সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 83)
হরকত ছাড়া:
وإذ أخذنا ميثاق بني إسرائيل لا تعبدون إلا الله وبالوالدين إحسانا وذي القربى واليتامى والمساكين وقولوا للناس حسنا وأقيموا الصلاة وآتوا الزكاة ثم توليتم إلا قليلا منكم وأنتم معرضون ﴿٨٣﴾
হরকত সহ:
وَ اِذْ اَخَذْنَا مِیْثَاقَ بَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ لَا تَعْبُدُوْنَ اِلَّا اللّٰهَ ۟ وَ بِالْوَالِدَیْنِ اِحْسَانًا وَّ ذِی الْقُرْبٰی وَ الْیَتٰمٰی وَ الْمَسٰکِیْنِ وَ قُوْلُوْا لِلنَّاسِ حُسْنًا وَّ اَقِیْمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ ثُمَّ تَوَلَّیْتُمْ اِلَّا قَلِیْلًا مِّنْکُمْ وَ اَنْتُمْ مُّعْرِضُوْنَ ﴿۸۳﴾
উচ্চারণ: ওয়াইযআখাযনা-মীছা-কা বানীইছরাঈলা লা-তা‘ বুদূ না ইল্লাল্লা-হা ওয়া বিলওয়া-লিদাইনি ইহছা-নাওঁ ওয়া যিলকুরবা- ওয়ালইয়াতা-মা-ওয়ালমাছা-কীনি ওয়াকূলূ লিন্না-ছি হুছনাওঁ ওয়া আকীমুসসালা-তা ওয়া আ-তুযযাকা-তা ছু ম্মা তাওয়াল্লাইতুম ইল্লা-কালীলাম মিনকুম ওয়া আনতুম মু‘রিদূন।
আল বায়ান: আর স্মরণ কর, যখন আমি বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করবে না এবং সদাচার করবে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথে। আর মানুষকে উত্তম কথা বল, সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তোমরা সকলে উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিলে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৩. আর স্মরণ কর, যখন আমরা ইসরাঈল-সন্তানদের নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড় আর কারো ইবাদত করবে না, মাতা-পিতা(১), আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও দরিদ্রের(২) সাথে সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে(৩)। আর সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে, তারপর তোমাদের মধ্য হতে কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া(৪) তোমরা সকলেই অবজ্ঞা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর স্মরণ কর, যখন বানী ইসরাঈলের শপথ নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ‘ইবাদাত করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, অনাথ ও দরিদ্রদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে, নামায কায়িম করবে এবং যাকাত দিবে। কিন্তু অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া তোমরা অগ্রাহ্যকারী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে।
আহসানুল বায়ান: ৮৩। আর (স্মরণ কর সেই সময়ের কথা) যখন বনী ইস্রাইলের কাছ থেকে আমি অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন ও দরিদ্রের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে, নামাযকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং যাকাত প্রদান করবে। কিন্তু স্বল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত তোমরা সকলে অগ্রাহ্য ক’রে (এ প্রতিজ্ঞা পালনে) পরাঙ্খমুখ হয়ে গেলে।
মুজিবুর রহমান: আর যখন আমি বানী ইসরাঈল হতে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আর কারও ইবাদাত করবেনা এবং মাতাপিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে ও আত্মীয়দের, পিতৃহীনদের ও মিসকীনদের সঙ্গেও (সদ্ব্যবহার করবে), আর তোমরা লোকের সাথে উত্তমভাবে কথা বলবে এবং সালাত প্রতিষ্ঠিত করবে ও যাকাত প্রদান করবে; অতঃপর তোমাদের মধ্য হতে অল্প সংখ্যক ব্যতীত তোমরা সকলেই বিমুখ হয়েছিলে, যেহেতু তোমরা ছিলে অগ্রাহ্যকারী।
ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন আমি বনী ইসরাঈল থেকে (এই মর্মে) ওয়াদা নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব করবে না; পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, অনাথ (ইয়াতীম) ও অসহায়দের (মিসকীন) সঙ্গে সদয় আচরণ করবে; মানুষকে ভাল কথা বলবে; নামায আদায় করবে ও যাকাত দান করবে। কিন্তু পরে অল্প কিছু লোক ছাড়া তোমরা সবাই (সেই ওয়াদা থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে।
মুহিউদ্দিন খান: যখন আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না, পিতা-মাতা, আত্নীয়-স্বজন, এতীম ও দীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, মানুষকে সৎ কথাবার্তা বলবে, নামায প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দেবে, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী।
জহুরুল হক: আর স্মরণ করো! আমরা ইসরাইলের বংশধরদের থেকে চুক্তি গ্রহণ করেছিলাম -- “তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো উপাসনা করবে না, আর মাতাপিতার প্রতি ভালো ব্যবহার করবে, এবং আত্মীয়স্বজনদের প্রতি, আর এতিমদের প্রতি, আর মিসকিনদের প্রতি, আর লোকদের সাথে ভালোভাবে কথা বলবে, আর নামায কায়েম করবে ও যাকাত আদায় করবে।” তারপর তোমরা তোমাদের অল্প কয়েকজন ছাড়া ফিরে গেলে, আর তোমরা ফিরে যাবার দলের।
Sahih International: And [recall] when We took the covenant from the Children of Israel, [enjoining upon them], "Do not worship except Allah; and to parents do good and to relatives, orphans, and the needy. And speak to people good [words] and establish prayer and give zakah." Then you turned away, except a few of you, and you were refusing.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৩. আর স্মরণ কর, যখন আমরা ইসরাঈল-সন্তানদের নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড় আর কারো ইবাদত করবে না, মাতা-পিতা(১), আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও দরিদ্রের(২) সাথে সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে(৩)। আর সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে, তারপর তোমাদের মধ্য হতে কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া(৪) তোমরা সকলেই অবজ্ঞা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে।
তাফসীর:
১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে কোন আমল সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেন, “সময়মত সালাত আদায় করা”। বললেন, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, “পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার" বললেন, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, “আল্লাহর পথে জিহাদ করা”। [বুখারী ৫২৭, মুসলিম: ৮৫]
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মিসকীন সে নয়, যে এক খাবার বা দুই খাবারের জন্য ঘুরে বেড়ায় বরং মিসকীন হচ্ছে, যার সামর্থ নেই অথচ সে লজ্জায় কারও কাছে চায় না। অথবা মানুষকে আগলে ধরে কোন কিছু চায় না।” [বুখারী: ১৪৭৬, মুসলিম: ১০৩৯]
৩. আয়াতে এমন কথাকে বুঝানো হয়েছে, যা সৌন্দর্যমণ্ডিত। এর অর্থ এই যে, যখন মানুষের সাথে কথা বলবে, নম্রভাবে হাসিমুখে ও খোলামনে বলবে। তবে দ্বীনের ব্যাপারে শৈথিল্য অথবা কারো মনোরঞ্জনের জন্য সত্য গোপন করবে না। কারণ, আল্লাহ্ তা'আলা যখন মূসা ও হারূন আলাইহিমাস সালাম-কে নবুয়ত দান করে ফিরআউনের প্রতি পাঠিয়েছিলেন, তখন এ নির্দেশ দিয়েছিলেন, “তোমরা উভয়েই ফিরআউনকে নরম কথা বলবে।" [সূরা ত্বা-হাঃ ৪৪] আজ যারা অন্যের সাথে কথা বলে, তারা মূসা আলাইহিস সালাম-এর চাইতে উত্তম নয় এবং যার সাথে কথা বলে, সেও ফিরআউন অপেক্ষা বেশী মন্দ বা পাপিষ্ঠ নয়। সুতরাং সবার সাথে সুন্দরভাবে কথা বলা উচিত। হাদীসে এসেছে, “তোমরা সৎকাজের সামান্যতম কিছুকে খাটো করে দেখ না। যদিও তা হয় তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাত করা।” [মুসলিম: ২৬২৬] তাছাড়া মানুষের সাথে সদালাপের অর্থ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে এক বর্ণনায় এসেছে যে, তা হচ্ছে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
৪. অল্প কয়েকজন অর্থ, তারাই যারা তাওরাতের পুরোপুরি অনুসরণ করত, তাওরাত রহিত হওয়ার পূর্বে তারা মূসা আলাইহিস সালাম প্রবর্তিত শরীআতের অনুসারী ছিল এবং তাওরাত রহিত হওয়ার পর ইসলামী শরীআতের অনুসারী হয়ে যায়। আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, একত্ববাদে ঈমান, এবং পিতা-মাতা, আত্মীয় স্বজন, ইয়াতীম বালক-বালিকা ও দীন-দরিদ্রের সেবাযত্ন করা, মানুষের সাথে নম্রভাবে কথাবার্তা বলা, সালাত আদায় করা ও যাকাত দেয়া ইসলামী শরীআতসহ পূর্ববর্তী শরীআতসমূহেও ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মানুষ সেগুলো ত্যাগ করে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৮৩। আর (স্মরণ কর সেই সময়ের কথা) যখন বনী ইস্রাইলের কাছ থেকে আমি অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন ও দরিদ্রের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে, নামাযকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং যাকাত প্রদান করবে। কিন্তু স্বল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত তোমরা সকলে অগ্রাহ্য ক’রে (এ প্রতিজ্ঞা পালনে) পরাঙ্খমুখ হয়ে গেলে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৩ ও ৮৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে বানী ইসরাঈদেরকে যে সমস্ত আদেশ বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সে আদেশগুলো আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তার মধ্যে অন্যতম হল তাদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে, পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে, সালাত কায়িম করবে, যাকাত প্রদান করবে। আদম (আঃ) থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত সকল নাবী-রাসূলগণকে এ পয়গাম প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللّٰهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ)
“আল্লাহর ‘ইবাদত করার ও তাগূতকে বর্জন করার নির্দেশ দেবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।”(সূরা নাহল ১৬:৩৬)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَمَآ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِکَ مِنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا نُوْحِیْٓ اِلَیْھِ اَنَّھ۫ لَآ اِلٰھَ اِلَّآ اَنَا فَاعْبُدُوْنِ)
আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করিনি তার প্রতি এ ওয়াহী ব্যতীত যে, ‘আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নেই; সুতরাং আমারই ‘ইবাদত করো।’(সূরা আম্বিয়া ২১:২৫)
এবং এ তাওহীদ বা এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ তা‘আলা সকল জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ)
“আমি সৃষ্টি করেছি জিন ও মানুষকে এজন্য যে, তারা একমাত্র আমার ইবাদত করবে।” (সূরা যারিআত ৫১:৫৬)
এটাই হল বান্দার ওপর আল্লাহ তা‘আলার সবচেয়ে বড় হক। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর হকের সাথে সাথে মাখলুকের মধ্যে যারা সদাচরণ পাবার অধিক হকদার তাদের কথাও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(وَقَضٰي رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوآ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا)
“তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারও ‘ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।”(সূরা ইসরা ১৭:২৩)
ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! কোন আমল আল্লাহ তা‘আলার নিকট সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেন: যথাসময়ে সালাত আদায় করা, তারপর পিতা-মাতার সাথে সদ্বব্যবহার করা। তারপর আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করা। (সহীহ বুখারী হা: ৫২৭)
তাই সালাত, যাকাত ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ বা একত্ববাদের ইবাদত ও পিতা-মাতার সাথে সদ্বব্যবহার এটা সকল উম্মাতের মধ্যেই ছিল। এ উম্মাতে মুহাম্মাদীকেও আল্লাহ তা‘আলা একই নির্দেশ দিয়ে বলেন,
(وَاعْبُدُوا اللہَ وَلَا تُشْرِکُوْا بِھ۪ شَیْئًا وَّبِالْوَالِدَیْنِ اِحْسَانًا وَّبِذِی الْقُرْبٰی وَالْیَتٰمٰی والْمَسٰکِیْنِ وَالْجَارِ ذِی الْقُرْبٰی وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْۭبِ وَابْنِ السَّبِیْلِﺫ وَمَا مَلَکَتْ اَیْمَانُکُمْﺚ اِنَّ اللہَ لَا یُحِبُّ مَنْ کَانَ مُخْتَالًا فَخُوْرَا)
“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে ও কোন কিছুকে তাঁর শরীক করবে না; এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে।”(সূরা নিসা ৪:৩৬)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে আরো অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তারা জমিনে রক্তপাত করবে না, আত্মীয়-স্বজনদেরকে স্বীয় বাসস্থান থেকে বের করে দেবে না ইত্যাদি।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. প্রত্যেক উম্মাতেই সালাত, সিয়াম ও যাকাত ইত্যাদি মৌলিক ইবাদত ছিল, তবে পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য ছিল।
২. আল্লাহ তা‘আলার হকের পর মাখলুকের মাঝে যারা সবচেয়ে বেশি সদাচরণ পাওয়ার হকদার তারা হলেন পিতা-মাতা।
৩. প্রত্যেক নাবী তাদের স্বজাতীর কাছে তাওহীদের পয়গাম নিয়ে আগমন করেছেন এবং এ দিকেই আহ্বান করেছেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: বানী ইসরাঈলের নিকট হতে কতকগুলো প্রতিশ্রুতি গ্রহণ
ও তার বিস্তারিত বিবরণ বানী ইসরাঈলের উপর যে নির্দেশাবলী রয়েছে এবং তাদের নিকট হতে যে। প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়েছে এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে এবং তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আলোচনা করা হচ্ছে। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর একতুবাদ মেনে নেয় এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপাসনা করে। শুধু মাত্র বানী ইসরাঈলই নয়, বরং সমস্ত মাখলুকের প্রতি এ নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “সব রাসূলকেই আমি এ নির্দেশ দিয়েছি যে, তারা যেন ঘোষণা করে দেয় আমি ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউই নেই,সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেছেনঃ “এবং আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি (তারা মানুষকে বলেছে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তিনি ছাড়া অন্যান্য বাতিল মাবুদ হতে বেঁচে থাকো।” সবচয়ে বড় হক আল্লাহ তায়ালারই, এবং তার যতগুলো হক আছে তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে এই যে, তারই ইবাদত করা হবে এবং তিনি ছাড়া আর কারও ইবাদত করা হবে না।
আল্লাহ তা'আলার হকের পর এখন বান্দাদের হকের কথা বলা হচ্ছে। বান্দাদের মধ্যে মা-বাপের হক সবচেয়ে বড় বলে প্রথমে ওরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং মা-বাপের প্রতিও এহসান কর।” অন্যত্র তিনি বলেনঃ “তোমার প্রভুর সিদ্ধান্ত এই যে, তোমরা তিনি ছাড়া আর কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাপের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।”
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময় মত আদায় করা।” জিজ্ঞেস করেনঃ ‘তার পর কোটি? তিনি বলেনঃ মা-বাপের খিদমত করা।” জিজ্ঞেস করেনঃ “এরপর কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।'
আর একটি সহীহ হাদীসে আছে, একটি লোক জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কার সাথে সৎ ব্যবহার করবো?' তিনি বলেনঃ “তোমার মায়ের সঙ্গে। লোকটি জিজ্ঞেস করেনঃ “তারপরে কার সঙ্গে?' তিনি বলেনঃ তোমার মায়ের সঙ্গে। আবার জিজ্ঞেস করেনঃ তারপর কার সঙ্গে?' তিনি বলেনঃ “তোমার বাপের সঙ্গে এবং তারপরে অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে।
এ আয়াতে (আরবি) বলেছেন, কেননা (আরবি) অপেক্ষা এতে গুরুত্ব বেশী আছে। কেউ কেউ (আরবি) ও পড়েছেন। হযরত উবাই (রাঃ) এবং হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁরা (আরবি)পড়েছেন। সেই ছোট ছেলেকে বলা হয় যার পিতা নেই (আরবি) ঐ সব লোককে বলা হয় যারা নিজের ও স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের খাওয়া পরার খরচ চালাতে পারে না। এরপূর্ণ ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ্ সূরা-ই-নিসার মধ্যে এর অর্থের আয়াতে আসবে। অতঃপর আল্লাহ্ পাক বলেনঃ “সর্বসাধারণের সাথে উত্তম রূপে কথা বল”। অর্থাৎ তাদের সাথে নম্রভাবে ও হাসিমুখে কথা বল। তাদেরকে ভাল কাজের আদেশ দাও ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখ। যেমন হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ হচ্ছে- তোমরা ভাল কাজের আদেশ কর ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখ। আর সহনশীলতা, ক্ষমা ও অপরাধ মাফ করার নীতি গ্রহণ কর। এটাই উত্তম চরিত্র যা গ্রহণ করা উচিত।
রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “ভাল জিনিসকে ঘৃণা করো না, কিছু করতে না পারলেও অন্ততঃ তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে সাক্ষাৎ কর”। (মুসনাদ-ইআহমাদ)। সুতরাং আল্লাহ্ প্রথমে তার ইবাদতের নির্দেশ দেন, অতঃপর পিতা মাতার খিদমত করা, আত্মীয় স্বজন, ইয়াতীম ও মিসকীনদের প্রতি সুনজর দেয়া এবং জনসাধারণের সাথে উত্তমরূপে কথা বলা ইত্যাদির নির্দেশ দেন। এরপর কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েরও আলোচনা করেন। যেমন বলেনঃ নামায পড়, যাকাত দাও।' তারপর এ সংবাদ দেন যে, তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং অল্প লোক ছাড়া তাদের অধিকাংশই অবাধ্য হয়ে যায়। এ উম্মতকেও এই নির্দেশই দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর,তার সঙ্গে অন্যকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে, আত্মীয়দের সঙ্গে, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সঙ্গে, নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে, দূরবর্তী-প্রতিবেশীর সঙ্গে, সঙ্গী-সাথীদের সঙ্গে, মুসাফিরদের সঙ্গে এবং দাস দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। মনে রেখো যে, আল্লাহ আত্মম্ভরী অহংকারীকে পছন্দ করেন না।
এই উম্মত অন্যান্য উম্মতের তুলনায় এ সব নির্দেশ মানার ব্যাপারে এবং ওর উপর আমল করার ব্যাপারে অনেক বেশী দৃঢ় প্রমাণিত হয়েছে।
অদাহ্ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি ইয়াহূদীও খ্রীষ্টানদেরকে সালাম দিতেন এবং এর দলীল রূপে আল্লাহর এ নির্দেশটি পেশ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তোমরা জন সাধারণের সাথে উত্তমরূপে কথা বলবে। কিন্তু এ বর্ণনাটি গরীব এবং হাদীসের উল্টো। হাদীসে স্পষ্টরূপে বিদ্যমান আছে যে, তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে প্রথমতঃ (আরবি) বলবে না। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।