সূরা আশ-শুআ‘রা (আয়াত: 102)
হরকত ছাড়া:
فلو أن لنا كرة فنكون من المؤمنين ﴿١٠٢﴾
হরকত সহ:
فَلَوْ اَنَّ لَنَا کَرَّۃً فَنَکُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِیْنَ ﴿۱۰۲﴾
উচ্চারণ: ফালাও আন্না লানা-কাররাতান ফানাকূনা মিনাল মু’মিনীন।
আল বায়ান: ‘হায়, আমাদের যদি আরেকটি সুযোগ হত, তবে আমরা মুমিনদের অর্ন্তভুক্ত হতাম’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০২. হায়, যদি আমাদের একবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ ঘটত, তাহলে আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম!(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমাদের যদি একটিবার পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হত, তাহলে আমরা মু’মিনদের অর্ন্তভুক্ত হয়ে যেতাম।
আহসানুল বায়ান: (১০২) হায়! যদি আমাদের একবার প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ঘটত, তাহলে আমরা বিশ্বাসী হয়ে যেতাম!’[1]
মুজিবুর রহমান: হায়! যদি আমাদের একবার প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ঘটত তাহলে আমরা মু’মিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!
ফযলুর রহমান: (হায়!) আমরা একবার যদি (দুনিয়ায়) ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেতাম তাহলে ঈমানদার হয়ে যেতাম।”
মুহিউদ্দিন খান: হায়, যদি কোনরুপে আমরা পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ পেতাম, তবে আমরা বিশ্বাস স্থাপনকারী হয়ে যেতাম।
জহুরুল হক: হায়! আমাদের জন্য যদি আকেরবার উপায় থাকত তাহলে আমরা মুমিনদের মধ্যেকার হতাম।
Sahih International: Then if we only had a return [to the world] and could be of the believers... "
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০২. হায়, যদি আমাদের একবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ ঘটত, তাহলে আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম!(১)
তাফসীর:
(১) এ আকাংখার জবাবও কুরআনের এভাবে দেয়া হয়েছে, “যদি তাদেরকে পূর্ববর্তী জীবনে ফিরিয়ে দেয়া হয় তাহলে তারা তাই করতে থাকবে যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।” [সূরা আল-আন’আম: ২৮]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০২) হায়! যদি আমাদের একবার প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ঘটত, তাহলে আমরা বিশ্বাসী হয়ে যেতাম!’[1]
তাফসীর:
[1] কাফের ও মুশরিকরা পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করবে, যাতে তারা আল্লাহর আনুগত্য করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে নিতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেন যে, যদি তাদেরকে পুনর্বার পৃথিবীতে পাঠিয়েও দেওয়া হয়, তাহলেও তারা তাই করবে, যা তারা পূর্বে করেছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৯-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তাওহীদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন ও তার জন্য নিজের নিকটাত্মীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে দ্বিধাবোধ করেনি এমন নাবী খলীলুল্লাহ ইবরাহীম (عليه السلام) সম্পর্কে ও তার সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যখন ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁর পিতা ও স্ব-জাতির কাছে মূর্তি মা‘বূদ হতে পারেনা, তারা মা‘বূদ হতে অপারগ এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন তখন তারা বলল: ‘না, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুুরুষদেরকে এরূপই করতে দেখেছি।’ সুতরাং তারা যখন বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে ইবরাহীম (عليه السلام)-এর কথা বর্জন করল তখন তিনি বললেন: ‘তারা সকলেই আমার শত্র“, জগতসমূহের প্রতিপালক ব্যতীত; ‘যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে পথ প্রদর্শন করেন।”
(وَلَا تُخْزِنِيْ يَوْمَ يُبْعَثُوْنَ)
আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: হাশরের ময়দানে ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁর পিতার সাক্ষাত পেয়ে বলবেন: হে আল্লাহ তা‘আলা ! আপনি আমাকে ওয়াদা দিয়েছিলেন, কিয়ামতের দিন আমাকে অপমানিত করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: আমি কাফিরদের ওপর জান্নাত হারাম করে দিলাম। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৬৯)
(وَاغْفِرْ لِأَبِيْ)
‘আর আমার পিতাকে ক্ষমা কর, প্রশ্ন হতে পারে ইবরাহীম (عليه السلام)-এর পিতা মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে ক্ষমা চাইলেন? উত্তরঃ পূর্বে ওয়াদা দিয়েছিলেন সে প্রেক্ষিতে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু যখন প্রমাণিত হল যে, তাঁর পিতা আল্লাহর শত্র“ তখন ক্ষমা চাওয়া বাদ দিলেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ أَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوْا أُولِيْ قُرْبٰي مِنْۭ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحٰبُ الْجَحِيْمِ)
“আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নাবী এবং মু’মিনদের জন্য সঙ্গত নয় যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামী।” (সূরা তাওবাহ ৯:১১৪)
(إِلَّا مَنْ أَتَي اللّٰهَ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍ)
‘সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহ তা‘আলার নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।’
(قَلْبٍ سَلِيْمٍ)
অর্থ এমন অন্তর যা শিরক ও সংশয় থেকে ম্ক্তু। যে অন্তরে পাপ কাজের প্রতি ভালবাসা থাকে না, বারবার বিদ‘আত ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় না। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সম্পদ ও সন্তান কোন উপকারে আসবে না যদি উল্লিখিত গুণাবলী সম্বলিত অন্তর নিয়ে উপস্থিত না হয়। প্রশ্ন হতে পারে সম্পদ ও সন্তান কিভাবে উপকারে আসবে? সম্পদ ও সন্তান উপকারে আসবে যদি সম্পদ সৎপথে উপার্জন ও ব্যয় করা হয় আর সন্তানকে যদি দীনদার বানিয়ে রেখে যাওয়া হয়।
(إِذْ نُسَوِّيْكُمْ) - سوي يسوي
অর্থ বরাবর করে দেয়া, সমান করে দেয়া অর্থাৎ যে সকল পাপিষ্ঠ ব্যক্তিরা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে তাদেরকে আমরা আল্লাহ তা‘আলার সমান করে দিয়েছিলাম। এসকল পাপিষ্ঠ ব্যক্তিরা আল্লাহর ইবাদতের নামে নিজেদের ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছে। সুতরাং ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের ধর্মযাজক আহ্বার ও রুহবানদের ন্যায় একশ্রেণির মানুষ দাড়ি-টুপি পরে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের নামে নিজেদের ইবাদতের দিকে আহ্বান করে; তাদের থেকে আমাদের সাবধান থাকতে হবে।
ইবরাহীম (عليه السلام) ও তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনা ইতোপূর্বে সূরা আম্বিয়াসহ অন্যান্য সূরাতেও আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মুশরিকদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে যদিও নিকটাত্মীয় হয়।
২. মুশরিকদের কাছে দাওয়াত দেয়ার অন্যতম মূলনীতি হল তাদের মা‘বূদের অক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে, তাহলে দাওয়াত সহজেই ফলপ্রসূ হতে পারে।
৩. মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা বৈধ নয়।
৪. কিছু মানুষ আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের নামে নিজেদের ইবাদতের দিকে আহ্বান করে, তাদের থেকে সাবধান থাকতে হবে।।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯০-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর
যারা সৎ কাজ করেছিল, অসৎ কাজ হতে বিরত থেকেছিল, ঐ দিন জান্নাত তাদের পার্শ্বে ও তাদের সামনে সৌন্দর্যমণ্ডিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকবে। পক্ষান্তরে জাহান্নাম এরূপভাবেই অসৎ লোকদের সামনে প্রকাশিত হবে। ওর মধ্য হতে একটি গ্রীবা উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে, যে পাপীদের দিকে ক্রোধের দৃষ্টিতে তাকাবে এবং এমনভাবে চীৎকার শুরু করবে যে, প্রাণ উড়ে যাবে। মুশরিকদেরকে অত্যন্ত ধমকের সুরে বলা হবেঃ তোমরা যেসব বাতিল মা’ৰূদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? তারা তোমাদের কোন উপকার করতে পারে কি? অথবা তারা নিজেরাই নিজেদের কোন সাহায্য করতে সক্ষম কি? না, না। বরং উপাসক ও উপাস্য সবাইকে আজ জাহান্নামে লটকিয়ে রাখা হয়েছে। তারা আজ জাহান্নামের আগুনে ভষ্মিভূত হচ্ছে। অনুসারী ও অনুসৃত সকলকে সেদিন অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আর সাথে সাথে ইবলীসের সেনাবাহিনীর সবকেও অনুরূপভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
সেখানে প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত দুর্বল লোকেরা বড় লোকদের সাথে ঝগড়া করবে ও বলবেঃ “আমরা সারা জীবন তোমাদের কথামত চলেছি। সুতরাং আজ তোমরা আমাদেরকে শাস্তি হতে রক্ষা করছো না কেন? সত্য কথা তো এই যে, আমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম। তোমাদের নির্দেশাবলীকে আমরা আল্লাহর নির্দেশাবলী মনে করে নিয়েছিলাম। বিশ্ব-প্রতিপালকের সাথে তোমাদেরও আমরা ইবাদত করেছিলাম। আমরা তোমাদেরকে যেন আমাদের প্রতিপালকের সমান মনে করেছিলাম। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, পাপীরা আমাদেরকে ঐ ভুল ও বিপজ্জনক পথে পরিচালিত করেছিল। এখন তো আমাদের জন্যে কোন সুপারিশকারী নেই।” তারা পরস্পর বলাবলি করবেঃ “আমাদের জন্যে সুপরিশ করবে এরূপ কোন সুপারিশকারী আছে কি? অথবা আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া যেতে পারে কিন্তু সেখানে গিয়ে আমরা আমাদের পূর্বকৃত আমলের বিপরীত আমল করতাম! এখানে আমাদের জন্যে সুপারিশ করতে পারে এমন কাউকেও দেখছি না এবং কোন সত্যিকারের বন্ধুও পরিলক্ষিত হচ্ছে না যে, সে আমাদের এই দুঃখের সময় সহানুভূতি জ্ঞাপন করে। কেননা তারা জানে যে, যদি কোন ভাল লোকের সাথে তাদের বন্ধুত্ব থাকতো তবে অবশ্যই তারা তাদের উপকার করতো এবং যদি তাদের কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু থাকতো তবে অবশ্যই তাদের সুপরিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতো। আর যদি তাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে তারা তাদের দুষ্কর্ম সংশোধন করে নিতো। কিন্তু সত্য কথা তো এই যে, পুনরায় যদি তাদেরকে দুনিয়ায় ফিরিয়া দেয়াও হয় তবুও তারা আবার ঐ দুষ্কর্মই করতে থাকবে। যেহেতু তারা হলো চরম হতভাগ্য। সূরায়ে (আরবি) এও আল্লাহ তাআলা এই জাহান্নামীদের বিতর্কের কথা বর্ণনা করে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা নিশ্চিত সত্য জাহান্নামীদের এই বাদ-প্রতিবাদ।” (৩৮: ৬৪)।
হযরত ইবরাহীম (আঃ) নিজের কওমের কাছে যা কিছু বর্ণনা করেছেন এবং তাদের সামনে যেসব দলীল প্রমাণ পেশ করেছেন ও তাদেরকে তাওহীদের ব্যাখ্যা শুনিয়েছেন তাতে নিশ্চিতরূপে আল্লাহর আল্লাহ হওয়ার উপর এবং তাঁর একাকীত্বের উপর স্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে, কিন্তু তবুও অধিকাংশ লোকে ঈমান আনয়ন করে না। স্বীয় নবী (সঃ)-কে মহান আল্লাহ সম্বোধন করে বলেনঃ এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তোমার প্রতিপালক মাহাপরাক্রমশালী এবং সাথে সাথে তিনি পরম দয়ালুও বটে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।