সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 244)
হরকত ছাড়া:
وقاتلوا في سبيل الله واعلموا أن الله سميع عليم ﴿٢٤٤﴾
হরকত সহ:
وَ قَاتِلُوْا فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ اعْلَمُوْۤا اَنَّ اللّٰهَ سَمِیْعٌ عَلِیْمٌ ﴿۲۴۴﴾
উচ্চারণ: ওয়াকা-তিলূ ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়া‘লামূ আন্নাল্লা-হা ছামী‘উন ‘আলীম।
আল বায়ান: আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই কর এবং জেনে রাখ নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪৪. আর তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর এবং জেনে রেখ, আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
আহসানুল বায়ান: (২৪৪) তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
মুজিবুর রহমান: তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর এবং জেনে রেখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।
ফযলুর রহমান: তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করো আর জেনে রাখ, আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহর পথে লড়াই কর এবং জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু শুনেন।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্র রাস্তায় সংগ্রাম করো, আর জেনে রেখো -- নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।
Sahih International: And fight in the cause of Allah and know that Allah is Hearing and Knowing.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৪৪. আর তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৪৪) তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৪৩-২৪৫ নং আয়াতের তাফসীর:
২৪৩ নং আয়াতে বর্ণিত ঘটনা বানী ইসরাঈলের কোন এক জাতির সাথে সম্পৃক্ত। সহীহ হাদীসে এর বিস্তারিত বর্ণনা আসেনি। তারা তাদের বাড়ি থেকে মৃত্যুর ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পালিয়েও মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পায়নি। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মহামারি দ্বারা ধ্বংস করে দিলেন। পরে নাবী হিযক্বীল (আঃ)-এর দু‘আয় আল্লাহ তা‘আলা সকলকে জীবিত করেন। এরা জিহাদে নিহত হওয়ার ভয়ে অথবা মহামারী রোগের ভয়ে নিজেদের ঘর বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে গিয়েছিল; যাতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মৃত্যু দিয়ে প্রথমতঃ এ কথা জানিয়ে দিলেন যে, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নির্ধারিত মৃত্যু থেকে পলায়ন করে তোমরা কোথাও যেতে পারবে না। দ্বিতীয়তঃ এ কথাও জানিয়ে দিলেন যে, মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হলেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তৃতীয়তঃ আল্লাহ তা‘আলা পুনরায় সৃষ্টি করার ওপর ক্ষমতাবান। তিনি সমস্ত মানুষকে সেভাবে জীবিত করবেন যেমন তাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করলেন।
তাই মৃত্যুর ভয়ে জিহাদ করা থেকে বিরত থাকা বা পলায়ন করার কোন সুযোগ নেই। কারণ মৃত্যু যার যেখানে রয়েছে সেখানেই হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ)
“তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও।” (সূরা নিসা ৪:৭৮)
(قَرْضًا حَسَنًا)
‘উত্তম ঋণ’প্রদান করার অর্থ: আল্লাহ তা‘আলার পথে এবং জিহাদে মাল ব্যয় করা। অর্থাৎ জানের সাথে মাল কুরবানী দিতেও দ্বিধাবোধ কর না।
যারা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে তাদের সম্পদ আল্লাহ তা‘আলা বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَثَلُ الَّذِیْنَ یُنْفِقُوْنَ اَمْوَالَھُمْ فِیْ سَبِیْلِ اللہِ کَمَثَلِ حَبَّةٍ اَنْۭبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِیْ کُلِّ سُنْۭبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍﺚ وَاللہُ یُضٰعِفُ لِمَنْ یَّشَا۬ئُﺚ وَاللہُ وَاسِعٌ عَلِیْمٌ)
“যারা আল্লাহর পথে তাদের মাল খরচ করে তাদের উদাহরণ হচ্ছে একটি শস্যদানা যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে। প্রত্যেক শীষে এক শত শস্যদানা থাকে আর আল্লাহ যাকে চান তাকে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ প্রশস্তকারী, মহাজ্ঞানী।”(সূরা বাকারাহ ২:২৬১)
এটি মনে করা যাবে না যে, আল্লাহ তা‘আলা অভাবগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন যার ফলে তিনি ঋণ চাচ্ছেন। আসলে বিষয়টি এমন নয়। আল্লাহ তা‘আলার কোন ঋণের প্রয়োজন নেই, তিনি অমুখাপেক্ষী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللّٰهِ بَاقٍ)
“তোমাদের নিকট যা আছে তা নিঃশেষ হবে এবং আল্লাহর নিকট যা আছে তা স্থায়ী।”(সূরা নাহল ১৬:৯৬)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاللّٰهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَآءُ)
“আল্লাহ হলেন ধনী (অমুখাপেক্ষী) আর তোমরা হচ্ছ অভাবগ্রস্ত (মুখাপেক্ষী)।”(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩৮)
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে করযে হাসানা দেয়ার অর্থ হলো আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করা এবং আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে অসহায় ব্যক্তিদের করযে হাসানা বা সাহায্য-সহযোগিতা দেয়া।
আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা রিযিক বৃদ্ধি করে দেন আবার যাকে ইচ্ছা রিযিক কমিয়ে দেন। এতে কারো হাত নেই।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কোন শহর বা এলাকায় মহামারি দেখা দিলে সে এলাকা থেকে বের হওয়া নিষেধ। অনুরূপভাবে বাইরের এলাকা থেকে প্রবেশ করাও নিষেধ।
২. মুসলিম নেতা যখন জিহাদে যোগদানের আহ্বান জানাবে তখন সকলের জন্য জিহাদ করা ওয়াজিব।
৩. আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করার ফযীলাত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৪৩-২৪৫ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলো সংখ্যায় চার হাজার ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা ছিল আট হাজার। কেউ বলেন ন'হাজার, কেউ বলেন চল্লিশ হাজার এবং কেউ ত্রিশ হাজারের কিছু বেশী বলে থাকেন। এরা যাওয়ারদান' নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল যা ওয়াসিতের দিকে রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা আযরাআত নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল। তারা প্লেগের ভয়ে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা একটি গ্রামে এসে উপস্থিত হলে আল্লাহর নির্দেশক্রমে সবাই মরে যায়। ঘটনাক্রমে একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তাঁর প্রার্থনার ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনর্জীবিত করেন। কেউ কেউ বলেন যে, তারা একটি জনশূন্য নির্মল বায়ুযুক্ত খোলা মাঠে অবস্থান করেছিল। অতঃপর তারা দু'জন ফেরেশতার চীৎকারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে তাদের অস্থিগুলোও চুনে পরিণত হয়। সেই জায়গায় জনবসতি বসে যায়। একদা হিযকীল নামে বানী ইসরাঈলের একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাদের পুনর্জীবনের জন্যে প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন। আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দেন : “তুমি বল- “হে গলিত অস্থিগুলো! আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে তোমরা একত্রিত হয়ে যাও। অতঃপর প্রত্যেক শরীরের অস্থির কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। এরপর তার উপর আল্লাহর নির্দেশ হলো : তুমি বলহে অস্থিগুলো! আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে তোমরা গোত, শিরা ইত্যাদিও তোমাদের উপর মিলিয়ে নাও।' অতঃপর ঐ নবীর (আঃ) চোখের সামনে এটাও হয়ে গেল। এরপর তিনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে আত্মাগুলোকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আত্মাসমূহ! তোমরা আল্লাহ তাআলার হুকুমে পূর্বের নিজ নিজ দেহের ভিতর প্রবেশ কর। সঙ্গে সঙ্গে যেমন তারা এক সাথে সব মরে গিয়েছিল তেমনই সবাই এক সাথে জীবিত হয়ে গেল এবং স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের মুখে উচ্চারিত হলোঃ (আরবি) অর্থাৎ আপনি পবিত্র। আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই।' কেয়ামতের দিন ঐ দেহের সঙ্গেই দ্বিতীয়বার আত্মার উত্থিত হওয়ার এটা দলীল।
অতঃপর বলা হচ্ছে, মানুষের উপর আল্লাহ তা'আলার বড় অনুগ্রহ রয়েছে। যে, তিনি মহাশক্তির বড় বড় নিদর্শনাবলী তাদেরকে প্রদর্শন করছেন। কিন্তু এটা সত্ত্বেও অধিকাংশ লোক মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রাণ রক্ষা ও আশ্রয় লাভের অন্য কোন উপায় নেই। ঐ লোকগুলো প্লেগের ভয়ে পলায়ন করছিল এবং ইহলৌকিক জীবনের প্রতি লোভী ছিল, তাই তাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি এসে যায় এবং তার ধ্বংস হয়ে যায়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, যখন উমার (রাঃ) সিরিয়ার দিকে গমন করেন এবং সারাবা নামক স্থানে পৌছেন তখন হযরত আবু ওবাইদাহ বিন জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সেনাপতিদের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁরা তাঁকে সংবাদ দেন যে, সিরিয়ায় আজকাল প্লেগ রোগ রয়েছে। এখন তারাও তথায় যাবেন কি যাবেন না এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। অবশেষে হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) এসে তাদের সাথে মিলিত হন এবং বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি : যখন এমন জায়গায় প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে যেখানে তোমরা অবস্থান করছে তখন তোমরা তার ভয়ে পলায়ন করো না। আর যখন তোমরা কোন জায়গায় বসে থাকার সংবাদ শুনতে পাও তখন তোমরা তথায় যেও না।' হযরত উমার ফারূক (রাঃ) একথা শুনে আল্লাহর প্রশংসা করতঃ তথা হতে ফিরে যান (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।
অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ “এটা আল্লাহর শাস্তি যা পূর্ববর্তী উম্মতদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “ঐ লোকদের পলায়ন যেমন তাদেরকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারলো না দ্রুপ তোমাদেরও যুদ্ধ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া বৃথা। মৃত্যু ও আহার্য দু'টোই ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। নির্ধারিত আহার্য বাড়বেও না কমবেও না।, দ্রুপ মৃত্যুও নির্ধারিত সময়ের পূর্বেও আসবে না বা পিছনেও সরে যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছে : যারা আল্লাহর পথ হতে সরে পড়েছে এবং তাদের সঙ্গীদেরকেও বলছে এই যুদ্ধে শহীদগণও যদি আমাদের অনুসরণ করতো তবে তারাও নিহত হতো না। তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের নিজেদের জীবন হতে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও তো:
অন্য স্থানে রয়েছে : তারা বলে-হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করেছেন কেন: কেন আমাদেরকে সামান্য কিছু দিনের জন্যে অবসর দিলেন না: তুমি বল-ইহলৌকিক জগতের পুঁজি সামান্য এবং যে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্যে পরকালই উত্তম এবং তোমরা এতটুকুও অত্যাচারিত হবে না।' অন্যত্র রয়েছে। তোমাদেরকে মৃত্যু পেয়ে যাবেই যদিও তোমরা উচ্চতম শিখরে অবস্থান কর।' এস্থলে ইসলামী সৈনিকদের উদ্যমশীল নেতা, বীর পুরুষদের অগ্রগামী, আল্লাহর তরবারী এবং ইসলামের আশ্রয়স্থল আবূ সুলাইমান হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) ঐ উক্তি উদ্ধৃত করা সম্পূর্ণ সময়গাপযোগী হবে যা তিনি ঠিক মৃত্যুর সময় বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ও মৃত্যুকে ভয়কারী, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী কাপুরুষের দল কোথায় রয়েছে: তারা দেখুক যে, আমার গ্রন্থীসমূহ আল্লাহর পথে আহত হয়েছে। দেহের কোন জায়গা এমন নেই যেখানে তীর, তরবারী, বর্শা ও বল্লমের আঘাত লাগেনি। কিন্তু দেখ যে, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকে বিছানায় পড়ে মৃত্যুবরণ করছি।
অতঃপর বিশ্বপ্রভু তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর পথে খরচ করার উৎসাহ দিচ্ছেন। এরূপ উৎসাহ তিনি স্থানে স্থানে দিয়েছেন। হাদীস-ই-নযুলেও রয়েছে : ‘কে এমন আছে যে, সেই আল্লাহকে ঋণ প্রদান করবে যিনি না দরিদ্র, না অত্যাচারী: (আরবি) (২:২৪৫) এই আয়াতটি শুনে হযরত আবুদ দাহ্দাহ আনসারী (রাঃ) বলেছিলেন : হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ‘আল্লাহ্ কি আমাদের নিকট ঋণ চাচ্ছেন:' তিনি বলেন 'হাঁ'। হযরত আবুদ দাহ্দাহ্ তখন বলেনঃ আমাকে আপনার হাত খানা দিন। অতঃপর তিনি তার হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত নিয়ে বলেনঃ আমি আমার ছয়শো খেজুর বৃক্ষ বিশিষ্ট বাগানটি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ মহান সম্মানিত প্রভুকে ঋণ প্রদান করলাম। সেখান হতে সরাসরি তিনি বাগানে আগমন করেন এবং স্ত্রীকে ডাক দেন : “হে উম্মুদ্দাহ্দাহ্!' স্ত্রী উত্তরে বলেনঃ আমি উপস্থিত রয়েছি। তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি বেরিয়ে এসো। আমি এই বাগানটি আমার মহা সম্মানিত প্রভুকে ঋণ দিয়েছি (তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম)। কর-ই-হাসানা’-এর ভাবার্থ আল্লাহ তা'আলার পথেও খরচ হবে, সন্তানদের জন্যেও খরচ হবে এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতাও বর্ণনা করা হবে।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তা দ্বিগুণ চারগুণ করে দেবেন'। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ আল্লাহর পথে ব্যয়কারীর দৃষ্টান্ত ঐ শস্য বীজের ন্যয় যার সাতটি শীষ বের হয়ে থাকে এবং প্রত্যেক শীষে একশটি করে দানা থাকে এবং আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করেন তার চেয়েও বেশী দিয়ে থাকেন। এই আয়াতের তাফসীর ইনশাআল্লাহ অতি সত্ত্বরই আসছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে হযরত আবু উসমান নাহদী (রঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমি শুনেছি যে,আপনি বলেনঃ “ এক একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লক্ষ পুণ্য পাওয়া যায়। (এটা কি সত্য):' তিনি বলেনঃ ‘এতে তুমি কি বিস্ময়বোধ করছো: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নিকট শুনেছিঃ একটি পুণ্যের বিনিময়ে দু’লক্ষ পূণ্য পাওয়া যায় (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। কিন্তু এই হাদীসটি গরীব।
তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু উসমান নাহদী বলেনঃ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) খিদমতে আমার চেয়ে বেশী কেউ থাকতেন না। তিনি হজ্বে গমন করলে তার পিছনে আমিও গমন করি। আমি বসরায় গিয়ে শুনতে পাই যে, জনগণ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করছেন। তাদেরকে আমি বলিঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমিই সবচেয়ে বেশী তাঁর সাহচর্যে থেকেছি। আমি কখনও তাঁর নিকট এই হাদীসটি শুনিনি।'
অতঃপর আমার ইচ্ছে হলো যে, স্বয়ং আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে আমি জিজ্ঞেস করবো। আমি তথা হতে এখানে চলে আসি। এসে জানতে পারি যে, তিনি হজে চলে গেছেন। আমি শুধুমাত্র একটি হাদীসের জন্যে মক্কা চলে আসি। তথায় তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। আমি তাঁকে বলিঃ জনাব! বসরাবাসী আপনার উদ্ধৃতি দিয়ে এটা কিরূপ বর্ণনা দিচ্ছে:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়ের কি আছে:' অতঃপর এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার এই কথাটিও পড়ঃ(আরবি)
অর্থাৎ ইহলৌকিক জীবনের আসবাবপত্র পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। (৯:৩৮) আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি যে, একটি পুণ্যের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা দু’লক্ষ পুণ্য দান করে থাকেন।
জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে এই বিষয়ের নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে : যে ব্যক্তি বাজারে গিয়ে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই, তিনি এক,তাঁর কেউ অংশীদার নেই, তার জন্যে সাম্রাজ্য ও তাঁর জন্যেই প্রশংসা এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান- এ দু'আটি পাঠ করে, আল্লাহ তার জন্যে এক লাখ পুণ্য লিখেন এবং এক লাখ পাপ ক্ষমা করে দেন। তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে(আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রার্থনা করেন: হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে আরও বেশী দান করুন।
অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখনও তিনি এই প্রার্থনাই করেন। তখন (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান পূর্ণভাবে ও অপরিমিতভাবে দেয়া হবে’ (৩৯:১০) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত কা'ব বিন আহবর (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি বলেনঃ আমি এক ব্যক্তির নিকট শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সূরা-ই (আরবি) একবার পাঠ করে তার জন্যে বেহেশতে দশ লক্ষ অট্টালিকা তৈরি হয়, এটা কি সত্য:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়বোধ করার কি আছে: বরং বিশ লক্ষ, ত্রিশ লক্ষ এবং আরও এত বেশী যে, ওগুলো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারে না।'
অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা যখন (আরবি) অর্থাৎ বহু গুণ’ বলেছেন তখন তা গণনা করা মানুষের ক্ষমতার মধ্যে কি করে থাকতে পারে:' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “আহার্যের হ্রাস ও বৃদ্ধি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আল্লাহর পথে খরচ করাতে কার্পণ্য করো না। যাকে তিনি বেশী দিয়েছেন তার মধ্যেও যুক্তিসঙ্গতা রয়েছে এবং যাকে দেননি তার মধ্যেও দুরদর্শিতা রয়েছে। তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন তার নিকট প্রত্যাবর্তীত হবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।