সূরা আর-রুম (আয়াত: 22)
হরকত ছাড়া:
ومن آياته خلق السماوات والأرض واختلاف ألسنتكم وألوانكم إن في ذلك لآيات للعالمين ﴿٢٢﴾
হরকত সহ:
وَ مِنْ اٰیٰتِهٖ خَلْقُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ اخْتِلَافُ اَلْسِنَتِکُمْ وَ اَلْوَانِکُمْ ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّلْعٰلِمِیْنَ ﴿۲۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া মিন আ-য়া-তিহী খালকুছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিওয়াখতিলা-ফুআলছিনাতিকুম ওয়া আলওয়া-নিকুম ইন্না ফী যা-লিকা লাআ-য়া-তিল লিল‘আ-লিমীন।
আল বায়ান: আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও তোমাদের বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২. আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্ৰ্য। এতে তো অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাঁর নিদর্শনের মধ্যে হল, আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা। জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই এতে আছে বহু নিদর্শন।
আহসানুল বায়ান: (২২) তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শনঃ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা।[1] এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।
মুজিবুর রহমান: এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।
ফযলুর রহমান: তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে আরেকটি হল আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা। এর মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।
মুহিউদ্দিন খান: তাঁর আর ও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।
জহুরুল হক: আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে হচ্ছে মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি, আর তোমাদের ভাষা ও তোমাদের বর্ণের বৈচিত্র। নিঃসন্দেহ এতে তো নিদর্শনাবলী রয়েছে জ্ঞানী লোকদের জন্য।
Sahih International: And of His signs is the creation of the heavens and the earth and the diversity of your languages and your colors. Indeed in that are signs for those of knowledge.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২২. আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্ৰ্য। এতে তো অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।(১)
তাফসীর:
(১) আল্লাহর কুদরতের তৃতীয় নিদর্শনঃ তৃতীয় নিদর্শন হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবী সৃজন, বিভিন্ন স্তরের মানুষের বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি এবং বিভিন্ন স্তরের বর্ণবৈষম্য; যেমন কোন স্তর শ্বেতকায়, কেউ কৃষ্ণকায়, কেউ লালচে এবং কেউ হলদে। এখানে আকাশ ও পৃথিবী সৃজন তো শক্তির মহানিদর্শন বটেই, মানুষের ভাষার বিভিন্নতাও আল্লাহর বিস্ময়কর ব্যাপার। ভাষার বিভিন্নতার মধ্যে অভিধানের বিভিন্নতাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরবী ফারসী, হিন্দী, তুর্কী, ইংরেজী ইত্যাদি কত বিভিন্ন ভাষা আছে। এগুলো বিভিন্ন ভূ-খণ্ডে প্রচলিত। তন্মধ্যে কোন কোন ভাষা পরস্পর এত ভিন্নরূপ যে, এদের মধ্যে পারস্পরিক কোন সম্পর্ক আছে বলেই মনে হয় না। স্বর ও উচ্চারণভঙ্গির বিভিন্নতাও ভাষার বিভিন্নতার মধ্যে শামিল। [দেখুন: কুরতুবী; ইবন কাসীর]
আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক পুরুষ, নারী বালক ও বৃদ্ধের কণ্ঠস্বরে এমন স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করেছেন যে, একজনের কণ্ঠস্বর অন্য জনের কণ্ঠস্বরের সাথে পুরোপুরি মিল রাখে না। কিছু না কিছু পার্থক্য অবশ্যই থাকে। অথচ এই কণ্ঠস্বরের যন্ত্রপাতি তথা জিহবা, ঠোঁট, তালু ও কণ্ঠনালী সবার মধ্যেই অভিন্ন ও একরূপ। [সা’দী] এমনিভাবে বর্ণ-বৈষম্যের কথা বলা যায়। একই পিতা-মাতা থেকে একই প্রকার অবস্থায় দুই সন্তান বিভিন্ন বর্ণের জন্মগ্রহণ করে। এ হচ্ছে সৃষ্টি ও কারিগরির নৈপুণ্য। [ফাতহুল কাদীর; বাগভী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২২) তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শনঃ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা।[1] এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।
তাফসীর:
[1] পৃথিবীতে নানা ভাষা সৃষ্টিও আল্লাহর কুদরতের এক মহানিদর্শন। আরবী, তুর্কী, ইংরেজী, উর্দু, হিন্দী, পশতু, ফারসী, সিন্ধী, বেলুচী, ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষা রয়েছে পৃথিবীতে। আবার প্রত্যেক ভাষার ভাব ও উচ্চারণভঙ্গীর (আঞ্চলিক) বিভিন্নতা আছে। সহস্র ও লক্ষ মানুষের মাঝেও একজন মানুষকে তার ভাষা ও উচ্চারণভঙ্গী দ্বারা চিনতে পারা যায় যে, এ ব্যক্তি অমুক দেশের বা অমুক এলাকার। শুধু ভাষাই তার পূর্ণ পরিচয় বলে দেয়। অনুরূপভাবে একই পিতা-মাতা (আদম ও হাওয়া) থেকে জন্মলাভের পরেও রঙ ও বর্ণে এক অপর থেকে পৃথক। কেউ কৃষ্ণকায়, কেউ শ্বেতকায়, কেউ নীলবর্ণের, আবার কেউ শ্যাম ও গৌরবর্ণের। অতঃপর কালো-সাদার মাঝেও এত স্তর রয়েছে যে, অধিকাংশ মানুষ এই দুই রঙে বিভক্ত হয়েও অনেক ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে এবং এক অপর থেকে একেবারেই ভিন্ন ও পৃথক মনে হয়। অতঃপর মানুষের চেহারার আকারও শ্রী, শরীরের গঠন এবং উচ্চতাতেও এমন পার্থক্য রাখা হয়েছে যে, বিভিন্ন দেশের মানুষকে আলাদাভাবে সহজেই চেনা যায়। একজন অপরজনের সাথে কোন মিল নেই; এমনকি সহোদর ভাই আপন ভাই থেকে আলাদা। এ সত্ত্বেও আল্লাহর কুদরতের পরিপূর্ণতা এই যে, কোন এক দেশের বসবাসকারী অন্য দেশের বসবাসকারী থেকে পৃথক হয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২১-২৫ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলার আটটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের বিষদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
প্রথম নিদর্শন হল:
আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর মানবাকৃতিতে পৃথিবীতে তাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আদম (عليه السلام)-কে একমুষ্টি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা সমস্ত জমিন থেকে নিয়েছেন। ফলে আদম সন্তান সে মাটি অনুপাতেই। কেউ ফর্সা, কেউ লাল, কেউ কাল এবং কেউ উভয়ের মিশ্রিত বর্ণে। কেউ ভাল স্বভাবের, কেউ মন্দ স্বভাবের আবার কেউ উভয়ের মাঝামাঝি স্বভাবের। (তিরমিযী হা: ২৯৫৫, সহীহ)
এ সৃষ্টি সম্পর্কে সূরা হাজ্জের ৫ নং আয়াতে, সূরা ত্বহার ৫৫ নং এবং সূরা মু’মিনের ১২-১৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা পুরুষদের মধ্য থেকেই তাদের জীবনসঙ্গিণী স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন। আরবিতে زوج এর অর্থ হলো সঙ্গী বা জোড়া। অতএব পুরুষ নারীর ও নারী পুরুষের সঙ্গী বা জোড়া। নারীদেরকে পুরুষদের মধ্য হতেই সৃষ্টি করার অর্থ হলো পৃথিবীর প্রথম নারী মা হাওয়াকে আদম (عليه السلام)-এর বাম পার্শ্বের (পাঁজরের) হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর তাদের দুজন হতে মানুষের জন্মের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন। তারপর আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রীর মাঝে এমন একটি উপকরণ রেখে দিয়েছেন যখন স্বামী তার স্ত্রীর কাছে গমন করে তখন তার কাছে শান্তি পায়। আর উভয়ের মাঝে এমন ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন যা পৃথিবীর অন্য কোন দুই ব্যক্তির মাঝে লক্ষ্য করা যায় না। বলা বাহুল্য, মানুষ এ শান্তি ও অগাধ প্রেম ভালবাসা সে দাম্পত্যের মাঝে লাভ করতে পারে যার সম্পর্কের ভিত্তি শরীয়তসম্মত বিবাহের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পরন্তু ইসলাম একমাত্র বিবাহসূত্রের মাধ্যমেই আবদ্ধ দম্পতিকেই জোড়া বলে স্বীকার করে। অন্যথায় শরীয়ত বিরোধী দাম্পত্যের (লিভ টুগেদার) সম্পর্ককে ইসলাম জোড়া বলে স্বীকার করে না। বরং তাদেরকে ব্যভিচারী আখ্যায়িত করে এবং তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান প্রদান করেছে।
তৃতীয় নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা আকাশমণ্ডলী ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সুসজ্জিত করেছেন। চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। এগুলো পৃথিবীতে আলো প্রদান করে থাকে। পক্ষান্তরে পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পাহাড়-পর্বত, প্রশস্ত মাঠ, বন-জঙ্গল, নদী-নালা, সাগর-উপসাগর। উঁচু উঁচু টিলা, পাথর, বড় বড় গাছ ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন যা আল্লাহ তা‘আলার পূর্ণ ক্ষমতার নিদর্শন।
চতুর্থ নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে মাত্র দুজন মানুষ আদম ও হাওয়া (عليه السلام) থেকে সৃষ্টি করার পরও তাদের মধ্যে ভাষার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। কেউ কথা বলে বাংলায়, কেউ আরবি, কেউ উর্দু-ফারসি, হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি ভাষায়। এমনকি একই মানব থেকে সৃষ্টি হওয়ার পরও তাদের আকৃতি ও বর্ণ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কেউ কাল, কেউ শ্যামলা বর্ণের আবার কেউ সাদা বর্ণের। কারো সাথে কারো কোন প্রকারের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি কখনো কখনো সহোদর ভাইয়ের সাথেও কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এগুলো স্পষ্টভাবে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমতার ওপর প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللّٰهَ أَنْزَلَ مِنَ السَّمَا۬ءِ مَا۬ءً ج فَأَخْرَجْنَا بِه۪ ثَمَرٰتٍ مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُهَا ط وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌۭبِيْضٌ وَّحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيْبُ سُوْدٌ)
“তুমি কি লক্ষ্য করনি? আল্লাহ আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। তারপর আমি তা দিয়ে নানা বর্ণের ফলমূল উৎপন্ন করি। আর পর্বতমালারও রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথন সাদা, লাল ও ঘোর কাল।” (সূরা ফাতির ৩৫:২৭)
পঞ্চম নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা মানুষের নিদ্রা ও জীবিকা অন্বেষণ করার জন্য রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন এবং এসব অন্বেষণ করার মাধ্যমে যেন আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ বা দয়া কামনা করে। এ সম্পর্কে সূরা বানী ইসরাঈলের ১২ নং আয়াতসহ অন্যান্য আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
ষষ্ঠ নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে বিজলী দ্বারা বিদ্যুৎ প্রদর্শন করেন ভয় ও আশা সঞ্চারকরূপে। এ সম্পর্কে সূরা রা‘দের ১২ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
সপ্তম নিদর্শন:
সপ্তম নিদর্শন হল, আল্লাহ তা‘আলা আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে মৃত ভূমিকে জীবিত করেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاٰیَةٌ لَّھُمُ الْاَرْضُ الْمَیْتَةُﺊ اَحْیَیْنٰھَا وَاَخْرَجْنَا مِنْھَا حَبًّا فَمِنْھُ یَاْکُلُوْنَﭰ وَجَعَلْنَا فِیْھَا جَنّٰتٍ مِّنْ نَّخِیْلٍ وَّاَعْنَابٍ وَّفَجَّرْنَا فِیْھَا مِنَ الْعُیُوْنِﭱﺫ)
“আর তাদের জন্য একটি নিদর্শন মৃত জমিন। আমি তাকে সজীব করি এবং তা থেকে উৎপন্ন করি শস্য, ফলে তা থেকে তারা খেয়ে থাকে। আমি তাতে সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান এবং প্রবাহিত করি তাতে ঝরণাধারা।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৩-৩৪) এখানে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন হল-মৃত জমিনকে বৃষ্টির পানি দ্বারা যেমন জীবিত করা হয় তেমনি আল্লাহ তা‘আলা মানুষের কর্মের হিসাব নেয়ার জন্য পুনরুত্থিত করবেন।
অষ্টম নিদর্শন:
ল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে আকাশ ও জমিন স্থিতিশীল রয়েছে। আমরা জানি প্রথমে জমিন কম্পিত হচ্ছিল, তারপর আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে পাহাড় বদ্ধমূল করে দিলেন। ফলে জমিন স্থিতিশীল হয়েছে । আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللّٰهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ وَالْفُلْكَ تَجْرِيْ فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِه۪ ط وَيُمْسِكُ السَّمَا۬ءَ أَنْ تَقَعَ عَلَي الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِه۪ ط إِنَّ اللّٰهَ بِالنَّاسِ لَرَؤُوْفٌ رَّحِيْمٌ)
“তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন পৃথিবীতে যা কিছু আছে তৎসমুদয়কে এবং তাঁর নির্দেশে সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহকে? আর তিনিই আকাশকে স্থির রাখেন যাতে তা পতিত না হয় পৃথিবীর ওপর তাঁর অনুমতি ব্যতীত। আল্লাহ নিশ্চয়ই মানুষের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (সূরা হাজ্জ ২২:৬৫) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ يُمْسِكُ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُوْلَا ﹰ وَلَئِنْ زَالَتَآ إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ أَحَدٍ مِّنْۭ بَعْدِه۪ط إِنَّه۫ كَانَ حَلِيْمًا غَفُوْرًا)
“নিশ্চয়ই আল্লাহই আসমান ও জমিনকে স্থির রাখেন, যাতে তা টলে না যায়। যদি এরা টলে যায় তবে তিনি ছাড়া কে এদেরকে স্থির রাখবে? তিনি অতিশয় সহনশীল, পরম ক্ষমাশীল।” (সূরা ফাতির ৩৫:৪১)
(ثُمَّ إِذَا دَعَاكُمْ دَعْوَةً)
অর্থাৎ যখন তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে উঠানোর জন্য একবার আহ্বান করবেন তথা শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন সকলেই সেখান থেকে উঠে আল্লাহ তা‘আলার দিকে ছুটে আসবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(يَوْمَ يَدْعُوْكُمْ فَتَسْتَجِيْبُوْنَ بِحَمْدِه۪ وَتَظُنُّوْنَ إِنْ لَّبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيْلًا)
‘যেদিন তিনি তোমাদেরকে আহ্বান করবেন, এবং তোমরা তাঁর প্রশংসার সাথে তাঁর আহ্বানে সাড়া দেবে এবং তোমরা মনে করবে, তোমরা অল্প সময়ই (দুনিয়াতে) অবস্থান করেছিলে।’ (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৫২)
অতএব মানুষ আল্লাহ তা‘আলার এ সকল নিদর্শন বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক সর্বশেষে তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা সম্মুখেই উপস্থিত হতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
২. মানুষ সৃষ্টির মূল উপাদান হল মাটি, অতঃপর পিতা-মাতার মিলনে সৃষ্টির পরম্পরা বহাল রয়েছে।
৩. জীবন ও মৃত্যু সকল কিছুর ক্ষমতা আল্লাহ তা‘আলারই হাতে।
৪. ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষের বন্ধনকে স্বীকার করে কিন্তু লিভ-টুগেদারকে স্বীকার করে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর
এখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর মহাশক্তির নিদর্শন বর্ণনা করছেন। এ মহা প্রশস্ত আকাশের সৃষ্টি এবং তা তারকামণ্ডলী দ্বারা সুসজ্জিতকরণ, এগুলোর চাকচিক্য, এগুলোর মধ্যে কিছু কিছু আবর্তনশীল, কোন কোনটি একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে থাকে, পৃথিবীকে একটি মযবূত রূপদান করে সৃষ্টি করা, তাতে ঘনঘন বৃক্ষরাজি সষ্টি করা, তাতে পাহাড়-পর্বত, প্রশস্ত মাঠ, বন-জঙ্গল, নদ-নদী, সাগর-উপসাগর, উঁচু উঁচু টিলা, পাথর, বড় বড় গাছ ইত্যাদি সৃষ্টি করা, মানুষের ভাষা ও রং-এর বিভিন্নতা, আরবের ভাষা তাতারীরা বুঝে না, কুর্দিদের ভাষা রোমকরা বুঝে না, ইংরেজদের ভাষা তুর্কিরা বুঝে না, বার্বারদের ভাষা হাবশীরা বুঝতে পারে না, ভারতীয়দের ভাষা ইরাকীরা বুঝে না, ইনতাকালিয়া, আরমানিয়া, জাযীরিয়া ইত্যাদি, আল্লাহ জানেন আরো কত ভাষা আছে যা আদম সন্তানরা বলে থাকে। এগুলো বিশ্ব প্রতিপালকের মহাশক্তির নিদর্শন নয় কি?” ভাষার বিভিন্নতার পরে আসে রঙ-এর পার্থক্য। এগুলো নিঃসন্দেহে আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতার বিকাশ ও অসীম শক্তির নিদর্শন।
একটু চিন্তা-গবেষণা করলেই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়তে হবে যে, কোথাও হয়তো লক্ষ লক্ষ লোক একত্রিত হলো। সবাই একই বংশের, একই গোত্রের, একই দেশের এবং একই ভাষাভাষী লোক হতে পারে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোন দিক দিয়েই কোন পার্থক্য থাকবে না এটা সম্ভব নয়। অথচ মানবীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হিসেবে তাদের মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। সবারই দু’টি চক্ষু, দু’টি পলক, একটি নাক, দু’টি কান, একটি কপাল, একটি মুখ, দু’টি ঠোট, দু’টি গণ্ড ইত্যাদি রয়েছে। এতদসত্ত্বেও একজন অপরজন হতে পৃথক। কোন না কোন এমন গুণ বা বিশেষণ রয়েছে যদ্দ্বারা একজনকে অপরজন হতে অবশ্যই পৃথক করা যাবে। যেমন গাম্ভীর্য, স্বভাব-চরিত্র, কথাবার্তা বলার ভঙ্গিমা ইত্যাদি সবারই একরূপ নয়। যদিও তা কোন কোন সময় গুপ্ত ও হালকা হয়ে থাকে। কেউ খুবই সুন্দর, কেউ বদমেজাযী, সুতরাং রূপ ও আকারে একই মনে হলেও ভালভাবে লক্ষ্য করলে পার্থক্য পরিলক্ষিত হবেই। হয়তো প্রত্যেকেই জ্ঞানী, বড় শক্তিশালী, বড় কারিগর, কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাদের কীর্তিকলাপের মাধ্যমে তাদেরকে পৃথক করা যাবেই।
নিদ্রা কুদরতের একটি নিদর্শন। এর দ্বারা মানুষ তার ক্লান্তি দূর করে থাকে। এবং আরাম ও শান্তি লাভ করে। এজন্যেই পরম করুণাময় আল্লাহ রাত্রির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আবার কাজ কামের জন্যে, দুনিয়ার লাভালাভের জন্যে, আয়-উপার্জনের, জীবিকা অনুসন্ধানের জন্যে মহামহিমান্বিত আল্লাহ দিবস বানিয়েছেন। দিবস রজনীর সম্পূর্ণ বিপরীত। অবশ্যই জ্ঞানী-বুদ্ধিমানদের জন্যে এগুলো আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ ক্ষমতার বড় নিদর্শন।
হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাত্রে আমার ঘুম হতো না। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এটা বললাম। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি নিম্নের দু'আটি পাঠ করবেঃ (আরবি)
আমি দুআটি পড়তে থাকলাম। তখন আমার অসুখ সেরে গেলো এবং নিদ্রা হতে লাগলো।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।