আল কুরআন


সূরা ইয়াসীন (আয়াত: 49)

সূরা ইয়াসীন (আয়াত: 49)



হরকত ছাড়া:

ما ينظرون إلا صيحة واحدة تأخذهم وهم يخصمون ﴿٤٩﴾




হরকত সহ:

مَا یَنْظُرُوْنَ اِلَّا صَیْحَۃً وَّاحِدَۃً تَاْخُذُهُمْ وَ هُمْ یَخِصِّمُوْنَ ﴿۴۹﴾




উচ্চারণ: মা-ইয়ানজু রূনা ইল্লা সাইহাতাওঁ ওয়া-হিদাতান তা’খুযুহুম ইয়াখিসসিমূন।




আল বায়ান: তারা তো কেবল এক বিকট আওয়াজের অপেক্ষা করছে যা তাদেরকে বাক-বিতন্ডায় লিপ্ত অবস্থায় পাকড়াও করবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৯. তারা তো অপেক্ষায় আছে এক বিকট শব্দের, যা তাদেরকে আঘাত করবে তাদের বাক-বিতণ্ডাকালে।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা যে জন্য অপেক্ষা করছে সেটাতো একটা প্রচন্ড শব্দ যা তাদেরকে পাকড়াও করবে যখন তারা নিজেদের মধ্যে বাক-বিতন্ডায় লিপ্ত থাকবে।




আহসানুল বায়ান: (৪৯) ওরা তো এক মহাগর্জনের অপেক্ষায় আছে যা এদের বাক্-বিতন্ডাকালে ওদেরকে আঘাত করবে। [1]



মুজিবুর রহমান: এরাতো অপেক্ষায় আছে এক মহানাদের যা এদেরকে আঘাত করবে এদের বাক বিতন্ডা কালে।



ফযলুর রহমান: তারা কেবল একটা আওয়াজেরই অপেক্ষায় আছে, যা তাদেরকে ঝগড়ায় লিপ্ত থাকা অবস্থায় পাকড়াও করবে।



মুহিউদ্দিন খান: তারা কেবল একটা ভয়াবহ শব্দের অপেক্ষা করছে, যা তাদেরকে আঘাত করবে তাদের পারস্পরিক বাকবিতন্ডাকালে।



জহুরুল হক: তারা একটিমাত্র মহাগর্জন ছাড়া আর কিছুর অপেক্ষা করছে না, এটি তাদের আঘাত করবে যখন তারা কথা কাটাকাটি করছে।



Sahih International: They do not await except one blast which will seize them while they are disputing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৯. তারা তো অপেক্ষায় আছে এক বিকট শব্দের, যা তাদেরকে আঘাত করবে তাদের বাক-বিতণ্ডাকালে।(১)


তাফসীর:

(১) কাফেররা ঠাট্টা ও পরিহাসাচ্ছলে মুসলিমদেরকে জিজ্ঞেস করত, তোমরা যে কেয়ামতের প্রবক্তা, তা কোন বছর ও কোন তারিখে সংঘটিত হবে। বর্ণিত আয়াতে তারই জওয়াব দেয়া হয়েছে। তাদের প্রশ্ন বাস্তব বিষয় জানার জন্যে নয়, বরং ঠাট্টা ও পরিহাসের ছলে নিছক চ্যালেঞ্জের ঢংয়ে কুটতর্ক করার জন্য। এ ব্যাপারে তারা একথা বলতে চাচ্ছিল যে, কোন কিয়ামত হবে না, তোমরা খামাখা আমাদের ভয় দেখাচ্ছে। এ কারণে তাদের জবাবে বলা হয়নি, কিয়ামত অমুক দিন আসবে বরং তাদেরকে বলা হয়েছে, তা আসবে এবং প্রচণ্ড শক্তিতে আসবে। জানার জন্য হলেও কেরামতের সন-তারিখের নিশ্চিত জ্ঞান কাউকে না দেয়াই স্রষ্টার সৃষ্টি রহস্যের দাবি ছিল। তাই আল্লাহ তা’আলা এ জ্ঞান তাঁর নবী-রসুলকেও দান করেননি। নির্বোধদের এই প্রশ্ন অনর্থক ও বাজে ছিল বিধায় এর জওয়াবে কেয়ামতের তারিখ বর্ণনা করার পরিবর্তে তাদেরকে হুশিয়ার করা হয়েছে যে, যে বিষয়ের আগমন অবশ্যম্ভাবী। তার জন্যে প্রস্তুতি গ্ৰহণ করা এবং সন-তারিখ খোঁজাখুঁজিতে সময় নষ্ট না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কেয়ামতের খবর শুনে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং সৎকর্ম সম্পাদন করাই ছিল বিবেকের দাবি। কিন্তু তারা এমনি গাফেল যে, কেয়ামতের আগমনের পর তারা যেন চিন্তা করার অপেক্ষায় আছে। তাই বলা হয়েছে যে, তারা কেয়ামতের অপেক্ষা করছে। অথচ কিয়ামত আস্তে আস্তে ধীরে-সুস্থে আসবে এবং লোকেরা তাকে আসতে দেখবে, এমনটি হবে না। বরং তা এমনভাবে আসবে যখন লোকেরা পূর্ণ নিশ্চিন্ততা সহকারে নিজেদের কাজ কারবারে মশগুল থাকবে এবং তাদের মনের ক্ষুদ্রতম কোণেও এ চিন্তা জাগবে না যে, দুনিয়ার শেষ সময় এসে গেছে। এ অবস্থায় অকস্মাৎ একটি বিরাট বিস্ফোরণ ঘটবে এবং যে যেখানে থাকবে সেখানেই খতম হয়ে যাবে।

হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, লোকেরা পথে চলাফেরা করবে, বাজারে কেনাবেচা করতে থাকবে, নিজেদের মজলিসে বসে আলাপ আলোচনা করতে থাকবে, এমন সময় হঠাৎ শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে। কেউ কাপড় কিনছিল। হাত থেকে রেখে দেবার সময়টুকু পাবে না, সে শেষ হয়ে যাবে। কেউ নিজের পশুগুলোকে পানি পান করাবার জন্য জলাধার ভর্তি করবে এবং তখনো পানি পান করানো শুরু করবে না তার আগেই কিয়ামত হয়ে যাবে। কেউ খাবার খেতে বসবে এবং এক গ্রাস খাবার মুখ পর্যন্ত নিয়ে যাবার সুযোগও পাবে না। [বুখারীঃ ৬৫০৬]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৯) ওরা তো এক মহাগর্জনের অপেক্ষায় আছে যা এদের বাক্-বিতন্ডাকালে ওদেরকে আঘাত করবে। [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, মানুষ বাজারে কেনা-বেচা এবং স্বাভাবিক অভ্যাস অনুযায়ী কথাবার্তা ও বাক্-বিতন্ডায় ব্যস্ত থাকবে, এমতাবস্থায় হঠাৎ শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং কিয়ামত অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। এটা হবে প্রথম ফুৎকার, যাকে نَفْخَةُ فَزَعٍ বলা হয়। বলা হয়েছে যে, এর পরে দ্বিতীয় ফুৎকার হবে نَفْخَةُ الصَّعْقِ যাতে আল্লাহ তাআলা ছাড়া সমস্ত জীব মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৫-৫৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



পূর্বের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তা’আলা কয়েকটি নির্দশন বর্ণনা করার পর এখানে তিনি বলছেন : তাওহীদ ও রিসালতের সত্যতা প্রমাণে যে কোন নির্দশন তাদের কাছে এসেছে তারা সকল নির্দশন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।



(مَا بَيْنَ أَيْدِيْكُمْ وَمَا خَلْفَكُمْ)



‘যা তোমাদের সামনে রয়েছে এবং যা তোমাদের পিছনে আছে’ অর্থাৎ যে আমলগুলো তোমরা অতীতে করেছ এবং তোমাদের সামনে যে কবর, জাহান্নাম রয়েছে সে জন্য ভয় কর।



(وَإِذَا قِيْلَ لَهُمْ أَنْفِقُوْا)



অর্থাৎ তাদেরকে যখন বলা হয়- অভাবী গরীব মিসকীনদেরকে দান কর এবং আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করো ঐ সকল জীবিকা হতে যা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে দান করেছেন। তখন তারা বলে যে, আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা হলে তিনি নিজেই তো তাদেরকে খেতে দিতে পারতেন? সুতরাং তিনি যেহেতু তাদেরকে খাওয়াননি তাহলে আমরা কেন তাদেরকে খাওয়াব? অতএব তোমরা আমাদের এ গরীব-মিসকিনদেরকে খাওয়ানোর কথা বলে অন্যায় কাজ করছ। আমরা তাদের পিছনে অর্থ-সম্পদ খরচ করব না।



(مَتٰي هٰذَا الْوَعْدُ)



‘এ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কখন হবে?’ অর্থাৎ কাফির-মুশরিকরা কিয়ামত সংঘঠিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করে জিজ্ঞাসা করে কিয়ামত কখন হবে? আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, মূলত তারা একটি মহা গর্জনের অপেক্ষা করছে।



অর্থাৎ মানুষ বাজারে কেনা-বেচা এবং স্বাভাবিক অভ্যাস অনুযায়ী কথাবার্তা ও বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত থাকবে, এমন সময় হঠাৎ শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে এবং কিয়ামত সংঘঠিত হয়ে যাবে। এটা হবে প্রথম ফুঁৎকার, যাকে نفخة الفزع বলা হয়। বলা হয়েছে যে, এর পরে দ্বিতীয় ফুঁৎকার হবে, যাকে نفخة الصعق বলা হয়। যাতে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সমস্ত জীব মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।



وَنُفِخَ فِي الصُّوْر



অর্থাৎ প্রথম মত অনুযায়ী এটা দ্বিতীয় ফুঁৎকার এবং দ্বিতীয় মত অনুযায়ী এটা তৃতীয় ফুৎকার হবে, যাকে



نفخة البعث و النشور



বলা হয়। এতে মানুষকে কবর থেকে জীবিত করা হবে। (ইবনু কাসীর)



الْأَجْدَاثِ শব্দটি جدث এর বহুবচন, অর্থ কবর। يَنْسِلُوْنَ শব্দটি نسلان থেকে উদ্ভূত। অর্থ দ্রুত চলা। অর্থাৎ তারা দ্রুত কবর থেকে বের হবে। অন্য আয়াতে রয়েছে : হাশরের সময় মানুষ কবর থেকে উঠে দেখতে থাকবে। এ বক্তব্য পূর্ববর্তী বক্তব্যের পরিপন্থী নয়, কারণ প্রথমাবস্থায় বিস্মিত হয়ে দন্ডায়মান অবস্থায় দেখতে থাকবে এবং পরে দ্রুতগতিতে হাশরের দিকে দৌড়াতে থাকবে।



(مَنْۭ بَعَثَنَا مِنْ مَّرْقَدِنَا)



‘কে আমাদেরকে আমাদের কবর থেকে উঠাল?’ অর্থাৎ মু’মিনরা কবরে যে আরাম-আয়েশে ছিল কিয়ামত সংঘটিত হলে তা বর্জন করে উঠতে হবে আর কাফিররা কবরের আযাবের চেয়ে আরো কঠিন আযাবের সম্মুখিন হবে তাই তারা সবাই এ কথা বলবে। ফেরেশতারা তাদের কথার জবাবে বলবে :



(هٰذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمٰنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُوْنَ)



‘দয়াময় আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্যই বলেছিলেন।’



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কিয়ামতের দিবসে কারো প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না। প্রত্যেকে যা আমল করবে তাকে তারই প্রতিদান দেয়া হবে। সুতরাং যে যা আমল করবে কিয়ামতের দিন সে তা-ই পাবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আল্লাহ তা‘আলার বিধানের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা যাবে না।

২. আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় বেশি বেশি ব্যয় করা উচিত, এতে নেকীর পাল্লা ভারী হবে।

৩. কিয়ামত মানুষের নিকট হঠাৎ চলে আসবে। তারা বুঝতেও পারবে না। সুতরাং সর্বদা ভাল কাজ করতে হবে মন্দ কাজ করা যাবে না।

৪. বিচারের মাঠে কারো প্রতি কোন জুলুম করা হবে না, প্রত্যেকে আপন-আপন কর্মের ফল পাবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৮-৫০ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেনঃ যেহেতু কাফিররা কিয়ামতকে বিশ্বাস করতো। সেহেতু তারা নবীদেরকে (আঃ) ও মুসলমানদেরকে বলতোঃ “কিয়ামত আনয়ন করছো না কেন? আচ্ছা বলতোঃ কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ কিয়ামত সংঘটিত করার ব্যাপারে আমার কোন আসবাব পত্রের প্রয়োজন হবে না। শুধুমাত্র একবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, জনগণ প্রতিদিনের মত নিজ নিজ কাজে মগ্ন হয়ে পড়বে, এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে শিঙ্গায় ফুঙ্কার দেয়ার নির্দেশ দিবেন, তখন মানুষ এদিকে ওদিকে পড়তে শুরু করবে। ঐ আসমানী ভীষণ ও বিকট শব্দের ফলেই সবাই হাশরের মাঠে আল্লাহ তা'আলার সামনে একত্রিত হয়ে যাবে। ঐ শব্দের পরে কাউকেই এতোটুকুও সময় দেয়া হবে না যে, কারো সাথে কোন কথা বলে বা কারো কোন কথা শুনে অথবা কারো জন্যে কোন অসিয়ত করতে পারে। তাদের নিজেদের বাড়ীতে ফিরে যাবার ক্ষমতা থাকবে না। এ আয়াত সম্পর্কে বহু ‘আসার’ ও হাদীস রয়েছে, যেগুলো আমরা অন্য জায়গায় বর্ণনা করে। এসেছি। এই প্রথম ফুস্কারের পর দ্বিতীয় ফুঙ্কার দেয়া হবে, যার ফলে সবাই মরে যাবে। সারা জগত ধ্বংস হয়ে যাবে। একমাত্র সদা বিরাজমান আল্লাহ থাকবেন, যার ধ্বংস নেই। এরপর পুনরায় উত্থিত হবার ফুস্কার দেয়া হবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।