আল কুরআন


সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 59)

সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 59)



হরকত ছাড়া:

وما كان ربك مهلك القرى حتى يبعث في أمها رسولا يتلو عليهم آياتنا وما كنا مهلكي القرى إلا وأهلها ظالمون ﴿٥٩﴾




হরকত সহ:

وَ مَا کَانَ رَبُّکَ مُهْلِکَ الْقُرٰی حَتّٰی یَبْعَثَ فِیْۤ اُمِّهَا رَسُوْلًا یَّتْلُوْا عَلَیْهِمْ اٰیٰتِنَا ۚ وَ مَا کُنَّا مُهْلِکِی الْقُرٰۤی اِلَّا وَ اَهْلُهَا ظٰلِمُوْنَ ﴿۵۹﴾




উচ্চারণ: ওয়ামা-কা-না রাব্বুকা মুহলিকাল কুরা-হাত্তা-ইয়াব‘আছা ফীউম্মিহা-রাছূলাইঁ ইয়াতলূ ‘আলাইহিম আ-য়া-তিনা- ওয়ামা-কুন্না-মুহলিকিল কুরাইল্লা-ওয়া আহলুহা-জালিমূন।




আল বায়ান: আর তোমার রব কোন জনপদকে ধ্বংস করেন না, যতক্ষণ না তিনি তার মূল ভূখন্ডে রাসূল প্রেরণ করেন, যে তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে। আর কোন জনপদের অধিবাসীরা যালিম না হলে আমি তাদেরকে ধ্বংস করি না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৯. আর আপনার রব জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না, সেখানকার কেন্দ্রে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করার জন্য রাসূল প্রেরণ না করে এবং আমরা জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করি যখন এর বাসিন্দারা যালিম হয়।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমার প্রতিপালক কোন জনপদ ধ্বংস করেন না, যতক্ষণ না তিনি তার কেন্দ্রে রসূল প্রেরণ না করেন যে তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করে; আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করি না যতক্ষণ না তার বাসিন্দারা অত্যাচারী হয়।




আহসানুল বায়ান: (৫৯) তোমার প্রতিপালক তাঁর বাক্য আবৃত্তি করার জন্য প্রধান জনপদে রসূল প্রেরণ না করে জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না[1] এবং তিনি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করেন যখন এর অধিবাসীরা সীমালংঘন করে। [2]



মুজিবুর রহমান: তোমার রাব্ব জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না, ওর কেন্দ্রে তাঁর আয়াত আবৃত্তি করার জন্য রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত এবং আমি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করি যখন ওর বাসিন্দারা যুল্‌ম করে।



ফযলুর রহমান: তোমার প্রভু জনপদসমূহ ধ্বংস করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার কেনেদ্র তিনি একজন রসূল না পাঠান, যে লোকদেরকে আমার আয়াতসমূহ পড়ে শোনায়। তেমনি অধিবাসীরা জালেম না হলে আমি কোন জনপদ ধ্বংস করি না।



মুহিউদ্দিন খান: আপনার পালনকর্তা জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না, যে পর্যন্ত তার কেন্দ্রস্থলে রসূল প্রেরণ না করেন, যিনি তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং আমি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করি, যখন তার বাসিন্দারা জুলুম করে।



জহুরুল হক: আর তোমার প্রভু কখনো জনপদগুলোর ধ্বংসকারক নন যে পর্যন্ত না তিনি তাদের মাতৃভূমিতে একজন রসূল উত্থাপন করেছেন তাদের কাছে আমাদের বাণীসমূহ বিবৃত করতে, আর আমরা কখনো জনপদসমূহের ধ্বংসকারী নই যদি না তাদের অধিবাসীরা সীমালংঘনকারী হয়।



Sahih International: And never would your Lord have destroyed the cities until He had sent to their mother a messenger reciting to them Our verses. And We would not destroy the cities except while their people were wrongdoers.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৯. আর আপনার রব জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না, সেখানকার কেন্দ্রে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করার জন্য রাসূল প্রেরণ না করে এবং আমরা জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করি যখন এর বাসিন্দারা যালিম হয়।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫৯) তোমার প্রতিপালক তাঁর বাক্য আবৃত্তি করার জন্য প্রধান জনপদে রসূল প্রেরণ না করে জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না[1] এবং তিনি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করেন যখন এর অধিবাসীরা সীমালংঘন করে। [2]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, প্রমাণ পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করার পূর্বে কাউকেও ধ্বংস করি না। أُمِّهَا (প্রধান) শব্দ দ্বারা জানা গেল যে, সমস্ত ছোট-বড় এলাকায় নবী আসেননি; বরং এলাকার প্রধান শহরে নবী আসতেন এবং ছোট ছোট এলাকার জনপদ তার অধীনস্থ হত।

[2] নবী পাঠানোর পর যদি গ্রামবাসীরা ঈমান না আনত এবং কুফরী ও শিরকের উপর অটল থাকত, তাহলে তাদেরকে ধ্বংস করা হত। এ কথা সূরা হূদের ১১৭নং আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৬-৬১ নং আয়াতের তাফসীর:



(إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ.....) শানে নুযূল:



সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর চাচা আবূ তালেবের মুমূর্ষু অবস্থায় তার কাছে আগমন করেন। তিনি দেখলেনন আবূ জাহল, আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া পাশে বসা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: হে চাচা! আপনি বলুন:



لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ



“আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই। আমি আপনার জন্য কিয়ামতের দিন এর দ্বারাই সাক্ষ্য দিব। আবূ জাহল, আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া বলল: হে আবূ তালেব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মকে পরিত্যাগ করবে। তারা বার বার এ কথা বলতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও বার বার বলতে থাকলেন। পরিশেষে আবূ তালেব বলল: মুত্তালিবের ধর্মের ওপরেই রইলাম। আর সে



لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ



বলতে অস্বীকার করল। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: আমাকে নিষেধ না করা পর্যন্তঅবশ্যই আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তখন আল্লাহ তা‘আলা



(مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ....)



এ আয়াতটি নাযিল করেন। আর আবূ তালিবের উদ্দেশ্যে



(إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ....)



এ আয়াতটি নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৩৮৮৪, সহীহ মুসলিম হা: ২৪)



সূরা ফাতিহাতে উল্লেখ করা হয়েছেন হিদায়াত দু’ প্রকার। একপ্রকার হলন মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া, অপর প্রকার হলন সঠিক পথে চলার তাওফীক দেয়া। এখানে দ্বিতীয় প্রকার উদ্দেশ্য। সঠিক পথে চলার তাওফীক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা দিতে পারেন, অন্য কেউ পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنْ تَحْرِصْ عَلٰي هُدٰهُمْ فَإِنَّ اللّٰهَ لَا يَهْدِيْ مَنْ يُّضِلُّ وَمَا لَهُمْ مِّنْ نّٰصِرِيْنَ)‏



“যদি তুমি তাদের পথ প্রদর্শন করতে আগ্রহী হও তবুও আল্লাহ তা‘আলা যাকে বিভ্রান্ত‎ করেছেন, তাকে তিনি সৎ পথে পরিচালিত করবেন না এবং তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই।”(সূরা নাহল ১৬:৩৭) এ সম্পর্কে সূরা নাহলের ৩৭ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



এটা মক্কার কুরাইশদের কথা। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: কুরাইশদের মধ্য থেকে হারেস বিন উসমান নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল: আপনি যা বলেন তা যে সত্য সেটা আমরা জানি, কিন্তু আপনার প্রতি ঈমান আনতে ও হিদায়াতের অনুসরণ করতে পারছি না, কারণ যদি আমরা আপনার অনুসরণ করি তাহলে ভয় রয়েছে যে, আরবের লোকেরা আমাদেরকে মক্কা থেকে বের করে দিবে। আর তারা সবাই আমাদের বিরুদ্ধে ঐকমত্য হয়ে যাবে, তাদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। কুরআনে তাদের এ খোঁড়া অজুহাতের তিনটি জবাব দেয়া হয়েছে:



১. (أَوَلَمْ نُمَكِّنْ لَّهُمْ حَرَمًا اٰمِنًا يُّجْبٰٓي إِلَيْهِ ثَمَرٰتُ كُلِّ شَيْءٍ)



‘আমি কি তাদের জন্য এক নিরাপদ হারাম প্রতিষ্ঠিত করিনি, যেখানে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী হয়’ অর্থাৎ তাদের অজুহাত বাতিল। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে মক্কাবাসীর হেফাযতের জন্য একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা পূর্ব থেকেই করে রেখেছেন। তা এই যে, তিনি মক্কার ভূখণ্ডকে নিরাপদ হারাম করে দিয়েছেন। সমগ্র আরবের গ্রোত্রসমূহ কুফর, শির্ক পারস্পারিক শত্র“তা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে একমত ছিল যে, হারামের ভেতরে হত্যা ও যুদ্ধবিগ্রহ ঘোরতর অপরাধ। হারামের ভেতরে পিতার হত্যাকারীকে পেলেও সন্তান চরম প্রতিশোধস্পৃহা থাকা সত্ত্বেও তাকে হত্যা করতে পারবে না। অতএব যে প্রভু নিজ কৃপায় কুফর ও শির্ক সত্ত্বেও তাদেরকে এ ভূখণ্ডে নিরাপত্তা দিয়ে রেখেছেন, ঈমান কবূল করলে তিনি তাদেরকে ধ্বংস হতে দেবেন তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এছাড়াও আয়াতে হারামের দুটি গুণ বর্ণিত হয়েছেন ১. এটা শান্তির আবাসস্থল। ২. এখানে বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে সর্ব প্রকার ফল-মূল আমদানী হয়, যাতে মক্কার বাসিন্দারা তাদের প্রয়োজন সহজে মেটাতে পারে। মক্কায় প্রত্যেক প্রকার ফল-মূল আমদানী হওয়া আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ নিদর্শন। সারাবিশ্বে যখন কোন ফল-মূল থাকেনা তখন মক্কায় ফল-মূল থাকে। যখন যে ফলের মওসুম নয় তখনও মক্কায় সে ফল পাওয়া যায়। সুবহানাল্লাহ!



২. এরপর তাদের অজুহাতের দ্বিতীয় জবাব হলন



(وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍۭ بَطِرَتْ مَعِيْشَتَهَا)



‘কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যার বাসিন্দারা নিজেদের ভোগ-সম্পদের অহঙ্কার করত!’ এতে বলা হয়েছে যে, জগতের অন্যান্য কাফির সম্প্রদায়ের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত কর। কুফর ও শির্কের কারণে তারা কিভাবে নিপাত হয়েছে। তাদের বসত-বাড়ি, সুদৃঢ় দুর্গ ও প্রতিরক্ষামূলক সাজ-সরঞ্জামাদি মাটিতে মিশে গেছে। অতএব কুফর শির্ক হচ্ছে প্রকৃত আশঙ্কার বিষয়। দুটিই ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তোমরা এমনই বোকা ও নির্বোধ যে, কুফর ও শির্কের কারণে বিপদাশঙ্কা বোধ কর না। ঈমানের কারণে বিপদাশঙ্কা বোধ কর।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন, তিনি কোন জনপদকে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত ধ্বংস করেন না। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সতর্ক করার জন্য সতর্ককারী প্রেরণ করেন যদি তারা সতর্ক না হয় তখন তাদের ওপর শাস্তি অবতীর্ণ করেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِيْنَ حَتّٰي نَبْعَثَ رَسُوْلًا)



“আমি রাসূল না পাঠান পর্যন্ত‎ কাউকেও শাস্তি‎ দেই না।” (সূরা ইসরা ১৭:১৫)



৩. তৃতীয় জবাব হলন



(وَمَآ أُوْتِيْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا)



‘তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও শোভা’ এতে বলা হয়েছে; যদি ধরে নেয়া হয় ঈমান আনার ফলে তোমাদের কোন ক্ষতি হয়েই যায় তবে মনে রেখ, তা ক্ষণস্থায়ী।



এ জগতের ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও ধন-দৌলত যেমন ক্ষণস্থায়ী, কারও কাছে চিরকাল থাকে না তেমনি এখানকার কষ্টও ক্ষণস্থায়ী ও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই বুদ্ধিমানের উচিত, সেই কষ্ট ও সুখের চিন্তা করা যা চিরস্থায়ী ও অক্ষয়। দুনিয়ার চাকচিক্য, সৌন্দর্য সকল কিছু ক্ষণস্থায়ী। আর আল্লাহ তা‘আলার নিকট যা কিছু আছে তা উত্তম ও চিরস্থায়ী।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا عِنْدَ اللّٰهِ خَيْرٌ لِّلْأَبْرَارِ)



“আল্লাহর নিকট যা রয়েছে তা পুণ্যবানদের জন্য বহুগুণে উত্তম।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৯৮)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْـحَيٰوةَ الدُّنْيَا - وَالْاٰخِرَةُ خَيْرٌ وَّأَبْقٰي)



“কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাক। অথচ আখিরাত (জীবন) উত্তম ও চিরস্থায়ী।” (সূরা আলা ৮৭:১৬-১৭)



হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার মূল্য এমন যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে একটি আঙ্গুল ডুবিয়ে বের করে নিয়ে দেখুক সমুদ্রের তুলনায় তার আঙ্গুলে কতটা পানি লেগেছে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৮৫৮)



অতঃপর যারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী ভাল আমল করে আর যারা আখিরাতকে অস্বীকার করে তাদের মধ্যে তুলনা দিচ্ছেন যে, তারা কখনো সমান হতে পারে না। বরং যারা অস্বীকার করবে তারা অপরাধী হয়ে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে উপস্থিত হবে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِیْنَ کَالْمُجْرِمِیْنَﭲﺚمَا لَکُمْ کَیْفَ تَحْکُمُوْنَ)



“আমি কি আত্মসমর্পণকারীদেরকে অপরাধীদের মত করব? কি হয়েছে তোমাদের? তোমরা কেমন ফয়সালা কর?” (সূরা কালাম ৬৮:৩৫-৩৬)



অতএব যারা আখিরাতে বিশ্বাস রেখে সৎ আমল করে আর যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না এবং তার কোন তোয়াক্কা না করে অসৎ আমল করেই যায় তারা কোন দিক দিয়েই সমান হতে পারে না। যারা সৎ তারা জান্নাতী আর যারা অসৎ তারা জাহান্নামী। সুতরাং আমাদের উচিত সর্বদা সৎ আমল করা।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. হিদায়াত দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।

২. কাফির-মুশরিকদের জন্য দু‘আ করা কোন মু’মিন ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়; সে যতই নিকটাত্মীয় হোক না কেন।

৩. মক্কা নগরী পবিত্র, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।

৫. ঈমান আনার পিছনে ওযর পেশ করা যাবে না।

৬. গর্ব অহঙ্কার করা যাবে না।

৭. আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতসমূহের শুকরিয়া আদায় করতে হবে।

৮. দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আর আখিরাত চিরস্থায়ী।

৯. মু’মিন ও কাফির ব্যক্তি কক্ষনো সমান নয়।

১০. আখিরাতে মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট হাজির করা হবে তা নিশ্চিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৮-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর

মক্কাবাসীকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহ তা'আলার বহু নিয়ামত লাভ করে ভোগ সম্পদের দম্ভ করতো এবং হঠকারিতা ও ঔদ্ধত্যপনা প্রকাশ করতো, আল্লাহ ও তাঁর নবীদেরকে (আঃ) অমান্য ও অস্বীকার করতো এবং আল্লাহর রিযক ভক্ষণ করে নিমকহারামী করতো, তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়েছেন যে, আজ তাদের নাম নেয়ারও কেউ নেই। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত। অর্থাৎ “আল্লাহ একটি গ্রামের (লোকদের) উপমা বর্ণনা করেছেন যারা (পার্থিব বিপদ-আপদ হতে) নিরাপদে ছিল এবং তাদের মধ্যে শান্তি বিরাজ করছিল, সব জায়গা থেকে তাদের নিকট পর্যাপ্ত পরিমাণে রিক আসততা ......... অতঃপর তাদের যুলুম করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে পেয়ে বসে।` (১৬:১১২-১১৩) এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যার বাসিন্দারা নিজেদের ভোগ সম্পদের গর্ব করতো! এইতো তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে; তাদের পর এগুলোতে লোকজন খুব কমই বসবাস করেছে। আমিই তো চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত কা'ব (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে হযরত সুলাইমান (আঃ) পেঁচাকে বলেনঃ “তুমি ক্ষেতের ফসল খাও না কেন? সে উত্তরে বলেঃ “এই কারণেই তো হযরত আদম (আঃ)-কে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়েছিল। এজন্যেই আমি তা খাই না।” আবার তিনি প্রশ্ন করেনঃ “তুমি পানি পান কর না কেন?` জবাবে সে বলেঃ “কারণ এই যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর কওমকে এই পানিতেই ডুবিয়ে দেয়া হয়।” পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি তাঁবুতে বাস কর কেন?” সে উত্তর দেয়ঃ “কেননা, ওটা আল্লাহর মীরাস।” অতঃপর হযরত কা'ব (রাঃ) (আরবি) আয়াতটি পাঠ করেন।

এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় আদল ও ইনসাফের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি কাউকেও যুলুম করে ধ্বংস করেন না। প্রথমে তিনি তাদের সামনে তার হুজ্জত ও দলীল প্রমাণ পেশ করেন এবং তাদের ওযর উঠিয়ে দেন। রাসূলদেরকে প্রেরণ করে তিনি তাদের কাছে নিজের বাণী পৌঁছিয়ে দেন।

এই আয়াত দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নবুওয়াত ছিল সাধারণ। তিনি উম্মুল কুরা বা জনপদের কেন্দ্রে প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁকে সারা আরব-আজমের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করা হয়েছিল। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেন তুমি মক্কাবাসীকে এবং ওর চতুষ্পর্শ্বের লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন। কর।” (৪২ ৪৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই নিকট রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।” (৭:১৫৮) অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “যাতে আমি এই কুরআন দ্বারা তোমাদেরকে ভয়-প্রদর্শন করি এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে যাবে।` (৬:১৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দুনিয়াবাসীদের মধ্যে যে কেউ এই কুরআনকে অস্বীকার করবে তার ওয়াদার স্থান হচ্ছে জাহান্নাম।” (১১:১৭) অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “সমস্ত জনপদকে আমি কিয়ামতের পূর্বে ধ্বংসকারী অথবা কঠিন শাস্তি প্রদানকারী।” (১৭:৫৮) সুতরাং আল্লাহ তা'আলা খবর দিলেন যে, কিয়ামতের পূর্বে তিনি সত্বরই প্রত্যেক জনপদকে ধ্বংস করবেন। আর এক জায়গায় মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “আমি শাস্তি প্রদানকারী নই যে পর্যন্ত না আমি রাসূল প্রেরণ করি।” (১৭:১৫) সুতরাং আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাত বা প্রেরিতত্বকে সাধারণ করেছেন এবং সারা দুনিয়ার কেন্দ্রস্থল মক্কাভূমিতে তাঁকে প্রেরণ করে বিশ্বজাহানের উপর স্বীয় হুজ্জত খতম করে দেন।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি প্রত্যেক লাল-কালোর নিকট রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। এ জন্যেই তাঁর উপরই নবুওয়াতকে শেষ করে দেয়া হয়েছে। তার পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী বা রাসূল আসবেন না। বলা হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা আসল এবং বড় গ্রাম বা শহর উদ্দেশ্য।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।