সূরা আর-রুম (আয়াত: 42)
হরকত ছাড়া:
قل سيروا في الأرض فانظروا كيف كان عاقبة الذين من قبل كان أكثرهم مشركين ﴿٤٢﴾
হরকত সহ:
قُلْ سِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا کَیْفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلُ ؕ کَانَ اَکْثَرُهُمْ مُّشْرِکِیْنَ ﴿۴۲﴾
উচ্চারণ: কুল ছীরূফিল আরদিফানজুরূ কাইফা কা-না ‘আ-কিবাতুল্লাযীনা মিন কাবলু কানা আকছারুহুম মুশরিকীন।
আল বায়ান: বল, ‘তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর। অতঃপর দেখ পূর্ববর্তীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছিল’। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪২. বলুন, তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর অতঃপর দেখ পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছে! তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ আগে যারা ছিল তাদের পরিণাম কী হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।
আহসানুল বায়ান: (৪২) বল, ‘তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে দেখ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে। ওদের অধিকাংশই ছিল অংশীবাদী।’[1]
মুজিবুর রহমান: বলঃ তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে! তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।
ফযলুর রহমান: বল, “তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল।” তাদের অধিকাংশই মুশরিক ছিল।
মুহিউদ্দিন খান: বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ তোমাদের পুর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।
জহুরুল হক: বলো -- "তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো কেমন হয়েছিল তাদের পরিণাম যারা পূর্বে অধিষ্ঠিত ছিল। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।"
Sahih International: Say, [O Muhammad], "Travel through the land and observe how was the end of those before. Most of them were associators [of others with Allah].
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪২. বলুন, তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর অতঃপর দেখ পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছে! তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪২) বল, ‘তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে দেখ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে। ওদের অধিকাংশই ছিল অংশীবাদী।”[1]
তাফসীর:
[1] এখানে বিশেষ করে অংশীবাদী ও মুশরিকদের কথা উল্লেখ হয়েছে। যেহেতু শিরক হল সবচাইতে বড় গোনাহ। এ ছাড়াও এতে অন্যান্য পাপাচার ও অবাধ্যতাও এসে যায়। কারণ, অন্যান্য পাপও মানুষ নিজের প্রবৃত্তি-পূজার ফলেই করে থাকে। এই জন্য অনেকেই পাপ ও অবাধ্যাচরণকে আমলগত শিরক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪১-৪২ নং আয়াতের তাফসীর:
জল ও স্থলের বিপর্যয় দ্বারা উদ্দেশ্য হলন অনাবৃষ্টি, ফসল ও ফলমূল উৎপন্ন না হওয়া, দুর্ভিক্ষ হওয়া, বেশি বেশি বালা-মুসিবত, বিপদ-আপদ হওয়া, অনাকাক্সিক্ষত রোগ-মহামারি, মানব হত্যা, অগ্নিকাণ্ড, পানিতে নিমজ্জিত হওয়া, সব কিছু থেকে বরকত উঠে যাওয়া ইত্যাদি আপদ-বিপদ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এসব আপদ-বিপদ মানুষের কর্মের ফসল অর্থাৎ অন্যায়-অশ্লীল কাজে জড়িত হওয়া, মানুষের ওপর জুলুম করা, মন্দ কাজ থেকে বাধা না দেয়া, অপরাধের শরয়ী শাস্তি প্রদান না করা ইত্যাদিও দুনিয়াতে বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার কারণ।
হাদীসে এসেছে, জমিনে একটি হদ কায়েম হওয়া জমিনবাসীর জন্য চল্লিশ দিন বৃষ্টিপাত হওয়া অপেক্ষা উত্তম। (নাসায়ী হা: ৪৯২০, মুসনাদ আহমাদ ২/৩৬২ সহীহ)
কারণ হদ কায়েম হলে পাপীরা পাপকার্য হতে বিরত থাকবে, নিরীহ মানুষ নির্যাতন মুক্ত থাকবে। আর দুনিয়ায় যখন পাপকার্য বন্ধ হয়ে যাবে তখন দুনিয়াবাসী আসমান ও জমিনের বরকত লাভ করবে। তাদের এ সকল পাপকার্যের জন্য আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বিভিন্ন মঙ্গল-অমঙ্গল দ্বারা পরীক্ষা করেন যাতে তারা অপকর্ম থেকে ফিরে আসে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَبَلَوْنٰهُمْ بِالْحَسَنٰتِ وَالسَّيِّاٰتِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُوْنَ)
“এবং কল্যাণ ও অকল্যাণ দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৬৮)
পাপীদের সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছে যে, “যখন কোন পাপী ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে তখন লোকজন, শহর, গাছপালা, জীবজন্তু সবাই শান্তি লাভ করে। (সহীহ বুখারী হা: ৬৫১২, সহীহ মুসলিম হা: ৬১)
তবে সব পাপ কাজের শাস্তি আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে দেন না। অধিকাংশ পাপই ক্ষমা করে দেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَمَآ (أَصَابَكُمْ مِّنْ مُّصِيْبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيْكُمْ وَيَعْفُوْا عَنْ كَثِيْرٍ )
“তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদেরই হাতের কামাইয়ের ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন।” (সূরা শুরা ৪২:৩০)
পূর্বযুগের অপরাধীদের কিরূপ শাস্তি হয়েছিল তাদের অবস্থা দেখে শিক্ষা নেয়ার জন্য জমিনে সফর করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক, তাই তাদের অবস্থা এরূপ হয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক মুশরিককে আল্লাহ তা‘আলা এ বাণীর মাধ্যমে সতর্ক করছেনন খবরদার কখনো আমার সাথে শির্ক করবে না। যদি শির্ক কর তোমাদের দুনিয়া-আখেরাত উভয়টি বাতিল হয়ে যাবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সর্বপ্রকার পাপাচার হতে বিরত থাকতে হবে। কেননা একজনের পাপের কারণে সমস্ত দুনিয়ার সৃষ্টিজীব কষ্ট পেতে পারে।
২. দুনিয়াতে ফেতনা-ফাসাদ ও দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি মানুষের পাপের কারণে হয়ে থাকে।
৩. আরাম-আয়েশ ও অবসর যাপনের জন্য ভ্রমণ না করে শিক্ষা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪১-৪২ নং আয়াতের তাফসীর
ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইকরামা (রঃ), যহহাক (রঃ), সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ। গুরুজন বলেন যে, এখানে (আরবি) দ্বারা জঙ্গল ও মরু প্রান্তরকে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবি) দ্বারা বুঝানো হয়েছে শহর ও গ্রামকে। অন্যেরা বলেন যে, দ্বারা মানুষের সুপরিচিত স্থল ভাগকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবি) দ্বারা বুঝানো হয়েছে। সমুদ্রকে যা মানুষের নিকট পরিচিত।
স্থল ভাগের বিপর্যয় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাওয়া, ফসল ও ফল-মূল পয়দা না হওয়া এবং দুর্ভিক্ষ হওয়া। আর সমুদ্রের বিপর্যয় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বৃষ্টি না হওয়া, জলজন্তুগুলো অন্ধ হয়ে যাওয়া। মানব হত্যা এবং জলযান জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে জল ও স্থলভাগের বিপর্যয়। এখানে (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো দ্বীপসমূহ এবং (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শহর, লোকালয় ইত্যাদি। কিন্তু প্রথম বর্ণিত ব্যাখ্যাটি বেশী প্রকাশমান। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর এ বর্ণনাটিও এর পৃষ্ঠপোষকতা করে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়লার বাদশাহর সাথে সন্ধি করেন, তাতে তিনি তার বাহর অর্থাৎ শহরের নাম উল্লেখ করলেন।।
ফল বা খাদ্যশস্যের ক্ষতি মানুষের পাপের কারণে হয়ে থাকে। যারা আল্লাহর অবাধ্য তারাই পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। আসমান ও যমীনের শুদ্ধি আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের দ্বারা হয়ে থাকে। সুনানে আবি দাউদে হাদীস আছেঃ “যমীনে একটি হদ (পাপের শাস্তি) কায়েম হওয়া যমীনবাসীর পক্ষে চল্লিশ দিনের বৃষ্টি অপেক্ষা উত্তম।” এটা এই কারণে যে, `হদ কায়েম হলে পাপীরা পাপকার্য হতে বিরত থাকবে। আর দুনিয়ায় যখন পাপকার্য বন্ধ হয়ে যাবে তখন দুনিয়াবাসী আসমান ও যমীনের বরকত লাভ করবে।
শেষ যুগে যখন হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) পৃথিবীতে নাযিল হবেন। ও পবিত্র শরীয়ত মুতাবেক ফায়সালা দিতে থাকবেন, যেমন শূকরের হত্যা, ক্রুসের পরাজয়, জিযিয়া বন্ধ অর্থাৎ হয় ইসলামের কবুলিয়ত, না হয় যুদ্ধ। তারপর তাঁর সময় দাজ্জাল ও তার অনুসারীদের পতন ও ইয়াজুজ-মাজুজের ধ্বংস সাধন হয়ে যাবে, তখন যমীনকে বলা হবেঃ “তোমার বরকত ফিরিয়ে আন।” সেই দিন একটি ডালিম ফল একটি বড় দলের (খাদ্য হিসেবে) যথেষ্ট হবে। এ ডালিম এতো বড় হবে যে, ওর ছালের নীচে এসব লোক ছায়া গ্রহণ করতে পারবে। একটি উষ্ট্রীর দুগ্ধ একটি গোত্রের জন্যে যথেষ্ট হবে। এসব বরকত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শরীয়ত জারীকরণের ফলে হবে। তার দেয়া শরীয়ত বিধি যেমন বাড়তে থাকবে এ বরকতের পরিমাণও তেমন বৃদ্ধি পেতে থাকবে। অপরপক্ষে, ফাজের বা পাপাচারী লোকের ব্যাপারে হাদীস শরীফে উল্লিখিত হয়েছে যে, তার মৃত্যুর কারণে শহরের লোকজন, গাছপালা, জীবজন্তু ইত্যাদি সবাই শান্তিলাভ করে থাকে।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, যিয়াদের আমলে একটি থলে পাওয়া গিয়েছিল যাতে খেজুরের বড় আঁটির মত গমের দানা ছিল। তাতে লিখা ছিলঃ “এটা ঐ সময় উৎপন্ন হতো যখন ন্যায়-নীতিকে কাজে লাগানো হতো।”
যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এখানে ফাসাদ দ্বারা শিরক উদ্দেশ্য। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এর ফলে তাদেরকে তাদের কোন কোন কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান যাতে তারা ফিরে আসে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আমি তাদেরকে মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা পরীক্ষা করি যাতে তারা ফিরে আসে।” (৭:১৬৮) মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখো, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে! তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক। সেগুলো দেখে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।