আল কুরআন


সূরা আশ-শুআ‘রা (আয়াত: 47)

সূরা আশ-শুআ‘রা (আয়াত: 47)



হরকত ছাড়া:

قالوا آمنا برب العالمين ﴿٤٧﴾




হরকত সহ:

قَالُوْۤا اٰمَنَّا بِرَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ﴿ۙ۴۷﴾




উচ্চারণ: কা-লূ আ-মান্না-বিরাব্বিল ‘আ-লামীন।




আল বায়ান: তারা বলল, ‘আমরা ঈমান আনলাম সকল সৃষ্টির রবের প্রতি’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৭. তারা বলল, আমরা ঈমান আনলাম সৃষ্টিকুলের রব-এর প্রতি—




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলল- ‘আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম রাব্বুল ‘আলামীনের প্রতি,




আহসানুল বায়ান: (৪৭) এবং বলল, ‘বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের প্রতি আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম;



মুজিবুর রহমান: তারা বললঃ আমরা ঈমান আনলাম জগতসমূহের রবের প্রতি –



ফযলুর রহমান: তারা বলল, “আমরা বিশ্বজগতের প্রভুর প্রতি ঈমান আনলাম,



মুহিউদ্দিন খান: তারা বলল, আমরা রাব্বুল আলামীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।



জহুরুল হক: তারা বললে, "আমরা ঈমান আনলাম বিশ্বজগতের প্রভুর প্রতি, --



Sahih International: They said, "We have believed in the Lord of the worlds,



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৭. তারা বলল, আমরা ঈমান আনলাম সৃষ্টিকুলের রব-এর প্রতি—


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৭) এবং বলল, ‘বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের প্রতি আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম;


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১০-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা মূসা ও হারূন (عليهم السلام)-এর দাওয়াতী পদ্ধতি, বানী ইসরাঈলকে ফির‘আউনের দাসে পরিণত করা ও ফির‘আউনের সীমালঙ্ঘন করার কথা আলোচনা করেছেন।



মূসা ও হারূন (عليهم السلام)-এর ফিরআনের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ আল্লাহ তা‘আলা একাধিক স্থানে উল্লখ করেছেন। কারণ এদের ঘটনার মাঝে অনেক শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। তাই বলা হয় “যেখানেই ফির‘আউন সেখানেই মূসা”



আল্লাহ তা‘আলা মূসা (عليه السلام)-কে



الْقَوْمَ الظّٰلِمِيْنَ



তথা ফির‘আউনের কাছে তাক্বওয়ার দাওয়াত দিয়ে প্রেরণ করলেন। ফির‘আউন ছিল সে দেশের তৎকালীন শাসক, মূসা (عليه السلام) সাধারণ একজন নাগরিক। তাই তিনি ভয় পেলে আল্লাহ তা‘আলাকে বললেন: আমি ভয় করছি যে, তারা আমাকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করবে। ভয়ে অন্তর সংকীর্ণ হয়ে আসছে, পূর্ব থেকে তো মুখে জড়তা ছিলই। তাই তিনি সহযোগী হিসেবে ভাই হারূনকে নাবী হিসেবে প্রেরণ করার প্রার্থনা করলেন। অর্থাৎ কিবতী ব্যক্তিকে হত্যা করে আমি তাদের কাছে অপরাধী হয়ে আছি তা তো তাদের জানা। সুতরাং আমি ভয় করছি, তারা আমাকে পেলে হত্যা করে ফেলবে। “আল্লাহ তা‘আলা বললেন: ‘কখনই নয়, অতএব তোমরা উভয়ে আমার নিদর্শনসহ যাও, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, শ্রবণকারী হিসেবে।” এখান থেকে জানা গেলন দাওয়াতী কাজ রাষ্ট্রের শাসক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। আরো জানা গেল, কেউ আল্লাহ তা‘আলার পথে সঠিক দাওয়াতী কাজ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন।



(إِنَّا مَعَكُمْ مُّسْتَمِعُوْنَ)



অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ক্ষমতা, দর্শন, শ্রবণ দ্বারা মূসা (عليه السلام)-এর সাথে ছিলেন। যা পরের শব্দ مُّسْتَمِعُوْنَ তাফসীর করে দিয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সব কিছু দেখছেন শুনছেন। মূসা (عليه السلام)-কে সহযোগিতা করার জন্য আল্লাহ তা‘আলাকে মূসার সাথে যেতে হবে না, আরশের ওপর থেকেই যথেষ্ট।



মূসা (عليه السلام) ফির‘আউনের কাছে গেলেন। বানী ইসরাঈলকে সাথে দিয়ে দেয়ার জন্য আবেদন করলেন। তখন ফির‘আউন মূসা (عليه السلام)-এর শৈশবকাল থেকে যতদূর লালন-পালন করেছে তার ইতিবৃত্ত তুলে ধরল। মূসা (عليه السلام) বললেন: ‎ ‘‘আমি তো এটা করেছিলাম তখন যখন ছিলাম অজ্ঞ।”



অজ্ঞ এর অর্থ হলন অনিচ্ছাকৃতভাবে অজ্ঞতাবশত হত্যা করেছি। হত্যা করা বৈধ মনে করিনি যে কারণে আমি কুফরী পর্যায়ে চলে যাব। আমি বুঝতে পারিনি যে, ঘুষি মারলে মারা যাবে। ফলে আমি আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা চেয়েছি, তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন।



তোমরা যখন হত্যার প্রতিশোধ নিতে এসেছিলে তখন আমি পলায়ন করে মাদইয়ান চলে যাই। পরে আল্লাহ তা‘আলা আমাকে নবুওয়াত দান করেন।



মূসা (عليه السلام) যখন ফির‘আউনের কাছে রবের দাওয়াত দিলেন তখন “ফির‘আউন বলল:‎ ‘জগতসমূহের প্রতিপালক আবার কী?’ মূসা বলল:‎ ‘তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত‎ কিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও।’’ এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে অমুসলিমকে প্রথমে আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদের দাওয়াত দিতে হবে। যেমন মুআয (رضي الله عنه)-কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন সর্বপ্রথম তাকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে বলেন। (সহীহ বুখারী হা: ১৩৯৫)



অতঃপর ফির‘আউনের দাবী অনুযায়ী মূসা (عليه السلام) মু‘জিযাহ প্রকাশার্থে সাপ দেখালে সেখানে উপস্থিত সকল জাদুকর ঈমান আনে এবং তারা বুঝতে পারে এটা কোন জাদু নয়। পরে এসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।



(إِنَّا لَمُدْرَكُوْنَ)



অর্থাৎ যখন মূসা (عليه السلام) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে রওনা দিয়ে সাগর পাড়ে চলে আসেন তখন পিছন দিক থেকে ফির‘আউনের বাহিনী চলে আসে, যখন একদল অপরদলকে দেখতে পেতে লাগল তখন মূসা (عليه السلام)-এর কাছে অভিযোগ করে বানী ইসরাঈল বলল: ‘আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!’ মূসা (عليه السلام) বললেন: ‘কখনই নয়! আমার সঙ্গে আছেন আমার প্রতিপালক; সত্বর তিনি আমাকে পথনির্দেশ করবেন।’ অতঃপর মূসা (عليه السلام)-সহ বানী ইসরাঈলকে নাজাত দেন আর ফির‘আউন ও তার দলবলকে সাগরে ডুবিয়ে মারেন। এ সম্পর্কে ইতোপূর্বে সূরা ত্বা-হা-সহ আরো অন্যান্য সূরাতেও আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ঈমান আনলে অধীনস্থরা এমনিতেই ঈমান আনবে। তাই প্রথমে শাসক শ্রেণিকে ঈমানের দাওয়াত দিতে হবে।

২. অমুসলিমদেরকে প্রথমে তাওহীদের দাওয়াত দিতে হবে।

৩. ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করলে বাধা দিতে হবে।

৪. কোন ব্যক্তির ভয় ঈমানদারকে তার ঈমান থেকে সরাতে পারে না, যেমন ফির‘আউনের জাদুকরেরা ঈমান আনার পর তাদেরকে ভয় দেখানো হলেও তারা ঈমান বর্জন করেনি।

৫. যারা সত্যের অনুসরণ করে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সহযোগিতা দিয়ে থাকেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৮-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর

হযরত মূসা (আঃ) ও ফিরাউনের মধ্যে যে মৌখিক তর্ক-বিতর্ক চলছিল তা শেষ হলো এবং এখন কার্যের বিতর্ক শুরু হলো। এই বিতর্কের আলোচনা সূরায়ে আরাফ, সূরায়ে তোয়া-হা এবং এই সূরায় রয়েছে। কিবতীদের ইচ্ছা ছিল আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করা, আর আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ছিল নূরকে ছড়িয়ে দেয়া। সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছা বিজয় লাভ করেছে। যেখানেই ঈমান ও কফরীর মধ্যে মুকাবিলা হয়েছে সেখানেই ঈমান কুফরীর উপর বিজয়ী হয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ হককে বাতিলের উপর জয়যুক্ত করে থাকেন। বাতিলের মস্তক চূর্ণ হয় এবং লোকদের বাতিল ইচ্ছা বাতাসে উড়ে যায়। সত্য এসে পড়ে এবং মিথ্যা পালিয়ে যায়। এখানেও এটাই হলো। প্রতিটি শহরে পুলিশ পাঠিয়ে দেয়া হয়। চতুর্দিক থেকে বড় বড় খ্যাতনামা যাদুকরদেরকে একত্রিত করা হয়। কথিত আছে যে, তাদের সংখ্যা ছিল বারো হাজার বা পনেরো হাজার অথবা সতেরো হাজার বা ঊনিশ হাজার অথবা আশি হাজার কিংবা এর চেয়ে কিছু কম বা বেশী। সঠিক সংখ্যার জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। এই যাদুকরদের গুরু ও নেতা ছিল চারজন। তাদের নাম ছিল সা’য়ূর, আয়ূর, হাতহাত এবং মুসাফা। দেশের মধ্যে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল বলে নির্ধারিত দিনের পূর্বেই চতুর্দিক হতে দলে দলে লোক এসে মিসরে জমা হয়ে যায়। এটা একটা সুপরিচিত নীতি যে, প্রজারা তাদের বাদশাহর মাযহাবের উপর থাকে, তাই সবারই মুখ দিয়ে একটি কথা বের হচ্ছিলঃ যাদুকরদের বিজয় লাভের পর আমরা তাদেরই অনুসারী হয়ে যাবো। এ কথা কারো মুখ দিয়ে বের হয়নিঃ ‘হক যে দিকে হবে আমরাও সেই দিকে হয়ে যাবো। যথাস্থানে ফিরাউন আমীর-ওমরাহকে সঙ্গে নিয়ে অত্যন্ত জাকজমকের সাথে গমন করলো। সাথে সৈন্য-সামন্তও ছিল। যাদুকরদেরকে সে তার সামনে ডাকিয়ে নিলো। যাদুকররা ফিরাউনকে বললোঃ “আমরা যদি বিজয়ী হই তবে আমাদের জন্যে পুরস্কার থাকবে তো?' ফিরাউন জবাবে বললোঃ “হ্যা, হ্যাঁ, শুধু পুরস্কার নয়, বরং তোমরা আমার নৈকট্য লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

তারা তখন আনন্দে আটখানা হয়ে ময়দানের দিকে চললো। সেখানে গিয়ে তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ “তুমি প্রথমে উস্তাদী দেখাবে, না আমরাই প্রথমে দেখাবো?” হযরত মূসা (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “তোমরাই প্রথমে দেখাও।” অতঃপর যাদুকররা তাদের রঞ্জু ও লাঠি নিক্ষেপ করলো এবং বললোঃ “ফিরাউনের ইযযতের শপথ! আমরাই বিজয়ী হবো।` যেমন সাধারণ অজ্ঞ লোকেরা যখন কোন কাজ করে তখন বলেঃ “এটা অমুকের পুণ্যের কারণে। হয়েছে।` সূরায়ে আ’রাফে রয়েছে যে, যাদুকররা মানুষের চোখে যাদু করে দেয় এবং তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করে ও বড় রকমের যাদু প্রকাশ করে। সূরায়ে তোয়া-হায় আছে যে, তাদের লাঠিগুলো ও তাদের রজ্জ্বগুলো তাদের যাদুর কারণে নড়ছে বলে অনুভূত হতে তাকে (শেষপর্যন্ত)।

এখন হযরত মূসা (আঃ)-এর হাতে যে লাঠিটি ছিল তা তিনি ময়দানে নিক্ষেপ করেন। সাথে সাথে ওটা বিরাট অজগর হয়ে যায় এবং ময়দানে যাদুকরদের যতগুলো ন্যরবন্দীর জিনিস ছিল সবগুলোকেই খেয়ে ফেলে। সুতরাং হক বিজয়ী হয় এবং বাতিল পরাভূত হয়। যাদুকরদের সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়। এ দেখে যাদুকররা সবাই মুসলমান হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে যে, একটি মাত্র লোক যাদু বিদ্যায় পারদর্শী বহু লোকের সাথে মুকাবিলা করে বিজয়ী হয়ে গেল এটা কোন সাধারণ লোক হতে পারে না। যাদু যাদুই বটে। আর এ লোকটির কাছে যা রয়েছে তা কখনো যাদু হতে পারে না, বরং এটা আল্লাহ প্রদত্ত মুজিযা। তারা সেখানেই আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়ে পড়ে এবং সমবেত লোকদের সামনে নিজেদের আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনয়নের কথা ঘোষণা করে। করা বলেঃ “আমরা জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনয়ন করলাম। অতপর নিজেদের কথাকে আরো সুস্পষ্ট করার জন্যে বলেঃ “জগতসমূহের প্রতিপালক বলতে আমরা তাঁকেই বুঝাচ্ছি যাঁকে হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারুন (আঃ) তাঁদের প্রতিপালক বলছেন।”

এতো বড় পরিবর্তন ফিরাউন স্বচক্ষে দেখলো, কিন্তু ঐ অভিশপ্তর ভাগ্যে ঈমান লিখিত ছিল না বলে তখনও তার চোখ খুললো না, বরং সে মহামহিমান্বিত আল্লাহর আরো বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। স্বীয় ক্ষমতাবলে সে সত্যকে দূর করে দেয়ার জন্যে উঠে পড়ে লেগে গেল। সে যাদুকরদেরকে বললোঃ “আমি বুঝতে পেরেছি যে, মূসা (আঃ) তোমাদের সবারই উস্তাদ ছিল। তোমরা বুদ্ধি করে তাকে প্রথমে পাঠিয়েছিলে। তারপর বাহ্যতঃ মুকাবিলা করার জন্যে নিজেরা ময়দানে নেমেছিলে। অতঃপর গোপন পরামর্শ অনুযায়ী তার কাছে। পরাজয়বরণ করে নিলে এবং তাকে মেনে নিলে। কাজেই তোমাদের প্রতারণা আমার কাছে আর গোপন নেই।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।