আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 31)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 31)



হরকত ছাড়া:

وعلم آدم الأسماء كلها ثم عرضهم على الملائكة فقال أنبئوني بأسماء هؤلاء إن كنتم صادقين ﴿٣١﴾




হরকত সহ:

وَ عَلَّمَ اٰدَمَ الْاَسْمَآءَ کُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَی الْمَلٰٓئِکَۃِ ۙ فَقَالَ اَنْۢبِـُٔوْنِیْ بِاَسْمَآءِ هٰۤؤُلَآءِ اِنْ کُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ ﴿۳۱﴾




উচ্চারণ: ওয়া‘আল্লামা আ-দামাল আছমাআ কুল্লাহা- ছু ম্মা ‘আরাদাহুম ‘আলাল মালাইকাতি ফাকা-লা আম্বিঊনী বিআছমাই হাউলাই ইন কুনতুম সা-দিকীন।




আল বায়ান: আর তিনি আদমকে নামসমূহ সব শিক্ষা দিলেন তারপর তা ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। সুতরাং বললেন, ‘তোমরা আমাকে এগুলোর নাম জানাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩১. আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা(১) দিলেন, তারপর সেগুলো(২)ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করে বললেন, ‘এগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।




তাইসীরুল ক্বুরআন: এবং তিনি আদাম (আ.)-কে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন এবং বললেন, ‘এ বস্তুগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।




আহসানুল বায়ান: ৩১। এবং তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সে-সকল ফিরিশতাদের সম্মুখে পেশ করলেন এবং বললেন, ‘এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’



মুজিবুর রহমান: এবং তিনি আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন, অনন্তর তৎসমূদয় মালাইকা/ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপিত করলেন, অতঃপর বললেনঃ যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে আমাকে এ সব বস্তুর নামসমূহ বর্ণনা কর।



ফযলুর রহমান: তিনি আদমকে (সকলের) সব নাম শিখিয়ে দেন; তারপর (নামগুলো যাদের) তাদেরকে ফেরেশতাদের সামনে হাজির করে বলেন, “যদি তোমাদের কথা সত্য হয়, তাহলে তোমরা আমাকে এদের নামগুলো বল দেখি।”



মুহিউদ্দিন খান: আর আল্লাহ তা’আলা শিখালেন আদমকে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম। তারপর সে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।



জহুরুল হক: তখন তিনি আদমকে নামাবলী -- তাদের সব-কিছু শিখিয়ে দিলেন, তারপর তিনি ফিরিশ্‌তাদের কাছে তাদের স্থাপন করলেন ও বললেন, -- “আমাকে এই সমস্তের নামাবলী বর্ণনা কর, যদি তোমরা সঠিক হয়ে থাকো।”



Sahih International: And He taught Adam the names - all of them. Then He showed them to the angels and said, "Inform Me of the names of these, if you are truthful."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩১. আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা(১) দিলেন, তারপর সেগুলো(২)ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করে বললেন, ‘এগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।


তাফসীর:

১. অর্থাৎ আগে যে খলীফা বানানোর ঘোষণা আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং আদম। সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন, আদমকে আদম এজন্যই নাম রাখা হয়েছে, কারণ তাকে যমীনের ‘আদীম’ বা চামড়া অর্থাৎ উপরিভাগ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। [তাবাকাতু ইবনে সাদ, তাবারী] আয়াত থেকে আরও সাব্যস্ত হয়েছে যে, আদম আলাইহিস সালাম নবী ছিলেন। তার সাথে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং কথা বলেছেন। হাদীসে এসেছে, আবু উমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক লোক প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! আদম কি নবী ছিলেন? রাসূল বললেন, ‘হ্যাঁ, যার সাথে কথা বলা হয়েছে। লোকটি আবার প্রশ্ন করল, তার মাঝে ও নুহের মাঝে ব্যবধান কেমন? রাসূল বললেন, দশ প্রজন্ম।” [ইবনে হিব্বানঃ ৬১৯০]

প্রশ্ন হতে পারে যে, আদম আলাইহিস সালামকে কি কি নাম শিখানো হয়েছিল? কাতাদাহ বলেন, সবকিছুর নাম শিখিয়েছিলেন, যেমন এটা পাহাড়, এটা সমুদ্র, এটা এই, ওটা সেই, প্রত্যেকটি বস্তুর নাম। তারপর ফেরেশতাগণের কাছে সেগুলো পেশ করে নাম জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। [তাবারী, ইবনে কাসীর] আর তা ছিল মূলত: সমস্ত সৃষ্টিকুলের নাম এবং তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডের নাম। বিখ্যাত শাফাআতের হাদীসেও এসেছে যে, “মানুষজন কিয়ামতের মাঠে যখন কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হবে তখন আদম আলাইহিস সালামের কাছে এসে সুপারিশ করার জন্য অনুরোধ করে বলবে যে, আপনি সকল মানুষের পিতা, আল্লাহ আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, ফেরেশতাদের দিয়ে সাজদাহ করিয়ে সম্মানিত করেছেন এবং وَعَلَّمَكَ أسْمَاءَ كُلَّ شَيْءٍ বা সবকিছুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন, সুতরাং আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন।” [বুখারী ৪৪৭৬]


২. ইবনে আব্বাস, কাতাদাহ ও মুজাহিদ বলেন, যে সমস্ত বস্তুর নাম আদমকে শিখিয়ে দিলেন সে বস্তুগুলো ফেরেশতাদের কাছে পেশ করে তাদের কাছে এগুলোর নাম জানতে চাওয়া হলো। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ৩১। এবং তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সে-সকল ফিরিশতাদের সম্মুখে পেশ করলেন এবং বললেন, ‘এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে ফেরেশতাদের ওপর যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এখানে তা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাকে এমন জিনিসের নাম শিক্ষা দিয়েছেন যা অন্যদেরকে শিক্ষা দেননি। আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে কোন্ কোন্ বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছিলেন এ বিষয়ে মুফাসসিরগণের মধ্যে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল: ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে ফেরেশতা ও তার বংশধরদের নাম শিক্ষা দিয়েছিলেন। কেননা এর পরবর্তী যে শব্দ عَرَضَهُمْ ‘উপস্থাপন করলেন’এসেছে তা বিবেকসম্পন্ন প্রাণীর জন্য ব্যবহৃত হয়।



ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: বরং সঠিক কথা হল, আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে সব জিনিসের নাম শিক্ষা দিয়েছেন। অধিকাংশ মুফাসসির এরূপই বলেছেন। ‘সবকিছুর নাম’বলতে পৃথিবীর সূচনা থেকে কিয়ামত পর্যন্ত ছোট-বড় যত জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে, হবে সকল সৃষ্টবস্তুর ইলম ও তা ব্যবহারের যোগ্যতা তাকে দেয়া হয়েছে। (তাফসীর ইবনে কাসীর ও আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ)



আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন মু’মিনগণ একত্রিত হবে এবং তারা বলবে, আমরা যদি আমাদের রবের কাছে আমাদের জন্য একজন সুপারিশকারী পেতাম। এরপর তারা আদম (আঃ)-এর কাছে আসবে এবং তাঁকে বলবে, আপনি মানব জাতির পিতা। আপনাকে আল্লাহ তা‘আলা নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতাদের মাধ্যমে আপনাকে সেজদাহ করিয়েছেন এবং যাবতীয় বস্তুর নাম আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন, সুতরাং আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। অতঃপর............হাদীসের শেষ পর্যন্ত। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৭৬, সহীহ মুসলিম হা: ৪৪)



তারপর আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে যে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছিলেন সে সকল বস্তু ফেরেশতাদের সামনে পরীক্ষাস্বরূপ পেশ করতে বললেন। তারা এগুলোর নাম বলতে পারে কিনা।



ফেরেশতারা জবাবে বলেছিল:



(سُبْحٰنَكَ لَا عِلْمَ لَنَآ إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا)



“আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া কোন জ্ঞানই আমাদের নেই।”



الْحَکِیْمُ ‘হাকীম’বলা হয় তাকে যিনি সকল বিষয় উপযুক্ত স্থানে স্থাপন করতে পারেন। প্রত্যেক বিষয়কে উপযুক্ত স্থানে স্থাপন করতে পারেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে বললেন: হে আদম! তুমি তাদেরকে সে নামসমূহ (যা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছি) জানিয়ে দাও।



যায়েদ ইবনু আসলাম বলেন: আদম (আঃ) সবার নাম এভাবে বললেন, আপনার নাম জিবরীল, আপনার নাম মিকাঈল, আপনার নাম ইসরাফিল এভাবে সকলের নাম তিনি বলে দিলেন। এমনকি কাকের নামও বলে দিলেন।



মুজাহিদ বলেন: আদম (আঃ) কবুতর, কাকসহ সকল কিছুর নাম যথাযথভাবে বলে দিলেন। তারপর যখন আদম (আঃ)-এর মর্যাদা ফেরেশতাদের সামনে প্রকাশ পেল তখন আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদেরকে বললেন: আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর গায়েবের খবর জানি এবং তোমরা যা গোপন কর তাও জানি। অত্র আয়াতে ফেরেশতারা যা গোপন করেছিল আল্লাহ তা‘আলা তা বর্ণনা করেননি।



কেউ কেউ বলেন: তা হল ইবলিস যে হিংসা গোপন করেছিল। এ দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা এ কথা বলেন:



(إِلَّآ إِبْلِيسَ أَبٰي وَاسْتَكْبَرَ)



“ইবলীস ব্যতীত, সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল।”



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আদম (আঃ)-কে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দেয়ার হিকমত জানলাম।

২. অজ্ঞ ব্যক্তিদের ওপর জ্ঞানীদের মর্যাদা অনেক বেশি।

৩. কোন কিছু অজানা থাকলে তা স্বীকার করলে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না।

৪. গায়েবের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তিনি আমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবই জানেন।

৫. যদি কোন ব্যক্তি এমন কিছু দাবি করে যার সে অধিকারী নয় তাহলে তাকে ভর্ৎসনা করা যাবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর

এখানে একথারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা একটা বিশেষ জ্ঞানে হযরত আদম (আঃ) কে ফেরেশতাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।

এটা ফেরেশতাদের হযরত আদম (আঃ) কে সিজদা করার পরের ঘটনা। কিন্তু তাঁকে সৃষ্টি করার মধ্যে মহান আল্লাহর যে হিকমত নিহিত ছিল এবং যা ফেরেশতাগণ জানতেন না, তার সাথে সম্বন্ধযুক্ত হওয়ার কারণে এ ঘটনাকেই পূর্বে বর্ণনা করেছেন এবং ফেরেশতাদের সিজদা করার ঘটনা, যা পূর্বে ঘটেছিল তা পরে বর্ণনা করেছেন, যেন খলীফা সৃষ্টি করার যৌক্তিকতা ও নিপূণতা প্রকাশ পায় এবং জানা যায় যে, হযরত আদম (আঃ)-এর মর্যাদা ও সম্মান লাভ হয়েছে। এমন এক বিদ্যার কারণে যে বিদ্যা ফেরেশতাদের নেই। আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি হযরত আদম (আঃ) কে সমুদয় বস্তুর নাম শিখিয়ে দেন, অর্থাৎ তাঁর সন্তানদের নাম, সমস্ত জীব জন্তুর নাম, যমীন, আসমান, পাহাড় পর্বত, জল-স্থল, ঘোড়া, গাধা, বরতন, পশু-পাখী, ফেরেশতা ও তারকারাজি ইত্যাদি সমুদয় ছোট বড় জিনিসের নাম।

হযরত ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, তাঁকে ফেরেশতা ও মানুষের নাম শিখানো হয়েছিল। কেননা এর পরে (আরবি) শব্দটি এসেছে এবং এটা বিবেক সম্পন্ন প্রাণীর জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ইবনে জারীরের (রঃ) একথাটি বিবেক সম্মত কথা নয় যে, যেখানে বিবেক সম্পন্ন ও বিবেকহীন একত্রিত হয়ে থাকে, সেখানে যে শব্দ আনা হয় তা শুধু বুদ্ধিজীবিদের জন্যেই আনা হয়। যেমন কুরআন মাজীদে আছেঃ “আল্লাহ সমুদয় সৃষ্টজীবকে পানি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, তাদের মধ্যে কতকগুলো পেটের ভরে ধীরে ধীরে চলে, কতকগুলো চলে দুই পায়ের ভরে, আবার কতকগুলো চার পায়ের ভরে চলে থাকে। আল্লাহ যা চান তাই সৃষ্টি করে থাকেন এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।`

সুতরাং এই আয়াতে প্রকাশিত হলো যে, বিবেকহীন প্রাণীও এর অন্তর্ভুক্ত কিন্তু (আরবি) বা শব্দের রূপ এসেছে বিবেক সম্পন্নদের। তা ছাড়া হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) পঠনে ও আছে। হযরত উবাই বিন কা‘আবের (রাঃ) পঠনে (আরবি) ও আছে। সঠিক কথা এই যে, হযরত আদম (আঃ) কে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জিনিসের নামই শিখিয়ে ছিলেন। প্রজাতিগত নাম, গুণগত নাম এবং ক্রিয়াগত নামও শিখিয়েছিলেন। যেমন হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কথা আছে যে, গুহ্যদ্বার দিয়ে নির্গত বায়ুর নামও শিখিয়েছিলেন (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর)।

একটি সুদীর্ঘ হাদীস

এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটি এনেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন ঈমানদারগণ একত্রিত হয়ে বলবে-“আমরা যদি কোন একজনকে সুপারিশকারীরূপে আল্লাহর নিকট পাঠাতাম তবে কতই ভাল হতো। সুতরাং তারা সবাই মিলে হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট আসবে এবং তাকে বলবে আপনি আমাদের সবারই পিতা। আল্লাহ পাক আপনাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন, স্বীয় ফেরেশতাদের দ্বারা আপনাকে সিজদা করিয়েছেন, আপনাকে সব জিনিসের নাম শিখিয়েছেন। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করুন যেন আমরা আমাদের এই স্থানে শান্তি লাভ করতে পারি।' এ কথা শুনে তিনি উত্তরে বলবেনঃ ‘আমার এ যোগ্যতা নেই। তার স্বীয় পাপের কথা স্মরণ হয়ে যাবে, সুতরাং তিনি লজ্জিত হবেন। তিনি বলবেনঃ তোমরা হযরত নূহের (আঃ) কাছে যাও। তিনি প্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ পৃথিবীবাসীর নিকট পাঠিয়েছিলেন। তারা এ উত্তর শুনে ষত নূহের (আঃ) নিকট আসবে। তিনিও এ উত্তরই দেবেন এবং আল্লাহর ইমর বিরুদ্ধে স্বীয় পুত্রের জন্যে প্রার্থনার কথা স্মরণ করে তিনি লজ্জিত হবেন এবং বলবেনঃ ‘তোমরা রাহমানের (আল্লাহর) বন্ধু হযরত ইবরাহীমের (আঃ) নিকট যাও।' তারা সব তাঁর কাছে আসবে কিন্তু এখানেও ঐ উত্তরই পাবে। তিনি বলবেনঃ “তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও, তার সাথে অল্লাহ এ কথা বলেছিলেন এবং তাঁকে তাওরাত দান করেছিলেন। এ কথা শুনে। মই হযরত মূসার (আঃ) নিকট আসবে এবং তার নিকট এ প্রার্থনাই জানাবে। কিন্তু এখানেও একই উত্তর পাবে। প্রতিশোধ গ্রহণ ছাড়াই একটি লোককে মেরে ফেলার কণা তার স্বরুণ হয়ে যাবে এবং তিনি লজ্জাবোধ করবেন ও বলবেনঃ ‘তোমরা হযরত ঈসার (আঃ) কাছে যাও। তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তার কালেমা এবং তাঁর রূহু। এরা সব এখানে আসবে কিন্তু এখানেও ঐ উত্তরই পাবে। তিনি বলবেনঃ তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট যাও। তাঁর পূর্বেও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করা হয়েছে। তারা সবাই আমার নিকট আসবে। আমি অগ্রসর হব। আমার প্রভুকে দেখা মাত্রই আমি সিজদায় পড়ে যাব। যে পর্যন্ত আল্লাহ পাককে মঞ্জুর হবে, আমি সিজদায় পড়েই থাকবো। অতঃপর আল্লাহ বলবেনঃ ‘মাথা উঠাও, যাজ্ঞা কর, দেয়া হবে; বল, শোনা হবে। এবং সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি আমার মস্তক উত্তোলন করবো এবং আল্লাহর প্রশংসা করবো যা তিনি আমাকে ঐ সময়েই শিখিয়ে দিবেন। অতঃপর আমি সুপারিশ করবো। আমার জন্যে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তাদেরকে আমি বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে পুনরায় তাঁর নিকট ফিরে আসবে। আবার আমার প্রভুকে দেখে এ রকমই সিজদায় পড়ে যাবো। পুনরায় সুপারিশ করবো। আমার জন্যে সীমা নির্ধারিত হবে। তাদেরকেও বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে তৃতীয়বার আসবো। আবার চতুর্থবার আসবো। শেষ পর্যন্ত দোযখে শুধুমাত্র ওরাই থাকবে যাদেরকে কুরআন মাজীদ বন্দী রেখেছে এবং যাদের জন্য জাহান্নামে চির অবস্থান ওয়াজিব হয়ে গেছে (অর্থাৎ মুশরিক ও কাফির)।

সহীহ মুসলিম, সুনান-ই- নাসাঈ, সুনান-ই- ইবনে মাজাহ্ ইত্যাদির মধ্যে শাফাআতের এই হাদীসটি বিদ্যমান রয়েছে। এখানে এই হাদীসটি আনার উদ্দেশ্য এই যে, এই হাদীসটির মধ্যে এ কথাটিও আছেঃ লোকেরা হযরত আদম (আঃ) কে বলবে ‘আল্লাহ আপনাকে সব জিনিষের নাম শিখিয়েছেন। অতঃপর ঐ জিনিষগুলো ফেরেশতাদের সামনে পেশ করেন এবং তাদেরকে বলেন-'তোমরা যদি তোমাদের একথায় সত্যবাদী হও যে, সমস্ত মাখলুক অপেক্ষা ভোমৱাই বেশী জ্ঞানী বা একথাই সঠিক যে, যমীনে আল্লাহ খলীফা বানাইবেন না, তবে এসব জিনিসের নাম বল। এটাও বর্ণিত আছে যে, যদি তোমরা এ কথায় সত্যবাদী হও বানী আদম বিবাদ বিসম্বাদ ও রক্তারক্তি করবে, তবে এ গুলোর নাম বল। কিন্তু প্রথমটিই বেশী সঠিক মত। যেন এতে এ ধমক রয়েছে যে, আচ্ছা! তোমরা যে বলছো যমীনে খলীফা হওয়ার যোগ্যে আমরাই, মানুষ নয়, যদি তোমরা এতে সত্যবাদী হও তবে যেসব জিনিষ তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোর নাম বলতো? আর যদি তোমরা তা বলতে না পার তবে তোমাদের এটা বুঝে নেয়া উচিত যে, যা তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোরই নাম তোমরা বলতে পারলে না, তবে ভবিষ্যতে আগত জিনিষের জ্ঞান তোমাদের কিরূপে হতে পারে? ' ফেরেশতারা এটা শোনা মাত্রাই আল্লাহ তা'আলার পবিত্র ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে এবং তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা বর্ণনা করতে আরম্ভ করলেন। আর বললেন যে, হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে যতটুকু শিখিয়েছেন, আমরা ততটুকুই জানি। সমস্ত জিনিষকে পরিবেষ্টনকারী জ্ঞান তো একমাত্র আপনারই আছে। আপনিই সমুদয় জিনিষের সংবাদ রাখেন। আপনার সমুদয় আদেশ ও নিষেধ হিকমত পরিপূর্ণ। যাকে কিছু শিখিয়ে দেন তাও হিকমত এবং যাকে শিক্ষা হতে বঞ্চিত রাখেন সেও হিকমতে। আপনি মহা প্রজ্ঞাময় ও ন্যায় বিচারক।

‘সুবহানাল্লাহ’-এর তাফসীর ও তার অর্থ

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, 'সুবহানাল্লাহ' -এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পবিত্রতা, অর্থাৎ তিনি সমস্ত অশ্লীলতা থেকে পবিত্র। হযরত উমার (রাঃ) একদা হযরত আলী (রাঃ) এবং তাঁর পার্শ্বে উপবিষ্ট অন্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তো জানি, কিন্তু সুবহানাল্লাহ' কি কালেমা?” হযরত আলী (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এ কালেমাটি মহান আল্লাহ নিজের জন্যে পছন্দ করেন এবং এতে তিনি খুব খুশী হন, আর এটা বলা তাঁর নিকট খুবই প্রিয়।” হযরত মাইমুন বিন মাহান (রঃ) বলেন যে, ওতে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং সমস্ত অশ্লীলতা হতে পবিত্র হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। হযরত আদম (আঃ) এভাবে নাম বলেছেনঃ “আপনার নাম জিবরাইল (আঃ), আপনার নাম মিকাঈল (আঃ), আপনার নাম ইসরাফীল (আঃ) এমন কি তাকে চিল, কাক ইত্যাদি সব কিছুর নাম জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সবই বলে দেন। ফেরেশতারা যখন হযরত আদম (আঃ)-এর মর্যাদার কথা বুঝতে পারলেন তখন আল্লাহ পাক তাদেরকে বললেনঃ “দেখ, আমি তোমাদেরকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, আমি প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় জানি।”

যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তোমরা উচ্চস্বরে বল (বা না বল), আল্লাহ গোপন হতে গোপনতম খবর জানেন। আরেক জায়গায় আছে “এ লোকেরা সেই আল্লাহকে কেন সিজদা করে না যিনি আকাশসমূহের ও পৃথিবীর গোপনীয় জিনিসগুলো বের করে থাকেন এবং যিনি তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সই জানেন? আল্লাহ একাই উপাস্য এবং তিনিই আরশ-ই-আযীমের প্রভু। তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ আমি তা জানি।” ভাবার্থ এই যে, ইবলীসের অন্তরে যে ফখর ও অহংকার লুকায়িত ছিল আল্লাহ অ জানতেন। আর ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তাতে ছিল প্রকাশ্য কথা। তাহলে আল্লাহ তা'আলা যে বললেনঃ “তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ, আমি সবই জানি” এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, ফেরেশতারা যা প্রকাশ করেছিলেন তা আল্লাহ জানেন এবং ইবলীস তার অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সেটাও তিনি জানতেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) ও সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সাওরীরও এটাই মত। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন। আবুল আলিয়া (রঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), হাসান (রঃ) এবং কাতাদার (রঃ) কথা এই যে, ফেরেশতাদের গোপনীয় কথা ছিলঃ যে মাখলূকই আল্লাহ পাক সৃষ্টি করুন না কেন, আমরাই তাদের চাইতে বেশী জ্ঞানী ও মর্যাদাবান হবো।' কিন্তু পরে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল এবং তারাও জানতে পারলেন যে, জ্ঞান ও মর্যাদা দুটোতেই হযরত আদম (আঃ) তাঁদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছেন। হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলেনঃ “যেমন তোমরা এসব জিনিসের নাম অবহিত নও, দ্রুপ তোমরা এটাও জানতে পার না যে, তাদের মধ্যে ভাল ও মন্দ উভয়ই হবে। তাদের মধ্যে কতকগুলো অনুগত হবে এবং কতকগুলো হবে অবাধ্য। আর পূর্বেই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাকে বেহেশত ও দোযখ দু'টোই পুরণ করতে হবে। কিন্তু তোমাদেরকে তার সংবাদ দেইনি। এখন ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আঃ) কে প্রদত্ত জ্ঞান উপলব্ধি করে তাঁর প্রধান্য স্বীকার করে নেন।

ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, সবচেয়ে উত্তম মত হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) মতটি। তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা যেন বলছেনঃ ‘ফেরেশতামণ্ডলী! আকাশ ও পৃথিবীর অদৃশ্যের জ্ঞান, তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয়তার জ্ঞান আমার আছে। তাদের প্রকাশ্য কথা এবং ইবলীসের গোপনীয় অহংকারের কথাও আল্লাহ জানতেন। এতে গোপনকারী শুধুমাত্র ইবলীস ছিল। কিন্তু বহুবচনের বা (আরবি) রূপ আনা হয়েছে। কেননা, আরবে এই প্রচলন আছে ও তাদের কথায় এটা পাওয়া যায় যে, তারা এক বা কয়েকজনের একটি কাজকে সকলের দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে থাকে। তারা বলে থাকেঃ সৈন্যগণকে মেরে ফেলা হয়েছে বা তারা পরাজিত হয়েছে। অথচ পরাজয় বা হত্যা একজনের বা কয়েকজনের হয়ে থাকে, কিন্তু তারা বহু বচনের রূপ এনে। থাকে।

বানূ তামীম গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে তার ঘরের পিছন হতে ডেকেছিল। কিন্তু কুরআন মাজীদে এর বর্ণনা নিম্নরূপে এসেছেঃ “যারা তোমাকে (নবী সঃ)-কে ঘরের পিছন থেকে ডেকে থাকে....।' তা হলে দেখা যাচ্ছে যে, ডাক দিয়েছিল একজনই কিন্তু রূপ আনা হয়েছে বহু বচনের। কাজেই ফেরেশতাদের মধ্যে গোপনকারী শুধু শয়তান হলেও বহু বচনের রূপ ব্যবহার করা হয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।