সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 71)
হরকত ছাড়া:
ومن تاب وعمل صالحا فإنه يتوب إلى الله متابا ﴿٧١﴾
হরকত সহ:
وَ مَنْ تَابَ وَ عَمِلَ صَالِحًا فَاِنَّهٗ یَتُوْبُ اِلَی اللّٰهِ مَتَابًا ﴿۷۱﴾
উচ্চারণ: ওয়া মান তা-বা ওয়া ‘আমিলা সা-লিহান ফাইন্নাহূইয়াতূবুইলাল্লা-হি মাতা-বা-।
আল বায়ান: আর যে তাওবা করে এবং সৎকাজ করে তবে নিশ্চয় সে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭১. আর যে তাওবা করে ও সৎকাজ করে, সে তো সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর যে ব্যক্তি তাওবাহ করে আর সৎকাজ করে, সে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে- পূর্ণ প্রত্যাবর্তন।
আহসানুল বায়ান: (৭১) যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে, সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ অভিমুখী হয়। [1]
মুজিবুর রহমান: যে ব্যক্তি তাওবাহ করে ও সৎ কাজ করে সে সম্পূর্ণ রূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়।
ফযলুর রহমান: যে তওবা করে ও সৎকাজ করে সে তো পুরোপুরি আল্লাহর দিকেই ফিরে আসে।
মুহিউদ্দিন খান: যে তওবা করে ও সৎকর্ম করে, সে ফিরে আসার স্থান আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
জহুরুল হক: আর যে কেউ তওবা করে এবং সৎকর্ম করে সে-ই তো তবে আল্লাহ্র প্রতি ফেরার মতো ফেরে।
Sahih International: And he who repents and does righteousness does indeed turn to Allah with [accepted] repentance.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭১. আর যে তাওবা করে ও সৎকাজ করে, সে তো সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭১) যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে, সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ অভিমুখী হয়। [1]
তাফসীর:
[1] প্রথম তওবার সম্পর্ক কুফর ও শিরকের সাথে। আর এই তওবার সম্পর্ক অন্যান্য সমস্ত পাপ ও ত্রুটির সাথে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতগুলোতে দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার একনিষ্ঠ বান্দা যারা শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত করে তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও আলামত উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিশ্বাসগত, দৈহিক ও আর্থিক যাবতীয় ব্যক্তিগত কর্মে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিধান অনুসরণ, অপর মানুষের সাথে সামাজিকতা ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রকারভেদ, দিবারাত্রি ইবাদতের মাধ্যমে সাথে আল্লাহ তা‘আলা-ভীতি, যাবতীয় গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার প্রয়াস, নিজের সাথে সাথে সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীদের সংশোধন চিন্তা ইত্যাদি বিষয়বস্তু শামিল রয়েছে। সেগুলো হল:
প্রথম গুণ:
عِبَادُ হওয়া। عِبَادُ শব্দটি عبد এর বহুবচন, অর্থন বান্দা, দাস, গোলাম, যে তার প্রভুর মালিকানাধীন এবং যার সমস্ত ইচ্ছা ও ক্রিয়াকর্ম প্রভুর আদেশ ও মর্জির ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তা‘আলার আবদ বা দাস হতে পারা সৌভাগ্যের ও মর্যাদার ব্যাপার, সবাই আল্লাহ তা‘আলার আবদ হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অনেক স্থানে আবদ বা দাস বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার দাসত্ব দু’প্রকারন (১) عبودية لربوبيته বা আল্লাহ তা‘আলা প্রতিপালন করেন সে জন্য তাঁর দাসত্ব করা, এতে কাফির মুশরিক, মুসলিম সবাই শামিল। কেননা পৃথিবীর সবাই আল্লাহ তা‘আলার প্রতিপালন বা রুবুবিয়াহ স্বীকার করে। (২) عبودية لألوهيته বা আল্লাহ তা‘আলা মা‘বূদ বা তিনি ইবাদত পাওয়ার যোগ্য তাই তাঁর ইবাদত করা। এ প্রকার ইবাদত একমাত্র মুসলিমরাই করে থাকে, এখানে এ প্রকার ইবাদতকারী বান্দাদের আলোচনা করা হয়েছে। (তাফসীর সাদী)
দ্বিতীয় গুণ:
(يَمْشُوْنَ عَلَي الْأَرْضِ هَوْنًا)
‘যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে’ هَوْنً শব্দের অর্থ স্থিরতা, গাম্ভীর্য, বিনয়। অর্থাৎ গর্বভরে চলে না, অহংকারীর ন্যায় পা ফেলে না। আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে খুব বিনয়-নম্রতার সাথে চলে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেনন
(وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ط إِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ)
“এবং পৃথিবীতে গর্বভরে বিচরণ কর না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা কোন দাম্ভিক, অহংকারকারীকে ভালোবাসেন না।” (সূরা লুকমান ৩১:১৮)
তৃতীয় গুণ:
(وَّإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجٰهِلُوْنَ قَالُوْا سَلَامًا)
‘এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা বলে, ‘সালাম’; الْجٰهِلُوْنَ এখানে এই শব্দের অনুবাদ অজ্ঞ ব্যক্তিরা করা হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ বিদ্যাহীন ব্যক্তি নয় বরং যারা মূর্খতাপূর্ণ কথাবার্তা বলে ও কাজ করে যদিও বাস্তবে বিদ্বান হয়। ‘সালাম’ শব্দ বলে এখানে প্রচলিত সালাম বুঝানো হয়নি। বরং নিরাপত্তার কথাবার্তা বুঝানো হয়েছে। ইমাম কুরতুবী নাহহাস থেকে বর্ণনা করেন যে, سلام শব্দটি تسليم থেকে নয় বরং تسلم থেকে উদ্ভুত যার অর্থ নিরাপদ থাকা। উদ্দেশ্য হলন মূর্খদের জবাবে তারা নিরাপত্তার কথাবার্তা বলে, যাতে অন্যরা কষ্ট না পায় এবং কোন বিশৃংখলা না হয় সে জন্য তাদের থেকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوْا عَنْهُ وَقَالُوْا لَنَآ أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ ز سَلٰمٌ عَلَيْكُمْ ز لَا نَبْتَغِي الْجٰهِلِيْنَ
“তারা যখন অসার বাক্য শ্রবণ করে তখন তারা তা উপেক্ষা করে চলে এবং বলে: ‘আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্য এবং তোমাদের প্রতি ‘সালাম’। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।’’ (সূরা কাসাস ২৮:৫৫)
চতুর্থ গুণ:
(وَالَّذِيْنَ يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا)
‘তারা আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য ও ইবাদতের মধ্যে রাত্রি অতিবাহিত করে।’ মানুষ যখন ঘুমিয়ে যায় তখন ইবাদতের কথা বলার কারণ হলন এ সময়টি হল নিদ্রা ও আরামের সময়, এ সময় সালাতের জন্য জাগ্রত হওয়া যেমন কষ্টকর ব্যাপার তেমনি এতে লোক দেখানোর কোন আশংকা থাকে না, ইবাদতে একাগ্রতা আসে। এ সময় আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(كَانُوْا قَلِيْلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ - وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ)
“তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রাবস্থায় অতিবাহিত করত। রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।” (সূরা যারিয়াত ৫১:১৭-১৮)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِسَلَامٍ
হে মানুষ সকল! সালামের প্রসার কর, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ, মানুষকে খাদ্য খাওয়াও, রাতে সালাত আদায় কর যখন মানুষ ঘুমিয়ে যায়, তাহলে শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী হা: ২৪৮৫, সহীহ)
পঞ্চম গুণ:
(وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ)
‘তারা জাহান্নামের শাস্তি থেকে দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে।’ অর্থাৎ রাতে ইবাদত করার পরেও নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকে না বরং জাহান্নামের ভয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। কেননা তারা জানে যে, এ জাহান্নামের শাস্তি চিরস্থায়ী। এর থেকে আল্লাহ তা‘আলা মুক্তি না দিলে মুক্তি পাওয়ার কোন রাস্তা নেই। তারা আল্লাহ তা‘আলার শাস্তির ব্যাপারে ভয় করে। যেমন জাহান্নামের শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِّنْ عَذَابِهَا ط كَذٰلِكَ نَجْزِيْ كُلَّ كَفُوْرٍ)
“তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও হালকা করা হবে না। আমি এরূপই শাস্তি দিয়ে থাকি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে।” (সূরা ফাতির ৩৫:৩৬)
ষষ্ঠ গুণ:
(وَالَّذِيْنَ إِذَآ أَنْفَقُوْا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتُرُوْا)
‘তারা খরচ করার সময় কৃপণতা করে না, আবার অপচয়ও করে না; বরং তারা এ ব্যাপারে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে।’ ইবনু আব্বাস প্রমুখ বলেন: আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য কাজে ব্যয় করাকে اسراف বলা হয়, যদিও তা এক পয়সা হয়। কেউ বলেছেন, বৈধ ও অনুমোদিত কাজে প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় করাকেও اسراف বলা হয়। আর তারা তাক্বওয়া ও ভাল কাজে ব্যয় করতে কুন্ঠাবোধ করে না, যথাসম্ভব ব্যয় করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاٰتِ ذَا الْقُرْبٰي حَقَّه۫ وَالْمِسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيْرًا)
“আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য অধিকার দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও; আর কিছুতেই অপব্যয় কর না।” (বানী ইসরাঈল ১৭:২৬) অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ الْمُبَذِّرِيْنَ كَانُوْآ إِخْوَانَ الشَّيَاطِيْنِ ط وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهٰ كَفُوْرًا)
“যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (সূরা ইসরা ১৭:২৭)
সপ্তম গুণ:
(وَالَّذِيْنَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللّٰهِ إلٰهًا اٰخَرَ)
‘তারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে ইলাহ হিসেবে আহ্বান করে না।’ অর্থাৎ তারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে, অন্য কাউকে তাঁর সাথে মা‘বূদ হিসেবে আহ্বান করে না। যেমন হাদীসে এসেছে: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হলন সবচেয়ে বড় পাপ কোন্টি? তিনি বলেন: আল্লাহর সাথে শির্ক করা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৬০০১-৪৪৭৭, সহীহ মুসলিম হা: ৮৬)
এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّه۫ مَنْ يُّشْرِكْ بِاللّٰهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوٰهُ النَّارُ ط وَمَا لِلظّٰلِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ)
“কেউ আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করলে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। জালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৭২)
অষ্টম গুণ:
(وَلَا يَقْتُلُوْنَ النَّفْسَ الَّتِيْ حَرَّمَ اللّٰهُ إِلَّا بِالْحَقِّ)
‘তারা অন্যায়ভাবে কোন মানুষকে হত্যা করে না।’ তবে যথাযথ কারণ পাওয়া গেলে ভিন্ন কথা, যথাযথ কারণ বলতে যে বিষয়টি বুঝনো হয়েছে তা হল: মুসলিম হওয়ার পর ধর্ম ত্যাগ করে মুর্তাদ হওয়া, এমতাবস্থায় তাকে হত্যা করা বৈধ। বিবাহের পর ব্যভিচারে লিপ্ত হলে তাকে হত্যা করা বৈধ। কাউকে হত্যা করলে কিসাসস্বরূপ তাকে হত্যা করা বৈধ।
নবম গুণ:
(وَلَا يَزْنُوْنَ)
‘তারা যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না।’ বরং নিজেদের সতীত্বকে হেফাযত করে। নিজ স্ত্রী বা দাসী ছাড়া অন্য কারো সাথে এ অপকর্মে লিপ্ত হয় না।
অতঃপর যারা এ সকল অপকর্মে বিশেষ করে উক্ত তিনটি যথা আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক, হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত হবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন এদের শাস্তি দ্বিগুণ করে দেয়া হবে। আর তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তবে যদি কেউ এগুলো করার পর অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে, আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান রাখে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তার গুনাহগুলো আল্লাহ তা‘আলা নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন।
দশম গুণ:
(وَالَّذِيْنَ لَا يَشْهَدُوْنَ الزُّوْرَ)
‘তারা কোন ব্যাপারে কোন মিথ্যা সাক্ষী দেয় না।’ মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া অন্যতম একটি কবীরা গুনাহ, যা ব্যক্তিকে ও সমাজকে নষ্ট করে। হাদীসে এসেছে, আবূ বকর
(رضي الله عنه)
থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে সচেতন করব না? এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন, বর্ণনাকারী বলেন, তখন আমরা বললাম, হ্যাঁ। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। এ কথটি তিনি বার বার বলতে থাকলেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৬৬৪, সহীহ মুসলিম হা: ৮৭)
একাদশ গুণ:
(وَإِذَا مَرُّوْا بِاللَّغْوِ مَرُّوْا كِرَامًا)
‘এবং অসার ক্রিয়াকলাপের সম্মুখীন হলে স্বীয় মর্যাদার সাথে সেটা পরিহার করে চলে।’ অর্থাৎ এমন মাজলিস বা আলোচনা সভা যেখানে এমন কথা-বার্তা হয় যা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য উপকারী নয়, তাহলে তারা সে সব মাজলিস ও বৈঠক বর্জন করে। এতে সকল প্রকার অসার কথা, গান-বাজনা ও অনর্থক কথা চলে আসে।
দ্বাদশ গুণ:
(وَالَّذِيْنَ إِذَا ذُكِّرُوْا بِاٰيٰتِ رَبِّهِمْ)
‘যাদের সম্মুখে তাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহ পাঠ করা হলে তারা অন্ধ ও বধিরসদৃশ আচরণ করে না।’ বরং এতে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পায় ও তার যথার্থ মূল্যায়ন করে, আল্লাহ তা‘আলার জন্য সিজদাবনত হয়, তাঁর প্রশংসা করে এবং অহংকার করে না।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(إِنَّمَا يُؤْمِنُ بِاٰيٰتِنَا الَّذِيْنَ إِذَا ذُكِّرُوْا بِهَا خَرُّوْا سُجَّدًا وَّسَبَّحُوْا بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ)
“কেবল তারাই আমার নিদর্শনগুলোর প্রতি ঈমান রাখে, যাদেরকে আমার আয়াতসমূহ যখন স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং স্বীয় প্রতিপালকের প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, আর তারা অহঙ্কার করে না।” (সূরা সিজদাহ ৩২:১৫)
ত্রয়োদশ গুণ:
(وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا)
‘এবং তারা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শস্বরূপ কর।’ সুতরাং আমরা যারা আল্লাহ তা‘আলার একনিষ্ঠ বান্দা হতে চাই তাদের উচিত উপরোল্লিখিত এ সকল বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না।
২. কোন প্রকার গর্ব অহঙ্কার করা যাবে না।
৩. কোন প্রকার কৃপণতা ও অপচয় করা যাবে না।
৫. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যাবে না।
৫. অশ্লীল কার্যকলাপ করা যাবে না।
৬. ভুলবশত পাপ কাজ হয়ে গেলেও সাথে সাথে তাওবাহ করে নিতে হবে।
৭. মিথ্যা কথা বলা যাবে না ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া যাবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬৮-৭১ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেঃ “তারপর কোনটি?” জবাবে তিনি বলেনঃ “তুমি তোমার সন্তানকে এ ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সাথে খাদ্য খাবে।” পুনরায় লোকটি প্রশ্ন করেঃ “তারপর কোন পাপটি সবচেয়ে বড়?” তিনি উত্তর দেন: “ঐ পাপটি এই যে, তুমি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়।” হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এই আয়াত দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ উক্তিকে সত্যায়িত করা হয়েছে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হন। আমিও তার পিছন ধরি। তিনি একটি উঁচু জায়গায় বসে পড়েন। আমি তাঁর নীচে বসি। আমি তার সাথে এই নির্জন অবস্থানকে বাক্যালাপের অতি উত্তম সময় মনে করে তাকে উপরোক্ত প্রশ্নগুলো করি।”
বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তোমরা চারটি গুনাহ হতে বহু দূরে থাকবে। সেগুলো হলোঃ তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করবে না, ব্যভিচার করবে না এবং চুরি করবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যভিচারের ব্যাপারে তোমরা কি বল?” তাঁরা উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) ওটা হারাম করেছেন এবং ওটা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, মানুষের তার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা অন্য দশ জন নারীর সাথে ব্যভিচার করা অপেক্ষাও জঘন্যতম।” আবার তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেনঃ “চুরি সম্পর্কে তোমরা কি বল?” তাঁরা জবাব দেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) এটা হারাম করেছেন, সুতরাং এটা হারাম।” তাহলে অনুরূপভাবে জেনে রেখো যে, দশটি বাড়ীতে চুরি করা ততো মন্দ নয়, প্রতিবেশীর একটি বাড়ীতে চুরি করা যতো মন্দ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত হায়সাম ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “শিরকের পরে এর চেয়ে বড় পাপ আর নেই যে, মানুষ তার বীর্য এমন রেহেমে বা গর্ভাশয়ে নিক্ষেপ করে যা তার জন্যে হালাল নয়।” (এ হাদীসটি আবু বকর ইবনে আবি দুনিয়া (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মুশরিকদের কতকগুলো লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে যারা বহু হত্যাকার্য ও ব্যভিচার করেছিল। তারা বলেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি যা কিছু বলছেন এবং যে দিকে আহ্বান করছেন তার সবই উত্তম ও সত্য। কিন্তু আমরা যেসব পাপকার্য করেছি সেগুলোর ক্ষমা আছে কি?” ঐ সময় (আরবি)এবং(আরবি) (৩৯:৫৩) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবু ফাখতাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলেনঃ “তুমি সৃষ্টিকর্তাকে ছেড়ে সৃষ্টের উপাসনা করবে এটা থেকে আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে নিষেধ করেছেন। আর তুমি তোমার কুকুরকে প্রতিপালন করবে এবং তোমার সন্তানকে হত্যা করবে এটা থেকেও আল্লাহ তোমাকে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তোমাকে এ কাজেও নিষেধ করেছেন যে, তুমি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
ঘোষিত হচ্ছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে।”
(আরবি) জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম। এটা হলো ঐ উপত্যকা, যার মধ্যে ব্যভিচারীদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। এর অর্থ শাস্তিও এসে থাকে।
বর্ণিত আছে যে, হযরত লোকমান (আঃ) স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেনঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! তুমি ব্যভিচার হতে বেঁচে থাকবে। কেননা ওর শুরুতেও ভয়, শেষেও ভয়।”
আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে মাওকূফ রূপে এবং মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) ও (আরবি) জাহান্নামের দু’টি কূপ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে দয়া করে এ দুটো হতে রক্ষা করুন! সুদ্দী (রঃ) -এর অর্থ প্রতিফল’ বলেছেন। প্রকাশ্য আয়াতের সাথে এটাই বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরবর্তী আয়াত যেন এই প্রতিফল ও শাস্তিরই তাফসীর যে, কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে সে স্থায়ী হবে হীন অবস্থায়।
এই কার্যাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা নয় যারা তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করে। আল্লাহ তাদের পাপ পরিবর্তন করে দিবেন। পুণ্যের দ্বারা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হত্যাকারীর তাওবাও গ্রহণযোগ্য। সূর্যয়ে নিসায় যে রয়েছে (আরবি) (৪:৯৩) এ আয়াতটি এর বিপরীত নয়, যদিও এটা মাদানী। আয়াত। কেননা, এটা সাধারণ কথা। কাজেই এ হুকুম প্রযোজ্য হবে ঐ হত্যাকারীদের উপর যারা তাদের এ কাজ হতে তাওবা করেনি। আর এখানকার এ আয়াতটি প্রযোজ্য ঐ হত্যাকারীদের উপর যারা তাওবা করেছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদেরকে ক্ষমা না করার কথা ঘোষণা করেছেন। আর সহীহ হাদীস দ্বারাও হত্যাকারীর তাওবা কবুল হওয়া প্রমাণিত। যেমন ঐ লোকটির ঘটনা যে একশ’ জন লোককে হত্যা করেছিল এবং তারপর তাওবা করেছিল, আর তার তাওবা ককূলও হয়েছিল ইত্যাদি।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ তাদের পাপ পরিবর্তন করে দিবেন পুণ্যের দ্বারা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এরা ঐসব লোক যারা ইসলাম কবুল করার পূর্বে পাপ কাজ করেছিল, ইসলাম গ্রহণ করার পর পুণ্যের কাজ করেছে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পাপ কার্যের পরিবর্তে পণ্যের কাজ করার তাওফীক দিয়েছেন।
আতা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো দুনিয়ার বর্ণনা, আল্লাহ তাআলা দয়া করে মানুষের বদভ্যাসকে ভাল অভ্যাসে পরিবর্তিত করে থাকেন। সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, মানুষ প্রতিমা পূজার পরিবর্তে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার তাওফীক লাভ করেছে। মুমিনদের সঙ্গে যুদ্ধ করার পরিবর্তে তারা কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করতে শুরু করেছে। তারা মুশরিকী নারীদেরকে বিয়ে করার পরিবর্তে মুমিনা নারীদেরকে বিয়ে করেছে।
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, পাপের পরিবর্তে তারা পুণ্যের আমল করতে শুরু করেছে। শিরকের পরিবর্তে তারা লাভ করেছে তাওহীদ ও আন্তরিকতা এবং দুষ্কর্মের পরিবর্তে লাভ করেছে পুণ্যশীলতা। একটি অর্থ তো হলো এটা। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, তাদের তাওবা আন্তরিকতাপূর্ণ ছিল বলে মহামহিমান্বিত আল্লাহ খুশী হয়ে তাদের পাপগুলোকে পুণ্যে পরিবর্তিত করেছেন।
কেননা, তাওবার পরে যখনই তাদের পূর্বের পাপকর্মগুলোর কথা স্মরণ হতে তখনই তারা লজ্জিত হতো। ঐ সময় তারা দুঃখিত হতো ও ক্ষমা প্রার্থনা করতো। এ জন্যেই তাদের পাপ আনুগত্যের সাথে বদলে যায়। যদিও ওগুলো আমলনামায় গুনাহরূপে লিখিত হয়, কিন্তু কিয়ামতের দিন সবই নেকী হয়ে যাবে। এটা হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত।
হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সর্বশেষে জাহান্নাম হতে বের হবে এবং সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে তাকে আমি চিনি। সে হবে ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা'আলার সামনে আনয়ন করা হবে। আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “তার বড় বড় পাপগুলো ছেড়ে দিয়ে ছোট ছোট পাপগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ কর।” সুতরাং তাকে প্রশ্ন করা হবেঃ “অমুক দিন কি তুমি অমুক কাজ করেছিলে? অমুক অমুক পাপ তুমি করেছিলে কি?” সে একটিও অস্বীকার করতে পারবে না, বরং সবটাই স্বীকার করে নিবে। শেষে আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেনঃ “আমি তোমাকে তোমার প্রতিটি পাপের বিনিময়ে পুণ্য দান করেছি।” তখন সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি আরো কতকগুলো কাজ করেছিলাম যেগুলো এখানে দেখছি না?” বর্ণনাকারী বলেন যে, এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে ওঠেন, এমনকি তার দাঁতের মাড়ী দেখতে পাওয়া যায়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আবু মালিক আল আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আদম সন্তান যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন ফেরেশতা শয়তানকে বলেনঃ “তোমার সহীফাটি (পুস্তিকাটি) আমাকে দাও।” তখন সে ওটা তাঁকে দিয়ে দেয়। তিনি তখন তার এক একটি পুণ্যের বিনিময়ে তার সহীফা হতে দশ দশটি পাপ মুছে ফেলেন। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউই যখন ঘুমাবার ইচ্ছা। করবে তখন যেন ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ বলে নেয়। এগুলো মিলে মোট একশ’ বার হবে। (এটা হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত সালমান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন মানুষকে আমলনামা দেয়া হবে। সে পড়তে শুরু করে দিবে। উপরে তার পাপগুলো লিপিবদ্ধ দেখে সে কিছুটা নিরাশ হয়ে যাবে। তৎক্ষণাৎ তার দৃষ্টি নীচের দিকে পড়বে। সেখানে সে তার পুণ্যগুলো লিপিবদ্ধ দেখবে। ফলে তার মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হবে। অতঃপর পুনরায় সে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাবে যে তার পাপগুলোও পুণ্যে পরিবর্তিত হয়েছে।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “বহু লোক আল্লাহ তা'আলার সামনে হাযির হবে যাদের কিছু পাপ থাকবে।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “তারা কারা?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওরা তারাই যাদের পাপগুলোকে আল্লাহ পুণ্যে পরিবর্তিত করবেন।”
হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেনঃ “চার প্রকারের লোক জান্নাতে যাবে। প্রথম হলো মুত্তাকীন বা পরহেযগারী অবলম্বনকারী। দ্বিতীয় হলো শুকুরগুর বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। তৃতীয় হচ্ছে আল্লাহকে ভয়কারী এবং চতুর্থ হচ্ছে আসহাবুল ইয়ামীন অর্থাৎ যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে।” তাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “তাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীন কেন বলা হয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “কেননা, তারা পাপ ও পুণ্য সবই করেছিল। তাদের আমলনামা তারা ডান হাতে পাবে। তারা তাদের পাপের এক একটি অক্ষর দেখে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! এগুলোতে আমাদের পাপ, আমাদের পুণ্যগুলো কোথায় গেল? ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা ঐ পাপগুলোকে মুছে ফেলবেন এবং ওগুলোর স্থলে পুণ্যসমূহ লিখে দিবেন। ওগুলো পড়ে তারা খুশী হবে এবং অন্যদেরকে বলবেঃ ‘নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো। জান্নাতীদের অধিকাংশ এরাই হবে।”
যাইনুল আবেদীন আলী ইবনে হুসাইন (রঃ) বলেন যে, পাপকে পুণ্যে পরিবর্তনকরণ আখিরাতে হবে। মাকহুল (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন এবং ওগুলোকে পুণ্যে পরিণত করবেন।
হযরত মকিল (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একজন অতি বৃদ্ধ লোক, যার গুলো চোখের উপর এসে গিয়েছিল, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে আরয করেঃ “আমি এমন একটি লোক যে, আমি কোন বিশ্বাসঘাতকতা, কোন পাপ এবং কোন দুষ্কার্য করতে বাকী রাখিনি। আমার পাপরাশি এতো বেড়ে গেছে যে, যদি সেগুলো সমস্ত মানুষের উপর বন্টন করে দেয়া হয় তবে সবাই আল্লাহর গবে পতিত হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় আমার পাপরাশির ক্ষমার কোন উপায় আছে কি? এখনো আমার তাওবা কবূল হতে পারে কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে উত্তরে বলেনঃ “তুমি মুসলমান হয়েছে কি?” লোকটি জবাবে বলেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদান নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি যা কিছু করেছিলে আল্লাহ সবই মাফ করে দিবেন এবং তোমার পাপগুলো পুণ্যে পরিবর্তিত করবেন। যতদিন তুমি এর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে ।” সে তখন বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বিশ্বাসঘাতকতা ও দুষ্কর্মগুলো (তিনি পুণ্যে পরিবর্তিত করবেন)?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যা, তোমার বিশ্বাসঘাতকতা ও দুষ্কর্মগুলোই (আল্লাহ তাআলা পুণ্যে পরিবর্তিত করে দিবেন)।” লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার ছোট-বড় সব পাপই কি মাফ হয়ে যাবে?” তিনি জবাবে বলেনঃ “হ্যা, সবই মাফ হয়ে যাবে।” সে তখন আনন্দে আটখানা হয়ে তাকবীর ধ্বনি দিতে দিতে ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়তে পড়তে ফিরে গেল। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু ফারওয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “যদি একটি লোক শুধু পাপই করে থাকে এবং মনে যা হয়েছে তাই করে থাকে, তবে তারও কি তাওবা কবুল হতে পারে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি ইসলাম কবুল করেছো কি?” তিনি জবাব দেনঃ “হ্যা।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাহলে এখন থেকে পুণ্যের কাজ করতে থাকো ও পাপের কাজ হতে বিরত থাকো। এ কাজ করলে আল্লাহ তাআলা তোমার পাপগুলোকেও পুণ্যে পরিবর্তিত করবেন।” তিনি বলেনঃ “আমার বিশ্বাসঘাতকতা ও অপকর্মগুলোও (পুণ্যে পরিবর্তিত হয়ে যাবে)?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ।” তিনি তখন তাকবীর ধ্বনি করতে করতে প্রত্যাবর্তন করেন। (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “একটি স্ত্রীলোক আমার কাছে এসে বলে-আমি ব্যভিচার করেছি, ওতে শিশুর জন্ম হয়েছে এবং ঐ শিশুকে মেরে ফেলেছি। এর পরেও আমার তাওবা কবূল হওয়ার কোন উপায় আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ “না, তোমার চক্ষু ঠাণ্ডা হবে না এবং আল্লাহর নিকট তুমি মর্যাদাও লাভ করবে না। তোমার তাওবা কখনোই ককূল হতে পারে না। এ কথা শুনে মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ফজরের নামায আদায় করে আমি তাঁর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “তুমি তাকে খুবই মন্দ কথা বলেছো। অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করে আমাকে বললেনঃ “তুমি কি কুরআন কারীমের এ আয়াতগুলো পাঠ করনি।” এতে আমি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ি এবং ঐ স্ত্রীলোকটির নিকট গমন করি ও তাকে আয়াতগুলো পাঠ করে শুনাই। তাতে সে খুবই খুশী হয় এবং তৎক্ষণাৎ সিজদায় পড়ে গিয়ে বলতে থাকেঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, তিনি আমার মুক্তির উপায় উদ্ভাবন করেছেন।” (এ হাদীসটিও তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, মহিলাটি হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর প্রথম ফতওয়াটি শুনে আফসোস করে বলেঃ “হায়! এই সুন্দর আকৃতি কি জাহান্নামের জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছিল?” তাতে এও রয়েছে যে, আবু হুরাইরা (রাঃ) যখন নিজের ভুল জানতে পারেন তখন তিনি ঐ মহিলাটির খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। মদীনার সমস্ত গলিতে তিনি তাকে খোঁজ করেন। কিন্তু কোথায়ও খুঁজে পাননি। ঘটনাক্রমে রাত্রে মহিলাটি আবার আসে। তখন হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) তাকে সঠিক মাসআলাটি বলে দেন। এটাও তাতে আছে যে, সে আল্লাহর প্রশংসা করে বলেঃ “তিনি এতই মহান যে, আমার পরিত্রাণের উপায় উদ্ভাবন করেছেন এবং আমার তাওবা কবুল হওয়ার কথা বলেছেন।” এ কথা বলে তার সাথে যে দাসীটি ছিল তাকে সে আযাদ করে দেয়। ঐ দাসীটির একটি কন্যাও ছিল। অতঃপর সে বিশুদ্ধ অন্তরে তাওবা করে।
এরপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দয়া, স্নেহ, অনুগ্রহ ও করুণার খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের দুষ্কর্মের কারণে লজ্জিত হয়ে তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবূল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করে বা নিজের নফসের উপর যুলুম করে, অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু পাবে।” (৪:১১০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন।” (৯:১০৪) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আমার যে বান্দারা তাদের নফসের উপর বাড়াবাড়ি করেছে (বহু পাপ করেছে) তাদেরকে বলে দাও যে, তারা যেন আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ না হয়।” (৩৯: ৫৩) অর্থাৎ যারা পাপ করার পর আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করেছে। তারা যেন তার করুণা হতে নিরাশ না হয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।