সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 88)
হরকত ছাড়া:
ولا تدع مع الله إلها آخر لا إله إلا هو كل شيء هالك إلا وجهه له الحكم وإليه ترجعون ﴿٨٨﴾
হরকত সহ:
وَ لَا تَدْعُ مَعَ اللّٰهِ اِلٰـهًا اٰخَرَ ۘ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۟ کُلُّ شَیْءٍ هَالِکٌ اِلَّا وَجْهَهٗ ؕ لَهُ الْحُکْمُ وَ اِلَیْهِ تُرْجَعُوْنَ ﴿۸۸﴾
উচ্চারণ: ওয়ালা-তাদ‘উ মা‘আল্লা-হি ইলা-হান আ-খারা । লাইলা-হা ইল্লা-হুওয়া কুল্লু শাইইন হা-লিকুন ইল্লা-ওয়াজহাহূ লাহুল হুকমুওয়া ইলাইহি তুরজা‘ঊন।
আল বায়ান: আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহকে ডেকো না, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তাঁর চেহারা (সত্ত্বা)* ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল, সিদ্ধান্ত তাঁরই এবং তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৮. আর আপনি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকবেন না, তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। আল্লাহর সত্তা ছাড়া সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।(১) বিধান তারই এবং তারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন ইলাহকে ডেকো না, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তাঁর (সত্তা) ছাড়া সকল কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই, আর তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।
আহসানুল বায়ান: (৮৮) তুমি আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে ডেকো না,[1] তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তাঁর মুখমন্ডল[2] ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই [3] এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [4]
মুজিবুর রহমান: তুমি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডেকনা, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
ফযলুর রহমান: আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্যকে ডেকো না। তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। একমাত্র তাঁর সত্তা ছাড়া আর সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত তাঁরই, এবং তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।
মুহিউদ্দিন খান: আপনি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে আহবান করবেন না। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সবকিছু ধবংস হবে। বিধান তাঁরই এবং তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্র সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডেকো না। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। তাঁর অবয়ব ব্যতীত আর সব কিছু ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই, আর তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে।
Sahih International: And do not invoke with Allah another deity. There is no deity except Him. Everything will be destroyed except His Face. His is the judgement, and to Him you will be returned.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৮. আর আপনি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকবেন না, তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। আল্লাহর সত্তা ছাড়া সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।(১) বিধান তারই এবং তারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
তাফসীর:
(১) এখানে وجهه বলে আল্লাহ তা'আলার পুরো সত্তাকে বোঝানো হলেও অন্য দিক থেকে এটা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার চেহারা’ রয়েছে। কারণ; যার চেহারা নেই তার সম্পর্কে এ শব্দ ব্যবহার করা যায় না। মূল উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সবকিছু ধ্বংসশীল। কোন কোন তাফসীরকার বলেন, وجهه বলে এমন আমল বোঝানো হয়েছে, যা একান্তভাবে আল্লাহর জন্য করা হয়। তখন আয়াতের উদ্দেশ্য হবে এই যে, যে আমল আল্লাহর জন্য খাঁটিভাবে করা হয়, তাই অবশিষ্ট থাকবে এছাড়া সব ধ্বংসশীল। উভয় তাফসীরই বিশুদ্ধ। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮৮) তুমি আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে ডেকো না,[1] তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তাঁর মুখমন্ডল[2] ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই [3] এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [4]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, অন্য কারো ইবাদত করো না। না দু’আর মাধ্যমে, না নযর-মানতের মাধ্যমে আর না কুরবানীর মাধ্যমে। কারণ, এগুলি ইবাদত বলে গণ্য, যা কেবলমাত্র এক আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করাকে কুরআনের ভাষায় ‘আহবান করা’ বলা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হল এ কথা স্পষ্ট করা যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যকে --যা করার তার ক্ষমতা নেই তার জন্য-- ডাকা, সাহায্য প্রার্থনা করা, তার নিকট দু’আ করা, বিনয়-নম্র হওয়া --এ সব করাই হল তার ইবাদত করা। যার কারণে মানুষ মুশরিকে পরিণত হয়।
[2] وَجهَه (তাঁর মুখমন্ডল) বলতে স্বয়ং আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া প্রত্যেক বস্তুই নশ্বর।{كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ} অর্থাৎ, ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই নশ্বর। অবিনশ্বর শুধু তোমার মহিমময়, মহানুভব প্রতিপালকের মুখমন্ডল (সত্তা)। (সূরা রাহমান ২৬-২৭ আয়াত)
[3] অর্থাৎ, তিনি যা চান সেই ফায়সালাই মান্য হয় এবং তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর আদেশ বলবৎ হয়।
[4] যাতে তিনি সৎকর্মশীলদের সৎকর্মের ও অসৎ কর্মশীলদের অসৎ কর্মের প্রতিদান দেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৫-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর:
(إِنَّ الَّذِيْ فَرَضَ عَلَيْكَ....)
উক্ত আয়াতে মূলত আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সান্ত্বনা প্রদান করছেন এবং তাবলীগী কাজে অবিচল থাকার প্রতি জোর দিচ্ছেন। সূরার শুরুতে মূসা (عليه السلام) ও তাঁর শত্র“ ফির‘আউনের ঘটনা বিস্তারিত আলোচনা করার পর সূরার শেষে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে চাচ্ছেনন মূসা (عليه السلام)-কে ফির‘আউন ও তার বাহিনী হত্যা করতে চেয়েছিল, তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে এবং তার ওপর অমানবিক নির্যাতন করে। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে ফির‘আউনের ওপর বিজয় দান করেন এবং নিজ দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। অনুরূপ হে রাসূল! মক্কার কাফিররা তোমাকে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছে, তোমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে এবং অমানবিক নির্যাতন করেছে। আল্লাহ তাঁর রীতি অনুযায়ী তোমাকেও বিজয় দান করবেন এবং মক্কায় তোমার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন।
(إِنَّ الَّذِيْ فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْاٰنَ)
অর্থাৎ যে পবিত্র সত্তা তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করে বিধি-বিধান দিয়েছেন সে সত্তা তোমাকে ‘মাআদে’ ফিরিয়ে আনবেন। ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন:
(لَرَآدُّكَ إِلٰي مَعَادٍ)
অর্থাৎ মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৭৩) অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এ কথাই বলেছেন। (তাফসীর কুরতুবী, মুয়াসসার) তবে আল্লামা সাদী বলেন: যে আল্লাহ তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করে বিধি-বিধান দিয়েছেন। যথা হালাল-হারাম বর্ণনা করে দিয়েছেন ও তোমাকে দাওয়াতী কাজের নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর হিকমতের শানে এটা উপযোগী নয় যে, ভাল-মন্দ কর্মের প্রতিদান না দিয়ে দুনিয়ার জীবনের মাঝেই সব শেষ করে দেবেন। বরং অবশ্যই তোমাকে আখিরাতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। তথায় ভাল কাজের উত্তম প্রতিদান দেবেন আর মন্দ কর্মের উপযুক্ত শাস্তি দেবেন। (তাফসীর সাদী)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি তাঁর অন্যতম একটি বড় অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কয়েকটি নির্দেশ প্রদান করছেন। অনুগ্রহ হলন তিনি তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করেছেন, অথচ তুমি জানতেও না যেন তুমি একজন নাবী হবে, তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করে সম্মানিত করা হবে। এটা মূলত তোমার প্রতি মহান আল্লাহ তা‘আলার একটা বড় অনুগ্রহ। সুতরাং যে আল্লাহ তা‘আলা তোমার প্রতি এত বড় নেয়ামত দান করেছেন তাঁর নির্দেশ হল-কখনো কাফিরদের সাহায্য করবে না। কুরআন নাযিল হওয়ার পর কারো কোন কথা বা মন্তব্য, মোট কথা কোন কিছুই যেন আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ থেকে তোমাকে বিরত না রাখতে পারে। আল্লাহ তা‘আলার দিকে মানুষকে আহ্বান কর, আর কখনো শির্কী কাজ করে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
(كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَه)
‘তাঁর চেহারা ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।’ وجه শব্দের অর্থ চেহারা, যা আমাদের কাছে পরিচিত। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার চেহারা কেমন তা আমাদের জানা নেই, আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে সংবাদ দেননি, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসেও বলেননি। সুতরাং আমরা অন্যান্য সিফাতের ন্যায় বিশ্বাস করব আল্লাহ তা‘আলার প্রকৃত চেহারা রয়েছে, যেমন তাঁর সত্তার সাথে উপযোগী। কোন মাখলূকের চেহারার সাথে সাদৃশ্য দিতে যাব না, আর অস্বীকারও করব না। হাদীসে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
حِجَابُهُ النُّورُ لَوْ كَشَفَهُ لَأَحْرَقَتْ سُبُحَاتُ وَجْهِهِ مَا انْتَهَي إِلَيْهِ بَصَرُهُ مِنْ خَلْقِهِ
আল্লাহ তা‘আলার পর্দা হল নূর, যদি তা উন্মোচন করেন তাহলে তাঁর চেহারার উজ্জ্বলতা ও নূর ঐ পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেলবে সৃষ্টির যে পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি পৌঁছবে। (সহীহ মুসলিম হা: ১৭৯)।
অনেকে বলতে পারেন তাহলে আল্লাহ তা‘আলার চেহারা ব্যতীত সব ধ্বংস হয়ে যাবে? উত্তর: আপনি যদি বলতে চান, এখানে চেহারা দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা‘আলার সম্পূর্ণ সত্তা, তাহলেও কোন সমস্যা নেই। এখানে وجه দ্বারা এমন সত্তার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে যার চেহারা রয়েছে। যদি চেহারা না থাকত তাহলে এ শব্দ দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার সত্তাকে ব্যক্ত করতে পারতেন না। সুতরাং যারা وجه দ্বারা তাফসীর করে থাকে এমন আমল যা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য করা হয় বা রূপক অর্থে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ তা‘আলার কোন চেহারা নেই, যদি বলি আল্লাহ তা‘আলার চেহারা আছে তাহলে আল্লাহ তা‘আলার আকার সাব্যস্ত করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি তাদের তাফসীর ভুল ও বিকৃত।
তাই প্রত্যেক মু’মিনের বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে যে সকল গুণ নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সহীহ হাদীসে উল্লেখ করেছেন তা আল্লাহ তা‘আলার শানে যেমন উপযুক্ত তেমনি, আমাদেরকে যতটুকু জানানো হয়েছে ততটুকুর প্রতি ঈমান আনব। কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও অপব্যাখ্যা করা যাবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার চেহারা রয়েছে যেমন তাঁর সত্তার জন্য উপয্ক্তু।
২. আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না।
৩. সকলকে একদিন আল্লাহ তা‘আলার কাছে ফিরে যেতে হবে।
৪. কুরআনের মাধ্যমে এক জাতিকে আল্লাহ তা‘আলা উত্থান করেন অপর জাতির পতন ঘটান।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮৫-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহর তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে রাসূল (সঃ)! তুমি তোমার রিসালাতের তাবলীগ করতে থাকো, মানুষকে আল্লাহর কালাম শুনিয়ে যাও, আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে কিয়ামতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। অতঃপর সেখানে তোমাকে নবুওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “অবশ্যই আমি জিজ্ঞাসাবাদ করবো যাদের নিকট রাসূল পাঠানো হয়েছিল তাদেরকে এবং অবশ্যই আমি প্রশ্ন করবো রাসূলদেরকে।” (৭:৬) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “ঐদিন রাসূলদেরকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করা হবে তোমাদেরকে কি জবাব দেয়া হয়েছিল?” (৫:১০৯) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আনয়ন করা হবে নবীগণকে এবং সাক্ষীদেরকে।”
সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) দ্বারা জান্নাতও উদ্দেশ্য হতে পারে। আবার মৃত্যুও হতে পারে এবং পুনরুত্থানও অর্থ হতে পারে। অর্থাৎ দ্বিতীয়বার জীবিত হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা মক্কাকে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মক্কা যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্মভূমি ছিল।
যহাক (রঃ) বলেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা হতে বের হন এবং জুহফাহ্ নামক স্থানে পৌঁছেন তখন মক্কার আকাঙ্ক্ষা তাঁর অন্তরে জেগে ওঠে, ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। তার সাথে ওয়াদা করা হয় যে, তাঁকে মক্কায় ফিরিয়ে দেয়া হবে। এর দ্বারা এটাও বের হচ্ছে যে, এটা মাদানী আয়াত। অথচ পুরো সূরাটি মক্কী। এও বলা হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাসকে বুঝানো হয়েছে। যিনি এই মত পোষণ করেছেন, সম্ভবতঃ কিয়ামতই তার উদ্দেশ্য। কেননা, বায়তুল মুকাদ্দাসই হাশরের ময়দান হবে। এই সমুদয় উক্তিকে একত্রিত করার উপায় এই যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কখনো তাফসীর করেছেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মক্কায় ফিরে যাওয়ার দ্বারা, যা মক্কা বিজয় দ্বারা পূর্ণ হয়। আর এটা রাসূলল্লাহ (সঃ)-এর বয়স পূর্ণ হয়ে যাওয়ার একটি বড় নিদর্শন ছিল। যেমন তিনি সূরায়ে (আরবি) এর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। হযরত উমার (রাঃ) তার অনুকূলেই মত দিয়েছিলেন। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “এ ব্যাপারে আপনি যা জানেন, আমিও তাই জানি।” এটা একই কারণ যে, তার থেকেই এই আয়াত দ্বারা যেখানে মক্কা’ বর্ণিত আছে সেখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকাল’ও বর্ণিত আছে। আবার তিনি কখনো জান্নাত’ তাফসীর করেছেন, যেটা তাঁর আবাসস্থল এবং তাঁর তাবলীগে রিসালাতের প্রতিদান যে, তিনি দানব ও মানবকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহ্বান করেছেন। আর তিনি ছিলেন সমস্ত মাখলুকের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বাকপটু ও উত্তম।
এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ তুমি তোমার বিরুদ্ধাচারীদেরকে ও তোমাকে অবিশ্বাসকারীদেরকে বলে দাও- কে সৎ পথের নির্দেশ এনেছে এবং কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে তা আমার প্রতিপালক খুব ভাল জানেন।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর আর একটি বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি আশা করেননি যে, তার উপর আল্লাহর কিতাব অবতীর্ণ হবে। এটা তো শুধু তাঁর প্রতি তাঁর প্রতিপালকের অনুগ্রহ। সুতরাং কাফিরদের সহায়ক হওয়া তাঁর জন্যে মোটেই সমীচীন নয়। তাদের থেকে পৃথক থাকাই তার উচিত। তাঁর এই ঘোষণা দেয়া উচিত যে, তিনি কাফিরদের বিরুদ্ধাচরণকারী ।
অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতি আল্লাহর আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর এই কাফিররা যেন তোমাকে কিছুতেই সেগুলো থেকে বিমুখ না করে। অর্থাৎ এই লোকগুলো যে তোমার ও দ্বীনের বিরুদ্ধাচরণ করছে এবং তোমার অনুসরণ হতে জনগণকে ফিরিয়ে রাখছে এতে তুমি যেন মনঃক্ষুন্ন হয়ে তোমার কাজ থেকে বিরত না হও। বরং তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও। আল্লাহ তোমার কালেমাকে পুরোকারী, তোমার দ্বীনের পৃষ্ঠপোষকতাকারী, তোমার রিসালাতকে জয়যুক্তকারী এবং তোমার দ্বীনকে সমস্ত দ্বীনের উপর বুলন্দকারী। সুতরাং তুমি জনগণকে তোমার প্রতিপালকের ইবাদতের দিকে আহ্বান করতে থাকো, যিনি এক ও শরীকবিহীন। তোমার জন্যে এটা উচিত নয় যে, তুমি কাফিরদের সহায়তা করবে। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও আহ্বান করো না। ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। উলুহিয়্যাতের যোগ্য একমাত্র তাঁরই বিরাট সত্তা। তিনিই চিরস্থায়ী ও সদা বিরাজমান। সমস্ত সৃষ্টজীব মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “ভূ-পৃষ্ঠে যত কিছু আছে সবই নশ্বর, অবিনশ্বর শুধু তোমার প্রতিপালকের সত্তা, যিনি মহিমময়, মহানুভব।” (৫৫:২৬-২৭) দ্বারা আল্লাহর সত্তাকে বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কবি লাবীদ একটি চরম সত্য কথা বলেছে। সে বলেছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই বাতিল বা অসার।” মুজাহিদ (রঃ) এবং সাওরী (রঃ) বনে যে,
(আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সবকিছুই ধ্বংসশীল, কিন্তু শুধু ঐ কাজ যা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়। কবিদের কবিতাতেও শব্দটি এই ভাবার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন কোন কবি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যে আল্লাহ সমস্ত বান্দার প্রতিপালক, যার দিকে মনোযোগ ও বাসনা, যার জন্যে আমল, তার নিকট আমি আমার এমন পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি যা আমি গণনা করে শেষ করতে পারবো না।” এই উক্তি পূর্বের উক্তির বিপরীত নয়। এটাও নিজের জায়গায় ঠিক আছে যে, মানুষের সব কাজই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে, শুধুমাত্র ঐ কাজের পুণ্য সে লাভ করবে যা একমাত্র তারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সে করেছে। আর প্রথম উক্তিটির ভাবার্থও সম্পূর্ণরূপে সঠিক যে, সমস্ত প্রাণী ধ্বংস ও নষ্ট হয়ে যাবে, শুধুমাত্র আল্লাহর সত্তা বাকী থাকবে যা ধ্বংস ও নষ্ট হওয়া থেকে বহু ঊর্ধ্বে। তিনিই প্রথম, তিনিই। শেষ। সবকিছুর পূর্বেও তিনি ছিলেন এবং সবকিছুর পরেও তিনি থাকবেন।
বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত ইবনে উমার (রাঃ) নিজের অন্তরকে দৃঢ় করতে চাইতেন তখন তিনি জঙ্গলে চলে যেতেন এবং কোন ভগ্নাবশেষের সামনে দাড়িয়ে ব্যথিত সুরে বলতেনঃ “তোমার পরিবারবর্গ কোথায়?” অতঃপর স্বয়ং এর উত্তরে তিনি। (আরবি)এই আয়াতটিই পাঠ করতেন।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ বিধান তাঁরই এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। তিনি প্রত্যেককেই পুণ্য ও পাপের প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি পুণ্যের পুরস্কার ও পাপের শাস্তি দিবেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।