আল কুরআন


সূরা আশ-শুআ‘রা (আয়াত: 128)

সূরা আশ-শুআ‘রা (আয়াত: 128)



হরকত ছাড়া:

أتبنون بكل ريع آية تعبثون ﴿١٢٨﴾




হরকত সহ:

اَتَبْنُوْنَ بِکُلِّ رِیْعٍ اٰیَۃً تَعْبَثُوْنَ ﴿۱۲۸﴾




উচ্চারণ: আতাবনূনা বিকুল্লি রী‘ইন আ-য়াতান তা‘বাছূন।




আল বায়ান: ‘তোমরা কি প্রতিটি উঁচু স্থানে বেহুদা স্তম্ভ নির্মাণ করছ’?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২৮. তোমরা কি প্রতিটি উচ্চ স্থানে(১) স্তম্ভ নির্মাণ করছ নিরর্থক?(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা কি প্রতিটি উচ্চস্থানে অনর্থক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছ?




আহসানুল বায়ান: (১২৮) তোমরা তো প্রতিটি উচ্চস্থানে অযথা ইমারত (স্তম্ভ) নির্মাণ করছ (পথিকের সাথে হাসি-তামাশা করার জন্য);[1]



মুজিবুর রহমান: তোমরা কি প্রতিটি উঁচু স্থানে নিরর্থক স্মৃতিসৌধ/ভাস্কর্য নির্মাণ করছ?



ফযলুর রহমান: তোমরা কি প্রতিটি উঁচু জায়গায় অযথা নিদর্শন (স্মৃতিস্তম্ব) নির্মাণ করছ?



মুহিউদ্দিন খান: তোমরা কি প্রতিটি উচ্চস্থানে অযথা নিদর্শন নির্মান করছ?



জহুরুল হক: "তোমরা কি প্রত্যেক পাহাড়ে অযথা স্তম্ভ নির্মাণ করছ,



Sahih International: Do you construct on every elevation a sign, amusing yourselves,



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১২৮. তোমরা কি প্রতিটি উচ্চ স্থানে(১) স্তম্ভ নির্মাণ করছ নিরর্থক?(২)


তাফসীর:

(১) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার মতে رِيعٍ উচ্চ স্থানকে বলা হয়। মুজাহিদ ও অনেক তাফসীরবিদের মতে رِيعٍ দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথকে বলা হয়। [কুরতুবী]


(২) آيَةً এর আসল অর্থ নিদর্শন। এস্থলে সুউচ্চ স্মৃতিসৌধ বোঝানো হয়েছে। تَعْبَثُونَ শব্দটি عبث থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ অযথা বা যাতে কোন প্রকার উপকার নেই। এখানে অর্থ এই যে, তারা অযথা সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ করত, যার কোন প্রয়োজন ছিল না। এতে শুধু গৰ্ব করাই উদ্দেশ্য থাকত। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১২৮) তোমরা তো প্রতিটি উচ্চস্থানে অযথা ইমারত (স্তম্ভ) নির্মাণ করছ (পথিকের সাথে হাসি-তামাশা করার জন্য);[1]


তাফসীর:

[1] رِيع শব্দটি رِيعَة এর বহুবচন। যার অর্থ উঁচু ভূমি, উঁচু ঢিবি, পাহাড়, উপত্যকা বা রাস্তা। রাস্তার উপর অযথা এমন ইমারত (বা স্তম্ভ) তৈরী করত যা উচ্চতায় একটি নিদর্শন হত। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য তাতে বাস করা নয় বরং শুধু খেল-তামাশা করা হত। হূদ (আঃ) তাদেরকে এই বলে নিষেধ করলেন যে, তোমরা এমন কাজ করছ, যাতে সময় ও সম্পদ উভয়ই নষ্ট হচ্ছে। আর তার পশ্চাতে উদ্দেশ্যও এমন, যাতে দ্বীন ও দুনিয়ার কোনই উপকার নেই। বরং তার বেকার ও অনর্থক হওয়াতে কোন সন্দেহ নেই।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১২৩-১৪০ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে আল্লাহ তা‘আলা হূদ (عليه السلام) ও তার জাতি ‘আদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যারা ছিল পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী জাতি।



তাদের কাছে অন্যান্য নাবীদের মত হূদ (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার ভয় ও নিজের রিসালাতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করলেন এবং দাওয়াতী কাজের জন্য কোন পারিশ্রমিক চান না সে কথাও জানালেন, উপরন্তু তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দিলেন। কিন্তু অন্যান্য জাতির ন্যায় তারাও দাওয়াত বর্জন করল। তারা বলল: ‘তুমি উপদেশ দাও অথবা না-ই দাও, উভয়ই আমাদের জন্য সমান।’ হূদ (عليه السلام) তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিলে তারা যে অদ্ভূত আচরণ করেছে তার বিবরণ সূরা আ‘রাফের ৬৫-৭২ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ হয়েছে।



(إِنْ هٰذَآ إِلَّا خُلُقُ الْأَوَّلِيْنَ)



অর্থাৎ নাবীদের দাওয়াত বর্জন করা পূর্ববর্তীদের স্বভাব। তাদের স্বভাব ধারণ করে এরাও অস্বীকার করল। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاَمَّا عَادٌ فَاُھْلِکُوْا بِرِیْحٍ صَرْصَرٍ عَاتِیَةٍﭕ سَخَّرَھَا عَلَیْھِمْ سَبْعَ لَیَالٍ وَّثَمٰنِیَةَ اَیَّامٍﺫ حُسُوْمًاﺫ فَتَرَی الْقَوْمَ فِیْھَا صَرْعٰیﺫ کَاَنَّھُمْ اَعْجَازُ نَخْلٍ خَاوِیَةٍﭖفَھَلْ تَرٰی لَھُمْ مِّنْۭ بَاقِیَةٍ)



“আর ‘আদ সম্প্রদায়, তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় দ্বারা। যা তিনি তাদের ওপর প্রবাহিত করেছিলেন বিরামহীনভাবে সাত রাত ও আট দিন, তুমি (উপস্থিত থাকলে) সেই সম্প্রদায়কে দেখতে খেজুর কাণ্ডের ন্যায় সেখানে ছিন্ন ভিন্নভাবে পড়ে আছে। তুমি কি তাদের কাউকেও অবশিষ্ট দেখতে পাও?” (সূরা হাক্কাহ ৬৯:৬-৮)



তাই আমাদের আগে থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত যে, তারা এক শক্তিশালী জাতি হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলার আযাব থেকে বাঁচতে পারেনি, আমরাও যদি নাফরমানী করি তাহলে আমাদের ওপরও শাস্তি আসবে আর তখন আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি থেকে কেউ আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। অতএব আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে সকল প্রকার শির্ক ও ঈমান বিনষ্টকারী আমল বর্জন করে বেশি বেশি সৎ আমল করা অবশ্য কর্তব্য।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১২৩-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর

এখানে হযরত হূদ (আঃ)-এর ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে যে, তিনি তাঁর সম্প্রদায় আ'দ জাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেন। তারা ছিল আকাফের অধিবাসী। আহকাফ হলো ইয়ামন দেশের হাযূরা মাউতের পার্শ্ববর্তী একটি পার্বত্য অঞ্চল। হব্রত হূদ (আঃ)-এর যুগটি ছিল হযরত নূহ (আঃ)-এর পরবর্তী যুগ। সূরায়ে আব্রাফেও তাঁর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। আ’দ সম্প্রদায়কে হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের স্থলাভিষিক্ত করা হয় এবং তাদেরকে বেশ স্বচ্ছলতা প্রদান করা হয়। তারা ছিল সবল ও সুঠাম দেহের অধিকারী। তাদের ছিল প্রচুর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি। জমি-জমা, বাগ্-বাগীচা, ফলমূল, নদী-প্রস্রবণ ইত্যাদির প্রাচুর্য তাদের ছিল। মোটকথা, সুখের সামগ্রী তাদের সবই ছিল। কিন্তু তারা মহান আল্লাহর নিয়ামতরাশির জন্যে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি এবং তার সাথে শরীক স্থাপন করেছিল। নবী (আঃ)-কে তারা আবিশ্বাস করেছিল। নবী তো ছিলেন তাদেরই একজন। তিনি তাদেরকে বুঝিয়েছিলেন এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি তাদেরকে তাঁর রাসূল হওয়ার কথা বলার পর তাঁর আনুগত্য করার এবং আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করার দাওয়াত দেন, যেমন হযরত নূহ (আঃ) দাওয়াত দিয়েছিলেন।

তারা তাদের শক্তি ও ধনৈশ্বর্যের নিদর্শন রূপে উঁচু উঁচু প্রসিদ্ধ পাহাড়ের উপর উঁচু উঁচু প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল। হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে এভাবে মাল অপচয় করতে নিষেধ করেছিলেন। কেননা, ওটা শুধু মাল অপচয় করা, সময় নষ্ট করা এবং কষ্ট উঠানো ছাড়া কিছুই ছিল না। ওতে না ছিল দ্বীনের কোন উপকার এবং না ছিল কোন উপকার দুনিয়ার। তাদের নবী হযরত হূদ (আঃ) তাই তাদেরকে বলেছিলেন, তোমরা কি প্রতিটি উঁচু স্থানে নিরর্থক স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করছো? তোমরা কি মনে করেছে যে, এখানে তোমরা চিরস্থায়ী হবে? দুনিয়া তোমাদেরকে আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। জেনে রাখো যে, তোমাদের এ মনোবাসনা নিরর্থক। দুনিয়া তো নশ্বর। তোমরা নিজেরাও ধ্বংস হয়ে যাবে। একটি কিরআতে (আরবি) রয়েছে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উত্মা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন মুসলমানরা গৃতায় বড় বড় প্রাসাদ নির্মাণ করে ও সুন্দর সুন্দর বাগান তৈরী করে তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) এসব দেখে মসজিদে দাঁড়িয়ে যান এবং উচ্চ স্বরে বলেনঃ “হে দামেস্কের অধিবাসী! তোমরা আমার কথা শুনো!” জনগণ সব একত্রিত হলে তিনি হামদ ও সানার পর বলেনঃ “তোমাদের কি লজ্জা হয় না, তোমরা কি এটা খেয়াল করছে না যে, তোমরা যা জমা করতে শুরু করেছে তা তোমরা খেতে পার না? তোমরা এমন ঘরবাড়ী তৈরী করতে শুরু করে দিয়েছো যেগুলো তোমাদের বসবাসের কাজে লাগবে না। তোমরা এমন দূরের আশা করতে শুরু করেছে যা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। তোমরা ভুলে গেছো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও বহু কিছু জমা করেছিল, বড় বড় ও উঁচু উঁচু প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল, বড় রকমের আশা তারা পোষণ করেছিল, কিন্তু ফল এই দাঁড়িয়েছিল যে, তারা প্রতারিত হয়েছিল, তাদের সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাদের ঘরবাড়ী, দালান-কোঠা মূলোৎপাটিত হয়েছিল। আ’দ সম্প্রদায়কে দেখো, আদৃন হতে আম্মান পর্যন্ত তাদের ঘোড়া ও উট ছিল। কিন্তু তারা আজ কোথায়? এমন কোন নির্বোধ আছে কি যে আ’দ সম্প্রদায়ের মীরাসকে মাত্র দুই দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করবে?

আল্লাহ তা'আলা আ’দ সম্প্রদায়ের ধন-দৌলত ও ঘরবাড়ীর বর্ণনা দেয়ার পর তাদের বল ও শক্তির বর্ণনা দিয়েছেন যে, তারা বড়ই উদ্ধত, অহংকারী ও পাষাণ হৃদয় ছিল। আল্লাহর নবী হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখালেন এবং তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে বললেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে ঐ সব নিয়ামতের কথা স্মরণ করালেন যেগুলো মহান আল্লাহ তাদেরকে দান করেছিলেন। যেমন চতুষ্পদ জন্তু, সন্তান-সন্ততি, উদ্যান এবং প্রস্রবণ। তারপর তিনি তাদেরকে বললেন যে, তিনি তাদের জন্যে মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করেন। তিনি তাদেরকে জান্নাতের লোভ দেখান এবং জাহান্নাম হতে ভীতি প্রদর্শন করেন। কিন্তু সবই বিফলে যায়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।