আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 143)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 143)



হরকত ছাড়া:

وكذلك جعلناكم أمة وسطا لتكونوا شهداء على الناس ويكون الرسول عليكم شهيدا وما جعلنا القبلة التي كنت عليها إلا لنعلم من يتبع الرسول ممن ينقلب على عقبيه وإن كانت لكبيرة إلا على الذين هدى الله وما كان الله ليضيع إيمانكم إن الله بالناس لرءوف رحيم ﴿١٤٣﴾




হরকত সহ:

وَ کَذٰلِکَ جَعَلْنٰکُمْ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوْنُوْا شُهَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَکُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْکُمْ شَهِیْدًا ؕ وَ مَا جَعَلْنَا الْقِبْلَۃَ الَّتِیْ کُنْتَ عَلَیْهَاۤ اِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ یَّتَّبِعُ الرَّسُوْلَ مِمَّنْ یَّنْقَلِبُ عَلٰی عَقِبَیْهِ ؕ وَ اِنْ کَانَتْ لَکَبِیْرَۃً اِلَّا عَلَی الَّذِیْنَ هَدَی اللّٰهُ ؕ وَ مَا کَانَ اللّٰهُ لِیُضِیْعَ اِیْمَانَکُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۴۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া কাযা-লিকা জা‘আলনা-কুম উম্মাতাওঁ ওয়াছাতাল লিতাকূনূ শুহাদাআ ‘আলান্না-ছি ওয়া ইয়াকূনার রাছূলু‘আলাইকুম শাহীদাওঁ ওয়ামা-জা‘আলনাল কিবলাতাল্লাতী কুনতা ‘আলাইহা ইল্লা-লিনা‘লামা মাইঁ ইয়াত্তাবি‘উররাছূলা মিম্মাইঁ ইয়ানকালিবু‘আলা-‘আকিবাইহি ওয়া ইন কা-নাত লাকাবীরাতান ইল্লা-‘আলাল্লাযীনা হাদাল্লা-হু ওয়ামা-কা-নাল্লাহু লিইউদী‘আ ঈমা-নাকুম ইন্নাল্লা-হা বিন্না-ছি লারাঊফুররাহীম।




আল বায়ান: আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। আর যে কিবলার উপর তুমি ছিলে, তাকে কেবল এ জন্যই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে আমি জেনে নেই যে, কে রাসূলকে অনুসরণ করে এবং কে তার পেছনে ফিরে যায়। যদিও তা অতি কঠিন (অন্যদের কাছে) তাদের ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত করেছেন এবং আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমানকে বিনষ্ট করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪৩. আর এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী(১) জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির উপর স্বাক্ষী হও(২) এবং রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হতে পারেন।(৩) আর আপনি এ যাবত যে কিবলা অনুসরণ করছিলেন সেটাকে আমরা এ উদ্দেশ্যে কেবলায় পরিণত করেছিলাম যাতে প্রকাশ করে দিতে পারি(৪) কে রাসূলের অনুসরণ করে এবং কে পিছনে ফিরে যায়? আল্লাহ্‌ যাদেরকে হিদায়াত করেছেন তারা ছাড়া অন্যদের উপর এটা নিশ্চিত কঠিন। আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের ঈমানকে ব্যর্থ করে দিবেন(৫)। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরম দয়ালু।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর এভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মাত করেছি, যাতে তোমরা লোকেদের উপর সাক্ষী হও এবং নাবী তোমাদের উপর সাক্ষী হয়। আর তুমি এ যাবৎ যে ক্বিবলার উপর ছিলে, তাকে এ উদ্দেশ্যে ক্বিবলা করেছিলাম, যাতে আমি জানতে পারি কে রসূলের অনুসরণ করে আর কে পায়ের ভরে উল্টো দিকে ফিরে যায়। আল্লাহ যাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন তারা বাদে অন্যের নিকট এটা বড়ই কষ্টকর ছিল। আর আল্লাহ তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করবেন না, নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি করুণাশীল, অতি দয়ালু।




আহসানুল বায়ান: (১৪৩) এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, [1] যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পার এবং রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হবে। তুমি এ যাবৎ যে ক্বিবলার অনুসরণ করছিলে, তা এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, যাতে আমি জানতে পারি[2] যে, কে রসূলের অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়? আল্লাহ যাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন, তারা ছাড়া অন্যের কাছে এ (পরিবর্তন) নিশ্চয় কঠিন ব্যাপার।[3] আর আল্লাহ এরূপ নন যে, তিনি তোমাদের বিশ্বাস (ঈমান তথা নামায)কে ব্যর্থ করবেন।[4] নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।



মুজিবুর রহমান: এভাবে আমি তোমাদেরকে আদর্শ জাতি করেছি, যেন তোমরা মানবগণের জন্য সাক্ষী হও এবং রাসূলও তোমাদের জন্য সাক্ষী হয়; এবং তুমি যে কিবলার দিকে ছিলে তা আমি এ জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যে, কে রাসূলের অনুসরণ করে, আর কে তা হতে স্বীয় পদদ্বয়ে পশ্চাতে ফিরে যায় আমি তা জেনে নিব এবং আল্লাহ যাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন তারা ছাড়া অপরের জন্য এটি অবশ্যই কঠোরতর; এবং আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের বিশ্বাস বিনষ্ট করেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি স্নেহশীল, করুণাময়।



ফযলুর রহমান: আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী (সেরা) জাতি বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের ব্যাপারে সাক্ষী হও, আর রসূল সাক্ষী হন তোমাদের ব্যাপারে। (তোমাদের মধ্যে) কে রসূলের অনুসরণ করে আর কে উল্টো দিকে ফিরে যায় তা দেখার জন্যই আমি তোমার পূর্ববর্তী কেবলা নির্ধারণ করেছিলাম। আল্লাহ যাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন তারা ব্যতীত অন্যদের জন্য বিষয়টি বেশ কঠিন ছিল। আর আল্লাহ তোমাদের ঈমান (নামায) নষ্ট করতে পারেন না। আল্লাহ নিঃসন্দেহে মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ, পরম দয়ালু।



মুহিউদ্দিন খান: এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে এবং যাতে রসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। আপনি যে কেবলার উপর ছিলেন, তাকে আমি এজন্যই কেবলা করেছিলাম, যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুসারী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চিতই এটা কঠোরতর বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ এমন নন যে, তোমাদের ঈমান নষ্ট করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ, মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুনাময়।



জহুরুল হক: আর এইভাবে তোমাদের আমরা বানিয়েছি একটি সুসামঞ্জস্যরক্ষাকারী সমাজ, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হতে পারো, আর রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হতে পারেন। আর আমরা তাকে কিবলাহ্ বানাতাম না যার উপরে তুমি ছিলে, যদি না আমরা যাচাই করতাম যে কে রসূলকে অনুসরণ করে আর কে তার মোড় ফিরিয়ে ঘুরে যায়। আর নিঃসন্দেহ এটি কঠিন ছিল তাদের ক্ষেত্রে ছাড়া যাদের আল্লাহ্ হেদায়ত করেছেন। আর আল্লাহ্ তোমাদের ঈমান কখনও নিষ্ফল হতে দেবেন না। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ মানুষের প্রতি পরম স্নেহময়, অফুরন্ত ফলদাতা।



Sahih International: And thus we have made you a just community that you will be witnesses over the people and the Messenger will be a witness over you. And We did not make the qiblah which you used to face except that We might make evident who would follow the Messenger from who would turn back on his heels. And indeed, it is difficult except for those whom Allah has guided. And never would Allah have caused you to lose your faith. Indeed Allah is, to the people, Kind and Merciful.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪৩. আর এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী(১) জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির উপর স্বাক্ষী হও(২) এবং রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হতে পারেন।(৩) আর আপনি এ যাবত যে কিবলা অনুসরণ করছিলেন সেটাকে আমরা এ উদ্দেশ্যে কেবলায় পরিণত করেছিলাম যাতে প্রকাশ করে দিতে পারি(৪) কে রাসূলের অনুসরণ করে এবং কে পিছনে ফিরে যায়? আল্লাহ্– যাদেরকে হিদায়াত করেছেন তারা ছাড়া অন্যদের উপর এটা নিশ্চিত কঠিন। আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের ঈমানকে ব্যর্থ করে দিবেন(৫)। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরম দয়ালু।


তাফসীর:

(১) وَسَطًا শব্দের অর্থ সর্বোৎকৃষ্ট বিষয়। আবু সায়ীদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম عدل শব্দ দ্বারা وسط এর ব্যাখ্যা করেছেন। [বুখারী: ৭৩৪৯] এর অর্থ সর্বোৎকৃষ্ট। আবার وسط অর্থ হয় মধ্যবর্তী, মধ্যপন্থী। সে হিসাবে এ আয়াতে মুসলিম সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মানের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, এ সম্প্রদায়কে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করা হয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়কে মধ্যপন্থী, ভারসাম্যপূর্ণ সম্প্রদায় বলে অভিহিত করে বলা হয়েছে যে, মানবীয় মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তাদের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান। যে উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের যাবতীয় কর্মধারা অব্যাহত রয়েছে এবং নবী ও আসমানী গ্রন্থসমূহ প্রেরিত হয়েছে, তাতে এ সম্প্রদায় অপরাপর সম্প্রদায় থেকে স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী ও শ্রেষ্ঠ। কুরআন বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্নভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের এ শ্রেষ্ঠত্বের কথা বর্ণনা করেছে।

বলা হয়েছে, আর আমরা যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে এমন একটি সম্প্রদায় রয়েছে, যারা সৎপথ প্রদর্শন করে এবং সে অনুযায়ী ন্যায়বিচার করে। [সূরা আল-আরাফ: ১৮১] এতে মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মিক ও চারিত্রিক ভারসাম্য আলোচিত হয়েছে যে, তারা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে আসমানী গ্রন্থের নির্দেশ অনুযায়ী নিজেরাও চলে এবং অন্যদেরকেও চালাবার চেষ্টা করে। কোন ব্যাপারে কলহ-বিবাধ সৃষ্টি হলে তার মীমাংসাও তারা গ্রন্থের সাহায্যেই করে, যাতে কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের স্বার্থপরতার কোন আশংকা নেই। অন্য সূরায় মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মিক ভারসাম্য এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ তোমরাই সে কাজের আদেশ করবে, মন্দকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান রাখবে। [সূরা আলে-ইমরান: ১১০] অর্থাৎ মুসলিমরা যেমন সব নবীর শ্রেষ্ঠতম নবীপ্রাপ্ত হয়েছে, সব গ্রন্থের সর্বাধিক পরিব্যপ্ত ও পূর্ণতর গ্রন্থ লাভ করেছে, তেমনি সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে সুস্থ মেজাজ এবং ভারসাম্যও সর্বাধিক পরিমাণে প্রাপ্ত হয়েছে।

ফলে তারাই সকল সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ সম্প্রদায় সাব্যস্ত হয়েছে। তাদের সামনে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তত্ত্ব-রহস্যের দ্বার উন্মুক্ত করা হয়েছে। ঈমান, আমল ও আল্লাহ ভীতির সমস্ত শাখাপ্রশাখা ত্যাগের বদৌলতে সজীব ও সতেজ হয়ে উঠবে। তারা কোন বিশেষ দেশ ও ভৌগলিক সীমার বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে না। তাদের কর্মক্ষেত্র হবে সমগ্র বিশ্ব এবং জীবনের সকল শাখায় পরিব্যপ্ত। তাদের অস্তিত্বই অন্যের হিতাকাংখা ও তাদেরকে জান্নাতের দ্বারে উপনীত করার কাজে নিবেদিত। এ সম্প্রদায়টি গণমানুষের হিতাকাংখা ও উপকারের নিমিত্তই সৃষ্ট। তাদের অভীষ্ট কর্তব্য ও জাতীয় পরিচয় এই যে, তারা মানুষকে সৎকাজের দিকে পথ দেখাবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকেও মুসলিম জাতি এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্প্রদায়। তাদের মধ্যে রয়েছে, ঈমানের ভারসাম্য। পূর্ববতী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে একদিকে দেখা যায়, তারা নবীগণকে আল্লাহর পুত্ৰ মনে করে তাদের উপাসনা ও আরাধনা করতে শুরু করেছে। যেমন, এক আয়াতে রয়েছেঃ ইয়াহুদীরা বলেছে, ওযায়ের আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলেছে, মসীহ আল্লাহর পুত্র। [সূরা আত-তাওবাহঃ ৩০]

অপরদিকে এসব সম্প্রদায়েরই অনেকে নবীর উপর্যুপরি মু'জিযা দেখা সত্বেও তাদের নবী যখন তাদেরকে কোন ন্যায়যুদ্ধে আহবান করেছেন, তখন তারা পরিস্কার বলে দিয়েছে, আপনি এবং আপনার পালনকর্তাই যান এবং শক্রদের সাথে যুদ্ধ করুন। আমরা এখানেই বসে থাকব সূরা আল-মায়েদাহ: ২৪] আবার কোথাও নবীগণকে স্বয়ং তাদের অনুসারীদেরই হাতে নির্যাতিত হতে দেখা গেছে। পক্ষান্তরে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থা তা নয়। তারা একদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি এমন আনুগত্য ও ভালবাসা পোষণ করে যে, এর সামনে জান-মাল, সন্তান-সন্ততি, ইজ্জত-আব্রু সবকিছু বিসর্জন দিতেও কুষ্ঠিত হয় না। অপরদিকে রাসূলকে রাসূল এবং আল্লাহকে আল্লাহই মনে করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তারা আল্লাহর দাস ও রাসূল বলেই বিশ্বাস করে এবং মুখে প্রকাশ করে। তার প্রশংসা এবং গুণগান করতে গিয়েও তারা একটা সীমার ভেতর থাকে।

তাছাড়া মুসলিমদের মধ্যে রয়েছে, কর্ম ও ইবাদাতের ভারসাম্য। পূর্ববর্তী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে একদিকে দেখা যায়, তারা শরীআতের বিধি-বিধানগুলোকে কানাকড়ির বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়, ঘুষ-উৎকোচ নিয়ে আসমানী গ্রন্থকে পরিবর্তন করে অথবা মিথ্যা ফতোয়া দেয়, বাহানা ও অপকৌশলের মাধ্যমে ধর্মীয় বিধান পরিবর্তন করে এবং ইবাদাত থেকে গা বাঁচিয়ে চলে। অপরদিকে তাদের উপাসনালয়সমূহে এমন লোকও দেখা যায়, যারা সংসারধর্ম ত্যাগ করে বৈরাগ্য অবলম্বন করেছে। তারা আল্লাহ প্রদত্ত হালাল নেয়ামত থেকেও নিজেদের বঞ্চিত রাখে এবং কষ্ট সহ্য করাকেই সওয়াব ও ইবাদাত বলে মনে করে। পক্ষান্তরে মুসলিম সম্প্রদায় একদিকে বৈরাগ্যকে মানবতার প্রতি যুলুম বলে মনে করে এবং অপরদিকে আল্লাহ ও রাসূলের বিধি-বিধানের জন্য জীবন বিসর্জন দিতেও কুন্ঠা বোধ করে না। অনুরূপভাবে তাদের মধ্যে রয়েছে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য।

পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের মধ্যে একদিকে দেখা যায়, তারা মানবাধিকারের প্রতি পরোয়াও করেনি; ন্যায়-অন্যায়ের তো কোন কথাই নেই। মহিলাদের অধিকার দান করা তো দূরের কথা, তাদের জীবিত থাকার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হত না। কোথাও প্রচলিত ছিল শৈশবেই তাদের জীবন্ত সমাহিত করার প্রথা এবং কোথাও মৃত স্বামীর সাথে স্ত্রীকে দাহ করার প্রথা। অপরদিকে এমন নির্বোধ দয়াদ্রতারও প্রচলন ছিল যে, পোকামাকড় হত্যা করাকেও অবৈধ জ্ঞান করা হত। কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় ও তাদের শরীআত এসব ভারসাম্যহীনতার অবসান ঘটিয়েছে। তারা একদিকে মানুষের সামনে মানবাধিকারকে তুলে ধরেছে। শুধু শান্তি ও সন্ধির সময়ই নয়, যুদ্ধ ক্ষেত্রেও শক্রর অধিকার সংরক্ষণে সচেতনতা শিক্ষা দিয়েছে। অপরদিকে প্রত্যেক কাজের একটা সীমা নির্ধারণ করেছে, যা লংঘন করাকে অপরাধ সাব্যস্ত করেছে। তদ্রুপভাবে তাদের মধ্যে রয়েছে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য।

অর্থনীতিতে অপরাপর সম্প্রদায়ের মধ্যে বিস্তর ভারসাম্যহীনতা পরিলক্ষিত হয়। একদিকে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থা। এতে হালাল-হারাম এবং অপরের সুখ-শান্তি ও দুঃখদুরাবস্থা থেকে চক্ষু বন্ধ করে অধিকতর ধন-সম্পদ সঞ্চয় করাকেই সর্ববৃহৎ মানবিক সাফল্য গণ্য করা হয়। অপরদিকে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা। এতে ব্যক্তি মালিকানাকেই অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়। মুসলিম সম্প্রদায় ও তাদের শরীআত এক্ষেত্রেও ভারসাম্যপূর্ণ অভিনব অর্থ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। ইসলামী শরীআত একদিকে ধন-সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য মনে করতে বারণ করেছে এবং সম্মান, ইজ্জত ও পদমর্যাদা লাভকে এর উপর নির্ভরশীল রাখেনি; অপরদিকে সম্পদ বন্টনের নিষ্কলুষ নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছে যাতে কোন মানুষ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত না থাকে এবং কেউ সমগ্র সম্পদ কুক্ষিগত করে না বসে। এছাড়া সম্মিলিত মালিকানাভুক্ত বিষয়-সম্পত্তিকে যৌথ ও সাধারণ ওয়াকফের আওতায় রেখেছে। বিশেষ বস্তুর মধ্যে ব্যক্তিমালিকানার প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। হালাল মালের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে এবং তা রাখার ও ব্যবহার করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে।


(২) এ আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় জানা গেল, ১. মুসলিম সম্প্রদায়কে ভারসাম্যপূর্ণ তথা ন্যায়ানুগ করা হয়েছে যাতে তারা সাক্ষাদানের যোগ্য হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আদেল বা ন্যায়ানুগ নয়, সে সাক্ষ্যদানেরও যোগ্য নয়। আদেলের অর্থ সাধারণতঃ নির্ভরযোগ্য করা হয়। ২. ইজমা শরীআতের দলীল। ইমাম কুরতুবী বলেনঃ ইজমা (মুসলিম আলেমদের ঐক্যমত) যে শরীআতের একটি দলীল, আলোচ্য আয়াতটি তার প্রমাণ। কারণ, আল্লাহ্ তা'আলা এ সম্প্রদায়কে সাক্ষ্যদাতা সাব্যস্ত করে অপরাপর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে তাদের বক্তব্যকে দলীল করে দিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, এ সম্প্রদায়ের ইজমা বা ঐকমত্যও একটি দলীল এবং তা পালন করা ওয়াজিব।


(৩) এ উম্মাত হাশরের ময়দানে একটি স্বাতন্ত্র্য লাভ করবে। সকল নবীর উম্মতরা তাদের হিদায়াত ও প্রচারকার্য অস্বীকার করে বলতে থাকবে, দুনিয়াতে আমাদের কাছে কোন আসমানী গ্রন্থ পৌছেনি এবং কোন নবীও আমাদের হেদায়াত করেননি। তখন মুসলিম সম্প্রদায় নবীগণের পক্ষে সাক্ষ্যদাতা হিসেবে উপস্থিত হবে এবং সাক্ষ্য দেবে যে, নবীগণ সর্বযুগেই আল্লাহর পক্ষ থেকে আনীত হিদায়াত তাদের কাছে পৌছে দিয়েছেন। একাধিক হাদীসে সংক্ষেপে ও সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা নূহ আলাইহিস সালাম-কে ডেকে বলবেন, হে নূহ আপনি কি আমার বাণী লোকদের কাছে পৌছিয়েছেন? তিনি বলবেন, হ্যাঁ।

তখন তার উম্মতকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তোমাদের কাছে কি তিনি কিছু পৌছিয়েছেন? তারা বলবে, আমাদের কাছে কোন সাবধানকারী আসেনি। তখন আল্লাহ বলবেনঃ হে নূহ আপনার পক্ষে কে সাক্ষ্য দেবে? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ ও তার উম্মত। তখন তারা সাক্ষ্য দেবে যে, নূহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর বাণী লোকদের কাছে পৌছিয়েছেন। আর রাসূল তখন তোমাদের সত্যতার উপর সাক্ষ্য দেবেন। এটাই হলো আল্লাহর বাণীঃ “এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির উপর স্বাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হতে পারেন।” [বুখারীঃ ৪৪৮৭]


(৪) আয়াতে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা হচ্ছে, لِنَعْلَمَ এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, ‘যাতে আমরা জানতে পারি’। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ থেকে কেউ কেউ এটা মনে করতে পারে যে, (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহ বুঝি আগে জানতেন না, ঘটনা ঘটার পরে জানেন। মূলত: এ ধরনের বোঝার কোন অবকাশই ইসলামী শরীআতে নেই। কারণ, আল্লাহ তা'আলা আগে থেকেই সবকিছু জানেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাকে পরীক্ষার মাধ্যমে তার জানা বিষয়টি অনুসারে বান্দার কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতে দিয়ে বান্দার উপর তার প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠা করেন। যাতে করে তার জানার উপর ন্যায় বরং বাস্তব ভিত্তিতে তিনি বান্দাকে সওয়াব বা শাস্তি দিতে পারেন। মূলত: এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা বান্দার পরীক্ষা নিয়ে থাকেন।

যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “এটা এজন্যে যে, আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা আছে তা পরীক্ষা করেন এবং তোমাদের মনে যা আছে তা পরিশোধন করেন। আর অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবহিত।” [সূরা আলে ইমরান ১৫৪] এ আয়াতে পরীক্ষা করার কথা বলার মাধ্যমে এ কথাটি স্পষ্ট হয়েছে যে, আল্লাহ আগে থেকেই জানেন। কিন্তু তার উদ্দেশ্য পরীক্ষা করা। এ অর্থের সমর্থন পাওয়া যায় আয়াতের শেষে ‘আর অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবহিত এ কথা বলার মাধ্যমে। এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেলে পবিত্র কুরআনের অন্যত্র যেমন, সূরা আল-কাহাফ: ১২, সাবা ২১ এ ব্যবহৃত لِنَعْلَمَ শব্দটির অর্থ স্পষ্ট হয়ে যাবে এবং কোন সন্দেহের উদ্রেক হবে না। [আদওয়াউল বায়ান]


(৫) এখানে ঈমান শব্দ দ্বারা ঈমানের প্রচলিত অর্থ নেয়া হলে আয়াতের মর্ম হবে এই যে, কেবলা পরিবর্তনের ফলে নির্বোধেরা মনে করতে থাকে যে, এরা দ্বীন ত্যাগ করেছে কিংবা এদের ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে। উত্তরে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না। কাজেই তোমরা নির্বোধদের কথায় কর্ণপাত করো না। কোন কোন মনীষীদের উক্তিতে এখানে ঈমানের অর্থ করা হয়েছে সালাত। মৰ্মাৰ্থ এই যে, সাবেক কেবলা বায়তুল-মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে যেসব সালাত আদায় করা হয়েছে, আল্লাহ্ তা'আলা সেগুলো নষ্ট করবেন না; বরং তা শুদ্ধ ও মকবুল হয়েছে।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, কাবাকে কেবলা করার পর অনেকেই প্রশ্ন করে যে, যে সব মুসলিম ইতিমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন, তারা বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করে গেছেন- কাবার দিকে সালাত আদায় করার সুযোগ পাননি, তাদের কি হবে? এ প্রশ্নের প্রেক্ষিতেই আলোচ্য আয়াত নাযিল হয় ৷ [বুখারীঃ ৪৪৮৬] এতে সালাতকে ঈমান শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করে স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে যে, ১. তাদের সব সালাতই শুদ্ধ ও গ্রহণীয়। তাদের ব্যাপারে কেবলা পরিবর্তনের কোন প্রতিক্রিয়া হবে না। ২. আমল ঈমানের অংগ ৷ ৩. সালাত ঈমানের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যে, সালাতকে বোঝানোর জন্য মহান আল্লাহ তা'আলা ঈমান শব্দ ব্যবহার করেছেন।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৪৩) এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, [1] যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পার এবং রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হবে। তুমি এ যাবৎ যে ক্বিবলার অনুসরণ করছিলে, তা এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, যাতে আমি জানতে পারি[2] যে, কে রসূলের অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়? আল্লাহ যাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন, তারা ছাড়া অন্যের কাছে এ (পরিবর্তন) নিশ্চয় কঠিন ব্যাপার।[3] আর আল্লাহ এরূপ নন যে, তিনি তোমাদের বিশ্বাস (ঈমান তথা নামায)কে ব্যর্থ করবেন।[4] নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।


তাফসীর:

[1] وَسَطٌ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল, মধ্যম। কিন্তু তা শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম অর্থেও ব্যবহার হয়। আর এখানে এই (সর্বোত্তম) অর্থেই ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, যেমন তোমাদেরকে সর্বোত্তম ক্বিবলা দেওয়া হয়েছে, অনুরূপ তোমাদেরকে সর্বোত্তম উম্মতও করা হয়েছে এবং এর উদ্দেশ্য হল, তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষ্য দেবে। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে,

{لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ} যাতে রসূল তোমাদের জন্যে সাক্ষ্যদাতা এবং তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে। (সূরা হাজ্জ ৭৮ আয়াত) কোন কোন হাদীসে এর বিশ্লেষণ এইভাবে এসেছে যে, যখন মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন নবীদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, তোমরা কি আমার আদেশ মানুষদের নিকট পৌঁছে দিয়েছিলে? তাঁরা বলবেন, 'হ্যাঁ।' আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমাদের কি কোন সাক্ষী আছে? তাঁরা বলবেন, হ্যাঁ, মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং তাঁর উম্মত। তখন এই উম্মত সাক্ষ্য দেবে। আর এই জন্য وَسَط এর অনুবাদ ন্যায়পন্থীও করা হয়। (ইবনে কাসীর) এ শব্দের আর একটি অর্থ, মধ্যপন্থীও করা হয়। অর্থাৎ, উম্মতে মুহাম্মাদী হল মধ্যপন্থী অর্থাৎ, অতিরঞ্জন ও অবজ্ঞা থেকে তারা পবিত্র। আর এটাই হল ইসলামের শিক্ষা। এতে অতিরঞ্জন (কোন কিছুকে নিয়ে বাড়াবাড়ি) এবং অবজ্ঞা (কোন জিনিসকে তার উপযুক্ত মর্যাদা থেকে একেবারে নীচে নামানোরও কোন অবকাশ) নেই।

[2] لِنَعْلَمَ (যাতে আমি জানতে পারি) আল্লাহ তো আগে থেকেই জানেন। আসলে এর অর্থ হল, যাতে আমি দৃঢ় প্রত্যয়ীদেরকে সংশয়ীদের থেকে পৃথক করে দি এবং মানুষের সামনেও যেন উক্ত দুই শ্রেণীর লোক স্পষ্ট হয়ে যায়। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[3] এখানে ক্বিবলা পরিবর্তনের একটি উদ্দেশ্যর কথা বলা হচ্ছে। নিষ্ঠাবান মুমিনরা তো কেবল আল্লাহর রসূল (সাঃ)-এর চোখের ইঙ্গিতের অপেক্ষায় থাকতেন। কাজেই তাঁদের জন্য একদিক থেকে অন্য দিকে ফিরে যাওয়া কোন সমস্যার ব্যাপার ছিল না, বরং একটি মসজিদে তো ক্বিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ তখন পৌঁছে, যখন তাঁরা রুকুতে ছিলেন। তাঁরা রুকুর অবস্থাতেই নিজেদের মুখমন্ডল কাবার দিকে ফিরিয়ে নিলেন। এটাকে মসজিদে ক্বিবলাতাইন (অর্থাৎ, সেই মসজিদ যেখানে একটিই নামায দু'টি ক্বিবলার দিকে মুখ করে পড়া হয়েছে।) বলা হয়। অনুরূপ ঘটনা ক্বুবার মসজিদেও ঘটেছে।

[4] কোন কোন সাহাবা (রাঃ)-এর মনে এই সমস্যার উদয় হল যে, যে সাহাবাগণ বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়ার যুগে মৃত্যুবরণ করেছেন অথবা আমরা যতদিন সেদিকে মুখ করে নামায পড়েছি, সে সবই মনে হয় বিফলে গেছে, তার মনে হয় কোন সওয়াব পাওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ বললেন, তোমাদের ঐ নামাযগুলো ব্যর্থ হবে না; বরং তোমরা তার পূর্ণ সওয়াব পাবে। আর এখানে নামাযকে বিশ্বাস বা ঈমান বলে আখ্যায়িত করে এ কথাও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, নামায ব্যতীত ঈমানের কোন মূল্য নেই। ঈমান তখনই ঈমান বলে গণ্য হবে, যখন নামায ও আল্লাহর অন্যান্য বিধানসমূহের যত্ন নেওয়া হবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৪২ থেকে ১৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:



শানে নুযূল:



সাহাবী বারা বিন আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মদীনায় আগমণ করার পর) বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন আর বারবার আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের অপেক্ষা করতেন। (কখন বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে সালাত আদায় করার নির্দেশ আসবে) তখন



قَدْ نَرَي .... يَعْمَلُونَ এ আয়াত নাযিল হয়। (ইবনু কাসীর)



এরপর বাইতুল্লাহ কেবলা হিসেবে নির্ধারিত হয়। এ সময় সাহাবাগণ বলতে লাগলেন, কেবলা পরিবর্তনের পূর্বে যারা মারা গেছে তাদের অবস্থা কী হবে? যদি আমরা জানতে পারতাম এবং আমরা যে এতদিন বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করেছি তার কী হবে? তখন وَمَا كَانَ اللّٰهُ.... আয়াত নাযিল হয়।



যখন কেবলা পরিবর্তন হয়ে গেল তখন আহলে কিতাবের নির্বোধ লোকেরা বলতে লাগল কিসে তাদেরকে পূর্বের কেবলা থেকে ফিরিয়ে নিল? তখন



(سَيَقُولُ السُّفَهَاء مِنَ النَّاسِ... )



আয়াত নাযিল হয়।



বারা বিন আযিব (রাঃ) থেকে অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় হিজরত করার পর ১৬-১৭ মাস পর্যন্ত বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করেন। কিন্তু তিনি পছন্দ করতেন কাবার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে। তখন



(قَدْ نَرَي . يَعْمَلُونَ....)



আয়াত নাযিল হয়।



এ আয়াত অবতীর্ণের পর থেকে মুসলিমগণ কাবামুখী হয়ে সালাত আদায় করতে লাগলেন। এমতাবস্থায় ইয়াহূদী নির্বোধেরা বলতে লাগল-



(مَا وَلّٰهُمْ عَنْ قِبْلَتِهِمُ الَّتِيْ كَانُوْا عَلَيْهَا)



“কিসে তাদেরকে সেই কেবলা হতে ফিরিয়ে দিল যার দিকে তারা ছিল?” তখন



(قُلْ لِّلّٰهِ الْمَشْرِقُ ...... مُّسْتَقِیْمٍ)



নাযিল হয়। এছাড়া আরো বর্ণনা রয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৮৬, ইবনু কাসীর ১খণ্ড, পৃঃ ৪০৬)



কেবলা পরিবর্তন কোন্ সালাতে হয়েছিল তা নিয়ে বেশ মতামত পাওয়া যায়, তবে সঠিক কথা হল, আসর সালাতে (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৮৬)। অন্যান্য বর্ণনা এর বিপরীত নয়। কারণ যারা যে সালাতের সময় পরিবর্তন পেয়েছিলেন তারা সে সালাতের কথা বলেছেন।



আয়াতে أمة وسطا এর অর্থ أمة خياراً وعدولاً বা সর্বশ্রেষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ ও মধ্যমপন্থী জাতি। যেমন বলা হয়



قريش أوسط العرب نسباً وداراً



বা কুরাইশগণ বংশ ও ঘর বাড়ির দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ আরব। আরো বলা হয়:



صلاة العصر صلاة الوسطي



আসরের সালাত উৎকৃষ্ট ও মধ্যম সালাত। তাই আল্লাহ তা‘আলা এ উৎকৃষ্ট ও মধ্যমপন্থী জাতিকে একটি পরিপূর্ণ শরীয়ত ও সুপ্রতিষ্ঠিত দীন দিয়েছেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ھُوَ اجْتَبٰٿکُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَیْکُمْ فِی الدِّیْنِ مِنْ حَرَجٍﺚ مِلَّةَ اَبِیْکُمْ اِبْرٰھِیْمَﺚ ھُوَ سَمّٰٿکُمُ الْمُسْلِمِیْنَﺃ مِنْ قَبْلُ وَفِیْ ھٰذَا لِیَکُوْنَ الرَّسُوْلُ شَھِیْدًا عَلَیْکُمْ وَتَکُوْنُوْا شُھَدَا۬ئَ عَلَی النَّاسِﺊ)



“তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি। এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত। তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’এবং এ কিতাবেও; যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হয় আর তোমরা সাক্ষী হও মানব জাতির জন্য।”(সূরা হজ্জ ২২:৭৮)



আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, কিয়ামত দিবসে নূহ (আঃ)-কে ডাকা হবে, তিনি বলবেন, হে প্রভু! আমি উপস্থিত। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি কি তোমার দায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছিলে? তিনি বলবেন: হ্যাঁ পৌঁছে দিয়েছিলাম। তখন তাঁর উম্মাতকে জিজ্ঞাসা করা হবে। নূহ তোমাদের নিকট (নবুওয়াতের বাণী) পৌঁছে দিয়েছে কি? তারা বলবে: আমাদের কাছে কোন ভীতি প্রদর্শনকারী আসেনি। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তোমার সাক্ষী কে? নূহ (আঃ) বলবেন: মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর উম্মাত। তখন (উম্মাতে মুহাম্মাদী) সাক্ষ্য দিয়ে বলবে, তিনি দায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ আয়াত পাঠ করলেন:



(وَكذٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَّسَطًا)



(সহীহ বুখারী হা: ৪৪৮৭)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَکَیْفَ اِذَا جِئْنَا مِنْ کُلِّ اُمَّةٍۭ بِشَھِیْدٍ وَّجِئْنَا بِکَ عَلٰی ھٰٓؤُلَا۬ئِ شَھِیْدًا)



“যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব তখন কী অবস্থা হবে?”। (সূরা নিসা ৪:৪১)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃত মু’মিনের মানদণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন।



এ কেবলা পরিবর্তন এ জন্য করা হয়েছে যাতে আল্লাহ তা‘আলা জেনে নেন কারা প্রকৃতপক্ষে রাসূলের অনুসারী আর কারা মুনাফিক।



ইসলামের কোন আদেশ পালন বা নিষেধকৃত বিষয় বর্জন করা মু’মিন ছাড়া অন্যদের জন্য বড়ই কঠিন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(وَاِذَا مَآ اُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ فَمِنْھُمْ مَّنْ یَّقُوْلُ اَیُّکُمْ زَادَتْھُ ھٰذِھ۪ٓ اِیْمَانًاﺆ فَاَمَّا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا فَزَادَتْھُمْ اِیْمَانًا وَّھُمْ یَسْتَبْشِرُوْنَ﯋وَاَمَّا الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِھِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْھُمْ رِجْسًا اِلٰی رِجْسِھِمْ)



“যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয় তখন তাদের কেউ কেউ বলে ‘এটা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করলো?’যারা মু’মিন এটা তাদেরই ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারাই আনন্দিত হয়। এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, এটা তাদের কলুষের সাথে আরও কলুষ যুক্ত করে।”(সূরা তাওবাহ ৯:১২৪-২৫)



(وَمَا كَانَ اللّٰهُ لِيُضِيْعَ إِيْمَانَكُمْ)



‘আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের ঈমান (সালাত) বিনষ্ট করে দিবেন’এখানে ঈমান সালাত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সালাতকে ঈমান বলার কারণ হল সালাত ঈমানের পরিচায়ক। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



الْفَرْقُ بَيْنَ الْعَبْدِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ



আল্লাহ তা‘আলার দাসত্ব ও কুফরীর মাঝে পার্থক্য হল সালাত বর্জন করা। (সহীহ মুসলিম হা:৮২)



(فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا)



‘তাই আমি তোমাকে ঐ কেবলামুখীই করব যা তুমি কামনা করছ’এ অংশটুকুর তাফসীর হল



(فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ)



“তুমি মাসজিদে হারামের দিকে (কা‘বার দিকে) তোমার মুখমণ্ডল ফিরিয়ে নাও।”



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষকে সালাতে কাবামুখী হবার নির্দেশ দিচ্ছেন। সে ব্যক্তি পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর বা দক্ষিণ দিকের অর্থাৎ পৃথিবীর যে কোন দিকের অধিবাসীই হোক না কেন।



সালাতের কেবলা হল বাইতুল্লাহ, তবে সফরে নফল সালাত ও যুদ্ধের ময়দানের ফরয সালাত ব্যতীত। কেননা তাতে কেবলামুখী হওয়া কঠিন বিধায় জরুরী নয়। (তাফসীর ইবনে কাসীর ১/৪১৫)



আহলে কিতাব বিশেষ করে ইয়াহূদীরা জানে যে, এ কেবলা পরিবর্তন সত্য এবং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে। কিন্তু অহঙ্কারবশত তা প্রত্যাখ্যান করে।



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কেন এ বিধান দিলেন বা কেন পূর্বের বিধান বাতিল করলেন ইত্যাদি প্রশ্ন করা ঈমানদারদের সমীচীন নয়। বরং ঈমানের পরিচয় হল আল্লাহ তা‘আলা যখন যে বিধান দেবেন তা মাথা পেতে মেনে নেয়া।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ইসলামে বিধান রহিতকরণ শরীয়তসিদ্ধ। যেমন এখানে বাইতুল মুকাদ্দাসের কেবলা রহিত করে বাইতুল্লাহকে নির্ধারণ করা হল।

২. কেবল মুনাফিক ও কাফিররাই শরীয়তের বিধি-বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে থাকে।

৩. সকল উম্মাতের ওপর উম্মাতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব সর্ম্পকে জানলাম।

৪. বিভিন্ন সময় বিধি-বিধানের বদল করে আল্লাহ তা‘আলা পরীক্ষা করেন কারা প্রকৃত ঈমানদার।

৫. শরীয়তের বিধান যত বড়ই হোক না কেন মু’মিনের কাছে তা সহজসাধ্য; পক্ষান্তরে মুনাফিক ও কাফিরের কাছে আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পড়ার মত কঠিন।

৬. অজানার কারণে কেবলার ভিন্নদিকে সালাত আদায় করলে সালাত পুনরাবৃত্তি করতে হবে না।

৭. সারা পৃথিবীবাসীর জন্য একমাত্র কেবলা কাবা, কেউ স্বেচ্ছায় অন্য কেবলা গ্রহণ করলে তা প্রত্যাখ্যাত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৪২-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর

বলা হয় যে, নির্বোধ লোক দ্বারা আরবের মুশরিকদের বুঝানো হয়েছে। একটি উক্তিতে ইয়াহূদীদের আলেমগণকে বুঝানো হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মুনাফিকেরা। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মোল বা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়েছেন। কা'বা ঘর তাঁর কিবলাহ্ হোক এটাই তাঁর মনের বাসনা ছিল। এর হুকুম প্রাপ্তির পর তিনি ঐদিকে মুখ করে প্রথম আসরের নামায পড়েন। যেসব লোক তাঁর সাথে নামায পড়েছিলেন তাদের মধ্যে একটি লোক মসজিদের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। তথায় তোক রুকুর অবস্থায় ছিলেন। ঐ লোকটি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি নবী (সঃ)-এর সঙ্গে মক্কার দিকে মুখ করে নামায পড়েছি।' একথা শুনামাত্রই ঐসব লোক ঐ অবস্থাতেই কা'বার দিকে ফিরে যান। কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশের পূর্বে যাঁরা মারা গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বহু লোক শহীদও হয়েছিলেন। তাঁদের নামায সম্বন্ধে কি বলা যায় তা জনগণের জানা ছিল না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না।'

সহীহ মুসলিমের মধ্যে এই বর্ণনাটি অন্যভাবে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তেন এবং অধিকাংশ সময় আকাশের দিকে দৃষ্টি উঠিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করতেন। তখন (আরবি) (২:৪৪) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং কা'বা শরীফ কিবলাহ্ রূপে নির্ধারিত হয়। এই সময় মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক বলেনঃ “কিবলাহ’ পরিবর্তনের পূর্বে যারা মারা গেছেন তাদের অবস্থা, যদি আমরা জানতে পারতাম! সেই সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি) (২:৪৩) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। আহলে কিতাবের মধ্যে কয়েকজন নির্বোধ এই কিবলাহ্ পরিবর্তনের উপর আপত্তি আরোপ করে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করেন তখন বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ্ করা তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিল। এতে ইয়াহূদীরা খুবই খুশী হয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ) -এর কিবলাহকে পছন্দ করতেন। সুতরাং কিবলাহ্ পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হলে ইয়াহূদীরা হিংসা বশতঃ বহু আপত্তি উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। এই ব্যাপারে যথেষ্ট হাদীসও রয়েছে।

মোট কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় দুই রুকনের মধ্যবর্তী সাখারাই-বায়তুল মুকাদ্দাসকে সামনে রেখে নামায পড়তেন। যখন তিনি মদীনায় হিজরত করেন তখন ঐ দুটোকে একত্রিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই জন্যে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নামাযে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করার নির্দেশ প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই নির্দেশ কুরআন কারীমের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল কি অন্য কিছুর মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এটা তাঁর ইজতিহাদী বিষয় ছিল এবং মদীনায় আগমনের পরে কয়েক মাস পর্যন্ত তিনি ওর উপরই আমল করেন, যদিও তিনি আল্লাহ তা'আলার কিবলাহ পরিবর্তনের নির্দেশের প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকতেন। অবশেষে তাঁর প্রার্থনা গৃহীত হয় এবং সর্বপ্রথম তিনি ঐদিকে মুখ করে আসরের নামায পড়েন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, ওটা যুহরের নামায ছিল। হযরত আবু সাঈদ বিন আলমুয়াল্লা (রাঃ) বলেন, আমি ও আমার সঙ্গী প্রথমে কাবার দিকে মুখ করে নামায পড়েছি এবং ওটা যুহরের নামায ছিল। কোন কোন মুফাসসিরের বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ)-এর উপর কিবলাহ পরিবর্তনের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বানী সালমার’ মসজিদে যুহরের নামায পড়ছিলেন। দু'রাকআত পড়া শেষ করে ফেলেছিলেন, অবশিষ্ট দু'রাকআত তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে পড়েন। এই কারণেই এই মসজিদের নাম হয়েছে মসজিদুল কিবলাতাইন' অর্থাৎ ‘দুই কিবলার মসজিদ'। হযরত নুওয়াইলা বিনতে মুসলিম (রাঃ) বলেনঃ “আমরা যুহরের নামাযে ছিলাম এমন সময় আমরা এ সংবাদ পাই, আমরা নামাযের মধ্যেই ঘুরে যাই। পুরুষ লোকেরা স্ত্রীলোকদের জায়গায় এসে পড়ে এবং স্ত্রীলোকেরা পুরুষ লোকদের জায়গায় পৌছে যায়। তবে ‘কুবা' বাসীর নিকট পরদিন ফজরের নামাযের সময় এ সংবাদ পৌছে।' বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মানুষ ‘কুবা’র মসজিদে ফজরের নামায আদায় করছিল, হঠাৎ কোন আগন্তুক বলে যে, রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কুরআন মাজীদের হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে এবং কাবা শরীফের দিকে মুখ করার নির্দেশ হয়ে গেছে। সুতরাং আমরাও সিরিয়ার দিক হতে মুখ সরিয়ে কা'বার দিকে মুখ করে নেই। এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেল যে, কোন নাসিখের’ হুকুম তখনই অবশ্য পালনীয় হয়ে থাকে যখন তা জানা যায়, যদিও তা পূর্বেই পৌছে থাকে। কেননা এই মহোদয়গণকে আসর, মাগরিব ও এশার নামায আবার ফিরিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি।

এখন অন্যায় পন্থী এবং দুর্বল বিশ্বাসের অধিকারী ব্যক্তিরা বলতে আরম্ভ করে যে, কখনও একে এবং কখনও ওকে কেবলাহ্ বানানোর কারণটা কি? তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, হুকুম ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যেদিকেই মুখ কর না কেন, সব দিকেই তিনি রয়েছেন। মুখ এদিকে ও ঐদিকে করার মধ্যে কোন মঙ্গল নিহিত নেই। প্রকৃত পুণ্যের কারণ হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা যা প্রত্যেক নির্দেশ মানতে বাধ্য করে থাকে। এর দ্বারা যেন মুসলমানদেরকে দ্রতা শিখানো হচ্ছে যে, তাদের কাজ তো শুধু আদেশ পালন। যে দিকেই তাদেরকে মুখ করতে বলা হয় সেদিকেই তারা মুখ করে থাকে। আনুগত্যের অর্থ হচ্ছে তার আদেশ পালন। যদি দিনে একশো বার ঘুরতে বলেন তবুও আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে ঘুরে যাবো। আমরা তাঁরই অনুগত এবং তাঁরই সেবক। তিনি যেদিকেই আমাদের ঘুরতে বলবেন, সেই দিকেই আমরা ঘুরে যাবো। মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের উপরে এটাও একটা বড় অনুগ্রহ যে, তাদেরকে আল্লাহর বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলার দিকে মুখ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সেই অংশী বিহীন আল্লাহর নামের উপর নির্মাণ করা হয়েছে এবং যদ্দ্বারা সমুদয় ফযীলত লাভ হয়ে থাকে। মুসনাদে আহমাদের মধ্যে একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই ব্যাপারে আমাদের উপর ইয়াহূদীদের খুবই হিংসা রয়েছে যে, আমাদেরকে জুম'আর দিনের তাওফীক প্রদান করা হয়েছে এবং তারা তা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আর এর উপর যে, আমাদের কিবলাহ এইটি এবং তারা এর থেকে ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। আমাদের সজোরে ‘আমীন' বলার উপরেও তাদের বড়ই হিংসা রয়েছে, যা আমরা ইমামের পিছনে বলে থাকি।'

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, হে উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)! তোমাদেরকে এই পছন্দনীয় কিবলার দিকে ফিরাবার কারণ এই যে, তোমরা নিজেও পছন্দনীয় উম্মত। তোমরা কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের উপর সাক্ষী স্বরূপ দাঁড়াবে। কেননা তারা সবাই তোমাদের মর্যাদা স্বীকার করে। (আরবি)-এর অর্থ এখানে ভাল ও উত্তম। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, কুরাইশ বংশ হিসেবে (আরবি) অর্থাৎ আরবের মধ্যে উত্তম। এটাও বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় গোত্রের মধ্যে (আরবি) ছিলেন অর্থাৎ সম্ভ্রান্ত বংশ সম্পন্ন ছিলেন। (আরবি)অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম নামায, যেটা আসরের নামায, এটা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে। সমস্ত উম্মতের মধ্যে উম্মতে মুহাম্মদীই (সঃ) সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বলে তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ শরীয়তও দেয়া হয়েছে, সম্পূর্ণ সরল ও সঠিক পথও দেয়া হয়েছে এবং অতি স্পষ্ট ধর্মও দেয়া হয়েছে। এই জন্যেই মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ সেই আল্লাহ তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাদের ধর্মে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি। তোমরা তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপরে রয়েছ এবং তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান। এর পূর্বেও এবং এর মধ্যেও যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন, আর তোমরা সাক্ষী হও অন্যান্য উম্মতের উপর।' মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন হযরত নুহ (আঃ) কে ডাকা হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি কি আমার বার্তা আমার বান্দাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলে?' তিনি বলবেনঃ হে প্রভু! হাঁ, আমি পৌছিয়ে দিয়েছি।' অতঃপর তাঁর উম্মতকে ডাকা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ নূহ (আঃ) কি তোমাদের নিকট আমার বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিল? তারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবে এবং বলবে আমাদের নিকট কোন ভয় প্রদর্শক আসেননি। তখন হযরত নূহ (আঃ)-কে বলা হবেঃ তোমার উম্মত তো অস্বীকার করছে সুতরাং তুমি সাক্ষী হাযির কর। তিনি বললেনঃ হ, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মত আমার সাক্ষী'। (আরবি) আয়াতটির ভাবার্থ এটাই (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘আদল’ ও ‘ইনসাফ'। এখন তোমাদেরকে আহবান করা হবে এবং তোমরা সাক্ষ্য প্রদান করবে, আর আমি তোমাদের অনুকূলে সাক্ষ্য দেব (সহীহ বুখারী, জামেউত্ তিরমিযী, সুনান-ই-নাসায়ী, সুনান ই ইবনে মাজাহ)।

মুসনাদে আহমাদের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন নবী আসবেন এবং তার সাথে তাঁর উম্মতের শুধু মাত্র দুটি লোকই থাকবে কিংবা তার চেয়ে বেশী। তাঁর উম্মতকে আহবান করা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবেঃ এই নবী কি তোমাদের নিকট ধর্ম প্রচার করে ছিলেন?' তারা অস্বীকার করবে। নবীকে তখন জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি ‘তাবলীগ’ করেছিলে কি? তিনি বলবেন হ’। তাকে বলা হবেঃ তোমার সাক্ষী কে আছে?' তিনি বলবেন, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মত।' অতঃপর মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে ডাকা হবে। তাদেরকে এই প্রশ্নই করা হবে যে, এই নবী প্রচার কার্য চালিয়ে ছিলেন কি? তারা বলবেন হাঁ। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ ‘তোমরা কি করে জানলে?' তারা উত্তর দেবেঃ আমাদের নিকট নবী আগমন করেছিলেন এবং তিনিই আমাদেরকে জানিয়ে ছিলেন যে, নবীগণ তাঁদের উম্মতের নিকট প্রচার কার্য চালিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার (আরবি) এই কথার ভাবার্থ।' মুসনাদে আহমাদের আরও একটি হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ যারা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত।' তাফসীর ইবনে মিরদুওয়াই ও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আমি ও আমার উম্মত উঁচু টিলার উপর অবস্থান করবো এবং সমস্ত মাখলুকের মধ্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবো এবং সকলকেই দেখতে থাকবো। সেই দিন সবাই এই আকাংখা পোষণ করবে যে, যদি তারাও আমাদের অন্তর্ভুক্ত হতো।

যে যে নবীকে তাদের কওম’ অবিশ্বাস করেছিল, আমরা মহান আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য প্রদান করবো যে, এই সব নবী তাদের রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।' মুস্তাদরিক-ই-হাকিম নামক হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন ‘বানী মাসলামা গোত্রের একটি লোকের জানাযায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপস্থিত হন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে ছিলাম। তাদের মধ্যে কোন একটি লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল! এই লোকটি খুবই সৎ, খোদাভীরু পুণ্যবান এবং খাঁটি মুসলমান ছিল। এভাবে সে তার অত্যন্ত প্রশংসা করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তুমি একথা কি করে বলছো?' লোকটি বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গুপ্ত ব্যাপারতো আল্লাহ তাআলাই জানেন। কিন্তু বাহ্যিক ব্যাপার তার এরূপই ছিল। নবী (সঃ) বলেনঃ ‘এটা তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। অতঃপর তিনি বানু হারিসার একটি জানাযায় উপস্থিত হন এবং আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তাদের মধ্যে একজন লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এই লোকটি খুবই মন্দ ছিল। সে ছিল খুবই কর্কশ ভাষী এবং মন্দ চরিত্রের অধিকারী।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দুর্নাম শুনে বলেন, 'তুমি কিভাবে একথা বলছছ?' সেই লোকটিও ঐ কথা বলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার জন্যে এটা ওয়াজিব হয়ে গেল।

হযরত মুসআব বিন সাবিত (রাঃ) বলেনঃ এই হাদীসটি শুনে মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ) আমাদেরকে বলেনঃ আল্লাহর রাসূল (সঃ) সত্যই বলেছেন। অতঃপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদে আহমাদ’ নামক হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, আবুল আসওয়াদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একবার মদীনায় আগমন করি। এখানে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বহু লোক মরতে থাকে। আমি হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা যেতে থাকে। জনগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করতে আরম্ভ করে। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। ইতিমধ্যে আর একটি জানাযা বের হয়। লোকেরা তার দুর্নাম করতে শুরু করে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। আমি বলিঃ হে আমিরুল মুমেনিন! কি ওয়াজিব হয়ে গেল?' তিনি বলেনঃ “আমি ঐ কথাই বললাম যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন। তিনি বলেছেনঃ চারজন লোক যে মুসলমানের ভাল কাজের সাক্ষ্য প্রদান করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে বেহেস্তে প্রবেশ করাবেন।' আমরা বলি-'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি তিন ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়? তিনি বলেনঃ “তিন জন দিলেও।' আমরা বলি যদি দুইজন দেয়?' তিনি বলেনঃ ‘দুইজন দিলেও। অতঃপর আমরা আর একজনের ব্যাপারে প্রশ্ন করিনি। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি হাদীসের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুহাইর সাকাফী (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘অতি সত্বরই তোমরা তোমাদের ভাল ও মন্দ জেনে নেবে। জনগণ বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে (জানবে)? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ পৃথিবীর উপর তোমরা ভাল ও মন্দ প্রশংসা দ্বারা আল্লাহর সাক্ষীরূপে গণ্য হচ্ছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘প্রথম কিবলাহ্ শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক ছিল। অর্থাৎ প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ্ নির্ধারিত করে পরে কা'বা শরীফকে কিবলাহ্ রূপে নির্ধারণ করা শুধু এই জন্যই ছিল যে, এর দ্বারা সত্য অনুসারীর পরিচয় পাওয়া যায়। আর তাকেও চেনা যায় যে এর কারণে ধর্ম হতে ফিরে যায়। এটা বাস্তবিকই কঠিন কাজ ছিল, কিন্তু যাদের অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যানুসারী, যারা বিশ্বাস রাখে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা যা বলেন তা সত্য, যাদের এই বিশ্বাস আছে যে, আল্লাহ তা'আলা যা চান তাই করে থাকেন, তিনি বান্দাদের উপর যে নির্দেশ দেয়ার ইচ্ছা করেন সেই নির্দেশই দিয়ে থাকেন এবং যে নির্দেশ উঠিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করেন তা উঠিয়ে নেন, তাঁর প্রত্যেক কাজ নিপুণতায় পরিপূর্ণ, তাদের জন্যে এই নির্দেশ পালন মোটেই কঠিন নয়। তবে যাদের অন্তর রোগাক্রান্ত তাদের কাছে কোন নতুন নির্দেশ এলেই তো তাদের নতুন ব্যথা উঠে পড়ে। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয় তখন তাদের মধ্যে কেউ বলে-এর দ্বারা কার ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে?’ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঈমানদারগণের ঈমান বৃদ্ধি পেয়ে থাকে এবং তাদের মনের আনন্দও বৃদ্ধি পায়। আর রোগাক্রান্ত অন্তর বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের অপবিত্রতার মধ্যে আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল-ঈমানদারদের জন্যে এটা সুপথ প্রাপ্তি ও রোগ মুক্তির কারণ এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদের কর্ণসমূহে বধিরতা ও চক্ষুসমূহে অন্ধত্ব রয়েছে।' (৪১:৪৪) অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ আমি এমন কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা ঈমানদারদের জন্যে শিফা ও রহমত স্বরূপ, এবং এটা দ্বারা অত্যাচারীদের শুধু অনিষ্টই বর্ধিত হয়।' (১৭৪৮২) এ ঘটনাতেও সমস্ত মহান সাহাবী (রাঃ) স্থির ছিলেন। যেসব মুহাজির (রাঃ) ও আনসার (রাঃ) প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন তারা উভয় কিবলাহর দিকে মুখ করেই নামায পড়েছেন।

উপরে বর্ণিত হাদীস দ্বারা এটা জানা গেছে যে, নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নামাযের মধ্যেই তাঁরা কাবার দিকে ফিরে গেছেন। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা রুকুর অবস্থায় ছিলেন এবং ঐ অবস্থাতেই কাবার দিকে ফিরে যান। এর দ্বারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ পাচ্ছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না, অর্থাৎ তোমরা বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ করে যেসব নামায আদায় করেছো,ওর পুণ্য থেকে আমি তোমাদেরকে বঞ্চিত করবো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বরং তাদের উচ্চমানের ঈমানদারী সাব্যস্ত হয়েছে। তাদেরকে দুই কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়ার পুণ্য দেয়া হবে। এর ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মদ (সঃ)-কে এবং তাঁর সাথে তোমাদের ঘুরে যাওয়াকে নষ্ট করবেন না। এর পর বলা হচ্ছেঃ নিশ্চয় আল্লাহ মানবগণের প্রতি স্নেহশীল, দয়ালু। সহীহ হাদীসে রয়েছে, একটি বন্দিনী স্ত্রী লোকের শিশু তার থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। এই স্ত্রী লোকটিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দেখেন যে, সে উন্মাদিনির ন্যায় শিশুকে খুঁজতে রয়েছে। তাকে খুঁজে না পেয়ে সে বন্দীদের মধ্যে যে শিশুকেই দেখতে পায় তাকেই গলায় জড়িয়ে ধরে। অবশেষে সে তার শিশুকে পেয়ে যায়। ফলে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে এবং লাফিয়ে গিয়ে তাকে কোলে উঠিয়ে নেয়। অতঃপর তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সোহাগ করতে থাকে এবং মুখে দুধ দেয়। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) বলেন, আচ্ছা বলতো এই স্ত্রী লোকটি কি তার এই শিশুটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?' তাঁরা বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কখনই না। তিনি তখন বলেনঃ আল্লাহর শপথ! এই মা তার শিশুর উপর যতটা স্নেহশীল, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর এর চেয়ে বহু গুণে স্নেহশীল ও দয়ালু।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।