আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 24)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 24)



হরকত ছাড়া:

فإن لم تفعلوا ولن تفعلوا فاتقوا النار التي وقودها الناس والحجارة أعدت للكافرين ﴿٢٤﴾




হরকত সহ:

فَاِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا وَ لَنْ تَفْعَلُوْا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیْ وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَ الْحِجَارَۃُ ۚۖ اُعِدَّتْ لِلْکٰفِرِیْنَ ﴿۲۴﴾




উচ্চারণ: ফাইল্লাম তাফ‘আলূওয়া লান তাফ‘আলূফাত্তাকুন্না-রাল্লাতী ওয়াকূদুহান্না-ছুওয়াল হিজা-রাতু উ‘ইদ্দাত লিলকা-ফিরীন।




আল বায়ান: অতএব যদি তোমরা তা না কর- আর কখনো তোমরা তা করবে না- তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. অতএব যদি তোমরা তা করতে না পার আর কখনই তা করতে পারবে না(১), তাহলে তোমরা সে আগুন থেকে বাঁচার ব্যবস্থা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর(২), যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে(৩) কাফেরদের জন্য।




তাইসীরুল ক্বুরআন: যদি তোমরা না পার এবং কক্ষনো পারবেও না, তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যা প্রস্তুত রয়েছে কাফেরদের জন্য।




আহসানুল বায়ান: ২৪। যদি তোমরা তা (আনয়ন) না কর, এবং কখনই তা করতে পারবে না, (1) তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, (2) অবিশ্বাসীদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে। (3)



মুজিবুর রহমান: অতঃপর যদি তোমরা তা করতে না পার এবং তোমরা তা কখনও করতে পারবেনা, তাহলে তোমরা সেই জাহান্নামের ভয় কর যার খোরাক মনুষ্য ও প্রস্তর খন্ড - যা অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।



ফযলুর রহমান: আর যদি তা করতে না পার—এবং অবশ্যই তা পারবেনা—তাহলে (জাহান্নামের) সেই আগুনকে ভয় করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর; এবং যা অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।



মুহিউদ্দিন খান: আর যদি তা না পার-অবশ্য তা তোমরা কখনও পারবে না, তাহলে সে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য।



জহুরুল হক: কিন্তু যদি তোমরা না করো -- আর তোমরা কখনো পারবে না -- তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানি হচ্ছে মানুষ এবং পাথরগুলো, -- তৈরি হয়েছে অবিশ্বাসীদের জন্য।



Sahih International: But if you do not - and you will never be able to - then fear the Fire, whose fuel is men and stones, prepared for the disbelievers.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৪. অতএব যদি তোমরা তা করতে না পার আর কখনই তা করতে পারবে না(১), তাহলে তোমরা সে আগুন থেকে বাঁচার ব্যবস্থা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর(২), যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে(৩) কাফেরদের জন্য।


তাফসীর:

১. এটা কুরআনের বিশেষ মু'জিযা। একমাত্র কুরআনই নিঃসংকোচে সর্বকালের জন্য নিজ স্বীকৃত সত্তার এভাবে ঘোষণা দিতে পারে। যেভাবে রাসূলের যুগে কেউ এ কুরআনের মত আনতে পারে নি। তেমনি কুরআন এ ঘোষণাও নিঃশঙ্ক ও নিঃসংকোচে দিতে পেরেছে যে, যুগের পর যুগের জন্য, কালের পর কালের জন্য এই চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হচ্ছে যে, এ কুরআনের মত কোন কিতাব কেউ কোন দিন আনতে পারবে না। অনুরূপই ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে। রাসূলের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত কেউ এ কুরআনের মত কিছু আনার দুঃসাহস দেখাতে পারে নি। আর কোনদিন পারবেও না। গোটা বিশ্বের যিনি সৃষ্টিকর্তা তার কথার সমকক্ষ কোন কথা কি কোন সৃষ্টির পক্ষে আনা সম্ভব?


২. ইবনে কাসীর বলেন, এখানে পাথর দ্বারা কালো গন্ধক পাথর বোঝানো হয়েছে। গন্ধক দিয়ে আগুন জ্বালালে তার তাপ ভীষণ ও স্থায়ী হয়। আসমান যমীন সৃষ্টির সময়ই আল্লাহ্ তা'আলা কাফেরদের জন্য তা সৃষ্টি করে প্রথম আসমানে রেখে দিয়েছেন। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে ঐ সমস্ত পাথর উদ্দেশ্য, যেগুলোর ইবাদাত করা হয়েছে। [ইবনে কাসীর] আর জাহান্নামের আগুন সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, “তোমাদের এ আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ এক ভাগ দিয়ে শাস্তি দিলেই তো যথেষ্ট হতো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, জাহান্নামের আগুন তোমাদের আগুনের তুলনায় উনসত্তর গুণ বেশী উত্তপ্ত [বুখারী ৩২৬৫, মুসলিম: ২৪৮৩]


৩. এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যা হচ্ছে, জাহান্নাম কাফেরদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এখানে أُعِدَّتْ এর সর্বনামটির ইঙ্গিত সুস্পষ্টতই মানুষ ও পাথর দ্বারা প্রজ্জ্বলিত জাহান্নামের দিকে। অবশ্য এ সর্বনামটি পাথরের ক্ষেত্রেও হতে পারে। তখন অর্থ দাঁড়ায়, পাথরগুলো কাফেরদের শাস্তি প্রদানের জন্য তৈরী করে রাখা হয়েছে। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অনুরূপ তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে উভয় অর্থের মধ্যে বড় ধরনের কোন তফাৎ নেই। একটি অপরটির পরিপূরক ও পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আগুন বিহীন যেমন পাথর জ্বলে না, তেমনি পাথর বিহীন আগুনের দাহ্য ক্ষমতাও বাড়ে না। সুতরাং উভয় উপাদানই কাফেরদের কঠোর শাস্তি দেয়ার জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

আয়াতের এ অংশ দ্বারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণ দলীল নেন যে, জাহান্নাম বর্তমানে তৈরী করা অবস্থায় আছে। জাহান্নাম যে বাস্তবিকই বর্তমানে রয়েছে তার প্রমাণ অনেক হাদীস দ্বারা পাওয়া যায়। যেমন, জাহান্নাম ও জান্নাতের বিবাদের বর্ণনা সংক্রান্ত হাদীস [বুখারী ৪৮৪৯, মুসলিম: ২৮৪৬] , জাহান্নামের প্রার্থনা মোতাবেক তাকে বছরে শীত ও গ্রীষ্মে দুই বার শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণের অনুমতি প্রদানের বর্ণনা [বুখারী ৫৩৭, মুসলিম: ৬৩৭] ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এক হাদীসে আছে, “আমরা একটি বিকট শব্দ শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার কারণ জানতে চাওয়ায় তিনি বললেন, এটা সত্তর বছর পূর্বে জাহান্নামের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত পাথর জাহান্নামে পতিত হওয়ার আওয়ায। (মুসলিম: ২৮৪৪, মুসনাদে আহমাদ ২/৪৭১] তাছাড়া সূর্যগ্রহণের সালাত এবং মিরাজের রাত্রির ঘটনাবলীও প্রমাণ করে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই তৈরী করে রাখা হয়েছে। [ইবনে কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ২৪। যদি তোমরা তা (আনয়ন) না কর, এবং কখনই তা করতে পারবে না, (1) তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, (2) অবিশ্বাসীদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে। (3)


তাফসীর:

(1) ক্বুরআন কারীমের সত্যতার এটি আর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে, আরব (আরবী ভাষা-ভাষী) ও অনারব (যাদের ভাষা আরবী নয়) সকল কাফেরদেরকে চ্যালেঞ্জ্ করা হয়েছে। কিন্তু তারা আজ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জের জওয়াব দিতে অপারগ সাব্যস্ত হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অপারগই থাকবে।

(2) ইবনে আববাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুযায়ী পাথর বলতে এখানে গন্ধক জাতীয় পাথরকে বুঝানো হয়েছে। অন্যদের নিকট পাথরের সেই মূর্তিগুলোও জাহান্নামের ইন্ধন হবে, দুনিয়াতে পৌত্তলিকরা যাদের পূজা করত। যেমন ক্বুরআন মাজীদে আছে,

{إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ} & তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের পূজা করো, সেগুলো দোযখের ইন্ধন। (আম্বিয়া ৯৮ আয়াত)

(3) এ থেকে প্রথমতঃ জানা গেল যে, প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম কাফের (অবিশ্বাসী) এবং মুশরিক (অংশীবাদী)-দের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আর দ্বিতীয়তঃ জানা গেল যে, জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব আছে এবং এখনোও তা বিদ্যমান রয়েছে। সালফে-সালেহীনদের এটাই আক্বীদা (বিশ্বাস)। এটা কেবল উপমা বা দৃষ্টান্তমূলক কোন জিনিস নয়; যেমন অনেক আধুনিকতাবাদী ও হাদীস অস্বীকারকারীরা বোঝাতে চায়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা তাওহীদের আলোচনা করার পর এখানে নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি কাফিরদের সম্বোধন করে বলেন:



(وَاِنْ کُنْتُمْ فِیْ رَیْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلٰی عَبْدِنَا فَاْتُوْا بِسُوْرَةٍ مِّنْ مِّثْلِھ۪ﺕ وَادْعُوْا شُھَدَا۬ءَکُمْ مِّنْ دُوْنِ اللہِ اِنْ کُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ)



“এবং আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমরা যদি সন্দিহান হও, তবে তার সমতুল্য একটি ‘সূরা’তৈরি করে নিয়ে এসো এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সাহায্যকারীদেরকে আহ্বান কর; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।”



এখানে “عبد” (আবদ) বা বান্দা দ্বারা উদ্দেশ্য নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।



অন্যএ আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلٰي مُحَمَّدٍ)



“আর তারা ঈমান আনে যা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি।”(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২)



সুতরাং এখানে عبد (আবদ) দ্বারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বুঝানো হয়েছে। আর “আবদ” হল একটি অধিক সম্মানসূচক উপাধি। কুরআনের অনেক জায়গায় আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে “আবদ”বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنْ كُنْتُمْ اٰمَنْتُمْ بِاللّٰهِ وَمَآ أَنْزَلْنَا عَلٰي عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ)



“যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহর ওপর এবং যা মীমাংসার দিন আমি আমার বান্দার (মুহাম্মাদের) প্রতি অবতীর্ণ করেছিলাম তার ওপর।”(সূরা আনফাল ৮:৪১)



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرٰي بِعَبْدِه۪)



“পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে (মুহাম্মাদকে) রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন।”(সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:১)



এভাবে সূরা ফুরকান ১, সূরা নাজম ১০, সূরা হাদীদ ৯ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে عبد (আবদ) বা দাস বলে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার বান্দা বা দাস, আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর স্রষ্টা ও মা‘বূদ।



এছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে পছন্দ করেন তাদের ব্যাপারে এ উপাধি ব্যবহার করেছেন।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(فَأْتُوْا بِسُوْرَةٍ مِّنْ مِّثْلِه۪)



“তবে তার সমতুল্য একটি ‘সূরা’তৈরি করে নিয়ে এসো”

কাফিররা যখন কুরআনকে পূর্বকালের উপকথা বা মুহাম্মাদের কথা বলে প্রত্যাখ্যান করতে লাগল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করলেন, এ কুরআনের মত একটি কিতাব রচনা করে নিয়ে আসতে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْاِنْسُ وَالْجِنُّ عَلٰٓی اَنْ یَّاْتُوْا بِمِثْلِ ھٰذَا الْقُرْاٰنِ لَا یَاْتُوْنَ بِمِثْلِھ۪ وَلَوْ کَانَ بَعْضُھُمْ لِبَعْضٍ ظَھِیْرًا)



‘‘যদি এ কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য সব মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং যদিও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এটার অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।”(সূরা ইসরা ১৭:৮৮)



তারা যখন এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারল না তখন আল্লাহ তা‘আলা দশটি সূরার মত কিছু তৈরি করে আনতে বললেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قُلْ فَأْتُوْا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِه۪ مُفْتَرَيَاتٍ)



“তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমরা এর অনুরূপ দশটি স্বরচিত সূরা আনয়ন করো।”(সূরা হূদ ১১:১৩)



এমনকি আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে একটি সূরার কথা বলেও চ্যালেঞ্জ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَأْتُوْا بِسُوْرَةٍ مِّنْ مِّثْلِه۪)



– এর সমতুল্য একটি মাত্র সূরা নিয়ে এসো। (সূরা বাকারাহ ২:২৩)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নিজেই তাদের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে বলেন:



(فَإِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا وَلَنْ تَفْعَلُوْا)



অনন্তর যদি তোমরা তা করতে না পার এবং তোমরা তা কখনো করতে পারবে না। (সূরা বাকারাহ ২:২৪)



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِيْ وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ)



“তা হলে তোমরা সেই জাহান্নামকে ভয় কর যার ইন্ধন হচ্ছে মানুষ ও পাথর যা তৈরি করে রাখা হয়েছে কাফিরদের জন্য।”(সূরা বাকারাহ ২:২৪)



আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ অবান্তর চিন্তা-ভাবনা ও অপকৌশল পরিহার করে সে জাহান্নামকে ভয় করার নির্দেশ দিলেন যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।



“وُقُوْدٌ” এর অর্থ হচ্ছে জ্বালানি, যা দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। যেমন গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَأَمَّا الْقَاسِطُوْنَ فَكَانُوْا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا)



“অপরপক্ষে অত্যাচারীরা তো জাহান্নামেরই ইন্ধন হবে।”(সূরা জিন ৭২:১৫)



এখানে الحجارة (হিজারা) বা পাথর দ্বারা উদ্দেশ্য গন্ধকের পাথর যা অত্যন্ত কাল, বড় এবং অত্যন্ত দুর্গন্ধময়। যার আগুন অত্যন্ত উত্তপ্ত হবে।



ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন: এটা গন্ধকের পাথর যা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিনে সৃষ্টি করা হয়েছে। কাফিরদের জন্য এগুলো প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। (তাফসীর ইবনু জারীর আত-তাবারী, অত্র আয়াতের তাফসীর, বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুপাতিক)



সুদ্দী স্বীয় সনদে ইবনু মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেন যে, জাহান্নামে গন্ধকের পাথর থাকবে যার প্রজ্জ্বলিত অগ্নি দ্বারা কাফিরদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।



মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: এ পাথরগুলোর দুর্গন্ধ মৃত দেহের দুর্গন্ধের চেয়েও কঠিন দুর্গন্ধময়।



আবার কেউ বলেছেন: এগুলো হল সেই সব মূর্তি, যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার অংশীদার হিসেবে ইবাদত করা হত। যাতে মুশরিকরা বুঝতে পারে তারা এসব মূর্তির ইবাদত করেছে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভের জন্য। কিন্তু সেগুলো কোন উপকার করা তো দূরের কথা, আজ তাদের সাথে জাহান্নামে জ্বলছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اِنَّکُمْ وَمَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللہِ حَصَبُ جَھَنَّمَﺚ اَنْتُمْ لَھَا وٰرِدُوْنَﮱلَوْ کَانَ ھٰٓؤُلَا۬ئِ اٰلِھَةً مَّا وَرَدُوْھَاﺚ وَکُلٌّ فِیْھَا خٰلِدُوْنَ)



“তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদত করো সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সকলে তাতে প্রবেশ করবে।। যদি তারা ইলাহ্ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না; তাদের সকলেই তাতে স্থায়ী হবে।”(সূরা আম্বিয়া ২১:৯৮-৯৯)



(أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِيْنَ)



“তৈরি করে রাখা হয়েছে কাফিরদের জন্য।”থেকে বুঝা যাচ্ছে মূলত জাহান্নাম কাফির ও মুশরিকদের জন্য, কোন মু’মিন সেখানে চিরস্থায়ী থাকবে না। আরো বুঝা যাচ্ছে জান্নাত এবং জাহান্নামের অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান।



হাফেয ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেন: এ আয়াত দ্বারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জমায়াতের ইমামগণ দলীল পেশ করে থাকেন যে, জাহান্নাম এখনো বিদ্যমান।



এ ব্যাপারে অনেক সহীহ হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। যেমন একটি সুদীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত রয়েছে:



تَحَاجَتِ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ



জান্নাত ও জাহান্নাম ঝগড়া করল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৮৫০)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: জাহান্নাম তার রবের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলল: হে আমার প্রতিপালক! আমার কিছু অংশ কিছু অংশকে খেয়ে ফেলছে। তখন তাকে দু’টি শ্বাস ছাড়ার অনুমতি দেয়া হল। একটি শীতকালে এবং অপরটি গ্রীষ্মকালে। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৬০)



ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: এক সময় আমরা একটি প্রকট আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমরা বললাম: এটি কী? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: সত্তর বছর পূর্বে একটি পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তা আজ পৌঁছল। (সহীহ মুসলিম হা: ২১৮৪-২১৮৫)



এরূপ অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে যা প্রমাণ করে জান্নাত ও জাহান্নাম এখনো বিদ্যমান। এটাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এর আক্বীদা-বিশ্বাস।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. তৎকালীন আরবরা সাহিত্যে বিশ্ব-সেরা ছিল। তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এ কুরআনের সবচেয়ে একটি ছোট সূরার মত সূরা তৈরি করে আনতে। কিন্তু তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারেনি। এ চ্যালেঞ্জ কিয়ামত অবধি সকল মানুষের জন্য বিদ্যামান থাকবে।

২. আবদ বা দাস একটি সম্মানসূচক উপাধি। আল্লাহ তা‘আলা কেবল তাদের জন্য এ উপাধি ব্যবহার করেন যাদের তিনি ভালবাসেন।

৩. জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এখনো বিদ্যমান।

৪. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল; তাঁর কোন অংশ নয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর

নবুওয়াতের উপর আলোচনা

তাওহীদের পর এখন নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছেঃ “আমি যে পবিত্র কুরআন আমার বিশিষ্ট বান্দা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছি তাকে যদি তোমরা আমার বাণী বলে বিশ্বাস না কর তবে তোমরা ও তোমাদের সাহায্যকারীরা সব মিলে পূর্ণ কুরআন তো নয় বরং শুধুমাত্র ওর একটি সূরার মত সূরা আনয়ন কর। তোমরা তো তা করতে কখনও সক্ষম হবে না, তা হলে ওটিযে আল্লাহর কালাম এতে সন্দেহ করছে কেন?” (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সাহায্যকারী ও অংশীদার, যারা তাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করত। তাহলে ভাবার্থ হলো এইঃ “যাদেরকে তোমরা পূজনীয়রূপে স্বীকার করছ তাদেরকেও ডাকো এবং তাদের সাহায্য ও সহযোগিতায় হলেও এটির মত একটি সূরা রচনা কর।”

হষরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তোমরা তোমাদের শাসনকর্তা এবং বাকপটু ও বাগ্মীদের নিকট হতেও সাহায্য নিয়ে নাও। কুরান পাকের এই মুজিযার প্রকাশ এবং এই রীতির বাণী কয়েক স্থানে আছে। সূরা-ই কাসাসের মধ্যে আছেঃ “ (হে নবী সঃ) তুমি বলে দাও যে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে আল্লাহর নিকট হতে অন্য কোন কিতাব নিয়ে এসো সৎ পথ প্রদর্শনে এ দু’টো (কুরআন ও তাওরাত) অপেক্ষা অধিক উৎকৃষ্ট হয়, তা হলে আমিও তার অনুসরণ করবো।” আল্লাহ তাআলা সূরা-ই-বানী ঈসরাইলে বলেছেনঃ “তুমি বলে দাও যে, যদি মানুষ ও জ্বিন এ উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয় যে, এরূপ কুরআন রচনা করে আনবে, তথাপিও তার অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না, যদিও তারা একে অন্যের সাহায্যকারী হয়।”

সূরা-ই-হূদে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তবে কি তারা এরূপ বলে যে, এটা তুমি নিজেই রচনা করেছ? বলে দাও, তোমরাও তাহলে ওর অনুরূপ রচিত দশটি সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহকে ছাড়া যাকে যাকে ডাকতে পার ডেকে আন যদি তোমরা সত্যবাদী হও।` সূরা-ই- ইউনুসে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “এ কুরআন কল্পনাপ্রসূত নয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে, বরং এটা তো সেই কিতাবসমূহের সত্যতা প্রমাণকারী যা এর পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা আবশ্যকীয় বিধানসমূহের ব্যাখ্যা দানকারী, এতে কোন সন্দেহ নেই, এটা বিশ্ব প্রভুর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা কি এরূপ বলে যে, এটা তোমার স্বরচিত? তুমি বলে দাও, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা-ই এনে দাও এবং আল্লাহকে ছাড়া যাকে পার ডাকো যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” এ সমস্ত আয়াত তো মক্কা মুকাররামায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং মক্কাবাসীকে এর মুকাবিলায় অসমর্থ সাব্যস্ত করে মদীনা শরীফেও, এ বিষয়ের পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যেমন উপরের আয়াত।

(আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটিকে কেউ কেউ কুরআনের দিকে ফিরিয়েছেন। অর্থাৎ এর (কুরআনের) মত কোন একটি সূরা রচনা কর। কেউ কেউ সর্বনামটি মুহাম্মদ (সঃ)-এর দিকে ফিরিয়েছেন। অর্থাৎ তার মত কোন নিরক্ষর লোক এরূপ হতেই পারে না যে, লেখাপড়া কিছু না জেনেও এমন বাণী রচনা করতে পারে যার মত বাণী কারও দ্বারা রচিত হতে পারে না। কিন্তু প্রথম মৃতটিই সঠিক।

মুজাহিদ (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), আমর বিন মাসউদ (রঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং অধিকাংশ চিন্তাবিদের এটাই মত। ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রঃ), যামাখৃশারী এবং ইমাম রাষীও (রঃ) এই মত পছন্দ করেছেন। এটাকে প্রাধান্য দেয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি এই যে, এতে সবারই প্রতি ধমক রয়েছে। একত্রিত করে এবং পৃথক পৃথক করেও, সে নিরক্ষরই হোক বা আহলে কিতাব ও শিক্ষিত লোকই হোক, এতে এই মুজিযার পূর্ণতা রয়েছে এবং শুধুমাত্র অশিক্ষিত লোকদেরকে অপারগ করা অপেক্ষা এতে বেশী গুরুত্ব এসেছে। আবার দশটি সূরা আনতে বলা এবং ওটা আনতে না পারার ভবিষ্যদ্বাণী করাও এটাই প্রমাণ করছে যে, এর ভাবার্থ কুরআনই হবে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব নয়। সুতরাং এই সাধারণ ঘোষণা, যা বার বার করা হয়েছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে এই ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছে যে, এরা এর উপর সক্ষম নয়। এ ঘোষণা একবার মক্কায় করা হয়েছে এবং পরে মদীনাতেও এর পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আর ঐসব লোক, যাদের মাতৃভাষা আরবী ছিল এবং নিজেদের বাকপটুতা ও বাগ্মীতার জন্যে গর্ববোধ করতো তারা সবাই এর মুকাবিলা করতে অসমর্থ হয়েছিল। তারা পূর্ণ কুরআনের উত্তর দিতে পারেইনি।' দশটি সূরাও নয় এমনকি একটি আয়াতেরও উত্তর দিতে সমর্থ হয়নি। সূতরাং পবিত্র কুরআনের একটি মু'জিযা তো এই যে, তারা এর মত একটি ছোট সূরাও রচনা করতে পারেনি।

দ্বিতীয় মুজিযা

কুরআন কারীমের দ্বিতীয় মু'জিযা এই যে, তারা কখনও এর মত কিছুই রচনা করতে পারবে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআলার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হয়ে গেল। সেই যুগেও কারও সাহস হয়নি, তার পরে আজ পর্যন্তও হয়নি। এবং কিয়ামত পর্যন্তও কারও সাহস হবে না। আর এ হবেই বা কিরূপে? যেমনভাবে আল্লাহর সত্তা অতুলনীয়, তার বাণীও তদ্রুপ অতুলনীয়। প্রকৃত ব্যাপারও এটাই যে, কুরআন পাককে এক ন্যর দেখলেই তার প্রকাশ্য ও গোপনীয়, শাব্দিক ও অর্থগত সব কিছু এমনভাবে প্রকাশ পায় যা সৃষ্টজীবের শক্তির বাইরে। স্বয়ং বিশ্বপ্রভু বলছেনঃ “এটা এমন কিতাব যার আয়াতগুলো প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞাতার পক্ষ হতে (প্রমাণাদি দ্বারা) জোরদার করা হয়েছে, অতঃপর বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।”

সুতরাং শব্দ সংক্ষিপ্ত এবং অর্থ বিশ্লেষিত কিংবা শব্দ বিশ্লেষিত এবং অর্থ সংক্ষিপ্ত। কাজেই কুরআন স্বীয় শব্দ ও রচনায় অতুলনীয়, এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সারা দুনিয়া সম্পূর্ণরূপে অপারগ ও অসমর্থ। পূর্ব যুগের যেসব সংবাদ দুনিয়ার অজানা ছিল তা হুবহু এই পাক কালামে বর্ণিত হয়েছে, আগামীতে যা ঘটবে তারও আলোচনা রয়েছে এবং অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে সমস্ত ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেনঃ “তোমার প্রভুর কথা সংবাদের সত্যতায় এবং নির্দেশের ন্যায্যতায় পূর্ণ হয়েছে। এই পবিত্র কুরআন সমস্তটাই সত্য, সত্যবাদিতা, সুবিচার এবং হিদায়াতে ভরপুর।

কুরআন কাব্য নয়

পবিত্র কুরআনের মধ্যে কোন আজে বাজে কথা, ক্রীড়া-কৌতুক এবং মিথ্যা অপবাদ নেই যা সাধারণতঃ কবিদের কবিতায় পাওয়া যায়। বরং তাদের কবিতার কদর ও মূল্য ওরই উপর নির্ভর করে। মশহুর প্রবাদ আছে যে, (আরবি) অর্থাৎ যা খুব বেশী মিথ্যা তা খুব বেশী সুস্বাদু। লম্বা চওড়া জোরালো প্রশংসামূলক কবিতাগুলোকে দেখা যায় যে, তা অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা মিশ্রিত। ওতে থাকবে নারীদের প্রশংসা ও সৌন্দর্য বর্ণনা, ঘোড়া ও মদের প্রশংসা, কোন মানুষের বাড়ানো তারীফ, উষ্ট্ৰীসমূহের ভূষণ ও সাজ-সজ্জা, বীরত্বের অতিরঞ্জিত গীত, যুদ্ধের চালবাজী কিংবা ডর-ভয়ের কাল্পনিক দৃশ্য। এতে না আছে কোন দুনিয়ার উপকার, না আছে কোন দ্বীনের উপকার। এতে শুধু কবির বাকপটুতা ও কথা শিল্প প্রকাশ পায়। চরিত্রের উপরেও ওর কোন ভাল প্রভাব পড়ে না, আমলের উপরেও না। পুরো কাসিদার মধ্যে দু' একটি ভাল কবিতা হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু বাকী সবগুলোই আজে বাজে কথায় ভর্তি থাকে। পক্ষান্তরে, কুরআন পাকের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে,ওর এক একটি শব্দ ভাষা-মাধুর্যে, দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারে এবং মঙ্গল ও কল্যাণে ভরপুর। আবার বাক্যের বিন্যাস ও সৌন্দর্য, শব্দের গাঁথুনী, রচনার গঠন শৈলী অর্থের সুস্পষ্টতা এবং বিষয়ের পবিত্রতা যেন সোনায় সোহাগা। এর খবরের আস্বাদন, এর বর্ণনাকৃত ঘটনাবলীর সরলতা মৃত সঞ্জীবনী, এর সংক্ষেপণ উচ্চ আদর্শ, এর বিশ্লেষণ মু'জিযার প্রাণ। এর কোন কিছুর পুনরাবৃত্তি দ্বিগুণ স্বাদ দিয়ে থাকে। মনে হয় যেন খাটি মুক্তার বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে। বার বার পড়লেও মনে বিরক্তি আসবে না। স্বাদ গ্রহণ করতে থাকলে সব সময় নতুন স্বাদ পাওয়া যাবে। বিষয়বস্তু অনুধাবন করতে থাকলে শেষ হবে না। এটা একমাত্র কুরআন পাকের বৈশিষ্ট্য। এর চাটনীর মজা এবং মিষ্টতার স্বাদের কথা তাঁকেই জিজ্ঞেস করা। উচিত যাকে মহান আল্লাহ জ্ঞান, অনুভূতি এবং বিদ্যাবুদ্ধির কিছু অংশ দান করেছেন। এর ভয়,প্রদর্শন, ধমক এবং শাস্তির বর্ণনা মজবুত পাহাড়কেও নড়িয়ে দেয়, মানুষের অন্তর তো কি ছার। এর অঙ্গীকার, সুসংবাদ, দান ও অনুগ্রহের বর্ণনা অন্তরের শুষ্ক কুঁড়ির মুখ খুলে দেয়। এটা ইচ্ছা ও আকাংখার প্রশমিত আবেগের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী এবং বেহেশত ও আরামের সুন্দর সুন্দর দৃশ্য চোখের সামনে উপস্থাপনকারী। এতে মন আনন্দিত হয় এবং খুলে যায়। এতে আগ্রহ উৎপাদক ঘোষণা হচ্ছেঃ “অতএব এইরুপ লোকদের জন্য কত কি নয়ন জুড়ানো আসবাব যে গায়েবী ভাণ্ডারে মওজুদ রয়েছে এটা কারও জানা নেই।”

আরও বলা হচ্ছেঃ “এবং তার (বেহেশতের) মধ্যে মনঃপুত ও চক্ষু জুড়ানো দ্রব্যাদি রয়েছে।” ভয় প্রদর্শন ও ধমকরূপে বলা হচ্ছেঃ “তোমরা কি তার হতে, যিনি আকাশে রয়েছেন, নির্ভয় রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে যমীনের মধ্যে ধ্বসিয়ে দেন, অতঃপর ঐ যমীন থর থর করতে থাকে? না কি তোমরা নির্ভয় হয়ে গেছে এটা হতে যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি এক প্রচণ্ড বায়ু প্রেরণ করে দেন? সুতরাং তোমরা সত্ত্বরই জানতে পারবে যে, ভয় প্রদর্শন কিরূপ ছিল।” আরও বলা হচ্ছেঃ “অতঃপর তাদের পাপের কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি।” উপদেশ দান রূপে বলা হয়েছেঃ “যদিও আমি। তাদেরকে কয়েক বছর ধরে সুখ-সম্ভোগে রেখেছি তাতে কি হয়েছে? অতঃপর যার ওয়াদা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল তা এসে গেল। যে আঁকজমকের মধ্যে তাঁরা ছিল তা তাদের কোন কাজে আসলো না।

মোটকথা এভাবে আল্লাহ কুরআন পাকের মধ্যে যখন যে বিষয় ধরেছেন তাকে পূর্ণতায় পৌছিয়ে ছেড়েছেন। আর একে বিভিন্ন প্রকারের বাকপটুতা, ভাষালংকার এবং নিপুণতা দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন। নির্দেশাবলী ও নিষেধাজ্ঞার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, প্রত্যেক নির্দেশের মধ্যে মঙ্গল, সততা, লাভ এবং পবিত্রতার একত্র সমাবেশ ঘটেছে, আর প্রত্যেক নিষেধাজ্ঞা পাপ, হীনতা, ইতরামি এবং ভ্রষ্টতা কর্তনকারী। হযরত ইবনে মাউদ (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ বলেছেন যে, যখন কুরআন মাজীদের মধ্যে (আরবি) শুনতে পাও তখন তোমরা কান লাগিয়ে দাও, হয়তো কোন ভাল কাজের হুকুম দেয়া হবে, বা কোন মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা হবে। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তিনি। তোমাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করেন এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখেন, পবিত্র জিনিস হালাল করেন এবং অপবিত্র জিনিস হারাম করেন, যে ভারী শিকল পায়ে জড়ানো ছিল এবং যে গলাবন্ধ গলায় দেয়া ছিল তা তিনি দূরে নিক্ষেপ করেন।”

কুরআন কারীমের মধ্যে আছে কিয়ামতের বর্ণনা, তথাকার ভয়াবহ দৃশ্য, বেহেশত ও দোযখের বর্ণনা, দয়া ও কষ্টের পূর্ণ বিবরণ। আরও রয়েছে আল্লাহর মনোনীত বান্দাগণের জন্যে নানা প্রকার নিয়ামতের বর্ণনা ও তার শত্রুদের জন্যে নানা প্রকার শাস্তির বর্ণনা। কোথাও বা আছে সুসংবাদ এবং কোথায়ও আছে ভয় প্রদর্শন। কোন স্থানে আছে সৎকার্যের প্রতি আগ্রহ উৎপাদন এবং কোন স্থানে আছে মন্দ কাজ হতে বাধা প্রদান। কোন জায়গায় আছে দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতার শিক্ষা এবং কোন জায়গায় আছে আখেরাতের প্রতি আগ্রহের শিক্ষা। এ সমুদয় আয়াতই মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে এবং আল্লাহর পছন্দনীয় শরীয়তের দিকে ঝুকিয়ে দেয়, অন্তুরের কালিমা দূর করে, শয়তানী পথগুলো বন্ধ করে এবং মন্দ ক্রিয়া নষ্ট করে থাকে।

সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবীকে (আঃ) এমন মু'জিযা দেয়া হয়েছিল যা দেখে মানুষ তাদের উপর ঈমান এনেছিল, কিন্তু আমার মজিযা আল্লাহর ওয়াহী অর্থাৎ পবিত্র কুরআন। কাজেই আমি আশা করি যে, কিয়ামতের দিন অন্যান্য নবীদের (আঃ) অপেক্ষা আমার অনুসারী বেশী হবে।” কেননা, অন্যান্য নবীদের (আঃ) মু'জিযা তাঁদের সঙ্গেই বিদায় নিয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই মু’জিয়া কিয়ামত পর্যন্ত বাকী থাকবে। জনগণ ওটা দেখতে থাকবে এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ ফরমানঃ “আমার মু'জিযা ওয়াহী যা আমাকে দেয়া হয়েছে” এর ভাবার্থ এই যে, এই কুরআনকে তার জন্যেই বিশিষ্ট করা হয়েছে এবং এটা একমাত্র তাকেই দেয়া হয়েছে যা প্রতিযোগিতায় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সারা দুনিয়াকে হার মানিয়ে দিয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যান্য আসমানী কিতাব অধিকাংশ আলেমের মতে এই বিশেষণ হতে শূন্য রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতার উপর এবং ইসলাম ধর্মের সত্যতার উপর এই মুজিযা ছাড়াও আরও এত দলীল আছে যে, তা গুণে শেষ করা যায় না। আল্লাহর জন্যেই সমুদয় প্রশংসা।

কোন কোন ইসলামী দর্শন বেত্তা কুরআন কারীমের মু'জিয়া হওয়াকে এমন পন্থায় বর্ণনা করেছেন যে, তা আলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এবং মু'তাযিলার কথারই অন্তর্ভুক্ত। তারা বলেন যে, হয়তো বা কুরআন নিজেই মু'জিয়া, এর মত কিছু রচনা করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার তাদের ক্ষমতাই নেই। কিংবা যদিও এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভব এবং এটা মানবীয় শক্তির বাইরে নয়, তথাপি তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে আহ্বান করা হচ্ছে। তারা কঠিন শক্রতার মধ্যে রয়েছে, সত্য ধর্মকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলার জন্যে তারা সর্বশক্তি ব্যয় করতে এবং সব কিছু ধ্বংস করতে সদা প্রস্তুত রয়েছে। তবুও তারা কুরআন কারীমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। এটা কুরআনের পক্ষ হতেই হচ্ছে যে, তাদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কুরআন তাদেরকে বাধা দিচ্ছে যার ফলে তারা এর অনুরূপ পেশ করতে অপারগ হচ্ছে।

যদিও শেষের মতটি তলোপছন্দনীয় নয়, তথাপি তাকেও যদি মেনে নেয়া হয় তবে তার দ্বারাও কুরআনের মু'জিযা হওয়া সাব্যস্ত হচ্ছে। এটা সত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় ও তর্কের খাতিরে নিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়া হলেও কুরআনের মুজিযা হওয়াই সাব্যস্ত হচ্ছে। ইমাম রাযী (রঃ) হোট ছোট সূৰ্বর প্রশ্নের উত্তরে এই পন্থাই অবলম্বন করেছেন।

(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে জ্বালানী, যা দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। যেমন গাছের ডাল, কাঠ, খড়ি ইত্যাদি। কুরআন কারীমের এক জায়গায় আছেঃ “অত্যাচারী লোকেরা দোযখের জ্বালানী কাঠ।” অন্য স্থানে আছেঃ “তোমরা ও তোমাদের ঐ সব মাবুদ, আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তোমরা ইবাদত করতে, দোযখের খড়ি হবে, তোমরা সব ওর মধ্যে আসবে। যদি তারা সত্য মা'বুদ হতো তবে সেখানে আগমন করতো না। প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই চিরকাল অবস্থানকারী (আরবি) বলা হয় পাথরকে। এখানে অর্থ হচ্ছে গন্ধকের পাথর যা অত্যন্ত কালো, বড় এবং দুর্গন্ধময়, যার আগুনে অত্যন্ত তেজ থাকে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে নিরাপদে রাখুন।

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার সঙ্গে • সঙ্গেই এই পাথরগুলো প্রথম আকাশে সৃষ্টি করা হয়েছে। (তাফসীর-ই-ইবনে) জারীর, মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম, মুসতাদরিক-ই-হাকিম)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে সুদ্দী (রঃ) নকল করেছেন যে, দোযখের মধ্যে এই কালো গন্ধকের পাথরও থাকবে যার কঠিন আগুন দ্বারা কাফিরদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই পাথরগুলোর দুর্গন্ধ মৃতদেহের দুর্গন্ধের চেয়েও বেশী কঠিন। মুহাম্মদ বিন আলী (রঃ) এবং ইবনে জুরাইও (রঃ) বলেন যে, গন্ধকের অর্থ হচ্ছে বড় বড় ও শক্ত শক্ত পাথর। কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা হতে উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐ পাথরগুলো যেগুলোর ছবি ইত্যাদি বানানো হতো, অতঃপর ঐগুলোকে পূজা করা হতো। যেমন এক জায়গায় আছেঃ “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ইবাদত করতে, তারা জাহান্নামের জ্বালানী খড়ি।”

কুরতুবী (রঃ) এবং রাযী (রঃ) এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, গন্ধকের পাথরে আগুন ধরা কোন নতুন কথা নয়। কাজেই ভাবার্থ হবে এই মূর্তিগুলোই এবং আরও অন্যান্য পাথর-আল্লাহ্ পাককে ছাড়া যেগুলো যে কোন আকারে পূজনীয় হবে। কিন্তু এই যুক্তিটা জোরালো যুক্তি নয়। কেননা, যখন গন্ধকের পাথর দিয়ে আগুন উসকানো হয়, তখন এটা জানা কথা যে, এর তাপ ও প্রখরতা সাধারণ আগুন হতে বহুগুণে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ওর জ্বাল, স্ফীতি এবং শিখাও খুব বেশী হবে। তাছাড়া পূর্ববর্তী গুরুজনেরাও এর তাফসীর এটাই বর্ণনা করেছেন। এরকমই পাথরগুলোতে আগুন লাগাও সর্বজন বিদিত এবং আয়াতের উদ্দেশ্যও হচ্ছে আগুনের তেজ এবং স্ফীতি বর্ণনা করা, আর এটা বর্ণনা করার জন্যও পাথরের অর্থ গন্ধকের পাথর মনে করাই বেশী যুক্তিযুক্ত। কেননা, এতে আগুনও তেজ হবে এবং শাস্তিও কঠিন হবে। কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ
“যখন অগ্নিশিখা হালকা হয়, আমি তখন ওকে আরও উকিয়ে দেই।” আরও একটি হাদীসে আছে যে, প্রত্যেক কষ্টদায়ক জিনিস আগুনে আছে। কিন্তু এ হাদীসটি সুরক্ষিত ও পরিচিত নয়। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, এর দু'টো অর্থ আছে। একটি এই যে, প্রত্যেক সেই ব্যক্তি জাহান্নামী যে অপরকে কষ্ট দেয়। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, প্রত্যেক কষ্টদায়ক জিনিস আগুনে বিদ্যমান থাকবে যা জাহান্নামীদেরকে শাস্তি দেবে।

(আরবি) অর্থাৎ তৈরী করা হয়েছে। বাহ্যতঃ ভাবার্থ বুঝা যাচ্ছে যে, ঐ আগুন কাফিরদের জন্যে তৈরী করা হয়েছে। এর ভাবার্থ পাথরও হতে পারে। অর্থাৎ ঐ পাথর কাফিরদের জন্য তৈরী করা হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদেরও (রাঃ) এটাই মত। প্রকৃতপক্ষে এই দু' অর্থে কোন বিরোধ নেই। কেননা, আগুন জ্বালাবার জন্যেই পাথর তৈরী করা, আর আগুন তৈরী করার জন্যে পাথর তৈরী করা জরুরী। সুতরাং একে অপরের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কুফরীর উপর রয়েছে তার জন্যও ঐ শাস্তি তৈরী আছে। এই আয়াত দ্বারা এই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে যে, জাহান্নাম এখনও বিদ্যমান ও সৃষ্ট রয়েছে। কেননা, (আরবি)শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর দলীল স্বরূপ বহু হাদীসও রয়েছে। একটি সুদীর্ঘ হাদীসে আছে, জান্নাত ও জাহান্নামে ঝগড়া হলো (শেষ পর্যন্ত)। দ্বিতীয় হাদীসে আছেঃ “জাহান্নাম আল্লাহ তা'আলার নিকট দু’টি শ্বাস গ্রহণের অনুমতি চাইলো এবং তাকে শীতকালে একটি এবং গ্রীষ্মকালে একটি শ্বাস নেয়ার অনুমিত দেয়া হলো।” ৩য় হাদীসে আছে, সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদিন একটি বড় শব্দ শুনতে পাই। আমরা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করিঃ “এটা কিসের শব্দ?” তিনি বলেনঃ “সত্তর বছর পূর্বে একটি পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, আজ তা তথায় পৌছেছে।” ৪র্থ হাদীস এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূর্য গ্রহণের নামায পড়া অবস্থায় জাহান্নামকে দেখেছিলেন। ৫ম হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিরাযের রাত্রে জাহান্নাম ও তার শাস্তি অবলোকন করেছিলেন। এরকমই আরও সহীহ মুতাওয়াতির হাদীস রয়েছে। মু'তাযিলারা নিজেদের অজ্ঞতার কারণে এটা স্বীকার করে না এবং বিপরীত কথা বলে থাকে। কাযী-ই-উনদুলুস মুনজির বিন সাঈদ বালুতীও তাদের অনুকরণ করেছেন।

ইমাম রাযী (রঃ) এর বিশ্লেষণঃ

ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে লিখেছেনঃ “কেউ যদি বলে যে, সূরা-ই-কাওসার, সূরা-ই-আসর এবং সূরা-ই-আল কাফিরুনের মত ছোট ছোট সূরাগুলোও (আরবি), শব্দেরই অন্তর্ভুক্ত, আর এটা সর্বজনবিদিত যে, এরকম সূরা কিংবা এর সমপর্যায়ের কোন সূরা রচনা করা সম্ভব, সুতরাং একে মানবীয় শক্তির বাইরে বলা নেহায়েত হঠধর্মী ও অযথা পক্ষপাতিত্ব করারই শামিল, তাহলে আমি উত্তরে বলব যে, আমরা তো কুরআন মাজীদের মু'জিযা হওয়ার দু’টি পন্থা বর্ণনা করে দ্বিতীয় পন্থাকে এজন্যেই পছন্দ করেছি যে, আমরা বলি, যদি এই ছোট সূরাগুলোও ভাষার সৈৗন্দর্য ও অলংকারের দিক দিয়ে এরকমই হয় যে,ওগুলোকেও মু'জিযা বলা যেতে পারে এবং ওর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব না হয়, তবে তো আমাদের উদ্দেশ্য লাভ হয়েই গেল। কেননা, এরূপ সূরা রচনা মানুষের সাধ্যের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও তারা এরূপ সূরা রচনা করতে পারছে না। এটা একথারই দলীল যে, ছোট ছোট আয়াতগুলোসহ সম্পূর্ণ কুরআনই মু'জিযা।” এটা তো ইমাম রাযীর (রঃ) কথা। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, প্রকৃতপক্ষে কুরআন কারীমের ছোট বড় প্রত্যেকটি সূরা মু'জিযা এবং মানুষ এর অনুরূপ রচনা করতে সম্পূর্ণ অসমর্থ ও অপারগ।

ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, মানুষ যদি গভীর চিন্তা সহকারে শুধুমাত্র সূরা আল-আসর'কে বুঝবার চেষ্টা করে তাহলেই যথেষ্ট। হযরত আমর বিন আস (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে প্রতিনিধি হিসেবে মুসাইলামা কাযযাবের নিকট উপস্থিত হলে সে তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “তুমি তো মক্কা থেকেই আসছো, আচ্ছা বলতো আজকাল কোন নতুন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে?” তিনি বলেনঃ সম্প্রতি একটি সংক্ষিপ্ত সূরা অবতীর্ণ হয়েছে যা অত্যন্ত চারুবাক ও ভাষার সৌন্দর্য ও অলংকারে পরিপূর্ণ এবং খুবই ব্যাপক।” অতঃপর সূরা-ইআল-আসর পড়ে শুনান। মুসাইলামা কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ওর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বলেঃ “আমার উপরও এ রকমই একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে।” তিনি বলেনঃ “ঠিক আছে, শুনাও দেখি।” সে বলেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “ওহে জংলী ইদুর! তোমার অস্তিত্ব তো দুটি কান ও বক্ষ ছাড়া কিছুই নয়, বাকী তো তোমার সবই নগণ্য।” অতঃপর সে বলেঃ বল হে আমর! কেমন হয়েছে। তিনি (আমর রাঃ) বলেনঃ আমাকে জিজ্ঞেস করছো কি? তুমি তো সবই জান যে, এর সবই মিথ্যা। কোথায় এই বাজে কথা আর কোথায় সেই জ্ঞান ও দর্শনপূর্ণ বাণী।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।