আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 269)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 269)



হরকত ছাড়া:

يؤتي الحكمة من يشاء ومن يؤت الحكمة فقد أوتي خيرا كثيرا وما يذكر إلا أولو الألباب ﴿٢٦٩﴾




হরকত সহ:

یُّؤْتِی الْحِکْمَۃَ مَنْ یَّشَآءُ ۚ وَ مَنْ یُّؤْتَ الْحِکْمَۃَ فَقَدْ اُوْتِیَ خَیْرًا کَثِیْرًا ؕ وَ مَا یَذَّکَّرُ اِلَّاۤ اُولُوا الْاَلْبَابِ ﴿۲۶۹﴾




উচ্চারণ: ইউ’তিল হিকমাতা মাইঁ ইয়াশাউ ওয়া মাইঁ ইউ’তাল হিকমাতা ফাকাদ ঊতিয়া খাইরান কাছীরাওঁ ওয়ামা-ইয়াযযাক্কারু ইল্লাউলুল আলবা-ব।




আল বায়ান: তিনি যাকে চান প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দেয়া হয়, তাকে অনেক কল্যাণ দেয়া হয়। আর বিবেক সম্পন্নগণই উপদেশ গ্রহণ করে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৬৯. তিনি যাকে ইচ্ছে হেকমত দান করেন। আর যাকে হেকমত(১) প্রদান করা হয় তাকে তো প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়; এবং বিবেকসম্পন্নগণই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: যাকে ইচ্ছে তিনি হিকমাত দান করেন এবং যে ব্যক্তি এ জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়, নিঃসন্দেহে সে মহাসম্পদ প্রাপ্ত হয় এবং উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানী।




আহসানুল বায়ান: (২৬৯) তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন, আর যাকে প্রজ্ঞা [1] প্রদান করা হয়, তাকে নিশ্চয় প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়। বস্তুতঃ শুধু জ্ঞানীরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।



মুজিবুর রহমান: তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন এবং যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয় সে নিশ্চয়ই প্রচুর কল্যাণ লাভ করে; বস্ত্ততঃ জ্ঞানবান ব্যক্তিগণ ব্যতীত কেহই উপলদ্ধি করতে পারেনা।



ফযলুর রহমান: তিনি যাকে চান প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয় তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়। বুদ্ধিমান মানুষ ছাড়া কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।



মুহিউদ্দিন খান: তিনি যাকে ইচ্ছা বিশেষ জ্ঞান দান করেন এবং যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়, সে প্রভুত কল্যাণকর বস্তু প্রাপ্ত হয়। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানবান।



জহুরুল হক: তিনি জ্ঞানদান করেন যাকে ইছে করেন, আর যাকে জ্ঞান দেওয়া হয় তাকে অবশ্যই অপার কল্যাণ দেওয়া হয়েছে। আর বোধশক্তির অধিকারী ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারে না।



Sahih International: He gives wisdom to whom He wills, and whoever has been given wisdom has certainly been given much good. And none will remember except those of understanding.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৬৯. তিনি যাকে ইচ্ছে হেকমত দান করেন। আর যাকে হেকমত(১) প্রদান করা হয় তাকে তো প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়; এবং বিবেকসম্পন্নগণই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।


তাফসীর:

(১) ‘হেকমত’ শব্দটি কুরআনুল কারীমে বার বার ব্যবহৃত হয়েছে। প্রত্যেক জায়গায় এর ব্যাখ্যায় বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এগুলো প্রায় কাছাকাছি উক্তি। হেকমতের আসল অর্থ প্রত্যেক বস্তুকে যথাস্থানে স্থাপন করা। এর পূর্ণত্ব শুধুমাত্র নবুওয়াতের মাধ্যমেই সাধিত হতে পারে। তাই এখানে হেকমত বলতে নবুওয়াতকে বোঝানো হয়েছে। রাগেব ইস্পাহানী বলেনঃ হেকমত শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা হলে এর অর্থ হবে সমগ্র বিষয়াদির পূর্ণ জ্ঞান এবং নিখুঁত আবিস্কার। অন্যের জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করা হলে এর অর্থ হয় সৃষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান এবং তদানুযায়ী কর্ম। এ অর্থটিই বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে। কোথাও এর অর্থ নেয়া হয়েছে কুরআন, কোথাও হাদীস, কোথাও বিশুদ্ধ জ্ঞান, কোথাও সৎকর্ম, কোথাও সত্যকথা, কোথাও সুস্থ বুদ্ধি, কোথাও দ্বীনের বোধ, কোথাও মতামতের নির্ভুলতা এবং কোথাও আল্লাহর ভয়। কেননা, আল্লাহর ভয়ই প্রকৃত হেকমত। আয়াতে হেকমতের ব্যাখ্যা সাহাবী ও তাবে-তাবেয়ীগণ কর্তৃক হাদীস ও সুন্নাহ বলে বর্ণিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, আলোচ্য আয়াতে উপরোল্লেখিত সবগুলো অর্থই বোঝানো হয়েছে। [বাহরে মুহীত]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৬৯) তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন, আর যাকে প্রজ্ঞা [1] প্রদান করা হয়, তাকে নিশ্চয় প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়। বস্তুতঃ শুধু জ্ঞানীরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।


তাফসীর:

[1] حِكمَة ‘হিকমত’এর অর্থ কেউ করেছেন, জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা। কেউ করেছেন, সঠিক মত বা সিদ্ধান্ত, কুরআনের ‘নাসেখ-মানসুখ’ এর জ্ঞান এবং বিচার শক্তি। আবার কারো নিকট ‘হিকমত’ হল, কেবল সুন্নাতের জ্ঞান অথবা কিতাব ও সুন্নাতের জ্ঞান। অথবা উপরোক্ত সব অর্থই ‘হিকমত’-এর আওতাভুক্ত। সহীহ বুখারী ও মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা করা বৈধ। এক ব্যক্তি হল সেই, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং সে তা সৎপথে ব্যয় করে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি হল সে, যাকে আল্লাহ হিকমত দান করেছেন যার দ্বারা সে বিচার-ফয়সালা করে এবং মানুষদেরকেও তা শিক্ষা দেয়।’’ (বুখারী, অধ্যায়ঃ ইলম, মুসলিম, অধ্যায়ঃ সালাতুল মুসাফেরীন)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৬৭ থেকে ২৬৯ নং আয়াতের তাফসীর:



শানে নুযূল:



বারা বিন আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: এ আয়াতটি আমাদের আনসারদের ব্যাপারে নাযিল হয়। আমরা ছিলাম খেজুরের মালিক। যার যেমন সাধ্য ছিল সে অনুযায়ী কম-বেশি দান করার জন্য নিয়ে আসত। কিছু মানুষ ছিল যাদের কল্যাণমূলক কাজে কোন উৎসাহ ছিল না। তাই তারা খারাপ ও নিম্নমানের খেজুর নিয়ে এসে মাসজিদে নাববীর খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে দিত। ফলে



(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا..... مِنْهُ وَفَضْلًا وَاللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ)



‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে যা উৎপন্ন করি তার মধ্য হতে পবিত্র জিনিস দান কর’নাযিল হয়। (সহীহ, তিরমিযী হা: ২৯৮৭) এ আয়াতের শানে নুযুলের ব্যাপারে এছাড়া আরো বর্ণনা পাওয়া যায়। (লুবাবুন নুকূল, পৃঃ ৫৭)



দান-সদাকাহ আল্লাহ তা‘আলার কাছে কবূল হওয়ার জন্য যেমন শর্ত হল দান-সদাকাহ করার পর খোঁটা বা কষ্ট দেয়া যাবে না, তেমনি আরো দু’টি শর্ত রয়েছে: (১) হালাল ও পবিত্র উপার্জন হতে দান করতে হবে। হালাল উপার্জন ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে হতে পারে অথবা কায়িম শ্রম ও চাকুরীর মাধ্যমেও হতে পারে। সেদিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন ‘তোমরা যা উপার্জন করেছ।’আবার জমি থেকে উৎপাদিত পবিত্র ফসল হতেও দান করা যাবে। সেদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন ‘আমি জমিন থেকে যা উৎপন্ন করি তার মধ্য হতে’। হারাম পন্থায় উপার্জন করে দান-সদাকাহ করলে, হজ্জ করলে কোন উপকারে আসবে না।



(২) যে দান-সদাকাহ করবে তাকেও সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত হতে হবে। কোন খারাপ নিয়তে কিংবা নাম-যশ অর্জনের উদ্দেশ্যে দান-সদাকাহ করলে তা আল্লাহ তা‘আলার কাছে কবুল হবে না। এ ব্যক্তি ঐ অজ্ঞ কৃষক সদৃশ, যে বীজকে অনুর্বর মাটিতে বপন করে, ফলে তা নষ্ট হয়ে যায়।



(أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ)



‘আমি জমিন থেকে যা উৎপন্ন করি’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা জমিন থেকে যা উৎপন্ন করেন যেমন: শস্য, গুপ্তধন ইত্যাদি। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: বৃষ্টি ও প্রবাহিত পানি দ্বারা সিক্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফসল বা সেচ ব্যতীত উর্বরতার ফলে উৎপন্ন ফসলের ওপর উশর (দশ ভাগের একভাগ) ওয়াজিব। আর সেচ দ্বারা উৎপাদিত ফসলের ওপর অর্ধ উশর (বিশ ভাগের এক ভাগ) ওয়াজিব। (সহীহ বুখারী হা: ১৪৮৩)



الْخَبِيْثُ বা ‘মন্দ জিনিস’এর দু’টি অর্থ হতে পারে:





(১) এমন জিনিস যা অবৈধ পথে উপার্জন করা হয়েছে। তা আল্লাহ তা‘আলার কাছে কবূল হবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



إِنَّ اللّٰهَ طَيِّبٌ لاَ يَقْبَلُ إِلاَّ طَيِّبًا



আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া গ্রহণ করেন না।



(২) খারাপ ও অতি নিম্নমানের জিনিস যা তাকে দেয়া হলে সে নিজেও নেবে না। এমন নষ্ট খারাপ জিনিস যা নিজে পছন্দ করে না তা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করলে আল্লাহ তা‘আলাও গ্রহণ করেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّي تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ ﹽ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللّٰهَ بِهِ عَلِيمٌ)



“তোমরা নেকী পাবে না যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় জিনিস আল্লাহর পথে খরচ কর। আর তোমরা যা কিছুই দান কর আল্লাহ তা জানেন।”(সূরা আলি-ইমরান ৩:৯২)



এসব খারাপ জিনিস তোমরাও তো চক্ষু বন্ধ না করে গ্রহণ করতে চাও না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّي يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ



তোমাদের কেউ ততক্ষণ পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের জন্য যা পছন্দ করো তা অপর ভাইয়ের জন্যও পছন্দ করো। (সহীহ বুখারী হা: ১৩)



আল্লাহ তা‘আলা এসব দান-সদাকাহ থেকে অনেক বড়, অমুখাপেক্ষী। আল্লাহ তা‘আলার এসব নির্দেশ শুধু পরীক্ষা করার জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لَنْ يَنَالَ اللّٰهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَي مِنْكُمْ)



“আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাক্ওয়া।”(সূরা হাজ্জ ২২:৩৭)



পরবর্তী আয়াতে শয়তানের কুমন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে। সৎ পথে ব্যয় করতে চাইলে শয়তান নিঃস্ব ও দরিদ্র হওয়ার ভয় দেখায়। পক্ষান্তরে অন্যায় অশ্লীল বেহায়াপনাপূর্ণ কাজে উৎসাহ দেয় এবং এমনভাবে চাকচিক্য করে তুলে ধরে যে, মানুষ তাতে ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।



মহান আল্লাহ তা‘আলা তার ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্র“তি দিচ্ছেন। যারা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে ফেরেশতা তাদের জন্য দু‘আ করে বলে, হে আল্লাহ! তোমার পথে যারা ব্যয় করে তুমি তাদের মাল আরো বৃদ্ধি করে দাও। আর যারা ব্যয় করে না তাদের মাল ধ্বংস করে দাও। (সহীহ বুখারী হা: ১৪৪২)



(وَمَنْ یُّؤْتَ الْحِکْمَةَ)



‘আর যাকে হিকমত দান করা হয়’হিকমাতের অর্থ কী তা অনেকে অনেক প্রকারে ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ বলেছেন: কুরআন; কেউ বলেছেন, নাসেখ, মানসূখ, হালাল, হারাম ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান। কেউ বলেছেন, কুরআন ও তার বুঝ। কেউ বলেছেন, কথায় ও কাজে সঠিকতা। কেউ বলেছেন, শরীয়তের রহস্য জানা ও বুঝা এবং কুরআন ও সুন্নাহ হিফজ করা ইত্যাদি। তবে মূল কথা হলো হিকমাতের মধ্যে সবকিছু শামিল।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: দু’ব্যক্তির সাথে ঈর্ষা করা বৈধ: ১. যাকে আল্লাহ তা‘আলা সম্পদ দান করেছেন। আর সে তা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে। ২. যাকে আল্লাহ তা‘আলা হিকমত শিক্ষা দিয়েছেন সে তা দ্বারা মানুষের মাঝে ফায়সালা করে এবং মানুষকে শিক্ষা দেয়। (সহীহ বুখারী হা: ৭৩)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. নিয়্যত খালেস রেখে আল্লাহ তা‘আলার পথে কেবল হালাল ও উত্তম জিনিস দান করতে হবে। হারাম ও নষ্ট বস্তু দান করে নেকীর আশা করা যায় না।

২. নিজের জন্য যা পছন্দ করি না তা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করলে কবুল হবে না।

৩. শয়তান সর্বদা মানুষকে খারাপ কাজে উৎসাহ দেয় আর দরিদ্রতার ভয় দেখায়।

৪. মানুষ যতই সম্পদশালী হোক সবচেয়ে বড় সম্পদ হল দীনের জ্ঞান, সকল সম্পদের ওপর জ্ঞানের মর্যাদা অনেক বেশি।

৫. আল্লাহ তা‘আলার ডাকে সাড়া দান ও প্রদর্শিত পথে আমল করা প্রশংসনীয় কাজ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন ব্যবসার মাল, যা আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন এবং সোনা, রূপা, শস্য ইত্যাদি যা তাদেরকে ভূমি হতে বের করে দেয়া হয়েছে তা হতে উত্তম ও পছন্দনীয় জিনিস তাঁর পথে খরচ করে। তারা যেন পঁচা, গলা ও মন্দ জিনিস আল্লাহর পথে না দেয়। আল্লাহ অত্যন্ত পবিত্র, তিনি অপবিত্র জিনিস গ্রহণ করেন না। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “এমন জিনিস তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করার ইচ্ছে করো না যা তোমাদের নিজেদেরকে দেয়া হলে তোমরাও তা গ্রহণ করতে সম্মত হতে না। সুতরাং তোমরা এই রকম জিনিস কিরূপে আল্লাহকে দিতে পারো: আর তিনি তা গ্রহণই যা করবেন কেন: তবে তোমরা যদি সম্পদ হাত ছাড়া হতে দেখে নিজের অধিকারের বিনিময়ে কোন পঁচা-গলা জিনিস বাধ্য হয়ে গ্রহণ করে নাও তাহলে অন্য কথা। কিন্তু আল্লাহ পাক তো তোমাদের মত বাধ্য ও দুর্বল নন যে, তিনি এই সব জঘন্য জিনিস গ্রহণ করবেন: তিনি কোন অবস্থাতেই এই সব জিনিস গ্রহণ করেন না। কিংবা ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তোমরা হালাল জিনিস ছেড়ে হারাম মাল হতে দান করো না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের রুজী তোমাদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন তদ্রুপ চরিত্রও তোমদের বেঁটে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া তার বন্ধুদেরকেও দেন এবং শক্রদেরকেও দেন। কিন্তু দ্বীন শুধু তার বন্ধুদেরকেই দান করে থাকেন। যে দ্বীন লাভ করে, সে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় পাত্র। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কোন বান্দা মুসলমান হতে পারে না যে পর্যন্ত না তার অন্তর ও তার জিহ্বা মুসলমান হয়। কোন বান্দা মুসলমান হতে পারবে না যে পর্যন্ত না তার প্রতিবেশী তার থেকে নির্ভয় হয়। জনগণের প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কষ্টের ভাবার্থ হচ্ছে প্রতারণা ও উৎপীড়ন। যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন না এবং তার দান-খয়রাতও গ্রহণ করেন না। যা সে ছেড়ে যায় তার জন্যে তা দুযখে যাবার পাথেয় ও কারণ হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দের দ্বারা দূর করেন না বরং মন্দকে ভাল দ্বারা দূর করেন! অপবিত্র জিনিস অপবিত্র জিনিস দ্বারা বিদূরিত হয় না। সুতরাং দু’টি উক্তি হলো-এক হলো মন্দ জিনিস এবং দ্বিতীয় হলো হারাম মাল।

হযরত বারা' বিন আযিব (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ খেজুরের মৌসুমে আনসারগণ নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী খেজুরের গুচ্ছ এনে মসজিদে নব্বীর (সঃ) দুটি স্তম্ভের মধ্যে ঝুলানো রজ্জুতে ঝুলিয়ে দিতেন। ঐগুলো আসহাব-ই-সুফফা ও দরিদ্র মুহাজিরগণ ক্ষুধার সময় খেয়ে নিতেন। সাদকার প্রতি আগ্রহ কম ছিল এরূপ একটি লোক ওতে খারাপ খেজুরের একটি গুচ্ছ এনে ঝুলিয়ে দেয়। সেই সময়। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বলা হয়, যদি তোমাদেরকে এই রকমই জিনিস উপঢৌকন স্বরূপ দেয়া হয় তবে তোমরা তা কখনও গ্রহণ করবে। অবশ্য মনে না চাইলেও যদি লজ্জার খাতিরে তা গ্রহণ করে নাও সেটা অন্য কথা। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই ভাল ভাল খেজুর নিয়ে আসতেন। (ইবনে জারীর) ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, মানুষ হালকা ধরনের খেজুর ও খারাপ ফল দানের জন্যে বের করতো। ফলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই রকম জিনিস দান করতে নিষেধ করেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাগফাল (রাঃ) বলেন যে, মুমিনের উপার্জন কখনও জঘন্য হতে পারে না। ভাবার্থ এই যে, তোমরা। বাজে জিনিস দান করো না। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গো-সাপের (গুইসাপ) গোত আনা হলে তিনি নিজেও খেলেন না এবং কাউকে খেতে নিষেধও করলেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “কোন মিসকীনকে দেবো কি: রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা নিজেরা যা খেতে চাও না তা অপরকে খেতে দিও না। হযরত বারা (রাঃ) বলেনঃ “যখন তোমাদের কারও উপর কোন দাবী থাকে এবং সে তোমাকে এমন জিনিস দেয় যা বাজে ও মূল্যহীন তবে তোমরা তা কখনও গ্রহণ করবে না, কিন্তু যখন তোমাদের হক নষ্ট হতে দেখবে তখন তোমরা চক্ষু বন্ধ করে তা নিয়ে নেবে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ এই যে, তোমরা কাউকে উত্তম মাল ধার দিয়েছে, কিন্তু পরিশোধ করার সময় সে নিকৃষ্ট মাল নিয়ে আসছে, এইরূপ অবস্থায় তোমরা কখনও ঐ মাল গ্রহণ করবে না। আর যদি গ্রহণ করও তবে মূল্য কমিয়ে দিয়ে তা গ্রহণ করবে। তাহলে যে জিনিস তোমরা নিজেদের হকের বিনিময়ে গ্রহণ কর না, তা তোমরা আল্লাহর হকের বিনিময়ে কেন দেবে: সুতরাং তোমরা উত্তম ও পছন্দনীয় মাল আল্লাহর পথে খরচ কর। এই অর্থই হচ্ছেঃ (আরবি) এই আয়াতটির। অর্থাৎ ‘তোমরা কখনও পুণ্য লাভ করতে পার না যে পর্যন্ত না তোমাদের পছন্দনীয় মাল হতে খরচ কর। (৩:৯২) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ যে তোমাদেরকে তাঁর পথে উত্তম ও পছন্দনীয় মাল খরচ করার নির্দেশ প্রদান করলেন, এই জন্যে তোমরা এই কথা বুঝে নিও না যে, আল্লাহ তোমাদের (আরবি) মুখাপেক্ষী। না, না, তিনি তো সম্পূর্ণরূপে অভাব মুক্ত। তিনি কারও প্রত্যাশী নন। বরং তোমরা সবাই তার মুখাপেক্ষী। তাঁর নির্দেশ শুধু এই জন্যেই যে, দরিদ্র লোকেরাও যেন দুনিয়ার নিয়ামতসমূহ হতে বঞ্চিত না থাকে। যেমন অন্য জায়গায় কুরবানীর হুকুমের পরে বলেছেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ আল্লাহর নিকট কুরবানীর গোশতও পৌছে না এবং রক্তও পৌছে না; কিন্তু তাঁর নিকট তোমাদের সংযমশীলতা পৌছে থাকে (২২:৩৭)।' তিনি বিপুল দাতা। তাঁর ধনভাণ্ডারে কোন কিছুর স্বল্পতা নেই। হালাল ও পবিত্র মাল হতে সাদকা বের করে আল্লাহর অনুগ্রহ ও মহাদানের প্রতি লক্ষ্য কর। এর বহুগুণ বৃদ্ধি করে তিনি তোমাদেরকে প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি দরিদ্রও নন, অত্যাচারীও নন। তিনি প্রশংসিত। সমস্ত কথায় ও কাজে তারই প্রশংসা করা হয়। তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নয়। তিনি সারা জগতের পালন কর্তা। তিনি ব্যতীত কেউ কারও পালন কর্তা নয়। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বানী আদমের মনে শয়তান এক ধারণা জন্মিয়ে থাকে এবং ফেরেশতা এক ধারণা জন্মিয়ে থাকে। শয়তান দুষ্টামি ও সত্যকে অবিশ্বাস করার প্রতি উত্তেজিত করে এবং ফেরেশতা সৎকাজের প্রতি এবং সত্যকে স্বীকার করার প্রতি উৎসাহিত করে। যার মনে এই ধারণা আসবে সে যেন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং জেনে নেয় যে, এটা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়েছে। আর যার মনে ঐ ধারণা আসবে সে যেন আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। শেষে (আরবি) (২:২৬৮) এই আয়াতটি তিনি পাঠ করেন। (তিরমিযী) এই হাদীসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হতে মাওকুফ রূপেও বর্ণিত আছে। পবিত্র আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলার পথে খরচ করতে শয়তান বাধা দেয় এবং মনে কু-ধারণা জন্মিয়ে দেয় যে, এইভাবে খরচ করলে সে দরিদ্র হয়ে যাবে। এই কাজ হতে বিরত রাখার পর তাকে পাপের কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে এবং আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে, অবৈধ কাজে এবং সত্যের বিরুদ্ধাচরণের কাজে উত্তেজিত করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা'আলা এর বিপরীত নির্দেশ দেন যে, সে যেন তাঁর পথে খরচ করা হতে বিরত না হয় এবং শয়তানের, ধমকের উল্টো বলেন যে, ঐ দানের বিনিময়ে তিনি তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর সে যে তাকে দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয় দেখাচ্ছে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আল্লাহ তাকে তার সীমাহীন অনুগ্রহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে বলছেন। তাঁর চেয়ে অধিক দাতা, দয়ালু ও অনুগ্রহশীল আর কে হতে পারে: আর পরিণামের জ্ঞান তার অপেক্ষা বেশী কার থাকতে পারে। এখানে ‘হিকমত’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফের পূর্ণ পারদর্শিতা লাভ, যার দ্বারা রহিতকৃত ও রহিতকারী, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট, পূর্বের ও পরের, হালাল ও হারামের এবং উপমার আয়াতসমূহের পূর্ণ পরিচয় লাভ হয়। ভাল-মন্দ পড়তে তো সবাই পারে কিন্তু ওর ব্যাখ্যা ও অনুধাবন হচ্ছে ঐ হিকমত, যা মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। আর যাকে এই হিকমত দান করা হয় সে প্রকৃত ভাবার্থ জানতে পারে এবং কথার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে। তার মুখে সঠিক ভাবার্থ উচ্চারিত হয়। সত্য জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবন সে লাভ করে বলেই তার অন্তরে আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মারফু হাদীসেও রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘হিকমতের মূল হচ্ছে আল্লাহর ভয়। পৃথিবীতে এইরূপ বহু লোক রয়েছে যারা ইহলৌকিক বিদ্যায় বড়ই পারদর্শী। দুনিয়ার বিষয়সমূহে তারা পূর্ণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে থাকে। কিন্তু তারা ধর্ম বিষয়ে একেবারেই অন্ধ। আবার পৃথিবীতে বহু লোক এমনও রয়েছেন যারা ইহলৌকিক বিদ্যায় দুর্বল বটে, কিন্তু শরীয়তের বিদ্যায় তারা বড়ই পারদর্শী। সুতরাং এটাই ঐ হিকমত যা আল্লাহ তা'আলা এঁদেরকে দিয়েছেন এবং ওরদেরকে বঞ্চিত রেখেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে হিকমতের ভাবার্থ হচ্ছে নবুওয়াত'। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, হিকমত' শব্দটির মধ্যে এই সবগুলোই মিলিত রয়েছে। আর নবুওয়াতও হচ্ছে ওর উঁচু ও বড় অংশ এবং এটা শুধু নবীদের (আঃ) জন্যেই নির্দিষ্ট রয়েছে। তারা ছাড়া এটা কেউ লাভ করতে পারে না। কিন্তু যারা নবীদের অনুসারী তাদেরকেও আল্লাহ পাক হিকমতের অন্যান্য অংশ হতে বঞ্চিত রাখেননি। সত্য জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবনরূপ সম্পদ তাদেরকেও দান করা হয়েছে। কোন কোন হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন মাজীদ মুখস্থ করেছে, তার স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যস্থলে নবুওয়াত চড়ে বসে; কিন্তু তার নিকট ওয়াহী করা হয় না। কিন্তু অপরপক্ষে বলা হয়েছে যে, হাদীসটি দুর্বল। কেননা বর্ণিত আছে যে, এটা হযরত আবদুল্লাহ বিন আমরের (রাঃ) নিজস্ব উক্তি। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ দুই ব্যক্তি ছাড়া কারও প্রতি হিংসা করা যায় না। এক ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ মাল-ধন দিয়েছেন। অতঃপর তাকে ঐ মাল তার পথে খরচ করার তওফীক প্রদান করেছেন। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ প্রজ্ঞা দান করেছেন, অতঃপর সে সেই প্রজ্ঞা অনুযায়ী মীমাংসা করে এবং তা শিক্ষা দিয়ে থাকে। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে থাকে যারা জ্ঞান ও বিবেকের অধিকারী। অর্থাৎ যারা আল্লাহর কালাম ও রাসূলের হাদীস পড়ে বুঝবার চেষ্টা করে, কথা মনে রাখে এবং ভাবার্থের প্রতি মনোযোগ দেয় তারাই ভাবার্থ উপলব্ধি করতে পারে। সুতরাং উপদেশ দ্বারা তারাই উপকৃত হয়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।