সূরা আর-রুম (আয়াত: 21)
হরকত ছাড়া:
ومن آياته أن خلق لكم من أنفسكم أزواجا لتسكنوا إليها وجعل بينكم مودة ورحمة إن في ذلك لآيات لقوم يتفكرون ﴿٢١﴾
হরকত সহ:
وَ مِنْ اٰیٰتِهٖۤ اَنْ خَلَقَ لَکُمْ مِّنْ اَنْفُسِکُمْ اَزْوَاجًا لِّتَسْکُنُوْۤا اِلَیْهَا وَ جَعَلَ بَیْنَکُمْ مَّوَدَّۃً وَّ رَحْمَۃً ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یَّتَفَکَّرُوْنَ ﴿۲۱﴾
উচ্চারণ: ওয়া মিন আ-য়া-তিহী আন খালাকা লাকুম মিন আনফুছিকুম আযওয়া-জাল লিতাছকুনূ ইলাইহা ওয়াজা‘আলা বাইনাকুম মাওয়াদ্দাতাওঁ ওয়া রাহমাতান ইন্না ফী যা-লিকা লাআয়া-তিল লিকাওমিইঁ ইয়াতাফাক্কারূন।
আল বায়ান: আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১. আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া(১); যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও(২) এবং সৃজন করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও সহমর্মিতা। নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে সে সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাঁর নিদর্শনের মধ্যে হল এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিণী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তার কাছে শান্তি লাভ করতে পার আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এর মাঝে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।
আহসানুল বায়ান: (২১) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন,[1] যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও[2] এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন।[3] চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।
মুজিবুর রহমান: এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে যাতে তোমরা তাদের সাথে শান্তিতে বাস করতে পার এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।
ফযলুর রহমান: তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে আরেকটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও। তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সমপ্রীতি ও দয়াও সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এর মধ্যে চিন্তাশীল লোকদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।
মুহিউদ্দিন খান: আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।
জহুরুল হক: আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে হচ্ছে যে তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন যুগলদের, যেন তোমরা তাদের মধ্যে স্বস্তি পেতে পার, আর তিনি তোমাদের মধ্যে প্রেম ও করুণা সৃষ্টি করেছেন। নিঃসন্দেহ এতে তো নিদর্শনাবলী রয়েছে সেই লোকদের জন্য যারা চিন্তা করে।
Sahih International: And of His signs is that He created for you from yourselves mates that you may find tranquillity in them; and He placed between you affection and mercy. Indeed in that are signs for a people who give thought.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২১. আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া(১); যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও(২) এবং সৃজন করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও সহমর্মিতা। নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে সে সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।(৩)
তাফসীর:
(১) আল্লাহর কুদরতের দ্বিতীয় নিদর্শনঃ দ্বিতীয় নিদর্শন এই যে, মানুষের মধ্য থেকে আল্লাহ তাআলা নারী জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তারা পুরুষের সংগিনী হয়েছে। [ইবন কাসীর] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখবে সে যেন তার পড়শীকে কষ্ট না দেয়। আর তোমরা মহিলাদের প্রতি কল্যাণকর হওয়ার ব্যাপারে পরস্পরকে উপদেশ দাও; কেননা তারা বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বাঁকা অংশ হচ্ছে হাড়ের উপরের অংশ। যদি তুমি তাকে সোজা করতে যাও তবে তা ভেঙ্গে ফেলবে। পক্ষান্তরে যদি তুমি ছেড়ে যাও তবে সব সময় বাঁকাই থেকে যাবে। সুতরাং তোমরা মহিলাদের প্রতি কল্যাণকর হওয়ার ব্যাপারে পরস্পরকে উপদেশ দাও। [বুখারী: ৫১৮৫, ৫১৮৬]
(২) ইবন কাসীর বলেন, এর অর্থ তোমাদের স্বজাতি থেকে তোমাদের জন্য স্ত্রীর ব্যবস্থা করেছেন। যাতে তোমাদের মধ্যে প্রশান্তি আসে। যেমন অন্য আয়াতে বলেছেন, “তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।” [সূরা আল-আরাফ: ১৮৯]
(৩) এখানে নারী জাতি সৃষ্টি করার রহস্য ও উপকারিতা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ অর্থাৎ তোমরা তাদের কাছে পৌঁছে শান্তি লাভ কর, এ কারণেই তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পুরুষদের যত প্রয়োজন নারীর সাথে সম্পৃক্ত সবগুলো সম্পর্কে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, সবগুলোর সারমর্ম হচ্ছে মানসিক শান্তি ও সুখ। [আদওয়াউল বায়ান; সাদী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২১) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন,[1] যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও[2] এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন।[3] চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ তোমাদেরই মধ্যে থেকে নারী জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে তারা তোমাদের স্ত্রী হয় এবং তোমরা এক অপরের সঙ্গী বা জোড়া জোড়া হয়ে যাও। আরবীতে زَوج এর অর্থ হল সঙ্গী বা জোড়া। অতএব পুরুষ নারীর ও নারী পুরুষের সঙ্গী বা জোড়া। নারীদেরকে পুরুষদের মধ্য হতেই সৃষ্টি করার অর্থ হল, পৃথিবীর প্রথম নারী মা হাওয়াকে আদম (আঃ)-এর বাম পার্শেবর (পাঁজরের) হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর তাঁদের দুই জন হতে মানুষের জন্মের (স্বাভাবিক) ধারাবাহিকতা আরম্ভ হয়েছে।
[2] অর্থাৎ, যদি পুরুষ ও নারী আলাদা আলাদা বস্তু হতে সৃষ্টি হত; যেমন যদি নারী জ্বিন অথবা চতুষ্পদ জন্তু থেকে সৃষ্টি হত, তাহলে তাদের উভয়ের একই বস্তু হতে সৃষ্টি হওয়াতে যে সুখ-শান্তি পাওয়া যায় তা কখনই পাওয়া সম্ভব হত না। বরং এক অপরকে অপছন্দ করত ও জন্তু জানোয়ারের ন্যায় ব্যবহার করত। সুতরাং মানুষের প্রতি আল্লাহর অশেষ দয়া যে, তিনি মানুষের জুড়ি ও সঙ্গিনী মানুষকেই বানিয়েছেন।
[3] مَوَدَّة এর অর্থ হল স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সুমধুর ভালবাসা যা সাধারণত পরিলক্ষিত হয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যেরূপ ভালবাসা সৃষ্টি হয় অনুরূপ ভালবাসা পৃথিবীর অন্য কোন দুই ব্যক্তির মাঝে হয় না। আর رَحمَة (মায়া-মমতা) হল এই যে, স্বামী নিজ স্ত্রীকে সর্বপ্রকার সুখ-সুবিধা ও আরাম-আয়েশ দান করে থাকে। অনুরূপ স্ত্রীও নিজের সাধ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী স্বামীর সেবা করে থাকে। মহান আল্লাহ উভয়ের উপরেই সে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন। বলা বাহুল্য, মানুষ এই শান্তি ও অগাধ প্রেম-ভালবাসা সেই দাম্পত্যের মাধ্যমেই লাভ করতে পারে যার সম্পর্কের ভিত্তি শরীয়তসম্মত বিবাহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। পরন্তু ইসলাম একমাত্র বিবাহসূত্রের মাধ্যমেই সম্পৃক্ত দম্পতিকেই জোড়া বলে স্বীকার করে। অন্যথায় শরীয়ত-বিরোধী দাম্পত্যের (লিভ টুগেদারের) সম্পর্ককে ইসলাম জোড়া বলে স্বীকার করে না। বরং তাদেরকে ব্যভিচারী আখ্যায়িত করে এবং তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান প্রয়োগ করে। আজকাল পাশ্চাত্য সভ্যতার পতাকাবাহী শয়তানরা এই নোংরা প্রচেষ্টায় লিপ্ত যে, পাশ্চাত্য সমাজের মত ইসলামী দেশেও বিবাহকে অপ্রয়োজনীয় স্বীকার করে অনুরূপ (অবৈধ প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ লিভ টুগেদারের) নারী-পুরুষকে জোড়া, যুগল বা দম্পতি (COUPLE) হিসেবে মেনে নেওয়া হোক এবং তাদের জন্য শাস্তির পরিবর্তে ঐ সকল অধিকার দেওয়া ও মেনে নেওয়া হোক, যে অধিকার একজন শরীয়তসম্মত দম্পতি পেয়ে থাকে! (আল্লাহ তাদেরকে সর্বত্রই ধ্বংস করেন।)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২১-২৫ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলার আটটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের বিষদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
প্রথম নিদর্শন হল:
আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর মানবাকৃতিতে পৃথিবীতে তাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আদম (عليه السلام)-কে একমুষ্টি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা সমস্ত জমিন থেকে নিয়েছেন। ফলে আদম সন্তান সে মাটি অনুপাতেই। কেউ ফর্সা, কেউ লাল, কেউ কাল এবং কেউ উভয়ের মিশ্রিত বর্ণে। কেউ ভাল স্বভাবের, কেউ মন্দ স্বভাবের আবার কেউ উভয়ের মাঝামাঝি স্বভাবের। (তিরমিযী হা: ২৯৫৫, সহীহ)
এ সৃষ্টি সম্পর্কে সূরা হাজ্জের ৫ নং আয়াতে, সূরা ত্বহার ৫৫ নং এবং সূরা মু’মিনের ১২-১৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা পুরুষদের মধ্য থেকেই তাদের জীবনসঙ্গিণী স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন। আরবিতে زوج এর অর্থ হলো সঙ্গী বা জোড়া। অতএব পুরুষ নারীর ও নারী পুরুষের সঙ্গী বা জোড়া। নারীদেরকে পুরুষদের মধ্য হতেই সৃষ্টি করার অর্থ হলো পৃথিবীর প্রথম নারী মা হাওয়াকে আদম (عليه السلام)-এর বাম পার্শ্বের (পাঁজরের) হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর তাদের দুজন হতে মানুষের জন্মের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন। তারপর আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রীর মাঝে এমন একটি উপকরণ রেখে দিয়েছেন যখন স্বামী তার স্ত্রীর কাছে গমন করে তখন তার কাছে শান্তি পায়। আর উভয়ের মাঝে এমন ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন যা পৃথিবীর অন্য কোন দুই ব্যক্তির মাঝে লক্ষ্য করা যায় না। বলা বাহুল্য, মানুষ এ শান্তি ও অগাধ প্রেম ভালবাসা সে দাম্পত্যের মাঝে লাভ করতে পারে যার সম্পর্কের ভিত্তি শরীয়তসম্মত বিবাহের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পরন্তু ইসলাম একমাত্র বিবাহসূত্রের মাধ্যমেই আবদ্ধ দম্পতিকেই জোড়া বলে স্বীকার করে। অন্যথায় শরীয়ত বিরোধী দাম্পত্যের (লিভ টুগেদার) সম্পর্ককে ইসলাম জোড়া বলে স্বীকার করে না। বরং তাদেরকে ব্যভিচারী আখ্যায়িত করে এবং তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান প্রদান করেছে।
তৃতীয় নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা আকাশমণ্ডলী ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সুসজ্জিত করেছেন। চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। এগুলো পৃথিবীতে আলো প্রদান করে থাকে। পক্ষান্তরে পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পাহাড়-পর্বত, প্রশস্ত মাঠ, বন-জঙ্গল, নদী-নালা, সাগর-উপসাগর। উঁচু উঁচু টিলা, পাথর, বড় বড় গাছ ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন যা আল্লাহ তা‘আলার পূর্ণ ক্ষমতার নিদর্শন।
চতুর্থ নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে মাত্র দুজন মানুষ আদম ও হাওয়া (عليه السلام) থেকে সৃষ্টি করার পরও তাদের মধ্যে ভাষার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। কেউ কথা বলে বাংলায়, কেউ আরবি, কেউ উর্দু-ফারসি, হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি ভাষায়। এমনকি একই মানব থেকে সৃষ্টি হওয়ার পরও তাদের আকৃতি ও বর্ণ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কেউ কাল, কেউ শ্যামলা বর্ণের আবার কেউ সাদা বর্ণের। কারো সাথে কারো কোন প্রকারের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি কখনো কখনো সহোদর ভাইয়ের সাথেও কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এগুলো স্পষ্টভাবে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমতার ওপর প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللّٰهَ أَنْزَلَ مِنَ السَّمَا۬ءِ مَا۬ءً ج فَأَخْرَجْنَا بِه۪ ثَمَرٰتٍ مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُهَا ط وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌۭبِيْضٌ وَّحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيْبُ سُوْدٌ)
“তুমি কি লক্ষ্য করনি? আল্লাহ আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। তারপর আমি তা দিয়ে নানা বর্ণের ফলমূল উৎপন্ন করি। আর পর্বতমালারও রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথন সাদা, লাল ও ঘোর কাল।” (সূরা ফাতির ৩৫:২৭)
পঞ্চম নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা মানুষের নিদ্রা ও জীবিকা অন্বেষণ করার জন্য রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন এবং এসব অন্বেষণ করার মাধ্যমে যেন আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ বা দয়া কামনা করে। এ সম্পর্কে সূরা বানী ইসরাঈলের ১২ নং আয়াতসহ অন্যান্য আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
ষষ্ঠ নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে বিজলী দ্বারা বিদ্যুৎ প্রদর্শন করেন ভয় ও আশা সঞ্চারকরূপে। এ সম্পর্কে সূরা রা‘দের ১২ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
সপ্তম নিদর্শন:
সপ্তম নিদর্শন হল, আল্লাহ তা‘আলা আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে মৃত ভূমিকে জীবিত করেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاٰیَةٌ لَّھُمُ الْاَرْضُ الْمَیْتَةُﺊ اَحْیَیْنٰھَا وَاَخْرَجْنَا مِنْھَا حَبًّا فَمِنْھُ یَاْکُلُوْنَﭰ وَجَعَلْنَا فِیْھَا جَنّٰتٍ مِّنْ نَّخِیْلٍ وَّاَعْنَابٍ وَّفَجَّرْنَا فِیْھَا مِنَ الْعُیُوْنِﭱﺫ)
“আর তাদের জন্য একটি নিদর্শন মৃত জমিন। আমি তাকে সজীব করি এবং তা থেকে উৎপন্ন করি শস্য, ফলে তা থেকে তারা খেয়ে থাকে। আমি তাতে সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান এবং প্রবাহিত করি তাতে ঝরণাধারা।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৩-৩৪) এখানে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন হল-মৃত জমিনকে বৃষ্টির পানি দ্বারা যেমন জীবিত করা হয় তেমনি আল্লাহ তা‘আলা মানুষের কর্মের হিসাব নেয়ার জন্য পুনরুত্থিত করবেন।
অষ্টম নিদর্শন:
ল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে আকাশ ও জমিন স্থিতিশীল রয়েছে। আমরা জানি প্রথমে জমিন কম্পিত হচ্ছিল, তারপর আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে পাহাড় বদ্ধমূল করে দিলেন। ফলে জমিন স্থিতিশীল হয়েছে । আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللّٰهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ وَالْفُلْكَ تَجْرِيْ فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِه۪ ط وَيُمْسِكُ السَّمَا۬ءَ أَنْ تَقَعَ عَلَي الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِه۪ ط إِنَّ اللّٰهَ بِالنَّاسِ لَرَؤُوْفٌ رَّحِيْمٌ)
“তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন পৃথিবীতে যা কিছু আছে তৎসমুদয়কে এবং তাঁর নির্দেশে সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহকে? আর তিনিই আকাশকে স্থির রাখেন যাতে তা পতিত না হয় পৃথিবীর ওপর তাঁর অনুমতি ব্যতীত। আল্লাহ নিশ্চয়ই মানুষের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (সূরা হাজ্জ ২২:৬৫) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ يُمْسِكُ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُوْلَا ﹰ وَلَئِنْ زَالَتَآ إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ أَحَدٍ مِّنْۭ بَعْدِه۪ط إِنَّه۫ كَانَ حَلِيْمًا غَفُوْرًا)
“নিশ্চয়ই আল্লাহই আসমান ও জমিনকে স্থির রাখেন, যাতে তা টলে না যায়। যদি এরা টলে যায় তবে তিনি ছাড়া কে এদেরকে স্থির রাখবে? তিনি অতিশয় সহনশীল, পরম ক্ষমাশীল।” (সূরা ফাতির ৩৫:৪১)
(ثُمَّ إِذَا دَعَاكُمْ دَعْوَةً)
অর্থাৎ যখন তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে উঠানোর জন্য একবার আহ্বান করবেন তথা শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন সকলেই সেখান থেকে উঠে আল্লাহ তা‘আলার দিকে ছুটে আসবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(يَوْمَ يَدْعُوْكُمْ فَتَسْتَجِيْبُوْنَ بِحَمْدِه۪ وَتَظُنُّوْنَ إِنْ لَّبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيْلًا)
‘যেদিন তিনি তোমাদেরকে আহ্বান করবেন, এবং তোমরা তাঁর প্রশংসার সাথে তাঁর আহ্বানে সাড়া দেবে এবং তোমরা মনে করবে, তোমরা অল্প সময়ই (দুনিয়াতে) অবস্থান করেছিলে।’ (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৫২)
অতএব মানুষ আল্লাহ তা‘আলার এ সকল নিদর্শন বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক সর্বশেষে তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা সম্মুখেই উপস্থিত হতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
২. মানুষ সৃষ্টির মূল উপাদান হল মাটি, অতঃপর পিতা-মাতার মিলনে সৃষ্টির পরম্পরা বহাল রয়েছে।
৩. জীবন ও মৃত্যু সকল কিছুর ক্ষমতা আল্লাহ তা‘আলারই হাতে।
৪. ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষের বন্ধনকে স্বীকার করে কিন্তু লিভ-টুগেদারকে স্বীকার করে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২০-২১ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাঁর ক্ষমতার নিদর্শন অনেক রয়েছে। নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি নিদর্শন এই যে, তিনি মানব জাতির পিতা হযরত আদম (আঃ)-কে মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর সমগ্র মানব জাতিকে তিনি সৃষ্টি করেছেন একবিন্দু অপবিত্র পানি (বীর্য) দ্বারা। অতঃপর মানুষকে তিনি খুবই সুদর্শন করে তুলেছেন। শুক্রকে তিনি জমাট রক্তে, অতঃপর গোশতে পরিণত করেছেন ও তার উপর অস্থি তৈরী করেছেন। আর অস্থিগুলোকে তিনি গোশতের আবরণ দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। তারপর তিনি তাতে রূহ ফুকে দিয়েছেন। এরপর নাসিকা, কর্ণ, চক্ষু সৃষ্টি করেছেন এবং মায়ের পেট হতে নিরাপদে বের করে এনেছেন। অতঃপর দুর্বলতা দূর করে দিয়ে সবলতা প্রদান করেছেন। দিন দিন শক্তিকে আরো মযবূত করেছেন। বেশ ক্ষমতাবান করে গড়ে তুলেছেন। আয়ু দান করেছেন এবং নড়াচড়া করার ও আরামের শক্তি দিয়েছেন। নানা প্রকার উপকরণ ও শারীরিক কলকজা দান করেছেন। তাদেরকে তিনি আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা করেছেন। এখান থেকে সেখানে এবং সেখান থেকে এখানে আসার শক্তি যুগিয়েছেন।
সাগরের পানিতে, মাটির উপরে ঘুরে বেড়াবার জন্যে নানা প্রকার। আরোহণযোগ্য যন্ত্র ও জন্তুর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বিদ্যা, বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি, প্রচেষ্টা চালাবার ক্ষমতা, ধ্যান, গবেষণা ইত্যাদির জন্যে মস্তিষ্ক দান করেছেন। তিনি পার্থিব কাজ কারবার বুঝবার ক্ষমতা দিয়েছেন। আখিরাতে পরিত্রাণ লাভের জ্ঞান দান করেছেন এবং আমল শিখিয়েছেন। পবিত্রময় ঐ আল্লাহ যিনি মানব জাতিকে প্রত্যেক কাজের অনুমান করার শক্তি দিয়েছেন, প্রত্যেককে এক এক মর্যাদায় রেখেছেন। দৈহিক গঠন ও আকৃতি, কথাবার্তা, ধনী-নির্ধন, জ্ঞানী-অজ্ঞান, ভাল-মন্দ নির্বাচন শক্তি, দয়া-দাক্ষিণ্য, দানশীলতা ও কার্পণ্য ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে প্রত্যেককে পৃথক পৃথক করেছেন। যাতে প্রত্যেকে মহান প্রতিপালকের বহু নিদর্শন নিজের মধ্যে ও অন্যের মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে দেখে নিতে পারে।
হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সমগ্র পৃথিবী হতে এক মুষ্টি মাটি নিয়ে তা দিয়ে হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন। অতএব পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের মাটির রঙ এর ন্যায় মানুষের রঙ হয়ে থাকে। কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ লাল, কেউ অত্যন্ত খারাপ স্বভাবের, কেউ অত্যন্ত ভাল স্বভাবের, কেউ খুব মিশুক, কেউ বদমেজাযী ইত্যাদি নানা প্রকারের হয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন)
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এও রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য হতে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদেরকে একই নফস হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকেই তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।”
আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আঃ)-এর বাম দিকের ক্ষুদ্র বক্ষাস্থি হতে হযরত হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন। অতএব এটা চিন্তার বিষয় যে, যদি মহান আল্লাহ মানুষের সঙ্গিনী মানুষ হতে সৃষ্টি না করে অন্য প্রাণী হতে সৃষ্টি করতেন তবে মানুষ এখন যেমন স্ত্রী নিয়ে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা লাভ করে থাকে তা কখনো লাভ করতে পারতো না। প্রেম ও ভালবাসা শুধুমাত্র একই প্রকারের মৌলিক বস্তু হতে লাভ করা সম্ভব। আল্লাহ পাক স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। স্বামী তো ভালবাসার কারণেই স্ত্রীর দেখা শোনা করে থাকে, তার প্রতি দয়া করে এবং তাকে সদা খেয়ালে রাখে। কারণ তার থেকে তার সন্তান জন্মেছে। তাদের দেখা শোনা তাদের উভয়ের মেলামেশার উপর নির্ভরশীল। মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে অনেক কারণ এনে দিয়েছেন যার ফলে তাদের মধ্যে প্রেম-প্রীতি দৃঢ় হয়েছে। এ কারণেই মানুষ নিজ নিজ জীবন-সঙ্গিনী নিয়ে আরাম ও সুখে জীবন যাপন করছে। এগুলোও রাম্বুল আলামীনের একটা মেহেরবানী এবং তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতার একটা বড় নিদর্শন। সামান্য চিন্তা করলেই এ মহান কীর্তি-কলাপ মানুষের চরম জ্ঞানের মূল দেশে পৌঁছে যায়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।