সূরা আন-নামাল (আয়াত: 82)
হরকত ছাড়া:
وإذا وقع القول عليهم أخرجنا لهم دابة من الأرض تكلمهم أن الناس كانوا بآياتنا لا يوقنون ﴿٨٢﴾
হরকত সহ:
وَ اِذَا وَقَعَ الْقَوْلُ عَلَیْهِمْ اَخْرَجْنَا لَهُمْ دَآبَّۃً مِّنَ الْاَرْضِ تُکَلِّمُهُمْ ۙ اَنَّ النَّاسَ کَانُوْا بِاٰیٰتِنَا لَا یُوْقِنُوْنَ ﴿۸۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইযা-ওয়াকা‘আল কাওলু‘আলাইহিম আখরাজনা-লাহুম দাব্বাতাম মিনাল আরদি তুকালিলমুহুম আন্নান্না-ছা কা-নূবিআ-য়া-তিনা-লা-ইঊকিনূন।
আল বায়ান: আর যখন তাদের উপর ‘বাণী’ (আযাব) বাস্তবায়িত হবে তখন আমি যমীনের জন্তু (দাব্বাতুল আরদ)* বের করব, যে তাদের সাথে কথা বলবে। কারণ মানুষ আমার আয়াতসমূহে সুদৃঢ় বিশ্বাস রাখত না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮২. আর যখন তাদের উপর ঘোষিত শাস্তি আসবে তখন আমরা তাদের জন্য যমীন থেকে এক জীব বের করব(১), যা তাদের সাথে কথা বলবে(২) যে, মানুষ আমাদের নিদর্শনসমূহে নিশ্চিত বিশ্বাস করত না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি যখন বাস্তবে পরিণত হবে, আমি তখন (কিয়ামাত আগমণের নির্দশন হিসেবে) ভূমি থেকে তাদের জন্য একটি জন্তু বের করব যা তাদের সঙ্গে এ কথা বলবে যে, মানুষ আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করত না।
আহসানুল বায়ান: (৮২) যখন ঘোষিত শাস্তি ওদের নিকট আসবে[1] তখন আমি ভূগর্ভ হতে এক (প্রকার) জন্তু নির্গত করব যা মানুষের সাথে কথা বলবে। [2] বস্তুতঃ ওরা আমার নিদর্শনে ছিল অবিশ্বাসী। [3]
মুজিবুর রহমান: যখন ঘোষিত শাস্তি তাদের উপর এসে যাবে তখন আমি মাটির গহবর হতে বের করব এক জীব, যা তাদের সাথে কথা বলবে; এ জন্য যে, মানুষ আমার নিদর্শনে অবিশ্বাসী।
ফযলুর রহমান: যখন তাদের বিরুদ্ধে (শাস্তির) ওয়াদা বাস্তবায়িত হবে (তাদের শাস্তির সময় হবে) তখন আমি তাদের জন্য ভূমি থেকে একটি প্রাণী বের করব, যে তাদের সাথে কথা বলবে; এজন্য যে, মানুষ আমার নিদর্শনসমূহ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত না।
মুহিউদ্দিন খান: যখন প্রতিশ্রুতি (কেয়ামত) সমাগত হবে, তখন আমি তাদের সামনে ভূগর্ভ থেকে একটি জীব নির্গত করব। সে মানুষের সাথে কথা বলবে। এ কারণে যে মানুষ আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করত না।
জহুরুল হক: আর যখন তাদের উপরে উক্তিটি বর্তাবে তখন তাদের জন্য আমরা বের ক’রে আনব মাটির কীট যেটি তাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করবে, কেননা মানুষগুলো আমাদের নির্দেশাবলীতে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে নি।
Sahih International: And when the word befalls them, We will bring forth for them a creature from the earth speaking to them, [saying] that the people were, of Our verses, not certain [in faith].
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮২. আর যখন তাদের উপর ঘোষিত শাস্তি আসবে তখন আমরা তাদের জন্য যমীন থেকে এক জীব বের করব(১), যা তাদের সাথে কথা বলবে(২) যে, মানুষ আমাদের নিদর্শনসমূহে নিশ্চিত বিশ্বাস করত না।
তাফসীর:
(১) ‘যমীন থেকে এক জীব বের করব’ যা কিয়ামতের আলামত। কিয়ামতের পূর্বে আল্লাহ তা’আলা তাঁর নিদর্শনবাহী বেশ কিছু অলৌকিক কর্মকাণ্ড হতে দেবেন, এটা সেগুলোর অন্যতম। কিয়ামতের দশটি বড় বড় নিদর্শন সম্পর্কে হুযাইফা ইবনে আসীদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেনঃ “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের প্রতি দৃষ্টি দিলেন, আমরা পরস্পর আলোচনা করছিলাম, তিনি বললেনঃ তোমরা কি আলোচনা করছিলে? আমরা বললামঃ আমরা কিয়ামতের কথা আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেনঃ যতক্ষণ পর্যন্ত দশটি বৃহৎ আলামত বা নিদর্শন না দেখবে ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। তারপর তিনি ধোঁয়া, দাজ্জাল, বিশেষ ধরনের প্রাণীর আবির্ভাব, পশ্চিমে সূর্য উদিত হওয়া, ঈসা ইবনে মারইয়াম এর অবতরণ, ইয়াজুজ ও মাজুজ, তিনটি ভূমি ধস যার একটি প্রাচ্যে, আরেকটি প্রাশ্চাত্যে, অন্যটি আরব উপদ্বীপে হবে, আর এ আলামতগুলোর সবশেষে ইয়ামেন থেকে একটি আগুন বের হবে যা মানুষকে তাদের একত্রিত হওয়ার স্থানের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে”। [মুসলিমঃ ২৯০১]
কোন কোন হাদীসে মাহদী, কাবার ধ্বংস ও যমীন থেকে কুরআন উঠে যাওয়ার কথা এসেছে। সে যাই হোক, সবার মতেই দাব্বাতুল আরদ হলো কিয়ামতের বড় আলামতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত। কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত যে, কিয়ামতের পূর্বে তার আবির্ভাব হবে, যেমন আলোচ্য আয়াত তার প্রমাণ। তাছাড়া হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “তিনটি বস্তু যখন বের হবে তখন কোন আত্মার ঈমান গ্ৰহণ করা তার কোন উপকারে আসবে না। যদি তারা আগে ঈমান না এনে থাকে বা তারা ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণকর কিছু অর্জন না করে থাকে। পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদয় হওয়া, দাজ্জাল এবং দাব্বাতুল আরাদ বা যমীন থেকে উত্থিত জীব” [মুসলিমঃ ১৫৮]। অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেনঃ “দাব্বাহ বের হয়ে মানুষের নাকের উপর দাগ দিয়ে দিবে, তারপর তোমাদের মধ্যে বিচরণ করবে, এমনকি কোন লোক উট খরিদ করার পর কেউ জিজ্ঞাসা করবে কার থেকে খরিদ করেছ? বলবেঃ একজন নাকের উপর দাগ বিশিষ্ট লোক থেকে।” [মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২৬৮]। সুতরাং আমাদেরকে এটার উপর ঈমান আনতে হবে।
(২) ভূগর্ভের জীব মানুষের সাথে কথা বলবে, এর অর্থ কি? কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ কুরআনে উল্লেখিত বাক্যটিই হবে তার কথা। অর্থাৎ (أَنَّ النَّاسَ كَانُوا بِآيَاتِنَا لَا يُوقِنُونَ) বা “মানুষ আমাদের নিদর্শনসমূহে নিশ্চিত বিশ্বাস করত না।” এ বাক্যটি সে আল্লাহর পক্ষ থেকে শোনাবে। বাক্যের অর্থ এইঃ অনেক মানুষ আজকের পূর্বে আমাদের আয়াতসমূহে বিশ্বাস করবে না। উদ্দেশ্য এই যে, এখন সময় এসে গেছে। এখন সবাই বিশ্বাস করবে। কিন্তু তখনকার বিশ্বাস আইনতঃ ধর্তব্য হবে না। যদিও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে যে, অদ্ভুত সে জন্তুটি শুধু কথাই বলবে না বরং দাগও দিবে। অর্থাৎ ঈমানদার ও কাফেরদেরকে দাগ দিয়ে পৃথক করে দিবে। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮২) যখন ঘোষিত শাস্তি ওদের নিকট আসবে[1] তখন আমি ভূগর্ভ হতে এক (প্রকার) জন্তু নির্গত করব যা মানুষের সাথে কথা বলবে। [2] বস্তুতঃ ওরা আমার নিদর্শনে ছিল অবিশ্বাসী। [3]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যখন সৎকর্মের আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধ করার মত কেউ থাকবে না।
[2] এই জন্তু হল তাই, যা কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি নিদর্শন। যেমন হাদীসে এসেছে নবী (সাঃ) বলেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দশটি নিদর্শন তোমরা না দেখবে। তার মধ্যে একটি হল উক্ত জন্তুর আবির্ভাব। (মুসলিম ফিতনা অধ্যায়) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে সর্বপ্রথম নিদর্শন যা প্রকাশ পাবে, তা হল সূর্যের পশ্চিম দিক হতে উদিত হওয়া এবং তার পর উক্ত জীবের আবির্ভাব হওয়া। এই দুয়ের মধ্যে যেটি প্রথম প্রকাশ পাবে তার পরপরই দ্বিতীয়টিও প্রকাশিত হবে। (মুসলিম, দাজ্জাল বের হওয়ার অধ্যায়)
[3] এটি উক্ত জন্তুর বের হওয়ার কারণ। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাঁর এই নিদর্শন এই কারণে দেখাবেন, যেহেতু মানুষ আল্লাহর নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে না। কেউ কেউ বলেন, উক্ত বাক্য জন্তুটি নিজ মুখে বলবে। পক্ষান্তরে উক্ত জন্তুর মানুষের সাথে কথা বলার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কারণ কুরআন তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮২ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতে কিয়ামতের পূর্বে কিয়ামতের নির্দশন হিসেবে একটি জন্তু ভূগর্ভ হতে বের হবে সে কথাই বলা হচ্ছে যে, যখন আল্লাহ তা‘আলার কথা অনুপাতে শাস্তি এসে পড়বে ঠিক তখনই আল্লাহ তা‘আলা ভূগর্ভ হতে একটি প্রাণী নির্গত করবেন যা মানুষের সাথে কথা বলবে। যেমন হাদীসে এসেছে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা দশটি নিদর্শন দেখতে পাও। তা হল প্রথম, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে, জন্তু (যা মানুষের সাথে কথা বলবে) এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দশটি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেন। (তিরমিযী হা: ২১৮৩, সহীহ)
সাহাবী আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ছয়টি আলামত প্রকাশ হওয়ার পূর্বেই তাড়াতাড়ি আমল কর। সেগুলো হচ্ছে- পশ্চিমাকাশে সূর্যোদয়, ধোঁয়া, দাজ্জাল, ভূ-প্রাণী, তোমাদের কারো মৃত্যু অথবা কিয়ামত। (সহীহ মুসলিম হা: ৩২৮)
হাদীস থেকে বুঝা যাচ্ছেন কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ভূগর্ভ থেকে একটি জন্তু নির্গত হবে যা মানুষের সাথে কথা বলবে। আরো বুঝা যাচ্ছেন এ জীবটি সাধারণ জন্তুর মত প্রজনন প্রক্রিয়ায় হবে না বরং অকস্মাৎ জমিন ফুড়ে বের হবে।
ইমাম ইবনু কাসীর (رحمه الله) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন:
এখানে ভূ-প্রাণী আবির্ভাবের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা তখনই হবে যখন মানুষ ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করবে, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশাবলী বর্জন করবে এবং সত্য দীনকে বিকৃত করে ফেলবে। এমন সময় আল্লাহ তা‘আলা জমিন থেকে অলৌকিক প্রাণী বের করবেন এবং মানুষ তার সাথে কথা বলবে। (তাফসীর ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: ঘোষিত শাস্তি হবে আলেমদের মৃত্যবরণ করার মাধ্যমে, ইলম চলে যাওয়ার মাধ্যমে এবং কুরআন তুলে নেয়ার মাধ্যমে। তারপর তিনি বলেন: কুরআন তুলে নেয়ার পূর্বে বেশি বেশি তেলাওয়াত কর। শ্রোতাগণ বললেন: কুরআনের এসব পাণ্ডুলিপি তুলে নেয়া সম্ভব কিন্তু, মানুষের অন্তরে যা মুখস্ত রক্ষিত আছে তা কিভাবে তুলে নেয়া হবে। তিনি বললেন: একদা একটি রাত্রি অতিবাহিত করার পর যখন তারা সকালে উপনীত হবে তখন তাদের অন্তর কুরআন শূণ্য হয়ে যাবে। এমনকি তারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পড়াও ভুলে যাবে। তখন তারা জাহিলী যুগের কবিতা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আর তখনই তাদের ওপর ঘোষিত শাস্তি এসে যাবে। (তাফসীর কুরতুবী ১৩/২৩২)
ভূ-প্রাণীটির ধরন নির্ধারণে আলেমদের মাঝে মতামত পরিলক্ষিত হয়। ইমাম কুরতুবী বলেন: তার একটি মত হল, প্রাণীটি সালেহ (عليه السلام)-এর উটের বাচ্চা। এ মতটিই অধিক সঠিক, এ মতের স্বপক্ষে তিনি প্রমাণ নিয়ে এসেছেন যা আবূ দাউদ আত তায়ালিসী হুযাইফা ইবনে উসাইদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। (তাফসীর কুরতুবী ১৩/২৩৫, মুসতাদরাক হাকেম ৪/৪৮৪, দুর্বল)
আব্দুল্লাহ বিন আমর (رضي الله عنه) বলেন: উক্ত প্রাণীটি হচ্ছে তামীম আদ দারী থেকে বর্ণিত দাজ্জালের ঘটনা সম্বলিত হাদীসে উল্লিখিত সংবাদবাহী প্রাণী। আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
পশুটির বের হওয়ার স্থান:
পশুটির বের হওয়ার স্থান নিয়ে আলিমদের মাঝে কিছু মতামত পরিলক্ষিত হয়। কেউ বলেছেন: পশুটি মক্কার বৃহৎ মসজিদ থেকে বের হবে।
আবার বলা হয় পশুটি তিনবার বের হবে। একবার কোন এক মরু এলাকায় বের হয়ে আবার লুকিয়ে যাবে। অতঃপর কোন এক জনবসতিতে বের হবে। সর্বশেষ মসজিদে হারামে বের হবে।
এ ছাড়াও আরো উক্তি রয়েছে, তবে অধিকাংশ উক্তিগুলোই প্রমাণ করে তা মক্কা মুকাররামা থেকে বের হবে। (আত তাযকিরাহ পৃ: ৬৯৭-৬৯৮, ইশাআহ পৃ: ১৭৬-১৭৭)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কিয়ামতের পূর্বে একটি বিশেষ জন্তু মানুষের সাথে কথা বলবে।
২. কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: যে জীবের বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে তা শেষ যুগে প্রকাশিত হবে যখন মানুষ আল্লাহর দ্বীনকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবে। যখন তারা সত্য দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলবে। কেউ কেউ বলেন যে, এটা মক্কা শরীফ হতে বের হবে। আবার অন্য কেউ বলেন যে, এটা অন্য স্থান হতে বের হবে। এর বিস্তারিত বিবরণ এখনই আসবে ইনশাআল্লাহ্। সে বাকশক্তি সম্পন্ন হবে এবং বলবে যে, মানুষ আল্লাহর নিদর্শনসমূহে অবিশ্বাসী। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। কিন্তু এই উক্তি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত ইবনে। আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, এটা তাদেরকে আহত করবে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, উভয়েই এটা করবে, অর্থাৎ এও করবে এবং এও করবে। এটা খুবই চমৎকার উক্তি। এই উক্তি দু'টির মধ্যে কোনই বৈপরীত্য নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
‘দাব্বাতুল আর’ সম্বন্ধে যেসব হাদীস ও আসার বর্ণিত আছে, এগুলোর কিছু কিছু আমরা এখানে বর্ণনা করছি। এ ব্যাপারে আমরা আল্লাহ তাআলার নিকটই সাহায্য প্রার্থী।
হযরত হুযাইফা ইবনে উসায়েদ গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা আমরা কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরাফা হতে আমাদের নিকট আগমন করেন। আমাদেরকে এই আলোচনায় লিপ্ত দেখে বলেনঃ “কিয়ামত ঐ পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত তোমরা দশটি নিদর্শন দেখতে পাবে। ওগুলো হলো- পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া, ধূম্র, দাব্বাতুল আর ও ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়া। হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর আগমন ঘটা, দাজ্জাল বের হওয়া, পূর্বে, পশ্চিমে ও আরব উপদ্বীপে তিনটি খাসফ (মাটিতে প্রোথিত হওন) হওয়া এবং আদন হতে এক আগুন বের হওয়া যা লোকদেরকে চালনা করবে বা তাদেরকে একত্রিত করবে। তাদের সাথেই রাত্রি কাটাবে এবং তাদের সাথেই দুপুরে বিশ্রাম করবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)
হযরত তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দাব্বাতুল আরযের উল্লেখ করে বলেনঃ “দাব্বাতুল আর তিনবার বের হবে। প্রথমবার বের হবে দূর-দূরান্তের জঙ্গল ও মরুপ্রান্তর হতে এবং ওর যিকর শহর অর্থাৎ মক্কায় প্রবেশ করবে। তারপর এক দীর্ঘ যুগ পরে দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হবে এবং জনগণের মুখে এই কাহিনী কথিত হতে থাকবে, এমনকি মক্কায়ও এর প্রসিদ্ধি পৌছে যাবে। তারপর যখন জনগণ আল্লাহর সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন মসজিদ মসজিদে হারাম'-এ অবস্থান করবে ঐ সময় হঠাৎ সেখানে তারা দাব্বাতুল আর দেখতে পাবে। রু ও মাকাম (মাকামে ইবরাহীম আঃ)-এর মাঝে নিজের মস্তক হতে মাটি ঝাড়তে থাকবে। লোকেরা ওকে দেখে এদিক ওদিক হয়ে যাবে। এটা মুমিনদের দলের নিকট যাবে এবং তাদের মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল তারকার ন্যায় জ্যোতির্ময় করে তুলবে। না তার থেকে পলায়ন করে কেউ বাঁচতে পারে, না তার থেকে লুকিয়ে গিয়ে রক্ষা পেতে পারে। এমনকি একটি লোক নামায শুরু করে তার নিকট আশ্রয় চাবে। সে তখন তার পিছনে এসে বলবেঃ “এখন তুমি নামাযে দাড়িয়েছো?” অতঃপর তার কপালে চিহ্ন এঁকে দিয়ে সে চলে যাবে। তার এই চিহ্নের পরে মুমিন ও কাফিরের মধ্যে পরিষ্কারভাবে পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে। এমনকি মুমিন কাফিরকে বলবেঃ “হে কাফির! আমাকে আমার প্রাপ্য প্রদান কর।” আর কাফির মুমিনকে বলবেঃ “হে মুমিন! আমাকে আমার প্রাপ্য দিয়ে দাও।” (এ হাদীসটি আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা হুযাইফা ইবনে উসায়েদ (রাঃ) হতেও মাওকুফ রূপে বর্ণিত আছে)
একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এটা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর যুগে হবে। তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করতে থাকবেন। কিন্তু এর ইসনাদ সঠিক নয়। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, সর্বপ্রথম যে নিদর্শন প্রকাশ পাবে তা হলো সূর্যের পশ্চিম দিক হতে উদিত হওয়া এবং দাব্বাতুল আরযের চাশতের সময় এসে পড়া। এ দুটোর মধ্যে যেটা প্রথমে হবে, তার পরপরই দ্বিতীয়টি হবে।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন: “ছ’টি জিনিসের আগমনের পূর্বেই তোমরা সৎ কাজ করে নাও। ওগুলো হলো- সূর্যের পশ্চিম দিক হতে উদিত হওয়া, ধূম্র নির্গত হওয়া, দাজ্জালের আগমন ঘটা, দাব্বাতুল আর আসা এবং তোমাদের প্রত্যেকের বিশেষ ও সাধারণ বিষয়।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)
এ হাদীসটি অন্য সনদে অন্যান্য কিতাবগুলোতেও বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দাব্বাতুল আর বের হবে এবং তার সাথে থাকবে হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ও হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর আংটি। লাঠি দ্বারা কাফিরের নাকের উপর মোহর লাগানো হবে এবং আংটি দ্বারা মুমিনের চেহারা উজ্জ্বল করা হবে। এমনকি জনগণ দস্তরখানার উপর একত্রিত হয়ে মুমিন ও কাফিরকে পৃথকভাবে চেনে নেবে।” (এ হাদীসটি আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) স্বীয় কিতাবে বর্ণনা করেছেন)
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, কাফিরদের নাকের উপর আংটি দ্বারা মোহর করে দেয়া হবে এবং মুমিনদের চেহারা লাঠির ঔজ্জ্বল্যে উজ্জ্বল হয়ে যাবে।
হযরত বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সঙ্গে নিয়ে মক্কার পার্শ্ববর্তী একটি জঙ্গলে প্রবেশ করেন। আমি দেখি যে, একটি শুষ্ক ভূমি রয়েছে, যার চতুর্দিকে রয়েছে বালুকারাশি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এখান থেকে দাব্বাতুল আর বের হবে।” এই ঘটনার কয়েক বছর পর আমি হজ্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। তখন আমাকে তার লাঠি দেখানো হয় যা আমার এই লাঠির মত। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ্ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার চারটি পা হবে। সে সাফার গিরিপথ হতে বের হবে। সে এতো দ্রুত গতিতে চলবে যে, যেন ওটা কোন দ্রুতগামী ঘোড়া। কিন্তু তবুও তিন দিনে তার দেহের এক তৃতীয়াংশও বের হবে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “জিয়াদে এক কংকরময় ভূমি আছে। সেখান থেকে এই দাব্বাতুল আর বের হবে। আমি যদি সেখানে থাকতাম তবে তোমাদেরকে ঐ কংকরময় ভূমি দেখিয়ে দিতাম। এটা সোজা পূর্ব দিকে যাবে এবং এতো জোরে চলবে যে, চতুর্দিকে ওর শব্দ পৌছে যাবে। সেখানে চীৎকার করে আবার ইয়ামনের দিকে যাবে। এখানেও শব্দ করে সন্ধ্যার সময় মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করে সকালে আসফান পৌছে যাবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করলোঃ “এরপর কি হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এরপর কি হবে তা আমার জানা নেই।”
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, দাব্বাতুল আর মুযদালাফার রাত্রে (১০ই যিলহজ্ব দিবাগত রাত্রে) বের হবে।
হযরত উযায়ের (আঃ)-এর কালাম হতে বর্ণিত আছে যে, দাব্বাতুল আর সুদূমের নীচে হতে বের হবে। তার কথা সবাই শুনবে, গর্ভবতী মহিলার গর্ভপাত হয়ে যাবে সময়ের পূর্বেই, সুস্বাদু পানি বিস্বাদ হয়ে যাবে, বন্ধু শত্রুতে পরিণত হবে, হিকমত জ্বলে যাবে, ইলম উঠে যাবে, নীচের যমীন কথা বলবে, মানুষ এমন আশা পোষণ করবে যা কখনো পুরো হবে না, তারা এমন জিনিসের জন্যে চেষ্টা করবে যা কখননা লাভ করতে পারবে না এবং তারা এমন কিছুর জন্যে কাজ করবে যা খাবে না।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “দাব্বাতুল আরযের দেহের উপর সর্বপ্রকারের রঙ থাকবে এবং তার দুই শিং এর মাঝে সওয়ার বা আরোহীর জন্যে এক ফারসীকের পথ হবে।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা মোটা বর্শার মত হবে। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, ওর লোম থাকবে; ক্ষুর থাকবে, দাড়ী থাকবে এবং লেজ থাকবে না। সে দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে চলবে তবুও তিন দিনে তার দেহের মাত্র এক তৃতীয়াংশ বের হবে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, তার মাথা হবে বলদের মাথার মত, চোখ হবে শূকরের চোখের মত, কান হবে হাতীর কানের মত এবং শিং-এর জায়গাটি উটের মত হবে। তার ঘাড় হবে উটপাখীর মত, বক্ষ হবে সিংহের মত, রঙ হবে চিতা বাঘের মত, ক্ষুর হবে বিড়ালের মত, লেজ হবে ভেড়ার মত এবং পা হবে উটের মত। প্রত্যেক দুই জোড়ের মাঝে বার গজের ব্যবধান থাকবে। তার সাথে হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি ও হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর আংটি থাকবে। সে হযরত মূসা (আঃ)-এর ঐ লাঠি দ্বারা প্রত্যেক মুমিনের কপালে চিহ্ন দিয়ে দেবে, যা ছড়িয়ে পড়বে এবং তার চেহারা জ্যোতির্ময় হয়ে যাবে। আর প্রত্যেক কাফিরের চেহারার উপর হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর আংটি দ্বারা চিহ্ন দিয়ে দেবে যা ছড়িয়ে পড়বে এবং তার সারা চেহারা কালো হয়ে যাবে। এইভাবে মুমিন ও কাফিরকে পৃথক করা যাবে। ক্রয়-বিক্রয়ের সময় এবং খাদ্য খাওয়ার সময় মানুষ একে অপরকে “হে মুমিন!' এবং ‘হে কাফির!' এই বলে সম্বোধন করবে। দাব্বাতুল আর এক এক করে নাম ডেকে ডেকে তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ অথবা জাহান্নামের দুঃসংবাদ শুনিয়ে দেবে। এই আয়াতের ভাবার্থ এটাই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।