সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 11)
হরকত ছাড়া:
وليعلمن الله الذين آمنوا وليعلمن المنافقين ﴿١١﴾
হরকত সহ:
وَ لَیَعْلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ لَیَعْلَمَنَّ الْمُنٰفِقِیْنَ ﴿۱۱﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাইয়া‘লামান্নাল্লা-হুল্লাযীনা আ-মানূওয়া লাইয়া‘লামান্নাল মুনা-ফিকীন।
আল বায়ান: আর আল্লাহ অবশ্যই জানেন, কারা ঈমান এনেছে এবং তিনি মুনাফিকদেরকেও জানেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১. আর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা ঈমান এনেছে এবং অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা মুনাফিক।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ অবশ্য অবশ্যই জেনে নেবেন কারা ঈমান এনেছে আর অবশ্য অবশ্যই জেনে নেবেন কারা মুনাফিক।
আহসানুল বায়ান: (১১) আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা বিশ্বাসী এবং কারা মুনাফিক (কপট)।[1]
মুজিবুর রহমান: আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা ঈমান এনেছে এবং অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা মুনাফিক।
ফযলুর রহমান: অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদেরকেও জানেন আর মোনাফেকদেরকেও জানেন।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন যারা মুনাফেক।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ অবশ্যই জানিয়ে দেবেন তাদের যারা ঈমান এনেছে, আর জানিয়ে দেবেন মুনাফিকদের।
Sahih International: And Allah will surely make evident those who believe, and He will surely make evident the hypocrites.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১. আর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা ঈমান এনেছে এবং অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা মুনাফিক।(১)
তাফসীর:
(১) আয়াতের শাব্দিক অনুবাদ হচ্ছে, আল্লাহ অবশ্যই জানবেন কারা ঈমান এনেছে, আর অবশ্যই জানবেন কারা মুনাফিক। আল্লাহর এ জানার অর্থ প্রকাশ করে দেয়া। যাতে করে মুমিনদের ঈমান ও মুনাফিকদের মুনাফিকির অবস্থা যাতে উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং যার মধ্যে যা কিছু লুকিয়ে আছে সব সামনে এসে যায় সে জন্য আল্লাহ বারবার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। [দেখুন, ইবন কাসীর] একথাটিই কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ মুমিনদেরকে কখনো এমন অবস্থায় থাকতে দেবেন না, যে অবস্থায় এখন তোমরা আছে (অর্থাৎ সাচ্চা ঈমানদার ও মুনাফিক সবাই মিশ্রিত হয়ে আছো) যতক্ষণ না তিনি পবিত্ৰ লোকদেরকে অপবিত্ৰ লোকদের থেকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করে দেবেন।” [সূরা আলে ইমরান: ১৭৯]
আরও এসেছে, “আর আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যতক্ষণ না আমরা জেনে নেই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদেরকে এবং আমরা তোমাদের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করি।” [সূরা মুহাম্মাদ: ৩১] অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা শুধু তাঁর জ্ঞান অনুসারে কোন ফয়সালা করতে চান না। তিনি চান তাদের অন্তরের লুকানো বিষয় প্রকাশ হয়ে পড়ুক। আর সে জন্যই তিনি তাদেরকে পরীক্ষা করেন। এ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করতে চান। যাতে কিয়ামতের মাঠে বলতে না পারে যে, আপনি আমাদের যদি পরীক্ষা করতেন হয়ত আমরা সে পরীক্ষায় টিকে যেতাম। [সা'দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১) আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা বিশ্বাসী এবং কারা মুনাফিক (কপট)।[1]
তাফসীর:
[1] এর অর্থ হল যে, মহান আল্লাহ সুখ ও দুঃখ দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন, যাতে মু’মিন ও মুনাফিকের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যায়। যে উভয় অবস্থায় আল্লাহর আনুগত্য করবে সে মু’মিন, আর যে কেবলমাত্র সুখে-সম্পদে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে আসলে নিজ প্রবৃত্তির অনুগত; আল্লাহর নয়। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, {وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ} অর্থাৎ, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব; যতক্ষণ না আমি তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদেরকে জেনে নিই এবং আমি তোমাদের অবস্থা পরীক্ষা করি। (সূরা মুহাম্মাদ ৩১ আয়াত) যে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদেরকে ভীষণ পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়েছিল, তার পরবর্তীকালে মহান আল্লাহ বলেন,
{مَّا كَانَ اللّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَآ أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتَّىَ يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ} অর্থাৎ, অপবিত্র (মুনাফিক)-কে পবিত্র (মু’মিন) হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ আল্লাহ সে অবস্থায় বিশ্ববাসিগণকে ছেড়ে দিতে পারেন না। (সূরা আলে ইমরান ১৭৯ আয়াত)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর:
সূরার শুরু থেকে এ যাবৎ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেনন তিনি পরীক্ষা করবেন কে প্রকৃত মু’মিন আর কে মুনাফিক। অত্র আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছেন, মানুষের মাঝে একশ্রেণি রয়েছে যারা মুখে ঈমানদার বলে দাবী করে কিন্তু মূলত তারা মুনাফিক, তাদের অন্তরে ঈমান নেই।
(فِتْنَةَ النَّاسِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হল: মু’মিনরা কাফির শক্রদের থেকে যে কষ্ট, হত্যা, বন্দী ও নির্যাতনের শিকার হত তা। এরূপ কষ্টকে মুনাফিকরা আল্লাহ তা‘আলার শাস্তির সাথে তুলনা করত। অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করতে গিয়ে নিহত হত, মার খেত ও বন্দী হত তখন তা আল্লাহ তা‘আলার শাস্তির মত গণ্য করত।
আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি মানুষকে যেমন কুফর ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, কাফিরদের দ্বারা মুনাফিকরা শাস্তি প্রাপ্ত হলে দীন থেকে ফিরে যেত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمِنَ النَّاسِ مَنْ یَّعْبُدُ اللہَ عَلٰی حَرْفٍﺆ فَاِنْ اَصَابَھ۫ خَیْرُ اۨطْمَاَنَّ بِھ۪ﺆ وَاِنْ اَصَابَتْھُ فِتْنَةُ اۨنْقَلَبَ عَلٰی وَجْھِھ۪ﺥ خَسِرَ الدُّنْیَا وَالْاٰخِرَةَﺚ ذٰلِکَ ھُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِیْنُﭚ)
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে দ্বিধার সাথে; তার মঙ্গল হলে তাতে প্রশান্তি লাভ করে আর কোন বিপর্যয় ঘটলে সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুনিয়াতে ও আখিরাতে; এটা তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।” (সূরা হাজ্জ ২২:১১)
পক্ষান্তরে যদি কোন সাহায্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আসে তখন তারা বলে যে, আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(الَّذِيْنَ يَتَرَبَّصُوْنَ بِكُمْ ج فَإِنْ كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللّٰهِ قَالُوْآ أَلَمْ نَكُنْ مَّعَكُمْ ﺘوَإِنْ كَانَ لِلْكٰفِرِيْنَ نَصِيْبٌ لا قَالُوْآ أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُمْ مِّنَ الْمُؤْمِنِيْنَ)
“যারা তোমাদের অমঙ্গলের প্রতীক্ষায় থাকে তারা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে তোমাদের জয় হলে বলে, ‘আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?’ আর যদি কাফিরদের কিছু বিজয় হয়, তবে তারা বলে ‘আমরা কি তোমাদের পরিবেষ্টন করে রেখেছিলাম না এবং আমরা কি তোমাদেরকে মু’মিনদের হাত হতে রক্ষা করিনি?’’ (সূরা নিসা ৪:১৪১)
আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধের ময়দানে মুসলিম দলের জয়-পরাজয় দিয়ে থাকেন পরীক্ষা করার জন্য এবং জেনে নেয়ার জন্য, আসলে কে প্রকৃত ঈমানদার আর কে প্রকৃত ঈমানদার নয়।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যুদ্ধের ময়দানে পরীক্ষা হয় কে প্রকৃত মু’মিন আর কে মুনাফিক।
২. সুখের সময় মুনাফিকরা ঈমানের কথা খুব প্রকাশ করে কিন্তু দুঃখের সময় পেছনে থাকে।
৩. মুনাফিকরা মুসলিমদের জন্য কাফিরদের থেকে অধিক ক্ষতিকর।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর
এখানে ঐ মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা মুখে ঈমানের দাবী করে, কিন্তু যখন বিরোধীদের পক্ষ হতে কোন দুঃখ কষ্ট তাদের উপর আপতিত হয় তখন তারা মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন এ অর্থই করেছেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যে এক ধারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করে, যদি তাকে শান্তি ও সুখ পৌঁছে তবে সে সন্তুষ্ট থাকে, আর যদি কষ্ট ও বিপদ আপদ পোঁছে তবে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়।” (২২:১১) এজন্যেই আল্লাহ পাক এখানে বলেনঃ মানুষের মধ্যে কতক লোক বলে- আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করি, কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তাদেরকে কোন দুঃখ-কষ্ট পৌঁছে, তখন তারা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে। আর যখন তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন সাহায্য (গনীমত) আসে তখন বলে- আমরা। তো তোমাদের সাথেই ছিলাম। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ যারা তোমাদের সাথে অপেক্ষমান থাকে, অতঃপর যদি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তোমাদের বিজয় লাভ হয় তবে তারা বলে আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? আর যদি কাফিরদের (বিজয়ের) অংশ হয় তখন তারা (কাফিরদেরকে) বলে- আমরা কি তোমাদেরকে সহায়তা করিনি এবং তোমাদের পক্ষে কি মুমিনদের প্রতিরোধ ও প্রতিহত করিনি?` (৪:১৪১) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “খুব সম্ভব যে, আল্লাহ বিজয় আনয়ন করবেন অথবা নিজের পক্ষ হতে কোন বিষয় আনয়ন করবেন, তখন তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছে সে জন্যে লজ্জিত হয়ে যাবে।” (৫:৫২)
আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন সাহায্য আসলে তারা বলতে থাকে। আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম।
অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ বিশ্ববাসীর অন্তঃকরণে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন? অর্থাৎ মুনাফিকরা তাদের অন্তরে যা কিছু গোপন রেখেছে, আল্লাহ সবই অবগত আছেন।
আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন ঈমানদারদেরকে এবং অবশ্যই তিনি প্রকাশ করবেন মুনাফিকদেরকে। অর্থাৎ সুখ-দুঃখ ও বিপদ-আপদের মাধ্যমে তিনি মুমিন ও মুনাফিকদেরকে পৃথক করে দিবেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো, যতক্ষণ না আমি জেনে নিই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদেরকে এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে পরীক্ষা করি।” (৪৭:৩১) যেমন আল্লাহ তা'আলা উহুদের ঘটনার পরে বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছে। আল্লাহ সেই অবস্থায় মুমিনদেরকে ছেড়ে দিতে পারেন না।` (৩:১৭৯)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।