আল কুরআন


সূরা আন-নামাল (আয়াত: 46)

সূরা আন-নামাল (আয়াত: 46)



হরকত ছাড়া:

قال يا قوم لم تستعجلون بالسيئة قبل الحسنة لولا تستغفرون الله لعلكم ترحمون ﴿٤٦﴾




হরকত সহ:

قَالَ یٰقَوْمِ لِمَ تَسْتَعْجِلُوْنَ بِالسَّیِّئَۃِ قَبْلَ الْحَسَنَۃِ ۚ لَوْ لَا تَسْتَغْفِرُوْنَ اللّٰهَ لَعَلَّکُمْ تُرْحَمُوْنَ ﴿۴۶﴾




উচ্চারণ: কা-লা ইয়া-কাওমি লিমা তাছতা‘জিলূনা বিছছাইয়িআতি কাবলাল হাছানাতি লাওলাতাছতাগফিরূনাল্লা-হা লা‘আল্লাকুম তুরহামূন।




আল বায়ান: সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা কল্যাণের পূর্বে কেন অকল্যাণকে তরান্বিত করতে চাইছ? কেন তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ না যেন তোমাদেরকে রহমত করা হয়’?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৬. তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন কল্যাণের আগে অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ?(১) কেন তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ না, যাতে তোমরা রহমত পেতে পার?




তাইসীরুল ক্বুরআন: সালিহ্ বলল- ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কল্যাণের পূর্বে দ্রুত অকল্যাণ কামনা করছ কেন? তোমরা কেন আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর না যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও?’




আহসানুল বায়ান: (৪৬) সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ?[1] কেন তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছ না; যাতে তোমরা করুণার পাত্র হতে পার?’



মুজিবুর রহমান: সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন কল্যাণের পূর্বে অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ? কেন তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছনা, যাতে তোমরা অনুগ্রহ ভাজন হতে পার?



ফযলুর রহমান: ছালেহ বলল, “হে আমার সমপ্রদায়! তোমরা কল্যাণের (আল্লাহর অনুগ্রহের) আগে দ্রুত অকল্যাণ (শাস্তি) চাচ্ছ কেন? কেন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছ না, যাতে তোমরা অনুগ্রহ পেতে পার?”



মুহিউদ্দিন খান: সালেহ বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা কল্যাণের পূর্বে দ্রুত অকল্যাণ কামনা করছ কেন? তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ না কেন? সম্ভবতঃ তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে।



জহুরুল হক: তিনি বললেন -- "হে আমার স্বজাতি, তোমরা কেন মন্দকে ত্বরান্বিত করতে চাইছ ভালর আগে? কেন তোমরা আল্লাহর পরিত্রাণ খোঁজো না যাতে তোমাদের করুণা করা হয়?"



Sahih International: He said, "O my people, why are you impatient for evil instead of good? Why do you not seek forgiveness of Allah that you may receive mercy?"



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৬. তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন কল্যাণের আগে অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ?(১) কেন তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ না, যাতে তোমরা রহমত পেতে পার?


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়ার পরিবর্তে অকল্যাণ চাওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করছো কেন? অন্য জায়গায় সালেহের জাতির সরদারদের এ উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছেঃ “হে সালেহ! আনো সেই আযাব আমাদের উপর, যার হুমকি তুমি আমাদের দিয়ে থাকে, যদি সত্যি তুমি রসূল হয়ে থাকো।” [সূরা আল-আরাফঃ ৭৭]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৬) সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ?[1] কেন তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছ না; যাতে তোমরা করুণার পাত্র হতে পার?”


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, ঈমান আনার পরিবর্তে তোমরা কেন কুফরীর উপর চলতে চাচ্ছ; যা আযাবের কারণ হবে? এ ছাড়া তাদের অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যের কারণে তারা বলত, আমাদের উপর আযাব নিয়ে এসো। যার উত্তরে সালেহ এ কথাগুলি বললেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৫-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে আল্লাহ তা‘আলা সালেহ (عليه السلام) ও তাঁর সামূদ জাতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আ‘দ জাতির ধ্বংসের প্রায় ৫০০ বছর পরে সালেহ (عليه السلام) সামূদ জাতির প্রতি নাবী হিসেবে প্রেরিত হন। (তারীখুল আম্বিয়া ১/৪৯) আ‘দ ও সামূদ জাতি একই দাদা ‘ইরাম’ এর দুটি বংশধারার নাম। সামূদ জাতি আরবের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় বসবাস করত। তাদের প্রধান শহরের নাম ছিল ‘হিজর’ যা সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে একে সাধারণভাবে ‘মাদায়েনে সালেহ’ বলা হয়। আ‘দ জাতির ধ্বংসের পর সামূদ জাতি তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়।



(فَاِذَا ھُمْ فَرِیْقٰنِ)



অর্থাৎ সালেহ (عليه السلام) তাওহীদের দাওয়াত দেয়া শুরু করলে জাতির লোকেরা দু’দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল ঈমান আনে, তবে এরা ছিল সমাজের দুর্বল ও সাধারণ মানুষ। সাধারণত নাবীদের অনুসারী এমনই হয়ে থাকে যেমন হিরাকলের হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৭)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قَالَ الْمَلَاُ الَّذِیْنَ اسْتَکْبَرُوْا مِنْ قَوْمِھ۪ لِلَّذِیْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِمَنْ اٰمَنَ مِنْھُمْ اَتَعْلَمُوْنَ اَنَّ صٰلِحًا مُّرْسَلٌ مِّنْ رَّبِّھ۪ﺚ قَالُوْٓا اِنَّا بِمَآ اُرْسِلَ بِھ۪ مُؤْمِنُوْنَﮚقَالَ الَّذِیْنَ اسْتَکْبَرُوْٓا اِنَّا بِالَّذِیْٓ اٰمَنْتُمْ بِھ۪ کٰفِرُوْنَ)



“তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা সে সম্প্রদায়ের ঈমানদার যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে বলল: ‘তোমরা কি জান যে, সালেহ ‘আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রেরিত?’ তারা বলল: ‘তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী।’ তখন অহংকারীরা বললো তোমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা অবিশ্বাস করি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৭৫-৭৬)



সামূদ জাতির নিকট সালেহ (عليه السلام)-এর দাওয়াত:



পথভোলা এ জাতিকে অন্যান্য নাবীদের মত সালেহ (عليه السلام) প্রথমেই তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাদেরকে পূর্তিপূজাসহ যাবতীয় শির্ক ও কুসংস্কার ত্যাগ করে আল্লাহকে ভয়, এক আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর প্রেরিত রাসূলের আনুগত্য করার প্রতি আহবান জানান। যেমন সূরা আ‘রাফের ৭৩ ও সূরা হূদের ৬১ নং আয়াতে বলা হয়েছে। তাওহীদের এ দাওয়াতের সাথে সাথে তাদের ওপর আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ বলেন: ‘আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ ও পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করেছ। সুতরাং তোমরা ‘আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর।’ অন্যান্য নাবীদের মত এ কথাও বললেন, আমি এ কাজের জন্য তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চাই না।



সালেহ (عليه السلام)-এর দাওয়াতের ফলশ্রতি:



সালেহ (عليه السلام) তাওহীদের দাওয়াত দেয়া শুরু করলে লোকেরা তাঁকে বলল:



(یٰصٰلِحُ قَدْ کُنْتَ فِیْنَا مَرْجُوًّا قَبْلَ ھٰذَآ اَتَنْھٰٿنَآ اَنْ نَّعْبُدَ مَا یَعْبُدُ اٰبَا۬ؤُنَا وَاِنَّنَا لَفِیْ شَکٍّ مِّمَّا تَدْعُوْنَآ اِلَیْھِ مُرِیْبٍ)



‘হে সালেহ্! এর পূর্বে তুমি ছিলে আমাদের আশা ভরসার পাত্র। তুমি কি আমাদেরকে নিষেধ করছ ‘ইবাদত করতে তাদের, যাদের ‘ইবাদত করত আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা? আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তি‎কর সন্দেহে রয়েছি সে বিষয়ে, যার প্রতি তুমি আমাদেরকে আহ্বান করছ।’ (সূরা হূদ ১১:৬২) এমনকি তারা উদ্ধত্য প্রকাশ করে আরো বলল,



(اَبَشَرًا مِّنَّا وَاحِدًا نَّتَّبِعُھ۫ٓﺫ اِنَّآ اِذًا لَّفِیْ ضَلٰلٍ وَّسُعُرٍﭧءَاُلْقِیَ الذِّکْرُ عَلَیْھِ مِنْۭ بَیْنِنَا بَلْ ھُوَ کَذَّابٌ اَشِرٌ)



“আমরা কি আমাদেরই এক ব্যক্তির অনুসরণ করব? তবে তো আমরা বিপথগামী এবং বিবেকহীনরূপে গণ্য হব। আমাদের মধ্যে কি তারই প্রতি ওয়াহী করা হয়েছে? বরং সে তো একজন মিথ্যাবাদী, দাম্ভিক।” (সূরা কামার ৫৪:২৪-২৫) তারা আরো বলল: ‘তোমাকে ও তোমার সঙ্গে যারা আছে তাদেরকে আমরা অমঙ্গলের কারণ মনে করি।’ (সূরা নামল ২৭:৪৭)



এভাবে সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি সালেহ (عليه السلام)-কে অমান্য করল এবং মূর্তিপূজাসহ শির্ক ও আল্লাহদ্রোহী কাজে লিপ্ত রইল। আল্লাহ তা‘আলার ভাষায়,



(وَاَمَّا ثَمُوْدُ فَھَدَیْنٰھُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمٰی عَلَی الْھُدٰی فَاَخَذَتْھُمْ صٰعِقَةُ الْعَذَابِ الْھُوْنِ بِمَا کَانُوْا یَکْسِبُوْنَ)



“আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, আমি তাদেরকে পথ নির্দেশ করেছিলাম; কিন্তু তারা সৎপথের পরিবর্তে অন্ধত্ব (ভ্রান্ত পথ) অবলম্বন করেছিল। অতঃপর তাদের কৃতকর্মের পরিণামস্বরূপ লাঞ্ছনাদায়ক বজ্র শাস্তি আঘাত হানল।” (সূরা ফুসসিলাত ৪১:১৭)



সামূদ জাতির ওপর আপতিত গযবের বিবরণ:



জাতির অবাধ্য লোকেরা সালেহ (عليه السلام)-এর কাছে দাবী করল, আপনি যদি সত্যি নাবী হন তাহলে পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের করে এনে দেখান। সালেহ (عليه السلام) তাদের দাবী শুনে অঙ্গীকার নিলেন যে, তোমাদের দাবী পূরণ করা হলে তোমরা ঈমান আনবে। তবে দাবী পূরণ করার পরেও ঈমান না আনলে আল্লাহ তা‘আলার গযবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। এতে সবাই স্বীকৃতি দিল এবং সে মর্মে অঙ্গীকার করল। তখন সালেহ (عليه السلام) দু‘আ করলে আল্লাহ তার দু‘আ কবূল করে নিলেন এবং বললেন:



( اِنَّا مُرْسِلُوا النَّاقَةِ فِتْنَةً لَّھُمْ فَارْتَقِبْھُمْ وَاصْطَبِرْ)



“নিশ্চয়ই আমি তাদের পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি এক উষ্ট্রী; অতএব তুমি (হে সালেহ!) তাদের আচরণ লক্ষ্য কর এবং ধৈর্যশীল হও।” (সূরা কামার ৫৪:২৭) উক্ত উষ্ট্রীর জন্য পানি পান করার নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করা ছিল আর বলে দেয়া ছিল সেদিন যেন কেউ পানি সংগ্রহ না করে। (সূরা কামার ৫৪:২৮)



সামূদ জাতির লোকেরা যে কূপ থেকে পানি পান করত ও তাদের গবাদি পশুদের পানি পান করাত, এ উষ্ট্রীও সেই কূপ থেকে পানি পান করত। যেদিন উষ্ট্রী পানি পান করত সেদিন পানি শেষ হয়ে যেত। অবশ্য সেদিন লোকেরা উষ্ট্রীর দুধ পান করত এবং বাকী দুধ দ্বারা তাদের সব পাত্র ভরে নিত। কিন্তু এ হতভাগাদের কপালে এত সুখ সহ্য হল না। তারা উষ্ট্রীকে হত্যা করার নীলনকশা তৈরি করল। আল্লাহ তা‘আলার গযবের পরওয়া করল না, অবশেষে শয়তান তাদেরকে সর্ববৃহৎ কুমন্ত্রণা দিলো। আর তা হল নারীর প্রলোভন। সামূদ গোত্রের দুজন পরমা সুন্দরী মহিলা, যারা সালেহ (عليه السلام)-এর প্রতি চরম বিদ্বেষী ছিল তারা তাদের রূপ-যৌবন দেখিয়ে দুজন যুবককে উষ্ট্রী হত্যায় রাযী করাল। অতঃপর তারা তীর ও তরবারির আঘাতে উষ্ট্রীকে পা কেটে হত্যা করে ফেলল। হত্যাকারী যুবকদ্বয়ের প্রধানকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ বলেন:



(اِذِ انْۭبَعَثَ اَشْقٰٿھَا)



“যখন তাদের সর্বাধিক হতভাগ্য ব্যক্তি তৎপর হয়ে উঠেছিল।” (সূরা শামস ৯১:১২) কেননা তার কারণেই গোটা সামূদ জাতি গযবে পতিত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘‘অতঃপর তারা তাদের এক সঙ্গীকে আহ্বান করল, সে ওটাকে (উষ্ট্রীকে) ধরে হত্যা করল। কি কঠোর ছিল আমার আযাব ও সতর্কবাণী! আমি তাদের উপর পাঠিয়েছি এক বিকট আওয়াজ; ফলে তারা হয়ে গেল খোয়াড় মালিকদের বিখন্ডিত ভূষির ন্যায়।“ (সূরা কামার ৫৪: ২৯-৩১)



এ উষ্ট্রী হত্যার পর সালেহ (عليه السلام) জাতিকে আল্লাহ তা‘আলার গযবের কথা জানিয়ে দিলেন যে,



(تَمَتَّعُوْا فِیْ دَارِکُمْ ثَلٰثَةَ اَیَّامٍﺚ ذٰلِکَ وَعْدٌ غَیْرُ مَکْذُوْبٍ)



‘‘তোমরা তোমাদের গৃহে তিন দিন জীবন উপভোগ করে নাও। এটা একটি প্রতিশ্র“তি যা মিথ্যা হবার নয়।’’ (সূরা হূদ ১১:৬৫) কিন্তু তারা এরূপ কঠোর হুশিয়ারীকে কোন গুরুত্ব না দিয়ে বরং তাচ্ছিল্যভরে বলল, “হে সালেহ! তুমি সত্য রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর।”



(تِسْعَةُ رَھْطٍ) অর্থাৎ সালেহ (عليه السلام)-এর যুগে যে নয় জন বড় বড় নেতা ঐ শহরে বসবাস করত তাদের কথা বলা হচ্ছে। رهط শব্দের অর্থ দল। এখানে নয় ব্যক্তির মধ্য থেকে প্রত্যেককেই رهط বলার কারণ সম্ভবতঃ এই যে, তারা তাদের অর্থ-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে সম্প্রদায়ের প্রধানরূপে গণ্য হত এবং প্রত্যেকের সাথে ভিন্ন ভিন্ন দল ছিল। কাজেই এই নয় ব্যক্তিকে নয় দল বলা হয়েছে। তারা ছিল হিজর জনপদের প্রধান। তারা ছিল এমন নয়জন যারা সর্বদা ঐ সময় জমিনে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়াত। তারা কোন কিছু না বুঝেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত, কখনো সংশোধন হবার চেষ্টা করত না। একদা তারা আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে বলেছিল, তারা সালেহ (عليه السلام) ও তাঁর পরিবার পরিজনকে রাত্রিকালে হত্যা করবে এবং তারা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে তা অস্বীকার করবে। কেননা এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করার কারণেই গযব আসবে। সুতরাং সেই গযবের জন্য দায়ী। আর যদি গযব না আসে তাহলে মিথ্যার দণ্ড ভোগ করুক। জাতির নয়জন নেতা এ নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দেয়। তাদের সিদ্ধান্ত মতে নয়জন নেতা তাদের প্রধান কাদার বিন সালেফ এর নেতৃত্বে রাতের বেলা সালেহ (عليه السلام)-কে হত্যা করার জন্য তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে পথিমধ্যেই প্রস্তর বর্ষণে ধ্বংস করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَکَرُوْا مَکْرًا وَّمَکَرْنَا مَکْرًا وَّھُمْ لَا یَشْعُرُوْنَﮁفَانْظُرْ کَیْفَ کَانَ عَاقِبَةُ مَکْرِھِمْﺫ اَنَّا دَمَّرْنٰھُمْ وَقَوْمَھُمْ اَجْمَعِیْنَ)



“তারা এক চক্রান্ত‎ করেছিল এবং আমিও এক কৌশল অবলম্বন করলাম, কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি। অতএব দেখ, তাদের চক্রান্তে‎র পরিণাম কী হয়েছেন আমি অবশ্যই তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করেছি।” (সূরা নামল ২৭:৫০-৫১) যাই হোক নির্ধারিত দিনে গযব আসার প্রাক্কালেই আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে সালেহ (عليه السلام) স্বীয় ঈমানদার সাথীদেরকে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন।



ভীষণ ভূমিকম্প শুরু হল এবং ওপর থেকে বিকট ও ভয়াবহ এক গর্জন শোনা গেল। ফলে সবাই যার যার স্থানে একযোগে অধোমুখী হয়ে ভূতলশায়ী হল (সূরা আ‘রাফ ৭৮, হূদ ৬৭-৬৮) এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হল এমনভাবে, যেন তারা কোনদিন সেখানে বসবাস করেনি। অন্য আয়াতে এসেছে যে, ‘আমি তাদের উপর পাঠিয়েছি এক বিকট আওয়াজ; ফলে তারা হয়ে গেল খোয়াড় মালিকদের বিখন্ডিত ভূষির ন্যায়।’ (সূরা কামার ৫৪:৩১)



৯ম হিজরীতে তাবূক যুদ্ধে যাওয়ার পথে মুসলিম বাহিনী হিজরে অবতরণ করলে রাসূলুল্লাহ তাদেরকে সেখানে প্রবেশ করতে নিষেধ করে বলেন,



لَا تَدْخُلُوا مَسَاكِنَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ إِلَّا أَنْ تَكُونُوا بَاكِينَ أَنْ يُصِيبَكُمْ مَا أَصَابَهُمْ ثُمَّ تَقَنَّعَ بِرِدَائِهِ



তোমরা ঐসব অভিশপ্তদের এলাকায় প্রবেশ করো না ক্রন্দনরত অবস্থায় ব্যতীত। যদি ক্রন্দন করতে না পার তাহলে প্রবেশ করো না। তাহলে তোমাদের ওপর ঐ গযব আসতে পারে, যা তাদের ওপর এসেছিল। এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাথা ঢেকে ফেললেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৩৩)



পার্থিব ক্ষমতা ও ধনৈশ্বর্য অধিকাংশ মানুষকে অশুভ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। বিত্তশালীরা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভুলে গিয়ে ভ্রান্ত পথে পা বাড়ায়। সামূদ জাতির বেলায়ও তাই হয়েছিল। অথচ নূহ (عليه السلام)-এর জাতির কঠিন শাস্তির ঘটনাবলী তখনও লোকমুখে আলোচিত হত। আর আ‘দ জাতির নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঘটনা তো তাদের কাছে একপ্রকার টাটকা ঘটনাই ছিল। অথচ তাদের ভাইদের ধ্বংসস্তুপের ওপরে বড় বড় বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ করে ও বিত্ত বৈভবের মালিক হয়ে তারা পেছনের কথা ভুলে গেল। এমনকি তারা আ‘দ জাতির মত অহংকারী কার্যকলাপ শুরু করে দিল। ফলে আল্লাহর গযব অনিবার্য হয়ে গেল। এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৭৩-৭৯ নং আয়াতের আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার বিরুদ্ধে কারো কোন কৌশল কাজে আসবে না।

২. সমাজের প্রধান হলেই কেউ সঠিক পথের অনুসারী এমনটি মনে করা যাবে না।

৩. দলীল-প্রমাণ বাদ দিয়ে নেতা হলেই কারো অনুসরণ করা যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৫-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, যখন হযরত সালেহ (আঃ) তাঁর কওমের কাছে আসলেন এবং আল্লাহর রিসালাত আদায় করতে গিয়ে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিলেন তখন তাদের মধ্যে দু’টি দল হয়ে যায়। একটি মুমিনদের দল এবং অপরটি কাফিরদের দল। এ দু'টি দল পরস্পরের মধ্যে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানরা সেই সম্প্রদায়ের ঈমানদার যাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো তাদেরকে বললো, তোমরা কি জান যে, সালেহ (আঃ) আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত? তারা বললো, তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী। দাম্ভিকরা বললো, তোমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।” (৭: ৭৫-৭৬)

হযরত সালেহ (আঃ) তাঁর কওমকে বলেনঃ “হে আমার কওম! তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা রহমত চাওয়ার পরিবর্তে শাস্তি চাচ্ছ? কেন তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছে না, যাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হতে তারা উত্তরে বললোঃ “তোমাকে ও তোমার সঙ্গে যারা আছে তাদেরকে আমরা অমঙ্গলের কারণ মনে করি।' এ কথাই ফিরাউন ও তার লোকেরা হযরত মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে বলেছিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তারা কল্যাণ লাভ করে তখন বলে-আমরা তো এরই উপযুক্ত, আর যখন তাদেরকে অকল্যাণ পৌছে তখন তারা এ জন্যে মূসা (আঃ) ও তার সঙ্গীদেরকে দায়ী করে।” অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “যদি তাদেরকে কল্যাণ পৌছে তবে তারা বলে-এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, আর যদি তাদেরকে অকল্যাণ পৌছে তবে তারা বলে- এটা তোমার পক্ষ হতে এসেছে; তুমি বল, সবই আল্লাহর পক্ষ হতে এসে থাকে।” (৪:৭৮)

আল্লাহ তা'আলা জনপদের অধিবাসীদের সম্পর্কে খবর দিয়ে বলেন, যখন তাদের নিকট রাসূলগণ এসেছিলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তারা বললোঃ আমরা তোমাদেরকে অকল্যাণের কারণ মনে করি, যদি তোমরা বিরত না হও তবে অবশ্যই আমরা তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবো এবং আমাদের পক্ষ হতে তোমাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অবশ্যই আপতিত হবে। তারা বললোঃ তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই সাথে।” (৩৬: ১৮-১৯)

এখানে রয়েছে যে, হযরত সালেহ (আঃ) বললেনঃ তোমাদের শুভাশুভ আল্লাহর ইখতিয়ারে, বস্তুতঃ তোমরা এমন এক সম্প্রদায় যাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ পরীক্ষা করা হচ্ছে তিরস্কার দ্বারাও এবং বিপদ-আপদ দ্বারাও। তবে এখানে তোমাদেরকে অবকাশ দেয়া হচ্ছে। এ অবকাশ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে, এর পরে পাকড়াও করা হবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।