সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 24)
হরকত ছাড়া:
ليجزي الله الصادقين بصدقهم ويعذب المنافقين إن شاء أو يتوب عليهم إن الله كان غفورا رحيما ﴿٢٤﴾
হরকত সহ:
لِّیَجْزِیَ اللّٰهُ الصّٰدِقِیْنَ بِصِدْقِهِمْ وَ یُعَذِّبَ الْمُنٰفِقِیْنَ اِنْ شَآءَ اَوْ یَتُوْبَ عَلَیْهِمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ غَفُوْرًا رَّحِیْمًا ﴿ۚ۲۴﴾
উচ্চারণ: লিয়াজযিয়াল্লা-হুসসা-দিকীনা বিসিদকিহিম ওয়া ইউ‘আযযি বাল মুনা-ফিকীনা ইন শাআ আওঁইয়াতূবা ‘আলাইহিম ইন্নাল্লা-হা কা-না গাফূরার রাহীমা।
আল বায়ান: যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার জন্য পুরস্কৃত করতে পারেন এবং তিনি চাইলে মুনাফিকদের আযাব দিতে পারেন অথবা তাদের ক্ষমা করে দিতে পারেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. যাতে আল্লাহ্ পুরস্কৃত করেন সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতার জন্য এবং শাস্তি দেন মুনাফিকদেরকে যদি তিনি চান অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যাতে আল্লাহ (ওয়া‘দার প্রতি) সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার পুরস্কার দেন আর মুনাফিকদেরকে ইচ্ছে করলে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আহসানুল বায়ান: (২৪) কারণ আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে সত্যবাদিতার জন্য পুরস্কৃত করেন এবং তাঁর ইচ্ছা হলে কপটাচারীদেরকে শাস্তি দেন অথবা ওদের তওবা গ্রহণ করেন।[1] নিশ্চয়ই আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
মুজিবুর রহমান: কারণ আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে পুরস্কৃত করেন সত্যবাদীতার জন্য এবং তাঁর ইচ্ছা হলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
ফযলুর রহমান: যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার পুরস্কার দিতে পারেন এবং মোনাফেকদেরকে যদি চান শাস্তি দিতে কিংবা ক্ষমা করে দিতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
মুহিউদ্দিন খান: এটা এজন্য যাতে আল্লাহ, সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার কারণে প্রতিদান দেন এবং ইচ্ছা করলে মুনাফেকদেরকে শাস্তি দেন অথবা ক্ষমা করেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
জহুরুল হক: যেন আল্লাহ্ পুরস্কৃত করতে পারেন সত্যপরায়ণদের তাদের সত্যনিষ্ঠার জন্যে, আর তিনি ইচ্ছা করলে মুনাফিকদের শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদের প্রতি ফিরতেও পারেন। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।
Sahih International: That Allah may reward the truthful for their truth and punish the hypocrites if He wills or accept their repentance. Indeed, Allah is ever Forgiving and Merciful.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৪. যাতে আল্লাহ্ পুরস্কৃত করেন সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতার জন্য এবং শাস্তি দেন মুনাফিকদেরকে যদি তিনি চান অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৪) কারণ আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে সত্যবাদিতার জন্য পুরস্কৃত করেন এবং তাঁর ইচ্ছা হলে কপটাচারীদেরকে শাস্তি দেন অথবা ওদের তওবা গ্রহণ করেন।[1] নিশ্চয়ই আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করার তওফীক (সুমতি) দিয়ে দেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২১-২৭ নং আয়াতের তাফসীর:
মুসলিমদের উত্তম আদর্শের প্রতীক একমাত্র নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাই তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে প্রত্যেক মুসলিম জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সর্বক্ষেত্রে আদর্শ গ্রহণ করবে। আজ বিভিন্ন দল, তরীকা ও সম্প্রদায়ের অনুসারীরা তাদের নেতা ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির আদর্শের দিকে আহ্বান করে থাকে। কখনো একজন মুসলিম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ বর্জন করে অন্য কোন ব্যক্তির আদর্শ গ্রহণ করতে পারে না। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনাদর্শে রয়েছে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি। পৃথিবীতে এমন কোন ব্যক্তি নেই যার সকল কথা ও কাজ পালনীয় ও অনুসরণীয়, কেবলমাত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত। একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সমস্ত কথা, কাজ ও অবস্থা আনুগত্য ও অনুসরণযোগ্য। প্রতিটি স্থান, কাল ও পাত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ অনুসরণ করলে মুসলিমরা আবার সে স্বর্ণ যুগে ফিরে যেতে পারবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেভাবে কথা বলেছেন, কাজ করেছেন, এমনকি যুদ্ধে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও বীরত্বের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অবশ্যই অনুসরণীয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিপদে কখনো বিচলিত হননি। বরং সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَّثَلُ الَّذِيْنَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ ط مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَآءُ وَالضَّرَّآءُ وَزُلْزِلُوْا حَتّٰي يَقُوْلَ الرَّسُوْلُ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مَعَهُ مَتٰي نَصْرُ اللّٰهِ ط أَلَآ إِنَّ نَصْرَ اللّٰهِ قَرِيْبٌ)
“তোমরা কি ধারণা করেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত সংকটময় অবস্থা এখনো তোমাদের ওপর আসেনি। তাদেরকে বিপদ ও দুঃখ স্পর্শ করেছিল এবং তাদেরকে কাঁপিয়ে তুলা হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথে ঈমান আনয়নকারীরা শেষপর্যন্ত বলেছিল, কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।” (সূরা বাকারাহ ২:২১৪)
নাফি‘(رحمه الله) হতে বর্ণিত যে, ইবনু উমার (رضي الله عنه) তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ এর নিকট গেলেন যখন তাঁর (হাজ্জ যাত্রার) বাহন প্রস্তুত, তখন তাঁর ছেলে বললেন: আমার আশংকা হয় এ বছর মানুষের মধ্যে লড়াই হবে, তারা আপনাকে কাবায় যেতে বাধা দেবে। কাজেই এবার নিবৃত্ত হওয়াটাই উত্তম। তখন ইবনু উমার (رضي الله عنه) বললেন: আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা রওনা হয়েছিলেন, কুরাইশ কাফিররা তাঁকে বাইতুল্লাহ যেতে বাধা দিয়েছিল। আমাকেও যদি বাইতুল্লাহ যেতে বাধা দেয়া হয়, তবে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা করেছিলেন আমিও তাই করব। কেননা “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ” (সূরা আহযাব ২১)। এরপর তিনি বললেন: তোমরা সাক্ষী থেকো, আমি উমরাহর সাথে হাজ্জ এর নিয়ত করলাম। নাফি‘ বলেন: তিনি মক্কায় উপনীত হয়ে উভয়টির জন্য মাত্র একটি তাওয়াফ করলেন। (সহীহ বুখারী হা: ১৬৩৯)
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ তারাই মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিতে পারবে যারা পরকালের সফলতা কামনা করে। তাই আমাদের উচিত হবে যদি আমরা পরকালীন কল্যাণ ও সফলতা চাই তাহলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ অনুরসণ করব। কোন কাজ করার পূর্বে ভেবে দেখব, এ কাজ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করেছেন কিনা। আর করে থাকলে তিনি তা কিভাবে করেছেন সেভাবেই করতে হবে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে যখন মুসলিম বাহিনীকে তাঁর সাহায্য পাঠিয়ে বিজয়ী করলেন, যারা প্রকৃত মু’মিন ছিল তারা বুঝতে পারলেন এটা আল্লাহ তা‘আলার ও তাঁর রাসূলের ওয়াদার বাস্তবরূপ। ফলে তাদের ঈমান বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। এখানে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন ও সাহায্য পেলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। এ সম্পর্কে সূরা ফাতহ-এর ৪ ও সূরা তাওবার ১২৪ নং আয়াতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
(مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ رِجَالٌ.....) শানে নুযূল:
আনাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার চাচা আনাস বিন নযর বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বললেন: হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনি মুশরিকদের সাথে প্রথম যে যুদ্ধ করেছেন আমি তাতে অনুপস্থিত ছিলাম। আল্লাহ তা‘আলা যদি আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করার সুযোগ দেন তাহলে দেখিয়ে দেব যে, আমি কী করছি। অতঃপর যখন উহুদ যুদ্ধের সময় আসল তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, সা‘দ বিন মুআয (رضي الله عنه) পেছনে ফিরে আসছেন। তখন তিনি তাকে বললেন: হে সা‘দ বিন মুআয! আল্লাহ তা‘আলার শপথ আমি এ দিক থেকে জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি। তখন সে সামনের দিকে অগ্রসর হল এবং জিহাদ করতে করতে শহীদ হয়ে গেল। তখন তাঁর গায়ে আশিটিরও বেশি যখমের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। কোনটা বর্শার আবার কোনটা তরবারীর। তাঁর ব্যাপারেই এ আয়াতটি নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী হা: ২৮০৫, সহীহ মুসলিম হা: ১৯০৩)
আয়িশাহ (رضي الله عنها) অত্র আয়াতের তাফসীরে বলেন: এদের অন্তর্ভুক্ত হলেন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ যিনি উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলেন এমনকি ৭০ এর অধিক তীরবিদ্ধ হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন: তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। (সিলসিলা সহীহাহ হা: ৯৪৫)
জনৈক সাহাবী অজ্ঞ গ্রাম্য ব্যক্তিকে বললেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করুন ‘তাদের মধ্যে কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে’ তারা কারা? সাহাবীরা সহজে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রশ্ন করার সাহস পেত না। সে গ্রাম্য ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ ফিরিয়ে নেন, এভাবে দুবার হয়। সে সাহাবী বলছেন: আমি মাসজিদের দরজা দিয়ে আসছি তখন আমার গায়ে সবুজ কাপড় ছিল, যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে দেখলেন তখন বললেন: প্রশ্নকারী কোথায়? সেই গ্রাম্য ব্যক্তি বলল: আমি হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: এ হল সেই ব্যক্তিদের একজন। (তিরমিযী হা: ৩২০৩, সিলসিলা সহীহাহ হা: ১২৬)
(فَمِنْهُمْ مَّنْ قَضٰي نَحْبَه)- نَحْبَه অর্থ ارادته ومطلوبه
অর্থাৎ তাদের অনেকে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেছে এবং তাদের ওপর যে হক ছিল তা আদায় করে আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেছে। আর কেউ কেউ দুটি প্রতিদানের একটির অপেক্ষায় রয়েছে। দুটি প্রতিদান হলন এক. সাহায্য-সহযোগিতা, দুই. আল্লাহ তা‘আলার পথে শাহাদাত বরণ। (তাফসীর মুয়াসসার)
আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধ-জিহাদ শরীয়ত সিদ্ধ করে দিয়েছেন যাতে সত্যবাদীদেরকে তাদের ওয়াদা সত্যে পরিণত করার প্রতিদান দিতে পারেন।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قَالَ اللّٰهُ هٰذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصّٰدِقِيْنَ صِدْقُهُمْ ط لَهُمْ جَنّٰتٌ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهٰرُ خٰلِدِيْنَ فِيْهَآ أَبَدًا ط رَضِيَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ ط ذٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ)
“আল্লাহ বলবেন, ‘এ সেদিন যেদিন সত্যবাদীগণ তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট; এটা মহাসফলতা।’ (সূরা মায়িদা ৫:১১৯) আর আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে মুনাফিকদেরকে তাদের কর্মের কারণে শাস্তি দেবেন অথবা তাওবা করার সুযোগ দিলে তাওবা করতে পারবে ফলে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেবেন।
(وَرَدَّ اللّٰهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِغَيْظِهِمْ)
‘আল্লাহ কাফিরদেরকে তাদের ক্রোধ সহকারে ফিরিয়ে দিয়েছেন’ অর্থাৎ কাফিররা খুব আশা নিয়ে এসেছিল তারা যুদ্ধে বিজয়ী হবে, কিন্তু মু’মিনদেরকে আল্লাহ তা‘আলা সাহায্য করেছিলেন বিধায় কাফিররা বিজয়ী হতে পারেনি। সে কথাই বলা হচ্ছে: আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদেরকে তাদের ক্রোধসহ ফিরিয়ে দিলেন, তারা কোন কল্যাণ তথা বিজয় অর্জন করতে পারেনি। আয়িশাহ বলেন: এখানে কাফির দ্বারা উদ্দেশ্য হল আবূ সুফিয়ান ও উআইনা বিন বদর। আবূ সুফিয়ান ফিরে এসেছিল তুহামাহ এলাকায়, আর উআইনা ফিরে এসেছিল নাজদে। (কুরতুবী)
(وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيٰرَهُمْ.....)
‘আর তিনি তোমাদেরকে উত্তরাধিকারী করে দিলেন তাদের জমিনের’ এ আয়াত দ্বারা বানী কুরাইযার যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছে:
আয়িশাহ (رضي الله عنها) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে অস্ত্র সরঞ্জামাদী রাখলেন এবং গোসল শেষ করলেন। এমতাবস্থায় তাঁর নিকট জিবরীল (عليه السلام) এসে বললেন, আপনি অস্ত্র সরঞ্জামাদী রেখে দিয়েছেন? আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আমরা (ফেরেশতারা) এখনো অস্ত্র সরঞ্জামাদী রাখিনি। আপনি বানী কুরাইযার সাথে যুদ্ধ করার জন্য বের হন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের সাথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪১১৭, সহীহ মুসলিম হা: ১৭৬৯)
এ যুদ্ধের মাধ্যমেই মুসলিম বাহিনীকে ইয়াহূদীদের ঘর-বাড়ি, ভূমি ও ধন-সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. জীবনের সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কর্মপদ্ধতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির অনুসরণ করতে হবে। কেননা তিনি হলেন মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ এবং অনুসরণীয় ব্যক্তি।
২. বিপদে বিচলিত হওয়া যাবে না বরং বিপদ যত বড়ই হোক না কেন আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করতে হবে।
৩. ঈমান বৃদ্ধি পায় আবার কমেও যায়।
৪. অঙ্গীকার করার পর তা অবশ্যই পূর্ণ করতে হবে, ভঙ্গ করা যাবে না।
৫. বাতিলকে কখনো কোন প্রকার সাহায্য সহযোগীতা করা যাবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর
এখানে মুমিন ও মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সময় আসার পূর্বে মুনাফিকরা বড় বড় বুলি আওড়িয়ে থাকে কিন্তু যখন সময় এসে যায় তখন। অত্যন্ত ভীরুতা ও কাপুরুষতা প্রদর্শন করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে কৃত ওয়াদা সব ভুলে যায়। সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করার পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। পক্ষান্তরে মুমিনরা তাদের ওয়াদা পূর্ণভাবে পালন করে। কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করে এবং কেউ কেউ শাহাদাতের প্রতীক্ষায় থাকে।
হযরত সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যখন আমি কুরআন মাজীদ লিখতে শুরু করি তখন একটি আয়াত আমি পাচ্ছিলাম না। অথচ সূরায়ে আহযাবে আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তা শুনেছিলাম। অবশেষে হযরত খুযাইমা ইবনে সাবিত আনসারী (রঃ)-এর নিকট আয়াতটি পাওয়া গেল। ইনি ঐ সাহাবী, যাঁর একার সাক্ষ্যকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের সমান করে দিয়েছিলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি)-এ আয়াতটি হযরত আনাস ইবনে মাযার (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনাটি এই যে, তিনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি বলে মনে অত্যন্ত দুঃখ ও ব্যথা অনুভব করেছিলেন। তার দুঃখের কারণ ছিল এই যে, যে যুদ্ধে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপস্থিত থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন সেই যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করতে পারলেন না। সুতরাং তার মত। হতভাগ্য আর কে আছে? তাই তিনি অঙ্গীকার করে বলেনঃ “আবার যদি জিহাদের সুযোগ এসে যায় তবে অবশ্যই আমি আল্লাহ তাআলাকে আমার সত্যবাদিতা ও সৎ সাহসিকতা প্রদর্শন করবো আর এও দেখিয়ে দেবো যে, আমি কি করছি!” অতঃপর যখন উহুদ যুদ্ধের সুযোগ আসলো তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, সামনের দিক হতে হযরত সা’দ ইবনে মুআয (রাঃ) ফিরে আসছেন। তাকে এভাবে ফিরে আসতে দেখে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবু আমর (রাঃ)! কোথায় যাচ্ছেন? আল্লাহর শপথ! উহুদ পাহাড়ের এই দিক হতে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি।” এ কথা বলেই তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হন এবং মুশরিকদের মধ্যে প্রবেশ করে বহুক্ষণ ধরে তরবারী চালনা করেন। কিন্তু মুসলমানরা সবাই ফিরে গিয়েছিলেন বলে তিনি একা হয়ে গেলেন। তাঁর এই আকস্মিক আক্রমণের ফলে মুশরিকরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেললো। অতঃপর তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। তার দেহে আশিটিরও বেশী যখম হয়েছিল। কোনটি ছিল বর্শার যখম এবং কোনটি ছিল তরবারীর যখম। শাহাদাতের পর তাঁকে কেউ চিনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর ভগ্নী তাঁকে তাঁর হাতের অঙ্গুলীগুলোর অগ্রভাগ দেখে চিনতে পারেন। তার ব্যাপারেই (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, যখন মুসলমানরা যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করে তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা মুসলমানরা) যা করলো এজন্যে আমি আপনার নিকট ওযর প্রকাশ করছি এবং মুশরিকরা যা করেছে সে জন্যে আমি আপনার নিকট অসন্তোষ প্রকাশ করছি।” তাতে এও রয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ) তাকে বলেনঃ “আমি আপনার সাথেই রয়েছি। আমি তার সাথে চলছিলামও বটে। কিন্তু তিনি যা করছিলেন। তা আমার সাধ্যের অতিরিক্ত ছিল।”
হযরত তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ উহুদের যুদ্ধ হতে মদীনায় ফিরে এসে মিম্বরের উপর আরোহণ করেন এবং আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণকীর্তনের পর মুসলমানদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। যারা শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের মর্যাদার বর্ণনা দেন। অতঃপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। একজন মুসলমান দাঁড়িয়ে গিয়ে প্রশ্ন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ আয়াতে যাদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাঁরা কারা?” ঐ সময় আমি সামনের দিক হতে আসছিলাম এবং হারামী ও সবুজ রঙ-এর দু'টি কাপড় পরিহিত ছিলাম। আমার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেনঃ “হে প্রশ্নকারী ব্যক্তি! এই লোকটিও তাদের মধ্যে একজন।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা ইবনে তালহা (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর দরবারে গমন করেন। যখন তিনি তার দরবার হতে ফিরে আসতে উদ্যত হন তখন তিনি তাকে ডেকে বলেনঃ “হে মূসা (রাঃ)! এসো, আমার নিকট হতে একটি হাদীস শুনে যাও। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি। যে, (আরবি)-এই আয়াতে যেসব লোকের বর্ণনা রয়েছে তাদের মধ্যে তোমার পিতা হযরত তালহা (রাঃ) একজন।”এটাও মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে।
এঁদের বর্ণনা দেয়ার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আর কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে যে, আবার যুদ্ধের সুযোগ আসলে তারা তাদের কাজ আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং শাহাদাতের পেয়ালা পান করবে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি।
এই ভীতি এবং এই সন্ত্রাস এই কারণেই ছিল যে, আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে পুরস্কৃত করেন তাদের সত্যবাদিতার জন্যে এবং তাঁর ইচ্ছা হলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ তা'আলা হলেন আলেমুল গায়েব। তার কাছে প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই সমান। যা হয়নি তা তিনি তেমনি জানেন যেমন জানেন যা হয়ে গেছে। কিন্তু তার অভ্যাস এই যে, বান্দা কোন কাজ যে পর্যন্ত না করে বসে সে পর্যন্ত তাকে শুধু নিজের জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে শাস্তি প্রদান করেন না। যেমন তিনি বলেনঃ (আারবি)
অর্থাৎ “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো, যতক্ষণ না আমি জেনে নিই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদের এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে পরীক্ষা করি।” (৪৭:৩১) সুতরাং অস্তিত্বের পূর্বের জ্ঞান, তারপর অস্তিত্ব লাভের পরের জ্ঞান উভয়ই আল্লাহ তা'আলার রয়েছে। আর অস্তিত্বে আসার পর হবে পুরস্কার অথবা শাস্তি। যেমন মহান আল্লাহ অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আারবি)
অর্থাৎ “অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছে। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদেরকে অবহিত করবার নন।” (৩:১৭৯) সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ তার ইচ্ছা হলে তিনি মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। অর্থাৎ তাদেরকে তিনি খাটি অন্তরে তাওবা করার তাওফীক দেন। ফলে তারা তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তাঁর করুণা ও রহমত তার গযব ও ক্রোধের উপর বিজয়ী।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।