আল কুরআন


সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 1)

সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 1)



হরকত ছাড়া:

يا أيها النبي اتق الله ولا تطع الكافرين والمنافقين إن الله كان عليما حكيما ﴿١﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ اتَّقِ اللّٰهَ وَ لَا تُطِعِ الْکٰفِرِیْنَ وَ الْمُنٰفِقِیْنَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ عَلِیْمًا حَکِیْمًا ۙ﴿۱﴾




উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুত্তাকিল্লা-হা ওয়ালা তুতি‘ইল কা-ফিরীনা ওয়াল মুনা-ফিকীনা ইন্নাল্লা-হা কা-না ‘আলীমান হাকীমা।




আল বায়ান: হে নবী, আল্লাহকে ভয় কর এবং কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সম্যক জ্ঞানী, মহাপ্রজ্ঞাময়।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. হে নবী! আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করুন এবং কাফিরদের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, হিকমতওয়ালা।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে নবী (সা)! আল্লাহকে ভয় কর, আর কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য কর না, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞাতা, মহাপ্রজ্ঞাময়।




আহসানুল বায়ান: (১) হে নবী! আল্লাহকে ভয় কর[1] এবং অবিশ্বাসী ও কপটাচারীদের আনুগত্য করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।[2]



মুজিবুর রহমান: হে নাবী! আল্লাহকে ভয় কর এবং কাফিরদের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করনা। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।



ফযলুর রহমান: হে নবী! তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং কাফের ও মোনাফেকদের কথামতো কাজ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী, পরম প্রাজ্ঞ।



মুহিউদ্দিন খান: হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাফের ও কপট বিশ্বাসীদের কথা মানবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।



জহুরুল হক: হে প্রিয় নবী! আল্লাহ্‌কে ভয়-ভক্তি করো আর অবিশ্বাসীদের ও মুনাফিকদের আজ্ঞাপালন করো না। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাতা, পরমজ্ঞানী।



Sahih International: O Prophet, fear Allah and do not obey the disbelievers and the hypocrites. Indeed, Allah is ever Knowing and Wise.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১. হে নবী! আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করুন এবং কাফিরদের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, হিকমতওয়ালা।(১)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতের উপসংহার (إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا) বলে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করার এবং কাফের ও মুনাফেকদের অনুসরণ না করার পূর্ব বর্ণিত যে হুকুম তার তাৎপর্য ও যৌক্তিকতা বর্ণনা করা হয়েছে। কেননা, যে আল্লাহ যাবতীয় কর্মের পরিণতি ও ফলাফল সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত, তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়। মানুষের যাবতীয় কল্যাণ ও মঙ্গল তাঁর পরিজ্ঞাত। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১) হে নবী! আল্লাহকে ভয় কর[1] এবং অবিশ্বাসী ও কপটাচারীদের আনুগত্য করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।[2]


তাফসীর:

[1] এই আয়াতে সর্বাবস্থায় আল্লাহভীতি এবং দাওয়াত ও তবলীগের কাজে অটল থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। ত্বালক্ব বিন হাবীব বলেন, ‘তাকওয়া হল এই যে, তুমি আল্লাহর আনুগত্য আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী করবে ও আল্লাহর কাছে নেকীর আশা রাখবে এবং আল্লাহর অবাধ্যতা আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী বর্জন করবে ও আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করবে। (ইবনে কাসীর)

[2] সুতরাং তিনিই আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী। যেহেতু তিনি পরিণাম সম্বন্ধে অবগত আছেন এবং তিনি নিজ কথা ও কাজে হিকমত-ওয়ালা।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ:



খন্দক যুদ্ধের অপর নাম “غزوة الأحزاب” আহযাবের যুদ্ধ। এ সূরায় আহযাবের যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে বিধায় উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ, তাই তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিধি-বিধান সম্বলিত। মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যে কষ্ট দিত, পালক পুত্রের স্ত্রী বিবাহ করেছেন সে জন্য অপবাদ দিত ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সূরাটি অবতীর্ণ হয়। এ সূরাতেই সে আয়াত রয়েছে যার বিধান বলবত রয়েছে কিন্তু তেলাওয়াত রহিত হয়ে গেছে। তাহল



(الشيخ والشيخة إذا زنيا فاجلدوهما البتة نكالا من الله والله عزيز حكيم)



-বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচার করলে তাদেরকে অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করবে, এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে শাস্তি। আল্লাহ তা‘আলা পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। সূরায় মূল যে কয়টি বিষয় আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে:-

(১) যিহারের পরিচয় ও বিধান,

(২) পালক পুত্র ও তাদের স্ত্রীদের বিধান,

(৩) মু’মিনদের প্রতি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অধিকার,

(৪) আহযাবের যুদ্ধের ঘটনা,

(৫) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন ও রীতি-নীতি মু’মিনের জন্য উত্তম আদর্শ,

(৬) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীদের বিধান ও মু’মিনদের সাথে সম্পর্ক,

(৭) নারীদের পর্দার বিধান,

(৮) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যে কোন ফয়াসালার ক্ষেত্রে মু’মিনদের অবস্থান,

(৯) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশেষ নাবী ও রাসূল,

(১০) নিজ ও অন্যের বাড়িতে প্রবেশের আদব কায়দা, বিশেষ করে তিন সময়,

(১১) যারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে গালি গালাজ করে কষ্ট দিত তাদের বিধান ইত্যাদি।



১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা সূরাটি শুরু করলেন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করার মাধ্যমে যে, হে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর। তুমি আল্লাহ তা‘আলার দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছো ও তাঁর বিধান মেনে চলছো বিধায় কে কী বলবে সে ভয় করো না। যে আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে রিসালাত দিয়েছেন ও তোমার প্রতি ওয়াহী করে ধন্য করেছেন সে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর। আর কাফির ও মুনাফিকদের অনুসরণ করো না বরং তোমার প্রতি যা ওয়াহী করা হয়েছে তার অনুসরণ কর। কারণ তারা আল্লাহ তা‘আলার বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তুমি আল্লাহ তা‘আলার দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছ এবং তাঁর বিধান মেনে চলছো বলে তারা কত ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করবে, কত রসিকতা করবে। তাই বলে আল্লাহ তা‘আলার বিধান থেকে সরে যাওয়া যাবে না, কারণ তারা চায় তুমিও তাদের মত পথভ্রষ্ট হয়ে যাও।



মূলত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা সতর্ক করার একটি সুন্দর পদ্ধতি বর্ণনা করছেন। তা হল তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সতর্ক করার দ্বারা তাঁর সকল উম্মতকে সতর্ক করেছেন। অর্থাৎ বড়দের মাধ্যমে ছোটদেরকে সতর্ক করা। যদিও এখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে কিন্তু এর দ্বারা সকল মু’মিন ব্যক্তি উদ্দেশ্য। এসব নিদের্শ দেয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, সকল কাজে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করো। কেননা আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করলে কোন নিন্দুকের নিন্দা ও তিরস্কারকারীর তিরস্কার দীন থেকে সরাতে পারবে না। তিনিই তার জন্য যথেষ্ট, সে অন্য কারো সাহায্য-সহযোগীতার মুখাপেক্ষী হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَنْ يَّتَوَكَّلْ عَلَي اللّٰهِ فَهُوَ حَسْبُه)



“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট” (সূরা তালাক ৬৫:৩)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে তাঁর দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে কোন নিন্দুকের নিন্দা ও তিরস্কারকারীর তিরস্কার দীন থেকে সরাতে পারবে না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কাফির ও মুনাফিকদের অনুসরণ করা যাবে না, বরং অনুসরণ করতে হবে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের।

২. সদা-সর্বদা ওয়াহীর নির্দেশ মেনে চলতে হবে তাহলে দীনের সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত থাকা যাবে।

৩. সর্বাবস্থায় একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় ও তাঁর ওপর ভরসা করতে হবে।

৪. ভদ্রতা, শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া বা সতর্ক করার একটি সুন্দর দিক হলো, বড়দেরকে বলে ছোটদেরকে শিক্ষা দেয়া, যাতে ছোটরা শিক্ষার ব্যপারে লজ্জাবোধ না করে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হযরত যির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “সূরায়ে আহযাবের কতটি আয়াত গণনা করা হয়?` উত্তরে তিনি বলেনঃ “ তেহাত্তরটি।” তখন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “না, না। আমি তো দেখেছি যে, এ সূরাটি প্রায় সূরায়ে বাকারার সমান ছিল। এই সূরার মধ্যেই নিম্নের আয়াতটিও আমরা পাঠ করতামঃ (আরবি)

অর্থাৎ “বুড়ো ও বুড়ী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদেরকে অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে ফেললো, এটা হলো আল্লাহর পক্ষ হতে শাস্তি এবং আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।” এর দ্বারা জানা যায় যে, এই সূরার। কতকগুলো আয়াত আল্লাহর নির্দেশক্রমে রহিত হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর

সতর্ক করার সুন্দর পন্থা এই যে, বড়দেরকে বলতে হবে যাতে ছোটরা তা শুনে সাবধান হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে যখন কোন কথা গুরুত্বের সাথে বলেন তখন বুঝে নিতে হবে যে, অন্যের জন্যে এর গুরুত্ব আরো বেশী। আল্লাহর হিদায়াত অনুযায়ী পুণ্য লাভ করার নিয়তে তাঁর ফরমানের আনুগত্য করা এবং তাঁর ফরমান অনুযায়ী তার শাস্তি থেকে বাচার উদ্দেশ্যে তাঁর নাফরমানী পরিত্যাগ করার নাম হলো তাকওয়া। আর কাফির ও মুনাফিকদের কথা না মানা, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ না করা এবং স্বীকার করে নেয়ার নিয়তে তাদের কথা না শোনার নামও তাকওয়া। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী তো। একমাত্র আল্লাহ। তিনি তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞানের মাধ্যমে প্রত্যেক কাজের ফুল বা পরিণাম সম্যক অবগত। তার সীমাহীন হিকমতের কারণে তার কোন কাজ, কোন কথা বিবেচনা ও নীতি বহিভূর্ত হয় না। তাই তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ অতএব তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অহী করা হয় তুমি তারই অনুসরণ কর, যাতে তুমি খারাপ পরিণতি ও বিভ্রান্তি হতে বাঁচতে পার। আল্লাহ তা'আলার কাছে কারো ক্রিয়াকলাপ গোপন নেই। নিজের সমস্ত কাজকর্মে শুধু আল্লাহর উপরই ভরসা কর। তার উপর যে ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট হন। কারণ তিনি সমস্ত কাজের উপর পূর্ণ শক্তিশালী। তাঁর প্রতি যে আকৃষ্ট হয় বা তাঁর দিকে যে ঝুঁকে পড়ে সে সফলকামই হয়ে থাকে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।