সূরা আশ-শুআ‘রা (আয়াত: 212)
হরকত ছাড়া:
إنهم عن السمع لمعزولون ﴿٢١٢﴾
হরকত সহ:
اِنَّهُمْ عَنِ السَّمْعِ لَمَعْزُوْلُوْنَ ﴿۲۱۲﴾ؕ
উচ্চারণ: ইন্নাহুম ‘আনিছছাম‘ই লামা‘যূলূন।
আল বায়ান: নিশ্চয়ই তাদেরকে এর শ্রবণ থেকে আড়ালে রাখা হয়েছে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১২. তাদেরকে তো শোনার সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদেরকে এটা শোনা থেকে অবশ্যই দূরে রাখা হয়েছে।
আহসানুল বায়ান: (২১২) অবশ্যই ওদেরকে শ্রবণ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। [1]
মুজিবুর রহমান: তাদেরকে শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে।
ফযলুর রহমান: তাদেরকে (এর) শ্রবণ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মুহিউদ্দিন খান: তাদেরকে তো শ্রবণের জায়গা থেকে দূরে রাখা রয়েছে।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ শুনবার ক্ষেত্রে তারা তো অপারগ।
Sahih International: Indeed they, from [its] hearing, are removed.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২১২. তাদেরকে তো শোনার সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২১২) অবশ্যই ওদেরকে শ্রবণ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। [1]
তাফসীর:
[1] এই আয়াতসমূহে কুরআন যে শয়তানের হস্তক্ষেপ হতে সংরক্ষিত, তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমতঃ শয়তানের কুরআন নিয়ে অবতীর্ণ হওয়ার যোগ্যতাই নেই। কারণ তার উদ্দেশ্য হল, ফিৎনা-ফাসাদ ও নোংরামী প্রচার-প্রসার করা। পক্ষান্তরে কুরআনের উদ্দেশ্য হল কল্যাণ ও পুণ্যের আদেশ ও তার প্রচার-প্রসার করা এবং পাপ ও অন্যায়ের দরজা চিরতরে বন্ধ করা। অর্থাৎ, উভয়ের উদ্দেশ্য এক অপরের বিপরীত ও পরস্পর-বিরোধী। দ্বিতীয়তঃ শয়তান এর শক্তি রাখে না। তৃতীয়তঃ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় শয়তানকে তা শোনা হতে দূরে ও বঞ্চিত রাখা হয়। আকাশে উল্কাসমূহকে তার প্রহরী হিসাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। যখনই কোন শয়তান উপরে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখনই এ সব উল্কা তার উপর বজ্রের ন্যায় আচমকা আঘাত হানে এবং তাকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে। এভাবে মহান আল্লাহ কুরআন সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২১০-২২০ নং আয়াতের তাফসীর:
মানুষ যাতে সন্দেহ পোষণ করতে না পারে সে জন্য প্রথমে আল্লাহ তা‘আলা বলে দিচ্ছেন যে, শয়তানের পক্ষে এ কুরআন নাযিল করা সম্ভব নয়। এমনকি সে এর শ্রবণ থেকেও বিতাড়িত। কারণ কুরআনের যা উদ্দেশ্য তা হল কল্যাণ ও পুণ্যের আদেশ ও তার প্রচার-প্রসার করা। কিন্তু শয়তানের উদ্দেশ্য এর বিপরীত। যার ফলে তার থেকে এ কুরআনকে দূরে রাখা হয়েছে। বরং কুরআন নাযিলের মাধ্যম ছিলেন রূহুল আমীন জিবরীল (عليه السلام) যাঁর গুণাবলী সূরা নাজমে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সতর্ক করে বলছেন যে, তুমি কখনো আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করো না। যদি আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কাউকে মা‘বূদ হিসেবে ডাক তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(لَا تَجْعَلْ مَعَ اللّٰهِ إلٰهًا اٰخَرَ فَتَقْعُدَ مَذْمُوْمًا مَّخْذُوْلًا)
“আল্লাহ তা‘আলার সাথে অপর কোন ইলাহ্ সাব্যস্ত কর না; করলে নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে পড়বে।” (সূরা ইসরা ১৭:২২) শির্ক সম্পর্কে সূরা নিসার ৪৮ নং আয়াতসহ আরো একাধিক স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, তিনি যেন তাঁর নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন এবং আহ্বান জানালেন: হে বানী ফিহর! হে বানী আদী! কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে। অবশেষে তারা জমায়েত হল। যে নিজে আসতে পারল না সে তার প্রতিনিধি পাঠাল যাতে দেখতে পায় ব্যাপার কী? সেখানে আবূ লাহাব ও কুরাইশগণও আসল। তখন রাসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: বল তো আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, শত্র“ সৈন্য উপত্যকায় চলে এসেছে, তারা তোমাদের ওপর হঠাৎ হামলা করতে প্রস্তুত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল: আমরা তোমাকে সর্বদা সত্য পেয়েছি। তখন তিনি বললেন: আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করছি। আবূ লাহাব বলল: সারাদিন তোমার ওপর ধ্বংস নামুক! এ জন্যই কি তুমি আমাদেরকে একত্রিত করেছ? তখন সূরা লাহাব অবতীর্ণ হল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৭০, সহীহ মুসলিম হা: ২০৮)
নম্রতা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَقَدْ جَا۬ءَکُمْ رَسُوْلٌ مِّنْ اَنْفُسِکُمْ عَزِیْزٌ عَلَیْھِ مَا عَنِتُّمْ حَرِیْصٌ عَلَیْکُمْ بِالْمُؤْمِنِیْنَ رَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ)
“অবশ্যই তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তার জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মু’মিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।” (সূরা তাওবাহ ৯:১২৮) এবং যারা তাঁর অনুসরণ করে তাদের সাথে যেন বিনয়ী ভাব অবলম্বন করেন। এর দ্বারা সকল মু’মিনকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ সকল মু’মিনরা যেন তাদের সাথীদের সাথে বিনয়ী হন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِيْنَ)
“তুমি মু’মিনদের জন্য তোমার দয়ার ডানা অবনমিত কর।” (সূরা হিজর: ১৫:৮৮) এ সম্পর্কে সূরা আলে ইমরানের ১৫৯ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
সুতরাং মু’মিনগণ তাদের নিকটাত্মীয়দেরকে প্রথমে আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করবে অতঃপর যারা ঈমান আনবে ও সৎ আমল করবে তাদের প্রতি সদয় হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না।
২. প্রথমত নিজের আত্মীয়স্বজনকে কুরআন ও হাদীসের দাওয়াত দিতে হবে অতঃপর অন্যান্যদেরকে।
৩. অধীনস্থ ব্যক্তিবর্গের সাথে নম্র ব্যবহার করতে হবে। কঠোরতা অবলম্বন করা যাবে না।
৪. সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করতে হবে, অন্য কারো ওপর ভরসা করা যাবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২১০-২১২ নং আয়াতের তাফসীর
মহান আল্লাহ বলেন যে, এটা এমন এক পবিত্র কিতাব যার আশে পাশে মিথ্যা আসতে পারে না। কিতাব (আল-কুরআন) মহাবিজ্ঞানময় ও প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত। এটাকে শক্তিশালী ফেরেশতা রূহুল আমীন (হযরত জিবরাঈল আঃ) আনয়ন করেছেন, শয়তান আনয়ন করেনি।
অতঃপর শয়তান যে এটা আনয়ন করেনি তার তিনটি কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে। যে, সে এর যোগ্যতাই রাখে না। তার কাজ হলো মাখলুককে পথভ্রষ্ট করা, সরল-সঠিক পথে আনয়ন করা নয়। ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ এই কিতাবের বৈশিষ্ট্য। অথচ শয়তান এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এই কিতাব হলো জ্যোতি ও হিদায়াত এবং এটা হলো দলীল। আর শয়তানরা এই তিনটিরই উল্টো। তারা অন্ধকার-প্রিয়। তারা ভ্রান্তপথ প্রদর্শক এবং অজ্ঞতার পাগল। সুতরাং এই কিতাব ও শয়তানদের মধ্যে আকাশ পাতালের পার্থক্য রয়েছে। কোথায় তারা এবং কোথায় এই কিতাব! দ্বিতীয় কারণ এই যে, সে তো এটা বহন করার যোগ্যতাই রাখে না এবং তার মধ্যে এ শক্তিই নেই। এটা এমনই সম্মানিত ও মর্যাদা সম্পন্ন বাণী যে, যদি এটা কোন বড় পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ হয় তবে ওকে ফাটিয়ে চৌচির করে ফেলবে।
এরপর তৃতীয় কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এই কুরআন অবতীর্ণ করার সময় শয়তানদেরকে তো সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তারা তো ওটা শুনতেই পায়নি। আকাশের চতুর্দিকে প্রহরী নিযুক্ত ছিল। শুনবার জন্যে যখনই তারা আকাশে উঠতে যাচ্ছিল তখনই তাদের প্রতি অগ্নি বর্ষিত হচ্ছিল। এর একটি অক্ষরও শুনবার ক্ষমতা তার ছিল না। এর ফলে আল্লাহর কালাম নিরাপদ ও সুরক্ষিত পন্থায় তাঁর নবী (সঃ)-এর নিকট পৌঁছে যায় এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর মাখলুকের কাছে এটা পৌঁছে। এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। যেমন তিনি স্বয়ং জ্বিনদের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আমরা চেয়েছিলাম আকাশের তথ্য সংগ্রহ করতে কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আর পূর্বে আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনবার জন্যে বসতাম কিন্তু এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে তার উপর নিক্ষেপের জন্যে প্রস্তুত জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডের সম্মুখীন হয়। আমরা জানি না জগদ্বাসীর অমঙ্গলই অভিপ্রেত, না তাদের প্রতিপালক তাদের মঙ্গল চান।” (৭২: ৮-১০)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।