সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 45)
হরকত ছাড়া:
يا أيها النبي إنا أرسلناك شاهدا ومبشرا ونذيرا ﴿٤٥﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ اِنَّاۤ اَرْسَلْنٰکَ شَاهِدًا وَّ مُبَشِّرًا وَّ نَذِیْرًا ﴿ۙ۴۵﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুইন্নাআরছালনা-কা শাহিদাওঁ ওয়া মুবাশশিরাওঁ ওয়া নাযীরা-।
আল বায়ান: হে নবী, আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৫. হে নবী! অবশ্যই আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে(১);
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে নবী (সা.)! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি (যুগে যুগে প্রেরিত নবী রসূলগণ যে তাঁদের উম্মাতের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন- এ কথার) সাক্ষীস্বরূপ এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে,
আহসানুল বায়ান: (৪৫) হে নবী! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে,[1] সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে,
মুজিবুর রহমান: হে নাবী! আমিতো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী হিসাবে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে –
ফযলুর রহমান: হে নবী! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি একজন সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে;
মুহিউদ্দিন খান: হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।
জহুরুল হক: হে প্রিয় নবী! আমরা নিশ্চয়ই তোমাকে পাঠিয়েছি একজন সাক্ষীরূপে, আর একজন সুসংবাদদাতারূপে, আর একজন সতর্ককারীরূপে,
Sahih International: O Prophet, indeed We have sent you as a witness and a bringer of good tidings and a warner.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৫. হে নবী! অবশ্যই আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে(১);
তাফসীর:
(১) ‘মুবাশ্শির’ এর মর্মার্থ এই যে, তিনি স্বীয় উম্মতের মধ্য থেকে সৎ ও শরীয়তানুসারী ব্যক্তিবর্গকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন এবং ‘নাযির’ অর্থাৎ, তিনি অবাধ্য ও নীতিচ্যুত ব্যক্তিবর্গকে আযাব ও শাস্তির ভয়ও প্রদর্শন করেন। [তাবারী, বাগভী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৫) হে নবী! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে,[1] সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে,
তাফসীর:
[1] অনেকে ‘شاهد’ এর অর্থ হাযের-নাযের (সর্বস্থলে উপস্থিত ও দর্শক) করে থাকেন; যা কুরআনের অর্থ-বিকৃতির নামান্তর। নবী (সাঃ) আপন উম্মতের জন্য সাক্ষ্য দেবেন, তাদের জন্যও সাক্ষ্য দেবেন যাঁরা তাঁর উপর ঈমান এনেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধেও যারা তাঁকে মিথ্যা মনে করেছে। কিয়ামতের দিন তিনি মু’মিনদেরকে তাদের ওযুর উজ্জ্বল স্থান দেখে চিনতে পারবেন। অনুরূপ তিনি অন্যান্য নবীদের জন্য সাক্ষ্য দেবেন যে, তাঁরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছিলেন। এ সাক্ষ্য আল্লাহর দেওয়া সুনিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে হবে। এই কারণে নয় যে, তিনি সকল আম্বিয়াগণ (ও তাঁদের কার্যকলাপ)-কে স্বচক্ষে দর্শন করতেন। বলা বাহুল্য, এই বিশ্বাস কুরআনী দলীলের পরিপন্থী।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৫-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর:
আলোচ্য আয়াতগুলোতে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করার কিছু উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে এবং তাঁর পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
(১) شَاهِدًا – রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সাক্ষ্য দানকারীরূপে প্রেরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি স্বীয় উম্মাতের জন্য সাক্ষীস্বরূপ, যারা তাঁর ওপর ঈমান এনেছে ও সৎ আমল করে তাদের পক্ষে আর যারা কুফরী করবে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করবেন। এমনকি তিনি পূর্ববর্তী নাবীদের ব্যাপারেও সাক্ষ্য প্রদান করবেন যে, তাঁরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট আল্লাহ তা‘আলার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছিলেন। আর এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে জানিয়ে দেবেন। বস্তুত এমন নয় যে, তিনি তা স্বচক্ষে দেখেছেন। আবূ সাঈদ খুদরী (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত দীর্ঘ হাদীস, যার কিয়দাংশন হল কিয়ামতের দিন নূহ (عليه السلام) উপস্থিত হলে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি আমার বাণী তোমার উম্মাতের কাছে পৌঁছে দিয়েছ কি? তিনি বলবেন: হ্যাঁ, যথারীতি পৌঁছে দিয়েছি। অতঃপর তাঁর উম্মতকে জিজ্ঞেস করা হবে, তিনি কি তোমাদের কাছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী পৌঁছে দিয়েছেন? তারা অস্বীকার করবে। নূহ (عليه السلام)-কে জিজ্ঞেস করা হবে, আপনার স্বপক্ষে কোন সাক্ষী আছে কি? তিনি বলবেন: মুহাম্মাদ ও তাঁর উম্মত সাক্ষী। তখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও উম্মাতে মুহাম্মাদী সাক্ষ্য দেবেন যে, তিনি আল্লাহ তা‘আলার বার্তা যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍۭ بِشَهِيْدٍ وَّجِئْنَا بِكَ عَلٰي هٰٓؤُلَا۬ءِ شَهِيْدًا)
“যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব তখন কী অবস্থা হবে?” (সূরা নিসা ৪:৪১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَكَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ أُمَّةً وَّسَطًا لِّتَكُوْنُوْا شُهَدَا۬ءَ عَلَي النَّاسِ وَيَكُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَيْكُمْ شَهِيْدًا)
“আর এভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী ন্যায়পরায়ণ উম্মত করেছি যেন তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষী হও এবং রাসূলও তোমাদের জন্য সাক্ষী হবেন।” (সূরা বাকারাহ ২:১৪৩)
আবার কোন কোন বিদ‘আতী شَاهِدًا এর অর্থ বলেছে যে, ‘হাযির-নাযির’ অর্থাৎ সর্বস্থলে সর্বাবস্থায় উপস্থিত ও দর্শক। এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোথাও হাযের নাযের নন। একথা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
(২ ও ৩) (وَّمُبَشِّرًا وَّنَذِيْرًا) –
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি সঠিক ঈমান ও সৎ আমলকারী মু’মিনদেরকে আল্লাহ তা‘আলার রহমত ও জান্নাতের সুসংবাদ দানকারী এবং কাফির মুনাফিকদেরকে আল্লাহ তা‘আলার আযাব ও জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ককারী।
(فَضْلًا كَبِيْرًا)
‘মহা অনুগ্রহ’ যা মু’মিনদের জন্য প্রস্তুত আছে। এ মহা অনুগ্রহের বর্ণনা দিয়ে সূরা শুরাতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ فِيْ رَوْضَاتِ الْجَنّٰتِ ج لَهُمْ مَّا يَشَا۬ءُوْنَ عِنْدَ رَبِّهِمْ ط ذٰلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيْرُ)
“তুমি জালিমদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবে তাদের কৃতকর্মের জন্য; আর এটাই আপতিত হবে তাদের ওপর। যারা ঈমান আনে ও সৎ আমল করে তারা থাকবে জান্নাতের বাগানসমুহে। তারা যা কিছু চাইবে তাদের প্রতিপালকের নিকট তাই পাবে। এটাই তো মহা অনুগ্রহ।” (সূরা শুরা ৪২:২২)
(৪) (وَّدَاعِيًا إِلَي اللّٰهِ) –
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আহ্বানকারী অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় ও অনুমতিতে তিনি মানুষকে এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের দিকে আহ্বান করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ هٰذِه۪ سَبِيْلِيْٓ أَدْعُوْآ إِلَي اللّٰهِ ﺩ عَلٰي بَصِيْرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِيْ ط وَسُبْحٰنَ اللّٰهِ وَمَآ أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ)
“বল: ‘এটাই আমার পথ: আল্লাহর প্রতি মানুষকে আমি আহ্বান করি সজ্ঞানে ও দলীল-প্রমাণের সাথে আমি এবং আমার অনুসারীগণও। আল্লাহ মহিমান্বিত এবং যারা আল্লাহর সাথে শরীক করে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ (সূরা ইউসূফ ১২:১০৮)
(৫) (وَسِرَاجًا مُّنِيْرًا) –
উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রদীপের সাথে তুলনা করার কারণ হল প্রদীপ দ্বারা যেমন অন্ধকার দূর হয় অনুরূপ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দ্বারাও কুফর ও শির্কের অন্ধকার দূর করা হয়েছে। তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে উজ্জ্বল প্রদীপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এসব গুণ ও দায়িত্ব উল্লেখ করার পর সতর্ক করে বলছেন, হে নাবী! কখনো কাফির ও মুনাফিকদের অনুসরণ কর না। বরং তোমার প্রতি যে ওয়াহী করা হয়েছে তার অনুসরণ কর। যদি তাদের অনুসরণ কর তাহলে তারা তোমাকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে, ফলে তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের শামিল হয়ে যাবে। তাই তাদের অনুরসরণ না করে সর্বদা সকল কাজে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা রাখো। কেননা আল্লাহ তা‘আলাই সংরক্ষক হিসেবে যথেষ্ট।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করার উদ্দেশ্য জানলাম।
১. রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোথাও হাযির-নাযির নন।
২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে শির্কের অন্ধকার দূর করার জন্য উজ্জ্বল প্রদীপরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।
৩. কাফির ও মুনাফিকদের অনুসরণ করা যাবে না।
৪. সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার ওপরই ভরসা করতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪৫-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে বললামঃ তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে আমাকে তার খবর দিন। উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, কুরআন কারীমে তার যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে তারই কতক অংশ তাওরাতেও বর্ণিত হয়েছে। তাওরাতে রয়েছেঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে। অজ্ঞ ও নিরক্ষর লোকদেরকে তুমি সতর্ক করবে। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম মুতাওয়াকিল (ভরসাকারী) রেখেছি। তুমি কঠোর চিত্ত ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে গোলমাল ও চীকার করে বেড়াও না। তুমি মন্দকে মন্দ দ্বারা দূরীভূত কর না। বরং তুমি ক্ষমা ও মাফ করে থাকো। আল্লাহ তোমাকে কখনো উঠিয়ে নিবেন না যে পর্যন্ত না তুমি মানুষের বক্রকৃত দ্বীনকে সোজা করবে। আর তারা যে পর্যন্ত বলবেঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। যার দ্বারা অন্ধের চক্ষু উজ্জ্বল হয়ে যাবে, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং মোহরকৃত অন্তর খুলে যাবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের নবীদের মধ্যে শুইয়া (আঃ) নামক একজন নবীর নিকট অহী করলেনঃ “তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে দাঁড়িয়ে যাও। আমি তোমার মুখের ভাষায় আমার কথা বলবো। আমি অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের মধ্যে। একজন নিরক্ষর নবীকে পাঠাবো। সে না বদ স্বভাবের হবে, না কর্কশভাষী হবে। সে হাটে-বাজারে হট্টগোল সৃষ্টি করবে না। সে এতো শান্ত-শিষ্ট হবে যে, জ্বলন্ত প্রদীপের পার্শ্ব দিয়ে সে গমন করলেও প্রদীপটি নিভে যাবে না। যদি সে বাঁশের উপর দিয়েও চলে তবুও তাতে তার পায়ের শব্দ হবে না। আমি তাকে সুসংবাদ প্রদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করবো। সে সত্যভাষী হবে। আমি তার সম্মানার্থে অন্ধের চক্ষ খুলে দিবো, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং দাগ ও কালিমাযুক্ত অন্তরকে পরিষ্কার করে দিবো। আমি তাকে প্রত্যেক ভাল কাজের দিকে পরিচালিত করবো। সমস্ত ভাল স্বভাব তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। লোকের অন্তর জয়কারী হবে তার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সৎ কাজ করা তার প্রকৃতিগত বিষয় হবে। তার অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকবে। তার কথাবার্তা হবে হিকমত পূর্ণ। সত্যবাদিতা ও অঙ্গীকার পালন হবে তার স্বভাবগত বিষয়। ক্ষমা ও সদাচরণ হবে তার চরিত্রগত গুণ। সত্য হবে তার শরীয়ত। তার স্বভাব-চরিত্রে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। হিদায়াত হবে তার কাম্য। ইসলাম হবে তার মিল্লাত। তার নাম হবে আহমাদ (সঃ)। তার মাধ্যমে আমি পথভ্রষ্টকে সুপথ প্রদর্শন করবো, মূর্খদেরকে বিদ্বান বানিয়ে দিবো। অধঃপতিতকে করবো মর্যাদাবান। অপরিচিতকে করবো খ্যাতি সম্পন্ন ও সকলের পরিচিত। তার কারণে আমি রিক্ত হস্তকে দান করবো প্রচুর সম্পদ। ফকীরকে বানিয়ে দিবো বাদশাহ। কঠোর হৃদয়ের লোকের অন্তরে আমি দয়া ও প্রেম-প্রীতি দিয়ে দিবো। মতভেদকে ইত্তেফাকে পরিবর্তিত করবো। মতপার্থক্যকে করে দিবো একমত। তার কারণে আমি দুনিয়াকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করবো। সমস্ত উম্মত হতে তার উম্মত হবে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদা সম্পন্ন। মানব জাতির উপকারার্থে তাদের আবির্ভাব ঘটবে, তারা সৎ কার্যের নির্দেশ দান করবে ও মন্দ কার্যে বাধা দেবে। তারা হবে একত্ববাদী মুমিন ও নিষ্ঠাবান। পূর্ববর্তী নবীদের উপর যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তারা মেনে নেবে। তারা মসজিদে, মজলিসে, চলা-ফেরাতে এবং উঠা-বসাতে আমার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণাকারী হবে। তারা আমার জন্যে দাঁড়িয়ে ও বসে নামায পড়বে। আল্লাহর পথে দলবদ্ধ ও সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধ করবে। তাদের মধ্যে হাজার হাজার লোক আমার সন্তুষ্টির অন্বেষণে ঘরবাড়ী ছেড়ে জিহাদের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। অযু করার জন্যে তারা মুখ-হাত ধৌত করবে। পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত তারা কাপড় পরিধান করবে। আমার কিতাব তাদের বুকে বাঁধা থাকবে। আমার নামে তারা কুরবানী করবে। তারা হবে রাত্রে আবেদ এবং দিনে মুজাহিদ। এই নবীর আহূলে বায়েত ও সন্তানদের মধ্যে আমি অগ্রগামী, সত্যের সাধক, শহীদ ও সৎ লোকদেরকে সৃষ্টি করবো। তারপরে তার উম্মত দুনিয়ায় সত্যের পথে মানুষকে আহ্বান করতে থাকবে এবং ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করবে। তাদেরকে যারা সাহায্য করবে তাদেরকে আমি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবো। পক্ষান্তরে তাদের যারা বিরোধিতা ও বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং অমঙ্গল কামনা করবে তাদের জন্যে আমি খুব মন্দ দিন আনয়ন করবো। আমি এই নবীর উম্মতকে নবীর ওয়ারিশ বানিয়ে দিবো। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে আহ্বানকারী হবে। তারা ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে। তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। ঐ ভাল কাজ আমি তাদের হাতেই সমাপ্ত করাবো, যা তারা শুরু করেছিল। এটা আমার অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহ আমি। যাকে ইচ্ছা প্রদান করে থাকি এবং আমি বড় অনুগ্রহশীল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় ঐ সময় যখন তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুআয (রাঃ)-কে ইয়ামনের শাসনকর্তা করে পাঠাচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা দু’জন যাও, সুসংবাদ শুনাবে, ঘৃণা উৎপাদন করবে না, সহজ পন্থা বাতলাবে, তাদের প্রতি কঠোর হবে কেননা, আমার প্রতি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে- “হে নবী (সঃ)! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে।' অর্থাৎ তুমি তোমার উম্মতের উপর সাক্ষী হবে, জান্নাতের সুসংবাদদাতা ও জাহান্নাম হতে সতর্ককারী হবে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে এই সাক্ষ্যদানের দিকে আহ্বানকারী হবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং কুরআনের মাধ্যমে উজ্জ্বল প্রদীপ হবে।” সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) বা সাক্ষী দ্বারা বুঝানো হয়েছে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী হওয়াকে। আর কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের আমলের উপর সাক্ষী হবেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবো।” (৪:৪১) যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেন তোমরা (উম্মতে মুহাম্মাদী সঃ) লোকদের (অন্যান্য নবীদের উম্মতের) উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন।” (২:১৪৩)
মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি মুমিনদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদানকারী এবং কাফিরদেরকে জাহান্নাম হতে ভয় প্রদর্শনকারী। আর তুমি আল্লাহর অনুমতিক্রমে সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহর দাসত্বের দিকে আহ্বানকারী। তোমার সত্যতা ঐ রকম সুপ্রতিষ্ঠিত যেমন সূর্যের আলো সুপ্রতিষ্ঠিত। যদি কোন হঠকারী লোক অকারণে হঠকারিতা করে তবে সেটা অন্য কথা।
এরপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তুমি কাফির ও মুনাফিকদের কথা মেনে নিয়ো না, বরং তাদের কথা ছেড়ে দাও। আর তারা যে তোমাকে কষ্ট দেয় ও তোমার প্রতি নির্যাতন করে সেটা তুমি উপেক্ষা কর, ওটাকে কিছুই মনে করো , বরং আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল হও। কর্মবিধায়করূপে তিনিই যথেষ্ট।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।