আল কুরআন


সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 54)

সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 54)



হরকত ছাড়া:

أولئك يؤتون أجرهم مرتين بما صبروا ويدرءون بالحسنة السيئة ومما رزقناهم ينفقون ﴿٥٤﴾




হরকত সহ:

اُولٰٓئِکَ یُؤْتَوْنَ اَجْرَهُمْ مَّرَّتَیْنِ بِمَا صَبَرُوْا وَ یَدْرَءُوْنَ بِالْحَسَنَۃِ السَّیِّئَۃَ وَ مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَ ﴿۵۴﴾




উচ্চারণ: উলাইকা ইউ’তাওনা আজরাহুম মাররাতাইনি বিমা-সাবারূওয়া ইয়াদরাঊনা বিলহাছানাতিছ ছাইয়িআতা ওয়া মিম্মা-রাযাকনা-হুম ইউনফিকূ ন।




আল বায়ান: তাদেরকে দু’বার প্রতিদান দেয়া হবে। এ কারণে যে, তারা ধৈর্যধারণ করে এবং ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে। আর আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৪. তাদেরকে দু’বার প্রতিদান দেয়া হবে(১); যেহেতু তারা ধৈর্যশীল এবং তারা ভাল দিয়ে মন্দের মুকাবিলা করে।(২) আর আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদেরকে তাদের পারিশ্রমিক দু’বার দেয়া হবে যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং তারা ভাল দিয়ে মন্দের প্রতিহত করে আর আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তাত্থেকে তারা ব্যয় করে।




আহসানুল বায়ান: (৫৪) ওদেরকে দু’বার পুরস্কৃত করা হবে, কারণ ওরা ধৈর্যশীল।[1] ওরা ভালোর দ্বারা মন্দকে দূর করে[2] এবং আমি ওদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে।



মুজিবুর রহমান: তাদেরকে দু’বার পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে; কারণ তারা ধৈর্যশীল এবং তারা ভাল দ্বারা মন্দের মুকাবিলা করে এবং আমি তাদেরকে যা দিয়েছি তা হতে তারা ব্যয় করে।



ফযলুর রহমান: যেহেতু তারা কষ্ট সহ্য করেছে তাই তাদেরকে দুইবার পুরস্কার দেওয়া হবে। তারা ভাল দ্বারা মন্দ প্রতিহত করে এবং তাদেরকে যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।



মুহিউদ্দিন খান: তারা দুইবার পুরস্কৃত হবে তাদের সবরের কারণে। তারা মন্দের জওয়াবে ভাল করে এবং আমি তাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।



জহুরুল হক: এদের দুইবার তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে যেহেতু তারা অধ্যবসায় করেছিল, এবং তারা ভালো দিয়ে মন্দকে প্রতিরোধ করে, আর আমরা তাদের যে রিযেক দিয়েছি তা থেকে তারা খরচ করে থাকে।



Sahih International: Those will be given their reward twice for what they patiently endured and [because] they avert evil through good, and from what We have provided them they spend.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৪. তাদেরকে দু”বার প্রতিদান দেয়া হবে(১); যেহেতু তারা ধৈর্যশীল এবং তারা ভাল দিয়ে মন্দের মুকাবিলা করে।(২) আর আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ আহলে কিতাবের মুমিনদেরকে দুইবার পুরস্কৃত করা হবে। পবিত্র কুরআনে এমনি ধরনের প্রতিশ্রুতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্ৰা স্ত্রীগণের সম্পর্কেও বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে, (وَمَنْ يَقْنُتْ مِنْكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ وَتَعْمَلْ صَالِحًا نُؤْتِهَا أَجْرَهَا مَرَّتَيْنِ) “তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি অনুগত হবে ও সৎকাজ করবে তাকে আমরা পুরস্কার দেব দু’বার” [সূরা আল-আহযাবঃ ৩১] অনুরূপভাবে এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তিন ব্যক্তির জন্য দু’বার পুরস্কার রয়েছে ১। যে কিতাবধারী পূর্বে তার নবীর প্রতি ঈমান এনেছে তারপর এই নবীর প্রতি ঈমান এনেছে। ২। যে অপরের মালিকানাধীন দাস মনিব এবং তার মূল প্ৰভু রাব্বুল আলমীনের আনুগত্য করে ৩। যার মালিকানায় কোন যুদ্ধ-লব্ধ দাসী ছিল সে তাকে গোলামী থেকে মুক্ত করে বিবাহিতা স্ত্রী করে নিল৷ [বুখারীঃ ৯৭]

এখানে চিন্তাসাপেক্ষ বিষয় এই যে, এই কয়েক প্রকার লোককে দুবার পুরস্কৃত করার কারণ কি? এর জওয়াবে বলা যায় যে, তাদের প্রত্যেক আমল যেহেতু দুটি, এই যে, সে পূর্বে এক নবীর প্রতি ঈমান এনেছিল, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ঈমান এনেছে। পবিত্র স্ত্রীগণের দুই আমল এই যে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য ও মহব্বত রাসূল হিসেবেও করেন, আবার স্বামী হিসেবেও করেন। গোলামের দুই আমল তার দ্বিমুখী আনুগত্য, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য এবং তার মালিকের আনুগত্য। বাদীকে মুক্ত করে যে বিবাহ করে, তার এক আমল মুক্ত করা, আর দ্বিতীয় আমল বিবাহ করা। [কুরতুবী]


(২) অর্থাৎ তারা মন্দের জবাব মন্দ দিয়ে নয়। বরং ভালো দিয়ে দেয়। মিথ্যার মোকাবিলায় মিথ্যা নয় বরং সত্য নিয়ে আসে। যুলুমকে যুলুম দিয়ে নয় বরং ইনসাফ দিয়ে প্রতিরোধ করে। দুষ্টামির মুখোমুখি দুষ্টামির সাহায্যে নয় বরং ভদ্রতার সাহায্যে হয়। এই মন্দ ও ভাল বলে কি বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে অনেক উক্তি বর্ণিত আছেঃ কেউ বলেন, ভাল বলে ইবাদত এবং মন্দ বলে গোনাহ বোঝানো হয়েছে। কেননা, পুণ্য কাজ অসৎ কাজকে মিটিয়ে দেয়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “গোনাহের পর নেক কাজ কর। নেককাজ গোনাহকে মিটিয়ে দেবে”। [তিরমিযীঃ ১৯৮৭] কেউ কেউ বলেন, ভাল বলে জ্ঞান ও সহনশীলতা এবং মন্দ বলে অজ্ঞতা ও অসহনশীলতা বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তারা অপরের অজ্ঞতার জওয়াব জ্ঞান ও সহনশীলতা দ্বারা দেয়। [বাগভী] প্রকৃতপক্ষে এসব উক্তির মধ্যে কোন বিরোধ নেই। কেননা, এগুলো সবই ভাল ও মন্দের অন্তর্ভুক্ত।

এ আয়াতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ হেদায়াত রয়েছেঃ এক. কারও দ্বারা কোন গোনাহ হয়ে গেলে তার প্রতিকার এই যে, এরপর সৎকাজে সচেষ্ট হতে হবে। সৎকাজ গোনাহের কাফফারা হয়ে যাবে। দুই. কেউ কারও প্রতি উৎপীড়ন ও মন্দ আচরণ করলে শরীয়তের আইনে যদিও সমান সমান হওয়ার শর্তে প্ৰতিশোধ নেয়া জায়েয আছে, কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার পরিবর্তে মন্দের প্রত্যুত্তরে ভাল এবং উৎপীড়নের প্রত্যুত্তরে অনুগ্রহ করাই উত্তম। এটা উৎকৃষ্ট চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তর। দুনিয়া ও আখেরাতে এর উপকারিতা অনেক। কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “ভাল ও মন্দ একসমান হতে পারে না। মন্দ ও যুলুমকে উৎকৃষ্ট পন্থায় প্রতিহত কর। (যুলুমের পরিবর্তে অনুগ্রহ কর)। এরূপ করলে যে ব্যক্তি ও তোমার মধ্যে শক্ৰতা আছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে। [সূরা ফুসসিলাতঃ ৩৪]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫৪) ওদেরকে দু”বার পুরস্কৃত করা হবে, কারণ ওরা ধৈর্যশীল।[1] ওরা ভালোর দ্বারা মন্দকে দূর করে[2] এবং আমি ওদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে।


তাফসীর:

[1] ‘ধৈর্যশীলতা’ বলতে সর্বাবস্থায় আম্বিয়া ও আল্লাহর কিতাবের উপর ঈমান আনা এবং তার উপর দৃঢ়তার সাথে অবিচলিত থাকা। যারা পূর্ববর্তী নবী ও তাঁর উপর অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমান এনেছেন এবং তারপর পরবর্তী নবী ও তাঁর উপর অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমান আনেন, তাঁদের জন্য রয়েছে ডবল পুরস্কার। হাদীসেও তাঁদের এই মর্যাদা বর্ণনা করে নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘তিন শ্রেণীর লোককে দ্বিগুণ সওয়াব দান করা হবে। ওদের মধ্যে এক শ্রেণীর লোক হল, সেই ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান; যে নিজ নবীর উপর ঈমান এনেছিল, তারপর আমার উপর ঈমান আনল।

(বুখারীঃ শিক্ষা অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)

[2] অর্থাৎ, অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণে অন্যায় করে না (ইট খেয়ে পাটকেল ছুঁড়ে না); বরং ক্ষমা করে দেয় ও উপেক্ষা করে চলে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫২-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে আহলে কিতাবদের ঐ সমস্ত ইয়াহূদ ও খ্রিস্টানদের কথা বলা হয়েছে যারা তাদের নিকট আগত নাবী ও অবতীর্ণ কিতাবের ওপর ঈমান এনেছিল, তারা তাদের ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাওরাত ও ইনজিলের সুসংবাদ অনুপাতে তাদের বিশ্বাস ছিল মুহাম্মাদ নামে একজন সর্বশেষ নাবী আগমন করবেন । তাই যখন নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগমন করলেন তখন বিলম্ব না করে পূর্ব জ্ঞান ও সুসংবাদ অনুপাতে তারা তাঁর প্রতি ঈমান আনল, কুরআনের প্রতি ঈমান আনল এবং মুসিলমদের কাতারে শামিল হল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



( وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتٰبِ لَمَنْ يُّؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَمَآ أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَآ أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِيْنَ لِلّٰهِ)



“আর নিশ্চয়ই আহলে কিতাবের মধ্যে এরূপ লোকও রয়েছে যারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি এবং তোমাদের প্রতি ও তাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৯৯)



(وَإِذَا يُتْلٰي عَلَيْهِمْ)



অর্থাৎ যখন তাদের সামনে কুরআন তেলাওয়াত করা হয় তখন তারা বলে, আমরা এর প্রতি ঈমান আনলাম এবং বিশ্বাস করলাম যে, এটা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কিতাব। এ কিতাব নাযিল হওয়ার পূর্ব থেকেই আমরা মুসলিম, আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদে বিশ্বাসী। এদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এ সকল ঈমানদারদেরকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। প্রথম প্রতিদানন তাদের নিকট আগত রাসূলের প্রতি ঈমান আনার কারণে, দ্বিতীয় প্রতিদানন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনার কারণে। কারণ তারা দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে গিয়ে ধৈর্যধারণ করেছে। আর যখনই কোন কষ্টপ্রাপ্ত হয়েছে তখনই তারা প্রতিশোধ না নিয়ে বরং তা ক্ষমা করে দেয়, মন্দকে ভাল দ্বারা প্রতিহত করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:



(اِدْفَعْ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ ط نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُوْنَ)‏



“মন্দের মুকাবিলা কর‎ যা উত্তম তা দ্বারা; তারা যা বলে আমি সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।” (সূরা মু’মিনূন ২৩:৯৬) এবং তাদেরকে যা রিযিক দেয়া হয় তারা তা থেকে আল্লাহ তা‘আলার পথে খরচ করে।



হাদীসে এসেছে: আবূ মূসা আশয়ারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “তিন শ্রেণির লোক যাদেরকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবেন ১. আহলে কিতাবের যে ব্যক্তি তার নাবীর প্রতি ঈমান এনেছে এবং (আমাকে পাওয়ার পর) আমার প্রতি ঈমান এনেছে। ২. ঐ দাস যে আল্লাহ তা‘আলার হক আদায় করে এবং তার মালিকেরও হক আদায় করে। ৩. ঐ ব্যক্তি যার একটি দাসী রয়েছে। সে তাকে উত্তমভাবে আদব শিক্ষা দেয় অতঃপর স্বাধীন করে দেয় এবং সে তাকে বিবাহ করে নেয়। (সহীহ বুখারী হা: ৯৭, মুসলিম হা: ১৫৪, ২৮১১)



আর তারা যখন কোন বেহুদা কথা শুনতে পায় সেখান থেকে বিমুখ হয় এবং সেখান থেকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِذَا مَرُّوْا بِاللَّغْوِ مَرُّوْا كِرَامًا)



“এবং অসার ক্রিয়াকলাপের সম্মুখীন হলে স্বীয় মর্যাদার সাথে সেটা পরিহার করে চলে।” (সূরা ফুরকান ২৫:৭২) এবং যারা মন্দ কর্মে লিপ্ত তাদের মন্দ থেকে ফিরে আসার নসীহত করে তথাপি যদি তারা ফিরে না আসে তাহলে তারা শুধু এ কথা বলে তাদেরকে সতর্ক করে দেয় যে, আমাদের আমল আমাদের জন্য আর তোমাদের আমলসমূহ তোমাদের জন্য।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لَكُمْ دِيْنُكُمْ وَلِيَ دِيْنِ)



“তোমাদের দীন তোমাদের জন্যন আর আমার দীন আমার জন্য।” (সূরা কাফিরূন ১০৯:৬)



সুতরাং মু’মিনদের অন্যতম একটি গুণ হল তারা অসার কথা-বার্তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে কেউ মন্দ আচরণ করলে সুন্দর পন্থায় বিদায় দিয়ে চলে আসে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা তাদের নাবীর প্রতি ঈমান আনবে ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবে তাদের প্রতিদান দ্বিগুণ।

২. বিপদে ধৈর্যধারণ করার ফযীলত অনেক।

৩. যেখানে অশ্লীল ক্রিয়াকলাপ হবে সেখান থেকে দূরে থাকতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫২-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর

আহলে কিতাবের আলেমগণ, যারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর প্রিয়পাত্র ছিলেন, তাঁদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা কুরআনকে মেনে চলেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “যাদেরকে আমি কিতাব দান করেছি তারা ওটাকে সঠিকভাবে পাঠ করে থাকে, তারা ওর উপর ঈমান আনয়ন করে।” (২:১২১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “আহলে কিতাবের মধ্যে অবশ্যই এমন লোকও আছে যারা আল্লাহ্র উপর ঈমান আনয়ন করে এবং তোমাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে ও তাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, এসবগুলোর উপরই বিশ্বাস স্থাপন করে, আর তারা আল্লাহর নিকট বিনীত হয়।” (৩:১৯৯) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “যাদেরকে এর পূর্বে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাদের নিকটে যখন এটা পাঠ করা হয় তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। আর বলে- আমাদের প্রতিপালক পবিত্র, মহান। আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয়েই থাকে।” (১৭:১০৭-১০৮) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্ব হিসেবে সমস্ত লোক হতে বেশী নিকটতম ঐ লোকদেরকে তুমি পাবে যারা বলে- আমরা নাসারা, এটা এই কারণে যে, তাদের মধ্যে আলেম ও বিবেকবান লোকেরা রয়েছে, তারা অহংকার ও দাম্ভিকতা শূন্য এবং তারা কুরআন শুনে কেঁদে ফেলে ও বলে ওঠেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং (ঈমানের) সাক্ষ্যদাতাদের সাথে আমাদের নাম লিখে নিন।” (৫:৮২-৮৩)।

হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যাদের ব্যাপারে এটা অবতীর্ণ হয়েছে তাঁরা ছিলেন সত্তরজন খৃষ্টান আলেম। তারা আবিসিনিয়ার বাদশাহ্ নাজ্জাশী কর্তৃক প্রেরিত প্রতিনিধি ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সূরায়ে ‘ইয়াসীন’ শুনিয়ে দেন। শোনা মাত্রই তাঁরা কান্নায় ফেটে পড়েন এবং সাথে সাথেই মুসলমান হয়ে যান। তাঁদের ব্যাপারেই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এখানে তাদেরই প্রশংসা করা হয় যে, আয়াতগুলো শোনা মাত্রই তাঁরা। নিজেদেরকে খাটি একত্ববাদী ঘোষণা করেন এবং ইসলাম কবূল করে মুমিন ও মুসলমান হয়ে যান। তাঁদের ব্যাপারেই আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদেরকে দু’বার পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে। প্রথম পুরস্কার তাঁদের নিজেদের কিতাবের উপর ঈমান আনয়নের কারণে এবং দ্বিতীয় পুরস্কার কুরআনকে বিশ্বাস করে নেয়ার কারণে। তাঁরা সত্যের অনুসরণে অটল থাকেন, যা প্রকৃতপক্ষে একটি বড় কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

সহীহ্ হাদীসে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকারের লোককে দ্বিগুণ পুরস্কার দেয়া হবে। প্রথম হলো ঐ আহলে কিতাব যে নিজের নবীকে মেনে নেয়ার পর আমার উপরও ঈমান আনে। দ্বিতীয় হলো ঐ গোলাম যে নিজের পার্থিব মনিবের আনুগত্য করার পর আল্লাহর হকও আদায় করে। তৃতীয় হলো ঐ ব্যক্তি, যার কোন ক্রীতদাসী রয়েছে। তাকে আদব ও বিদ্যা শিক্ষা দেয়। অতঃপর তাকে আযাদ করে দিয়ে বিয়ে করে নেয়।”

হযরত কাসেম ইবনে আবি উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “মক্কা বিজয়ের দিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সওয়ারীর সাথে ছিলাম এবং তাঁর খুবই নিকটে ছিলাম। তিনি খুবই ভাল ভাল কথা বলেন। সেদিন তিনি একথাও বলেনঃ “ইয়াহুদী ও নাসারার মধ্যে যে মুসলমান হয়ে যায় তার জন্যে দ্বিগুণ পুরস্কার। তার জন্যে আমাদের সমান (অর্থাৎ সাধারণ মুসলমানের সমান অধিকার রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁদের গুণ বর্ণনা করছেন যে, তারা মন্দের প্রতিদান মন্দ দ্বারা গ্রহণ করেন না, বরং ক্ষমা করে দেন। তাঁদের সাথে যারা মন্দ ব্যবহার করে তাদের সাথে তারা উত্তম ব্যবহারই করে থাকেন। তাদের হালাল ও পবিত্র জীবিকা হতে তারা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকেন, নিজেদের সন্তানদেরকেও লালন পালন করেন, দান-খয়রাত করার ব্যাপারেও তারা কার্পণ্য করেন না এবং বাজে ও অসার কার্যকলাপ হতে তারা দূরে থাকেন। যারা অসার কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে তাদের সাথে তারা বন্ধুত্ব করেন না। তাদের মজলিস হতে তারা দূরে থাকেন। ঘটনাক্রমে সেখান দিয়ে হঠাৎ গমন করলে ভদ্রভাবে তারা সেখান হতে সরে পড়েন। এইরূপ লোকদের সাথে তারা মেলামেশা করেন না এবং তাদের সাথে ভালবাসাও রাখেন না। পরিষ্কারভাবে তাদেরকে বলে দেনঃ “আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্যে। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।” অর্থাৎ তারা অজ্ঞদের কঠোর ভাষাও সহ্য করে নেন। তাদেরকে এমন জবাব দেন না যাতে তারা আরো উত্তেজিত হয়ে যায়। বরং তারা তাদের অপরাধ ক্ষমা করে থাকেন। যেহেতু তারা নিজেরা পাক-পবিত্র, সেহেতু মুখ দিয়ে পবিত্র কথাই বের করে থাকেন।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আবিসিনিয়া হতে প্রায় বিশ জন খৃষ্টান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাঁর সাথে আলাপ আলোচনা শুরু করেন। ঐ সময় কুরায়েশরা নিজ নিজ মজলিসে কাবা ঘরের চতুর্দিকে বসেছিল। ঐ খৃষ্টান আলেমগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করে সঠিক উত্তর পেয়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং কুরআন কারীম পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তাঁরা ছিলেন শিক্ষিত ও ভদ্র এবং তাঁদের মস্তিষ্ক ছিল প্রখর। তাই কুরআন কারীম তাঁদের মনকে আকৃষ্ট করলো এবং তাদের চক্ষুগুলো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। তৎক্ষণাৎ তারা দ্বীন ইসলাম কবুল করে নিলেন। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করলেন। কেননা, আসমানী কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যেসব বিশেষণ তারা পড়েছিলেন সেগুলোর সবই তার মধ্যে বিদ্যমান পেয়েছিলেন। যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে চলতে শুরু করেন তখন অভিশপ্ত আবূ জেহেল তার লোকজনসহ পথে তাদের সাথে মিলিত হয় এবং তাদেরকে বিদ্রুপ করতে থাকে। তারা তাদেরকে বলেঃ “তোমাদের ন্যায় জঘন্যতম প্রতিনিধি আমরা কখনো কোন কওমের মধ্যে দেখিনি। তোমাদের কওম তোমাদেরকে এই লোকটির (হযরত মুহাম্মদের সঃ) অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্যে এখানে পাঠিয়েছিলেন। এখানে এসেই তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করে দিলে এবং এই লোকটির প্রভাব তোমাদের উপর এমনভাবে পড়ে যায় যে, অল্পক্ষণের মধ্যেই তোমরা তোমাদের নিজেদের ধর্ম পরিত্যাগ করে তার ধর্ম গ্রহণ করে বসলে। সুতরাং তোমাদের চেয়ে বড় আহমক আর কেউ আছে কি?” তারা ঠাণ্ডা মনে তাদের কথাগুলো শুনলেন এবং উত্তরে বললেনঃ “আমরা তোমাদের সাথে অজ্ঞতামূলক আলোচনা করতে চাই না। আমাদের ধর্ম আমাদের সাথে এবং তোমাদের ধর্ম তোমাদের সাথে। আমরা যে কথার মধ্যে আমাদের কল্যাণ নিহিত পেয়েছি সেটাই আমরা কবুল করে নিয়েছি।” একথাও বলা হয়েছে যে, তাঁরা ছিলেন নাজরানের খৃষ্টান প্রতিনিধি। এই ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। এটাও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো তাদেরই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত যুহরী (রঃ)-কে এ আয়াতগুলোর শানে নুযূল জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি তো আমার আলেমদের থেকে শুনে আসছি যে, এ আয়াতগুলো নাজ্জাশী ও তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে এবং সূরায়ে মায়েদার (আরবি) হতে (আরবি) (৫:৮২-৮৩) পর্যন্ত এই আয়াতগুলোও তাঁদেরই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।