সূরা ইয়াসীন (আয়াত: 69)
হরকত ছাড়া:
وما علمناه الشعر وما ينبغي له إن هو إلا ذكر وقرآن مبين ﴿٦٩﴾
হরকত সহ:
وَ مَا عَلَّمْنٰهُ الشِّعْرَ وَ مَا یَنْۢبَغِیْ لَهٗ ؕ اِنْ هُوَ اِلَّا ذِکْرٌ وَّ قُرْاٰنٌ مُّبِیْنٌ ﴿ۙ۶۹﴾
উচ্চারণ: ওয়ামা-‘আল্লামনা-হুশশি‘রা ওয়ামা-ইয়ামবাগী লাহূ ইন হুওয়া ইল্লা-যিকরুওঁ ওয়া কুরআ-নুম মুবীন।
আল বায়ান: আমি রাসূলকে কাব্য শিখাইনি এবং এটি তার জন্য শোভনীয়ও নয়। এ তো কেবল এক উপদেশ ও স্পষ্ট কুরআন মাত্র।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৯. আর আমরা রাসূলকে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়।(১) এটা তো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন;
তাইসীরুল ক্বুরআন: [কাফিররা রসূল (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলে, লোকটা একটা কবি। কিন্তু) আমি রসূলকে কবিতা শিখাইনি, আর তা তার জন্য শোভনীয়ও নয়। তাতো এক উপদেশ ও স্পষ্ট কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু নয়।
আহসানুল বায়ান: (৬৯) আমি তাকে (রসূলকে) কবিতা শিখাইনি এবং এ তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়। এ তো কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন;[1]
মুজিবুর রহমান: আমি তাকে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়। ইহাতো শুধু উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।
ফযলুর রহমান: আমি তাকে (রসূলকে) কবিতা শিখাইনি, তার জন্য তা সমীচীনও নয়। এই কিতাব তো এক স্মারকপত্র আর স্পষ্ট কোরআন।
মুহিউদ্দিন খান: আমি রসূলকে কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং তা তার জন্যে শোভনীয়ও নয়। এটা তো এক উপদেশ ও প্রকাশ্য কোরআন।
জহুরুল হক: আর আমরা তাঁকে কবিত্ব শেখাই নি, আর তা তাঁর পক্ষে সমীচীনও নয়। এটি স্মারক গ্রন্থ ও সুস্পষ্ট কুরআন বৈ তো নয়, --
Sahih International: And We did not give Prophet Muhammad, knowledge of poetry, nor is it befitting for him. It is not but a message and a clear Qur'an
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬৯. আর আমরা রাসূলকে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়।(১) এটা তো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন;
তাফসীর:
(১) দেখুন, সূরা আল-হাক্কাহঃ ৪১৷
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬৯) আমি তাকে (রসূলকে) কবিতা শিখাইনি এবং এ তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়। এ তো কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন;[1]
তাফসীর:
[1] মক্কার মুশরিকরা নবী (সাঃ)-কে মিথ্যুক প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলত। তার মধ্যে একটা কথা এই ছিল যে, তুমি কবি এবং এই কুরআন তোমারই কবিতার ছন্দ মাত্র। আল্লাহ তাআলা তাদের এই কথা খন্ডন করে বললেন যে, সে না কবি, আর না কুরআন কবিতামালার সমষ্টি; বরং এ হল নসীহত ও উপদেশমালা। কাব্যে সাধারণতঃ অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি এবং কখনো অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য থাকে। কবিতায় শুধু কবির আবেগ ও আকাশ-কুসুম কল্পনা থাকে। তার ভিত্তি হয় মিথ্যার উপরে। এ ছাড়া কবিরা শুধু বাক্য বিশারদ হয়, কাজের কাজী নয়। যার কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, শুধু এই নয় যে, আমি আমার পয়গম্বরকে কবিতা শিক্ষা দিইনি এবং তাঁর প্রতি কবিতা অহী করিনি; বরং কুরআনের বাকরীতি ও প্রকৃতি এই রকম করেছি যে, কবিতার সাথে তার কোন সম্পর্ক ও সাদৃশ্যই নেই। আর এ জন্যই মহানবী (সাঃ) যখন কারোর কবিতা পড়তেন তখন অধিকাংশ ভুল পড়তেন এবং কবিতার ছন্দ ও ওজন ভেঙ্গে যেত; যার উদাহরণ হাদীসে বিদ্যমান। এই সতর্কতা অবলম্বন এই জন্য করা হয়েছে, যাতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে পূর্ণ প্রমাণ প্রতিষ্ঠা হয়, তাদের সন্দেহের অবসান ঘটে এবং তারা যেন বলতে না পারে যে, কুরআন তাঁর রচিত কাব্য। যেমন উক্ত সন্দেহ অবসানের নিমিত্তেই তিনি নিরক্ষর ছিলেন; যাতে মানুষ কুরআন সম্পর্কে এ কথা বলতে না পারে যে, এটা তিনি অমুক ব্যক্তি থেকে শিক্ষা অর্জন করে তা সাজিয়ে-গুছিয়ে রচনা করেছেন। অবশ্য কোন কোন সময় তাঁর মুবারক মুখ থেকে এমন বাক্য বের হয়ে যাওয়া, যা কবিতা ছত্র ও ছন্দের মত হয়ে থাকে, তা তাঁর কবি হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। কারণ এগুলি তাঁর ইচ্ছা ছাড়াই অবলীলাক্রমে মুখে এসে যেত এবং তা কবিতার ছাঁচে পড়ে যাওয়াটা আকস্মিক ব্যাপার ছিল, যেমন হুনাইনের দিন তাঁর মুখে ইচ্ছা ছাড়াই (যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠ্য) এই কবিতা আবৃত্ত হয়েছিলঃ أَنَا النَّبِيُّ لاَ كَذِب – أَنَا ابْنُ عَبْْدِ الْمُطَّلِبْ অন্য এক সময় তাঁর আঙ্গুল যখম হলে তিনি বলেছিলেন,هَلْ أَنْتِ إِلاَّ إِصْبَعٌ دَمِيْتِ – وَفِيْ سَبِيْلِ اللهِ مَا لَقِيْتِ (বুখারী, মুসলিমঃ জিহাদ অধ্যায়)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৮-৭০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আমি তাদের মধ্য থেকে যাকে দীর্ঘ জীবন দান করি তার স্বাভাবিক গঠনের অবনতি ঘটাই। অর্থাৎ মানুষ শিশু অবস্থায় যেমন তার কোন জ্ঞান থাকে না অনুরূপ সে যখন জীবনের শেষ বেলায় বৃদ্ধ হয় তখন শিশুকালের মতই তারা জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে সূরা নাহ্ল-এর ৭০ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল কাফির-মুশরিকদের কথার প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন যারা বলত, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন কবি। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আমি তাকে কাব্য শিখাইনি অর্থাৎ সে কবি নয় এবং কবিতা রচনা করা তার পক্ষে শোভনীয় নয়। শুধুমাত্র তাকে স্পষ্ট কুরআন দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে যেন তিনি জীবিত লোকদেরকে সতর্ক করতে পারেন। অর্থাৎ যাদের অন্তর সত্যাগ্রহী তাদেরকে।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(وَأُوْحِيَ إِلَيَّ هٰذَا الْقُرْاٰنُ لِأُنْذِرَكُمْ بِه۪ وَمَنْ....)
“এবং এ কুরআন আমার নিকট প্রেরিত হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট তা পৌঁছবে তাদেরকে এর দ্বারা আমি সতর্ক করি।” (সূরা আন‘আম ৬ : ১৯)
আর যারা এ সতর্কবাণী শুনার পরও সতর্ক হয় না বরং অবাধ্য থেকেই যায় তাদের জন্যই জাহান্নামের শাস্তি বাস্তবায়িত হবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(وَمَنْ يَّكْفُرْ بِه۪ مِنَ الْأَحْزَابِ فَالنَّارُ مَوْعِدُه۫)
“অন্যান্য দলের যারা একে অস্বীকার করে, অগ্নিই তাদের প্রতিশ্র“ত স্থান।” (সূরা হূদ ১১ : ১৭)
অতএব যারা আল্লাহ তা‘আলার বিধানের অবাধ্য হবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. কুরআন মূলত জীবিতদের জন্যই নাযিল হয়েছে, অতএব মৃতদের পাশে কুরআন পাঠে তাদের কোনই উপকার হবে না।
২. সূরা ইয়াসীনের ফযীলত রয়েছে বলে তা মৃতদের পাশে পাঠ করা হয় যা সঠিক নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬৮-৭০ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা ইবনে আদম সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, যেমন যেমন তাদের যৌবনে ভাটা পড়তে থাকে তেমন তেমন তাদের বার্ধক্য দর্বলতা ও শক্তিহীনতা এসে পড়ে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন দুর্বল রূপে, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি, শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি। করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।”(৩০:৫৪) অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অথাৎ “তোমাদের মধ্যে এমন লোক আছে যাকে খুব বেশী বয়সের দিকে ফিরিয়ে দেয়া হয় (সে অতি বার্ধক্যে পদার্পণ করে), যাতে সে জ্ঞানবান হওয়ার পরে জ্ঞানহীন হয়ে পড়ে।”(২২:৫) সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ এই যে, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী ও স্থানান্তরের জায়গা। এ দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়। তবুও কি এ লোকগুলো এ জ্ঞান রাখে না যে, তারা নিজেদের শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের উপর চিন্তা-ভাবনা করে এবং হৃদয়ঙ্গম করে যে, এই দুনিয়ার পরে আখিরাত আসবে এবং এই জীবনের পরে আবার নবজীবন লাভ করবে?
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং কাব্য রচনা তাঁর পক্ষে শোভনীয়ও নয়। কবিতার প্রতি তাঁর ভালবাসা নেই এবং কোন আকর্ষণও নেই। এর প্রমাণ তার জীবনেই প্রকাশমান যে, তিনি কোন কবিতা পাঠ করলে তা সঠিকভাবে শেষ করতে পারতেন না এবং তাঁর পুরোপুরিভাবে তা মুখস্থ থাকতো না। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, আবদুল মুত্তালিবের বংশের প্রত্যেক নর ও নারী কবিতা বলতে পারতো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা হতে বহু দূরে ছিলেন।” (এটা ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্ন লিখিত কবিতাংশটিঃ (আরবী) এইরূপে পড়েন। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন:“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কবিতাংশটি এরূপ নয়, বরং নিম্নরূপ হবেঃ (আরবী) অতঃপর হযরত আবু বকর (রাঃ) অথবা হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা আপনার ব্যাপারে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
ইমাম বায়হাকী (রঃ) স্বীয় দালায়েল’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আব্বাস ইবনে মিরদাস সালমী (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমিই তো (আরবী) এ কবিতাংশটি বলেছো?” উত্তরে হযরত আব্বাস ইবনে মিরদাস (রাঃ) বলেনঃ “এটা (আরবী)-এইরূপ হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সবই সমান।” অর্থাৎ অর্থের দিক দিয়ে দুটো একই। তার উপর আল্লাহর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সুহায়লী (রঃ) আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর এভাবে নাম আগে পাছে করার এক বিস্ময়কর কারণ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আকরাকে পূর্বে এবং উইয়াইনাকে পরে এ জন্যেই উল্লেখ করেছেন যে, উইয়াইনা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফের যুগে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আকরা ইসলামের উপর অটল ছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
উমুভী (রঃ) তাঁর 'মাগাযী’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদর যুদ্ধে নিহত কাফিরদের মাঝে চক্কর দিতে দিতে মুখে উচ্চারণ করছিলেনঃ (আরবী) তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) কবিতার পংক্তিটি পূর্ণ করতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) এটা কোন একজন আরবীয় কবির কবিতাংশ। এটা দিওয়ানে হামাসার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো কখনো কবি তুরফার নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এমন ব্যক্তি তোমার নিকট সংবাদ বহন করবে যাকে তুমি ভ্রমণ সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করনি।” এর প্রথম মিসরাটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “যামানা অতি শীঘ্র অজ্ঞাত বিষয় তোমার নিকট প্রকাশ করে দিবে।”
হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় ? “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিতা বলতেন কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ তাঁর কবিতার প্রতি সবচেয়ে বেশী ঘৃণা ছিল। হ্যা, তবে তিনি কখনো কখনো বানু কায়েসের কবিতা পাঠ করতেন। কিন্তু তাতেও তিনি ভুল করে বসতেন। আগে পিছে হয়ে যেতো। হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন বলতেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরূপ হবে না বরং এইরূপ হবে।
তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমি কবিও নই এবং কবিতা রচনা করা আমার জন্যে শোভনীয়ও নয়।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিতা পড়তেন কি-না এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ না, তবে কবি তুরফার নিম্নের কবিতাংশটি তিনি পড়তেনঃ (আরবী) কিন্তু তিনি (আরবী) এইরূপ পড়েন। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “এটা এই রূপ নয়।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি কবি নই এবং কবিতা রচনা আমার জন্যে শোভনীয়ও নয়।”
সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খন্দক খননের সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর কবিতা পাঠ করেছিলেন। তবে এটা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, তিনি এ কবিতা সাহাবীদের (রাঃ) সাথে পাঠ করেছিলেন। কবিতাটি নিম্নরূপঃ (আরবী) রাসূলুল্লাহ (সঃ) শব্দটি খুব টান দিয়ে উচ্চ স্বরে পড়তেন।
কবিতাটির আনুবাদঃ “কোন চিন্তা নেই, যদি আপনি না থাকতেন তবে আমরা সুপথ প্রাপ্ত হতাম না। আর সাদকাও করতাম না এবং নামাযও পড়তাম না। সুতরাং (হে আল্লাহ!) আমাদের উপর শান্তি নাযিল করুন এবং যদি আমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্মুখীন হই তবে আমাদের পাগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে অটল ও স্থির রাখুন! এ লোকগুলোই আমাদের উপর হঠকারিতা করেছে, তবে যখন তারা ফিত্নার ইচ্ছা করে তখন আমরা তা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করি। অনুরূপভাবে এটাও প্রমাণিত আছে যে, হুনায়েনের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাঠ করেছিলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি নবী, এটা মিথ্যা নয় এবং আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান (সন্তানের সন্তান বা বংশধর)।”
এ ব্যাপারে এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, ঘটনাক্রমে এমন একটা কথা তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে যা কবিতার ওজনে মিলে গেছে। কিন্তু ইচ্ছা করে তিনি কবিতা বলেননি।
হযরত জুনদুব ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে একটি গুহায় ছিলাম এমতাবস্থায় তাঁর একটি অঙ্গুলী যখমী হয়। তখন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাঃ “তুমি একটি অঙ্গুলী মাত্র এবং তুমি আল্লাহর পথে রক্তাক্ত হয়েছে।” এটাও ঘটনাক্রমে হয়েছে, ইচ্ছাপূর্বক নয়। অনুরূপভাবে (আরবী)-এর তাফসীরে একটি হাদীস আসছে, তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করেন তবে তো আমাদের পাপরাশিই ক্ষমা করবেন, অন্যথায় আপনার কোন বান্দাই তো ছোট ছোট পাপ ও পদস্থলন হতে মুক্ত ও পবিত্র নয়। সুতরাং এ সবগুলো এ আয়াতের বিপরীত নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা কবিতা শিক্ষা নয়। বরং এটা তো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন। এর কাছে বাতিল আসতে পারে না। কুরআন কারীমের এই পবিত্র ছন্দ কবিতা হতে বহু দূরে রয়েছেন এবং এটা হতে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র। এমনিভাবে এ কুরআন গণক এবং যাদুকরের কথা হতেও পুরোপুরিভাবে পবিত্র। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বভাব ও প্রকৃতি এসব হতে ছিল সম্পূর্ণ নিষ্কলংক।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তিনি বলতে শুনেছেনঃ “আমাকে যা দেয়া হয়েছে তার কাছে আমি বিষের প্রতিষেধক পান করা, তাবীয লটকানো এবং কবিতা রচনাকরণকে মোটেই গ্রাহ্য করি না (কুরআন কারীমের কাছে এগুলো একেবারে মূল্যহীন ও তুচ্ছ)।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, কবিতার প্রতি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রকৃতিগতভাবে ঘৃণা ছিল। দুআয় তিনি ব্যাপক অর্থবোধক কালেমা পছন্দ করতেন এবং এ ছাড়া অন্যগুলো ছেড়ে দিতেন। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কারো পেট পূজে পরিপূর্ণ হওয়া তার জন্যে কবিতায় তার পেট পূর্ণ হওয়া অপেক্ষা উত্তম।” (ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)
হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:“যে ব্যক্তি ইশার নামাযের পর কবিতার একটি ছন্দ রচনা করে তার ঐ রাত্রির নামায ককূল হয় না।”
তবে এখানে এটা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, কবিতার শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। মুশরিকদের নিন্দে করে কবিতা রচনা করা শরীয়ত সম্মত। হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) প্রমুখ বড় বড় মর্যাদাবান সাহাবীগণ মুশরিকদের নিন্দা করে কবিতা রচনা করেছেন। কতকগুলো কবিতা হয় উপদেশ, আদব ও হিকমতে পরিপূর্ণ, যেমন অজ্ঞতার যুগের কবিদের কবিতার মধ্যে পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, উমাইয়া ইবনে সালাতের কবিতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মন্তব্য করেনঃ “তার কবিতাগুলো তো ঈমান এনেছে। কিন্তু তার অন্তর কাফিরই রয়ে গেছে।”
একজন সাহাবী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উমাইয়ার একশটি কবিতা শুনিয়ে দেন। প্রত্যেকটি কবিতার পরেই তিনি বলেনঃ “আরো বলো।`
সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কতকগুলো বর্ণনা যাদুর মত কাজ করে আর কতকগুলো কবিতা হয় হিকমতে পরিপূর্ণ।”
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়। এটা তো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন। যে ব্যক্তি এ সম্পর্কে সামান্য পরিমাণও চিন্তা করবে তার কাছেই এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। এটা এ জন্যেই যে, যেন তিনি দুনিয়ায় জীবিতাবস্থায় বিদ্যমান লোকদেরকে সতর্ক করতে পারেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন আমি এর দ্বারা তোমাদেরকে এবং যাদের কাছে এটা পৌঁছবে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি।` (৬:১৯) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দলসমূহের মধ্যে যারাই এটাকে মানবে না তারাই জাহান্নামের যোগ্য।”(১১:১৭) এই কুরআন এবং নবী (সঃ)-এর ফরমান তাদের জন্যে ক্রিয়াশীল ও ফলদায়ক হবে যাদের অন্তর জীবিত এবং ভিতর পরিষ্কার। যাদের জ্ঞান ও অন্তদৃষ্টি রয়েছে। আর শাস্তির কথা তো কাফিরদের উপর বাস্তবায়িত হয়েছে। অতএব, কুরআন কারীম মুমিনদের জন্যে রহমত স্বরূপ এবং কাফিরদের উপর হুজ্জত স্বরূপ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।