আল কুরআন


সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 6)

সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 6)



হরকত ছাড়া:

ونمكن لهم في الأرض ونري فرعون وهامان وجنودهما منهم ما كانوا يحذرون ﴿٦﴾




হরকত সহ:

وَ نُمَکِّنَ لَهُمْ فِی الْاَرْضِ وَ نُرِیَ فِرْعَوْنَ وَ هَامٰنَ وَ جُنُوْدَهُمَا مِنْهُمْ مَّا کَانُوْا یَحْذَرُوْنَ ﴿۶﴾




উচ্চারণ: ওয়া নুমাক্কিনা লাহুম ফিল আরদি ওয়া নুরিয়া ফির‘আওনা ওয়া হা-মা-না ওয়া জুনূদাহুমামিনহুম মা-কা-নূইয়াহযারূন।




আল বায়ান: আর যমীনে তাদেরকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে এবং ফির‘আউন, হামান ও তাদের সৈন্যদেরকে দেখিয়ে দিতে, যা তারা তাদের কাছ থেকে আশঙ্কা করছিল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. আর যমীনে তাদেরকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে, আর ফিরআউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তারা সে দূর্বল দলের কাছ থেকে আশংকা করত।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর (ইচ্ছে করলাম) তাদেরকে দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে, আর ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্য বাহিনীকে দেখিয়ে দিতে যা তারা তাদের (অর্থাৎ মূসার সম্প্রদায়ের) থেকে আশঙ্কা করত।




আহসানুল বায়ান: (৬) ইচ্ছা করলাম দেশে তাদেরকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে[1] এবং ফিরআউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তাদের নিকট হতে ওরা আশঙ্কা করত। [2]



মুজিবুর রহমান: আর তাদেরকে দেশের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে; এবং ফির‘আউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে যা তাদের নিকট থেকে তারা আশংকা করত।



ফযলুর রহমান: জমিনে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে এবং ফেরাউন, হামান ও এ দুঞ্চজনের বাহিনীকে তাদের পক্ষ থেকে তাই দেখাতে যা তারা ভয় করত।



মুহিউদ্দিন খান: এবং তাদেরকে দেশের ক্ষমতায় আসীন করার এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্য-বাহিনীকে তা দেখিয়ে দেয়ার, যা তারা সেই দূর্বল দলের তরফ থেকে আশংকা করত।



জহুরুল হক: আর দেশে তাদের প্রতিষ্ঠা করতে, আর ফিরআউন ও হামান ও তাদের সেনাবাহিনীকে আমরা তা দেখাতে যা তারা তাদের থেকে আশংকা করত।



Sahih International: And establish them in the land and show Pharaoh and [his minister] Haman and their soldiers through them that which they had feared.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬. আর যমীনে তাদেরকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে, আর ফিরআউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তারা সে দূর্বল দলের কাছ থেকে আশংকা করত।(১)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে ফিরআউনী কৌশলের শুধু ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত হওয়ার কথাই নয়; বরং ফিরআউন ও তার পরিষদবৰ্গকে চরম বোকা ও অন্ধ বানানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে বালকের জন্মরোধ করতে বনী ইসরাঈলের অসংখ্য নবজাতককে হত্যা করেছিল সে বালককে আল্লাহ তা'আলা এই ফিরআউনের ঘরে তারই হাতে লালনপালন করালেন এবং সে বালকের জননীর মনতুষ্টির জন্যে তারই কোলে বিস্ময়কর পন্থায় পৌছে দিলেন। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬) ইচ্ছা করলাম দেশে তাদেরকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে[1] এবং ফিরআউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তাদের নিকট হতে ওরা আশঙ্কা করত। [2]


তাফসীর:

[1] এখানে ‘দেশ’ বলতে শাম দেশকে বুঝানো হয়েছে; যেখানে তারা কিনআনীদের দেশের উত্তরাধিকারী হল। কারণ, বানী ইস্রাঈলদের মিসর হতে বের হবার পর পুনরায় সেখানে ফিরে যায়নি। والله أعلم

[2] অর্থাৎ, তাদের যে আশংকা ছিল যে, একজন ইস্রাঈলীর হাতে ফিরআউন, তার দেশ ও তার সৈন্য-সামন্ত সব ধ্বংস হবে, আমি তাদের সেই আশংকাকে সত্যে পরিণত করলাম।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: সূরার নামকরণ:



কাসাস শব্দটি কিস্সা এর বহুবচন। কিস্সা অর্থ ঘটনা, কাহিনী ইত্যাদি। এ সূরাতে একাধিক নাবীর কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, তাই এ নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহের মধ্যে সূরা কাসাস সর্বশেষ সূরা। হিজরতের সময় মক্কা ও জুহফা এর মাঝখানে এ সূরা অবতীর্ণ হয়। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, হিজরতের সফরে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন জুহফায় পৌঁছেন, তখন জিবরীল (عليه السلام) আগমন করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলেন: হে মুহাম্মাদ, আপনার মাতৃভূমির কথা আপনার মনে পড়ে কি? তিনি বললেন: হ্যাঁ। অতঃপর জিবরীল (عليه السلام) তাঁকে এ সূরা শুনালেন। এ সূরার শেষভাগে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, আপনাকে মক্কা থেকে বের করে দেয়ার পরিণামে মক্কা বিজিত হয়ে আপনার অধিকারভুক্ত হবে, যেমনটি উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা অত্র সূরার ৮৫ নং আয়াতে বলেনন



(إِنَّ الَّذِيْ فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْاٰنَ لَرَآدُّكَ إِلٰي مَعَادٍ)



“যিনি তোমার জন্য কুরআনকে করেছেন বিধান তিনি তোমাকে অবশ্যই ফিরিয়ে আনবেন জন্মভূমিতে।”



সূরা কাসাসে সর্বপ্রথম মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী সংক্ষেপে ও পরে বিস্তারিত বর্র্ণিত হয়েছে। অর্ধেক সূরা পর্যন্ত মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী ফির‘আউনের সাথে এবং শেষভাগে কারূনের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী সমগ্র কুরআনে কোথাও সংক্ষেপে আবার কোথাও বিস্তারিত আকারে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা কাহফে খাজির (عليه السلام)-এর সাথে তাঁর কাহিনী বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর সূরা ত্বা-হা-য় বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে এবং এরই কিছু বিবরণ সূরা আন-নামলে অতঃপর সূরা কাসাসে এর পুনরালোচনা রয়েছে।



১-৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:



طٰس۬مّ۬ (ত্বা-সীন-মীম) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।



এরপর বলেন, এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত, এ সম্পর্কে সূরা শুআরার প্রথমে অর্থাৎ ২ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা মূসা (عليه السلام)-এর জীবন বৃত্তান্তের বর্ণনা দিচ্ছেন।



(وَأَوْحَيْنَآ إِلٰٓي أُمِّ مُوْسٰٓي)



‘আমি মূসার মায়ের কাছে ওয়াহী করেছি’ এখানে ওয়াহী শব্দটি পারিভাষিক অর্থে ব্যবহার হয়নি। বরং শাব্দিক অর্থে স্বভাবগত ইলহাম যা মানুষকে করা হয়। এখানে এটাই উদ্দেশ্য, অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-এর মায়ের মনের মাঝে একটি ইলহাম করে দিয়েছিলেন যেন তিনি তার ছেলে মূসা (عليه السلام)-কে বুকের দুধ পান করান। আর যদি ভয় হয় নিজের কাছে থাকলে ফির‘আউন হত্যা করবে তাহলে একটি বাক্সে করে সাগরে ভাসিয়ে দেবে।



الْيَمِّ শব্দের অর্থ সাগর, অর্থাৎ নীল নদে ভাসিয়ে দাও, মারা যাবে বা হারিয়ে যাবে এ ভয় বা আশঙ্কা করবে না। আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং আমি তাকে রাসূল বানাবো।



(فَالْتَقَطَه۫ٓ اٰلُ فِرْعَوْنَ)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-কে নীল নদে ভাসিয়ে দিলে ভেসে ভেসে ফির‘আউনের প্রাসাদের কাছে চলে যায়, ফির‘আউনের পরিবার তাকে তুলে নিল এবং ফির‘আউনের স্ত্রী আসিয়া বললন এ শিশু আমাদের নয়ণমনি হবে অতএব তাকে হত্যা করো না। এভাবে আপন গৃহে শত্র“ লালিত পালিত হল কিন্তু তারা বুঝতেও পারল না।



(وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوْسٰي فٰرِغًا)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-কে হারিয়ে ফেলে মায়ের মন অস্থির। কিনা কী হয়, মূসা (عليه السلام) যে তার সন্তান এ কথা প্রকাশ করেই দিতেন যদি আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তর ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ না করে দিতেন, যাতে তার এ বিশ্বাস বদ্ধমূল থাকে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে ফিরিয়ে দেয়ার যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন তা অবশ্যই সত্যে পরিণত হবে। فٰرِغًا অর্থন কেউ বলেছেন: দুনিয়ার সব কিছু থেকে তার মাতা চিন্তামুক্ত, কেবল চিন্তা একটাই মূসা। কেউ বলেছেন: সকল দুশ্চিন্তা থেকে তিনি মুক্ত কারণ তিনি জানেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে ফেরত দেবেন, সে ডুবে যাবে না। তারপর মূসা (عليه السلام)-এর বোনকে তার মা বললেন সে যেন তাকে দূর থেকে দেখে দেখে রাখে, কোথা থেকে কোথায় যায়।



(وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ)



অর্থাৎ ফির‘আউনের বাড়িতে মূসা (عليه السلام)-কে নিয়ে যাওয়ার পর দুধ পান করাতে চাইলে কেউ দুধ পান করাতে পারে না। উদ্দেশ্য হল যাতে দুধ পান করানোর জন্য মূসার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে হয়। যা আয়াতেই উল্লেখ রয়েছে।



(وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّه)



অর্থাৎ যখন শক্তি, জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায় পূর্ণ যৌবনে উপনিত হল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে নবুওয়াত দিলেন। অধিকাংশদের ক্ষেত্রে এ পূর্ণতা চল্লিশ বছর বয়সে হয়ে থাকে। তাই দেখা যায় অধিকাংশ নাবীদেরকে এ বয়সে নবুওয়াত দেয়া হয়েছে যেমন আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।



(عَلٰي حِيْنِ غَفْلَةٍ)



‘অধিবাসীরা ছিল অসতর্ক’ হয় তা দুপুরের সময় যখন মানুষ বিশ্রাম নেয় অথবা অন্য কোন সময় যখন মানুষ বিভিন্ন জায়গাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হতে বিরত থাকে।



(هٰذَا مِنْ شِيْعَتِه۪)



‘একজন তার নিজ দলের’ অর্থাৎ বানী-ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত, (وَهٰذَا مِنْ عَدُوِّه۪) ‘এবং অপর জন তার শত্র“দলের’ অর্থাৎ কিবতী বংশের।



(فَقَضٰي عَلَيْهِ)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-এর ঘুষিতে সে মারা যায়। মূসা (عليه السلام) তাকে মেরে ফেলার জন্য ঘুষি দেননি, কিন্তু ঘটনাক্রমে সে আঘাতে মারা যায়। ফলে মূসা (عليه السلام) অনুতপ্ত হন এবং বলেন, নিশ্চয়ই এটা শয়তানের কাজ, তাই তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন।



(فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِيْنَةِ خَا۬ئِفًا)



মূসা (عليه السلام) খুব ভীত-শঙ্কিত অবস্থায় তথায় সকাল করলেন আর খুব খেয়াল করছেন যে, ফির‘আউনের পারিষদের কেউ জানতে পারে কি না; কারণ ফির‘আউন ভাল করেই জানে এ কাজ মূসা (عليه السلام) ছাড়া কেউ করার দুঃসাহস রাখে না। এমন সময় মূসা (عليه السلام) শুনতে পেলেন, যে বানী-ইসরাঈলের লোকটাকে গতকাল সাহায্য করেছিল সে আরেকজন কিবতীকে হত্যা করবে বলে চিৎকার করছে। তখন মূসা (عليه السلام) তাকে তিরস্কার করে আয়াতে উল্লিখিত কথা বললেন।



(فَلَمَّآ أَنْ أَرَادَ أَنْ يَّبْطِشَ بِالَّذِيْ هُوَ عَدُوٌّ لَّهُمَا)



অর্থাৎ যখন লোকটি এরূপ চিৎকার করল তখন মূসা ইচ্ছা করলেন তাকে ধরে শাস্তি দেবেন। যখন লোকটি বুঝল তাকে মূসা (عليه السلام) মারবে তখন সে বলল: ‘হে মূসা! তুমি যেমন গতকাল এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, সেভাবে আমাকেও কি হত্যা করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চাচ্ছ, শান্তি স্থাপনকারী হতে চাও না।’



(هُوَ عَدُوٌّ لَّهُمَا)



অর্থাৎ সে বানী ইসরাঈলের লোকটি মূসা (عليه السلام) ও যে কিবতী লোকটিকে মূসা (عليه السلام) হত্যা করেছেন তাদের দুজনেরই শত্র“ হয়ে গেল।



(وَجَا۬ءَ رَجُلٌ) কেউ বলেছেন, লোকটির নাম হিজকিল; কেউ বলেছেন, শামউন।



(وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَا۬ءَ مَدْيَنَ)



শামদেশের একটি শহরের নাম মাদইয়ান। মাদইয়ান ইবনু ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। এ এলাকা ফির‘আউনের ক্ষমতার বাইরে ছিল। মিশর থেকে এর দূরত্ব ছিল আট মনযিল। মূসা (عليه السلام) ফির‘আউন ও তার বাহিনীকে ভয় করে মিশর থেকে মাদইয়ানে চলে আসার ইচ্ছা করলেন। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়ন মানুষকে যে বিষয়ে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে ভয় করা তাওয়াক্কুল ও ঈমানের পরিপন্থী নয়। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা করে ফেলবে এ ভয়ে তিনি মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে গেলেন। মূসা (عليه السلام) নিঃসম্বল অবস্থায় মিসর ত্যাগ করলেন। তাঁর সাথে পাথেয় বলতে কিছু ছিল না এবং তিনি রাস্তাও চিননে না। আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করে রওনা দিলেন এবং বললেন ‘আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন।’



(وَلَمَّا وَرَدَ مَا۬ءَ مَدْيَنَ) مَا۬ءَ مَدْيَنَ



বলতে একটি কুপকে বুঝানো হয়েছে। অত্র এলাকাবাসীরা এখান থেকে তাদের জন্তুদের পানি পান করাতো। অর্থাৎ দু’জন মহিলা বলতে শু‘আইব (عليه السلام)-এর কন্যাদ্বয়।



(قَالَ مَا خَطْبُكُمَا)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام) তাদের দাঁড়ানো দেখে বললেন; আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? তারা বলল, পুরুষেরা পানি পান করিয়ে নিয়ে গেলে তারপর আমরা পানি পান করাই। পুরুষদের ভিড়ে পান করাতে পারি না। আমাদের বাবা বৃদ্ধ মানুষ তাই তিনি আসতে পারেন না।



এ ঘটনা থেকে কয়েকটি শিক্ষান ১. দুর্বলদের সাহায্য করা নাবী-রাসূলদের স্ন্নুাত। ২. বেগানা নারীর সাথে প্রয়োজনে কথা বলায় দোষ নেই, যদি কোন ফেতনার আশঙ্কা না থাকে। ৩. প্রয়োজনে নারীরাও বাইরে যেতে পারে তবে অবশ্যই শালিনতা বজায় রাখতে হবে।



(ثُمَّ تَوَلّٰيٓ إِلَي الظِّلِّ)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام) অনাহারে ও ক্লান্ত হয়ে গাছের ছায়াতলে বিশ্রাম নিলেন এবং এক আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিজের দূরবস্থা ও অভাব পেশ করলেন। এটা দু‘আ করার অন্যতম একটি আদব, আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিজেকে অতি তুচ্ছ ও নগন্য করে তুলে ধরা।



(تَمْشِيْ عَلَي اسْتِحْيَا۬ءٍ)



অর্থাৎ কন্যাদ্বয় বাড়িতে ফিরে গিয়ে শু‘আইব (عليه السلام)-কে ঘটনা খুলে বললে তিনি মূসা (عليه السلام)-কে আমন্ত্রণ জানিয়ে মেয়েকে পাঠান যেন তাকে ডেকে নিয়ে আসে। মেয়েটি লজ্জাজড়িত পদক্ষেপে সেখানে পৌঁছল এবং পিতার আমন্ত্রণের কথা জানাল।



(إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِيْنُ)



অর্থাৎ শু‘আইব (عليه السلام)-এর এক কন্যা তার পিতাকে বলল: গৃহের কাজের জন্য আপনার একজন কর্মচারীর প্রয়োজন আছে, তাহলে তাকেই নিযুক্ত করে দিন। কারণ তার মাঝে আমরা দুটি গুণ লক্ষ্য করেছি। এক. সে শক্তিশালী, দুই. বিশ্বস্ত। আমরা পানি পান করাতে গিয়ে তার শক্তি এবং পথিমধ্যে আমাদেরকে পশ্চাতে রেখে পথচলা দ্বারা তার বিশ্বস্ততার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।



(قَالَ إِنِّيْٓ أُرِيْدُ أَنْ أُنْكِحَكَ)



অর্থাৎ শু‘আইব (عليه السلام) নিজেই নিজের পক্ষ থেকে কন্যাকে মূসা (عليه السلام)-এর সাথে বিবাহ দানের প্রস্তাব করলেন। এ থেকে জানা যায়, উপযুক্ত পাত্র পেলে পাত্রীর অভিভাবকের উচিত পাত্রের প্রস্তাবের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই প্রস্তাব দেয়া। যেমন উমার (رضي الله عنه) নিজ কন্যা হাফসা বিধবা হলে আবূ বকর ও উসমান (رضي الله عنهما) এর কাছে প্রস্তাব দেন। (কুরতুবী)



(فَلَمَّا قَضٰي مُوْسَي الْأَجَلَ)



অর্থাৎ যখন মূসা (عليه السلام) নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ করলেন তখন পরিবার নিয়ে মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।



মূসা (عليه السلام) আট বছর কাজ করেছেন নাকি দশ বছর কাজ করেছেন? ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন: অধিক মেয়াদকাল পূর্ণ করেছিলেন। নাবীরা যা বলেন তা পূর্ণ করেন।



এ সম্পর্কে পূর্বে সূরা ত্বা-হা-র ৯ নং আয়াত থেকে ৯৩ নং আয়াতসহ আরো একাধিক স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১। মিথ্যার পরাজয় অবশ্যই হবে, তা রক্ষা করার যতই কৌশল করা হোক না কেন।

২। আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা করেন তাই হয়, তাঁর ইচ্ছার কোন প্রতিরোধক নেই।

৩। মানুষ স্বভাবতই সন্তানের প্রতি দয়াপরায়ণ, বিশেষ করে যাদের সন্তান নেই তাদের আগ্রহ আরো বেশি।

৪। পুরুষ মহিলাদের পেছনে চলবে না, এতে পর্দা লংঘন হয়। বরং মহিলারা পুরুষের পেছনে পেছনে চলবে।

৫। কন্যার অভিভাবক কাউকে যোগ্য পাত্র মনে করলে সরাসরি প্রস্তাব দিতে পারবে।

৬। অহঙ্কার ও সীমালংঘন ধ্বংস ও পতনের মূল কারণ।

৭। আল্লাহ তা‘আলা উপরে আছেন, এ কথা ফির‘আউনও জানতো। যার ফলে হামানকে সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিল ওপরে উঠে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখবে বলে।

৮। কথা বলা আল্লাহ তা‘আলার একটি গুণ। আল্লাহ তা‘আলা কথা বলেন যেমন মূসা (عليه السلام)-এর সাথে কথা বলেছেন।

৯। প্রত্যেক নাবী-রাসূলগণ সমসমায়িক ক্ষমতাসীনদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেছেন।

১০। দীনের কাজে অপরের সহযোগিতা নেয়া ও সহযোগিতা দেয়া উভয়টাই কল্যাণকর।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: হযরত মা’দীকাৱাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর নিকট এসে তার কাছে আবেদন জানালাম যে, তিনি যেন আমাদেরকে (আরবি) দুশ বার পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তখন তিনি বললেনঃ “এটা আমার মুখস্থ নেই, তোমরা বরং হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত্ত (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে তার থেকে এটা শ্রবণ কর। কেননা, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এটা শিখিয়েছেন। সুতরাং আমরা হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত্ত (রাঃ)-এর নিকট গমন করলে তিনি আমাদেরকে সূরাটি পড়ে শুনিয়ে দেন। (এটা ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

১-৬ নং আয়াতের তাফসীর

(আারবি)-এর বর্ণনা ইতিপূর্বে গত হয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন যে, এই আয়াতগুলো হলো সুস্পষ্ট কিতাবের অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের। সমস্ত কাজের মূল এবং অতীতের ও ভবিষ্যতের সমস্ত খবর এই কিতাবের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।

অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমার নিকট মূসা (আঃ) ও ফিরাউনের কিছু বৃত্তান্ত যথাযথভাবে বর্ণনা করছি। যেমন অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আারবি) অর্থাৎ “আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি।” (১২: ৩) তার সামনে এটা এমনভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তিনি যেন ঐ সময় তথায় বিদ্যমান ছিলেন।

ফিরাউন একজন অহংকারী, উদ্ধত ও দুষ্ট প্রকৃতির লোক ছিল। সে জনগণের উপর জঘন্যভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। সে তাদেরকে পরস্পরে লড়িয়ে দিয়ে, তাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করে তাদেরকে দুর্বল করে দিয়ে স্বয়ং তাদের উপর জোরপূর্বক প্রভুত্ব চালাতে থাকে। বিশেষ করে বানী ইসরাঈলকে তো সে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। অথচ মাযহাবী হিসেবে সেই যুগে তারাই ছিল সর্বোত্তম। ফিরাউন তাদেরকে খুবই নিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছিল। সে সমস্ত ঘৃণ্য কাজ তাদের দ্বারা করিয়ে নিতো। এতে করেও তার প্রাণ ভরেনি। সে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল, যাতে তারা শক্তিশালী হতে না পারে। তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করার একটি বড় কারণ এই ছিল যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন মিসর দেশের মধ্য দিয়ে স্বীয় স্ত্রী হযরত সারা (রাঃ) সহ গমন করছিলেন এবং তথাকার উদ্ধত বাদশাহ হযরত সারা (রাঃ)-কে নিজের দাসী বানিয়ে নেয়ার জন্যে তাঁর নিকট হতে ছিনিয়ে নিয়েছিল, যাকে আল্লাহ ঐ কাফির থেকে রক্ষা করেছিলেন, তখন তিনি হযরত সারা (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “তোমার সন্তানদের মধ্য হতে একটি সন্তানের হাতে এই মিসরের শাসন ক্ষমতা এই কওম হতে খতম হয়ে যাবে এবং এর বাদশাহ তার সামনে অতি লাঞ্ছিতভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।” বানী ইসরাঈলের মধ্যে এ রিওয়াইয়াতটি চলে আসছিল এবং তাদের পাঠ্যের মধ্যেও এটা ছিল বলে ফিরাউনের কওম কিবতীরাও এটা শুনেছিল। সুতরাং তারা এটা ফিরাউনের কানে পৌছিয়ে দিয়েছিল। তাই ফিরাউন এই আইন জারী করে দিলো যে, বানী ইসরাঈলের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে ও কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখা হবে। এতো বড় অত্যাচারমূলক কাজ করতে সে মোটেই দ্বিধাবোধ করলো না। কিন্তু মহামহিমান্বিত ও প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই হয়ে থাকে। হযরত মূসা (আঃ) জীবিত রয়ে গেলেন এবং আল্লাহ তা'আলা ঐ উদ্ধত কওমকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করতঃ ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলেন। সুতরাং সমুদয় প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। এ জন্যেই তো আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আারবি)

(আারবি) হতে (আারবি) পযন্ত। অর্থ্যৎ“আমি ইচ্ছা করলাম, সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে ও দেশের অধিকারী করতে। আর তাদেরকে দেশের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফিরাউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তাদের নিকট তারা আকাক্ষা করতো। এটা প্রকাশমান কথা যে, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা পূর্ণ হয়েই থাকে। আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আারবি)

অর্থাৎ “যে সম্প্রদায়কে দুর্বল গণ্য করা হতো তাদেরকে আমি আমার কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করি, এবং বানী ইসরাঈল সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালকের শুভবাণী সত্যে পরিণত হলো, যেহেতু তারা ধৈর্যধারণ করেছিল; আর ফিরাউন ও তার সম্প্রদায়ের শিল্প এবং যেসব প্রাসাদ তারা নির্মাণ করেছিল তা ধ্বংস করেছি।” (৭:১৩৭) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আারবি) অর্থাৎ “এভাবেই আমি বানী ইসরাঈলকে ওর উত্তরাধিকারী বানিয়েছি।” (২৬:৫৯)।

ফিরাউন তার সর্বশক্তি প্রকাশ করেছিল, কিন্তু আল্লাহর শক্তি সে অনুমানও করতে পারেনি। শেষে আল্লাহর ইচ্ছাই পূর্ণ হয় এবং যে শিশুর কারণে সে হাজার হাজার নিস্পাপ শিশুর রক্ত প্রবাহিত করেছিল তাঁকেই তিনি তারই ক্রোড়ে লালন-পালন করিয়ে নেন, আর তারই হাতে তিনি তাকে ও তার লোক-লস্করকে ধ্বংস করিয়ে দেন, যাতে সে জেনে ও বুঝে নেয় যে, সে আল্লাহ তাআলার এক লাঞ্ছিত ও অসহায় দাস ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবার ক্ষমতা কারো নেই। হযরত মূসা (আঃ)-কে ও তাঁর কওমকে আল্লাহ তা'আলা মিসরের রাজত্ব দান করলেন এবং ফিরাউন যাকে ভয় করছিল তিনিই সামনে এসে গেলেন এবং সে ধ্বংস হয়ে গেল। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।