আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 113)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 113)



হরকত ছাড়া:

وقالت اليهود ليست النصارى على شيء وقالت النصارى ليست اليهود على شيء وهم يتلون الكتاب كذلك قال الذين لا يعلمون مثل قولهم فالله يحكم بينهم يوم القيامة فيما كانوا فيه يختلفون ﴿١١٣﴾




হরকত সহ:

وَ قَالَتِ الْیَهُوْدُ لَیْسَتِ النَّصٰرٰی عَلٰی شَیْءٍ ۪ وَّ قَالَتِ النَّصٰرٰی لَیْسَتِ الْیَهُوْدُ عَلٰی شَیْءٍ ۙ وَّ هُمْ یَتْلُوْنَ الْکِتٰبَ ؕ کَذٰلِکَ قَالَ الَّذِیْنَ لَا یَعْلَمُوْنَ مِثْلَ قَوْلِهِمْ ۚ فَاللّٰهُ یَحْکُمُ بَیْنَهُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ فِیْمَا کَانُوْا فِیْهِ یَخْتَلِفُوْنَ ﴿۱۱۳﴾




উচ্চারণ: ওয়াকা-লাতিল ইয়াহূদূ লাইছাতিন নাসা-রা- ‘আলা- শাইয়িওঁ ওয়াকা-লাতিন নাসা-রা-লাইছাতিল ইয়াহূদূ ‘আলা শাইয়িওঁ ওয়া হুম ইয়াতলূনাল কিতা-বা কাযা-লিকা কা-লাল্লাযীনা লা-ইয়া‘লামূনা মিছলা কাওলিহিম ফাল্লা-হু ইয়াহকুমুবাইনাহুম ইয়াওমাল কিয়া-মাতি ফীমা-কানূ ফীহি ইয়াখতালিফূন।




আল বায়ান: আর ইয়াহূদীরা বলে, ‘নাসারাদের কোন ভিত্তি নেই’ এবং নাসারারা বলে ‘ইয়াহূদীদের কোন ভিত্তি নেই’। অথচ তারা কিতাব পাঠ করে। এভাবেই, যারা কিছু জানে না, তারা তাদের কথার মত কথা বলে। সুতরাং যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করত আল্লাহ কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে তাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১৩. আর ইয়াহুদীরা বলে, ‘নাসারাদের কোন ভিত্তি নেই’ এবং ‘নাসারারা বলে ইয়াহুদীদের কোন ভিত্তি নেই’ অথচ তারা কিতাব পড়ে। এভাবে যারা কিছুই জানেনা তারাও একই কথা বলে(১)। কাজেই যে বিষয়ে তারা মতভেদ করতো কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে (সে বিষয়ে) মীমাংসা করবেন।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর ইয়াহূদীরা বলে যে, নাসারাদের মাযহাবের কোন ভিত্তি নেই; নাসারারা বলে যে, ইয়াহূদীদের মাযহাবের কোন ভিত্তি নেই, অথচ তারা কিতাব পাঠ করে, এভাবে যারা কিছু জানে না তারাও ওদের মতই বলে, যার সম্বন্ধে তারা মতবিরোধ করছে, আল্লাহ ক্বিয়ামাতের দিন তাদের মধ্যে সেই বিষয়ের সমাধান করবেন।




আহসানুল বায়ান: ১১৩। ইয়াহুদীরা বলে, ‘খ্রিষ্টানদের কোন (ধর্মীয়) ভিত্তি নেই’ [1] এবং খ্রিষ্টানরা বলে, ‘ইয়াহুদীদের কোন (ধর্মীয়) ভিত্তি নেই’; অথচ তারা কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) পাঠ করে। এভাবে যারা অজ্ঞ তারাও অনুরূপ কথা বলে থাকে। [2] সুতরাং যে বিষয়ে তাদের মতভেদ আছে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তার মীমাংসা করবেন।



মুজিবুর রহমান: আর ইয়াহুদীরা বলেঃ খৃষ্টানরা কোন বিষয়ের উপর নেই; এবং খৃষ্টানরা বলে, ইয়াহুদীরাও কোন বিষয়ের উপর নেই - অথচ তারা গ্রন্থ পাঠ করে। এরূপ যারা জানেনা, তারাও ওদের কথার অনুরূপ কথা বলে থাকে; অতএব যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করেছিল, উত্থান দিনে আল্লাহ তাদের মধ্যে তদ্বিষয়ে ফায়সালা করে দিবেন।



ফযলুর রহমান: ইহুদিরা বলে, “খ্রিষ্টানদের কাছে কিছু নেই” এবং খ্রিষ্টানরা বলে, “ইহুদিদের কাছে কিছু নেই” (একে অপরের ধর্মকে হেয় করার জন্য তারা এ ধরনের কথা বলে); অথচ তারা আসমানি কিতাব পাঠ করে থাকে। যারা (কিছু) জানে না তারাও তাদের মত এমন কথাই বলে। তারা যা নিয়ে (দুনিয়ায়) মতভেদ করত কেয়ামতের দিন আল্লাহ সে বিষয়ে মীমাংসা করবেন।



মুহিউদ্দিন খান: ইহুদীরা বলে, খ্রীস্টানরা কোন ভিত্তির উপরেই নয় এবং খ্রীস্টানরা বলে, ইহুদীরা কোন ভিত্তির উপরেই নয়। অথচ ওরা সবাই কিতাব পাঠ করে! এমনিভাবে যারা মূর্খ, তারাও ওদের মতই উক্তি করে। অতএব, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের মধ্যে ফয়সালা দেবেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করছিল।



জহুরুল হক: আর ইহুদীরা বলে -- “খ্রীষ্টানরা কিছুরই উপর নয়”, আর খ্রীষ্টানরা বলে -- “ইহুদীরা কিছুরই উপর নয়।” অথচ তারা সবাই গ্রন্থ পড়ে। এমনিভাবে তাদের কথার মতো কথা বলে এরা যারা জানে না। তাই আল্লাহ্ কিয়ামতের দিনে তাদের মধ্যে রায় দেবেন যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করতো।



Sahih International: The Jews say "The Christians have nothing [true] to stand on," and the Christians say, "The Jews have nothing to stand on," although they [both] recite the Scripture. Thus the polytheists speak the same as their words. But Allah will judge between them on the Day of Resurrection concerning that over which they used to differ.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১১৩. আর ইয়াহুদীরা বলে, ‘নাসারাদের কোন ভিত্তি নেই’ এবং ‘নাসারারা বলে ইয়াহুদীদের কোন ভিত্তি নেই’ অথচ তারা কিতাব পড়ে। এভাবে যারা কিছুই জানেনা তারাও একই কথা বলে(১)। কাজেই যে বিষয়ে তারা মতভেদ করতো কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে (সে বিষয়ে) মীমাংসা করবেন।


তাফসীর:

(১) ইয়াহুদী হোক অথবা নাসারা কিংবা মুসলিম- যে কেউ উপরোক্ত মৌলিক বিষয়াদির মধ্য থেকে কোন একটি ছেড়ে দেয়, অতঃপর শুধু নামভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে নিজেদেরকে জান্নাতের একমাত্র উত্তরাধিকারী মনে করে নেয়, সে আত্মপ্রবঞ্চনা বৈ কিছুই করে না; আসল সত্যের সাথে এর কোনই সম্পর্ক নেই। এসব নামের উপর ভরসা করে কেউ আল্লাহর নিকটবর্তী ও মকবুল হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না তার মধ্যে ঈমান ও সৎকর্ম থাকে। প্রত্যেক নবীর শরীআতেই ঈমানের মূলনীতি এক ও অভিন্ন।

তবে সৎকর্মের আকার-আকৃতিতে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়েছে। তাওরাতের যুগে যেসব কাজ-কর্ম মূসা আলাইহিস সালাম ও তাওরাতের শিক্ষার অনুরূপ ছিল, তাই ছিল সৎকর্ম। তদ্রুপ ইঞ্জলের যুগে নিশ্চিতরূপে তা-ই ছিল সৎকর্ম, যা ঈসা আলাইহিস সালাম ও ইঞ্জলের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যশীল ছিল। এখন কুরআনের যুগে ঐসব কাজ-কর্মই সৎকর্মরূপে অভিহিত হওয়ার যোগ্য, যা সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী এবং তার মাধ্যমে আসা গ্রন্থ কুরআনুল কারীমের হেদায়াতের অনুরূপ।

মোটকথা, ইয়াহুদী ও নাসারাদের মতবিরোধ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলার ফয়সালা এই যে, উভয় সম্প্রদায় মূর্খতাসুলভ কথাবার্তা বলছে, তাদের কেউই জান্নাতের ইজারাদার নয়। ভুল বুঝাবুঝির প্রকৃত কারণ হচ্ছে এই যে, ওরা দ্বীনের আসল প্রাণ ও বিশ্বাস, সৎকর্মকে বাদ দিয়ে বংশ অথবা দেশের ভিত্তিতে কোন সম্প্রদায়কে ইয়াহুদী আর কোন সম্প্রদায়কে নাসারা নামে অভিহিত করেছে। কুরআনুল কারীমে আহলে-কিতাবদের মতবিরোধ ও আল্লাহর ফয়সালা উল্লেখ করার মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিমদেরকে সতর্ক করা, যাতে তারাও ভুল বুঝাবুঝিতে লিপ্ত হয়ে একথা না বলে যে, আমরা পুরুষানুক্রমে মুসলিম, প্রত্যেক অফিসে ও রেজিষ্টারে আমাদের নাম মুসলিমদের কোটায় লিপিবদ্ধ এবং আমরা মুখেও নিজেদেরকে মুসলিম বলি, সুতরাং জান্নাত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাধ্যমে মুসলিমদের সাথে ওয়াদাকৃত সকল পুরস্কারের যোগ্য হকদার আমরাই।

এ ফয়সালা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শুধু দাবী করলে, মুসলিমরূপে নাম লিপিবদ্ধ করালে অথবা মুসলিমের ঔরসে কিংবা মুসলিমদের আবাসভূমিতে জন্ম গ্রহণ করলেই প্রকৃত মুসলিম হয় না, বরং মুসলিম হওয়ার জন্য পরিপূর্ণভাবে ইসলাম গ্রহণ করা অপরিহার্য। ইসলামের অর্থ আত্মসমর্পণ। দ্বিতীয়তঃ সৎকর্ম অর্থাৎ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করাও জরুরী।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ১১৩। ইয়াহুদীরা বলে, ‘খ্রিষ্টানদের কোন (ধর্মীয়) ভিত্তি নেই’ [1] এবং খ্রিষ্টানরা বলে, ‘ইয়াহুদীদের কোন (ধর্মীয়) ভিত্তি নেই’; অথচ তারা কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) পাঠ করে। এভাবে যারা অজ্ঞ তারাও অনুরূপ কথা বলে থাকে। [2] সুতরাং যে বিষয়ে তাদের মতভেদ আছে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তার মীমাংসা করবেন।


তাফসীর:

[1] ইয়াহুদীরা তাওরাত পড়ত। তাতে মুসা (আঃ)-এর জবানি ঈসা (আঃ)-এর সত্যায়ন বিদ্যমান, তা সত্ত্বেও ইয়াহুদীরা ঈসা (আঃ)-কে অস্বীকার করত। খ্রিষ্টানদের কাছে ইঞ্জীল বিদ্যমান, তাতে মূসা (আঃ) এবং তাওরাত যে আল্লাহর পক্ষ হতে আগত, সে কথার সত্যায়ন রয়েছে, তা সত্ত্বেও এরা ইয়াহুদীদেরকে কাফের মনে করে। অর্থাৎ, এখানে আহলে-কিতাবদের উভয় দলের কুফরী ও অবাধ্যতা এবং তাদের নিজের নিজের ব্যাপারে মিথ্যা আনন্দের মধ্যে মত্ত থাকার কথাই প্রকাশ করা হচ্ছে।

[2] আহলে-কিতাবদের মোকাবেলায় আরবের মুশরিকরা নিরক্ষর (অশিক্ষিত) ছিল। আর এই জন্যই তাদেরকে 'অজ্ঞ' বলা হয়েছে। কিন্তু তারাও মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মত এই মিথ্যা ধারণায় মত্ত ছিল যে, তারাই নাকি হকের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর এই জন্য তারা নবী করীম (সাঃ)-কে স্বাবীঃ অর্থাৎ, বেদ্বীন বলত।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১১৩ ও ১১৪ নং আয়াতের তাফসীর:



শানে নুযূল:



ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আগমন করল তখন ইয়াহূদী পণ্ডিতগণ এসে তাদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়ে গেল। তখন রাফে বিন হুরাইমালা বলল- তোমরা কোন ধর্মের ওপরই নও। কেননা তোমরা ঈসা ও ইঞ্জিলের সাথে কুফরী করেছ। তখন একজন নাজরানবাসী ইয়াহূদীদেরকে বলল- তোমরাও কোন ধর্মের ওপরই নও। কেননা তোমরা মূসা (আঃ)-এর নবুওয়াত ও তাওরাতকে অস্বীকার করেছ। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (তাফসীর ইবনে কাসীর ১/৩৩৮, লুবাবন নুকূল ফি আসবাবে নুযূল, পৃঃ ২৭)



অর্থাৎ ইয়াহূদীরা তাওরাত পড়ত। তাতে মূসা (আঃ)-এর জবানে ঈসা (আঃ)-এর সত্যায়ন বিদ্যমান, তা সত্ত্বেও ইয়াহূদীরা ঈসা (আঃ) কে অস্বীকার করে। খ্রিস্টানদের কাছে ইনজিল বিদ্যমান, তাতে মূসা (আঃ) এবং তাওরাত যে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে আগত সে কথার সত্যায়ন রয়েছে, তা সত্ত্বেও এরা ইয়াহূদীদেরকে কাফির মনে করে। এ হল ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের পরস্পরের প্রতি হিংসার বহিঃপ্রকাশ, যার কারণে তারা একে অপরকে পথভ্রষ্ট ও কাফির বলে।



(كَذٰلِكَ قَالَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ مِثْلَ قَوْلِهِمْ)



‘এভাবে যারা জানে না, তারাও ওদের কথার মত কথা বলে থাকে’অর্থাৎ আহলে কিতাবদের মোকাবেলায় আরবের মুশরিকরা নিরক্ষর (অশিক্ষিত) ছিল। আর এ জন্যই তাদেরকে ‘অজ্ঞ’বলা হয়েছে। কিন্তু তারা মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের মত এ মিথ্যা ধারণায় মত্ত ছিল যে, তারাই নাকি হক্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এ জন্যই তারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সাবেয়ী বা বেদীন বলত।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন: কারা সঠিক দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আর কারা প্রতিষ্ঠিত নয় তা নিয়ে নিজেদের মাঝে ঝগড়া করার প্রয়োজন নেই বরং তিনি কিয়ামতের দিন এ বিষয়ে ফায়সালা করে দেবেন। যেমন অন্যত্র বলেন:



(اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَالَّذِیْنَ ھَادُوْا وَالصَّابِئِیْنَ وَالنَّصٰرٰی وَالْمَجُوْسَ وَالَّذِیْنَ اَشْرَکُوْٓاﺣ اِنَّ اللہَ یَفْصِلُ بَیْنَھُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَةِﺚ اِنَّ اللہَ عَلٰی کُلِّ شَیْءٍ شَھِیْدٌ)



“যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহূদী হয়েছে, যারা সাবিয়ী, খৃষ্টান ও অগ্নিপূজক এবং যারা মুশরিক হয়েছে ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন। আল্লাহ সমস্ত‎ কিছুর সম্যক প্রত্যক্ষকারী।”(সূরা হজ্জ ২২:১৭)



(وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ)



‘‘আর তার চেয়ে বড় জালিম আর কে আছে’’আয়াতের শানে নুযূল: এর শানে নুযূলের ব্যাপারে দু’টি মত পাওয়া যায়। যথা:



১. ৬ষ্ঠ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন উমরা করতে যান তখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যে বাধা প্রদান করেছিল, সে ব্যাপারে নাযিল হয়। এর প্রমাণ বহন করে এ বাণী:



(هُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ)



“এরাই তো ঐ লোক, যারা কুফরী করেছে ও তোমাদেরকে মাসজিদুল হারাম থেকে ফিরিয়ে রেখেছে”(সূরা ফাতহ ৪৮:২৫)



এ অর্থে মাসজিদ ধ্বংস করার অর্থ হলো: মাসজিদে ইবাদত করতে বাধা দেয়া।



২. বখতে নসর ও অন্যান্যরা যে বাইতুল মাকদাসকে নষ্ট ও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছিল সে ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। এর প্রমাণ বহন করে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(فَاِذَا جَا۬ئَ وَعْدُ الْاٰخِرَةِ لِیَسُوْ۬ءۭا وُجُوْھَکُمْ وَلِیَدْخُلُوا الْمَسْجِدَ کَمَا دَخَلُوْھُ اَوَّلَ مَرَّةٍ وَّلِیُتَبِّرُوْا مَا عَلَوْا تَتْبِیْرًا)



“অতঃপর পরবর্তী নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে আমি আমার বান্দাদেরকে প্রেরণ করলাম তোমাদের মুখমণ্ডল কালিমাচ্ছন্ন করার জন্য, প্রথমবার তারা যেভাবে মাসজিদে প্রবেশ করেছিল পুনরায় সেভাবেই তাতে প্রবেশ করার জন্য এবং তারা যা অধিকার করেছিল তা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার জন্য।”(সূরা ইসরা ১৭:৭) (আযওয়াউল বায়ান ১/৮৯)



প্রথম বর্ণনাটি অধিক গ্রহণযোগ্য। আর এটাই অধিকাংশ মুফাসসিরগণ বর্ণনা করেছেন। ইবনু কাসীরেও এ বর্ণনা আছে। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



যারা মাসজিদে ইবাদত করতে বাধা দেয় ও মাসজিদ ধ্বংস করে তারা কারা? এ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়: তবে সঠিক হল তারা আরবের মুশরিকগণ। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



তারা যারাই হোক তাদের জন্য দুনিয়াতে রয়েছে অপমান আর আখিরাতে রয়েছে মহা শাস্তি।



(أُولٰ۬ئِكَ مَا كَانَ لَهُمْ أَنْ يَّدْخُلُوْهَآ إِلَّا خَا۬ ئِفِيْنَ)



এ ধরণের ব্যক্তিদেরকে ভীত অবস্থায়ই তাতে প্রবেশ করা উচিত” এখানে শব্দগুলো সংবাদমূলক হলেও উদ্দেশ্য হল আদেশ। অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠা ও বিজয় দান করবেন তখন তোমরা মুশরিকদেরকে সেখানে সন্ধি ও জিযিয়া-কর ছাড়া প্রবেশ বা অবস্থান করার অনুমতি দেবে না।



তাই ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা দিলেন, আগামী বছর থেকে কোন মুশরিক কাবায় হজ্জ ও উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৩৭৯) তবে যার সাথে চুক্তি আছে সে চুক্তির সময় পর্যন্ত এখানে থাকার অনুমতি পাবে।



কেউ বলেছেন: এটা একটা সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণী যে, অতি সত্বর মুসলিমরা জয়লাভ করবে এবং মুশরিকরা এ ভেবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রবেশ করবে যে, আমরা মুসলিমদের ওপর জুলুম-অত্যাচার করেছি তার বদলায় হয়তো তারা আমাদেরকে শাস্তি দিতে ও হত্যাও করতে পারে। বলা বাহুল্য অতি সত্বর এ সুসংবাদ বাস্তবে রূপান্তরিত হয়।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. দীন তিন স্তরের (ঈমান, ইসলাম ও ইহসান) ওপর প্রতিষ্ঠিত, এটাই জাহান্নাম হতে নাজাত ও জান্নাত লাভের একমাত্র মাধ্যম।

২. মাসজিদ ধ্বংস করা অথবা ইবাদতে বাধা দেয়া বড় ধরণের অপরাধ।

৩. কাফির-মুশরিকদের থেকে মাসজিদ রক্ষা করা ওয়াজিব।

৪. মুসলিমদের অন্যান্য জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব জানলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১১১-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর

ইয়াহূদীদের প্রতারণা, আমিত্ব এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তার উপর ভীষণ সতর্কতা

এখানে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের অহংকার ও আত্মম্ভরিতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকেও কিছুই মনে করতো না এবং স্পষ্টভাবে বলতো যে, তারা ছাড়া অন্য কেউ বেহেশতে যাবে না। সূরা মায়েদায় তাদের নিম্নরূপ একটা উক্তিও বর্ণিত হয়েছেঃ আমরা আল্লাহ তা'আলার সন্তান এবং তাঁর প্রিয়। তাদের এ কথার উত্তরে ইরশাদ হচ্ছেঃ তা হলে কিয়ামতের দিন তোমাদের উপর শাস্তি হবে কেন?’ অনুরূপভাবে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের উক্তি নিম্নরূপও ছিলঃ “আমরা কয়েকটা দিন দোযখে অবস্থান করবে। তাদের একথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তাদের এই দাবীও দলীল বিহীন। এভাবেই এখানেও তিনি তাদের একটা দাবী খণ্ডন করতঃ বলেনঃ ‘দলীল উপস্থিত কর দেখি? তাদের অপারগতা সাব্যস্ত করে পুনরায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “হাঁ, যে কেউই আল্লাহ তা'আলার অনুগত হয়ে ইখলাসের সাথে সল্কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে, সে পূর্ণভাবে তার প্রতিদান লাভ করবে। যেমন তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ “তারা যদি ঝগড়া করে তবে তাদেরকে বলে দাও আমি এবং আমার অনুসারীগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট আত্মসমর্পণ করেছি।'

মোট কথা, অন্তরের বিশুদ্ধতা ও সুন্নাতের অনুসরন প্রত্যেক আমল গ্রহণ যোগ্য হওয়ার জন্যে শর্ত। তাহলে (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘অন্তরের বিশুদ্ধতা এবং (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সুন্নাতের অনুসরণ। শুধু মাত্র বিশুদ্ধ অন্তঃকরণই আমলকে গ্রহণযোগ্য করতে পারে না যে পর্যন্ত না সে সুন্নাতের প্রতি অনুগত থাকে। হাদীস শরীফে উল্লিখিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যার উপর আমার নির্দেশ নেই তা গ্রহণীয় নয়' (সহীহ মুসলিম)। সুতরাং ‘সংসার ত্যাগ' কাজটি বিশুদ্ধ অন্তরের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তা সুন্নাতের উল্টো বলে গ্রহণীয় নয়। তদ্রুপ আমল সম্পর্কে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ তারা যা আমল করেছিল আমি তা সবই অগ্রাহ্য করেছি।' (২৫:২৩) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ কাফিরদের আমল বালুর চকে চকে মরীচিকার মত, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন তার কাছে যায় তখন কিছুই পায় না। অন্য স্থানে রয়েছেঃ “কিয়ামতের দিন বহু মুখমণ্ডলের উপর অপমানের কালিমা নেমে আসবে, তারা কাজ করতেও কষ্ট উঠাতে থাকবে এবং জ্বলন্ত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে, আর তাদেরকে গরম পানি পান করতে দেয়া হবে।

আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে এর ভাবার্থ নিয়েছেন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের আলেম ও আবেদগণ। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, বাহ্যতঃ কোন কাজ সুন্নাতের অনুরূপ হলেও ঐ আমলে অন্তরের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য না থাকার কারণে উক্ত আমলও প্রত্যাখ্যাত হয়ে যাবে। কপট ও মুনাফিকদের অবস্থাও এরূপই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘মুনাফিকরা আল্লাহ তা'আলাকে ধোকা দেয়, তিনিও তাদেরকে ধোকা দেন; যখন তারা নামাযে দাড়ায় তখন অলসতার সাথে দাঁড়ায়, তারা মানুষকে দেখাবার জন্যেই শুধু আমল করে থাকে।' তিনি আরো বলেনঃ ‘ঐ সব নামাযীর জন্যে ধ্বংস ও বিধ্বস্তি রয়েছে যারা নামাযে উদাসীন থাকে এবং যারা শুধু লোক দেখানোর জন্যে নামায পড়ে, আর যাকাত দেয়া হতে বিরত থাকে।' অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ সুতরাং যে ব্যক্তি স্বীয় প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ লাভের আকাংখা রাখে সে যেন সকাজ করতে থাকে এবং স্বীয় প্রভুর ইবাদতে অন্য কাউকেও অংশীদার না করে। আরও বলেছেনঃ “তাদেরকে তাদের প্রভু পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং ভয় ও সন্ত্রাস হতে রক্ষা করবেন। পরকালে তাদের কোন ভয় নেই এবং দুনিয়া ত্যাগ করতে তাদের কোন দুঃখ নেই।'

অতঃপর আল্লাহ পাক ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতার বর্ণনা দেন। নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিরা যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করে তখন ইয়াহুদী পণ্ডিতেরাও আসে। অতঃপর তারা একদল অপর দলকে পথভ্রষ্ট আখ্যায় আখ্যায়িত করে। অথচ উভয় দলই আহলে কিতাব। তাওরাতের মধ্যে ইঞ্জীলের এবং ইঞ্জীলের মধ্যে তাওরাতের সত্যতার প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং তাদের এসব কথা একেবারেই বাজে ও ভিত্তিহীন।

পূর্ববর্তী ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা সত্য ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, কিন্তু পরে তারা বিদআত ও ফিতনা ফাসাদে জড়িয়ে পড়ায় ধর্ম তাদের হতে ছিনিয়ে নেওয়া হয়; অতঃপর ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান কেউই আর সঠিক পথের উপর ছিল না তার পরে মহান আল্লাহ বলেনঃ মুখ ও নিরক্ষরেরাও এরূপ কথাই বলে। এতেও ইঙ্গিত তাদের দিকেই রয়েছে।

আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের পূর্বেকার লোক। কেউ কেউ আবার ‘আরবের লোক’ ভাবার্থ নিয়েছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর দ্বারা সাধারণ ভাবার্থ নিয়েছেন, যার মধ্যে সবাই জড়িত রয়েছে আর এটাই সঠিক। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ পাক তাদের মতবিরোধের ফায়সালা কিয়ামতের দিন করবেন, যেদিন কোন অত্যাচার ও বল প্রয়োগ থাকবে না। অন্য স্থানেও এ বিষয়টি আনা হয়েছে। সূরা-ই-হাজ্জ-এর মধ্যে এরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ পাক কিয়ামতের দিন মুমিন, ইয়াহূদী, সাবেঈ, খ্রীষ্টান, মাজুস এবং মুশরিকদের মধ্যে ফায়সালা করবেন, তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর সাক্ষী আছেন।'

আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওআমাদের প্রভু আমাদেরকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ন্যায় সঙ্গতভাবে ফায়সালা করবেন, তিনি বড় ফায়সালাকারী ও সর্বজ্ঞাত।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।