আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 207)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 207)



হরকত ছাড়া:

ومن الناس من يشري نفسه ابتغاء مرضاة الله والله رءوف بالعباد ﴿٢٠٧﴾




হরকত সহ:

وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ یَّشْرِیْ نَفْسَهُ ابْتِغَآءَ مَرْضَاتِ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ رَءُوْفٌۢ بِالْعِبَادِ ﴿۲۰۷﴾




উচ্চারণ: ওয়া মিনান্না-ছি মাইঁ ইয়াশরী নাফছাহুব তিগাআ মারদা-তিল্লাহি ওয়াল্লা-হু রাঊফুম বিল‘ইবা-দ।




আল বায়ান: আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজকে বিকিয়ে দেয়। আর আল্লাহ (তাঁর) বান্দাদের প্রতি স্নেহশীল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২০৭. আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজেকে বিকিয়ে দেয়(১)। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল।




তাইসীরুল ক্বুরআন: মানুষের মধ্যে এমন আছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে নিজের প্রাণ দিয়ে থাকে, বস্তুতঃ আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যধিক দয়ালু।




আহসানুল বায়ান: (২০৭) পক্ষান্তরে এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মবিক্রয় করে দেয় [1] এবং আল্লাহ নিজ বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র।



মুজিবুর রহমান: পক্ষান্তরে কোন কোন লোক এরূপ আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধনের জন্য আত্মবির্সজন করে, এবং আল্লাহ হচ্ছেন সমস্ত বান্দার প্রতি স্নেহ-পরায়ণ।



ফযলুর রহমান: মানুষের মধ্যে আবার এমন লোকও আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়। আল্লাহ (তাঁর) বান্দাদের প্রতি পরম স্নেহপরায়ণ।



মুহিউদ্দিন খান: আর মানুষের মাঝে এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদের জানের বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।



জহুরুল হক: আর মানুষের মাঝে এমনও আছে যে নিজের সত্তাকে বিক্রি করে দিয়েছে আল্লাহ্‌র সন্তষ্টি কামনা ক’রে। আর আল্লাহ্ পরম স্নেহময় বান্দাদের প্রতি।



Sahih International: And of the people is he who sells himself, seeking means to the approval of Allah. And Allah is kind to [His] servants.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২০৭. আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজেকে বিকিয়ে দেয়(১)। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল।


তাফসীর:

(১) বিভিন্ন গ্রন্থে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াতটি সোহাইব রুমী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাযিল হয়েছিল। তিনি যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিলেন, তখন পথিমধ্যে একদল কোরাইশ তাকে বাধা দিতে উদ্যত হলে তিনি সওয়ার থেকে নেমে দাঁড়ালেন এবং তার তুনীরে রক্ষিত সবগুলো তীর বের করে দেখালেন এবং কোরাইশদের লক্ষ্য করে বললেন, হে কোরাইশগণ! তোমরা জান, আমার তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তুনীরে একটি তীরও থাকবে, ততক্ষণ তোমরা আমার ধারে-কাছেও পৌছতে পারবে না। তীর শেষ হয়ে গেলে তলোয়ার চালাব।

যতক্ষণ আমার প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ আমি তলোয়ার চালিয়ে যাব। তারপর তোমরা যা চাও করতে পারবে। আর যদি তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ কামনা কর, তাহলে শোন, আমি তোমাদেরকে মক্কায় রক্ষিত আমার ধন-সম্পদের সন্ধান বলে দিচ্ছি, তোমরা তা নিয়ে নাও এবং আমার রাস্তা ছেড়ে দাও। তাতে কোরাইশদল রাযী হয়ে গেল এবং সোহাইব রুমী রাদিয়াল্লাহু আনহু নিরাপদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’বার বললেন, সুহাইব লাভবান হয়েছে! সুহাইব লাভবান হয়েছে! [মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩/৩৯৮]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২০৭) পক্ষান্তরে এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মবিক্রয় করে দেয় [1] এবং আল্লাহ নিজ বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র।


তাফসীর:

[1] এই আয়াত সম্পর্কে বলা হয় যে, সুহায়ব রূমী (রাঃ)-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। যখন তিনি হিজরত করেন, তখন মক্কার কাফেররা বলল, এই ধন-সম্পদ এখানকারই উপার্জিত, বিধায় আমরা তা সাথে করে নিয়ে যেতে দেবো না। সুহায়ব (রাঃ) সমস্ত ধন-সম্পদ তাদেরকে সমর্পণ করে দ্বীন নিয়ে রসূল (সাঃ)-এর নিকটে উপস্থিত হয়ে গেলেন। তিনি তাঁর ঘটনা শুনে বললেন, ‘‘সুহায়ব অতীব লাভদায়ক ব্যবসা করেছে।’’ কথাটি তিনি দু'বার বলেছিলেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) কিন্তু এ আয়াতও ব্যাপক অর্থের, যা সমস্ত মু’মিন, আল্লাহভীরু এবং দুনিয়ার মোকাবেলায় দ্বীনকে প্রাধান্য দানকারী সকলকেই শামিল করে থাকে। কেননা, কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হওয়া সমস্ত আয়াতের ব্যাপারে নীতি হল, ‘বাচ্যার্থের ব্যাপকতাই লক্ষণীয়, অবতীর্ণের কারণবিষয়ক ঘটনার বিশেষত্ব নয়’। অর্থাৎ, আয়াতের যে অর্থ তার ব্যাপকতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে, বিশেষ কোন কারণে নাযিল হয়ে থাকলেও অর্থ কেবল তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সুতরাং আখনাস বিন শুরাইক (যার কথা পূর্বের আয়াতে এসেছে) মন্দ চরিত্রের একটি নমুনা। যারাই এই চরিত্রের অধিকারী হবে, তারা সকলেই তার শ্রেণীভুক্ত হবে। অনুরূপ যারা উত্তম গুণাবলী এবং পূর্ণ ঈমানের গুণে গুণান্বিত হবে, তাঁদের সকলের জন্য নমুনা হবেন সুহায়ব (রাঃ)।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২০৪ থেকে ২০৭ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতের কয়েকটি শানে নুযূল পাওয়া যায় তবে সবই দুর্বল।



এখানে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মু’মিনদেরকে মুনাফিকদের ব্যাপারে অবগত করছেন যে, কিছু মুনাফিক রয়েছে যারা এমন মধুময়, সুন্দর সাবলিল ভাষায় নরম কণ্ঠে কথা বলবে ফলে তাদের কথা তোমাকে আশ্চর্যান্বিত করবে। এর উদ্দেশ্য দুনিয়া অর্জন, আখিরাত নয়। কথায় কথায় তারা আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে বলবে, আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আল্লাহ তা‘আলা আমাদের অন্তরের কথা জানেন, অবশ্যই আমরা মু’মিন, আপনাকে ভালবাসি, আমি এরূপ এরূপ .... ইত্যাদি। (আয়সারুত তাফাসীর ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৫৩)



(وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ)



‘সে হচ্ছে ভীষণ ঝগড়াটে ব্যক্তি’রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার নিকট সবচেয়ে বেশি ক্রোধভাজন ঐ ব্যক্তি যে বেশি ঝগড়াটে।



কিন্তু যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে চলে যায় তখন জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, মানুষের শস্য নষ্ট করে ও জীব-জন্তু হত্যা করে।



আল্লাহ তা‘আলা এসব ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না। যখন এ ফাসাদকারী মুনাফিকদেরকে বলা হয় তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর, তাঁর শাস্তিকে ভয় কর, জমিনে ফাসাদ কর না। তারা এরূপ নসিহত গ্রহণ করে না বরং অহঙ্কার ও জাহিলয়াতের গোঁড়ামি ও পাপ কাজে অটল থাকে। এদের জন্য জাহান্নাম।



(وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَّشْرِيْ نَفْسَهُ.... )



শানে নুযূল:



ইবনু আব্বাস, ইকরিমা, সাঈদ বিন মুসাইয়েব ও আবূ উসমান আন নাহদীসহ প্রমুখ বর্ণনা করেন, আয়াতটি সুহাইব বিন সিনান আর-রুমীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করার পর যখন হিজরত করার ইচ্ছা করলেন তখন মানুষেরা বাধা দিল যাতে সে সম্পদ নিতে না পারে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে মুশরিকরা তাকে ইসলাম ছাড়তে বাধ্য করল। তারা বলল, সে যদি সম্পদ রেখে হিজরত করতে চায় তাহলে করুক। তিনি তাই করলেন; তখন এ আয়াত নাযিল হয়।



অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, সুহাইব যখন মক্কা থেকে হিজরত করার ইচ্ছা করলেন, কুরাইশরা বলল, হে সুহাইব! তুমি আমাদের নিকট এসেছিলে এমন অবস্থায় যে, তোমার কোন সম্পদ ছিল না এখন তুমি সম্পদ নিয়ে চলে যেতে চাও। আল্লাহ তা‘আলার শপথ তুমি তা করতে পারবে না। সুহাইব বললেন, আমি তাদেরকে বললাম, আমি যদি তোমাদেরকে সম্পদ ফিরিয়ে দেই তাহলে আমাকে ছেড়ে দেবে? তারা বলল, হ্যাঁ। তখন আমি তাদের কাছে সমস্ত সম্পদ দিয়ে দেই। মদীনায় আগমন করার পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে, তিনি বললেন: সুহাইব সফলকাম হয়েছে, সুহাইব সফলকাম হয়েছে। (হাদীসটি হাসান, হাকিম ৩/৩৯৮)



অধিকাংশ মুফাসসিরগণ বলেন: এ আয়াতটি প্রত্যেক ঐ সকল মুজাহিদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, যারা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করে।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اِنَّ اللہَ اشْتَرٰی مِنَ الْمُؤْمِنِیْنَ اَنْفُسَھُمْ وَاَمْوَالَھُمْ بِاَنَّ لَھُمُ الْجَنَّةَﺚ یُقَاتِلُوْنَ فِیْ سَبِیْلِ اللہِ فَیَقْتُلُوْنَ وَیُقْتَلُوْنَﺤ وَعْدًا عَلَیْھِ حَقًّا فِی التَّوْرٰٿةِ وَالْاِنْجِیْلِ وَالْقُرْاٰنِﺚ وَمَنْ اَوْفٰی بِعَھْدِھ۪ مِنَ اللہِ فَاسْتَبْشِرُوْا بِبَیْعِکُمُ الَّذِیْ بَایَعْتُمْ بِھ۪ﺚ وَذٰلِکَ ھُوَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ)



“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের নিকট হতে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, এর বিনিময়ে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, নিধন করে ও নিহত হয়।



তাওরাত, ইন্জীল ও কুরআনে এ সম্পর্কে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্র“তি রয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কে আছে? তোমরা যে সওদা করেছ সে সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং সেটাই তো মহাসাফল্য।” (সূরা তাওবাহ ৯:১১১)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মুনাফিকদের মনোমুগ্ধকর কথা থেকে সাবধান থাকতে হবে।

২. যারা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে তারা মানুষের মধ্যে খারাপ জাতি।

৩. কথায় কথায় আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করা মু’মিনদের কাজ নয়।

৪. জিহাদের প্রতি উৎসাহ ও প্রেরণা দেয়া হয়েছে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২০৪-২০৭ নং আয়াতের তাফসীর

সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতগুলো আখনাস বিন শারীক সাকাফীর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এই লোকটি মুনাফিক ছিল। প্রকাশ্যে সে মুসলমান ছিল বটে কিন্তু ভিতরে সে মুসলমানদের বিরোধী ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় যারা হযরত যুবাইর (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের দুর্নাম করেছিল, যাদেরকে ‘রাজী’ নামক স্থানে শহীদ করা হয়েছিল। এই শহীদগণের প্রশংসায় শেষের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবং পূর্বের আয়াতগুলো মুনাফিকদের নিন্দে করে অবতীর্ণ হয়। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতগুলো সাধারণ। প্রথম তিনটি আয়াত সমস্ত মুনাফিকের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় এবং চুতর্থ আয়াতটি সমুদয় মুসলমানের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়। কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এটাই এবং এটাই সঠিক। হযরত নাওফ বাককালী (রঃ) যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলেরও পণ্ডিত ছিলেন, বলেনঃ “আমি এই উম্মতের কতকগুলো লোকের মন্দ-গুণ আল্লাহ তা'আলার অবতারিত গ্রন্থের মধ্যেই পাচ্ছি। বর্ণিত আছে যে, কতকগুলো লোক প্রতারণা করে দুনিয়া কামাচ্ছে। তাদের কথা তো মধুর চাইতেও মিষ্ট কিন্তু তাদের অন্তর নিম অপেক্ষাও তিক্ত। মানুষকে দেখানোর জন্যে তারা ছাগলের চামড়া পরিধান করে, কিন্তু তাদের অন্তর নেকড়ে বাঘের ন্যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার উপর সে বীরতু প্রকাশ করে এবং আমার সাথে প্রতারণা করে থাকে। আমার সত্তার শপথ! আমি তার প্রতি এমন পরীক্ষা পাঠাবো যে, সহিষ্ণু লোকেরাও হতভম্ব হয়ে পড়বে।”

কুরতুবী (রঃ) বলেন, 'আমি খুব চিন্তা ও গবেষণা করে বুঝতে পারলাম যে, এগুলো মুনাফিকদের বিশেষণ। কুরআন পাকের মধ্যেও এটা বিদ্যমান রয়েছে।' অতঃপর তিনি (আরবি) (২:২০৪) এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। হযরত সাঈদ (রঃ) যখন অন্যান্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথাটি বর্ণনা করেন তখন হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রাঃ) বলেছিলেন, 'এটা কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছে। এবং তিনিও এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। সাঈদ (রঃ) বলেন, এই আয়াতগুলো কাদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমি জানি। শান-ই-নযুল হিসেবে আয়াতগুলো যে সম্বন্ধেই অবতীর্ণ হয়ে থাকনা কেন, হুকুম হিসেবে সাধারণ।

ইবনে মাহীসানের (রাঃ) কিরাতে ইয়াশহাদু আল্লাহু’ রয়েছে। তখন অর্থ। হবে-তারা মুখে যা কিছুই বলুক না কেন, তাদের অন্তরের কথা আল্লাহ খুবই ভাল জানেন।' যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)

অর্থাৎ “(হে মুহাম্মদ (সঃ)!) যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে তখন তারা বলে-আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।' (৬৩:১) কিন্তু জমহুরের পঠনে ‘ইয়ুশহিদুল্লাহ রয়েছে। তখন অর্থ হবে তারা জনসাধারণের সামনে নিজেদের মনের দুষ্টামি গোপন করলেও আল্লাহর সামনে তাদের অন্তরের কুফরী প্রকাশমান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ তারা মানুষ হতে গোপন করছে বটে কিন্তু আল্লাহ হতে গোপন করতে পারবে না। (৪:১০৮)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই অর্থ বর্ণনা করেন, মানুষের সামনে তারা ইসলাম প্রকাশ করে এবং আল্লাহর শপথ করে বলে যে, তারা মুখে যা বলছে তাই তাদের অন্তরেও রয়েছে।' আয়াতের সঠিক অর্থ এটাই বটে। আবদুর রহমান বিন যায়েদ (রঃ) এবং মুজাহিদ (রঃ) হতেও এই অর্থই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই অর্থই পছন্দ করেছেন। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘খুবই বাঁকা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ এর দ্বারা তুমি যেন বাঁকা সম্প্রদায়কে ভয় প্রদর্শন কর।' (২০:৯৭) মুনাফিকদের অবস্থাও তদ্রুপ। তারা প্রমাণ স্থাপনে মিথ্যা বলে থাকে, সত্য হতে সরে যায়, সরল ও সঠিক কথা ছেড়ে দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং গালি দিয়ে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকদের অবস্থা তিনটি। (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। (৩) ঝগড়া করলে গালি দেয়।

অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নিকট অতি মন্দ ঐ ব্যক্তি যে অত্যন্ত ঝগড়াটে। এর কয়েকটি সনদ রয়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-এরা যেমন কটু ও কর্কশ ভাষী তেমনই এদের কার্যাবলীও অতি জঘন্য। তাদের কাজ তাদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের আকীদা বা বিশ্বাস একেবারেই অসৎ। এখানে (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘ইচ্ছে করা। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা জুম'আর নামাযের ইচ্ছে কর।' (৬২:৯) এখানে শব্দটির অর্থ দৌড়ান নয়। কেননা নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে রয়েছে, যখন তোমরা নামাযের জন্যে আগমন কর তখন আরাম ও স্বস্তির সাথে এসো। কাজেই অর্থ এই যে, মুনাফিকদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীর বুকে অশান্তি উৎপাদন করা এবং শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তু বিনষ্ট করা।

হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এই অর্থও বর্ণিত আছে যে, ঐ মুনাফিকদের শঠতা ও অন্যায় কার্যকলাপের ফলে আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বন্ধ করে দেন, ফলে শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তুর ক্ষতি সাধন হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা এই ধরনের বিবাদ ও অশান্তি উৎপাদনকারীদেরকে মোটেই ভালবাসেন না। এই দুষ্ট ও অসদাচরণকারীদেরকে যখন উপদেশের মাধ্যমে বুঝানো হয়, তখন তারা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং বিরোধিতার উত্তেজনায় পাপ কার্যে আরও বেশী লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে, এবং যখন তাদের সামনে আমার প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ পাঠ করা হয় তখন তুমি কাফিরদের মুখমণ্ডলে ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির চিহ্ন লক্ষ্য করে থাকো। এবং পাঠকদের উপর তারা লাফিয়ে পড়ে; জেনে রেখো যে, কাফিরদের জন্যে আমার নির্দেশ হচ্ছে দেখাগ্নি এবং সেটা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের জন্যে দোযখই যথেষ্ট এবং নিশ্চয় ওটা নিকৃষ্ট আশ্রয় স্থল।

মুনাফিকদের জঘন্য চরিত্রের বর্ণনা দেয়ার পর এখন মুমিনদের প্রশংসা করা হচ্ছে। এই আয়াতটি হযরত সুহাইব বিন সিনানের (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি মক্কায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি মদীনায় হিজরত করতে চাইলে মক্কার কাফিরেরা তাকে বলে, আমরা তোমাকে মাল নিয়ে মদীনা যেতে দেবো। তুমি মাল-ধন ছেড়ে গেলে যেতে পারো। তিনি সমস্ত মাল পৃথক করে নেন এবং কাফিরেরা তাঁর ঐ মাল অধিকার করে নেয়। সুতরাং তিনি ঐসব সম্পদ ছেড়ে দিয়েই মদীনায় হিজরত করেন। এই কারণেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) ও সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল তাঁর অভ্যর্থনার জন্যে ‘হুররা' নামক স্থান পর্যন্ত এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলেনঃ “আপনি বড়ই উত্তম ও লাভজনক ব্যবসা করেছেন।' একথা শুনে তিনি বলেনঃ “আপনাদের ব্যবসায়েও যেন আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেন। আচ্ছা বলুন তো, এই মুবারকবাদের কারণ কি: ঐ মহান ব্যক্তিগণ বলেনঃ আপনার সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছেন তখন তিনিও তাকে সুসংবাদ প্রদান করেন।

মক্কার কুরাইশরা তাকে বলেছিলেঃ তুমি যখন মক্কায় আগমন কর তখন তোমার নিকট কিছুই ছিল না। তোমার নিকট যে মাল-ধন রয়েছে তা সবই তুমি এখানেই উপার্জন করেছ। সুতরাং এই মাল আমরা তোমাকে মদীনায় নিয়ে যেতে দেবো না। অতএব তিনি মাল ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহর দ্বীন নিয়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, যখন তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন এবং কাফিরেরা তা জানতে পারে তখন তারা সবাই এসে তাকে ঘিরে নেয়। তিনি তৃণ হতে তীর বের করে নিয়ে বলেনঃ “হে মক্কাবাসী! আমি যে কেমন তীরন্দাজ তা তোমরা ভাল করেই জান। আমার একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। তীর শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে বিদীর্ণ করতে থাকবো। এর পরে চলবে তরবারির যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও আমি তোমাদের কারও চেয়ে কম নই। যখন তরবারীও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তখন তোমরা কাছে এসে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। তোমরা যদি এটা স্বীকার করে নাও তবে ভাল কথা। নচেৎ আমি তোমাদেরকে আমার সমুদয় সম্পদ দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা সবই নিয়ে নাও এবং আমাকে মদীনা যেতে দাও।' তারা মাল নিতে সম্মত হয়ে যায়, এভাবেই তিনি হিজরত করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার পূর্বেই ওয়াহীর মাধ্যমে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে মুবারকবাদ দেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের এও উক্তি রয়েছে যে, এই আয়াতটি সাধারণ প্রত্যেক মুজাহিদের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে।

‘আল্লাহ তা'আলা বেহেশতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা হত্যা করে এবং নিহতও হয়। আল্লাহর এই সত্য অঙ্গীকার তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী সত্য অঙ্গীকারকারী আর কে হতে পারে: হে ইমানদারগণ! তোমরা এই ক্রয়-বিক্রয়ে ও আদান-প্রদানে সন্তুষ্ট হয়ে যাও, এটাই বড় কৃতকার্যতা'। হযরত হিশাম বিন আমের (রাঃ) যখন কাফিরদের দু'টি ব্যুহ ভেদ করে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং একাকীই তাদের উপর আক্রমণ চালান তখন কতকগুলো মুসলমান তাঁর এই আক্রমণকে শরীয়ত: বিরোধী মনে করেন। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীগণ এর প্রতিবাদ করেন এবং (আরবি) (২:২০৭) এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।