সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 50)
হরকত ছাড়া:
ولقد صرفناه بينهم ليذكروا فأبى أكثر الناس إلا كفورا ﴿٥٠﴾
হরকত সহ:
وَ لَقَدْ صَرَّفْنٰهُ بَیْنَهُمْ لِیَذَّکَّرُوْا ۫ۖ فَاَبٰۤی اَکْثَرُ النَّاسِ اِلَّا کُفُوْرًا ﴿۵۰﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ সাররাফনা-হু বাইনাহুম লিয়াযযাক্কারূ ফাআবা আকছারুন্না-ছি ইল্লাকুফূরা-।
আল বায়ান: আর আমি তা তাদের মধ্যে বণ্টন করি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে; তারপর অধিকাংশ লোক শুধু অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫০. আর আমরা তো তা তাদের মধ্যে বিতরণ করি যাতে তারা স্মরণ করে। অতঃপর অধিকাংশ লোক শুধু অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি পানিকে (সকলের প্রয়োজন মেটানোর জন্য) তাদের মাঝে বণ্টন করি যাতে তারা (আল্লাহর অনুগ্রহের কথা) স্মরণ করে, কিন্তু মানুষদের অধিকাংশই ঈমান গ্রহণ করতে অস্বীকার ক’রে কেবল কুফরিই করল।
আহসানুল বায়ান: (৫০) আমি তা ওদের মধ্যে বিভিন্নভাবে বিবৃত করেছি;[1] যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক কেবল অবিশ্বাসই প্রকাশ করে। [2]
মুজিবুর রহমান: আর আমি এটা তাদের মধ্যে বিতরণ করি যাতে তারা স্মরণ করে; কিন্তু অধিকাংশ লোক শুধু অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।
ফযলুর রহমান: আমি এই পানি তাদের মধ্যে বিতরণ করেছি যাতে তারা (আমার অনুগ্রহ) স্মরণ করে; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কেবল অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।
মুহিউদ্দিন খান: এবং আমি তা তাদের মধ্যে বিভিন্নভাবে বিতরণ করি, যাতে তারা স্মরণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক অকৃতজ্ঞতা ছাড়া কিছুই করে না।
জহুরুল হক: আর আমরা নিশ্চয়ই এটিকে বিতরণ করি তাদের মধ্যে যেন তারা স্মরণ করতে পারে, কিন্ত অধিকাংশ লোকেই প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া আর কিছুতে একমত হয় না।
Sahih International: And We have certainly distributed it among them that they might be reminded, but most of the people refuse except disbelief.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫০. আর আমরা তো তা তাদের মধ্যে বিতরণ করি যাতে তারা স্মরণ করে। অতঃপর অধিকাংশ লোক শুধু অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।(১)
তাফসীর:
(১) ইকরিম রাহেমাহুল্লাহ এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, অর্থাৎ তারা বলে আমরা অমুক নক্ষত্র এবং অমুক নক্ষত্রের কাছাকাছি হওয়ার কারণে বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি। ইকরিমা রাহেমাহুল্লাহর এ তাফসীরের সপক্ষে আমরা হাদীস থেকে প্রমাণ দেখতে পাই। একবার রাত্রিকালে বৃষ্টি হওয়ার পর ভোরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বললেন, তোমরা কি জান তোমাদের প্রভু কি বলেছেন? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ আল্লাহ বলেন, আমার বান্দাদের কতক লোক আমার উপর ঈমানদার এবং কতক লোক কাফেরে পরিণত হয়েছে। যারা বলে, আমরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি তারা আমার উপর ঈমান এনেছে এবং নক্ষত্ররাজির উপর কুফরী করেছে। আর যারা বলে, আমরা অমুক অমুক নক্ষত্রের কাছাকাছি হওয়ার কারণে বৃষ্টি পেয়েছি তারা আমার সাথে কুফরী করেছে এবং নক্ষত্ররাজির উপর ঈমান এনেছে। [মুসলিমঃ ১২৫]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫০) আমি তা ওদের মধ্যে বিভিন্নভাবে বিবৃত করেছি;[1] যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক কেবল অবিশ্বাসই প্রকাশ করে। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, কুরআন কারীমকে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, صرفناه এর ه (তা) সর্বনাম দ্বারা পানি বা বৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার অর্থ, আমি বৃষ্টিকে ফিরিয়ে ফিরিয়ে বর্ষণ করি। অর্থাৎ, কখনো এক এলাকায় আবার কখনো অন্য এলাকায়। এমনকি কখনো দেখা যায় যে একই শহরের এক জায়গায় বৃষ্টি হয়, অন্য জায়গায় হয় না। এটি আল্লাহর হিকমত ও ইচ্ছা। তিনি যেভাবে ইচ্ছা কখনো বৃষ্টি বর্ষণ করেন, কখনো করেন না। আবার কখনো এক এলাকায় করেন, আবার কখনো অন্য এলাকায়।
[2] এটিও এক প্রকার কুফরী ও অকৃতজ্ঞতা যে, বৃষ্টিকে আল্লাহর ইচ্ছাধীন না মনে করে নক্ষত্রের আসা-যাওয়ার পরিণাম মনে করা। যেমন জাহেলী যুগের লোকেরা মনে করত। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৫-৫০ নং আয়াতের তাফসীর:
আলোচ্য আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাঁর অস্তিত্ব, ক্ষমতা ও বান্দার প্রতি তাঁর নেয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন যা তাঁর একত্বের প্রমাণ বহন করে। الظِّلَّ দ্বারা উদ্দেশ্যন সুবহে সাদিক থেকে সূর্য উঠা পর্যন্ত নাতিশীতোষ্ণ সময়টুকু। আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে সকল মানুষকে বলছেন: তুমি কি তোমার দৃষ্টি দ্বারা প্রত্যক্ষ এবং চিন্তা করে দেখছ না? আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে ছায়া বিস্তৃত করে দিয়েছেন। রৌদ্র ও ছায়া দু’টি এমন নেয়ামত যা ছাড়া মানুষের জীবন ও কাজ কারবার চলতে পারে না। সর্বদা ও সর্বত্র রৌদ্র থাকলে মানুষ ও জীব গরমে অতিষ্ঠ হয়ে যেত যা গ্রীষ্মকালে মানুষসহ পশু-পাখি, জীব-জন্তু অনুধাবন করে থাকে। পক্ষান্তরে সর্বদা ও সর্বত্র ছায়া থাকলে, রোদ না আসলে মানুষের স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে না এবং হাজারো কাজে বিঘœ সৃষ্টি হবে, কোন ফসল ও উদ্ভিদ উদ্গত হবে না যা শীতকালে অনুধাবন করা যায়। সুতরাং রৌদ্র ও ছায়া আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ নেয়ামত।
(وَلَوْ شَا۬ءَ لَجَعَلَه۫ سَاكِنًا)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে ছায়া স্থির করে দিতে পারতেন, কখনো রৌদ্র আসতো না। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তা না করে সূর্যের কিরণ দ্বারা ছায়া দূরীভূত করে দিয়েছেন।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللّٰهُ عَلَيْكُمُ اللَّيْلَ سَرْمَدًا إِلٰي يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إلٰهٌ غَيْرُ اللّٰهِ يَأْتِيْكُمْ بِضِيَا۬ءٍ)
“বল: ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ তা‘আলা যদি রাতকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত এমন কোন মা‘বূদ আছে যে তোমাদেরকে আলো এনে দিতে পারে?” (সূরা কাসাস ২৮:৭১-৭২)
دَلِيْلًا অর্থাৎ আমি সূর্যকে করেছি ছায়ার ওপর দলীলস্বরূপ। সূর্যের আলোর মাধ্যমে ছায়া চিনতে পারা যায়। যদি আলো না থাকত তাহলে ছায়া বুঝা যেত না। এরপর আল্লাহ তা‘আলা ছায়াকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেন।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অন্য আরেকটি ক্ষমতার কথা বর্ণনা করেছেন। তা হল আল্লাহ তা‘আলা রাত্রিকে মানুষের জন্য করেছেন লেবাস। অর্থাৎ পোশাক যেমন মানুষকে ঢেকে রাখে অনুরূপভাবে রাত্রি তার অন্ধকার দ্বারা সব কিছু আচ্ছাদিত করে নেয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشٰي)
“শপথ রাত্রির, যখন সে আচ্ছন্ন করে।” (সূরা লাইল ৯২:১) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشٰهَا)
“শপথ রাত্রির যখন সে সূর্যকে আচ্ছাদিত করে” (সূরা শামস ৯১:৪)
سُبَاتًا শব্দটি سبت থেকে উদ্ভুত, এর প্রকৃত অর্থ হল ছিন্ন করা। سبات এমন বস্তু যা দ্বারা অন্য বস্তুকে ছিন্ন করা হয়। নিদ্রাকে আল্লাহ তা‘আলা এমন করেছেন যে, এর ফলে সারাদিনের ক্লান্তি ও কষ্ট ছিন্ন তথা দূর হয়ে যায়। ফলে রাতে ঘুম আবৃত করে নেয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَّجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا)
“আমিই তোমাদের নিদ্রাকে করেছি আরামদায়ক।” (সূরা নাবা ৭৮:৯)
সুতরাং আমরা স্বভাবগতভাবেই অনুধাবন করতে পারি রাত ঘুমের জন্য কত উপযোগী। দিনের বেলা মানুষের কোলাহল, সূর্যের আলো, সব মিলিয়ে ঘুম আসে না, আসলেও তৃপ্তিদায়ক হয় না।
পক্ষান্তরে দিনকে করেছেন বিচরণ করার জন্য। মানুষ দিনের বেলা জীবিকা উপার্জন ও কাজ-কর্ম করার জন্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিচরণ করে থাকে। نُشُوْرً শব্দের প্রকৃত অর্থ উত্থিত হওয়া, জাগা। ঘুম এক প্রকার মৃত্যু, সকাল বেলা মানুষ যখন ঘুম থেকে উঠে তখন সে জীবন ফিরে পায়, তাই তাকে نُشُوْرً বলা হয়েছে। তাই আমরা ঘুম থেকে জাগার দু‘আয় বলি:
الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
প্রশংসা সে সত্তার যিনি আমাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করেছেন এবং তাঁর দিকেই উত্থিত হব। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَّجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا)
“আর দিবসকে জীবিকা অর্জনের মাধ্যম করে দিয়েছি; (সূরা নাবা ৭৮:১১)
এরপর আল্লাহ তাঁর অন্যান্য করুণা বা ক্ষমতার কথা বর্ণনা করেছেন যে, তিনিই তাঁর করুণার প্রাক্কালে সুসংবাদবাহীরূপে বাতাস প্রেরণ করেন। আল্লাহ বলেন:
(وَهُوَ الَّذِيْ يُرْسِلُ الرِّيٰحَ بُشْرًام بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِه۪)
“তিনিই স্বীয় অনুগ্রহের প্রাক্কালে বায়ুকে সুসংবাদবাহীরূপে প্রেরণ করেন।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৫৭)
উবাই বিন কাব (রাঃ) বলেন: কুরআন প্রত্যেক যে সকল স্থানে رياح বা বহুবচন হিসেবে ব্যবহার হয়েছে তা রহমতের বাতাস বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়েছে। আর যেসকল স্থানে ريحবা একবচন হিসেবে ব্যবহার হয়েছে তা আযাবের বাতাস বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আরেকটি নিদর্শনের কথা বর্ণনা করছেন যে, আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন, যা দ্বারা তিনি মৃত জমিনকে জীবিত করেন। أَنَاسِيَّ শব্দটি انسي এর বহুবচন অর্থ মানুষ। অর্থাৎ মাটি মরে ধু-ধু হয়ে যাওয়ার পর বৃষ্টির পানি যেমন তাকে জীবিত করে, তেমনি বৃষ্টির পানি দ্বারা জীব-জন্তু ও মানুষ পিপাসা নিবারণ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَانْظُرْ إِلٰٓي اٰثٰرِ رَحْمَتِ اللّٰهِ كَيْفَ يُحْيِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا ط إِنَّ ذٰلِكَ لَمُحْيِ الْمَوْتٰي ج وَهُوَ عَلٰي كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ )
“অতএব আল্লাহ তা‘আলার রহমাতের ফল সম্পর্কে চিন্তা কর; কিভাবে তিনি জমিনকে জীবিত করেন তার মৃত্যুর পর।” (সূরা রূম ৩০:৫০)
সুতরাং এসব নেয়ামত যে সত্তা দান করেছেন সে সত্তার প্রশংসা করা উচিত, একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা উচিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. এতে প্রমাণিত হয় যে, সকল কিছুর ওপর কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার, সুতরাং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত করতে হবে। অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না।
২. সকল বস্তুর রিযিকের মালিক কেবল আল্লাহ তা‘আলা।
৩. মানুষের যখন যা প্রয়োজন তখন আল্লাহ তা‘আলা তা প্রদান করেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪৮-৫০ নং আয়াতের তাফসীর
এটাও আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ ও ব্যাপক ক্ষমতার পরিচায়ক যে, তিনি মেঘের আগমনের সুসংবাদবাহী রূপে বায়ু প্রেরণ করেন।
(আরবি) এরপরে ঘোষিত হচ্ছেঃ আর আমি আকাশ হতে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করি। (আরবি)-এর অর্থ হলো অতি পবিত্র এবং যা অন্য কিছুকেও পবিত্র করে থাকে।
সাবিত আল বানানী (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা বর্ষার দিনে আবুল আলিয়া (রঃ)-এর সাথে চলতে থাকি। ঐ সময় বসরার পথগুলো ময়লাযুক্ত থাকতো। তিনি নামায পড়লেন। তখন আমি তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ আমি আকাশ হতে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করি।' সুতরাং আকাশ হতে বর্ষিত পানি এগুলোকে পবিত্র করেছে (কাজেই এখানে নামায পড়াতে কোন দোষ নেই)।” এটা মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) এই আয়াত সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেনঃ “আল্লাহ এই পানিকে পবিত্ররূপে বর্ষণ করেছেন। এটাকে কোন কিছুই অপবিত্র করতে পারে না।”
হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা বুযাআর কূপের পানিতে অযু করতে পারি কি? এটা এমন একটি কূপ, যার মধ্যে পচা-সড়া জিনিস এবং কুকুরের মাংস নিক্ষেপ করা হয়। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “নিশ্চয়ই পানি পবিত্র, ওকে কোন কিছুই অপবিত্র করতে পারে না। (এ হাদীসটি ইমাম শাফেয়ী (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ (রঃ) এটাকে সহীহ বলেছেন। ইমাম আবূ দাঊদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযীও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন। ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)
হযরত খালিদ ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা একদা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নিকট উপস্থিত ছিলাম এমন সময় জনগণ পানি সম্পর্কে আলোচনা শুরু করে। তখন আমি বলি, এক প্রকার পানি হলো ঐ পানি যা আকাশ হতে বর্ষিত হয়। আর এক প্রকার পানি হলো ঐ পানি যা সমুদ্র হতে উথিত মেঘমালা পান করিয়ে থাকে। সমুদ্রের পানি উদ্ভিদ জন্মায় না, বরং আকাশ হতে বর্ষিত পানি উদ্ভিদের জন্ম দেয়।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যখনই আল্লাহ তা'আলা আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা বর্ষণ করেন তখনই যমীনে উদ্ভিদের জন্ম হয় অথবা সমুদ্রে মণিমুক্তা জন্ম হয়। অন্য কেউ বলেন যে, স্থলে গম ও সমুদ্রে মুক্তার সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ওর দ্বারা আমি মৃত ভূ-খণ্ডকে সঞ্জীবিত করি। অর্থাৎ যে ভূমি দীর্ঘাদন যাবত পানির জন্যে অপেক্ষমান ছিল এবং পানি না হওয়ার কারণে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছিল, তাতে না ছিল কোন গাছ-পালা, না ছিল কোন তরু-লতা, অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করলেন তখন সেই মৃত প্রায় ভূমি নব-জীবন লাভ করলো এবং তাতে বৃক্ষ ও তরু-লতার জন্ম হলো ও সেগুলো ফলে-ফুলে ভরে উঠলো। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যখন আমি তাতে বারি বর্ষণ করি তখন তা শস্য-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদগত করে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ।” (৪১:৩৯)
আল্লাহ পাক বলেনঃ আমার সৃষ্টির মধ্যে বহু জীব-জন্তু ও মানুষকে ঐ পানি আমি পান করাই। অর্থাৎ সেই পানি বিভিন্ন জীব-জন্তু ও মানুষ পান করে থাকে যারা ঐ পানির বড়ই মুখাপেক্ষী। মানুষ সেই পানি নিজেরা পান করে এবং তাদের ফসলের জমিতে তা সেচন করে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তারা নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই (আল্লাহই ) তাদের উপর বারি বর্ষণ করে থাকেন।” (৪২: ২৮) আর এক স্থানে বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তুমি আল্লাহর করুণার লক্ষণের প্রতি লক্ষ্য কর যে, কিভাবে তিনি যমীনকে ওর মরে যাওয়ার পরসঞ্জীবিত করেন।” (৩০: ৫০)।
ঘঘাষিত হচ্ছেঃ আমি এটা (এই পানি) তাদের মধ্যে বিতরণ করি যাতে তারা স্মরণ করে। অর্থাৎ আমি এই ভূমিতে পানি বর্ষণ করি এবং ঐ ভূমিতে বর্ষণ করি না। মেঘমালা এক ভূমি অতিক্রম করে অন্য ভূমির উপর বৃষ্টি বর্ষণ করে এবং যে ভূমিকে অতিক্রম করে যায় ওর উপর এক ফোঁটাও বৃষ্টি বর্ষণ করে। এর মধ্যে পূর্ণ কৌশল ও নিপুণতা রয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এক বছরে অন্য বছর অপেক্ষা বেশী বৃষ্টি বর্ষিত হয় না, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তা যেভাবে চান বিতরণ করে থাকেন। অতঃপর তারা (আরবি)
অর্থাৎ “আমি ওটা (ঐ পানি) তাদের মধ্যে বিতরণ করে থাকি যাতে তারা স্মরণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক শুধু অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।” অর্থাৎ তারা যেন স্মরণ করে যে, যে আল্লাহ মৃত ভূমিকে সঞ্জীবিত করতে সক্ষম, সে আল্লাহ মৃতকে ও গলিত অস্থিকে পুনর্জীবন দান করতেও নিঃসন্দেহে সক্ষম। অথবা সে যেন স্মরণ করে যে, তার পাপের কারণে যদি আল্লাহ তার উপর বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেন তবে সে সমূলে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এটা স্মরণ করে যেন সে পাপকার্য হতে বিরত থাকে।
উকবা (রাঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম উমার (রাঃ) বলেন যে, একদা হযরত জিবরাঈল (আঃ) জানাযার জায়গায় উপস্থিত ছিলেন। ঐ সময় নবী (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! আমি মেঘের বিষয়টি অবগত হতে পছন্দ করি।” তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে বললেনঃ “আপনি মেঘের উপর নিযুক্ত এই ফেরেশতাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন।” এ কথা শুনে মেঘের উপর নিযুক্ত ফেরেশতা বললেন, আমাদের কাছে মোহরকৃত একটা নির্দেশনামা আসে। তাতে নির্দেশ দেয়া থাকে- “অমুক অমুক শহরে পানি পান করাও। অমুক অমুক জায়গায় পানির ফোঁটা পৌছিয়ে দাও।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি মুরসাল)
আল্লাহ পাক বলেনঃ কিন্তু অধিকাংশ লোক শুধু অকৃজ্ঞতাই প্রকাশ করে থাকে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা বলে- “অমুক অমুক নক্ষত্রের আকর্ষণে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্মিত হয়েছে।” যেমন একদা রাত্রিকালে বৃষ্টিপাত হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক যা বলেছেন তা তোমরা জান কি?` সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি ঈমান আনয়নকারীরূপে সকাল করে এবং কেউ সকাল করে আমাকে অস্বীকারকারীরূপে। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বলে‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণার ফলে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে সে আমার উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তারকাকে অস্বীকারকারী। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বলে- ‘অমুক অমুক তারকার আকর্ষণে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে সে আমাকে অস্বীকারকারী এবং নক্ষত্রের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।