আল কুরআন


সূরা আন-নামাল (আয়াত: 17)

সূরা আন-নামাল (আয়াত: 17)



হরকত ছাড়া:

وحشر لسليمان جنوده من الجن والإنس والطير فهم يوزعون ﴿١٧﴾




হরকত সহ:

وَ حُشِرَ لِسُلَیْمٰنَ جُنُوْدُهٗ مِنَ الْجِنِّ وَ الْاِنْسِ وَ الطَّیْرِ فَهُمْ یُوْزَعُوْنَ ﴿۱۷﴾




উচ্চারণ: ওয়া হুশিরা লিছুলাইমা-না জুনূদুহূমিনাল জিন্নি ওয়াল ইনছি ওয়াততাইরি ফাহুম ইউযা‘উন।




আল বায়ান: আর সুলাইমানের জন্য তার সেনাবাহিনী থেকে জিন, মানুষ ও পাখিদের সমবেত করা হল। তারপর এদেরকে বিন্যস্ত করা হল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. আর সুলাইমানের সামনে সমবেত করা হল তার বাহিনীকে—জিন মানুষ ও বিহঙ্গকুলকে এবং তাদেরকে বিন্যস্ত করা বিভিন্ন ব্যূহে।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: সুলাইমানের সামনে তার সেনাবাহিনীকে সমবেত করা হল, জ্বিন, মানুষ ও পক্ষীকুলকে; অতঃপর তাদেরকে বিভিন্ন বুহ্যে বিন্যস্ত করা হল।




আহসানুল বায়ান: (১৭) সুলাইমানের সম্মুখে তার সমস্ত বাহিনী; জীন, মানুষ ও পক্ষীকুলকে সমবেত করা হল;[1] তাদেরকে (এক এক) দলে বিন্যস্ত করা হল। [2]



মুজিবুর রহমান: সুলাইমানের সামনে সমবেত করা হল তার বাহিনীকে, জিন, মানুষ ও পক্ষীকুলকে এবং তাদেরকে বিন্যস্ত করা হল বিভিন্ন বুহ্যে।



ফযলুর রহমান: সোলায়মানের সামনে তার জ্বিন, মানুষ ও পাখি বাহিনীগুলোকে জড়ো করা হল। অতঃপর তাদেরকে ভাগে ভাগে বিন্যস্ত করা হল (যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হল)।



মুহিউদ্দিন খান: সুলায়মানের সামনে তার সেনাবাহিনীকে সমবেত করা হল। জ্বিন-মানুষ ও পক্ষীকুলকে, অতঃপর তাদেরকে বিভিন্ন ব্যূহে বিভক্ত করা হল।



জহুরুল হক: আর সুলাইমানের সামনে সমবেত করা হয়েছিল তাঁর বাহিনীকে -- জিন ও মানুষ ও পাখিদের থেকে, আর তাদের কুচকাওয়াজ করানো হলো।



Sahih International: And gathered for Solomon were his soldiers of the jinn and men and birds, and they were [marching] in rows.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৭. আর সুলাইমানের সামনে সমবেত করা হল তার বাহিনীকে—জিন মানুষ ও বিহঙ্গকুলকে এবং তাদেরকে বিন্যস্ত করা বিভিন্ন ব্যূহে।(১)


তাফসীর:

(১) يوزعون শব্দটি وزع শব্দ থেকে উদ্ভূত। এর শাব্দিক অর্থ, বিরত রাখা। অর্থাৎ বাহিনীকে প্রাচুর্যের কারণে বিরত রাখা, যাতে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। বিক্ষিপ্ত ভাবে ঘুরাপিরা না করে একটি সুনির্দিষ্ট পন্থায় চলাফেরা করতে তাদেরকে বাধ্য করা হয়। [মুয়াস্‌সার]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৭) সুলাইমানের সম্মুখে তার সমস্ত বাহিনী; জীন, মানুষ ও পক্ষীকুলকে সমবেত করা হল;[1] তাদেরকে (এক এক) দলে বিন্যস্ত করা হল। [2]


তাফসীর:

[1] এখানে সুলাইমান (আঃ)-এর ব্যক্তিগত বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে; যাতে তিনি পুরো মানব ইতিহাসে একক। আর তা হল তাঁর আধিপত্য কেবলমাত্র মানুষের উপর ছিল না; বরং জীন, জীব-জন্তু ও পশু-পক্ষীর উপরেও ছিল। এমনকি বাতাসও তাঁর অধীনস্থ ছিল। এখানে বলা হয়েছে যে, সুলাইমান (আঃ) কোথাও যাবার জন্য সমস্ত সৈন্যদেরকে, অর্থাৎ জীন, মানুষ ও পাখীদেরকে জমায়েত করলেন।

[2] এই অনুবাদ تَوزِيع এর অর্থ تَفرِيق হিসাবে করা হয়েছে। অর্থাৎ, সকলকে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত করা হল। যেমন মানুষের একটি দল, জিনের একটি দল, পশুর একটি দল, পক্ষীর একটি দল ইত্যাদি। দ্বিতীয় অর্থ হল, তাদেরকে থামিয়ে দেওয়া হত। অর্থাৎ, এই সেনাদল এত বিশাল হত যে, পথে থামিয়ে তা সুবিন্যস্ত করা হত। যাতে করে শাহী সেনা অসংগঠিত ও ছিন্ন-ভিন্ন না হয়ে পড়ে। এই অর্থ وَزَع يَزَع থেকে আসবে। যার অর্থ থামানো। এই শব্দের সাথে একটি আলিফ বাড়িয়ে দিয়ে أَوزِعنِي করা হয়েছে যেমন, এই সূরার ১৯নং আয়াতে আসছে। যার অর্থঃ আমার নিকট হতে এমন জিনিস দূর করে দাও, যা তোমার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা করতে বাধা দিয়ে থাকে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৫-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা দাঊদ ও তাঁর সন্তান সুলাইমান (عليه السلام)-কে নবুওয়াত ও অন্যান্য নেয়ামত দান করে সাধারণ মু’মিনের থেকে যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তার বর্ণনা এখানে তুলে ধরা হয়েছে।



عِلْمًا দ্বারা উদ্দেশ্য হল নবুওয়াত। অর্থাৎ সুলাইমান (عليه السلام) ও তাঁর পিতা দাঊদ (عليه السلام)-কে নবুওয়াত দান করেছেন।



(وَوَرِثَ سُلَيْمٰنُ دَاو۫دَ)



‘সুলাইমান হয়েছিল দাঊদের উত্তরাধিকারী’ এখানে উত্তরাধিকার বলতে জ্ঞান ও নবুওয়াতের উত্তরাধিকার বুঝানো হয়েছে। পার্থিব সম্পদের উত্তরাধিকার নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:



إِنَّا مَعْشَرَ الْأَنْبِيَاءِ لَا نُورَثُ



আমরা নাবীরা কাউকে উত্তরাধিকার বানাই না, যে সম্পদ রেখে যাই তা সাদকাস্বরূপ। (মুসনাদ আহমাদ হা: ৯৯৭২, সহীহ)



অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:



وَإِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ، وَإِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا، وَلَا دِرْهَمًا وَرَّثُوا الْعِلْمَ، فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ



আলেমগণ নাবীদের উত্তরাধিকারী, তারা কোন অর্থকড়ির উত্তরাধিকার করে যায়নি। বরং তারা ইলমের উত্তরাধিকার করে গেছেন, সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করবে সে যেন পূর্ণ অংশই গ্রহণ করল। (আবূ দাঊদ হা: ৩৬৪১, সহীহ)



আল্লাহ তা‘আলা সুলাইমান (عليه السلام)-কে অনেক বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, তন্মধ্যে এখানে দুটি উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যগুলো সূরা স্ব-দ-এর ৩০-৪০ নং ও সাবার ১২-১৪ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে।



(১) পক্ষীকুলকে সুলাইমান (عليه السلام)-এর অনুগত করে দেয়া হয়েছিল এবং তিনি তাদের ভাষা বুঝতেন। যেমন ১৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে। পক্ষীকুল তাঁর হুকুমে বিভিন্ন কাজ করত। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পত্র তিনি হুদহুদ পাখির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী ‘সাবা’ রাজ্যের রাণী বিলকীসের কাছে প্রেরণ করছিলেন।



(২) পিপীলিকার ভাষাও তিনি বুঝতেন। যেমন ১৮-১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে, সুলাইমান (عليه السلام)-এর সেন্যবাহিনীর পদপিষ্ট হতে বাঁচার জন্য পিপীলিকা বাহিনীর প্রতি তাদের নেতার নির্দেশ শুনে তিনি হাসলেন। এসব ছিল সুলাইমান (عليه السلام)-এর প্রতি আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ। এত ক্ষমতা ও জীব-জন্তুর ভাষা বুঝতে পারা ইত্যাদি নেয়ামত পেয়েও তিনি কোনরূপ গর্ব-অহংকার করেননি। বরং তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে এসব নেয়ামতের কৃতজ্ঞতার তাওফীক চেয়ে দু‘আ করলেন যাতে তিনি সৎ আমল করতে পারেন এবং আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।



সুলাইমান (عليه السلام)-এর জীবনে উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী:



(১) ন্যায় বিচারের ঘটনা: মেষপাল ও ক্ষেতের মালিকের মাঝে বিবাদের মীমাংসায় পিতার চেয়ে ন্যায়ভাবে বিচার করা ও দু’ মহিলার সন্তানের ব্যাপারে ন্যায় বিচার করার ঘটনা সূরা আম্বিয়ার ৭৮-৮২ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে।



(২) পিপীলিকার ঘটনা: একদা সুলাইমান (عليه السلام) তাঁর বিশাল সেনাবাহিনীসহ একটি এলাকা অতিক্রম করছিলেন। ঐ সময় তাঁর সাথে জিন, মানুষ ও পক্ষীকুল ছিল। যে এলাকা দিয়ে তাঁরা যাচ্ছিলেন সে এলাকায় বালির টিবি সদৃশ পিপীলিকাদের বহু বসতঘর ছিল। সুলাইমান (عليه السلام)-এর বাহিনীকে আসতে দেখে পিপীলিকার সর্দার শীঘ্র বাসস্থানে প্রবেশের নির্দেশ দিল যাতে বাহিনীর পদপিষ্ট হতে না হয়।



(৩) হুদহুদ পাখির ঘটনা: আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে পক্ষীকুল সুলাইমান  এর আনুগত্য লাভ করে। একদিন পক্ষীকুলকে ডেকে একত্রিত করেন ও তাদের খোঁজ-খবর নেন। তখন দেখতে পেলেন যে, হুদহুদ পাখিটি নেই। তিনি যখন হুদহুদ পাখিকে দেখতে পেলেন না তখন সবাইকে সম্বোধন করে নিজের দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করলেন, আমার কী হল যে, আমি হুদহুদ পাখিকে দেখতে পাচ্ছি না? (অর্থাৎ দোষ-ত্র“টি অন্যের দিকে সম্পৃক্ত না করে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করা জ্ঞানী লোকের পরিচয়) তখন সুলাইমান রাগান্বিত হয়ে অনতিবিলম্বে তাকে ধরে আনার নির্দেশ দিলেন এবং উপযুক্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে দিলেন। অন্যথায় তাকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে নতুবা জবাই করা হবে বলে হুশিয়ার করলেন। তার কিছুক্ষণ পরই হুদহুদ পাখি এসে হাজির হল এবং সুলাইমানকে লক্ষ্য করে বলল, আমি এমন বিষয়ে সংবাদ নিয়ে এসেছি যে বিষয়ে আপনি অবগত নন। এ কথা বলেই সে তার আনীত নতুন সংবাদের রিপোর্ট পেশ করল। হুদহুদ পাখি দ্বারা এ কথা বলানোর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এ সংবাদ দিচ্ছেন যে, নাবীগণ গায়েবের খবর জানেন না। তাঁরা কেবল ততটুকুই জানেন যতটুকু আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ওয়াহী মারফত জানান।



উল্লেখ্য যে, হুদহুদ এক জাতীয় ছোট্ট পাখির নাম। যা পক্ষীকুলের মধ্যে অতীব ক্ষুদ্র ও দুর্বল এবং যার সংখ্যাও দুনিয়াতে কম। দুনিয়াতে এত পাখি থাকতে হুদহুদ পাখির খোঁজ নেয়ার কারণ সম্পর্কে নও মুসলিম ইয়াহূদী পণ্ডিত আব্দুল্লাহ বিন সালাম (رحمه الله) -কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: সুলাইমান (عليه السلام) তাঁর বাহিনী নিয়ে সে সময় এমন এক অঞ্চলে ছিলেন যেখানে পানি ছিল না। আল্লাহ তা‘আলা হুদহুদ পাখিকে এ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, সে ভূগর্ভের বস্তুসমূহকে এবং ভূগর্ভে প্রবাহিত পানি ওপর থেকে দেখতে পায় (কুরতুবী)।



(৪) রাণী বিলকীসের ঘটনার সার সংক্ষেপ:



সুলাইমান (عليه السلام)-এর শাম ও ইরাক সাম্রাজ্যের পার্শ্ববর্তী ইয়ামান তথা ‘সাবা’ রাজ্যের রাণী ছিলেন বিলকীস বিনতুস সারাহ বিন হাদাহিদ বিন শারাহীল। তিনি ছিলেন সাম বিন নূহ (عليه السلام)-এর ১৮তম অধস্তন বংশধর। তাঁর ঊর্ধ্বতন ৯ম পিতামহের নাম ছিল ‘সাবা’ (কুরতুবী)। সম্ভবতঃ তাঁর নামেই ‘সাবা’ সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে অনেক জীবনোপকরণ দিয়েছিলেন এবং নাবীগণের মাধ্যমে এসব নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু শয়তানের চক্রে ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য হয় এবং ‘সূর্য পূজারী’ হয়ে যায়। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর প্লাবণের আযাব প্রেরণ করেন এবং ধ্বংস করে দেন। সূরা সাবার ১৫-১৭ নং আয়াতে এ সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।



হুদহুদ পাখি নতুন সংবাদ দিল যে, আমি এক মহিলাকে দেখলাম যে, সে সাবাবাসীর ওপর রাজত্ব করছে। তাকে সব কিছুই দেয়া হয়েছে এবং তার এক বিরাট সিংহাসন রয়েছে। আমি তার সম্প্রদায়কে দেখলাম, তারা আল্লাহ তা‘আলার পরিবর্তে সূর্যকে সিজদাহ করছে। শয়তান তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার পথ থেকে বাধা প্রদান করেছে যার ফলে তারা পথভ্রষ্ট।



তখন সুলালমান (عليه السلام) বললেন: আমি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করব, দেখব তুমি সত্য বলছো না মিথ্যা বলছো। এ রাজ্য সম্পর্কে সুলাইমান (عليه السلام)-এর অজানাটা বিস্মকর কিছু নয়। ইউসুফ (عليه السلام)-কে বাড়ির অনতিদূরে কূপে নিক্ষেপ করা হল অথচ ইয়া‘কূব (عليه السلام) জানলেন না। আয়িশাহ (رضي الله عنها) এর গলার হার হারিয়ে গেল অথচ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানতে পারলেন না। যা হোক সুলাইমান (عليه السلام) হুদহুদ পাখিকে একটি চিঠি দিয়ে পাঠালেন এবং বললেন, তুমি চিঠি দিয়ে একটু দূরে সরে পড়বে এবং তারা কী মতামত প্রকাশ করে তা শুনে আসবে।



বিলকীস যখন চিঠি পেল তখন তার পরিষদবর্গকে লক্ষ্য করে বলল, হে পরিষদবর্গ! আমাকে একটি মহিমান্বিত পত্র দেয়া হয়েছে। এটি হল সুলাইমান (عليه السلام)-এর পক্ষ থেকে। আর তাতে রয়েছেন পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহ তা‘আলার নামে আরম্ভ করছি। অতঃপর এতে বলা হয়েছে, তোমরা অহমিকা বশে আমাকে অমান্য কর না; বরং আত্মসমর্পণ করে আমার নিকট উপস্থিত হও। তখন বিলকীস তার পারিষদবর্গকে এ বিষয়ে অভিমত জানাতে বললেন। তখন পারিষদবর্গ তাদের শক্তি, সাহস, ক্ষমতা ও প্রস্তুতির কথা ব্যক্ত করে বলল; তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারটি আপনার হাতেই। তখন বিলকীস বলল: যখন রাজা-বাদশাহ কোন দেশে আক্রমণ করে তখন ঐ দেশকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাবান লোকদেরকে অপদস্ত করে আর এরাও এরূপই করবে। তখন বিলকীস সুলাইমান (عليه السلام)-এর নিকট দূতের মাধ্যমে উপঢৌকন পাঠাল যাতে তাদের মন-মানসিকতা জানতে পারে। যখন বিলকিসের দূতেরা উপঢৌকন নিয়ে সুলাইমান (عليه السلام)-এর নিকট আসল তখন সুলাইমান (عليه السلام) তা ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে এমন বাহিনীর মাধ্যমে যাদের মোকাবেলা করার মত ক্ষমতা ওদের নেই। বরং সেখান থেকে তাদেরকে লাঞ্ছিত করে বের করবে। আর তখন তারা হবে অবনমিত।



অতঃপর সুলাইমান (عليه السلام) তার সৈন্যদের মধ্যে ঘোষণা করলেন, বিলকীস ও তার সৈন্য দল আত্মসমর্পণ করে আমার নিকট আসার পূর্বে কে তার সিংহাসন আমাকে এনে দিতে পারবে? তখন এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আপনার বৈঠক হতে ওঠার পূর্বে আমি তা আপনাকে এনে দেব। অন্য একজন যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল সে বলল, আপনি চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। এরপর যখন সে তা নিয়ে আসল তখন সুলাইমান (عليه السلام) তাকে বললেন: তার সিংহাসনের আকৃতি বদলে দাও: দেখি সে তা চিনতে পারে, নাকি চিনতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর যখন বিলকীস আসল তখন তাকে বলা হল, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? তখন সে বলল, এটা যেন সেটাই। তাকে বলা হল, এ প্রাসাদে প্রবেশ কর। যখন সে ওর প্রতি দৃষ্টিপাত করল, তখন তার মনে হল এ এক স্বচ্ছ জলাশয় এবং সে তার কাপড় টেনে হাটু পর্যন্ত তুলে ধরল।



তখন সুলাইমান (عليه السلام) তাকে বললেন: এ-তো স্বচ্ছ কাঁচ দ্বারা নির্মিত প্রাসাদ। তখন বিলকীস তার অপরাধের কথা বুঝতে পেরে নিজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং বলল, আমি সুলাইমানের সাথে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম।



(الَّذِیْ عِنْدَھ۫ عِلْمٌ مِّنَ الْکِتٰبِ)



‘কিতাবের জ্ঞান যার ছিল’ দ্বারা কাকে বুঝানো হয়েছে, এ নিয়ে তাফসীরবিদগণ মতভেদ করেছেন। তার মধ্যে প্রবল মত হল, তিনি ছিলেন স্বয়ং সুলাইমান (عليه السلام)। কেননা আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের ব্যাপারে সর্বাধিক জ্ঞান তাঁরই ছিল। তিনি এর দ্বারা উপস্থিত জিন ও মানুষ পরিষদবর্গকে বুঝিয়ে দিলেন যে, তোমাদের সাহায্য ছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা অন্যের মাধ্যমে অর্থাৎ ফেরেশতাদের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করে থাকেন। মূলত গোটা ব্যাপারটাই ছিল মু‘জিযাহ এবং রাণী বিলকীসকে আল্লাহ তা‘আলার সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদর্শন করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। এতে তিনি সফল হয়েছিলেন এবং সুদূর ইয়ামান থেকে বায়তুল মুক্বাদ্দাসে বিলকীস তার সিংহাসনের আগাম উপস্থিতি ও প্রাসাদের অনন্য কারুকার্য দেখে লজ্জিত হয়ে পড়ে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার নিকট আত্মসমর্পণ করে মুসলিম হয়ে যায়। এটাই ছিল সুলাইমান (عليه السلام)-এর প্রধান লক্ষ্য।



বিঃ দ্রঃ সুলাইমান (عليه السلام), বিলকীস ও হুদহুদ পাখি সম্পর্কে অনেক মিথ্যা বানোয়াট কথা বলা হয়ে থাকে। যেমন বলা হয়: সুলাইমান (عليه السلام) বিলকীসকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার পায়ে পশম ছিল তাই এমন প্রাসাদ তৈরি করা হল যাতে দেখতে মনে হয় তাতে পানি রয়েছে। ফলে প্রবেশকালে সে কাপড় তুলতে থাকবে আর তা দেখা হয়ে যাবে পায়ে পশম আছে কি না?



আরো বলা হয়: একদা বিলকীসের পিতা শিকার করতে বের হন, পথিমধ্যে দেখতে পান সাদা কালো দুটি সাপ লড়াই করছে। তিনি কালো সাপটি হত্যা করলেন আর সাদা সাপ ধরে নিয়ে আসলেন। বাড়িতে এনে দেখলেন সাপটি একজন সুন্দর যুবক হয়ে বসে আছে, এ অবস্থা দেখে তিনি ভয় পেলেন। যুবক বলল: ভয় করবেন না, আমি সে সাদা সাপ। এসব ঘটনা মিথ্যা, এসবের কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। সুতরাং এসব ঘটনা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।



ইনশা আল্লাহ তা‘আলা না বলার ফল:



সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এ বিষয়ে বর্ণিত ঘটনার সারমর্ম এই যে, একবার সুলাইমান (عليه السلام) এ মনোভাব ব্যক্ত করলেন যে, রাত্রিতে আমি (আমার ৯০ বা ১০০) সকল স্ত্রীর সাথে মিলিত হব। যাতে প্রত্যেকের গর্ভ থেকে একটি করে পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে ও পরে তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে ঘোড় সওয়ার হয়ে জিহাদ করবে। কিন্তু এ সময় তিনি ইনশা আল্লাহ তা‘আলা (যদি আল্লাহ তা‘আলা চান) বলতে ভুলে যান। নাবীর এ ত্র“টি আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করলেন না। ফলে মাত্র একজন স্ত্রীর গর্ভ থেকে একটি অপূর্ণাঙ্গ ও মৃত শিশু ভূমিষ্ট হয়। (সহীহ বুখারী হা: ২৮১৯) এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে, সুলাইমান বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতাসম্পন্ন বাদশাহ হলেও এবং জিন, বায়ু, পক্ষীকুল ও সকল জীবজন্তু তাঁর হুকুমবরদার হলেও আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা ব্যতীত তার কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না। তাই নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়ে বলেন:



(وَلَا تَقُوْلَنَّ لِشَیْءٍ اِنِّیْ فَاعِلٌ ذٰلِکَ غَدًاﭦ اِلَّآ اَنْ یَّشَا۬ئَ اللہُ)



“কখনই তুমি কোন বিষয়ে বল না, “আমি সেটা আগামীকাল করব, ‘আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে’ এ কথা বলা ছাড়া’’ (সূরা কাহফ ১৮:২৩)



সিংহাসনের ওপরে একটি নি®প্রাণ দেহ প্রাপ্তির ঘটনা সূরা স্ব-দ-এর ৩০-৪০ নং ও বায়তুল মুক্বাদ্দাস নির্মাণের ঘটনা সূরা সাবার ১২-১৪ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ রয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সুলাইমান (عليه السلام)-কে সকল কিছুর ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছিল।

২. ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম। যেমনটি পূর্ববর্তী ধর্মেও ছিল ।

৩. আল্লাহ তা‘আলার সৎ বান্দারা যত জ্ঞানী বা নেয়ামতের অধিকারী হোক না কেন তাতে তারা অহংকারী হয় না, বরং নেয়ামত পেয়ে শুকরিয়া আদায় করে, যেমন সুলাইমান (عليه السلام)।

৪. কোন ভাল জিনিস প্রাপ্ত হলে তাতে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা উচিত।

৫. কোন ভাল কাজ করতে হলে আল্লাহ তা‘আলার নামে শুরু করতে হবে।

৬. নাবীদের অর্থ-সম্পদের উত্তরাধিকার হয় না, উত্তরাধিকার হয় ইলম ও নবুওয়াতের।

৭. সৎ কর্ম কবূল হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে না।

৮. শাসকের জন্য জনসাধারণের খোঁজ-খবর নেয়া উচিত।

৯. যেকাজে অলসতা করে, তাকে সুষম শাস্তি দেয়া জায়েয।

১০. গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারাদিতে পরামর্শ করা বুদ্ধিমানের কাজ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৫-১৯ নং আয়াতের তাফসীর

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলার ঐ নিয়ামতরাশির বর্ণনা রয়েছে যেগুলো তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর উপর দিয়ে রেখেছিলেন। তিনি তাদেরকে দান করেছিলেন উভয় জগতের সম্পদ। এই নিয়ামতগুলো দান করার সাথে সাথে তিনি তাদেরকে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও তাওফীক দিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদেরকে প্রদত্ত নিয়ামতরাজির কারণে সদা-সর্বদা আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকেন। তাঁরা তাঁর প্রশংসা করতেন।

হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) লিখেছেনঃ “যে বান্দাকে আল্লাহ যে নিয়ামত দান করেন সেই নিয়ামতের উপর যদি সে তার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তবে তার ঐ প্রশংসা ঐ নিয়ামত অপেক্ষা উত্তম হবে। দেখো, স্বয়ং আল্লাহর কিতাবেই একথা বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর তিনি এই আয়াতই লিখেন। তারপর তিনি লিখেনঃ “আল্লাহ তা'আলা এ দুই নবী (আঃ)-কে যে নিয়ামত দান করেছিলেন তা অপেক্ষা উত্তম নিয়ামত আর কি হতে পারে?”

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘সুলাইমান (আঃ) হয়েছিল দাউদ (আঃ)-এর উত্তরাধিকারী। এর দ্বারা উদ্দেশ্য ধন-মালের উত্তরাধিকারী নয়। বরং রাজত্ব ও নবুওয়াতের উত্তরাধিকারী উদ্দেশ্য। যদি সম্পদের উত্তরাধিকারী উদ্দেশ্য হতো তবে শুধুমাত্র হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নাম আসতো না। কেননা, হযরত দাউদ (আঃ)-এর একশটি স্ত্রী ছিল। আর নবীদের (আঃ) মালের মীরাস হয় না। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেনঃ “আমরা নবীদের দল (মালের) কাউকেও উত্তরাধিকারী করি না। আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাদকা (রূপে পরিগণিত) হয়।”

হযরত সুলাইমান (আঃ) আল্লাহর নিয়ামতরাজি স্মরণ করে বলছেনঃ “হে লোক সকল! আমাকে পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এটা আমার প্রতি আল্লাহর একটি বিশেষ করুণা ও অনুগ্রহ যা অন্য কাউকেও দেয়া হয়নি। এটা অবশ্যই তার সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।”

কোন কোন অজ্ঞ লোক বলেছে যে, ঐ সময় পক্ষীকুলও মানুষের ভাষায় কথা বলতো। কিন্তু এটা তাদের অজ্ঞতা ছাড়া কিছুই নয়। তাদের তো এটা অনুধাবন করা উচিত ছিল যে, যদি সত্যি এরূপই হতো তবে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর বৈশিষ্ট্য আর কি থাকতো? অথচ তিনি গর্বের সাথে বর্ণনা করছেনঃ “আমাকে পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। সুতরাং ঐ অজ্ঞদের কথা সত্য হলে সবাই পাখীর ভাষা বুঝতে পারতো এবং হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর বৈশিষ্ট্য কিছুই থাকতো না। কাজেই তাদের উক্তি সম্পূর্ণ ভুল। পাখী ও পশুর ভাষা এখন যা আছে তখনও তাই ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর এটা একটা বিশেষ মর্যাদা যে, খেচর-ভূচর সবকিছুরই ভাষা বুঝতে পারতেন। সাথে সাথে তিনি এই নিয়ামতও লাভ করেছিলেন যে, একটা রাজত্ব পরিচালনার জন্যে যত কিছু জিনিসের প্রয়োজন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সবই দান করেছিলেন। এটা ছিল তাঁর প্রতি মহান আল্লাহর প্রকাশ্য অনুগ্রহ।

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত দাউদ (আঃ) একজন বড় মর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। যখন তিনি বাড়ী হতে বের হতেন তখন দরযা বন্ধ করে যেতেন। অতঃপর তার বাড়ীতে প্রবেশের কারো অনুমতি ছিল না। একদা অভ্যাসমত তিনি বাড়ী হতে বের হন। অল্পক্ষণ পরে তার এক পত্নী দেখতে পান যে, বাড়ীর শিশুদের মাঝে একটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনি এ দৃশ্য দেখে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন এবং অন্যদেরকেও দেখান। তাঁরা সবাই বিস্ময়াভিভূত হয়ে পরস্পর বলাবলি করেনঃ “দ্যা বন্দ রয়েছে তবুও এ লোকটি ভিতরে প্রবেশ করলো কি করে? আল্লাহর কসম! হযরত দাউদ (আঃ)-এর সামনে আজ আমাদের অপমানের কোন সীমা থাকবে না। ইতিমধ্যে হযরত দাউদ (আঃ) এসে পড়েন। তিনিও লোকটিকে তথায় দণ্ডায়মান দেখে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কে?” লোকটি উত্তরে বলেঃ “আমি সেই যাকে কেউ বাধা দিতে পারে না এবং দর বন্ধ করা দ্বারাও যাকে বাধা দেয়া যায় না। আর যে বড় হতে বড়তম ব্যক্তিরও কোন পরোয়া করে না।” হযরত দাউদ (আঃ) বুঝে নিয়ে বলেনঃ “মারহাবা! মারহাবা! (সাবাস! সাবাস!) আপনি মালাকুল মাউত (মৃত্যুর ফেরেশতা)।” তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর ফেরেশতা তার রূহ কবয করে নেন। সূর্য উদিত হলো এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর মৃতদেহের উপর রৌদ্র এসে পড়লো। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) পক্ষীকুলকে নির্দেশ দিলেন যে, তারা যেন হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর ছায়া করে। পাখীগুলো তখন তাদের পালক বিস্তার করে এমন গভীরভাবে ছায়া করলো যে, যমীন অন্ধকারে ছেয়ে গেল। এরপর হযরত সুলাইমান (আঃ) পাখীগুলোকে এক এক করে পালক গুটিয়ে নিতে বললেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পাখীগুলো কিভাবে তাদের পালকগুলো গুটিয়ে নিলো?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন নিজের হাত গুটিয়ে নিয়ে বললেনঃ “এভাবে। তার উপর সেই দিন লাল রং এর গৃধিনী জয়যুক্ত হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সৈন্য একত্রিত হলো যাদের মধ্যে মানুষ, জ্বিন, পাখী ইত্যাদি সবই ছিল। তাঁর নিকটবর্তী ছিল মানুষ, তারপর জ্বিন। পাখী তাঁর মাথার উপর থাকতো। গরমের সময় তারা তাঁকে ছায়া দিতো। সবাই নিজ নিজ পদে প্রতিষ্ঠিত ছিল। যার জন্যে যে জায়গা নির্ধারিত ছিল সে সেই জায়গাতেই থাকতো। এই সেনাবাহিনীকে নিয়ে হযরত সুলাইমান (আঃ) চলতে রয়েছেন। একটি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে তাঁদেরকে গমন করতে হলো যেখানে পিপীলিকার সেনাবাহিনী ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সেনাবাহিনীকে দেখে একটি পিপীলিকা অন্যান্য পিপীলিকাকে বললোঃ “তোমরা নিজ নিজ গর্তে প্রবেশ কর, যেন সুলাইমান (আঃ) ও তার সেনাবাহিনী তাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পদতলে পিষে না ফেলে।”

হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, ঐ পিপীলিকাটির নাম ছিল হারস। সে বানু শায়সানের গোত্রভুক্ত ছিল। সে আবার খোঁড়া ছিল। সে অন্যান্য পিপীলিকার ব্যাপারে ভয় করলো যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ঘোড়াগুলো তাদের ক্ষুরের দ্বারা পিপীলিকাগুলোকে পিষে ফেলবে।

পিপীলিকাটির এ কথা শুনে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর হাসি আসলো এবং তৎক্ষণাৎ তিনি দু'আ করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন যাতে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনি যে অনুগ্রহ করেছেন তার জন্যে। আমার প্রতি আপনার অনুগ্রহ এই যে, আপনি আমাকে পাখী ও জীব-জন্তুর ভাষা শিখিয়েছেন ইত্যাদি এবং আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনার ইনআম এই যে, তাঁরা মুমিন ও মুসলমান হয়েছেন ইত্যাদি। আর আমাকে তাওফীক দিন যাতে আমি সৎ কার্য করতে পারি, যা আপনি পছন্দ করেন এবং আপনার অনুগ্রহে আমাকে আপনার সঙ্কর্মপরায়ণ বান্দাদের শ্রেণীভুক্ত করুন।

তাফসীরকারদের উক্তি রয়েছে যে, এই উপত্যকাটি সিরিয়ায় অবস্থিত ছিল। কেউ কেউ অন্য জায়গাতে বলেছেন। এই পিপীলিকাটি মাছির মত দুই পালক বিশিষ্ট ছিল। অন্য উক্তিও রয়েছে। নাওফ বাক্কালী (রঃ) বলেন যে, পিপীলিকাটি নেকড়ে বাঘের মত ছিল। খুব সম্ভব, আসলে শব্দ লিখে দেয়া হয়েছে অর্থাৎ নেকড়ে বাঘ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

হযরত সুলাইমান (আঃ) জীব-জন্তুর ভাষা বুঝতে পারতেন বলে ঐ পিপীলিকাটির কথা তিনি বুঝে নেন এবং অনিচ্ছাকতভাবে তাঁর হাসি এসে যায়।

আবুস সাদীক নাজী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, সুলাইমান ইবনে দাউদ (আঃ) বৃষ্টির পানি চাওয়ার জন্যে বের হন। তিনি দেখতে পান যে, একটি পিপীলিকা উল্টোভাবে শুয়ে পা আকাশের দিকে উঠিয়ে দু'আ করতে রয়েছেঃ “হে আল্লাহ! আমরাও আপনার সৃষ্টজীব। বৃষ্টির পানির আমরাও মুখাপেক্ষী। যদি আপনি বৃষ্টি বর্ষণ না করেন তবে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।” পিপীলিকাকে এভাবে দু'আ করতে দেখে নিজের লোকেদের মধ্যে ঘোষণা করে দেনঃ “চল, ফিরে যাই। অন্য কারো দুআর বরকতে তোমাদেরকে বৃষ্টির পানি পান করানো হবে।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কোন এক নবীকে একটি পিপীলিকায় কামড়িয়ে নেয়। তিনি তখন পিপীলিকাসমূহের গর্তে আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলা ঐ নবীর নিকট অহী করেনঃ “একটি পিপীলিকায় তোমাকে কেটেছে বলে আমার তাসবীহ পাঠকারী পিপীলিকার বিরাট দলকে তুমি ধ্বংস করে দিলে? প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছা থাকলে যেটা তোমাকে কেটেছে ওর থেকেই প্রতিশোধ নিতে?” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।