৃষ্টি করেছিলেন। দৈহিক ও দুনিয়াবী শাসন শক্তির কথার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে- (ذَا الْأَيْدِ) । আর আধ্যাত্মিক শক্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে (اِنَّھ۫ٓ اَوَّابٌ)। দাঊদ (আঃ) তাঁর জাতির পক্ষ থেকে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন এবং আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে খুব মনোযোগী ছিলেন। তিনি আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে এত দৃঢ়পদ ও অটুট ছিলেন যে, তাঁর সাথে তাসবীহ পাঠ করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা পাহাড় ও পক্ষীকুলকে অনুগামী করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :



(وَلَقَدْ اٰتَيْنَا دَاو۫دَ مِنَّا فَضْلًا ط يٰجِبَالُ أَوِّبِيْ مَعَه۫ وَالطَّيْرَ ج وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيْدَ‏)‏



“আর আমি দাঊদকে দিয়েছিলাম আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ (যেমন বলেছিলাম) হে পাহাড়-পর্বত! তোমরা দাঊদের সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং পাখিগুলোকেও এমন আদেশ দিয়েছিলাম। আর তার জন্য আমি লৌহকে নরম করেছিলাম।” (সূরা সাবা ৩৪ : ১০) যখন দাঊদ (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার যিকির করতেন তখন পাহাড় ও পক্ষীকূল তাঁর সাথে যিকির করত, তিনি তাদের যিকির করা বুঝতে পারতেন। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ পাঠ করে যদিও আমরা বুঝতে পারি না। (সূরা ইসরা ১৭ : ৪৪)



হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : আল্লাহ তা‘আলার নিকট সর্বাধিক প্রিয় সালাত হল দাঊদ (আঃ)-এর সালাত এবং সর্বাধিক প্রিয় সিয়াম হল দাঊদ (আঃ)-এর সিয়াম। তিনি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত ঘুমাতেন। অতঃপর এক তৃতীয়াংশ সালাতে কাটাতেন এবং বাকী ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। তিনি একদিন অন্তর অন্তর সিয়াম পালন করতেন। শত্র“র মোকাবেলায় তিনি কখনো পশ্চাদবরণ করতেন না। (সহীহ বুখারী হা. ১০৭৯, মিশকাত হা. ১২২৫)



(২) পাহাড়-পর্বত ও পক্ষীকুল তাঁর অনুগত ছিল। এ সম্পর্কে সূরা সাবার ১০-১১ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



(بِالْعَشِيِّ وَالْإِشْرَاقِ) ‘



সকাল-সন্ধ্যায়’ ইশরাক বলা হয় চাশতের সময়কে, এ সময়ে সালাতকে চাশতের সালাত ও আওয়াবিনের সালাতও বলা হয় (সহীহ মুসলিম হা. ৭৪৮)। চাশতের সালাত দু থেকে বার রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়। চাশতের সময় সালাত আদায় করা অনেক ফযীলতের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : তোমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য প্রতিদিন সাদকাহ করতে হয়। প্রত্যেক তাসবীহ পাঠ এক একটি সাদকাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা সাদকাহ, আল্লাহু আকবর বলা সাদকাহ, ভাল কাজের আদেশ করা সাদকাহ, খারাপ কাজে বাধা দেয়া সাদকাহ। এসব ক’টির জন্য যথেষ্ট হবে চাশতের দু’রাকাত সালাত। (সহীহ মুসলিম হা. ৭২০)



مَحْشُوْرَةً অর্থ একত্রিত বা জমা হওয়া। অর্থাৎ তাঁকে অপূর্ব সুমধুর কণ্ঠস্বর দান করা হয়েছিল। যখন তিনি যাবূর তেলাওয়াত করতেন, তখন কেবল মানুষ নয়, পাহাড়-পর্বত ও পক্ষীকুল পর্যন্ত তা একমনে শুনত।



(৩, ৪ ও ৫) তাঁকে দেয়া হয়েছিল সুদৃঢ় সাম্রাজ্য, গভীর প্রজ্ঞা ও অনন্য বাগ্মিতা। যেমন অত্র সূরার ২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর এ সাম্রাজ্য ছিল শাম ও ইরাক ব্যাপী। যা বর্তমান ফিলিস্তীনসহ সমগ্র ইরাক ও শাম (সিরিয়া) শামিল করে। যেমন ২৬ নম্বর আয়াতের বলা হয়েছে।



(৬) লোহাকে নরম করে দেয়া হয়েছিল। এ সম্পর্কে সূরা সাবার ১০-১১ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।

আর তাঁকে দান করেছিলেন হিকমত তথা নবুওয়াত ও মহা প্রজ্ঞা এবং আরো দান করেছেন মীমাংসাকারী জ্ঞান। আরো দান করেছেন সর্বপ্রকার বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিকতা যার মাধ্যমে তাঁর রাজ্যকে করেছিলেন সুদৃঢ়।



ইবাদতখানায় প্রবেশকারী বাদী-বিবাদীর বিচার



দাঊদ (আঃ) যেকোন ঘটনায় যদি বুঝতেন যে, এটি আল্লাহ তা‘আলার তরফ থেকে পরীক্ষা, তাহলে তিনি সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার দিকে রুজু হতেন ও ক্ষমা প্রার্থনায় রত হতেন। এরই একটি উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্ত ঘটনায়-



আল্লাহ তা‘আলা দাঊদ (আঃ)-কে মীমাংসা করার জ্ঞান দান করার পর দু’টি বিবাদমান ব্যক্তির বর্ণনা দিচ্ছেন যারা প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে দাঊদ (আঃ)-এর নিকট এসেছিল। যখন তারা তাঁর নিকট প্রবেশ করল তখন তিনি ভীত-বিহ্বল হলেন, বিবাদমান ব্যক্তি দু’টি তাঁকে বলল : আপনি ভয় পাবেন না, আমরা বিবাদমান দু’টি পক্ষ। একজন অপরজনের ওপর জুলুম করেছি, আপনি আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিন, কোন প্রকার জুলুম বা অবিচার করবেন না এবং আমাদেরকে সঠিক পথ নির্দেশ করুন। তখন তারা তাদের ঝগড়ার বিষয়বস্তু উপস্থাপন করল। একজন বলল, সে আমার ভাই, তার নিরানব্বইটি স্ত্রী রয়েছে আর আমার একটি মাত্র স্ত্রী, তারপরও সে আমার এ স্ত্রীকে তাকে দিয়ে দিতে বলে এবং আমার ওপর চাপ প্রয়োগ করে। এটি ছিল তাদের ঝগড়ার মূল ঘটনা।



তখন দাঊদ (আঃ) তাদের কথা অনুপাতে বিচার কার্য শুরু করলেন। তিনি বললেন : তোমার স্ত্রীকে তার স্ত্রীদের সাথে যুক্ত করার দাবী করে সে তোমার প্রতি জুলুম করেছে। অধিকাংশ শরীকরা একে অন্যের ওপর অবিচার করে থাকে, শুধুমাত্র মু’মিন ও সৎ কর্মপরায়ণ ব্যক্তি ব্যতীত। তবে তাদের সংখ্যা স্বল্প। এ মীমাংসা করার পর দাঊদ (আঃ) বুঝতে পারলেন যে, মহান রবের পক্ষ হতে এটা তার পরীক্ষা। তখন তিনি আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন এবং তাঁর অভিমুখী হলেন। এ আয়াত পাঠ করার পর সিজদাহ করতে হয়। দাঊদ (আঃ) এখানে সিজদাহ্ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও এখানে অনুরূপ করেছেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন এবং বললেন : আমার নিকট তার জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা ও শুভ পরিণাম। কেননা তিনি ছিলেন তাওবাহ্কারী এবং স্বীয় রাজ্যে তিনি ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠাকারী। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন :



إِنَّ الْمُقْسِطِيْنَ عِنْدَ اللّٰهِ عَلَي مَنَابِرَ مِنْ نُورٍ، عَنْ يَمِينِ الرَّحْمَنِ عَزَّ وَجَلَّ، وَكِلْتَا يَدَيْهِ يَمِيْنٌ، الَّذِينَ يَعْدِلُوْنَ فِي حُكْمِهِمْ وَأَهْلِيهِمْ وَمَا وَلُوا



সুবিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোকেরা নূরের মিম্বরের ওপর দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার ডান দিকে অবস্থান করবে, আল্লাহ তা‘আলার উভয় হাতই ডান হাত তারা ঐ সব সুবিচারক যারা তাদের পরিবার-পরিজন ও অধিনস্তদের প্রতি সুবিচার করবে।” (সহীহ মুসলিম হা. ১৮২৭)



উপরোক্ত পাঁচটি আয়াতে বা অন্য কোথাও এরূপ কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি যে, সে পরীক্ষা কী ছিল, দাঊদ (আঃ) কী ভুল করেছিলেন, যে কারণে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন এবং যা আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। ফলে সে প্রাচীন যুগের কোন ঘটনার ব্যাখ্যা নাবী ব্যতীত অন্য কারো পক্ষে এ যুগে দেয়া সম্ভব নয়। তাই ধারণা ও কল্পনার মাধ্যমে যেটাই বলা হবে, তাতে ভ্রান্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে। কিন্তু পথভ্রষ্ট ইয়াহূদী পণ্ডিতেরা তাদের স্বগোত্রীয় এ মর্যাদাবান নাবীর উক্ত ঘটনাকে এমন নোংরাভাবে পেশ করেছে, যা কল্পনা করতেও গা শিউরে ওঠে। বলা হয়েছে, দাঊদ (আঃ)-এর নাকি ৯৯ জন স্ত্রী ছিল। এ সত্ত্বেও তিনি তাঁর এক সৈন্যের স্ত্রীকে জোরপূর্বক অপহরণ করেন। অতঃপর উক্ত সৈনিককে হত্যা করে তার স্ত্রীকে বিয়ে করেন। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আল্লাহ তা‘আলা দু’জন ফেরেশতাকে বাদী ও বিবাদীর বেশে পাঠিয়ে তাকে শিক্ষা দেন। (নাঊযুবিল্লাহ)



تَسَوَّرُ অর্থ হলো প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করা।



أيد এটা يد থেকে নয় বরং ادييد-এর মাসদার اَيِّدْ। অর্থ শক্তি ও প্রবলতা।



نَعْجَةٌ শব্দটি আরবরা স্ত্রী, খাসী, দুম্বী ইত্যাদি অর্থে ব্যবহার করে থাকে। তবে এখানে স্ত্রী অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। (কুরতুবী, সা‘দী, অত্র আয়াতের তাফসীর)



এরপর আল্লাহ তা‘আলা দাঊদ (আঃ)-কে বলে সকল বিচারকদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, তারা যেন মানুষের মধ্যে সুবিচার করে এবং নিজ খেয়াল-খুশির অনুসরণ না করে। কেননা নিজ খেয়াল-খুশির অনুসরণ করলে তা সত্য পথ হতে বিচ্যুত করে দেবে। আর এ কারণে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।



সংশয় নিরসন :



(وَظَنَّ دَاو۫دُ اَنَّمَا فَتَنَّاھُ)



‘আর দাঊদ বুঝতে পারলেন যে, আমি তাকে পরীক্ষা করেছি।’ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে জালালাইনে বলা হয়েছে, ‘অর্থাৎ উক্ত মহিলার প্রতি আসক্তির মাধ্যমে আমরা তাকে পরীক্ষায় ফেলেছি।’ ভিত্তিহীন এ তাফসীরের মাধ্যমে নাবীগণের উচ্চ মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। বিশেষ করে দাঊদ (আঃ)-এর মত একজন রাসূলের ওপরে পরনারীর প্রতি আসক্ত হওয়ার অমার্জনীয় অপবাদ আরোপ করা হয়েছে। অথচ এটি পরিষ্কারভাবে ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের বানোয়াট গল্প ব্যতীত কিছুই নয়।



সূরা সোয়াদ-এর সিজদার বিধান



এ সিজদাহ জরুরী নয়, এটা সিজদায়ে শোকর। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন : এখানে সিজদাহ্ বাধ্যতামূলক নয়। তিনি বলেন : তবে আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এতে সিজদাহ্ করতে দেখেছি। (সহীহ বুখারী হা. ১০৬৯)



ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এখানে সিজদাহ্ করার পর বলেন : দাঊদ (আঃ)-এর জন্য এ সিজদাহ্ ছিল তাওবার এবং আমাদের জন্য এ সিজদাহ্ হলো শোকরের।” (সহীহ বুখারী হা. ১০৬৯)



আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা মিম্বারের ওপর সূরা সোয়াদ পাঠ করেন। সিজদার আয়াত পর্যন্ত পৌঁছে তিনি মিম্বার হতে অবতরণ করেন ও সিজদাহ্ করেন। তাঁর সাথে অন্যান্য সবাই সিজদাহ্ করেন।



অন্য একদিন তিনি মিম্বারের ওপর এ সূরাটি পাঠ করেন। যখন তিনি সিজদার আয়াতে পৌঁছেন তখন সকলে সিজদার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তখন তিনি বলেন : এটা ছিল দাঊদ (আঃ)-এর তাওবার সিজদাহ্, তোমরাও সিজদার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছ? অতঃপর তিনি মিম্বার হতে নেমে সিজদাহ্ করেন। (আবূ দাঊদ হা. ১৪১০)



তিলাওয়াতে সিজদার বিধান সম্পর্কে সূরা আল আ‘রাফ-এ আলোচনা করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন যদিও কাফির-মুশরিকরা মনে করে যে, আকাশ ও জমিন অনর্থক সৃষ্টি করা হয়েছে তথাপি এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। এগুলো যথাযথ কারণেই সৃষ্টি করা হয়েছে।



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,



(أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنٰكُمْ عَبَثًا وَّأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُوْنَ‏)‏



‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না?’ (সূরা মু’মিনূন ২৩ : ১১৫)



এগুলো সৃষ্টি করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষা করা, কে সৎ কর্ম করে আর কে অসৎ কর্ম করে? যাতে করে তিনি সৎ কর্মপরায়ণদেরকে জান্নাতে এবং অসৎ কর্মপরায়ণদেরকে জাহান্নামে দিতে পারেন। কারণ উভয়ের প্রাপ্তি সমান হতে পারে না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. পর্বতমালা, বিহংগকুলসহ সবকিছুই আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ পাঠ করে।

২. দাঊদ (আঃ)-এর মর্যাদা সম্পর্কে জানা গেল।

৩. সদা-সর্বদা ন্যায় বিচার করতে হবে। কখনো জুলুম করা যাবে না।

৪. নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে কোন কাজ করা যাবে না।

৫. অনিয়ম দেখলে প্রকৃত অবস্থা জানা পর্যন্ত সবর করা উচিত।

৬. যারা আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যে শারীরিক ও আন্তরিকভাবে সুদৃঢ় আল্লাহ তা‘আলা তাদের গুণাগুণ বর্ণনা করেন।

৭. ইসতিগফার, ইবাদত বিশেষ করে সালাত পাপসমূহ মোচন করে দেয়।

৮. কেউ কারো ওপর জুলুম করলে সে বলতে পারবে যে, অমুক ব্যক্তি আমার ওপর জুলুম করেছে।

৯. স্বাভাবিক ভীতি নবুওয়াতের ও ওলীত্বের পরিপন্থী নয়।

১০. ন্যায় প্রতিষ্ঠাই ইসলামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।

১১. দায়িত্বশীল নিয়োগের জন্য সর্বপ্রথম দেখার বিষয় হচ্ছে চরিত্র ও দীনদারিত্ব।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২১-২৫ নং আয়াতের তাফসীর:

তাফসীরকারগণ এখানে একটি গল্প বর্ণনা করেছেন যার অধিকাংশই বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত হতে নেয়া হয়েছে। এটা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে একটি হাদীস রয়েছে বটে, কিন্তু ওটাও সঠিক নয়। কেননা, ইয়াযীদ রাকাশী নামক এর একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন, যিনি খুব সৎ লোক হলেও নিঃসন্দেহে দুর্বল। সুতরাং উত্তম কথা এই যে, কুরআন কারীমে যা আছে তা-ই সত্য এবং যা কিছু অন্তর্ভুক্ত করেছে তা-ই সঠিক। দু’জন লোককে ঘরের মধ্যে দেখে হযরত দাউদ (আঃ)-এর ভীত হওয়ার কারণ এই যে, তিনি নির্জন কক্ষে একাকী অবস্থান করছিলেন এবং প্রহরীদেরকে ঘরের মধ্যে সেই দিন কাউকেও প্রবেশ করতে দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এই দু’জনকে ঘরে আকস্মিকভাবে প্রবেশ করতে দেখে তিনি ভীত হয়ে পড়েছিলেন।

(আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ কথা-বার্তায় সে আমার উপর জয়লাভ করেছে এবং আমার উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। অর্থাৎ কথায় সে আমার প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেছে।

হযরত দাউদ (আঃ) বুঝে ফেলেন যে, এটা তাঁর উপর মহান আল্লাহর পরীক্ষা। সুতরাং তিনি রুকু ও সিজদা করতঃ আল্লাহ তাআলার দিকে ঝুঁকে পড়েন। বর্ণিত আছে যে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তিনি সিজদা হতে মাথা উঠাননি।

মহান আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি তার ত্রুটি ক্ষমা করলাম। এটা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, যে কাজ সাধারণের জন্যে পুণ্যের হয় সেই কাজটিই বিশিষ্ট লোকদের জন্যে পাপের হয়ে থাকে।

এটা সিজদার আয়াত কি-না এ বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর নতুন মাযহাব এই যে, এখানে সিজদা জরুরী নয়। এটা তো সিজদায়ে শুক্র। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, (আরবী)-এর মধ্যে সিজদা বাধ্যতামূলক নয়। তিনি বলেনঃ “তবে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এতে সিজদা করতে দেখেছি।` (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

সুনানে নাসাঈতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখানে সিজদা করার পর বলেনঃ “হযরত দাউদ (আঃ)-এর জন্যে এই সিজদা ছিল তাওবার এবং আমাদের জন্যে এ সিজদা হলো শোকরের।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সঃ)-এর কাছে একটি লোক এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি যেন একটি গাছের পিছনে নামায পড়ছি এবং নামাযে সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করছি ও সিজদা করছি। তখন আমার সাথে গাছটিও সিজদা করলো এবং আমি গাছটিকে নিম্নলিখিত দুআ পড়তে শুনলামঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমার এই সিজদাকে আমার জন্যে আপনার নিকট পুণ্য ও যখীরার কারণ বানিয়ে দিন, আর এর মাধ্যমে আমার পাপের বোঝা হালকা করে দিন এবং এটা কবুল করে নিন, যেমন কবুল করেছিলেন আপনার বান্দা হযরত দাউদ (আঃ)-এর সিজদাকে। তখন আমি দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে নামায আদায় করলেন এবং সিজদার আয়াত পাঠ করে সিজদা করলেন। ঐ সিজদায় তিনি ঐ দুআই পড়লেন যে দুআটির কথা লোকটি গাছটির দু'আ বলে বর্ণনা করেছিল।” (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযী ও সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের সিজদার উপর দলীল পেশ করেছেন যে, মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “তার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ), যাদেরকে আমি হিদায়াত দান করেছিলাম। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের হিদায়াতের অনুসরণ কর। তাহলে বুঝা গেল যে, তাঁদের অনুসরণ করতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আদিষ্ট ছিলেন। আর এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, হযরত দাউদ (আঃ) সিজদা করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহও (সঃ) এই সিজদা করেন।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি যেন সূরায়ে সোয়দি লিখছেন এটা তিনি স্বপ্নে দেখতে পান। যখন তিনি সিজদার আয়াতে পৌঁছেন তখন দেখেন যে, কলম, দোয়াত ও আশে পাশের সবকিছুই সিজদা করলো। তিনি তাঁর স্বপ্নের কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াত পাঠ করে বরাবরই সিজদা করতেন। (এ হদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা মিম্বরের উপর সূরায়ে সোয়াদ পাঠ করেন। সিজদার আয়াত পর্যন্ত পৌঁছে তিনি মিম্বর হতে অবতরণ করেন ও সিজদা করেন। তার সাথে অন্যান্য সবাই সিজদা করেন। অন্য একদিন মিম্বরের উপর তিনি এই সূরাটি পাঠ করেন। যখন তিনি সিজদার আয়াতে পৌঁছেন তখন জনগণ সিজদার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এ দেখে তিনি বলেনঃ “এটা তো ছিল হযরত দাউদ (আঃ)-এর তাওবার সিজদা। আর আমি দেখি যে, তোমরাও সিজদার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেছো?” অতঃপর তিনি মিম্বর হতে নেমে সিজদা করেন। (এ হদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার নিকট দাউদ (আঃ)-এর জন্যে রয়েছে উচ্চ মর্যাদা ও শুভ পরিণাম। কিয়ামতের দিন তিনি জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন। কেননা, তিনি স্বীয় রাজ্যে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ “সুবিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোকেরা নূরের মিম্বরের উপর রহমানের (আল্লাহর) ডানদিকে অবস্থান করবে, আল্লাহর উভয় হস্তই ডান, তারা ঐ সব সুবিচারক যারা তাদের পরিবার পরিজন ও যাদের তারা মালিক তাদের মধ্যে সুবিচার করে থাকে।”

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং সবচেয়ে বেশী তাঁর নৈকট্যলাভকারী বান্দা হবে ন্যায়-বিচারক বাদশাহ। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহর সবচেয়ে বড় শত্রু ও কঠিন আযাব প্রাপ্ত ব্যক্তি হবে অত্যাচারী বাদশাহ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত মালিক ইবনে দীনার (রাঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন হযরত দাউদ (আঃ)-কে আরশের পায়ার নিকট দাঁড় করানো হবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেনঃ “হে দাউদ (আঃ)! তুমি দুনিয়ায় যে মিষ্টি ও করুণ সুরে আমার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করতে সেভাবে এখনো কর।” তিনি উত্তরে বলবেনঃ “হে আল্লাহ! এখন ঐ সুর ও আওয়াজ কোথায়?” জবাবে আল্লাহ পাক বলবেনঃ “আজও আমি তোমাকে ঐ সুর ও শব্দ দান করলাম।” তখন হযরত দাউদ (আঃ) তাঁর মর্মস্পর্শী ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় আল্লাহর প্রশংসাগীতি গাইবেন। এটা শুনে জান্নাতীরা অন্য সব নিয়ামতের কথা ভুলে যাবে। তার এই সুমিষ্ট সুর এবং জ্যোতির্ময় কণ্ঠের মাধ্যমে সব কিছুকে ভুলিয়ে দিয়ে তাদেরকে তিনি নিজের দিকে আকৃষ্ট করবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।