আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 158)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 158)



হরকত ছাড়া:

إن الصفا والمروة من شعائر الله فمن حج البيت أو اعتمر فلا جناح عليه أن يطوف بهما ومن تطوع خيرا فإن الله شاكر عليم ﴿١٥٨﴾




হরকত সহ:

اِنَّ الصَّفَا وَ الْمَرْوَۃَ مِنْ شَعَآئِرِ اللّٰهِ ۚ فَمَنْ حَجَّ الْبَیْتَ اَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَیْهِ اَنْ یَّطَّوَّفَ بِهِمَا ؕ وَ مَنْ تَطَوَّعَ خَیْرًا ۙ فَاِنَّ اللّٰهَ شَاکِرٌ عَلِیْمٌ ﴿۱۵۸﴾




উচ্চারণ: ইন্নাসসাফা-ওয়াল মারওয়াতা মিন শা‘আ-ইরিল্লা-হি ফামান হাজ্জাল বাইতা আবি‘তামারা ফালা-জুনা-হা ‘আলাইহি আইঁ ইয়াত্তাওওয়াফা বিহিমা-ওয়ামান তাতাওওয়া‘আ খাইরান ফাইন্নাল্লা-হা শাকিরুন ‘আলীম।




আল বায়ান: নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে কিংবা উমরা করবে তার কোন অপরাধ হবে না যে, সে এগুলোর তাওয়াফ করবে। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কল্যাণ করবে, তবে নিশ্চয় শোকরকারী, সর্বজ্ঞ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫৮. নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের(১) অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যে কেউ (কা’বা) ঘরের হজ(২) বা উমরা(৩) সম্পন্ন করে, এ দু'টির মধ্যে সাঈ করলে তার কোন পাপ নেই(৪)। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন সৎকাজ করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ উত্তম পুরস্কারদাতা, সর্বজ্ঞ।




তাইসীরুল ক্বুরআন: নিশ্চয়ই ‘সাফা’ এবং ‘মারওয়া’ আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। কাজেই যে ব্যক্তি কাবাগৃহের হাজ্জ অথবা ‘উমরাহ করবে, এ দু’টোর সাঈ করাতে তাদের কোনই গুনাহ নেই এবং যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন সৎ কাজ করবে তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ (তার ব্যাপারে) গুণগ্রাহী এবং সর্বজ্ঞ।




আহসানুল বায়ান: (১৫৮) নিশ্চয় স্বাফা ও মারওয়া (পাহাড় দুটি) আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম।[1] সুতরাং যে কা’বাগৃহের হজ্ব কিংবা উমরাহ সম্পন্ন করে, তার জন্য এই (পাহাড়) দুটি প্রদক্ষিণ (সাঈ) করলে কোন পাপ নেই। [2] আর কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন পুণ্য কাজ করলে, আল্লাহ গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞাতা।



মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্গত। অতএব যে ব্যক্তি এই গৃহে ‘হাজ্জ’ অথবা ‘উমরাহ’ পালন’ করে তার জন্য এতদুভয়ের প্রদক্ষিণ করা দোষণীয় নয়, এবং কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সৎ কাজ করলে আল্লাহ গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞাত।



ফযলুর রহমান: ছাফা ও মারওয়া হচ্ছে আল্লাহর অন্যতম (দুটি) নিদর্শন। যে আল্লাহর ঘরকেন্দ্রিক হজ্জ কিংবা ওমরা করবে তার এ দুটো পরিভ্রমণ করায় কোন পাপ নেই। আর যে স্বপ্রণোদিত হয়ে ভাল কাজ করবে (সে তার কাজের পুরস্কার পাবে), নিশ্চয়ই আল্লাহ যথার্থ পুরস্কারদাতা, সর্বজ্ঞাত।



মুহিউদ্দিন খান: নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শন গুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা’বা ঘরে হজ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মুল্য দেবেন।



জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ সাফা ও মারওয়াহ্ আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের অন্যতম। তাই যে কেউ গৃহে হজ করে বা উমরাহ করে তার জন্য অপরাধ হবে না যদি সে এ দুইয়ের মাঝে তওয়াফ করে। আর যে কেউ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই অতি দানশীল, সর্বজ্ঞাতা।



Sahih International: Indeed, as-Safa and al-Marwah are among the symbols of Allah. So whoever makes Hajj to the House or performs 'umrah - there is no blame upon him for walking between them. And whoever volunteers good - then indeed, Allah is appreciative and Knowing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৫৮. নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের(১) অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যে কেউ (কা’বা) ঘরের হজ(২) বা উমরা(৩) সম্পন্ন করে, এ দু’টির মধ্যে সাঈ করলে তার কোন পাপ নেই(৪)। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন সৎকাজ করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্– উত্তম পুরস্কারদাতা, সর্বজ্ঞ।


তাফসীর:

(১) (شَعَائِرِ اللَّهِ) এখানে شعائر শব্দটি شعيرة শব্দের বহুবচন। এর অর্থ চিহ্ন বা নিদর্শন। (شَعَائِرِ اللَّهِ) বলতে সেসব আমলকে বুঝায়, যেগুলোকে আল্লাহ্ তা'আলা দ্বীনের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।


(২) حج এর শাব্দিক অর্থ ইচ্ছা পোষণ করা, সংকল্প করা। কুরআন-সুন্নাহর পরিভাষায় বিশেষ সময়ে বিশেষ অবস্থায় বায়তুল্লাহ শরীফে আল্লাহ্‌র ইবাদতের উদ্দেশ্যে গমন করে বিশেষ ধরনের কিছু কর্ম সম্পাদন করাকে হজ্ব বলা হয়ে থাকে।


(৩) عمرة শব্দের আভিধানিক অর্থ দর্শন করা। শরীআতের পরিভাষায়, ইহরামসহ আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহ্ শরীফে হাযির হয়ে তাওয়াফ-সায়ী প্রভৃতি বিশেষ কয়েকটি ইবাদাত সম্পাদনের নামই উমরাহ।


(৪) সাফা এবং মারওয়া বায়তুল্লাহর নিকটবর্তী দুটি পাহাড়ের নাম। হজ কিংবা উমরার সময় কাবাঘরের তওয়াফ করার পর এ দু'টি পাহাড়ের মধ্যে দৌড়াতে হয় শরীআতের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘সায়ী’। জাহেলী যুগেও যেহেতু এ সায়ীর রীতি প্রচলিত ছিল এবং তখন এ দু’টি পাহাড়ের মধ্যে কয়েকটি মূর্তি সাজিয়ে রাখা হয়েছিল, এ জন্য মুসলিমদের কারো কারো মনে একটা দ্বিধার ভাব জাগ্রত হয়েছিল যে, বোধহয় এ সায়ী জাহেলী যুগের কোন অনুষ্ঠান এবং ইসলাম যুগে এর অনুসরণ করা হয়ত গোনাহর কাজ। কোন কোন লোক যেহেতু জাহেলী যুগে একে একটা অর্থহীন কুসংস্কার বলে মনে করতেন, সেজন্য ইসলাম গ্রহণের পরও তারা একে জাহেলিয়াত যুগের কুসংস্কার হিসেবেই গণ্য করতে থাকেন। এরূপ সন্দেহের নিরসনকল্পে আল্লাহ্ তা'আলা যেভাবে বায়তুল্লাহ্ শরীফের কেবলা হওয়া সম্পর্কিত সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়েছেন, তেমনিভাবে এ আয়াতে বায়তুল্লাহ সংশ্লিষ্ট আরও একটি সংশয়ের অপনোদন করে দিয়েছেন। তাছাড়া রাসূলের বিভিন্ন হাদীস দ্বারাও সাফা-মারওয়ার মাঝখানের সায়ী প্রমাণিত। [দেখুন, মুসনাদে আহমাদ: ৬/৪২১, ৪২২]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৫৮) নিশ্চয় স্বাফা ও মারওয়া (পাহাড় দুটি) আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম।[1] সুতরাং যে কা’বাগৃহের হজ্ব কিংবা উমরাহ সম্পন্ন করে, তার জন্য এই (পাহাড়) দুটি প্রদক্ষিণ (সাঈ) করলে কোন পাপ নেই। [2] আর কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন পুণ্য কাজ করলে, আল্লাহ গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞাতা।


তাফসীর:

[1] شَعَائِرُ হল شَعِيْرَةٌ এর বহুবচন। যার অর্থ, নিদর্শন বা প্রতীক। এখানে নিদর্শনসমূহ বলতে হজ্জ আদায়ের সময় ইবাদতের বিভিন্ন স্থান (যেমন, মিনা, আরাফাত, মুযদালিফা, সাঈ ও কুরবানীর স্থান) কে বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট।

[2] স্বাফা-মারওয়ার সাঈ করা হজ্জের একটি রুকন (প্রধান অঙ্গ)। কিন্তু কুরআনের শব্দ ‘কোন পাপ নেই’ থেকে কোন কোন সাহাবীর সন্দেহ হয়েছিল যে, স্বাফা-মারওয়ার সাঈ জরুরী নয়। আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) যখন এ ব্যাপারে অবগত হলেন, তখন বললেন, যদি এর অর্থ এই হত, (যা তোমরা মনে কর) তাহলে মহান আল্লাহ এইভাবে বলতেন,

{فَلا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ لاَ يَطَّوَّفَ بِهِمَا} (প্রদক্ষিণ বা সাঈ না করলে কোন পাপ নেই।) তারপর এই আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ বললেন যে, আনসার সাহাবীগণ ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে ‘মানাত’ মূর্তির নামে ‘তালবিয়া’ পড়ত এবং মুশাল্লাল পাহাড়ে তার পূজা করত। মক্কায় পৌঁছে এই ধরনের লোক স্বাফা-মারওয়ার সাঈ করাকে পাপ মনে করত। ইসলাম গ্রহণ করার পর তাঁরা রসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলে এই আয়াত নাযিল হয়। যাতে বলা হয়েছে, স্বাফা-মারওয়ার সাঈ করা গুনাহ নয়। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল হজ্জঃ পরিচ্ছেদঃ স্বাফা-মারওয়ার সাঈ ওয়াজিব) কেউ কেউ এর কারণ এইভাবে বর্ণনা করেছেন যে, জাহেলিয়াতে মুশরিকরা স্বাফা পাহাড়ে ‘ইসাফ’ এবং মারওয়ায় ‘নায়েলা’ নামক মূর্তি স্থাপন করেছিল। সাঈ করার সময় তারা এদেরকে চুম্বন বা স্পর্শ করত। যখন তারা ইসলাম কবুল করে, তখন তাদের মাথায় এই খেয়াল এল যে, মনে হয় স্বাফা-মারওয়ার সাঈ করলে গুনাহ হতে পারে। কারণ, ইসলামের পূর্বে তারা উক্ত দু’টি মূর্তির জন্য সাঈ করত। মহান আল্লাহ এই আয়াতে তাদের সন্দেহ ও মনের কিন্তুকে দূর করে দিয়েছেন। এখন (উমরাহ ও হজ্জে ৭ বার যাওয়া-আসার মাধ্যমে) এই সাঈ করা জরুরী। যার শুরু স্বাফা থেকে হবে এবং শেষ হবে মারওয়ায়। (আইসারুত্ তাফাসীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৫৮ নং আয়াতের তাফসীর:



শানে নুযূল:



এ আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। দু’টি সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এবং একটি মুসতাদরাক হাকিমে রয়েছে।



সাহাবী উরওয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি আশিয়াহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কি লক্ষ করেছেন-



(إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَآئِرِ اللّهِ ............أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَا وَمَن تَطَوَّعَ خَيْراً فَإِنَّ اللّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ)



আমি এ আয়াত দ্বারা বুঝেছি, যদি কেউ তাওয়াফ না করে তাহলে তার কোন দোষ নেই। তখন আয়িশাহ (রাঃ) বললেন- হে আমার ভাগনে! তুমি কতই না খারাপ কথা বললে। তুমি যা বুঝেছ সেরূপ হলে আয়াতটি এমন হত



فلا جناح عليه أن لا يطاف بها



(ত াওয়াফ না করলে গুনাহ হবে না), কিন্তু বিষয়টি হল, আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে আনসারদের ব্যাপারে। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তারা মানাতের (মূর্তি) পূজা করত। আর মানাত ছিল কুদায়েদের পথে অবস্থিত। আনসারগণ সাফা ও মারওয়াহর মাঝে সাঈ করা খারাপ জানত। ইসলাম আগমনের পর তারা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলে এ আয়াত নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী হা: ১৬৪৩, ৪৪৯৫, সহীহ মুসলিম হা: ৩১৩৮, ৩১৪২)



সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা‘আলার অন্যতম নিদর্শন। شعائر শব্দটি شعيرة এর বহুবচন, অর্থ হল: নিদর্শন, প্রতীক। এখানে নিদর্শনসমূহ বলতে হজ্জ আদায়ের সময় ইবাদতের বিভিন্ন স্থান যেমন- মিনা, আরাফা, মুযদালিফা, সাঈ ও কুরবানীর স্থান বুঝায়।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা এসব নিদর্শনকে সম্মান করতে বলেছেন:



(وَمَنْ يَّعَظِّمْ شَعَا۬ئِرَ اللّٰهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَي الْقُلُوبِ)



“আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান করলে এটা তো তার হৃদয়ের তাক্বওয়ার পরিচয়।”(সূরা হজ্জ ২২:৩২)



সাফা ও মারওয়া হজ্জের অন্যতম রুকন। যা বাদ পড়লে হজ্জ বা উমরা হবে না। যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন সৎ আমল করবে এটা তার জন্য উত্তম। আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতিদান দেবেন।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সাফা ও মারওয়া সাঈ করা হজ্জ ও উমরার রুকন।

২. গীর্জা, পূজামণ্ডপ বা কাফিরদের ইবাদাতের স্থান মাসজিদে পরিণত হলে সেথায় সালাতসহ সকল ইবাদত পালন করতে কোন অসুবিধা নেই।

৩. কল্যাণকর কাজে উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে হযরত উরওয়া (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ এ আয়াত দ্বারা এরূপ জানা যাচ্ছে যে, তাওয়াফ না করায় কোন দোষ নেই।' তিনি বলেনঃ হে প্রিয় ভাগনে! তুমি সঠিক বুঝতে পারনি। তুমি যা বুঝেছ ভাবার্থ তাই হলে (আরবি) বলা হতো। বরং এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, মাশআল’ নামক স্থানে মানাত' নামে প্রতিমাটি অবস্থিত ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে মদীনার আনসারেরা তার পূজা করতো এবং যে তার উপাসনায় দাঁড়াতো সে সাফা ও মারওয়া’ পর্বতদ্বয়ের তাওয়াফকে দূষণীয় মনে করতো। এখন ইসলাম গ্রহণের পর জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ‘সাফা' ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ের তাওয়াফের দোষ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এতে বলা হয় যে, এই তাওয়াফে কোন দোষ নেই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা ও মারওয়া’র তাওয়াফ করেন। এ জন্যেই এটা সুন্নাত রূপে পরিগণিত হয়। এখন এই তাওয়াফকে ত্যাগ করা কারও জন্যে উচিত নয়। (বুখারী ও মুসলিম)। হযরত আবু বকর বিন আবদুর রহমান (রঃ) এই বর্ণনাটি শুনে বলেনঃ “নিঃসন্দেহে এটা একটা ইমী আলোচনা। আমি তো এর পূর্বে এটা শ্রবণই করিনি। কোনো কোনো বিদ্বান ব্যক্তি বলেন যে, হযরত আনসার (রাঃ) বলেছিলেনঃ “আমাদের প্রতি বায়তুল্লাহ শরীফকে তাওয়াফ করার নির্দেশ রয়েছে, সাফা ও মারওয়া’র তাওয়াফের নয়। সেই সময় এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতটির শান-ই-নুকূল এ দুটো হওয়ারই সম্ভাবনা রয়েছে।

হযরত আনাস (রাঃ) বলেন ‘আমরা সাফা ও মারওয়া’র তাওয়াফকে অজ্ঞতাপূর্ণ কাজ মনে করতাম এবং ইসলামের অবস্থায় এ থেকে বিরত থাকতাম। অবশেষে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই দু'টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থলে বহু প্রতিমা বিদ্যমান ছিল এবং শয়তানেরা সারা রাত ধরে ওর মধ্যে ঘুরাফিরা করতো। ইসলাম গ্রহণের পর জনসাধারণ এখানকার তাওয়াফ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। আসাফ’ মূর্তিটি ছিল ‘সাফা পাহাড়ের উপর এবং নায়েলা মূর্তিটি ছিল মারওয়া পাহাড়ের উপর। মুশরিকরা ঐ দু'টোকে স্পর্শ করতো ও চুম্বন দিতো। ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলমানেরা তাদের থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। কিন্তু এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার ফলে এখানকার তাওয়াফ সাব্যস্ত হয়। সীরাত-ই-মুহাম্মদ বিন ইসহাক' নামক পুস্তকে রয়েছে যে, ‘আসাফ’ ও নায়েলা’ একজন পুরুষ তোক ও অপরজন স্ত্রীলোক ছিল। এই অসৎ ও অসতী দু’জন কা'বা গৃহে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে আল্লাহ তাদের দুজনকে পাথরে পরিণত করেন। কুরাইশরা তাদেরকে কা'বার বাইরে রেখে দেয় যেন জনগণ এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু কয়েক যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর তাদের পূজা আরম্ভ হয়ে যায় এবং তাদেরকে সাফা ও মারওয়া' পাহাড়ে এনে দাড় করিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের তাওয়াফ শুরু হয়ে যায়।

সহীহ মুসলিমের মধ্যে একটি সুদীর্ঘ হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ কার্য সমাপন করেন তখন তিনি রুকন'-কে ছেড়ে বাবুস্ সাফা' দিয়ে বের হন এবং ঐ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ আমিও ওটা থেকেই শুরু করবো যা থেকে আল্লাহ তাআলা শুরু করেছেন।' একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি বলেনঃ “তোমরা তার থেকেই আরম্ভ কর যার থেকে আল্লাহ তা'আলা আরম্ভ করেছেন। অর্থাৎ সাফা থেকে চলতে আরম্ভ করে মারওয়া পর্যন্ত যাও। হযরত হাবীবা বিনতে আবী তাজবাত (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) দেখেছি, তিনি ‘সাফা মারওয়া তাওয়াফ করছিলেন। জনমণ্ডলী তার আগে আগে ছিল এবং তিনি তাদের পিছনে ছিলেন। তিনি কিছুটা দৌড়িয়ে চলছিলেন এবং এই কারণে তাঁর লুঙ্গি তাঁর জানুর মধ্যে এদিক ওদিক হচ্ছিল। আর তিনি পবিত্র মুখে উচ্চারণ করছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা দৌড়িয়ে চল। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর দৌড়ানো লিখে দিয়েছেন।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। এরকমই অর্থের আরও একটি বর্ণনা রয়েছে। এই হাদীসটি ঐসব লোকের দলীল যারা সাফা ও মারওয়া দৌড়কে হজ্বের রুকন মনে করে থাকেন। যেমন হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মযহাব এটাই। ইমাম আহমাদেরও (রঃ) এরকমই একটি বর্ণনা রয়েছে। ইমাম মালিকেরও (রঃ) প্রসিদ্ধ মযহাব এটাই। কেউ কেউ একে ওয়াজিব বলেন বটে কিন্তু হজ্বের রুকন বলেন না। যদি কোন ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক বা ভুলবশতঃ একে ছেড়ে দেয় তবে তাকে একটি জন্তু জবাহ করতে হবে। ইমাম আহমাদ (রঃ) হতে একটি বর্ণনা এরকমই বর্ণিত আছে। অন্য একটি দলও এটাই বলে থাকেন। অন্য একটি উক্তিতে একে মুস্তাহাব বলা হয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) ইমাম সাওরী (রঃ) ইমাম শাবী (রঃ) এবং ইবনে সিরিন (রঃ) একথাই বলে থাকেন। হযরত আনাস (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম মালিক (রঃ) ও আতাবিয়্যাহ' নামক পুস্তকে এটা বর্ণনা করেছেন (আরবি) এটিই তার দলীল। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী অগ্রগণ্য। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং সাফা-মারওয়া তাওয়াফ করেছেন এবং বলেছেন, 'হজ্বের আহকাম আমার নিকট হতে গ্রহণ কর। তিনি তাঁর এই হজ্বে যা কিছু করেছেন তাই ওয়াজিব হয়ে গেছে-তা অবশ্য পালনীয়। কোন কাজ যদি কোন বিশেষ দলীলের মাধ্যমে করণীয় হতে উঠিয়ে দেয়া হয় তবে সেটা অন্য কথা। তা ছাড়া হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর দৌড়ানো কাজ লিখে দিয়েছেন অর্থাৎ ফরজ করেছেন। মোট কথা এখানে বর্ণিত হচ্ছে যে, সাফা ও মারওয়া’র তাওয়াফও আল্লাহ তা'আলার শারঈ আহকামের অন্তর্গত।

হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে হজ্বব্রত পালন করবার জন্যে এটা শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, এখানে হযরত হাজেরার (আঃ) সাত বার প্রদক্ষিণই হচ্ছে সাফা মারওয়া’য় দৌড়ানোর মূল উৎস। যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে তাঁর ছোট শিশুপুত্রসহ এখানে রেখে গিয়েছিলেন এবং তার খানা-পানি শেষ হয়ে গিয়েছিল ও শিশু ওষ্ঠাগত প্রাণ হয়ে পড়েছিল তখন হযরত হাজেরা (আঃ) অত্যন্ত উদ্বেগ এবং দুর্ভাবনার সাথে এই পবিত্র পাহাড়দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে স্বীয় অঞ্চল ছড়িয়ে দিয়ে মহান আল্লাহর নিকট ভিক্ষা চাচ্ছিলেন। অবশেষে মহান আল্লাহ তার দুঃখ, চিন্তা, কষ্ট ও দুর্ভাবনা সব দূর করে দিয়েছিলেন। এখানে প্রদক্ষিণকারী হাজীগণেরও উচিত যে, তারা যেন অত্যন্ত দারিদ্র ও বিনয়ের সাথে এখানে প্রদক্ষিণ করেন এবং মহান আল্লাহর নিকট নিজেদের অভাব, প্রয়োজন এবং অসহায়তার কথা পেশ করেন ও মনের সংস্কার এবং সুপথ প্রাপ্তির প্রার্থনা জানান, আর পাপ মোচনের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাদের দোষ-ক্রটি হতে মুক্ত থাকা এবং অবাধ্যতার প্রতি ঘৃণা থাকা উচিত। তাদের কর্তব্য হবে এই যে, তারা যেন স্থিরতা, পুণ্য, মুক্তি এবং মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করেন ও আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করেন যে, তিনি যেন তাদেরকে অন্যায় ও পাপরূপ সংকীর্ণ পথ হতে সরিয়ে উৎকর্ষতা, ক্ষমা এবং পুণ্যের তাওফীক প্রদান করেন, যেমন তিনি হযরত হাজেরার (আঃ) অবস্থাকে এদিক হতে ওদিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন যে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে অর্থাৎ সাতবার প্রদক্ষিণের স্থলে আটবার বা নয়বার প্রদক্ষিণ করে কিংবা নফল হজ্ব এবং উমরার মধ্যে সাফা-মারওয়া’র তাওয়াফ করে। আবার কেউ কেউ একে সাধারণ রেখেছেন অর্থাৎ প্রত্যেক পুণ্যের কাজই অতিরিক্তভাবে করে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি গুণগ্রাহী ও সর্বজ্ঞাত অর্থাৎ আল্লাহ পাক অল্প কাজেই বড় পুণ্য দান করে থাকেন এবং প্রতিদানের সঠিক পরিমাণ তার জানা আছে। তিনি কারও পুণ্য এতটুকুও কম করবেন না, আবার তিনি অনু পরিমাণ অত্যাচারও করবেন না। তবে তিনি পুণ্যের প্রতিদান বৃদ্ধি করে থাকেন, এবং নিজের নিকট হতে বিরাট প্রতিদান প্রদান করে থাকেন। সুতরাং হামদ’ ও ‘শুকর’ আল্লাহ পাকেরই জন্যে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।