সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 21)
হরকত ছাড়া:
فخرج منها خائفا يترقب قال رب نجني من القوم الظالمين ﴿٢١﴾
হরকত সহ:
فَخَرَجَ مِنْهَا خَآئِفًا یَّتَرَقَّبُ ۫ قَالَ رَبِّ نَجِّنِیْ مِنَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِیْنَ ﴿۲۱﴾
উচ্চারণ: ফাখারাজা মিনহা-খা-ইফাইঁ ইয়াতারাক্কাবু কা-লা রাব্বি নাজ্জিনী মিনাল কাওমিজ্জা-লিমীন।
আল বায়ান: তখন সে ভীত প্রতীক্ষারত অবস্থায় শহর থেকে বেরিয়ে পড়ল। বলল, ‘হে আমার রব, আপনি যালিম কওম থেকে আমাকে রক্ষা করুন’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১. তখন তিনি ভীত সতর্ক অবস্থায় সেখান থেকে বের হয়ে পড়লেন এবং বললেন, হে আমার রব! আপনি যালিম সম্প্রদায় থেকে আমাকে রক্ষা করুন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তখন মূসা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল সতর্কতার সঙ্গে। সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে যালিম গোষ্ঠী হতে রক্ষা কর।’
আহসানুল বায়ান: (২১) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় সন্তর্পণে সে সেখান হতে বের হয়ে পড়ল[1] এবং বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি অত্যাচারী সম্প্রদায় হতে আমাকে রক্ষা কর।’ [2]
মুজিবুর রহমান: ভীত সতর্ক অবস্থায় সে সেখান হতে বের হয়ে পড়ল এবং বললঃ হে আমার রাব্ব! আপনি যালিম সম্প্রদায় হতে আমাকে রক্ষা করুন।
ফযলুর রহমান: তখন সে ভয়ে ভয়ে সেখান থেকে বের হয়ে চারপাশের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। (তখন) সে বলল, “প্রভু! আমাকে জালেম লোকদের (হাত) থেকে রক্ষা কর।”
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তিনি সেখান থেকে ভীত অবস্থায় বের হয়ে পড়লেন পথ দেখতে দেখতে। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে জালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে রক্ষা কর।
জহুরুল হক: সুতরাং তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন ভীতসন্ত্রস্তভাবে সতর্ক দৃষ্টি মেলে। তিনি বললেন -- "আমার প্রভু! আমাকে অত্যাচারীগোষ্ঠী থেকে উদ্ধার করো।"
Sahih International: So he left it, fearful and anticipating [apprehension]. He said, "My Lord, save me from the wrongdoing people."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২১. তখন তিনি ভীত সতর্ক অবস্থায় সেখান থেকে বের হয়ে পড়লেন এবং বললেন, হে আমার রব! আপনি যালিম সম্প্রদায় থেকে আমাকে রক্ষা করুন।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২১) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় সন্তর্পণে সে সেখান হতে বের হয়ে পড়ল[1] এবং বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি অত্যাচারী সম্প্রদায় হতে আমাকে রক্ষা কর।” [2]
তাফসীর:
[1] যখন মূসা (আঃ) একথা জানতে পারলেন, তখন সেখান থেকে পলায়ন করলেন, যাতে ফিরআউন তাঁকে বন্দী করতে না পারে।
[2] অর্থাৎ, ফিরআউন ও তার পারিষদের কবল হতে, যারা আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। কথিত আছে যে, মূসা (আঃ)-এর জানাই ছিল না যে, তাঁকে কোথায় যেতে হবে? কারণ, মিসর ছেড়ে চলে যাওয়ার এ ঘটনা ছিল আকস্মিক; পূর্ব হতে কোন পরিকল্পনা ছিল না। মহান আল্লাহ ঘোড়-সওয়ার এক ফিরিশতাকে পাঠালেন। তিনিই তাঁকে পথ নির্দেশ করেছিলেন। والله أعلم (ইবনে কাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: সূরার নামকরণ:
কাসাস শব্দটি কিস্সা এর বহুবচন। কিস্সা অর্থ ঘটনা, কাহিনী ইত্যাদি। এ সূরাতে একাধিক নাবীর কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, তাই এ নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহের মধ্যে সূরা কাসাস সর্বশেষ সূরা। হিজরতের সময় মক্কা ও জুহফা এর মাঝখানে এ সূরা অবতীর্ণ হয়। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, হিজরতের সফরে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন জুহফায় পৌঁছেন, তখন জিবরীল (عليه السلام) আগমন করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলেন: হে মুহাম্মাদ, আপনার মাতৃভূমির কথা আপনার মনে পড়ে কি? তিনি বললেন: হ্যাঁ। অতঃপর জিবরীল (عليه السلام) তাঁকে এ সূরা শুনালেন। এ সূরার শেষভাগে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, আপনাকে মক্কা থেকে বের করে দেয়ার পরিণামে মক্কা বিজিত হয়ে আপনার অধিকারভুক্ত হবে, যেমনটি উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা অত্র সূরার ৮৫ নং আয়াতে বলেনন
(إِنَّ الَّذِيْ فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْاٰنَ لَرَآدُّكَ إِلٰي مَعَادٍ)
“যিনি তোমার জন্য কুরআনকে করেছেন বিধান তিনি তোমাকে অবশ্যই ফিরিয়ে আনবেন জন্মভূমিতে।”
সূরা কাসাসে সর্বপ্রথম মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী সংক্ষেপে ও পরে বিস্তারিত বর্র্ণিত হয়েছে। অর্ধেক সূরা পর্যন্ত মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী ফির‘আউনের সাথে এবং শেষভাগে কারূনের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী সমগ্র কুরআনে কোথাও সংক্ষেপে আবার কোথাও বিস্তারিত আকারে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা কাহফে খাজির (عليه السلام)-এর সাথে তাঁর কাহিনী বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর সূরা ত্বা-হা-য় বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে এবং এরই কিছু বিবরণ সূরা আন-নামলে অতঃপর সূরা কাসাসে এর পুনরালোচনা রয়েছে।
১-৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:
طٰس۬مّ۬ (ত্বা-সীন-মীম) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
এরপর বলেন, এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত, এ সম্পর্কে সূরা শুআরার প্রথমে অর্থাৎ ২ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা মূসা (عليه السلام)-এর জীবন বৃত্তান্তের বর্ণনা দিচ্ছেন।
(وَأَوْحَيْنَآ إِلٰٓي أُمِّ مُوْسٰٓي)
‘আমি মূসার মায়ের কাছে ওয়াহী করেছি’ এখানে ওয়াহী শব্দটি পারিভাষিক অর্থে ব্যবহার হয়নি। বরং শাব্দিক অর্থে স্বভাবগত ইলহাম যা মানুষকে করা হয়। এখানে এটাই উদ্দেশ্য, অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-এর মায়ের মনের মাঝে একটি ইলহাম করে দিয়েছিলেন যেন তিনি তার ছেলে মূসা (عليه السلام)-কে বুকের দুধ পান করান। আর যদি ভয় হয় নিজের কাছে থাকলে ফির‘আউন হত্যা করবে তাহলে একটি বাক্সে করে সাগরে ভাসিয়ে দেবে।
الْيَمِّ শব্দের অর্থ সাগর, অর্থাৎ নীল নদে ভাসিয়ে দাও, মারা যাবে বা হারিয়ে যাবে এ ভয় বা আশঙ্কা করবে না। আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং আমি তাকে রাসূল বানাবো।
(فَالْتَقَطَه۫ٓ اٰلُ فِرْعَوْنَ)
অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-কে নীল নদে ভাসিয়ে দিলে ভেসে ভেসে ফির‘আউনের প্রাসাদের কাছে চলে যায়, ফির‘আউনের পরিবার তাকে তুলে নিল এবং ফির‘আউনের স্ত্রী আসিয়া বললন এ শিশু আমাদের নয়ণমনি হবে অতএব তাকে হত্যা করো না। এভাবে আপন গৃহে শত্র“ লালিত পালিত হল কিন্তু তারা বুঝতেও পারল না।
(وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوْسٰي فٰرِغًا)
অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-কে হারিয়ে ফেলে মায়ের মন অস্থির। কিনা কী হয়, মূসা (عليه السلام) যে তার সন্তান এ কথা প্রকাশ করেই দিতেন যদি আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তর ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ না করে দিতেন, যাতে তার এ বিশ্বাস বদ্ধমূল থাকে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে ফিরিয়ে দেয়ার যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন তা অবশ্যই সত্যে পরিণত হবে। فٰرِغًا অর্থন কেউ বলেছেন: দুনিয়ার সব কিছু থেকে তার মাতা চিন্তামুক্ত, কেবল চিন্তা একটাই মূসা। কেউ বলেছেন: সকল দুশ্চিন্তা থেকে তিনি মুক্ত কারণ তিনি জানেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে ফেরত দেবেন, সে ডুবে যাবে না। তারপর মূসা (عليه السلام)-এর বোনকে তার মা বললেন সে যেন তাকে দূর থেকে দেখে দেখে রাখে, কোথা থেকে কোথায় যায়।
(وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ)
অর্থাৎ ফির‘আউনের বাড়িতে মূসা (عليه السلام)-কে নিয়ে যাওয়ার পর দুধ পান করাতে চাইলে কেউ দুধ পান করাতে পারে না। উদ্দেশ্য হল যাতে দুধ পান করানোর জন্য মূসার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে হয়। যা আয়াতেই উল্লেখ রয়েছে।
(وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّه)
অর্থাৎ যখন শক্তি, জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায় পূর্ণ যৌবনে উপনিত হল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে নবুওয়াত দিলেন। অধিকাংশদের ক্ষেত্রে এ পূর্ণতা চল্লিশ বছর বয়সে হয়ে থাকে। তাই দেখা যায় অধিকাংশ নাবীদেরকে এ বয়সে নবুওয়াত দেয়া হয়েছে যেমন আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
(عَلٰي حِيْنِ غَفْلَةٍ)
‘অধিবাসীরা ছিল অসতর্ক’ হয় তা দুপুরের সময় যখন মানুষ বিশ্রাম নেয় অথবা অন্য কোন সময় যখন মানুষ বিভিন্ন জায়গাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হতে বিরত থাকে।
(هٰذَا مِنْ شِيْعَتِه۪)
‘একজন তার নিজ দলের’ অর্থাৎ বানী-ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত, (وَهٰذَا مِنْ عَدُوِّه۪) ‘এবং অপর জন তার শত্র“দলের’ অর্থাৎ কিবতী বংশের।
(فَقَضٰي عَلَيْهِ)
অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-এর ঘুষিতে সে মারা যায়। মূসা (عليه السلام) তাকে মেরে ফেলার জন্য ঘুষি দেননি, কিন্তু ঘটনাক্রমে সে আঘাতে মারা যায়। ফলে মূসা (عليه السلام) অনুতপ্ত হন এবং বলেন, নিশ্চয়ই এটা শয়তানের কাজ, তাই তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন।
(فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِيْنَةِ خَا۬ئِفًا)
মূসা (عليه السلام) খুব ভীত-শঙ্কিত অবস্থায় তথায় সকাল করলেন আর খুব খেয়াল করছেন যে, ফির‘আউনের পারিষদের কেউ জানতে পারে কি না; কারণ ফির‘আউন ভাল করেই জানে এ কাজ মূসা (عليه السلام) ছাড়া কেউ করার দুঃসাহস রাখে না। এমন সময় মূসা (عليه السلام) শুনতে পেলেন, যে বানী-ইসরাঈলের লোকটাকে গতকাল সাহায্য করেছিল সে আরেকজন কিবতীকে হত্যা করবে বলে চিৎকার করছে। তখন মূসা (عليه السلام) তাকে তিরস্কার করে আয়াতে উল্লিখিত কথা বললেন।
(فَلَمَّآ أَنْ أَرَادَ أَنْ يَّبْطِشَ بِالَّذِيْ هُوَ عَدُوٌّ لَّهُمَا)
অর্থাৎ যখন লোকটি এরূপ চিৎকার করল তখন মূসা ইচ্ছা করলেন তাকে ধরে শাস্তি দেবেন। যখন লোকটি বুঝল তাকে মূসা (عليه السلام) মারবে তখন সে বলল: ‘হে মূসা! তুমি যেমন গতকাল এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, সেভাবে আমাকেও কি হত্যা করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চাচ্ছ, শান্তি স্থাপনকারী হতে চাও না।’
(هُوَ عَدُوٌّ لَّهُمَا)
অর্থাৎ সে বানী ইসরাঈলের লোকটি মূসা (عليه السلام) ও যে কিবতী লোকটিকে মূসা (عليه السلام) হত্যা করেছেন তাদের দুজনেরই শত্র“ হয়ে গেল।
(وَجَا۬ءَ رَجُلٌ) কেউ বলেছেন, লোকটির নাম হিজকিল; কেউ বলেছেন, শামউন।
(وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَا۬ءَ مَدْيَنَ)
শামদেশের একটি শহরের নাম মাদইয়ান। মাদইয়ান ইবনু ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। এ এলাকা ফির‘আউনের ক্ষমতার বাইরে ছিল। মিশর থেকে এর দূরত্ব ছিল আট মনযিল। মূসা (عليه السلام) ফির‘আউন ও তার বাহিনীকে ভয় করে মিশর থেকে মাদইয়ানে চলে আসার ইচ্ছা করলেন। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়ন মানুষকে যে বিষয়ে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে ভয় করা তাওয়াক্কুল ও ঈমানের পরিপন্থী নয়। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা করে ফেলবে এ ভয়ে তিনি মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে গেলেন। মূসা (عليه السلام) নিঃসম্বল অবস্থায় মিসর ত্যাগ করলেন। তাঁর সাথে পাথেয় বলতে কিছু ছিল না এবং তিনি রাস্তাও চিননে না। আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করে রওনা দিলেন এবং বললেন ‘আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন।’
(وَلَمَّا وَرَدَ مَا۬ءَ مَدْيَنَ) مَا۬ءَ مَدْيَنَ
বলতে একটি কুপকে বুঝানো হয়েছে। অত্র এলাকাবাসীরা এখান থেকে তাদের জন্তুদের পানি পান করাতো। অর্থাৎ দু’জন মহিলা বলতে শু‘আইব (عليه السلام)-এর কন্যাদ্বয়।
(قَالَ مَا خَطْبُكُمَا)
অর্থাৎ মূসা (عليه السلام) তাদের দাঁড়ানো দেখে বললেন; আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? তারা বলল, পুরুষেরা পানি পান করিয়ে নিয়ে গেলে তারপর আমরা পানি পান করাই। পুরুষদের ভিড়ে পান করাতে পারি না। আমাদের বাবা বৃদ্ধ মানুষ তাই তিনি আসতে পারেন না।
এ ঘটনা থেকে কয়েকটি শিক্ষান ১. দুর্বলদের সাহায্য করা নাবী-রাসূলদের স্ন্নুাত। ২. বেগানা নারীর সাথে প্রয়োজনে কথা বলায় দোষ নেই, যদি কোন ফেতনার আশঙ্কা না থাকে। ৩. প্রয়োজনে নারীরাও বাইরে যেতে পারে তবে অবশ্যই শালিনতা বজায় রাখতে হবে।
(ثُمَّ تَوَلّٰيٓ إِلَي الظِّلِّ)
অর্থাৎ মূসা (عليه السلام) অনাহারে ও ক্লান্ত হয়ে গাছের ছায়াতলে বিশ্রাম নিলেন এবং এক আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিজের দূরবস্থা ও অভাব পেশ করলেন। এটা দু‘আ করার অন্যতম একটি আদব, আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিজেকে অতি তুচ্ছ ও নগন্য করে তুলে ধরা।
(تَمْشِيْ عَلَي اسْتِحْيَا۬ءٍ)
অর্থাৎ কন্যাদ্বয় বাড়িতে ফিরে গিয়ে শু‘আইব (عليه السلام)-কে ঘটনা খুলে বললে তিনি মূসা (عليه السلام)-কে আমন্ত্রণ জানিয়ে মেয়েকে পাঠান যেন তাকে ডেকে নিয়ে আসে। মেয়েটি লজ্জাজড়িত পদক্ষেপে সেখানে পৌঁছল এবং পিতার আমন্ত্রণের কথা জানাল।
(إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِيْنُ)
অর্থাৎ শু‘আইব (عليه السلام)-এর এক কন্যা তার পিতাকে বলল: গৃহের কাজের জন্য আপনার একজন কর্মচারীর প্রয়োজন আছে, তাহলে তাকেই নিযুক্ত করে দিন। কারণ তার মাঝে আমরা দুটি গুণ লক্ষ্য করেছি। এক. সে শক্তিশালী, দুই. বিশ্বস্ত। আমরা পানি পান করাতে গিয়ে তার শক্তি এবং পথিমধ্যে আমাদেরকে পশ্চাতে রেখে পথচলা দ্বারা তার বিশ্বস্ততার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
(قَالَ إِنِّيْٓ أُرِيْدُ أَنْ أُنْكِحَكَ)
অর্থাৎ শু‘আইব (عليه السلام) নিজেই নিজের পক্ষ থেকে কন্যাকে মূসা (عليه السلام)-এর সাথে বিবাহ দানের প্রস্তাব করলেন। এ থেকে জানা যায়, উপযুক্ত পাত্র পেলে পাত্রীর অভিভাবকের উচিত পাত্রের প্রস্তাবের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই প্রস্তাব দেয়া। যেমন উমার (رضي الله عنه) নিজ কন্যা হাফসা বিধবা হলে আবূ বকর ও উসমান (رضي الله عنهما) এর কাছে প্রস্তাব দেন। (কুরতুবী)
(فَلَمَّا قَضٰي مُوْسَي الْأَجَلَ)
অর্থাৎ যখন মূসা (عليه السلام) নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ করলেন তখন পরিবার নিয়ে মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
মূসা (عليه السلام) আট বছর কাজ করেছেন নাকি দশ বছর কাজ করেছেন? ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন: অধিক মেয়াদকাল পূর্ণ করেছিলেন। নাবীরা যা বলেন তা পূর্ণ করেন।
এ সম্পর্কে পূর্বে সূরা ত্বা-হা-র ৯ নং আয়াত থেকে ৯৩ নং আয়াতসহ আরো একাধিক স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১। মিথ্যার পরাজয় অবশ্যই হবে, তা রক্ষা করার যতই কৌশল করা হোক না কেন।
২। আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা করেন তাই হয়, তাঁর ইচ্ছার কোন প্রতিরোধক নেই।
৩। মানুষ স্বভাবতই সন্তানের প্রতি দয়াপরায়ণ, বিশেষ করে যাদের সন্তান নেই তাদের আগ্রহ আরো বেশি।
৪। পুরুষ মহিলাদের পেছনে চলবে না, এতে পর্দা লংঘন হয়। বরং মহিলারা পুরুষের পেছনে পেছনে চলবে।
৫। কন্যার অভিভাবক কাউকে যোগ্য পাত্র মনে করলে সরাসরি প্রস্তাব দিতে পারবে।
৬। অহঙ্কার ও সীমালংঘন ধ্বংস ও পতনের মূল কারণ।
৭। আল্লাহ তা‘আলা উপরে আছেন, এ কথা ফির‘আউনও জানতো। যার ফলে হামানকে সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিল ওপরে উঠে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখবে বলে।
৮। কথা বলা আল্লাহ তা‘আলার একটি গুণ। আল্লাহ তা‘আলা কথা বলেন যেমন মূসা (عليه السلام)-এর সাথে কথা বলেছেন।
৯। প্রত্যেক নাবী-রাসূলগণ সমসমায়িক ক্ষমতাসীনদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেছেন।
১০। দীনের কাজে অপরের সহযোগিতা নেয়া ও সহযোগিতা দেয়া উভয়টাই কল্যাণকর।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২১-২৪ নং আয়াতের তাফসীর
এই লোকটির মাধ্যমে হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউন ও তার লোকদের ষড়যন্ত্রের কথা অবহিত হন তখন তিনি অতি সন্তর্পণে একাকী সেখান থেকে পালিয়ে যান। ইতিপূর্বে তিনি রাজপুত্রদের মত জীবন যাপন করেছিলেন বলে এই সফর তাঁর কাছে খুবই কঠিন বোধ হয়। কিন্তু ভয় ও ত্রাসের কারণে তিনি এদিক ওদিক দেখছিলেন এবং সোজা পাড়ি দিচ্ছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনি ফিরাউনের ও তার লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করুন।” বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ)-কে মিসরের পথ-প্রদর্শনের জন্যে আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন যিনি ঘোড়ায় চড়ে তাঁর নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে পথ-প্রদর্শন করেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
অল্পক্ষণ পরেই তিনি বন-জঙ্গল ও মরুভূমি অতিক্রম করে মাদইয়ানের পথে পৌঁছে যান। এতে তিনি খুবই খুশী হন এবং বলে ওঠেনঃ “আমি মহান আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তিনি আমাকে সঠিক পথে চালিত করবেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর এ আশাও পূরণ করেন এবং তাঁকে শুধু দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক পথ-প্রদর্শন করেই ক্ষান্ত হলেন না, বরং তাকে অন্যদের জন্যে সঠিক পথ-প্রদর্শকও বানালেন। মাদইয়ানের পার্শ্ববর্তী কূপের নিকট এসে তিনি দেখলেন যে, রাখালরা কুপ হতে পানি উঠিয়ে তাদের জন্তুগুলোকে পান করাচ্ছে। তিনি এটাও দেখতে পেলেন যে, দু’টি মহিলা তাদের বকরীগুলোকে ঐ জন্তুগুলোর সাথে পানি পান করানো হতে বিরত রয়েছে। তিনি যখন এ অবস্থা অবলোকন করলেন যে, মহিলাদ্বয় নিজেরাও তাদের বকরীগুলোকে পানি পান করাতে পারছে না এবং ঐ রাখালরাও তাদের জানোয়ারগুলোর সাথে ঐ বকরীগুলোকে পানি পান করানোর কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না তখন তার মনে করুণার উদ্রেক হলো। তাই তিনি মহিলা দুটিকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা তোমাদের এ বকরীগুলোকে পানি পান করানো হতে বিরত থাকছো কেন?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা বকরীগুলোকে পানি পান করাতে পারি না যতক্ষণ না রাখালরা তাদের জানোয়াগুলোকে নিয়ে সরে যায়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ।” তাদের একথা শুনে তিনি নিজেই পানি উঠিয়ে তাদের বকরীগুলোকে পান করালেন।
হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, রাখালরা একটি বিরাট পাথর দ্বারা ঐ কূপটির মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল যা দশজন লোক মিলে সরাতে পারতো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) একাকী ঐ পাথরটি সরিয়ে ফেলেন। তিনি মাত্র এক বালতি পানি উঠিয়েছিলেন যাতে মহান আল্লাহ বরকত দান করেছিলেন, ফলে ঐ মহিলাদ্বয়ের বকরীগুলো ঐ পানি পান করেই পরিতৃপ্ত হয়েছিল। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) ক্লান্ত শ্রান্ত এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি গাছের ছায়ার নীচে বসে পড়েন। মিসর হতে মাদইয়ান পর্যন্ত তিনি দৌড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। তাই তাঁর পায়ে ফোসকা উঠে গিয়েছিল। খাওয়ার কোন দ্রব্য তাঁর সাথে ছিল না। গাছের পাতা, ঘাস ইত্যাদি তিনি ভক্ষণ করে আসছিলেন। পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি আধখানা খেজুরেরও মুখাপেক্ষী ছিলেন। অথচ সেই সময় সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে তিনিই ছিলেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও মনোনীত বান্দা!
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “দুই দিনের সফর শেষে আমি মাদইয়ানে পৌঁছি। আমি জনগণকে ঐ গাছের পরিচয় জানতে চাই যে গাছের ছায়ায় হযরত মূসা (আঃ) আশ্রয় নিয়েছিলেন। জনগণ আমাকে গাছটি দেখিয়ে দেয়। আমি দেখি যে, ওটা একটি সবুজ-শ্যামল বৃক্ষ। আমার আরোহণের পশুটি ক্ষুধার্ত ছিল। তাই সে ঐ গাছের পাতা মুখ দ্বারা ছিড়ে নেয় এবং অতি কষ্টে চিবাতে থাকে। কিন্তু শেষে সে পাতা মুখ হতে বের করে ফেলে। দেয়। আমি হযরত কালীমুল্লাহ (আঃ)-এর দু'আ করে সেখান হতে ফিরে আসি।”
অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) ঐ গাছটি দেখতে গিয়েছিলেন যেখান থেকে আল্লাহ তা'আলা হযরত মুসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন। এর বর্ণনা সত্ত্বরই আসবে ইনশাআল্লাহ!
সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ওটা ছিল বাবলার গাছ। মোটকথা, হযরত মূসা (আঃ) ঐ গাছের ছায়ায় বসে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন আমি তার মুখাপেক্ষী।” হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, ঐ মহিলাটিও তাঁর এ প্রার্থনা শুনেছিল।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।