আল কুরআন


সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 56)

সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 56)



হরকত ছাড়া:

إنك لا تهدي من أحببت ولكن الله يهدي من يشاء وهو أعلم بالمهتدين ﴿٥٦﴾




হরকত সহ:

اِنَّکَ لَا تَهْدِیْ مَنْ اَحْبَبْتَ وَ لٰکِنَّ اللّٰهَ یَهْدِیْ مَنْ یَّشَآءُ ۚ وَ هُوَ اَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِیْنَ ﴿۵۶﴾




উচ্চারণ: ইন্নাকা লা-তাহদী মান আহবাবতা ওয়ালাকিন্নাল্লা-হা ইয়াহদী মাইঁ ইয়াশাঊ ওয়া হুওয়া আ‘লামুবিলমুহতাদীন।




আল বায়ান: নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৬. আপনি যাকে ভালবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছে সৎপথে আনয়ন করেন এবং সৎপথ অনুসারীদের সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি যাকে ভালবাস তাকে সৎপথ দেখাতে পারবে না, বরং আল্লাহ্ই যাকে চান সৎ পথে পরিচালিত করেন, সৎপথপ্রাপ্তদের তিনি ভাল করেই জানেন।




আহসানুল বায়ান: (৫৬) কাকেও প্রিয় মনে করলে তুমি তাকে সৎপথে আনতে পারবে না, তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনেন এবং তিনিই ভাল জানেন কারা সৎপথের অনুসারী। [1]



মুজিবুর রহমান: তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎ পথে আনতে পারবেনা। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎ পথে আনেন এবং তিনিই ভাল জানেন কারা সৎ পথ অনুসরণকারী।



ফযলুর রহমান: তুমি যাকে পছন্দ করো (ইচ্ছা করলেই) তাকে সুপথে আনতে পার না; বরং আল্লাহই যাকে চান সুপথে আনেন। আর তিনিই সুপথপ্রাপ্তদের ভাল জানেন।



মুহিউদ্দিন খান: আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তা’আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।



জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি ধর্মপথে আনতে পারো না, কিন্তু আল্লাহ্‌ই পথ দেখান যাকে তিনি ইচ্ছা করেন। আর তিনিই ভাল জানেন সৎপথপ্রাপ্তদের।



Sahih International: Indeed, [O Muhammad], you do not guide whom you like, but Allah guides whom He wills. And He is most knowing of the [rightly] guided.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৬. আপনি যাকে ভালবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছে সৎপথে আনয়ন করেন এবং সৎপথ অনুসারীদের সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।(১)


তাফসীর:

(১) ‘হেদায়াত’ শব্দটি কয়েক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এক, শুধু পথ দেখানো। এর জন্য জরুরী নয় যে, যাকে পথ দেখানো হয় সে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতেই হবে। দুই, পথ দেখিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়া। প্রথম অর্থের দিক থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বরং সমস্ত নবীগণ যে হাদী বা পথপ্রদর্শক ছিলেন এবং হেদায়াত যে তাদের ক্ষমতাধীন ছিল, তা বলাই বাহুল্য। কেননা, এই হেদায়াতই ছিল তাদের পরম দায়িত্ব ও কর্তব্য। এটা তাদের ক্ষমতাধীন না হলে তারা নবুওয়াত ও রিসালাতের কর্তব্য পালন করবে কীরূপে? আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিদায়াতের উপর ক্ষমতাশীল নন। এতে দ্বিতীয় অর্থের হেদায়াত বোঝানো হয়েছে অর্থাৎ গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়া।

উদ্দেশ্য এই যে, প্রচার ও শিক্ষার মাধ্যমে আপনি কারও অন্তরে ঈমান সৃষ্টি করে দিবেন এবং মুমিন বানিয়ে দিবেন, এটা আপনার কাজ নয়। এটা সরাসরি আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতাধীন। এ সংক্রান্ত আলোচনা সূরা আল-ফাতিহার তাফসীরে উল্লেখিত হয়েছে। হাদীসে এসেছে, এই আয়াত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিব সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আন্তরিক বাসনা ছিল যে, সে কোনরূপেই ইসলাম গ্ৰহণ করুক। এর প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হয়েছে যে, কাউকে মুমিন-মুসলিম করে দেয়া আপনার ক্ষমতাধীন নয়। [দেখুন: বুখারী ৩৬৭১, মুসলিমঃ ২৪]।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫৬) কাকেও প্রিয় মনে করলে তুমি তাকে সৎপথে আনতে পারবে না, তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনেন এবং তিনিই ভাল জানেন কারা সৎপথের অনুসারী। [1]


তাফসীর:

[1] এই আয়াত ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নবী (সাঃ)-এর হিতাকাঙ্ক্ষী চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে। তখন তিনি চেষ্টা করলেন যাতে চাচা একবার নিজ মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বাণী উচ্চারণ করুক, যাতে পরকালে আল্লাহর সামনে তার ক্ষমার জন্য সুপারিশ করতে পারেন। কিন্তু সেখানে কুরাইশ নেতাদের উপস্থিতির কারণে আবূ তালেব ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থাকে এবং কুফরের উপরই তার মৃত্যু হয়। নবী (সাঃ) এর জন্য অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। এই সময় মহান আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে স্পষ্ট করে দিলেন যে, তোমার কাজ কেবলমাত্র পৌঁছিয়ে দেওয়া ও আহবান করা। আর হিদায়াত দান করা আমার কাজ। হিদায়াত সেই ব্যক্তিই লাভ করে থাকে, যাকে আমি হিদায়াত দান করি। তুমি যাকে হিদায়াতের উপর দেখতে পছন্দ কর, সে হিদায়াত পায় না। (বুখারীঃ সূরা কাস্বাসের তাফসীর পরিচ্ছেদ, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৬-৬১ নং আয়াতের তাফসীর:



(إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ.....) শানে নুযূল:



সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর চাচা আবূ তালেবের মুমূর্ষু অবস্থায় তার কাছে আগমন করেন। তিনি দেখলেনন আবূ জাহল, আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া পাশে বসা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: হে চাচা! আপনি বলুন:



لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ



“আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই। আমি আপনার জন্য কিয়ামতের দিন এর দ্বারাই সাক্ষ্য দিব। আবূ জাহল, আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া বলল: হে আবূ তালেব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মকে পরিত্যাগ করবে। তারা বার বার এ কথা বলতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও বার বার বলতে থাকলেন। পরিশেষে আবূ তালেব বলল: মুত্তালিবের ধর্মের ওপরেই রইলাম। আর সে



لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ



বলতে অস্বীকার করল। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: আমাকে নিষেধ না করা পর্যন্তঅবশ্যই আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তখন আল্লাহ তা‘আলা



(مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ....)



এ আয়াতটি নাযিল করেন। আর আবূ তালিবের উদ্দেশ্যে



(إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ....)



এ আয়াতটি নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৩৮৮৪, সহীহ মুসলিম হা: ২৪)



সূরা ফাতিহাতে উল্লেখ করা হয়েছেন হিদায়াত দু’ প্রকার। একপ্রকার হলন মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া, অপর প্রকার হলন সঠিক পথে চলার তাওফীক দেয়া। এখানে দ্বিতীয় প্রকার উদ্দেশ্য। সঠিক পথে চলার তাওফীক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা দিতে পারেন, অন্য কেউ পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنْ تَحْرِصْ عَلٰي هُدٰهُمْ فَإِنَّ اللّٰهَ لَا يَهْدِيْ مَنْ يُّضِلُّ وَمَا لَهُمْ مِّنْ نّٰصِرِيْنَ)‏



“যদি তুমি তাদের পথ প্রদর্শন করতে আগ্রহী হও তবুও আল্লাহ তা‘আলা যাকে বিভ্রান্ত‎ করেছেন, তাকে তিনি সৎ পথে পরিচালিত করবেন না এবং তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই।”(সূরা নাহল ১৬:৩৭) এ সম্পর্কে সূরা নাহলের ৩৭ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



এটা মক্কার কুরাইশদের কথা। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: কুরাইশদের মধ্য থেকে হারেস বিন উসমান নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল: আপনি যা বলেন তা যে সত্য সেটা আমরা জানি, কিন্তু আপনার প্রতি ঈমান আনতে ও হিদায়াতের অনুসরণ করতে পারছি না, কারণ যদি আমরা আপনার অনুসরণ করি তাহলে ভয় রয়েছে যে, আরবের লোকেরা আমাদেরকে মক্কা থেকে বের করে দিবে। আর তারা সবাই আমাদের বিরুদ্ধে ঐকমত্য হয়ে যাবে, তাদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। কুরআনে তাদের এ খোঁড়া অজুহাতের তিনটি জবাব দেয়া হয়েছে:



১. (أَوَلَمْ نُمَكِّنْ لَّهُمْ حَرَمًا اٰمِنًا يُّجْبٰٓي إِلَيْهِ ثَمَرٰتُ كُلِّ شَيْءٍ)



‘আমি কি তাদের জন্য এক নিরাপদ হারাম প্রতিষ্ঠিত করিনি, যেখানে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী হয়’ অর্থাৎ তাদের অজুহাত বাতিল। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে মক্কাবাসীর হেফাযতের জন্য একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা পূর্ব থেকেই করে রেখেছেন। তা এই যে, তিনি মক্কার ভূখণ্ডকে নিরাপদ হারাম করে দিয়েছেন। সমগ্র আরবের গ্রোত্রসমূহ কুফর, শির্ক পারস্পারিক শত্র“তা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে একমত ছিল যে, হারামের ভেতরে হত্যা ও যুদ্ধবিগ্রহ ঘোরতর অপরাধ। হারামের ভেতরে পিতার হত্যাকারীকে পেলেও সন্তান চরম প্রতিশোধস্পৃহা থাকা সত্ত্বেও তাকে হত্যা করতে পারবে না। অতএব যে প্রভু নিজ কৃপায় কুফর ও শির্ক সত্ত্বেও তাদেরকে এ ভূখণ্ডে নিরাপত্তা দিয়ে রেখেছেন, ঈমান কবূল করলে তিনি তাদেরকে ধ্বংস হতে দেবেন তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এছাড়াও আয়াতে হারামের দুটি গুণ বর্ণিত হয়েছেন ১. এটা শান্তির আবাসস্থল। ২. এখানে বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে সর্ব প্রকার ফল-মূল আমদানী হয়, যাতে মক্কার বাসিন্দারা তাদের প্রয়োজন সহজে মেটাতে পারে। মক্কায় প্রত্যেক প্রকার ফল-মূল আমদানী হওয়া আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ নিদর্শন। সারাবিশ্বে যখন কোন ফল-মূল থাকেনা তখন মক্কায় ফল-মূল থাকে। যখন যে ফলের মওসুম নয় তখনও মক্কায় সে ফল পাওয়া যায়। সুবহানাল্লাহ!



২. এরপর তাদের অজুহাতের দ্বিতীয় জবাব হলন



(وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍۭ بَطِرَتْ مَعِيْشَتَهَا)



‘কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যার বাসিন্দারা নিজেদের ভোগ-সম্পদের অহঙ্কার করত!’ এতে বলা হয়েছে যে, জগতের অন্যান্য কাফির সম্প্রদায়ের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত কর। কুফর ও শির্কের কারণে তারা কিভাবে নিপাত হয়েছে। তাদের বসত-বাড়ি, সুদৃঢ় দুর্গ ও প্রতিরক্ষামূলক সাজ-সরঞ্জামাদি মাটিতে মিশে গেছে। অতএব কুফর শির্ক হচ্ছে প্রকৃত আশঙ্কার বিষয়। দুটিই ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তোমরা এমনই বোকা ও নির্বোধ যে, কুফর ও শির্কের কারণে বিপদাশঙ্কা বোধ কর না। ঈমানের কারণে বিপদাশঙ্কা বোধ কর।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন, তিনি কোন জনপদকে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত ধ্বংস করেন না। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সতর্ক করার জন্য সতর্ককারী প্রেরণ করেন যদি তারা সতর্ক না হয় তখন তাদের ওপর শাস্তি অবতীর্ণ করেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِيْنَ حَتّٰي نَبْعَثَ رَسُوْلًا)



“আমি রাসূল না পাঠান পর্যন্ত‎ কাউকেও শাস্তি‎ দেই না।” (সূরা ইসরা ১৭:১৫)



৩. তৃতীয় জবাব হলন



(وَمَآ أُوْتِيْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا)



‘তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও শোভা’ এতে বলা হয়েছে; যদি ধরে নেয়া হয় ঈমান আনার ফলে তোমাদের কোন ক্ষতি হয়েই যায় তবে মনে রেখ, তা ক্ষণস্থায়ী।



এ জগতের ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও ধন-দৌলত যেমন ক্ষণস্থায়ী, কারও কাছে চিরকাল থাকে না তেমনি এখানকার কষ্টও ক্ষণস্থায়ী ও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই বুদ্ধিমানের উচিত, সেই কষ্ট ও সুখের চিন্তা করা যা চিরস্থায়ী ও অক্ষয়। দুনিয়ার চাকচিক্য, সৌন্দর্য সকল কিছু ক্ষণস্থায়ী। আর আল্লাহ তা‘আলার নিকট যা কিছু আছে তা উত্তম ও চিরস্থায়ী।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا عِنْدَ اللّٰهِ خَيْرٌ لِّلْأَبْرَارِ)



“আল্লাহর নিকট যা রয়েছে তা পুণ্যবানদের জন্য বহুগুণে উত্তম।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৯৮)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْـحَيٰوةَ الدُّنْيَا - وَالْاٰخِرَةُ خَيْرٌ وَّأَبْقٰي)



“কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাক। অথচ আখিরাত (জীবন) উত্তম ও চিরস্থায়ী।” (সূরা আলা ৮৭:১৬-১৭)



হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার মূল্য এমন যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে একটি আঙ্গুল ডুবিয়ে বের করে নিয়ে দেখুক সমুদ্রের তুলনায় তার আঙ্গুলে কতটা পানি লেগেছে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৮৫৮)



অতঃপর যারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী ভাল আমল করে আর যারা আখিরাতকে অস্বীকার করে তাদের মধ্যে তুলনা দিচ্ছেন যে, তারা কখনো সমান হতে পারে না। বরং যারা অস্বীকার করবে তারা অপরাধী হয়ে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে উপস্থিত হবে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِیْنَ کَالْمُجْرِمِیْنَﭲﺚمَا لَکُمْ کَیْفَ تَحْکُمُوْنَ)



“আমি কি আত্মসমর্পণকারীদেরকে অপরাধীদের মত করব? কি হয়েছে তোমাদের? তোমরা কেমন ফয়সালা কর?” (সূরা কালাম ৬৮:৩৫-৩৬)



অতএব যারা আখিরাতে বিশ্বাস রেখে সৎ আমল করে আর যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না এবং তার কোন তোয়াক্কা না করে অসৎ আমল করেই যায় তারা কোন দিক দিয়েই সমান হতে পারে না। যারা সৎ তারা জান্নাতী আর যারা অসৎ তারা জাহান্নামী। সুতরাং আমাদের উচিত সর্বদা সৎ আমল করা।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. হিদায়াত দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।

২. কাফির-মুশরিকদের জন্য দু‘আ করা কোন মু’মিন ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়; সে যতই নিকটাত্মীয় হোক না কেন।

৩. মক্কা নগরী পবিত্র, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।

৫. ঈমান আনার পিছনে ওযর পেশ করা যাবে না।

৬. গর্ব অহঙ্কার করা যাবে না।

৭. আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতসমূহের শুকরিয়া আদায় করতে হবে।

৮. দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আর আখিরাত চিরস্থায়ী।

৯. মু’মিন ও কাফির ব্যক্তি কক্ষনো সমান নয়।

১০. আখিরাতে মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট হাজির করা হবে তা নিশ্চিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! কাউকে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত করা তোমার শক্তির বাইরে। তোমার দায়িত্ব শুধু আমার বাণী জনগণের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া। হিদায়াতের মালিক আমি। আমি যাকে ইচ্ছা হিদায়াত কবূল করার তাওফীক দান করে থাকি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ তাদেরকে হিদায়াত করার দায়িত্ব তোমার নয়, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২:২৭২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার লিলা থাকলেও অধিকাংশ লোক মুমিন নয়।” (১২:১০৩) হিদায়াত লাভের হকদার কে এবং কে পথভ্রষ্ট হবার হকদার এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।

সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছে যে, এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচা আবু তালিবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যিনি তাঁকে খুবই সাহায্য সহানুভূতি করেছিলেন। সর্বক্ষেত্রেই তিনি তার সহযোগিতা করে এসেছিলেন এবং আন্তরিকভাবে তাকে ভালবাসতেন। কিন্তু তার এ ভালবাসা ছিল আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে প্রকৃতিগত। এ ভালবাসা শরীয়তগত ছিল না। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি তাকে ঈমান আনয়নের ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। কিন্তু তাঁর তকদীরের লিখন এবং আল্লাহ পাকের ইচ্ছা জয়যুক্ত হয়। তিনি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং কুফরীর উপরই অটল থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার মৃত্যুর সময় তাঁর নিকট আগমন করেন। আবু জেহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও তাঁর পাশে উপবিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে আমার প্রিয় চাচা! আপনি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু পাঠ করুন। এই কারণে আমি আল্লাহর নিকট আপনার জন্যে সুপারিশ করবো।” তখন আবু জেহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তাঁকে বলেঃ “হে আবু তালিব! তুমি কি তোমার পিতা আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে ফিরে যাবে?” এভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বুঝাতে থাকেন এবং তারা দু'জন তাকে ফিরাতে থাকে। অবশেষে তার মুখ দিয়ে শেষ কথা বের হয়ঃ “আমি এ কালেমা পাঠ করবো না, আমি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরই থাকলাম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, আমি আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা। করতে থাকবো। তবে যদি আল্লাহ আমাকে এর থেকে বিরত রাখেন এবং নিষেধ। করে দেন তাহলে অন্য কথা।” তৎক্ষণাৎ এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)

অর্থাৎ “নবী (সঃ) ও মুমিনদের জন্যে মোটেই উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে যদিও তারা তাদের নিকটতম আত্মীয় হয়।” (৯:১১৩) আর আবূ তালিবের ব্যাপারে (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু তালিবের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে চাচা! লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করুন, আমি কিয়ামতের দিন এর সাক্ষ্য দান করবো।” উত্তরে আবূ তালিব বলেনঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আমার যদি আমার বংশ কুরায়েশদের বিদ্রুপ বলে ভয় না থাকতো যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে এ কালেমা পাঠ করছি তবে অবশ্যই আমি এটা পাঠ করতাম। আর এভাবে তোমার চক্ষু ঠাণ্ডা করতাম।” ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা .. (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেন)

অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, শেষ পর্যন্ত তিনি কালেমা পড়তে অস্বীকার করেন এবং পরিষ্কারভাবে বলে দেন- “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আমি তো আমার বড়দের ধর্মের উপর রয়েছি।” তাঁর মৃত্যু একথারই উপর হয় যে, তিনি আবদুল মুত্তালিবের মাযহাবের উপর রয়েছেন।

হযরত সাঈদ ইবনে আবি রাশেদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট কায়সারের দূত যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয় এবং কায়সারের পত্রখানা নবী (সঃ)-এর সামনে পেশ করে তখন নবী (সঃ) তা নিজের ক্রোড়ে রেখে দেন। অতঃপর দূতকে বলেনঃ “তুমি কোন গোত্রের লোক?” সে উত্তরে বলেঃ “আমি তানূখ গোত্রের লোক।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি কি চাও যে, তুমি তোমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনের উপর এসে যাবে?” জবাবে সে বলেঃ “আমি যে কওমের দূত, যে পর্যন্ত না আমি তাদের পয়গামের জবাব তাদের কাছে পৌছাতে পারবো, তাদের মাযহাব পরিত্যাগ করতে পারবো না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হেসে তার সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে (আরবি) এই আয়াতটিই পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

মুশরিকরা তাদের ঈমান আনয়ন না করার একটি কারণ এও বর্ণনা করতো যে, তারা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কর্তৃক আনীত হিদায়াত মেনে নেয় তবে তাদের ভয় হচ্ছে যে, এই ধর্মের বিরোধী লোকেরা যে তাদের চতুর্দিকে রয়েছে তারা তাদের শত্রু হয়ে যাবে, তাদেরকে কষ্ট দেবে এবং তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এটাও তাদের ভুল কৌশল। আল্লাহ পাক তো তাদেরকে এক নিরাপদ হারামে অর্থাৎ মক্কা শরীফে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যেখানে দুনিয়ার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত নিরাপত্তা বিরাজ করছে। তাহলে কুফরীর অবস্থায় যখন তারা সেখানে নিরাপত্তা লাভ করছে, তখন আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করলে কি করে ঐ নিরাপত্তা উঠে যেতে পারে? এটাতো ঐ শহর যেখানে তায়েফ ইত্যাদি বিভিন্ন শহর হতে ফলমূল, ব্যবসার মাল ইত্যাদি বহুল পরিমাণে আমদানী হয়ে থাকে। সমস্ত জিনিস এখানে অতি সহজে চলে আসে এবং এভাবে মহান আল্লাহ তাদেরকে রিযক পৌঁছিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এটা জানে না। এজন্যেই তারা এরূপ বাজে ওর পেশ করে থাকে। বর্ণিত আছে যে, এ কথা যে বলেছিল তার নাম ছিল হারিস ইবনে আমির ইবনে নাওফিল।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।