সূরা লুকমান (আয়াত: 5)
হরকত ছাড়া:
أولئك على هدى من ربهم وأولئك هم المفلحون ﴿٥﴾
হরকত সহ:
اُولٰٓئِکَ عَلٰی هُدًی مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ اُولٰٓئِکَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ ﴿۵﴾
উচ্চারণ: উলাইকা ‘আলা-হুদাম মিররাব্বিহিম ওয়া উলাইকা হুমুল মুফলিহূন।
আল বায়ান: তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর এবং তারাই সফলকাম।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫. তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর আছে এবং তারাই সফলকাম।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারাই তাদের পালনকর্তার সঠিক পথে আছে আর তারাই সফলকাম। (দুনিয়া ও আখেরাতে)
আহসানুল বায়ান: (৫) ওরাই ওদের প্রতিপালক কর্তৃক নির্দেশিত পথে আছে এবং ওরাই সফলকাম। [1]
মুজিবুর রহমান: তারাই তাদের রবের নির্দেশিত পথে রয়েছে এবং তারাই সফলকাম।
ফযলুর রহমান: এরাই তাদের প্রভুর কাছ থেকে আসা সঠিক পথে আছে এবং এরাই সফলকাম।
মুহিউদ্দিন খান: এসব লোকই তাদের পরওয়ারদেগারের তরফ থেকে আগত হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এরাই সফলকাম।
জহুরুল হক: এরাই হচ্ছে তাদের প্রভুর কাছ থেকে হেদায়তের উপরে আর এরা নিজেরাই হচ্ছে সফলকাম।
Sahih International: Those are on [right] guidance from their Lord, and it is those who are the successful.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫. তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর আছে এবং তারাই সফলকাম।(১)
তাফসীর:
(১) যাদেরকে সৎকর্মপরায়ণ বলা হয়েছে তারা কেবলমাত্র এ তিনটি গুণাবলীর অধিকারী, একথা বলা হয়নি। আসলে প্রথমে ‘সৎকর্মপরায়ণ’ শব্দটি ব্যাপক অর্থে বর্ণনা করে এদিকে ইংগিত করা হয়েছে যে, এ কিতাব যেসব অপকর্মে বাধা দেয় এ সৎকর্মশীলরা সেসবগুলো থেকেই বিরত থাকে। আর এ কিতাব যেসব সৎকাজ করার হুকুম দেয় এরা সেসবগুলোই করে। তারপর এ “সৎকর্মশীলদের” তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলী বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একথা প্ৰকাশ করাই উদ্দেশ্য যে, বাদবাকি সমস্ত সৎকাজ কিন্তু এ তিনটি সদগুণের ওপরই নির্ভর করবে। তারা সালাত কায়েম করে। এর ফলে আল্লাহর হুকুম মেনে চলা ও আল্লাহর ভয়ে ভীত হওয়া তাদের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তারা যাকাত দেয়। এর ফলে আত্মত্যাগের প্রবণতা তাদের মধ্যে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয়, পার্থিব সম্পদের প্রতি মোহ প্ৰদমিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাংখা জেগে ওঠে। তারা আখেরাতে বিশ্বাস করে। এর ফলে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি করার অনুভূতি জাগে।
এর বদৌলতে তারা এমন জন্তু-জানোয়ারের মতো হয় না। যারা চারণক্ষেত্রে বাঁধন-হারা হয়ে এদিক ওদিক চরে বেড়ায়। বরং তারা এমন মানুষদের মতো হয়ে যায় যারা নিজেদেরকে স্বেচ্ছাচারী মনে করে না। মনে করে, তারা কোন প্রভুর গোলাম এবং নিজেদের সমস্ত কাজের জন্য প্রভুর সামনে জবাবদিহি করতে বাধ্য। এ তিনটি বিশেষত্বের কারণে এ “সৎকর্মশীলরা” ঠিক তেমনি ধরনের সৎকর্মশীল থাকে না যারা ঘটনাক্রমে কোন সৎকাজ করে বসে এবং তাদের অসৎকাজও তেমনি সৎকাজের মতো একই ধারায় অনুষ্ঠিত হতে পারে। পক্ষান্তরে এ বিশেষত্বগুলো তাদের মধ্যে একটি চিন্তা ও নৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দেয় যার ফলে তাদের সৎকাজগুলো একটি ধরা বাঁধা নিয়মানুসারে অনুষ্ঠিত হতে থাকে এবং অসৎকাজ যদি কখনো হয়ে যায়ই তাহলে তা হয় ঘটনাক্ৰমে। তাদের কোন গভীর চিন্তা ও নৈতিক উদ্যোগ তাদেরকে প্রাকৃতিক চাহিদা অনুসারে অসৎপথে নিয়ে যায় না। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫) ওরাই ওদের প্রতিপালক কর্তৃক নির্দেশিত পথে আছে এবং ওরাই সফলকাম। [1]
তাফসীর:
[1] فَلاح (সফলতা)র অর্থ জানার জন্য সূরা বাক্বারাহ ৫নং ও সূরা মু’মিনূনের ১নং আয়াতের তফসীর দেখুন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
এ সূরাতে লুকমান (عليه السلام) সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবৃত হয়েছে বিধায় এ নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া লুকমান (لقمان) শব্দটি এ সূরায় উল্লেখ রয়েছে। লুকমান (عليه السلام) নাবী ছিলেন, না সৎ বান্দা ছিলেনন সে সম্পর্কে সামনে আলোচনা আসছে।
সূরার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে মহা গ্রন্থ আল কুরআন তাদের জন্য হিদায়াত যারা মুহসিন, অতঃপর মুহসিনের পরিচয়, যারা অসার কথা ও গান-বাজনা ইত্যাদি নিয়ে মগ্ন থাকে তাদের অবস্থা এবং আল্লাহ তা‘আলার রুবুবিয়্যাহ সম্পর্কে, তারপর আল্লাহ তা‘আলার নেক বান্দা লুকমান (عليه السلام) তাঁর ছেলেকে উপদেশ প্রদান করেছেন তা নিয়ে এসেছেন, একশ্রেণির মানুষ রয়েছে যারা ওয়াহীর অনুসরণ বাদ দিয়ে বাপ-দাদার ভ্রান্ত তরীকা অনুসরণ করে তাদের কথা, বান্দার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার কয়েকটি নেয়ামতের কথা এবং সবশেষে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করার নির্দেশ দিয়ে গায়েবের চাবিকাঠি যে একমাত্র তাঁর কাছে সে সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন।
১-৫ নং আয়াতের তাফসীর:
الم (আলিফ-লাম-মীম) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা সৎ আমল করে তথা সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে এবং পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে এ সকল লোকদের জন্য কুরআন হল হিদায়াত ও রহমতস্বরূপ। আর তারাই হল মুহসিন বা সৎ কর্মপরায়ণ।
محسن- এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। প্রথম অর্থ হল, পিতা-মাতা, আত্মীয়, হকদার ও অভাবীদের সাথে সদ্ব্যবহারকারী। দ্বিতীয় অর্থ হলন সৎ কর্মপরায়ণ, অর্থাৎ অসৎ কর্ম থেকে দূরে থেকে সৎ কর্ম সম্পাদনকারী। তৃতীয় অর্থ হল, আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে ভীত হয়ে ইখলাস ও একাগ্রতার সাথে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতকারী। যেমন হাদীসে জিবরীলে বলা হয়েছে, “ইহসান” হলন তুমি এমনভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত কর, যাতে মনে হয় যেন তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাচ্ছ, আর যদি তুমি তাঁকে না দেখতে পাও তাহলে জেনে রেখ, তিনি তোমাকে দেখছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫০, সহীহ মুসলিম হা: ৮)
আর এখানে কুরআনকে সৎ কর্ম পরায়ণদের জন্য হিদায়াত ও রহমত বলা হয়েছে, অথচ কুরআন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াত ও রহমতস্বরূপ। এভাবে বলার কারণ হল যেহেতেু সৎ কর্ম পরায়ণগণই কুরআন দ্বারা উপকৃত হয়ে থাকে তাই তাদের কথা বলা হয়েছে। এ সকল সৎ কর্মশীলরাই তাদের রবের পক্ষ থেকে সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত, এরাই সফলকাম। এরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে।
এখানে সালাত ও যাকাতের সাথে বিশেষভাবে পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করার অন্যতম কারণ হল পরকালের প্রতি ঈমান না থাকলে কোন প্রকার সৎ আমল কবূল করা হবে না এবং তা ঈমানের অন্যতম একটি রুকন যা ছাড়া ঈমান সঠিক হবে না।
সুতরাং সফলতা অর্জনের প্রধান উপায় হল সঠিক ঈমান ও সৎআমল। ঈমান ও আমল ছাড়া কারো মাধমে পরকালে সফল হওয়া যাবে না। তাই আমাদেরকে সৎ আমলের প্রতি সচেষ্ট হওয়া উচিত, বিশেষ করে সালাত, সিয়াম, যাকাত ইত্যাদি।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা সৎ কর্মপরায়ণ তারা কুরআন থেকে উপকৃত হয়।
২. মু’মিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা সালাত আদায় করে, যাকাত প্রদান করে এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।
৩. পরকালের প্রতি ঈমান না থাকলে কোন প্রকার আমল কবূল করা হবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর
সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভেই হুরূফে মুকাত্তাআ’তের অর্থ ও মতলব বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
যারা শরীয়তের পূর্ণ অনুসারী তাদের জন্যে এই কুরআন হিদায়াত, শিক্ষা ও রহমত স্বরূপ। যারা নামায কায়েম করার সময় নামাযের রু, সময় ইত্যাদির পূর্ণ হিফাযতের সাথে সাথে নফল, সুন্নাত ইত্যাদিও পূর্ণভাবে আদায় করে। যারা ফরয যাকাত আদায় করে, আত্মীয়দের প্রতি দয়া দাক্ষিণ্য করে ও তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করে, দানশীলতার কাজ নিষ্ঠার সাথে চালিয়ে যায় এবং আখিরাতের পুরস্কার ও শাস্তির প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখে বলে আল্লাহর দিকে পরিপূর্ণভাবে আকৃষ্ট হয়ে থাকে। যারা পুণ্যের কাজ করে যায় এবং মহান প্রতিপালকের পুরস্কারের প্রতি দৃষ্টি রাখে। যারা রিয়াকারী বা লোক দেখানো কাজ করে না এবং লোকদের প্রশংসাও চায় না। এ ধরনের গুণবিশিষ্ট লোকেরাই সঠিক পথ প্রাপ্ত এবং এরাই তারা যারা দ্বীন ও দুনিয়ায় হবে সফলকাম ও কৃতকার্য।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।