সূরা লুকমান (আয়াত: 15)
হরকত ছাড়া:
وإن جاهداك على أن تشرك بي ما ليس لك به علم فلا تطعهما وصاحبهما في الدنيا معروفا واتبع سبيل من أناب إلي ثم إلي مرجعكم فأنبئكم بما كنتم تعملون ﴿١٥﴾
হরকত সহ:
وَ اِنْ جَاهَدٰکَ عَلٰۤی اَنْ تُشْرِکَ بِیْ مَا لَیْسَ لَکَ بِهٖ عِلْمٌ ۙ فَلَا تُطِعْهُمَا وَ صَاحِبْهُمَا فِی الدُّنْیَا مَعْرُوْفًا ۫ وَّ اتَّبِعْ سَبِیْلَ مَنْ اَنَابَ اِلَیَّ ۚ ثُمَّ اِلَیَّ مَرْجِعُکُمْ فَاُنَبِّئُکُمْ بِمَا کُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ ﴿۱۵﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইন জা-হাদা-কা ‘আলাআন তুশরিকা বী মা-লাইছা লাকা বিহী ‘ইলমুন ফালাতুতি‘হুমা-ওয়াসা-হিবহুমা-ফিদদুনইয়া-মা‘রূফাওঁ ওয়াত্তাবি‘ ছাবীলা মান আনা-বা ইলাইইয়া ছু ম্মা ইলাইইয়া মারজি‘উকুম ফাউনাব্বিউকুম বিমা-কুনতুম তা‘মালূন।
আল বায়ান: আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫. আর তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে শির্ক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই(১), তাহলে তুমি তাদের কথা মেনো না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে(২) আর যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ কর। তারপর তোমাদের ফিরে আসা আমারই কাছে, তখন তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবিহিত করব।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমার পিতামাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার অংশীদার স্থির করার জন্য যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না। কিন্তু পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করবে। যে আমার অভিমুখী হয় তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব তোমরা যা করছিলে।
আহসানুল বায়ান: (১৫) তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর,[1] অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব। [2]
মুজিবুর রহমান: তোমার মাতা-পিতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সাথে শরীক করতে যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তাহলে তুমি তাদের কথা মানবেনা। তবে পৃথিবীতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে এবং যে বিশুদ্ধ চিত্তে আমার অভিমুখি হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট এবং তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করব।
ফযলুর রহমান: কিন্তু তারা (পিতামাতা) যদি এই চেষ্টা করে, যাতে তুমি আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করো, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না; তবে দুনিয়ায় তাদেরকে সৌহার্দ্যের সাথে সঙ্গ দেবে। আর যে আমার দিকে ফিরে এসেছে তার পথ অনুসরণ করবে। অবশেষে আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন (নির্ধারিত আছে)। তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের অতীত কৃতকর্ম অবহিত করব।
মুহিউদ্দিন খান: পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করবো।
জহুরুল হক: কিন্তু যদি তারা তোমার সঙ্গে পীড়া-পীড়ি করে যেন তুমি আমার সাথে অংশী দাঁড় করাও যে সন্বন্ধে তোমার কাছে কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তাদের উভয়ের আজ্ঞাপালন করো না, তবে তাদের সঙ্গে এই দুনিয়াতে সদ্ভাবে বসবাস করো। আর তার পথ অবলন্বন করো যে আমার প্রতি বিনয়াবনত হয়েছে, অতঃপর আমারই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থান, তখন আমি তোমাদের জানিয়ে দেব যা তোমরা করে যাচ্ছিলে।
Sahih International: But if they endeavor to make you associate with Me that of which you have no knowledge, do not obey them but accompany them in [this] world with appropriate kindness and follow the way of those who turn back to Me [in repentance]. Then to Me will be your return, and I will inform you about what you used to do.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৫. আর তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে শির্ক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই(১), তাহলে তুমি তাদের কথা মেনো না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে(২) আর যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ কর। তারপর তোমাদের ফিরে আসা আমারই কাছে, তখন তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবিহিত করব।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ তোমার জানা মতে যে আমার সাথে শরীক নয়। অথবা তুমি আমার কোন শরীক আছে বলে জান না। তুমি তো শুধু এটাই জান যে, আমি এক, আমার কোন শরীক নেই। এমতাবস্থায় কিভাবে তুমি তোমার পিতা-মাতার কথা মানতে পার? অন্যায়কে যেন তুমি প্রশ্রয় না দাও। শির্ক গুরুতর অপরাধ হওয়ার কারণেই আল্লাহর নির্দেশ এই যে, যদিও সন্তানের প্রতি পিতা-মাতাকে মান্য করার ও তাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকারের বিশেষ তাকীদ রয়েছে এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সাথে সাথে পিতা-মাতার প্রতিও তা করার জন্যে সন্তানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শির্ক এমন গুরুতর অন্যায় ও মারাত্মক অপরাধ যে, মাতা-পিতার নির্দেশে, এমন কি বাধ্য করার পরও কারো পক্ষে তা জায়েয হয়ে যায় না।
যদি কারো পিতা-মাতা তাকে আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপনে বাধ্য করতে চেষ্টা করতে থাকেন, এ বিষয়ে পিতা-মাতার কথাও রক্ষা করা জায়েয নয়। যেমনটি হয়েছিল, সা'দ ইবন আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তার মায়ের আচরণ। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে তার মা শপথ করলেন যে, যতক্ষণ তুমি আবার পূর্ববর্তী দ্বীনে ফিরে না আসবে ততক্ষণ আমি কোন খাবার গ্রহণ করবনা। কিন্তু সা’দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার এ কথা মান্য করলেন না। তার সমর্থনেই এই আয়াত নাযিল হয়। [মুসলিম: ১৭৪৮]
(২) যদি পিতা-মাতা আল্লাহর অংশী স্থাপনে বাধ্য করার চেষ্টা করেন, তখন আল্লাহর নির্দেশ হল তাদের কথা না মানা। এমতাবস্থায় মানুষ স্বভাবতঃ সীমার মধ্যে স্থির থাকে না। এ নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সন্তানের পক্ষে পিতা-মাতার প্রতি কটু বাক্য প্রয়োগ ও অশোভন আচরণ করে তাদেরকে অপমানিত করার সম্ভাবনা ছিল। ইসলাম তো ন্যায়নীতির জ্বলন্ত প্রতীক — প্রত্যেক বস্তুরই একটি সীমা আছে। তাই অংশীদার স্থাপনের বেলায় পিতা-মাতার অনুসরণ না করার নির্দেশের সাথে সাথে এ হুকুমও প্ৰদান করেছে যে, দ্বীনের বিরুদ্ধে তো তাদের কথা মানবে না, কিন্তু পার্থিব কাজকর্ম যথা শারীরিক সেবা-যত্ন বা ধন-সম্পদ ব্যয় ও অন্যান্য ক্ষেত্ৰে যেন কার্পণ্য প্রদর্শিত না হয়। তাদের প্রতি বেআদবী ও অশালীনতা প্রদর্শন করো না।
তাদের কথাবার্তার এমনভাবে উত্তর দিবে না, যাতে অহেতুক মনোবেদনার উদ্রেক করে। মোটকথা, শিরক-কুফরীর ক্ষেত্রে তাদের কথা না মানার কারণে যে মর্মপীড়ার উদ্রেক হবে, তা তো অপারগতা হেতু বরদাশত করবে, কিন্তু প্রয়োজনকে তার সীমার মধ্যেই রাখতে হবে। অন্যান্য ব্যাপারে যেন মনোকষ্টের কারণ না ঘটে সে সম্পর্কে সচেতন থাকবে। [কুরতুবী, তাবারী, সা’দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৫) তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর,[1] অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, (বিশ্বাসী) মুমিনের পথ।
[2] অর্থাৎ, আমার অভিমুখী বিশ্বাসীর পথ অনুসরণ এই জন্য করবে যে, অবশেষে তোমাদের সকলকেই আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে এবং আমারই পক্ষ থেকে সকলকেই তার ভাল-মন্দ কর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে। যদি তোমরা আমার পথ অনুসরণ কর এবং আমাকে স্মরণ রেখে নিজেদের জীবন পরিচালিত কর, তাহলে কিয়ামতের দিন আমার বিচারালয়ে তোমাদের মুখ উজ্জ্বল হওয়ার আশা করা যায়। পক্ষান্তরে এর বিপরীত কর্মে আমার আযাবে গ্রেফতার হবে। কথা লুকমান হাকীমের অসিয়ত প্রসঙ্গে চলছিল। সামনে পুনরায় সেই অসিয়ত বর্ণনা করা হচ্ছে, যা তিনি আপন বৎসকে করেছিলেন। মাঝের দুটি আয়াতে পৃথকভাবে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। যার প্রথম কারণ এই বলা হয়েছে যে, লুকমান উক্ত অসিয়ত তাঁর ছেলেকে করেননি। কারণ, এতে তাঁর নিজস্ব স্বার্থ ছিল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, যাতে এটা পরিষ্ফুটিত হয়ে যায় যে,আল্লাহর একত্ব ও ইবাদতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাদের সেবা করা জরুরী। তৃতীয় কারণ এই যে, শিরক করা এত বড় পাপ যে, যদি পিতা-মাতা তা করার আদেশ করেন, তাহলে তাঁদের কথা মানা চলবে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৩-১৯ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা‘আলা লুকমান হাকীমের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে একজন আদর্শ পিতার সন্তানের প্রতি কী করণীয় সে সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরেছেন। লুকমান (عليه السلام) তাঁর পুত্রকে যে নসীহত করেছিলেন ও উপদেশ দিয়েছিলেন সে সকল উপদেশ যদি প্রতিটি পিতা তার সন্তানকে প্রদান করেন তাহলে প্রত্যেক পরিবার, সমাজ ও দেশ আদর্শ পরিবার, সমাজ ও দেশে পরিণত হবে। লুকমান হাকীম তাঁর পুত্রকে যে নসীহত ও উপদেশ দিয়েছিলেন সেগুলো হলন
প্রথম উপদেশ:
তিনি তাঁর ছেলেকে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা‘আলার হক সম্পর্কে সচেতন করে বললেন: একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে, কখনো আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করবে না। কেননা শির্ক একটি বড় ধরনের জুলুম। হাদীসে এসেছে, ইবনু মাসউদ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন
(الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَلَمْ يَلْبِسُوْآ إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ)
-এ আয়াতটি নাযিল হয় তখন সাহাবীদের নিকট বিষয়টি খুবই কঠিন মনে হল। তারা বলল: আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, তার ঈমানকে জুলুমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি? তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, বিষয়টি এরূপ নয়। তোমরা লুকমান (عليه السلام)-এর কথা শুননি? সে তার সন্তানকে বলেছিলন
(إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيْمٌ)
-নিশ্চয়ই শির্ক মহা জুলুম।।
অপর এক হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: সবচেয়ে বড় গুনাহ হল তিনটি, তার মধ্যে প্রথম হলো আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করা। (সহীহ বুখারী হা: ৬৮৭০-৭১)
দ্বিতীয় উপদেশ:
আল্লাহ তা‘আলার হকের পর বান্দার মাঝে যারা বেশি হকদার তাদের হক সম্পর্কে সচেতন করছেন। তারা হলেন পিতা-মাতা। তিনি তাঁর ছেলেকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য নসীহত করলেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য জোরালো আদেশ করেছেন। এমনকি কুরআনে প্রত্যেক জায়গায় আল্লাহ তা‘আলার অধিকারের পর পিতা-মাতার অধিকারের কথা বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَقَضٰي رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوْآ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ط إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَآ أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَّهُمَآ أُفٍّ وَّلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيْمًا)
“তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারও ‘ইবাদত কর না ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর। তাদের একজন অথবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয় তবে তাদেরকে ‘উফ্’ বল না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল।” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:২৩)
এখানে পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য পালন এবং তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকারের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এর হিকমত ও অন্তর্নিহিত রহস্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, তার মা ধরাধামে তার আবির্ভাব ও অস্তিত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার ও অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছেন। নয় মাস গর্ভ ধারণ, প্রসব বেদনা, লালন-পালন, দুধ পান ইত্যাদি ক্ষেত্রে মাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।
তবে পিতা-মাতা যদি এমন কোন বিষয়ের নির্দেশ দেয় যা বাস্তবায়ন করলে আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করা হয় সেক্ষেত্রে তাদের কথা মানা যাবে না। তবে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। এমনকি তাদের জন্য মহান আল্লাহ তা‘আলার দরবারে দু‘আ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِيْ صَغِيْرًا)
“এবং বল: ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।’’ (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:২৩-২৪)
তৃতীয় উপদেশ:
তৃতীয় উপদেশ দানের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার সূক্ষ্মদর্শীতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন: হে বৎস! তুমি যে আমলই করা না কেন যদি তা সরিষার দানা পরিমাণও হয় আর তা যদি শিলাগর্ভে বা আকাশে কিংবা মৃত্তিকার নীচে থেকে থাকে তাহলেও তা হাযির করে তোমাকে তার প্রতিদান দেবেন। এর দ্বারা তিনি ছেলেকে সতর্ক করছেন যাতে কখনো আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য ও পাপ কাজে লিপ্ত না হয়। আল্লাহ তা‘আলা কারো প্রতি কোন জুলুম করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَنَضَعُ الْمَوَازِيْنَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيٰمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ط وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ط وَكَفٰي بِنَا حٰسِبِيْنَ)
“এবং কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায়বিচারের মানদণ্ড। সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না এবং কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও সেটা আমি উপস্থিত করব; হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।” (সূরা আম্বিয়াহ ২১:৪৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(فَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَّرَه۫ - وَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَه۫)
“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে, এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।” (সূরা যিলযালা ৯৯:৭-৮)
সুতরাং মানুষ গোপনে বা প্রকাশ্যে যত ভাল আর খারাপ কাজ করুক না কেন আল্লাহ তা‘আলা তা কিয়ামতের দিন অবশ্যই উপস্থিত করবেন।
কেউ কেউ বলেন: صَخْرَةٌ হল যা সাত জমিনের নীচে থাকে। তবে এগুলোর ব্যাপরে সঠিক কথা আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
চতুর্থ উপদেশ:
চতুর্থ উপদেশ হল কর্ম পরিশুদ্ধতা সম্পর্কে। মানুষ যত আমল করে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হল সালাত। তাই তিনি তাঁর ছেলেকে বললেন, তুমি সালাত কায়েম কর। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا، وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ
সাত বছর বয়সে উপনীত হলে তোমাদের সন্তানদেরকে সালাতের নির্দেশ দাও, আদায় না করা অবস্থায় দশ বছর বয়সে পৌঁছলে প্রহার কর এবং বিছানা আলাদা করে দাও। (আবূ দাঊদা হা: ৪৯৫, সহীহ)
পঞ্চম উপদেশ:
পঞ্চম উপদেশ হল চরিত্র সংশোধন। ইসলাম একটি সমষ্টিগত ধর্ম, ব্যক্তির সাথে সমষ্টির সংশোধন ও জীবনব্যবস্থার প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অংগ। এজন্য সালাতের ন্যায় অবশ্য পালনীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে বাধা দেয়া। সে জন্য লুকমান (عليه السلام) বললেন: হে বৎস! তুমি সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বিরত থাকতে বলবে।
ষষ্ঠ উপদেশ:
ষষ্ঠ উপদেশ হল, যখন তুমি মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে বাধা দিবে তখন মানুষের পক্ষ হতে অনেক কষ্ট, বিপদ তোমাকে আঘাত করবে। আর তখন তোমার কাজ হল তুমি বিচলিত না হয়ে ধৈর্যধারণ করবে। কেননা এটা দৃঢ় সঙ্কল্পের একটি কাজ।
সপ্তম উপদেশ:
তুমি অহঙ্কারের বশবর্তী হয়ে মানুষকে অবজ্ঞা কর না। এবং উদ্ধতভাবে জমিনে বিচরণ কর না। কেননা আল্লাহ তা‘আলা উদ্ধত, অহঙ্কারীকে ভালবাসেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ج إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُوْلًا)
“ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ কর না; তুমি তো কখনই পদভরে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত সমান হতে পারবে না।” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৩৭)
হারিস বিন ওয়াহাব খুযা’য়ী (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতবাসীদের পরিচয় বলে দিব না? তারা কোমল স্বভাবের লোক, মানুষের কাছেও কোমল বলে পরিগণিত। যদি তারা কোন বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে আল্লাহ তা‘আলা তা অবশ্যই পূর্ণ করেন। আর আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসীদের পরিচয় বলে দিব না? তারা কঠোর স্বভাবের লোক, দাম্ভিক ও অহংকারী। অপর সনদে আনাস বিন মালেক (رضي الله عنه) বলেন: মদীনাবাসীদের ক্রীতদাসীদের মধ্যে একজন ক্রীতদাসী ছিল। সে তার প্রয়োজনে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাত ধরে যেখানে চাইতো নিয়ে যেত। (অর্থাৎ তার উদ্দিষ্টস্থলে হাত ধরে নিয়ে যেত। আর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও তার সাথে সাথে চলে যেতেন এবং তার প্রয়োজনীয় কাজ করে দিতেন। এমনই কোমল স্বভাবের ছিলেন তারা। অথচ তিনি তখনও রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন।) (সহীহ বুখারী হা: ৬০৭০, সহীহ মুসলিম হা: ২৮৫৩)
অষ্টম উপদেশ:
তুমি সংগতভাবে জমিনে তোমার পা ফেলবে। খুব ধীরে ধীরেও নয় আবার দম্ভভরেও নয়। বরং মধ্যম পন্থায় চলবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলার বান্দারা জমিনে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَعِبَادُ الرَّحْمٰنِ الَّذِيْنَ يَمْشُوْنَ عَلَي الْأَرْضِ هَوْنًا وَّإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجٰهِلُوْنَ قَالُوْا سَلَامًا)
‘রাহমান’-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা বলে, ‘সালাম’। (সূরা ফুরকান ২৫:৬৩)
নবম উপদেশ:
তুমি কথা বলার সময় নীচু স্বরে কথা বলবে। কেননা সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্বর হচ্ছে গাধার স্বর। তাই তুমি গাধার মত উচ্চ স্বরে কথা বল না। বরং তোমরা কথায় নম্রতা বজায় রাখবে। হাদীসে এসেছে, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যখন তোমরা মোরগের ডাক শুনবে তখন আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ কামনা কর। আর যখন গাধার ডাক শুনবে তখন আল্লাহ তা‘আলার কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩০৩, সহীহ মুসলিম হা: ৮২)
সুতরাং প্রত্যেক পিতা-মাতার উচিত তার সন্তানকে এ সকল উপদেশ প্রদান করা। ফলে সন্তান আদর্শবান হবে এবং পিতা-মাতার বৃদ্ধ অবস্থায় সেবাযত্ন করবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পিতা-মাতার উচিত তাদের সন্তানদেরকে লুকমান (عليه السلام)-এর মত উপদেশ প্রদান করা।
২. আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না। কেননা শির্ক হল সবচেয়ে বড় গুনাহ।
৩. আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার পাশাপাশি পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে।
৪. কিয়ামতের মাঠে মানুষের সমস্ত আমল উপস্থিত করা হবে এবং সেই অনুপাতে তাকে প্রতিদান দেয়া হবে। কারো প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না।
৫. প্রতিটি পিতা-মাতা সন্তানকে সালাত কায়েম করার, সৎ কাজের আদেশ করার, অসৎ কাজে বাধা এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করার উপদেশ দিবে।
৬. অহংকার পতনের মূল, তাই কোন প্রকার অহঙ্কার করা যাবে না।
৭. আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টিকে অবজ্ঞা করা যাবে না।
৮. সংযতভাবে চলা ফেরা করতে হবে।
৯. উচ্চকণ্ঠে নয় বরং নম্রভাবে কথা বলতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৩-১৫ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত লোকমান তার পুত্রকে যে নসীহত করেছিলেন ও উপদেশ দিয়েছিলেন এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তিনি হলেন লোকমান ইবনে আনকা ইবনে সুদূন। সুহাইলী (রঃ)-এর বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, তাঁর পিতার নাম ছিল সা’রান। আল্লাহ তা'আলা তাঁর উত্তম বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, তাঁকে হিকমত দান করা হয়েছিল। তিনি যে উত্তম ওয়াজ ও নসীহত স্বীয় পুত্রকে করেছিলেন তা বিষদভাবে আল্লাহ তাআলা এখানে তুলে ধরেছেন। পুত্র অপেক্ষা প্রিয় মানুষের কাছে আর কিছুই নেই। মানুষ তার ছেলেকে সবচেয়ে প্রিয়বস্তু ও মূল্যবান সামগ্রী দিতে চায়। তাই হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে সর্বপ্রথম যে নসীহত করলেন তা হচ্ছে- হে আমার প্রিয় বৎস! একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করো না। জেনে রেখো যে, এর চেয়ে বড় নির্লজ্জতাপূর্ণ ও জঘন্যতম কাজ আর কিছুই নেই। হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবি) (যারা ঈমান এনেছে ও তাদের ঈমানকে যুলুমের সাথে মিশ্রিত করেনি- ৬:৮৩) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের কাছে এটা খুবই কঠিন ঠেকে। তারা বলেনঃ “আমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে তার ঈমানকে যুলুমের সাথে মিশ্রিত করে না?' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তোমরা যা বুঝেছো তা নয়। তোমরা কি হযরত লোকমানের কথা শুননি? তিনি বলেছিলেনঃ “হে বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না, নিশ্চয়ই শিরক চরম যুলুম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছে)
এই উপদেশের পর হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে দ্বিতীয় উপদেশ যা দেন সেটাও গুরুত্বের দিক দিয়ে বাস্তবিকই এমনই যে, প্রথম উপদেশের সাথে এটা মিলিত হওয়া উচিত। অর্থাৎ পিতা-মাতার প্রতি ইহসান করা ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেন (আরবি)
অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করতে ও পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) কুরআন কারীমের মধ্যে প্রায়ই এ দু'টোর বর্ণনা একই সাথে দেয়া হয়েছে। সেখানেও ঠিক সেভাবেই করা হয়েছে।
(আরবি) শব্দের অর্থ হলো শ্রম, কষ্ট, দুর্বলতা ইত্যাদি। একটি কষ্ট তো হামল’ বা গর্ভধারণ অবস্থায় হয় যা মাতা সহ্য করে থাকেন। গর্ভধারণের অবস্থায় মায়ের দুঃখ-কষ্টের কথা সবাই জানে। অতঃপর মাতা সন্তানকে দু’বছর পর্যন্ত দুগ্ধ পান করিয়ে থাকেন। এই দু’বছর ধরে মাতাকে তার শিশু সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ
(আরবি) অর্থাৎ “মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে যারা দুধ-পান কাল পূর্ণ করতে চায়।” (২:২৩৩) অন্য একটি আয়াতে আছে (আরবি)
অর্থাৎ “তার গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল ত্রিশ মাস।” (৪৬:১৫) এ জন্যেই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আরো বড় বড় ইমামগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, গর্ভধারণের সময়কাল কমপক্ষে ছয় মাস হবে। মায়ের এই কষ্টের কথা সন্তানের সামনে এ জন্যেই প্রকাশ করা হচ্ছে যে, যেন সন্তান মায়ের এই মেহেরবানীর কথা স্মরণ করে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আনুগত্য ও ইহসান করে। আর একটি আয়াতে মহান আল্লাহ নির্দেশ দেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং বলঃ হে আমার প্রতিপালক! তাদের দু'জনের (অর্থাৎ আমার পিতা-মাতার) প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।” (১৭:২৪)।
এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। তোমাদের প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। সুতরাং যদি তোমরা আমার এ আদেশ মেনে নাও তবে আমি তোমাদেরকে এর পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবো।
হযরত সাঈদ ইবনে অহাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমাদের নিকট হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) আগমন করেন যাকে নবী (সঃ) প্রতিনিধিরূপে পাঠিয়েছিলেন। তিনি দাড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন। বক্তৃতায় তিনি প্রথমে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেন। অতঃপর বলেনঃ “আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর দূতরূপে প্রেরিত হয়েছি এ কথা বলার জন্যে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবে না। যদি তোমরা আমার কথা মেনে নাও তবে আমি তোমাদের কল্যাণ সাধনে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করবো না। তোমাদেরকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। অতঃপর হয়তো জান্নাতে যাবে, নয়তো জাহান্নামে যাবে। সেখান হতে আর বের হবে না, বরং সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। সেখানে মৃত্যু নেই। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাতে যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং তাদের কথায় আমার সাথে শরীক করে বসবে না। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার ও তাদের প্রতি ইহসান করাও পরিত্যাগ করবে। তোমাদের উপর তাদের পার্থিব যে হক রয়েছে তা অবশ্যই পূরণ করবে। যে বিশুদ্ধ চিত্তে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন করবে। আর জেনে রাখবে যে, তোমাদের সবারই প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করবো।
হযরত সা'দ ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “এ আয়াতটি আমারই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি আমার মাতার খুবই খিদমত করতাম এবং তাঁর পূর্ণ অনুগত থাকতাম। আল্লাহ তাআলা যখন আমাকে ইসলামের পথে হিদায়াত দান করলেন তখন আমার মা আমার প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে গেল। সে আমাকে বললো: “তুমি এই নতুন দ্বীন কোথায় পেলে? জেনে রেখো, আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, এই দ্বীন তোমাকে অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে, নচেৎ আমি পানাহার বন্ধ করে দেবো। আর এভাবে না খেয়ে মারা যাবো।” আমি ইসলাম পরিত্যাগ করলাম না। সুতরাং আমার মা পানাহার বন্ধ করে দিলো। ফলে চতুর্দিকে আমার দুর্নাম ছড়িয়ে পড়লো যে, আমি আমার মায়ের হন্তা। আমার মন খুবই ছোেট হয়ে গেল। আমি আমার মায়ের খিদমতে হাযির হলাম, তাকে বুঝালাম এবং অনুনয় বিনয় করে বললাম: তুমি তোমার এই হঠকারিতা হতে বিরত হও। জেনে রেখো যে, এই সত্য দ্বীন যে আমি ছেড়ে দেবো এটা সম্ভব নয়। এভাবে আমার মায়ের উপর তিন দিন অতিবাহিত হয়ে গেল এবং তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হলো। আমি তার কাছে গেলাম এবং বললামঃ আম্মা! জেনে রেখো যে, তুমি আমার কাছে আমার প্রাণ হতেও প্রিয় বটে, কিন্তু তাই বলে আমার দ্বীন হতে অধিক প্রিয় নও। আল্লাহর কসম! তোমার একটি জীবন কেন, তোমার মত শতটি জীবনও যদি ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হয়ে এক এক করে সবই বেরিয়ে যায় তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি এই দ্বীন ইসলামকে পরিত্যাগ করবো না। আমার এ কথায় আমার মা নিরাশ হয়ে গেল এবং পানাহার শুরু করে দিলো।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) তাঁর ‘আশারাহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।