আল কুরআন


সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 60)

সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 60)



হরকত ছাড়া:

وإذا قيل لهم اسجدوا للرحمن قالوا وما الرحمن أنسجد لما تأمرنا وزادهم نفورا ﴿٦٠﴾




হরকত সহ:

وَ اِذَا قِیْلَ لَهُمُ اسْجُدُوْا لِلرَّحْمٰنِ قَالُوْا وَ مَا الرَّحْمٰنُ ٭ اَنَسْجُدُ لِمَا تَاْمُرُنَا وَ زَادَهُمْ نُفُوْرًا ﴿ٛ۶۰﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইযা-কীলা লাহুমুছজু দূ লিররাহমা-নি কা-লূ ওয়ামার রাহমা-নু আনাছজুদু লিমা-তা’মুরুনা-ওয়া যা-দাহুম নুফূরা (ছিজদাহ-৭) ।




আল বায়ান: আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ‘রহমান’ কে সিজদা কর, তখন তারা বলে, রহমান কী আবার? তুমি আমাদেরকে আদেশ করলেই কি আমরা সিজদা করব? আর এটা তাদের পলায়নপরতাই বৃদ্ধি করে।[সাজদাহ]




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬০. আর যখন তাদেরকে বলা হয়, সিজদাবনত হও রাহমান এর প্রতি, তখন তারা বলে রাহমান আবার কি?(১) তুমি কাউকে সিজদা করতে বললেই কি আমরা তাকে সিজদা করব? আর এতে তাদের পলায়নপরতাই বৃদ্ধি পায়।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদেরকে যখন বলা হয় ‘রহমান’-এর উদ্দেশে সাজদায় অবনত হও, তারা বলে- ‘রহমান আবার কী? আমাদেরকে তুমি যাকেই সেজদা করতে বলবে আমরা তাকেই সেজদা করব নাকি?’ এতে তাদের অবাধ্যতাই বেড়ে যায়। [সাজদাহ]




আহসানুল বায়ান: (৬০) যখন ওদেরকে বলা হয়, ‘পরম দয়াময়ের প্রতি তোমরা সিজদাবনত হও।’ তখন ওরা বলে, ‘পরম দয়াময় আবার কে? তুমি কাউকেও সিজদা করতে বললেই কি আমরা তাকে সিজদা করব?’ আর এতে ওদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়। [1] (সাজদাহ-৭)



মুজিবুর রহমান: যখন তাদেরকে বল হয়ঃ সাজদাহবনত হও ‘রাহমান’ এর প্রতি তখন তারা বলেঃ রাহমান আবার কে? তুমি কেহকে সাজদাহ করতে বললেই কি আমরা তাকে সাজদাহ করব? এতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়। [সাজদাহ]



ফযলুর রহমান: তাদেরকে যখন বলা হল, “করুণাময়কে সেজদা করো” তখন তারা বলল, “করুণাময় আবার কি? তুমি যাকে সেজদা করার আদেশ দেবে আমরা কি তাকেই সেজদা করব?” এতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পেয়েছে।সেজদা



মুহিউদ্দিন খান: তাদেরকে যখন বলা হয়, দয়াময়কে সেজদা কর, তখন তারা বলে, দয়াময় আবার কে? তুমি কাউকে সেজদা করার আদেশ করলেই কি আমরা সেজদা করব? এতে তাদের পলায়নপরতাই বৃদ্ধি পায়।



জহুরুল হক: আর যখন তাদের বলা হয়, 'পরম করুণাময়কে সিজদা কর’, তারা বলে -- "করুণাময় আবার কে? আমরা কি তাকেই সিজদা করব যার সন্বন্ধে তুমি আমাদের আদেশ কর?" আর এটি তাদের জন্য বাড়িয়ে দেয় বিতৃষ্ণা।



Sahih International: And when it is said to them, "Prostrate to the Most Merciful," they say, "And what is the Most Merciful? Should we prostrate to that which you order us?" And it increases them in aversion.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬০. আর যখন তাদেরকে বলা হয়, সিজদাবনত হও রাহমান এর প্রতি, তখন তারা বলে রাহমান আবার কি?(১) তুমি কাউকে সিজদা করতে বললেই কি আমরা তাকে সিজদা করব? আর এতে তাদের পলায়নপরতাই বৃদ্ধি পায়।


তাফসীর:

(১) মক্কার কাফেররা এ নামটি যে জানত না তা নয়। তারা এ নামটি জানত। তবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করতে দ্বিধা করত। তারা এ নামটিকে কোন কোন মানুষকেও প্রদান করত। অথচ এ নামটি এমন এক নাম যা শুধুমাত্র মহান রাব্বুল আলমীনের জন্যই নির্দিষ্ট। কোন ক্রমেই অন্য কারো জন্য এ নামটিকে নাম হিসেবে বা গুণ হিসেবে ব্যবহার করা জায়েয নেই। কিন্তু তারা হঠকারিতাবশতঃ প্রশ্ন করল যে, রহমান কে এবং কি? হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনও তারা এমনটি অস্বীকার করে বলেছিলঃ “আমরা রহমান বা রহীম কি জিনিস তা জানিনা; বরং যেভাবে তুমি আগে লিখতে, সেভাবে ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ লিখা।” [মুসলিমঃ ১৭৮৪] সূরা আল-ইসরার ১১০ নং আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা কাফেরদেরকে উদ্দেশ্য করে তার এ নামের তাৎপর্য বর্ণনা করে বলেছেন যে, “আল্লাহকে ডাক বা রহমানকে ডাক, যেভাবেই ডাক এগুলো তার সুন্দর নামসমূহের অন্তর্গত”।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬০) যখন ওদেরকে বলা হয়, ‘পরম দয়াময়ের প্রতি তোমরা সিজদাবনত হও।’ তখন ওরা বলে, ‘পরম দয়াময় আবার কে? তুমি কাউকেও সিজদা করতে বললেই কি আমরা তাকে সিজদা করব?’ আর এতে ওদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়। [1] (সাজদাহ-৭)


তাফসীর:

[1] رحمن و رحيم (রাহমান ও রাহীম) আল্লাহর সুন্দর গুণ ও নামাবলীর মধ্যে দু’টি গুণবাচক নাম। কিন্তু জাহেলী যুগের লোকেরা আল্লাহকে উক্ত নামে চিনত না। যেমন হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্র লেখার সময় শুরুতে بسم الله الرحمن الرحيم লেখা হলে মক্কার মুশরিকরা বলেছিল, আমরা রাহমান ও রাহীমকে জানি না। باسمك اللّهم লেখ। (সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৩১৭) আরো দেখুন সূরা বানী ইস্রাঈল ১১০ এবং সূরা রা’দ ৩০নং আয়াত; এখানেও কাফেরদের ‘রাহমান’ নাম শুনে চমকে যাওয়া ও সিজদা করতে অস্বীকার করার কথা বর্ণিত হয়েছে। (এই আয়াত পাঠ করার পর সিজদা করা মুস্তাহাব। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ’রাফের শেষ আয়াতের টীকা দেখুন। -সম্পাদক)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৫-৬০ নং আয়াতের তাফসীর:



প্রথমত আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের বোকামির কথা বর্ণনা করেছেন যে, তারা আল্লাহ তা‘আলাকে ব্যতীত যেসব মূর্তি, গাছ, কবরে শায়িত ব্যক্তি ইত্যাদির ইবাদত করে তারা তাদের কোনই লাভ বা ক্ষতি করতে পারে না। সুতরাং এদের ইবাদত করা বোকামি ব্যতীত আর কিছুই নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاتَّخَذُوْا مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ اٰلِهَةً لَّعَلَّهُمْ يُنْصَرُوْنَ ط‏ لَا يَسْتَطِيْعُوْنَ نَصْرَهُمْ وَهُمْ لَهُمْ جُنْدٌ مُّحْضَرُوْنَ)



“তারা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অনেক মা‘বূদ গ্রহণ করেছে এ আশায় যে, তাদেরকে অনুগ্রহ করা হবে। এসব ইলাহ তাদের কোনই সাহায্য করতে সক্ষম নয়। এরা তাদের সৈন্য (সাহায্যকারী) হিসেবে উপস্থাপিত হবে।” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৭৪-৭৫) এ সম্পর্কে সূরা হাজ্জের ১২ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)‎-কে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছেন। অর্থাৎ মু’মিনদের জন্য সুসংবাদদাতা ও কাফিরদের জন্য সতর্ককারী, যারা আনুগত্য করবে তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ আর যারা অস্বীকার করবে তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির ব্যাপারে সতর্ককারী রূপে এবং তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)‎-কে এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন বলেন, হে মানুষ! আমি তোমাদের নিকট ঈমানের দাওয়াত ও আল্লাহ তা‘আলার বিধি-বিধান পৌঁছে দেয়ার জন্য কোন পারিশ্রমিক চাই না। যার মন চায় , সে আল্লাহ তা‘আলার পথ অবলম্বন করবে। এতে তারই উপকার হবে। এ সম্পর্কে সূরা হূদ-এ আলোচনা করা হয়েছে।



(وَتَوَكَّلْ عَلَي الْحَيِّ....)



‘তুমি নির্ভর কর সেই চিরঞ্জীবের ওপর, যিনি মরবেন না’ যিনি চিরঞ্জীব কখনো মারা যাবেন না তিনি হলেন আল্লাহ তা‘আলা। সুতরাং সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা কর। এখানে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে সকল মানব জাতিকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। ভরসা করা দু’প্রকার-(১) এমন বিষয়ে ভরসা করা যা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ দিতে পারে না, যেমন সন্তান দেয়া, বিপদ থেকে মুক্তি দেয়া ইত্যাদি যা আল্লাহ তা‘আলা কোন বান্দার হাতে সাময়িকের জন্যও দেননি। এরূপ ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করতে হবে, অন্য কারো ওপর ভরসা করলে শির্ক হবে। (২) এমন বিষয়ে ভরসা করা যা সাময়িকভাবে বান্দাকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যেমন টাকা-পয়সার সহযোগিতা দেয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভরসা করা যাবে।



(عَلَي الْعَرْشِ.... الَّذِيْ خَلَقَ)



‘তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও তাদের উভয়ের মধ্যবর্তী সমস্ত‎ কিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন’ এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৫৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যখন তাদেরকে বলা হয় তোমরা রহমানকে সিজদা কর, তখন তারা তা অস্বীকার করেন যেমন হাদীসে এসেছে:



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আলী (رضي الله عنه)-কে বললেন, লেখন



(بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ)



দয়াময় ও দয়ালু আল্লাহ তা‘আলার নামে শুরু করছি। তখন তারা (কাফিররা) বলল, আমরা রহমান ও রাহিমকে চিনি না। বরং তুমি ঐভাবে লেখ যে, হে আল্লাহ তা‘আলা! তোমার নামে।



সুতরাং তারা দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার জন্য সাজদাহ করত না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِذَا قُرِئَ عَلَيْهِمُ الْقُرْاٰنُ لَا يَسْجُدُوْنَ)



“এবং যখন তাদের নিকট কুর’আন পাঠ করা হয় তখন তারা সিজদা করে না?” (সূরা ইনশিকাক ৮৪:২১)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِذَا قِيْلَ لَهُمُ ارْكَعُوْا لَا يَرْكَعُوْنَ)‏



“যখন তাদেরকে বলা হয়ঃ তোমরা রুকূ কর (সালাত আদায় কর) তখন তারা রুকূ করে না।” (সূরা মুরসালাত ৭৭:৪৮)



বরং তারা এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত এবং আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকার করত।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কারো ইবাদত করা যাবে না।

২. দাওয়াতী কাজ করে বিনিময় গ্রহণ করার চেয়ে না করাই উত্তম।

৩. আল্লাহ তা‘আলা চিরস্থায়ী, চিরজীবী, তাঁর কোন মৃত্যু নেই এবং তিনি আরশের ওপর সমুন্নত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৫-৬০ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের অজ্ঞতার খবর দিচ্ছেন যে, তারা বিনা দলীল প্রমাণে প্রতিমাগুলোর পূজা করছে যারা তাদের উপকার বা অপকার কিছুই করতে পারে না। শুধু পূর্বপুরুষদের দেখাদেখি প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে তাদের প্রেম-প্রীতি তারা নিজেদের অন্তরে জমিয়ে নিয়েছে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা করছে। তারা শয়তানের সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছে এবং আল্লাহর সেনাবাহিনীর বিরোধী হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের জেনে রাখা উচিত যে, পরিণামে আল্লাহর সেনাবাহিনীই জয়যুক্ত হবে। তারা এই আশায় পড়ে রয়েছে যে, এই মিথ্যা ও বাজে মা’বৃদরা তাদের সাহায্য করবে। কিন্তু এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তারা অযথা তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মুমিনদের পরিণামই ভাল হবে। দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সাহায্য করবেন। এই কাফিরদেরকে তো শয়তান শুধু আল্লাহর বিরোধিতার উপর। উত্তেজিত করছে। সে তাদের অন্তরে সত্য আল্লাহর শত্রুতা সৃষ্টি করে দিচ্ছে এবং শিরকের মহব্বত পয়দা করছে। তাই তারা আল্লাহর নির্দেশাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করছে।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ আমি তো তোমাকে শুধু সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই প্রেরণ করেছি। যারা আল্লাহর আনুগত্যকারী তাদেরকে তুমি জান্নাতের সুসংবাদ দেবে এবং যারা তাঁর অবাধ্য তাদেরকে তার কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করবে। জনগণের মধ্যে তুমি সাধারণভাবে ঘোষণা করে দেবে- আমি তোমাদের কাছে আমার এই প্রচারকার্যের জন্যে কোন প্রতিদান চাই না। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ছাড়া আমার উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়। আমি শুধু এটাই চাই যে, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সঠিক পথে আসতে চায় তার সামনে সঠিক রাস্তা প্রকাশ করে দেবো।

মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে আরো বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি প্রতিটি কাজে ঐ আল্লাহর উপর নির্ভর করবে যিনি চিরঞ্জীব, যার মৃত্যু নেই। যিনি আদি ও অন্ত, প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কিছুরই পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। যিনি চিরজীবিত ও চির বিরাজমান। যিনি প্রত্যেক জিনিসেরই মালিক ও প্রতিপালক। তাঁকেই তুমি তোমার প্রকৃত আশ্রয়স্থল মনে করবে। তার সত্তা এমনই যে, তারই উপর ভরসা করা উচিত এবং ভীতি-বিহ্বলতার সময় তাঁরই দিকে ঝুঁকে পড়া কর্তব্য। সাহায্যকারী ও আশ্রয়দাতা হিসেবে তিনিই যথেষ্ট। মানুষের উচিত তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করা। তিনি তাঁর বান্দাদের পাপ সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার নিকট তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি (জনগণের নিকট) পৌছিয়ে দাও। যদি তুমি এটা না কর তবে তুমি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করলে না। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, আল্লাহ তোমাকে লোকদের (অনিষ্ট) থেকে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭)।

শহর ইবনে হাওশিব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা কোন এক গলিতে নবী (সঃ)-এর সাথে হযরত সালমান (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ হলে তিনি তাঁকে সিজদা করতে উদ্যত হন। তখন নবী (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! তুমি আমাকে সিজদা করো না, বরং সিজদা করো সেই সত্তাকে যিনি চিরঞ্জীব, যাঁর মৃত্যু নেই।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি মুরসাল)

আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ ‘তুমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহান আল্লাহর এ নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেছিলেন। তিনি বলতেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি।” মহান আল্লাহর এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছে ? ইবাদত শুধু আল্লাহরই করবে এবং শুধু তাঁর সত্তার উপরই ভরসা করবে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিপালক তিনিই, তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।” (৭৩;৯) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “সুতরাং তাঁরই ইবাদত করো এবং তাঁরই উপর নির্ভর করো।” (১১:১২৩) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তুমি বলে দাও- তিনিই রহমান (পরম দয়ালু), আমরা তার উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁরই উপর ভরসা করেছি।” (৬৭:২৯)

মহান আল্লাহর উক্তিঃ তিনি তাঁর বান্দাদের পাপ সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত। অর্থাৎ বান্দাদের সমস্ত কার্যকলাপ তার সামনে প্রকাশমান। অণু পরিমাণ কাজও তার কাছে গোপন নয়।

তিনিই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও অধিপতি। তিনিই সব কিছুর আহার্যদাতা। তিনি স্বীয় ক্ষমতাবলে আসমান যমীনের ন্যায় বিরাট মাখলুককে মাত্র ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। কার্যাবলীর তদবীর ও ফলাফল তারই পক্ষ হতে এবং তাঁরই হুকুম ও তদবীরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। তাঁর ফায়সালা সত্য, সঠিক ও উত্তমই হয়। তাঁর সত্তা ও গুণাবলী সম্বন্ধে যে অবগত আছে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখো।

এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, আল্লাহর সত্তা সম্বন্ধে পূর্ণ অবগতি একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এরই ছিল যিনি দুনিয়া ও আখিরাতে সাধারণভাবে সমস্ত আদম সন্তানের নেতা ছিলেন। একটি কথাও তিনি নিজের পক্ষ থেকে বানিয়ে বলেননি। বরং তিনি যা কিছু বলতেন আল্লাহর পক্ষ হতে আদিষ্ট হয়েই বলতেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার যে গুণাবলীর বর্ণনা দিয়েছেন সেগুলোর সবই সত্য। তিনি যা কিছু সংবাদ দিয়েছেন তার সবই সঠিক। প্রকৃত ও সত্য ইমাম তিনিই। সমস্ত বিবাদের মীমাংসা তাঁরই নির্দেশক্রমে করা যেতে পারে। যে তার কথা বলে সে সত্যবাদী। আর যে তাঁর বিপরীত কথা বলে সে মিথ্যাবাদী এবং তার কথা প্রত্যাখ্যাত হবে। সে যে কেউই হোক না কেন। আল্লাহর ফরমান অবশ্যই পালনীয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “কোন বিষয়ে যদি তোমাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে ফিরিয়ে দাও।” (৪:৫৯) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে ব্যাপারেই তোমরা মতানৈক্য কর, ওর ফায়সালা আল্লাহর নিকট রয়েছে।” (৪২:১০) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের কথা যা খবরের ব্যাপারে সত্য ও ফায়সালা হিসেবে ন্যায়, পূর্ণ হয়ে গেছে।” (৬:১১৬) এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে।

মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে সিজদা করতো। তাদেরকে যখন ‘রহমানকে সিজদা করার কথা বলা হতো তখন তারা বলতো: আমরা রহমানকে চিনি না। আল্লাহর নাম যে রহমান’ এটা তারা অস্বীকার করতো। যেমন হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লেখককে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম' লিখতে বলেন তখন মুশরিকরা বলে ওঠেঃ “আমরা রহমানকে চিনি না এবং রহীমকেও না। বরং আমাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ‘বিইসমিকা আল্লাহুম্মা’ লিখুন।” তাদের এই কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ(আরবি)

অর্থাৎ “তুমি বলে দাও- তোমরা আল্লাহকে ডাকো অথবা রহমানকে ডাকো, যে নামেই ইচ্ছা তাকে ডাকো, তাঁর বহু উত্তম নাম রয়েছে।” (১৭:১১০) অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ এবং তিনিই রহমান।

কাফিররা বলতো: তুমি কাউকেও সিজদা করতে বললেই কি আমরা তাকে সিজদা করবো? মোটকথা, এতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে মুমিনরা আল্লাহর ইবাদত করে যিনি রহমান এবং রাহীম। তাঁরা তাঁকেই ইবাদতের যোগ্য মনে করে এবং তার উদ্দেশ্যেই সিজদা করে।
আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, সূরায়ে ফুরকানের এই আয়াতটির পাঠক ও শ্রোতার উপর সিজদা ওয়াজিব হওয়া শরীয়তের বিধান। যেমন ওর স্থলে ওর ব্যাখ্যা বিদ্যমান। এসব ব্যাপারে মহামহিমান্বিত আল্লাহই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।