সূরা আস-সাফফাত (আয়াত: 75)
হরকত ছাড়া:
ولقد نادانا نوح فلنعم المجيبون ﴿٧٥﴾
হরকত সহ:
وَ لَقَدْ نَادٰىنَا نُوْحٌ فَلَنِعْمَ الْمُجِیْبُوْنَ ﴿۫ۖ۷۵﴾
উচ্চারণ: ওয়ালা কাদ না-দা-না-নূহুন ফালানি‘মাল মুজীবূন।
আল বায়ান: আর নিশ্চয় নূহ আমাকে ডেকেছিল, আর আমি কতইনা উত্তম সাড়াদানকারী!
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৫. আর অবশ্যই নূহ আমাদেরকে ডেকেছিলেন, অতঃপর (দেখুন) আমরা কত উত্তম সাড়াদানকারী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: (ইতোপূর্বে) নূহ আমাকে ডেকেছিল, অতঃপর (দেখ) আমি কতই না উত্তম সাড়াদাতা ছিলাম!
আহসানুল বায়ান: (৭৫) নূহ আমাকে আহবান করেছিল এবং আমি কত উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। [1]
মুজিবুর রহমান: নূহ আমাকে আহবান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়া দানকারী।
ফযলুর রহমান: নূহ আমাকে ডেকেছিল। আমি (তার ডাকে) কত উত্তম সাড়া দিয়েছি!
মুহিউদ্দিন খান: আর নূহ আমাকে ডেকেছিল। আর কি চমৎকারভাবে আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম।
জহুরুল হক: আর ইতিপূর্বে অবশ্য নূহ আমাদের আহ্বান করেছিলেন, আর আমরা কত উত্তম উত্তরদাতা।
Sahih International: And Noah had certainly called Us, and [We are] the best of responders.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৫. আর অবশ্যই নূহ আমাদেরকে ডেকেছিলেন, অতঃপর (দেখুন) আমরা কত উত্তম সাড়াদানকারী।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৫) নূহ আমাকে আহবান করেছিল এবং আমি কত উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, সাড়ে নয়শ’ বছর তাবলীগ করার পরেও যখন কওমের অধিকাংশ লোকেরাই তাঁকে মিথ্যাজ্ঞান করল এবং তিনি অনুভব করলেন যে, এদের ঈমান আনার কোন আশা নেই, তখন নিজ প্রভুর নিকট দু’আ করে বললেন, (فَدَعَا رَبَّهُ اَنِّيْ مَغْلُوْبٌ فَانْتَصِرْ) ‘‘হে আল্লাহ আমি অসহায়, তুমি আমার প্রতিশোধ নাও। (সূরা ক্বামার ১০ আয়াত) সুতরাং আল্লাহ নূহ (আঃ)-এর দু’আ কবুল করলেন এবং তাঁর কওমকে তুফান দিয়ে ধ্বংস করে দিলেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৫-৮২ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আল্লাহ তা‘আলা নূহ (আঃ)-কে সাড়ে নয়শত বছর বয়স দিয়ে পৃথিবীর বুকে প্রথম রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি এক পুরুষের পর দ্বিতীয় পুরুষকে অতঃপর তৃতীয় পুরুষকে শুধু এই আশায় দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন যে, তারা ঈমান আনবে। কিন্তু শতাব্দির পর শতাব্দি অক্লান্তভাবে দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও তারা ঈমান আনেনি। মূলত এ সময় নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায় জনবল ও অর্থবলে বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। সংখ্যাধিক্যের কারণে ইরাকের ভূখণ্ড ও পাহাড়েও তাদের আবাস সংকুলান হচ্ছিল না। তারা নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতকে তাচ্ছিল্য ভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। নূহ (আঃ) তাদেরকে দিবারাত্রি দাওয়াত দেন। কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে অর্থাৎ সকল পন্থা অবলম্বন করে তিনি নিজ কওমকে দীনের পথে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এই সুদীর্ঘ দাওয়াতী যিন্দেগীতে তিনি যেমন কখনো চেষ্টায় ক্ষান্ত হননি, তেমনি কখনো নিরাশও হননি। সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নানাবিধ নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েও তিনি সবর করেছেন। অবশেষে কওমের লোকেরা যখন তাকে সাধারণ মানুষ, হীন ও কম বুদ্ধির লোক, পদ লোভী ও বাপ-দাদার রীতি বিরোধী ইত্যাদি বলে প্রত্যাখ্যান করল তখন নূহ (আঃ) আল্লাহ তা‘আলাকে আহ্বান করলে আল্লাহ তা‘আলা তার আহবানে সাড়া দেন এবং কওমের অপরাধের কারণে সর্বগ্রাসী মহাপ্লাবনের গযবে ডুবিয়ে ধ্বংস করে দেন। নূহ (আঃ) ও যারা তার প্রতি ঈমান এনেছিল তাদেরকে গযব থেকে রক্ষা করেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত সূরা হূদের ২৫-৪৭ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. মু’মিন ব্যক্তিদের মর্যাদা ও কাফিরদের কঠোর শাস্তির কথা জানতে পারলাম।
২. সৎ কর্মের প্রতিদান সর্বদা ভাল আর মন্দ কর্মের প্রতিদান সর্বদা মন্দই হয়ে থাকে।
৩. যারা আল্লাহর পথে অবিচল ও অটল থাকে তাদেরকে আল্লাহ বিপদ থেকে নাজাত দেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।
মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।'
আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।