আল কুরআন


সূরা আর-রুম (আয়াত: 32)

সূরা আর-রুম (আয়াত: 32)



হরকত ছাড়া:

من الذين فرقوا دينهم وكانوا شيعا كل حزب بما لديهم فرحون ﴿٣٢﴾




হরকত সহ:

مِنَ الَّذِیْنَ فَرَّقُوْا دِیْنَهُمْ وَ کَانُوْا شِیَعًا ؕ کُلُّ حِزْبٍۭ بِمَا لَدَیْهِمْ فَرِحُوْنَ ﴿۳۲﴾




উচ্চারণ: মিনাল্লাযীনা ফাররাকূদীনাহুম ওয়া কা-নূশিয়া‘আন কুল্লুহিযবিম বিমা-লাদাইহিম ফারিহুন।




আল বায়ান: যারা নিজদের দীনকে বিভক্ত করেছে এবং যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে (তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না)। প্রত্যেক দলই নিজদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩২. যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে।(১) প্ৰত্যেক দলই যা তাদের কাছে আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।




তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করে ফেলেছে এবং বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গেছে। প্রত্যেক দল নিজেদের কাছে যা আছে তাই নিয়ে উল্লসিত।




আহসানুল বায়ান: (৩২) যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে;[1] প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত।[2]



মুজিবুর রহমান: যারা নিজেদের দীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল।



ফযলুর রহমান: যারা নিজেদের ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। প্রত্যেক দলই যার যার মত নিয়ে আনন্দিত।



মুহিউদ্দিন খান: যারা তাদের ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উল্লসিত।



জহুরুল হক: তাদের দলের যারা তাদের ধর্মকে বিভক্ত করেছে আর তারা হয়ে গেছে নানা দলীয়। প্রত্যেক দলই যা তাদের কাছে রয়েছে তাতেই উল্লসিত।



Sahih International: [Or] of those who have divided their religion and become sects, every faction rejoicing in what it has.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩২. যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে।(১) প্ৰত্যেক দলই যা তাদের কাছে আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।


তাফসীর:

(১) কাতাদাহ বলেন, তারা হচ্ছে ইয়াহুদী ও নাসারা। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩২) যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে;[1] প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত।[2]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, সত্য ধর্ম পরিত্যাগ করে অথবা তাতে নিজেদের মনমত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করে তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যেমন কেউ ইয়াহুদী, কেউ খ্রিষ্টান, কেউ অগ্নিপূজক ইত্যাদি।

[2] অর্থাৎ, প্রত্যেক দল ধারণা করে যে, তারাই সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত আছে, আর অন্যেরা আছে ভ্রান্ত পথে। আর যে যুক্তি তারা খাড়া করে রেখেছে এবং যাকে তারা প্রমাণ বলে আখ্যায়িত করে, তা নিয়ে তারা হর্ষোৎফুল্ল ও সন্তুষ্ট আছে। দুঃখের বিষয় যে, বর্তমানে মুসলিমদের অবস্থাও অনুরূপ হয়ে পড়েছে। তারাও বিভিন্ন মযহাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং প্রত্যেক মযহাব ঐ বাতিল ধারণা অনুযায়ী নিজেকে হকপন্থী মনে করে খোশ আছে। অথচ হকপন্থী শুধুমাত্র একটি দলই আছে; যার পরিচয় দিয়ে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘তারা আমার ও আমার সাহাবার তরীকার অনুসারী হবে।’’ (তিরমিযী প্রমুখ)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩০-৩২ নং আয়াতের তাফসীর:



(فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّيْنِ حَنِيْفًا)



অর্থাৎ যখন জানা গেল শির্ক অযৌক্তিক ও মহা অন্যায়। সুতরাং যাবতীয় শির্ক জাতীয় চিন্তাধারা ও আমল পরিত্যাগ করে শুধু ইসলামের দিকে মুখ কর অর্থাৎ সর্বাবস্থায় তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَأَنْ أَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّيْنِ حَنِيْفًا ج وَلَا تَكُوْنَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ)‏



“আর তোমাকে এও নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হও এবং কখনই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না” (সূরা ইউনূস ১০:১০৫)



الدِّيْنِ অর্থাৎ ইসলাম, ঈমান ও ইহসান। তোমার অন্তর, শরীর ও ইচ্ছাকে দীনের বাহ্যিক যাবতীয় ইবাদত যেমন সালাত, সিয়াম, হাজ্জ, যাকাত ও অন্যান্য এবং আভ্যন্তরীণ ইবাদত যেমন ভালবাসা, ভয় করা, আশা করা, আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করা ইত্যাদির প্রতি মনোনিবেশ কর। আর শরীয়তে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ইহসান হলন তুমি এমনভাবে ইবাদত করবে যেন তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাচ্ছ আর যদি দেখতে না পাও তাহলে জেনে রেখ আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে দেখছেন।



حَنِيْفًا অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে, সব মা‘বূদ ও তাগুতকে বর্জন করে ইবাদত করবে। কোন পীর, অলী-আওলিয়া ও দরগার অভিমুখী হয়ে নয়। এভাবে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করাকেই (فِطْرَتَ اللّٰهِ) বলা হয়েছে। এ ফিতরাতের ওপর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে।



কুরআন ও হাদীসে ফিতরাত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে:

১. ইসলাম। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: প্রত্যেক সন্তান ফিতরাতের ওপর জন্ম গ্রহণ করে। অর্থাৎ ইসলামের ওপর জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর পিতা-মাতা তাকে ইয়াহূদী বানায় অথবা খ্রিস্টান বানায় অথবা অগ্নিপূজক বানায়। (সহীহ বুখারী হা: ১৩৫৮, সহীহ মুসলিম হা: ২৬৫৮)



২. রাসূলদের সুন্নাত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছেন যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: পাঁচটি কাজ করা ফিতরাতের অন্তর্ভুক্তন খাতনা করা, নাভির নিচের পশম পরিস্কার করা, বগলের পশম তোলা, নখ খাট করা ও গোঁফ খাট করা। (সহীহ বুখারী হা: ৫৮৮৯, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৭)



অর্থাৎ এ ফিতরাত ও দীনের আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কোন পরিবর্তন নেই। এর বিপরীত কোন নির্দেশ আসবে না। কিয়ামত পর্যন্ত সকলকে ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার নির্দেশ বহাল থাকবে। এটাই হল মজবুত দীন। এ দীন দিয়েই আল্লাহ তা‘আলা সকল নাবী-রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছেন, এ দীনের অনুসরণ করলেই তা আল্লাহ তা‘আলার কাছে পৌঁছে দিবে। কিন্তু এ সঠিক দীন সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের জ্ঞান নেই, ফলে আল্লাহ তা‘আলাকে পাওয়ার জন্য পীর-ফকিরের অসিলা ধরে। আর কতক জনের জ্ঞান থাকলেও তা মেনে চলে না।



(مُنِيْبِيْنَ إِلَيْهِ) – اناب، ينيب



অর্থ অভিমুখী হওয়া, অর্থাৎ তুমি নিজেকে আল্লাহ তা‘আলার দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখ তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে। অন্তর এবং শরীর একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার দিকেই অভিমুখী হবে, তাঁর দিকেই মুতাওজ্জুহ হবে। কোন বাবা, পীর ও দরগার দিকে মুতাওজ্জুহ হওয়া যাবে না। এতে শরীয়তের বাহ্যিক-আভ্যন্তরীণ সকল ইবাদত শামিল। তা দেখা যাক আর না দেখা যাক। যেমন সালাত আদায় করা একটি বাহ্যিক ইবাদত, তা দেখা যায়। একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার অভিমুখী হয়ে তাঁর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য সালাত আদায় করতে হবে। ভয় করা একটি ইবাদত যা দেখা যায় না। ভয় একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকেই করতে হবে, যে ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ কোন ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না সে ক্ষেত্রে কোন পীর, বাবা বা অন্য কেউ ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে এ বিশ্বাস করা যাবে না, এটা শির্ক।



(وَاَقِیْمُوا الصَّلٰوةَ)



সালাত কায়েম কর, আর আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের ধর্মীয় অবস্থা বর্ণনা করে বলেন: তারা তাদের দীনকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছে অথচ পৃথিবীর বুকে দীন মাত্র একটি, তাহল সবাই এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। কিন্তু এ মুশরিকরা কেউ প্রতিমার পূজা করে, কেউ আগুনের পূজা করে, কেউ চন্দ্র-সূর্যের পূজা করে, কেউ সৎ ব্যক্তিদের পূজা করে। এভাবে তারা দীনকে বিভক্ত করে নিয়েছে। উচ্চ বংশের লোকেরা যার ইবাদত করবে নিচু বংশের লোকেরা তার ইবাদত করতে পারবে না একশ্রেণির লোকদের ইবাদত করতে হয় না, তারা মারেফতের জগতে চলে গেছে আরেক শ্রেণি যারা ততদূর পৌঁছতে পারেনি তাদের ইবাদত করতে হয়। এটা দীনকে বিভক্ত করে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়া ছাড়া কিছুই নয়। পূর্বে ইয়াহূদী-খ্রিস্টানেরা তাদের ধর্মে মনমত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করে দলে দলে বিভক্ত হয়েছিল। মূলত আল্লাহ তা‘আলা এসব বাণী দ্বারা মুসলিমদেরকে সতর্ক করছেন যারা দীনকে বিভাজন করে নিয়ে নিজেরা বিভক্ত হয়ে গেছে তাদের মত তোমরাও হয়ো না। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوْا وَاخْتَلَفُوْا مِنْم بَعْدِ مَا جَا۬ءَهُمُ الْبَيِّنٰتُ ط وَأُولٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ)



“তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং তাদের কাছে প্রমাণ আসার পর মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১০৫)



شِيَعًا শব্দটি شيعة এর বহুবচন। অর্থ দল, মত ইত্যাদি।



فَرِحُوْنَ অর্থাৎ যে দলের কাছে যে সকল দলীল-প্রমাণ রয়েছে তা নিয়েই তারা সন্তুষ্ট। তারা তাদের দলীল-প্রমাণ দ্বারা মনে করে আমরাই হক অন্য সবাই বাতিল।



সুতরাং পৃথিবীর বুকে দীন একটাইন আর তা হল ইসলাম। সকলে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে এ দীন দিয়ে যুগে যুগে অসংখ্য নাবী-রাসূল প্রেরণ করা হয়েছে। যারা এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত থেকে বের হয়ে গেছে তারাই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয় তারা ইসলামের বাইরে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. দীনে হানীফে তথা তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে।

২. প্রত্যেক মানুষ ইসলাম ও তাওহীদের ওপর জন্মগ্রহণ করে।

৩. আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি পদ্ধতির কোনই পরিবর্তন-পরিবর্ধন নেই।

৪. সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মাপকাঠি না।

৫. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকেই ভয় করতে হবে।

৬. দীনের ওপর সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে যার যার খেয়াল-খুশিমত দল বা তরীকা তৈরী করে বিভক্ত হওয়া যাবে না।

৭. সকল ইবাদতে মুতাওজ্জুহ হতে হবে আল্লাহ তা‘আলার দিকে; অন্য কারো দিকে নয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩০-৩২ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা একনিষ্ঠ হয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও, যে দ্বীনকে আল্লাহ পাক তোমাদের জন্যে নির্ধারিত করে দিয়েছেন। হে নবী (সঃ)! যে দ্বীনকে আল্লাহ তোমার হাতে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। প্রতিপালকের শান্তিপূর্ণ প্রকৃতির উপর তারাই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে যারা এই দ্বীনে ইসলামের অনুসারী। এরই উপর অর্থাৎ তাওহীদের উপর আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি রোজে আযলের উপর সকলকে অঙ্গীকারাবদ্ধ করেছেন। তিনি সেই দিন বলেছিলেনঃ “আমি কি তোমাদের সবারই প্রতিপালক নই?` তখন সবাই সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলঃ “হ্যা, অবশ্যই আপনি আমাদের প্রতিপালক।” হাদীসটি ইনশাআল্লাহ সত্বরই বর্ণনা করা হবে।

আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টিকে নিজ দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছেন। পরবর্তী সময়ে লোকেরা কেউ ইয়াহূদিয়্যাৎ কেউ নাসরানিয়্যাৎ ককূল করে নিয়েছে।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। ইমাম বুখারী (রঃ) এ অর্থই করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির অর্থ দ্বীন ও ফিতরাতে ইসলাম।

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু ফিত্রাত বা প্রকৃতির উপর ভূমিষ্ট হয়ে থাকে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও মাজুসী করে গড়ে তোলে। যেমন বকরীর নিখুঁত বাচ্চা পয়দা হয়। অতঃপর বকরীর মালিক ওর কান কেটে দেয়। তারপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটি, তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আসওয়াদ ইবনে সারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি ও তাঁর সাথে (কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। আল্লাহর ফলে আমরা যুদ্ধে জয়লাভ করি। সেদিন মুসলমানরা বহু কাফিরকে হত্যা করে, এমনকি ছোট ছোট শিশুদের উপরও তারা হস্তক্ষেপ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানতে পেরে খুব অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! এটা কেমন ধারা হলো যে, তোমরা সীমালংঘন করলে? কি করে আজ ছোট ছোট শিশুদেরকে হত্যা করা হলো?` কোন এক ব্যক্তি উত্তরে বললো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারাও তো কাফিরদের সন্তান?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “না! না জেনে রেখো যে, কাফিরদের শিশুরা তোমাদের অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। সাবধান! শিশুদেরকে কখনো হত্যা করো না। যারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক তাদেরকে হত্যা করা হতে বিরত থাকবে। প্রত্যেক শিশু ফিত্রাতের উপর পয়দা হয়। তারা যা বলে তা ফিত্রাত মুতাবেকই বলে। তাদের পিতা-মাতা তাদেরকে ইয়াহূদী ও নাসরানী করে গড়ে তোলো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)

হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশুই ফিত্রাতের উপর জন্মগ্রহণ করে, অতঃপর তারা কথা বলতে শিখে। তারপর সে হয়তো অকৃতজ্ঞ (কাফির) হয়ে যায় অথবা কৃতজ্ঞ (মুসলমান) হয়ে যায়।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মুশরিকদের সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সৃষ্টি করেন তখন হতেই তিনি জানেন যে, তারা বড় হলে কি আমল করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার উপর এমন এক যুগ এসেছে যে, আমি বলতাম, মুসলমানদের সন্তানরা মুসলমানদের সাথে এবং মুশরিকদের সন্তানরা মুশরিকদের সাথে হবে। শেষ পর্যন্ত অমুক ব্যক্তি আমাকে অমুক ব্যক্তি হতে শুনালো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মুশরিকদের সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাবে বলেনঃ “তারা বড় হলে কি ধরনের কাজ করবে ও কি মতামত গ্রহণ করবে তা আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)

হযরত আইয়াম ইবনে হিমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ভাষণে বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে আদেশ করেছেন যে, আজ তিনি আমাকে যা শিখিয়েছেন এবং তোমরা যা হতে অজ্ঞ রয়েছ, আমি যেন তা তোমাদেরকে শিখিয়ে দিই। আল্লাহ বলেছেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে যা, দিয়েছি তা তাদের জন্যে হালাল করেছি। আমি আমার সমস্ত বান্দাকে একনিষ্ঠ খাটি ধর্মের অনুসারী করেছি। শয়তান তাদে থেকে বিভ্রান্ত করে দেয়। হালাল বস্তুকে তাদের জন্যে হারাম করে এবং আমার সাথে শরীক স্থাপন করার জন্যে তাদেরকে প্ররোচিত করে। সে এমন কথা বলে যার কোন দলীল প্রমাণ নেই।` আল্লাহ তাআলা দুনিয়াবাসীর প্রতি লক্ষ্য করেছেন এবং আরব আজম সকলকে তিনি অপছন্দ করেছেন। শুধু গুটিকতক আহলে কিতাবকে তিনি পছন্দ করেছেন। তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি তোমাকে শুধু পরীক্ষার জন্যে পাঠিয়েছি। তোমারও পরীক্ষা নেয়া হবে এবং তোমার কারণে সবারই পরীক্ষা নেয়া হবে। আমি তোমার উপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করবো যা পানি দিয়ে ধৌত করা যাবে না। তুমি ওটা উঠতে বসতে পাঠ করতে থাকবে।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা আমাকে বলেছেন যে, আমি যেন কুরায়েশদেরকে সাবধান করে দিই। আমি আশংকা প্রকাশ করলাম যে, তারা হয়তো আমার মস্তক খুলে নিয়ে রুটি বানিয়ে নেবে। তখন আমার প্রতিপালক আমাকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, তাদেরকে আমি বের করে দেবো। যেমন তারা তোমাকে বের করে দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধ কর, আমি তোমাকে সাহায্য করবো। তুমি খরচ কর, তোমার উপর খরচ করা হবে। তুমি সৈন্য পাঠিয়ে দাও, আমি আরো পাঁচগুণ সৈন্য পাঠিয়ে দেবো। তুমি তোমার অনুগতদেরকে সাথে নিয়ে নাফরমানদের উপর আক্রমণ চালিয়ে দাও।` জান্নাতীরা তিন প্রকারের হয়ে থাকে। প্রথম প্রকার হলো ন্যায় বিচারক বাদশাহ, যাকে সঙ্কর্মের তাওফীক দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার হলো এমন মেহেরবান সহৃদয় লোক যে প্রত্যেক আত্মীয়ের জন্যেই কোমল। তৃতীয় প্রকার হলো ঐ পাকদামান মুসলমান যে ভিক্ষা বৃত্তি হতে বেঁচে থাকে। অথচ পরিবারস্থ বহু লোকের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত। আর জাহান্নামীরা পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। প্রথম প্রকার হলো ঐ দুর্বল ব্যক্তি যার আকল বা জ্ঞান নেই, সে তোমাদের মধ্যে তোমাদের অনুসারী বা তাবে’ স্বরূপ। তারা (হালাল) স্ত্রী ও (হালাল) মাল তালাশ করে না। দ্বিতীয় প্রকার হলো এমন খিয়ানতকারী যার কোন লাভ তার জন্যে লুক্কায়িত থাকে না, যদিও ছোট হয়, কিন্তু সে খিয়ানত করবেই। তৃতীয় প্রকার হলো ঐ ব্যক্তি যে সকাল বিকাল তোমাকে তোমার পরিবার ও মাল হতে ধোকা দেয়। তারপর তিনি কৃপণতা ও মিথ্যার এবং বদখাসলত অশ্লীলভাষীর উল্লেখ করেন। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে)

মহান আল্লাহ বলেনঃ এটাই সরল দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। তারা অজ্ঞানতার কারণেই আল্লাহর পবিত্র দ্বীন হতে দূরে সরে যায়, ফলে দ্বীন হতে বঞ্চিত হয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার লালসা থাকলেও অধিকাংশ লোক ঈমানদার নয়।” (১২:১০৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যদি তুমি ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থানরত অধিকাংশের অনুসারী হও তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে ভ্রষ্ট করে ফেলবে।” (৬:১১৭)

মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা বিশুদ্ধ চিত্তে তার অভিমুখী হয়ে তাঁকে ভয় কর, তাঁরই দিকে ঝুঁকে থাকে এবং তাঁরই দিকে মনোনিবেশ কর। তোমরা নামায কায়েম কর যা সব থেকে বড় ইবাদত এবং সবচেয়ে বড় আনুগত্য। তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। তোমরা নিখুঁতভাবে তার একত্বে বিশ্বাসী হও। তাকে ছেড়ে তোমার মনোবাসনা অন্যের কাছে পূরণের আশা করো না।

হযরত মুআয (রাঃ)-এর কাছে হযরত উমার (রাঃ) এ আয়াতের অর্থ জানতে চাইলে তিনি বলেনঃ “এগুলো তিনটি জিনিস এবং এগুলোই নাজাতের উপায়। প্রথম হলো আন্তরিকতা, যা হলো ফিত্রাত বা প্রকৃতি, যার উপর আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয় হলো নামায। প্রকৃতপক্ষে এটাই দ্বীন। তৃতীয় হলো ইতাআত বা আনুগত্য। এটাই হলো মানুষের জন্যে রক্ষাকবচ।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আপনি ঠিকই বলেছেন। তাহলে তো আপনাকে মুশরিকদের সাথে মেলামেশা করতে হবে না এবং তাদের কোন কাজে সাহায্য করা চলবে না। তাদের মত কোন কাজই করা যাবে না।`

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা ঐ মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে না যারা নিজেদের দ্বীনকে বদল করে দিয়েছে, কোন কোন কথা মেনে নিয়েছে এবং কোন কোন কথা অস্বীকার করেছে।

(আরবি)-এর দ্বিতীয় পঠন রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ তারা দ্বীনকে ছেড়ে দিয়েছে। যেমন ইয়াহুদী, নাসারা, অগ্নিপূজক, মূর্তিপূজক ও অন্যান্য বাতিল পন্থীরা কার্যতঃ তাদের দ্বীনকে ছেড়ে দিয়েছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “যারা নিজেদের দ্বীনে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও, তাদের বিষয়টি আল্লাহর প্রতি অর্পিত।” (৬:১৫৯)

উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)-এর পূর্বে যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল তারা সবাই বাতিল দ্বীনকে ধারণ করে নিয়েছিল। প্রত্যেক দলই দাবী করতো যে, তারা সত্য দ্বীনের উপর রয়েছে এবং অন্যান্য সব দলই বিপথে আছে। আসলে হক বা সত্য তাদের সব দল হতেই লোপ পেয়েছিল। এই উম্মতের মধ্যেও বিভিন্ন দল সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে একটি দল সত্যের উপর রয়েছে এবং অন্যান্য সব দলই বিভ্রান্ত। এই সত্যপন্থী দলটি হলো আত্মলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত, যারা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-কে ম্যবৃতভাবে ধারণ করে রয়েছে যার উপর সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ীন ও মুসলিম ইমামগণ ছিলেন। পূর্বযুগেও এবং এখনও। যেমন মুসতাদরাকে হাকিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মুক্তিপ্রাপ্ত দলটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ ‘মুক্তিপ্রাপ্ত দল ঐটি যারা ওরই অনুসরণ করবে যার উপর আজ আমি ও আমার সাহাবীগণ রয়েছি।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।