সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 39)
হরকত ছাড়া:
والذين كفروا وكذبوا بآياتنا أولئك أصحاب النار هم فيها خالدون ﴿٣٩﴾
হরকত সহ:
وَ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا وَ کَذَّبُوْا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصْحٰبُ النَّارِ ۚ هُمْ فِیْهَا خٰلِدُوْنَ ﴿۳۹﴾
উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা কাফারূ ওয়াকাযযাবূবিআ-য়া-তিনাউলাইকা আসহা-বুন্না-রি হুম ফীহা-খা-লিদূ ন।
আল বায়ান: আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৯. আর যারা কুফরী করেছে এবং আমাদের আয়াতসমূহে(১) মিথ্যারোপ করেছে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর যারা কুফরী করবে ও আমার নিদর্শনগুলোকে অস্বীকার করবে, তারাই জাহান্নামী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
আহসানুল বায়ান: ৩৯। আর যারা (কাফের) অবিশ্বাস করে ও আমার নিদর্শনকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তারাই অগ্নিকুণ্ডবাসী সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’[1]
মুজিবুর রহমান: আর যারা অবিশ্বাস করবে এবং আমার নিদর্শনসমূহে অসত্যারোপ করবে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী - তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে।
ফযলুর রহমান: কিন্তু যারা (তা মেনে চলতে) অস্বীকার করবে এবং আমার প্রমাণসমূহকে মিথ্যা বলবে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
মুহিউদ্দিন খান: আর যে লোক তা অস্বীকার করবে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী; অন্তকাল সেখানে থাকবে।
জহুরুল হক: “কিন্তু যারা অবিশ্বাস পোষণ করে ও আমাদের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে, তারাই হচ্ছে আগুনের বাসিন্দা, তারা তার মধ্যে থাকবে দীর্ঘকাল।”
Sahih International: And those who disbelieve and deny Our signs - those will be companions of the Fire; they will abide therein eternally."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৯. আর যারা কুফরী করেছে এবং আমাদের আয়াতসমূহে(১) মিথ্যারোপ করেছে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।(২)
তাফসীর:
১. আরবীতে “আয়াত” এর আসল মানে হচ্ছে নিশানী বা আলামত। এই নিশানী কোন জিনিসের পক্ষ থেকে পথ নির্দেশ দেয়। কুরআনে এই শব্দটি চারটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কোথাও এর অর্থ হয়েছে নিছক আলামত বা নিশানী। কোথাও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের নিদর্শনসমূহকে বলা হয়েছে আল্লাহর আয়াত। কারণ এ বিশ্ব জাহানের অসীম ক্ষমতাধর আল্লাহর সৃষ্ট প্রতিটি বস্তুই তার বাহ্যিক কাঠামোর অভ্যন্তরে নিহিত সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করছে। কোথাও নবী-রাসূলগণ যেসব মু'জিযা দেখিয়েছেন সেগুলোকে বলা হয়েছে আল্লাহর আয়াত। কারণ এ নবী-রাসূলগণ যে এ বিশ্ব জাহানের সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন প্রভূর প্রতিনিধি এ মু'জিযাগুলো ছিল আসলে তারই প্রমাণ ও আলামত।
কোথাও কুরআনের বাক্যগুলোকে আয়াত বলা হয়েছে। কারণ, এ বাক্যগুলো কেবল সত্যের দিকে পরিচালিত করেই ক্ষান্ত নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে কোন কিতাবই এসেছে, তার কেবল বিষয়বস্তুই নয়, শব্দ, বর্ণনাভঙ্গি ও বাক্য গঠনরীতির মধ্যেও এ গ্রন্থের মহান মহিমান্বিত রচয়িতার অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যের নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। কোথায় ‘আয়াত’ শব্দটির কোন অর্থ গ্রহণ করতে হবে তা বাক্যের পূর্বাপর আলোচনা থেকে সর্বত্র সুস্পষ্টভাবে জানা যায়।
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আর যারা জাহান্নামবাসী হিসেবে সেখানকার অধিবাসী হবে, তারা সেখানে মরবেও না বাঁচবেও না” [মুসলিম: ১৮৫] অর্থাৎ কাফের, মুশরিক ও মুনাফিকরা সেখানে স্থায়ী হবে। সুতরাং তাদের জাহান্নামও স্থায়ী।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৩৯। আর যারা (কাফের) অবিশ্বাস করে ও আমার নিদর্শনকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তারাই অগ্নিকুণ্ডবাসী সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’[1]
তাফসীর:
(1) দুআ কবুল করা সত্ত্বেও মহান আল্লাহ তাঁদেরকে পুনরায় জান্নাতে আবাদ না করে দুনিয়াতে থেকেই জান্নাত লাভের চেষ্টা করতে বলেন। আর আদম (আঃ)-এর মাধ্যমে সকল আদম-সন্তানকে জান্নাত লাভের পথ বলে দেওয়া হচ্ছে যে, আম্বিয়া (আলাইহিমুস্ সালাম)-এর মাধ্যমে আমার হিদায়াত (জীবন পরিচালনার বিধি-বিধান) তোমাদের নিকট আসবে। সুতরাং যে তা গ্রহণ করবে, সে জান্নাতের অধিকারী হবে। আর যে তা গ্রহণ করবে না, সে আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হবে।
তাদের কোন ভয় নেই -এর সম্পর্ক আখেরাতের সাথে। অর্থাৎ, আখেরাত সংক্রান্ত যে বিষয়ই তাদের সামনে আসবে, তাতে তাদের কোন ভয় থাকবে না। আর তারা দুঃখিত হবে না -এর সম্পর্ক দুনিয়ার সাথে। অর্থাৎ, দুনিয়া সংক্রান্ত যা কিছু তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে, সে ব্যাপারে তারা দুঃখিত হবে না। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে,
{فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلا يَضِلُّ وَلا يَشْقَى} (طـه: (১২৩)
যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে (দুনিয়াতে) পথভ্রষ্ট হবে না এবং (আখেরাতে) দুঃখ-কষ্টও পাবে না। (ইবনে কাসীর) অর্থাৎ, {لاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُوْنَ} এই মর্যাদা সকল সত্যবাদী মুমিন লাভ করবে। এটা কোন এমন মর্যাদা নয় যে, কেবল আল্লাহর অলীরাই তা পাবে। অনুরূপ এই মর্যাদা'র তাৎপর্যও অন্য কিছু নয়, বরং প্রত্যেক মুমিন ও আল্লাহভীরুই আল্লাহর অলী। "আল্লাহর আউলিয়া" কোন ভিন্ন সৃষ্টি নয়। তবে হ্যাঁ, অলীদের মর্যাদা ও দর্জায় তফাৎ থাকতে পারে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৫ হতে ৩৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতা কর্তৃক আদমকে সিজদাহ করার নির্দেশ দেয়ার পর আদমকে যে মর্যাদা দান করেছেন সেই সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের উভয়ের জন্য জান্নাতকে বসবাসের স্থান করে দিলেন এবং সকল প্রকার ভোগ-সম্ভোগ দিলেন, তবে একটি গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করলেন। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ)
“হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং যেখান থেকে ইচ্ছা খাও, কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না, হলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৯)
সে বৃক্ষের নাম কী বা সে বৃক্ষটি কী এ নিয়ে তাফসীরে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়, তবে সঠিক কথা হল: তা জান্নাতের গাছগুলোর অন্যতম একটি গাছ। আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
অতঃপর উভয়ে জান্নাতে বসবাসকালে শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহ তা‘আলার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَوَسْوَسَ لَھُمَا الشَّیْطٰنُ لِیُبْدِیَ لَھُمَا مَا و۫رِیَ عَنْھُمَا مِنْ سَوْاٰتِھِمَا وَقَالَ مَا نَھٰٿکُمَا رَبُّکُمَا عَنْ ھٰذِھِ الشَّجَرَةِ اِلَّآ اَنْ تَکُوْنَا مَلَکَیْنِ اَوْ تَکُوْنَا مِنَ الْخٰلِدِیْنَ)
“অতঃপর তাদের লজ্জাস্থান যা তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল তা তাদের কাছে প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, তোমরা উভয়ে ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা তোমরা স্থায়ী হয়ে যাবে এজন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।”(সূরা আ‘রাফ ৭:২০)
এমনকি শয়তান আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে বলল, আমি তোমাদের কল্যাণকামী।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَاسَمَهُمَآ إِنِّيْ لَكُمَا لَمِنَ النّٰصِحِيْنَ لا فَدَلّٰهُمَا بِغُرُوْرٍ )
“সে তাদের উভয়ের নিকট শপথ করে বলল: আমি তো তোমাদের কল্যাণকারীদের একজন। এভাবে সে তাদের উভয়কে প্রবঞ্চনার দ্বারা অধঃপতিত করল।”(সূরা আ‘রাফ ৭:২১-২২)
এভাবে প্ররোচিত করে শয়তান জান্নাতের নেয়ামত থেকে তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করে বের করে দিল। তারপর আল্লাহ তা‘আলা উভয়কে সম্বোধন করে বললেন; “আমি কি তোমাদেরকে ঐ গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদেরকে বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“?”
আল্লাহ তা‘আলা এরূপ অন্যত্র বলেন:
(وَنَادٰهُمَا رَبُّهُمَآ أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُلْ لَّكُمَآ إِنَّ الشَّيْطٰنَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِيْنٌ)
“তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন: ‘আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে বারণ করিনি এবং আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, শয়তান তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“?” (সূরা আ‘রাফ ৭:২২)
তাদের এ অপরাধের জন্য আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ জারি করলেন:
(وَقُلْنَا اھْبِطُوْا بَعْضُکُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّﺆ وَلَکُمْ فِی الْاَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَّمَتَاعٌ اِلٰی حِیْنٍ)
“এবং আমি বললাম, নেমে যাও, তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্র“। আর পৃথিবীতেই তোমাদের জন্য এক নির্দিষ্টকালের বসবাস ও ভোগ-সম্পদ রয়েছে।”
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা আদমকে বললেন, আমি তোমাকে যে গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছি সে গাছের ফল খেতে কিসে তোমাকে উদ্বুুদ্ধ করল। সে বলল: হাওয়া আমাকে তা সুশোভিত করে দেখিয়েছে। তখন আল্লাহ তা‘আলা বললেন: আমি তার শাস্তিস্বরূপ গর্ভধারণ বেদনা ও প্রসব বেদনা দিয়েছি। (দুররুল মানসুর, ১/১৩২, ফাতহুর কাদীর, ১১১, আল মাত্বালিব আল আলিয়া- কিতাবুল হায়েয। হাদীসটি মাওকুফ কিন্তু তার সনদ সহীহ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আদমকে হিন্দুস্তানে পাঠানো হয়েছিল এবং হাওয়াকে জেদ্দায়। হাওয়া (আঃ)-কে আদম (আঃ) খুঁজতে খুঁজতে মুযদালিফায় একত্রিত হন। হাওয়া তাকে জড়িয়ে ধরল। এ জন্য মুযদালিফাকে মুযদালিফা বলা হয়।
অতঃপর আদম ও হাওয়া তাদের অপরাধ বুঝতে পেরে আল্লাহ তা‘আলার কাছে অনুশোচনা ও তাওবাহ করল। সে তাওবার বাক্যও আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকে শিখে নিলেন।
( رَبَّنَا ظَلَمْنَآ اَنْفُسَنَاﺒ فَاِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَکُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ)
‘‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’(সূরা আ‘রাফ ৭:২৩)
কেউ এখানে একটি জাল হাদীসের আশ্রয় নিয়ে বলেন যে, আদম (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার আরশের ওপর ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’লেখা দেখেন এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওসীলা গ্রহণ করে দু‘আ করেন; ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁেক ক্ষমা করে দেন। এটা ভিত্তিহীন বর্ণনা এবং কুরআনের বর্ণনার পরিপন্থী। এ ছাড়া এটা আল্লাহ তা‘আলার বর্ণিত তরীকারও বিপরীত। প্রত্যেক নাবী সব সময় সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার নিকট দু‘আ করেছেন। অন্য কোন নাবী ও অলীর ওসীলা বা মাধ্যম ধরেননি। কাজেই নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সহ সকল নাবীদের দু‘আ করার নিয়ম এটাই ছিল যে, তাঁরা বিনা ওসীলা ও মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে সরাসরি দু‘আ করেছেন।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা উভয়ের তাওবাহ কবূল করে দুনিয়াতে প্রেরণ করলেন। দুনিয়াতে আদম ও হাওয়াকে পাঠিয়ে বলে দিলেন- তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে, যে ব্যক্তি তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তার প্রদর্শিত পথ অবলম্বন করবে তাদের কোন শঙ্কা নেই এবং কোন দুশ্চিন্তাও নেই। অর্থাৎ পরকালে সকল প্রকার ভয় ও হতাশামুক্ত থাকবে।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَاِمَّا یَاْتِیَنَّکُمْ مِّنِّیْ ھُدًیﺃ فَمَنِ اتَّبَعَ ھُدَایَ فَلَا یَضِلُّ وَلَا یَشْقٰی)
“পরে আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট সৎ পথের নির্দেশ আসলে যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না।”(সূরা ত্বা-হা: ২০:১২৩)
যে ব্যক্তি আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত হিদায়াত অনুসরণ করবে সে ব্যক্তি চারটি জিনিস থেকে মুক্ত থাকবে।
১. দুশ্চিন্তা, ২. ভয়-ভীতি, ৩. পথভ্রষ্টতা, ৪. দুর্ভাগ্য। (তাফসীরে সা‘দী পৃঃ ২৭)
আদম ও হাওয়া (আঃ)-এর বিষয়কে কেন্দ্র করে আল্লাহ তা‘আলা সকল আদম সন্তানকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন:
(يٰبَنِيْٓ اٰدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطٰنُ كَمَآ أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِّنَ الْجَنَّةِ يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْاٰتِهِمَا ط إِنَّه۫ يَرٰكُمْ هُوَ وَقَبِيْلُه۫ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ ط إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيٰطِيْنَ أَوْلِيَآءَ لِلَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ )
“হে বানী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই ধোঁকায় না ফেলে- যেভাবে তোমাদের পিতা-মাতাকে (আদম-হাওয়া) সে জান্নাত হতে বহিষ্কার করেছিল, তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য বিবস্ত্র করেছিল। সে নিজে এবং তার দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না, শয়তানকে আমি তাদের অভিভাবক করেছি।”(সূরা আ‘রাফ ৭:২৭)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার নিকট আদম (আঃ) ও তাঁর সন্তানদের মর্যাদার কথা জানতে পারলাম।
২. আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য হলে নেয়ামতের পরিবর্তে শাস্তি দেন।
৩. কোন বস্তুর নাম বা ধরণ কুরআনে উল্লেখ না হলে এবং হাদীসেও এর বিবরণ না আসলে তা নিয়ে অহেতুক আলোচনা করা শরীয়তসম্মত নয়।
৪. শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্র“, তার কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য সতর্ক থাকা দরকার।
৫. কোন অপরাধ হয়ে গেলে তার ওপর অটল না থেকে বরং তা বর্জন করে অনুশোচিত হয়ে তাওবাহ করা ওয়াজিব।
৬. যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত হিদায়াতের অনুসরণ করে চলবে সে দুশ্চিন্তা, ভয়-ভীতি, পথভ্রষ্টতা ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৮-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর
জগতের চিত্র
জান্নাত হতে বের করার সময় হযরত আদম (আঃ), হযরত হাওয়া (আঃ) ও ইবলীসকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছিল তারই বর্ণনা হচ্ছে যে, জগতে কিতাবাদি ও নবী রাসূলগণকে পাঠান হবে, অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশ করা হবে, দলীল প্রমাণাদি বর্ণিত হবে, সত্যপথ প্রকাশ করে দেয়া হবে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কেও পাঠান হবে এবং তার প্রতি কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করা হবে। অতঃপর, যারা আপন আপন যুগের নবী ও কিতাবের অনুসরণ করবে, পরকালে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং দুনিয়া হাত ছাড়া হওয়ার কারণে তারা কোন চিন্তাও করবে না। সুরা-ই-ত-হা’র মধ্যে এটাই বলা হয়েছেঃ “আমার হিদায়াতের অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হবে না। এবং হতভাগ্য হবে না, আর আমার স্মরণ হতে মুখ প্রত্যাবর্তনকারী দুনিয়ার সংকীর্ণতায় এবং আখেরাতের অপমানজনক শাস্তিতে গ্রেফতার হবে।”
এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, অস্বীকারকারী ও মিথ্যা পতিপন্নকারীরা জাহান্নামের মধ্যে চিরদিন অবস্থান করবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মূল দোযখী তাদের মরণও হবে না বা তারা ভাল জীবনও লাভ করবে না। তবে হাঁ, যেসব একত্ববাদী ও সুন্নাতের অনুসারীকে কিছু পাপের জন্যে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে, তারা পুড়ে কয়লা হয়ে মরে যাবে। পুনরায় তাদেরকে সুপারিশের মাধ্যমে বের করা হবে। সহীহ মুসলিম শরীফেও এই হাদীসটি আছে। দ্বিতীয়বার যে জান্নাত হতে বের হওয়ার হুকুম বর্ণিত হয়েছে ঐ ব্যাপারে কতক লোক বলেনঃ “এটা এজন্যেই যে, এখানে অন্যান্য আহকাম বৰ্ণনা করার ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, প্রথমবার বেহেশত হতে প্রথম আকাশে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং দ্বিতীয়ার প্রথম আকাশ হতে পৃথিবীতে নামান হয়েছিল। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।