আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 40)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 40)



হরকত ছাড়া:

يا بني إسرائيل اذكروا نعمتي التي أنعمت عليكم وأوفوا بعهدي أوف بعهدكم وإياي فارهبون ﴿٤٠﴾




হরকত সহ:

یٰبَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ اذْکُرُوْا نِعْمَتِیَ الَّتِیْۤ اَنْعَمْتُ عَلَیْکُمْ وَ اَوْفُوْا بِعَهْدِیْۤ اُوْفِ بِعَهْدِکُمْ ۚ وَ اِیَّایَ فَارْهَبُوْنِ ﴿۴۰﴾




উচ্চারণ: ইয়া-বানী ইছরাঈলাযকুরূনি‘মাতিয়াল্লাতী আন‘আমতু‘আলাইকুম ওয়াআওফূ বি‘আহদি ঊফি বি‘আহদিকুম ওয়াইয়্যা-ইয়া ফারহাবূন।




আল বায়ান: হে বনী ইসরাঈল, তোমরা আমার নিআমতকে স্মরণ কর, যে নিআমত আমি তোমাদেরকে দিয়েছি এবং তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ কর, তাহলে আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর কেবল আমাকেই ভয় কর।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪০. হে ইসরাঈল(১) বংশধরগণ(২) তোমরা আমার সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি(৩) এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর(৪), আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে বানী ইসরাঈল! আমার সেই অনুগ্রহকে স্মরণ কর, যদ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছি এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করব এবং তোমরা কেবল আমাকেই ভয় কর।




আহসানুল বায়ান: ৪০। হে বনী ঈস্রাঈল! [1] আমার সেই অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ কর যার দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছি, এবং আমার সঙ্গে তোমাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করব; এবং তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।



মুজিবুর রহমান: হে ইসরাঈলী বংশধর! আমি তোমাদেরকে যে সুখ সম্পদ দান করেছি তা স্মরণ কর এবং আমার অঙ্গীকার পূর্ণ কর - আমিও তোমাদের প্রতি কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করব এবং তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।



ফযলুর রহমান: হে বনী ইসরাঈল (ইসরাঈলের বংশধরগণ)! আমি তোমাদেরকে যে নেয়ামত দান করেছি তা স্মরণ করো এবং আমার অঙ্গীকার পূরণ করো, তাহলে আমিও তোমাদের অঙ্গীকার পূরণ করব। আর আমাকেই ভয় কর।



মুহিউদ্দিন খান: হে বনী-ইসরাঈলগণ, তোমরা স্মরণ কর আমার সে অনুগ্রহ যা আমি তোমাদের প্রতি করেছি এবং তোমরা পূরণ কর আমার সাথে কৃত প্রতিজ্ঞা, তাহলে আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করব। আর ভয় কর আমাকেই।



জহুরুল হক: হে ইসরাইলের বংশধরগণ! আমার নিয়ামত স্মরণ করো, যা আমি তোমাদের প্রদান করেছিলাম, আর আমার সাথের চুক্তি তোমরা বহাল রাখো, আমিও তোমাদের সাথের চুক্তি বহাল রাখব। আর আমাকে, শুধু আমাকে, তোমরা ভয় করবে।



Sahih International: O Children of Israel, remember My favor which I have bestowed upon you and fulfill My covenant [upon you] that I will fulfill your covenant [from Me], and be afraid of [only] Me.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪০. হে ইসরাঈল(১) বংশধরগণ(২) তোমরা আমার সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি(৩) এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর(৪), আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।


তাফসীর:

১. ইসরাঈল ইয়াকুব আলাইহিস সালামের অপর নাম। ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর দুটি নাম রয়েছে, ইয়াকুব ও ইসরাঈল।


২. এ সূরার চল্লিশতম আয়াত থেকে আরম্ভ করে একশত তেইশতম আয়াত পর্যন্ত শুধু আসমানী গ্রন্থে বিশ্বাসী আহলে-কিতাবদেরকে বিশেষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। সেখানে তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রথমে তাদের বংশগত কৌলিন্য, বিশ্বের বুকে তাদের যশ-খ্যাতি, মান-মর্যাদা এবং তাদের প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার অগণিত অনুকম্পাধারার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। অতঃপর তাদের পদচ্যুতি ও দুস্কৃতির জন্য সাবধান করে দেয়া হয়েছে এবং সঠিক পথের দিকে আহবান করা হয়েছে। প্রথম সাত আয়াতে এসব বিষয়েরই আলোচনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে প্রথম তিন আয়াতে ঈমানের দাওয়াত এবং চার আয়াতে সৎকাজের শিক্ষা ও প্রেরণা রয়েছে। এরপর অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। বিস্তারিত সম্বোধনের সূচনাপর্বে গুরুত্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যে (হে ইসরাঈলের বংশধর) শব্দসমষ্টি দ্বারা সংক্ষিপ্ত সম্বোধনের সূচনা হয়েছিল, সমাপ্তিপর্বেও সেগুলোরই পুনরুল্লেখ করা হয়েছে।


৩. বনী ইসরাঈলকে যে সমস্ত নেআমত প্রদান করা হয়েছে তা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। যেমন, ফেরআউন থেকে নাজাত, সমুদ্রে রাস্তার ব্যবস্থা করে তাদের বের করে আনা, তীহ ময়দানে মেঘ দিয়ে ছায়া প্রদান, মান্না ও সালওয়া নাযিলকরণ, সুমিষ্ট পানির ব্যবস্থা করণ ইত্যাদি। তাছাড়া তাদের হিদায়াতের জন্য অগণিত অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ ও তৎকালীন বিশ্বের সবার উপর শ্ৰেষ্ঠত্ব প্রদানও উল্লেখযোগ্য।


৪. এ আয়াতে ইসরাঈল-বংশধরগণকে সম্বোধন করে এরশাদ হয়েছেঃ “আর তোমরা আমার অঙ্গীকার পূরণ কর।” অর্থাৎ তোমরা আমার সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলে, তা পূরণ কর কাতাদাহ-এর মতে তাওরাতে বর্ণিত সে অংগীকারের কথাই কুরআনের এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে, “নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ইসরাঈল-বংশধর থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমরা তাদের মাঝে থেকে বার জনকে দলপতি নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলাম”। [সূরা আল-মায়েদাহঃ ১২] সমস্ত রাসূলের উপর ঈমান আনার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারই এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। যাদের মধ্যে আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এছাড়া সালাত, যাকাত এবং মৌলিক ইবাদতও এ অঙ্গীকারভূক্ত। এ জন্যই ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন যে, এ অঙ্গীকারের মূল অর্থ মুহাম্মাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্ণ অনুসরণ।

এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, অঙ্গীকার ও চুক্তির শর্তাবলী পালন করা অবশ্য কর্তব্য আর তা লংঘন করা হারাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন যে, অঙ্গীকার ভংগকারীদেরকে নির্ধারিত শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে এই শাস্তি দেয়া হবে যে, হাশরের ময়দানে যখন পূর্ববতী ও পরবর্তী সমগ্র মানবজাতি সমবেত হবে, তখন অঙ্গীকার ভংগকারীদের পিছনে নিদর্শনস্বরূপ একটি পতাকা উত্তোলন করে দেয়া হবে এবং যত বড় অঙ্গীকার ভংগ করবে, পতাকাও তত উচু ও বড় হবে। [সহীহ মুসলিম: ১৭৩৮] এভাবে তাদেরকে হাশরের ময়দানে লজ্জিত ও অপমানিত করা হবে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ৪০। হে বনী ঈস্রাঈল! [1] আমার সেই অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ কর যার দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছি, এবং আমার সঙ্গে তোমাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করব; এবং তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।


তাফসীর:

(1) "ইস্রাঈল" (অর্থ আব্দুল্লাহ) ইয়াক্বুব (আঃ)-এর উপাধি। ইয়াহুদীদেরকে বানী ইস্রাঈল - অর্থাৎ ইয়াক্বুব (আঃ)-এর সন্তান বলা হত। কারণ ইয়াক্বুব (আঃ)-এর বারো জন সন্তান ছিল, তা থেকে বারোটি বংশ গঠিত হয় এবং এ­ই বংশসমূহ থেকে বহু নবী ও রসূল হন। ইয়াহুদীদের আরবে বিশেষ মর্যাদা ছিল। কারণ, তারা অতীত ইতিহাস এবং ইলম ও দ্বীন সম্পর্কে অবহিত ছিল। আর এই জন্যই তাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত অতীত নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে বলা হচ্ছে যে, তোমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষা কর, যা শেষ নবী এবং তাঁর নবুঅতের উপর ঈমান আনার ব্যাপারে তোমাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল। যদি তোমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষা করো, তাহলে আমিও আমার অঙ্গীকার রক্ষা করে তোমাদের উপর থেকে সেই বোঝা নামিয়ে দেব, যা তোমাদের ভুল-ত্রুটির কারণে শাস্তিস্বরূপ তোমাদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তোমাদেরকে পুনরায় উন্নতি দান করব। আর আমাকে ভয় করো, কারণ আমি তোমাদেরকে অব্যাহত লাঞ্ছনা ও অধঃপতনের মধ্যে রাখতে পারি, যাতে তোমরা পতিত আছ এবং তোমাদের পূর্ব পুরুষগণও পতিত ছিল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪০ হতে ৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি, জান্নাতে বসবাস, অপরাধের কারণে দুনিয়াতে প্রেরণের আলোচনা করার পর বানী ইসরাঈলের ওপর তাঁর প্রদত্ত নেয়ামত ও দয়ার আলোচনা শুরু করেছেন।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “হে বানী ইসরাঈল” বানী ইসরাঈল দ্বারা উদ্দেশ্য ইয়া‘কূব (আঃ)-এর বংশধর। এখানে আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলের সকল দলকে যারা মদীনা ও তার পার্শ্ববর্তী এবং পরবর্তীতে যারা এসেছে সকলকে সম্বোধন করে বলেছেন, তোমাদের ওপর আমার অনুগ্রহকে স্মরণ কর। এখানে স্মরণ করা দ্বারা উদ্দেশ্য হল অন্তরে স্বীকার করা, মুখে প্রশংসা করা। আল্লাহ তা‘আলা যা পছন্দ করেন ও ভালোবাসেন অঙ্গ-প্রতঙ্গ দিয়ে তা কাজে পরিণত করা। (তাফসীরে সা‘দী: ২৮)



نِعْمَةُ اللّٰهِ বা আল্লাহর নেয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে মুফাসসিরগণ অনেক মতামত পেশ করেছেন।



আল্লামা শানক্বিতী (রহঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوٰي)



“আর আমি তোমাদের ওপর মেঘমালার ছায়া দান করেছিলাম এবং তোমাদের প্রতি ‘মান্না’ও ‘সালওয়া’অবতীর্ণ করেছিলাম।”(সূরা বাকারাহ ২:৫৭)



অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاِذْ نَجَّیْنٰکُمْ مِّنْ اٰلِ فِرْعَوْنَ یَسُوْمُوْنَکُمْ سُوْ۬ئَ الْعَذَابِ یُذَبِّحُوْنَ اَبْنَا۬ءَکُمْ وَیَسْتَحْیُوْنَ نِسَا۬ءَکُمْﺚ وَفِیْ ذٰلِکُمْ بَلَا۬ئٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ عَظِیْمٌﮀوَاِذْ فَرَقْنَا بِکُمُ الْبَحْرَ فَاَنْجَیْنٰکُمْ وَاَغْرَقْنَآ اٰلَ فِرْعَوْنَ وَاَنْتُمْ تَنْظُرُوْنَ)



“আর স্মরণ কর, যখন আমি তোমাদেরকে ফিরাউনের সম্প্রদায় হতে মুক্ত করেছিলাম। তারা তোমাদেরকে কঠোর শাস্তি প্রদান করত ও তোমাদের ছেলে সন্তানদেরকে হত্যা করত ও কন্যাগণকে জীবিত রাখত এবং এতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমাদের জন্য মহাপরীক্ষা ছিল। এবং যখন আমি তোমাদের জন্য সমুদ্রকে বিভক্ত করেছিলাম, অতঃপর তোমাদেরকে (সেখান থেকে) উদ্ধার করেছিলাম। আর ফিরাউনের স্বজনবৃন্দকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম এমতাবস্থায় তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।”(বাকারাহ ২:৪৯-৫০)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَنُرِیْدُ اَنْ نَّمُنَّ عَلَی الَّذِیْنَ اسْتُضْعِفُوْا فِی الْاَرْضِ وَنَجْعَلَھُمْ اَئِمَّةً وَّنَجْعَلَھُمُ الْوٰرِثِیْنَﭔﺫوَنُمَکِّنَ لَھُمْ فِی الْاَرْضِ وَنُرِیَ فِرْعَوْنَ وَھَامٰنَ وَجُنُوْدَھُمَا مِنْھُمْ مَّا کَانُوْا یَحْذَرُوْنَ)



“আমি ইচ্ছা করলাম, সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে ও উত্তরাধিকারী করতে; এবং তাদেরকে দেশে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে, আর ফিরআউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে যা তাদের নিকট হতে তারা আশঙ্কা করত।”(সূরা কাসাস ২৮:৫-৬)



প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মুজাহিদ ও আবূল আলিয়া (রহঃ) এ কথা বলেছেন। (আযউয়াউল বায়ান, ১/ ৮১)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আগমন করে দেখলেন যে, ইয়াহূদীরা আশুরার দিবসে সিয়াম পালন করছে। তখন তিনি বললেন, এ দিনে তোমরা সিয়াম পালন কর কেন? তারা বলল, এ কল্যাণময় দিনে আল্লাহ বানী ইসরাঈলকে তাদের শত্র“দের কবল হতে মুক্তি দিয়েছিলেন, ফলে মূসা (আঃ) সে দিনটি শুকরিয়াস্বরূপ সিয়াম পালন করেছেন (আমরাও তার অনুরসণ করে সিয়াম পালন করছি)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: তোমাদের অপেক্ষা আমিই মূসার ব্যাপারে অধিক হকদার। ফলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সিয়াম রাখলেন এবং সিয়াম রাখার জন্য নির্দেশ দিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ২০০৪, সহীহ মুসলিম হা: ১১৩০)



ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতের উদ্দেশ্য হল, মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে যেমন বলেছিলেন:



(یٰقَوْمِ اذْکُرُوْا نِعْمَةَ اللہِ عَلَیْکُمْ اِذْ جَعَلَ فِیْکُمْ اَنْۭبِیَا۬ئَ وَجَعَلَکُمْ مُّلُوْکًا ﺠ وَّاٰتٰٿکُمْ مَّا لَمْ یُؤْتِ اَحَدًا مِّنَ الْعٰلَمِیْنَ)



“হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদের মধ্য হতে নাবী করেছিলেন ও তোমাদেরকে শাসক করেছিলেন এবং বিশ্বজগতে কাউকেও যা তিনি দেননি তা তোমাদেরকে দিয়াছিলেন।”(সূরা মায়িদাহ ৫:২০)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের সে কৃত ওয়াদা হল আল্লাহ তা‘আলাও, তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যদি তোমরা তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর তবে আমিও তোমাদেরকে দেয়া অঙ্গীকার পূর্ণ করে দেব। আল্লাহ তা‘আলার অঙ্গীকার হল, তাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া, দুনিয়াতে রহমত ও পরকালে নাজাত দেয়া।



আল্লাহ তা‘আলা ও তাদের মাঝে যে ওয়াদাসমূহ হয়েছিল তা আল্লাহ তা‘আলা সূরা মায়িদায় উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(وَلَقَدْ اَخَذَ اللہُ مِیْثَاقَ بَنِیْٓ اِسْرَا۬ءِیْلَﺆ وَبَعَثْنَا مِنْھُمُ اثْنَیْ عَشَرَ نَقِیْبًاﺚ وَقَالَ اللہُ اِنِّیْ مَعَکُمْﺚ لَئِنْ اَقَمْتُمُ الصَّلٰوةَ وَاٰتَیْتُمُ الزَّکٰوةَ وَاٰمَنْتُمْ بِرُسُلِیْ وَعَزَّرْتُمُوْھُمْ وَاَقْرَضْتُمُ اللہَ قَرْضًا حَسَنًا لَّاُکَفِّرَنَّ عَنْکُمْ سَیِّاٰتِکُمْ وَلَاُدْخِلَنَّکُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِھَا الْاَنْھٰرُﺆ فَمَنْ کَفَرَ بَعْدَ ذٰلِکَ مِنْکُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَا۬ئَ السَّبِیْلِ)



“আর আল্লাহ তো বানী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, তাদের মধ্যে হতে বার জন নেতা নিযুক্ত করেছিলাম, আর আল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, তোমরা যদি সালাত কায়িম কর, যাকাত দাও এবং আমার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন ও তাদেরকে সম্মান কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তবে তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করবে এবং নিশ্চয় তোমাদের দাখিল করব জান্নাতে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। এরপরও তোমাদের কেউ কুফরী করলে সে তো সরল পথ হারাবে।”(সূরা মায়িদাহ ৫:১২)



তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে অঙ্গীকার পূর্ণ করার পথ নির্দেশনা দিয়ে বলেন: তোমরা আমাকে ভয় কর! অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আরো বিশেষভাবে এমন নির্দেশ দিচ্ছেন যা ছাড়া ঈমান পরিপূর্ণ হবে না এবং সঠিক হবে না, তা হল “আমি যা অবতীর্ণ করেছি তোমরা তার প্রতি ঈমান আন” অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর অবতীর্ণ পবিত্র কুরআনুল কারীমের প্রতি ঈমান আন।



(مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَكُمْ)



‘তোমাদের সাথে যা আছে তা তাঁরই সত্যতা প্রমাণকারী’অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর অবতীর্ণ কুরআন তোমাদের নিকট যা রয়েছে তার সমর্থনকারী, তার পরিপন্থী নয়।



অতএব যেহেতু কুরআন তোমাদের নিকট যা কিছু রয়েছে তার সমর্থনকারী তাহলে তার প্রতি ঈমান আনায় তোমাদের কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। কেননা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাই নিয়ে এসেছেন যা অন্যান্য নাবী-রাসূলগণ নিয়ে এসেছেন। অতএব তোমরাই তার প্রতি ঈমান আনার অধিক হকদার। কারণ তোমরা হলে কিতাবপ্রাপ্ত। আর যদি তোমরা তার প্রতি ঈমান না আন, তাহলে তোমাদের নিকট যা আছে তা মিথ্যা সাব্যস্ত হয়ে যাবে। কেননা তিনি যা নিয়ে এসেছেন অন্যান্য নাবীরাও তা-ই নিয়ে এসেছেন। অতএব তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার অর্থ হল তোমাদের নিকট যা আছে তাকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।



( وَلَا تَكُونُوا أَوَّلَ كَافِرٍۭ بِۭه۪)



‘এতে তোমরাই প্রথম অবিশ্বাসী হয়ো না’এ আয়াতের তাফসীরে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: হে আহলে কিতাবগণ, তোমরা তাঁর প্রতি প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। কারণ তোমাদের নিকট এমন জ্ঞান আছে যা অন্যদের নিকট নেই।



আবুল আলিয়া (রহঃ) বলেন: মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তোমরা প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। এরূপ বলেছেন হাসান বসরী, সুদ্দী, রাবী বিন আনাস।



ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন: আমার কাছে গ্রহণযোগ্য কথা হল, তোমরা কুরআনের প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। (তাফসীর ইবনে কাসীর, ১ম খণ্ড, ১৯৯)



আহলে কিতাবদেরকে এ কথা বলার কারণ হল, তাদেরকে আসমানী কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের কাছে মুহাম্মাদ ও কুরআনের ব্যাপারে জ্ঞান ছিল, তাই তারাই যদি প্রথম অস্বীকারকারী হয় তাহলে যাদের কিতাব দেয়া হয়নি তারা কখনোই ঈমান আনবে না।



(وَلَا تَشْتَرُوْا بِاٰیٰتِیْ ثَمَنًا قَلِیْلًا)



‘আর আমার আয়াতসমূহের পরিবর্তে সামান্য মূল্য গ্রহণ কর না’এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম সুদ্দী বলেন: এর ভাবার্থ হল, আল্লাহ তা‘আলার আয়াতের বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করা।



বিশিষ্ট তাবেয়ী রাবী বিন আনাস এবং আবুল আলিয়া বলেন: আল্লাহ তা‘আলার আয়াতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ কর না।



সঠিক কথা হল বানী ইসরাঈলরা যেন আল্লাহ তা‘আলার আয়াতসমূহের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁর রাসূলের সত্যতার স্বীকার পরিত্যাগ না করে। যদিও এর বিনিময়ে সারা দুনিয়াও তারা পেয়ে যায়। আখিরাতের তুলনায় তা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। স্বয়ং এটা তাদের কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে।



আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَي بِهِ وَجْهُ اللّٰهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلاَّ لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ



যে বিদ্যা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি লাভ করা যায় তা যদি কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে তবে সে কিয়ামাতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না। (আবূ দাঊদ হা: ৩৬৬৪, ইবনু মাজাহ হা: ২৫২ সহীহ)



এর অর্থ এমন নয় যে, কুরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে বিনিময় গ্রহণ করা বৈধ নয়। বরং শিক্ষা গ্রহণ করবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তবে তা শিক্ষা দিয়ে বিনিময় নিতে পারবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি নির্ধারিত মজুরী নিয়ে একটি সাপে কাটা রোগীকে কুরআন দিয়ে ঝাড়-ফুঁক করেছেন। এ ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট বর্ণনা করা হলে তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের মাধ্যমে বিনিময় গ্রহণ করা সবচেয়ে বেশি হকদার। (সহীহ বুখারী হা: ৫৪০৫, ৫৭৩৭)



অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক মহিলা সাহাবীর সাথে অপর সাহাবীকে বিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে বলেছেন: তোমার সাথে এই নারীর বিয়ে দিলাম এ মোহরের বিনিময়ে যে, তোমার যতটুকু কুরআন মাজীদ মুখস্ত আছে তা তুমি তাকে মুখস্ত করিয়ে দেবে।



অতএব ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষার পিছনে সময় ব্যয়ের বিনিময় নেয়া বৈধ। শিক্ষক যেন সচ্ছলভাবে জীবন যাপন করতে পারে এবং স্বীয় প্রয়োজনাদি পূরণ করতে পারে এজন্য বায়তুল মাল হতে গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ। যদি বায়তুল মাল হতে কিছুই পাওয়া না যায় এবং বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার কারণে অন্য কাজ করার সুযোগ না পান তবে তার জন্য বেতন নির্ধারণ করাও বৈধ।



ইমাম মালিক, শাফিঈ, আহমাদ বিন হাম্বাল ও জমহুর উলামার এটাই মতামত। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদীদেরকে নিষেধ করে বলছেন- “তোমরা সত্যকে বাতিলের সাথে মিশ্রণ কর না এবং সত্য গোপন কর না।”



আল্লাহ তা‘আলা সত্যকে বাতিলের সাথে মিশ্রণ ও সত্য গোপন উভয়কে নিষেধ করেছেন। কারণ তাদের কাছে এটাই কামনা।



তাই যারা এ সত্যকে বাতিলের সাথে মিশ্রণ ও গোপন করবে না তারাই নাবী-রাসূলদের ওয়ারিশ ও উম্মাতের পথপ্রদর্শক। পক্ষান্তরে এর বিপরীত যারা করে তারাই হল জাহান্নামের দিকে আহ্বানকারী। (তাফসীর সা‘দী পৃ: ২৮)



এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সালাত কায়িম ও যাকাত প্রদান ও রুকুকারীদের সাথে রুকু করার নির্দেশ দিচ্ছেন।



(وَارْكَعُوْا مَعَ الرّٰكِعِيْنَ)



“এবং রুকুকারীদের সাথে রুকূ কর”আয়াতের এ অংশ প্রমাণ করছে সালাত আদায় করতে হবে জামাতের সাথে।



এ ব্যাপারে হাদীসেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুব তাগিদ দিয়ে বলেন: আমার ইচ্ছা হয় কতক যুবকদের নির্দেশ দিই তারা কিছু কাঠ একত্রিত করুক, তারপর ঐ সকল ব্যক্তিদের বাড়িতে যাই যারা বিনা কারণে বাড়িতে সালাত আদায় করেছে, তাদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেই। (সহীহ বুখারী হা: ৬৪৪, সহীহ মুসলিম হা: ৬৫১.)



এ কঠিন নির্দেশমূলক কথা হতে প্রমাণিত হয় যে, সুস্থ পুরুষদের জামাতে সালাত আদায় করা অপরিহার্য বিষয়।



বিশিষ্ট তাবেয়ী মুকাতিল (রহঃ) বলছেন, এ কথার অর্থ হল: আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে, রাসূলের সাথে সালাত আদায়, রাসূলের কাছে যাকাত প্রদান ও উম্মাতে মুহাম্মাদীর সাথে রুকু করার নির্দেশ প্রদান করছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতের শুকরীয়া করা ওয়াজিব।

২. ওয়াদা পূর্ণ করা ওয়াজিব, বিশেষ করে বান্দা ও আল্লাহ তা‘আলার মাঝে যে সব ওয়াদা হয়েছে।

৩. সত্য বিষয় বর্ণনা করা ওয়াজিব এবং তা গোপন করা হারাম।

৪. জ্ঞানার্জন করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

৫. কুরআন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ, তবে তা যেন মূল লক্ষ্য না হয়।

৬. হকের সাথে বাতিল মিশ্রণ করা হারাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪০-৪১ নং আয়াতের তাফসীর

বানী ইসরাঈলকে ইসলামের আমন্ত্রণ

উল্লিখিত আয়াত দুটিতে বানী ইসরাঈলকে ইসলাম গ্রহণের ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কি সুন্দর রীতিতে তাদেরকে বুঝানো হচ্ছে যে, তোমরা এক নবীরই সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত এবং তোমাদের হাতে আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান রয়েছে, আর কুরআন কারীম এর সত্যতা স্বীকার করছে। সুতরাং তোমাদের জন্যে এটা মোটেই উচিত নয় যে, তোমরাই সর্বপ্রথম অস্বীকারকারী হয়ে যাবে। হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর নাম ছিল ইসরাঈল (আঃ)। তাহলে যেন তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তোমরা আমার সৎ ও অনুগত বান্দারই সন্তান। সুতরাং তোমাদের সম্মানিত পূর্বপুরুষের মত তোমাদেরও সত্যর অনুসরণ করা উচিত। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, তুমি দানশীলের ছেলে, সুতরাং তুমি দানশীলতায় অগ্রগামী হয়ে যাও। তুমি বীরের পুত্র, সুতরাং বীরত্ব প্রদর্শন কর। তুমি বিদ্বানের ছেলে, সুতরাং বিদ্যায় পূর্ণতা লাভ কর।

অন্য স্থানে এ রচনা রীতি এভাবে এসেছেঃ “আমার কৃতজ্ঞ বান্দা হযরত নূহ (আঃ)-এর সঙ্গে যাদেরকে বিশ্বব্যাপী তুফান হতে রক্ষা করেছিলাম, এরা তাদেরই সন্তান।

একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইয়াহূদীদের একটি দলকে জিজ্ঞেস করেনঃ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর নাম যে ইসরাঈল ছিল তা কি তোমরা জান না?' তারা সবাই শপথ করে বলেঃ‘আল্লাহর শপথ! এটা সত্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহ্! আপনি সাক্ষী থাকুন।

‘ইসরাঈল’-এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে আল্লাহর বান্দা। তাদেরকে ঐ সব অনুগ্রহের কথা স্মরণ করানো হচ্ছে যা ব্যাপক ক্ষমতার বড় বড় নিদর্শন ছিল। যেমন পাথর হতে নদী প্রবাহিত করা, মান্না’ ও ‘সালওয়া' অবতরণ করা, ফিরআউনের দলবল হতে রক্ষা করা, তাদের মধ্যে হতেই নবী রাসূল প্রেরণ করা, তাদেরকে সাম্রাজ্য ও রাজতু দান করা ইত্যাদি।

আমার অঙ্গীকার পুরো কর, অর্থাৎ তোমাদের কাছে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, যখন মুহাম্মদ (সঃ) আগমন করবেন এবং তার উপর আমার কিতাব অবতীর্ণ হবে তখন তোমরা তার উপর ও কিতাবের উপর ঈমান আনবে। তিনি তোমাদের বোঝা হালকা করবেন, তোমাদের শৃংখল ভেঙ্গে দেবেন এবং গলাবন্ধ দুরে নিক্ষেপ করে দেবেন। আর আমার অঙ্গীকারও পুরো হয়ে যাবে এইভাবে যে, আমি এই ধর্মের কঠিন নির্দেশগুলো যা তোমরা নিজেদের উপরে চাপিয়ে রেখেছো, সরিয়ে দেবো এবং শেষ যুগের নবীর (সঃ) মাধ্যমে একটি সহজ ধর্ম প্রদান করবো।

অন্য জায়গায় এর বর্ণনা এভাবে হচ্ছেঃ যদি তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর ও যাকাত আদায় কর এবং আমাকে উত্তম ঋণ প্রদান কর তবে আমি তোমাদের অমঙ্গল দূর করে দেবে এবং তোমাদেরকে প্রবাহমান নদী বিশিষ্ট বেহেশতে প্রবেশ করাবো। এই ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাওরাতে অঙ্গীকার করা হয়েছিলঃ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে এমন এক বড় মর্যাদা সম্পন্ন রাসূল সৃষ্টি করবো যার অনুসরণ করা সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতি ফরয করে দেবো, এবং দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদান করবো।'

হযরত ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে বড় বড় নবীগণের ভবিষ্যদ্বানী উদ্ধৃত করেছেন। এও বর্ণিত আছে যে, বান্দার অঙ্গীকারের অর্থ হচ্ছে ইসলামকে মান্য করা এবং তার উপর আমল করা। আর আল্লাহর অঙ্গীকার পুরো করার অর্থ হচ্ছে-তাদের প্রতি সস্তৃষ্ট হয়ে তাদেরকে বেহেশত দান করা। আমাকেই ভয় কর এর অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাঁর বান্দারদেরকে বলছেন যে, তাঁর বান্দাদের তাঁকে ভয় করা উচিত। কেননা, যদি তারা তাঁকে ভয় না করে তবে তাদের উপরও এমন শাস্তি এসে পড়বে যে শাস্তি তাদের পূর্ববর্তীদের উপর এসেছিল।

বর্ণনা রীতি কি চমৎকার যে, উৎসাহ প্রদানের পরই ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে। উৎসাহ ও ভয় প্রদর্শন একত্রিত করে সত্য গ্রহণ ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর অনুসরণের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কুরআন মাজীদ হতে উপদেশ গ্রহণ করতে, তাতে বর্ণিত নির্দেশাবলী পালন করতে এবং নিষিদ্ধ কার্য হতে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাদেরকে বলেছেন যে, তারা যেন সেই কুরআনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে যা তাদের নিজস্ব কিতাবেরও সত্যতা স্বীকার করে। এটা এনেছেন এমন নবী যিনি নিরক্ষর আরবী, সুসংবাদ প্রদানকারী, ভয় প্রদর্শনকারী, আলোকময় প্রদীপ সদৃশ, যার নাম মুহাম্মদ (সঃ),যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলকে সত্য প্রতিপন্নকারী এবং যিনি সত্যের বিস্তার সাধনকারী। তাওরাত ও ইঞ্জীলেও মুহাম্মদ (সঃ)-এর বর্ণনা ছিল বলে তাঁর আগমনই ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের সত্যতার প্রমাণ। আর এ জন্যেই তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তিনি তাদের কিতাবের সত্যতার প্রমাণরূপে আগমন করেছেন। সুতরাং তাদের অবগতি সত্ত্বেও যেন তারা তাঁকে প্রথম অস্বীকার না করে বসে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি কুরআনের দিকে ফিরেছে। কেননা পূর্বে (আরবি) এসেছে। প্রকৃতপক্ষে দু’টি মতই সঠিক। কেননা কুরআনকে মান্য করার অর্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মান্য করা এবং রাসূলের (সঃ) সত্যতা স্বীকার করে নেয়া। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বানী ইসরাঈলের প্রথম কাফির। কারণ কুরায়েশ বংশীয় কাফিরেরাও তো কুফরী ও অস্বীকার করেছিল। কিন্তু বানী ইসরাঈলের কুফরী ছিল আহলে কিতাবের প্রথম দলের কুফরী। এজন্যেই তাদেরকে প্রথম কাফির বলা হয়েছে। তাদের সেই অবগতি ছিল যা অন্যদের ছিল না। আমার আয়াতসমূহের পরিবর্তে তুচ্ছ বিনিময় গ্রহণ করো না। এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, বানী ইসরাঈল যেন আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) সত্যতা স্বীকার পরিত্যাগ না করে। এর বিনিময়ে যদি সারা দুনিয়াও তারা পেয়ে যায় তথাপি আখেরাতের তুলনায় এটা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। আর এটা স্বয়ং তাদের কিতাবেও বিদ্যমান আছে।

সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে বিদ্যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, তা যদি কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে তবে সে কিয়ামতের দিন বেহেশতের সুগন্ধি পর্যন্ত পাবে না।' নির্ধারণ না করে ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার মজুরী নেয়া বৈধ। শিক্ষক যেন স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপন করতে পারেন, এবং স্বীয় প্রয়োজনাদি পুরো করতে পারেন তজ্জন্যে বায়তুলমাল হতে গ্রহণ করাও তাঁর জন্যে বৈধ। যদি বায়তুল মাল হতে কিছুই পাওয়া না যায় এবং বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার কারণে শিক্ষক অন্য কাজ করারও সুযোগ না পান তবে তার জন্যে বেতন নির্ধারণ করাও বৈধ। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহর উলামার এটাই মাযহাব।

সহীহ বুখারী শরীফের ঐ হাদীসটিও এর দলীল যা হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নির্ধারণ করে মজুরী নিয়েছেন এবং একটি সাপে কাটা রোগীর উপর কুরআন পড়ে ফুক দিয়েছেন। এ ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ যার উপরে তোমরা বিনিময় গ্রহণ করে থাক তার সবচেয়ে বেশী হকদার হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। অন্য একটি সুদীর্ঘ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি স্ত্রীলোকের সঙ্গে একটি পুরুষ লোকের বিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে বলেছেনঃ “তোমার সঙ্গে এই নারীর বিয়ে দিলাম এই মোহরের উপরে যে, তোমার যেটুকু কুরআন মাজীদ মুখস্থ আছে তা তুমি তাকে মুখস্থ করিয়ে দেবে।

সুনান-ই-আবি দাউদের একটি হাদীসে আছে যে, একটি লোক আহলে সুফফাদের কোন একজনকে কিছু কুরআন মাজীদ শিখিয়েছিলেন। তার বিনিময়ে তিনি তাকে একটি কামান উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছিলেন। লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেনঃ “তুমি যদি আগুনের কামান নেয়া পছন্দ কর তবে তা গ্রহণ কর। সুতরাং তিনি তা ছেড়ে দেন। হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হতেও এইরূপই একটি মারফু হাদীস বর্ণিত আছে। এই দু’টি হাদীসের ভাবার্থ এই যে, তিনি যখন একমাত্র আল্লাহর জন্যেই এই নিয়্যাতে শিখিয়েছিলেন, তখন আর তার জন্যে উপটৌকন গ্রহণে স্বীয় পুণ্য নষ্ট করার কি প্রয়োজন? কিন্তু যখন প্রথম হতে বিনিময় গ্রহণের উদ্দেশ্যে শিক্ষা দেয়া হবে তখন নিঃসন্দেহে জায়েয হবে। যেমন উপরের দু'টি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সবচেয়ে বেশী জানেন।

শুধুমাত্র আল্লাহকেই ভয় করার অর্থ এই যে, আল্লাহর রহমতের আশায় তার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকতে হবে এবং তার শাস্তির ভয়ে তার অবাধ্যতা ত্যাগ করতে হবে। এই দু’অবস্থাতেই স্বীয় প্রভুর পক্ষ হতে সে একটি জ্যোতির উপর থাকে। মোটকথা তাদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, তারা যেন দুনিয়ার লোভে তাদের কিতাবে উল্লিখিত নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতা গোপন না করে এবং দুনিয়ার শাসন ক্ষমতার মোহে পড়ে বিরুদ্ধাচরণ না করে, বরং প্রভুকে ভয় করতঃ সত্যকে প্রকাশ করতে থাকে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।