সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 43)
হরকত ছাড়া:
أرأيت من اتخذ إلهه هواه أفأنت تكون عليه وكيلا ﴿٤٣﴾
হরকত সহ:
اَرَءَیْتَ مَنِ اتَّخَذَ اِلٰـهَهٗ هَوٰىهُ ؕ اَفَاَنْتَ تَکُوْنُ عَلَیْهِ وَکِیْلًا ﴿ۙ۴۳﴾
উচ্চারণ: আরাআইতা মানিততাখাযা ইলা-হাহূহাওয়া-হু আফাআনতা তাকূনু‘আলাইহি ওয়াকীলা-।
আল বায়ান: তুমি কি তাকে দেখনি, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে? তবুও কি তুমি তার যিম্মাদার হবে?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৩. আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্ৰহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন?
তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি কি তাকে দেখ না যে তার খেয়াল খুশিকে ইলাহরুপে গ্রহণ করেছে? এর পরেও কি তুমি তার কাজের জিম্মাদার হতে চাও?
আহসানুল বায়ান: (৪৩) তুমি কি দেখ না তাকে, যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার কর্মবিধায়ক হবে। [1]
মুজিবুর রহমান: তুমি কি দেখনা তাকে, যে তার কামনা বাসনাকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার যিম্মাদার হবে?
ফযলুর রহমান: তুমি কি তাকে দেখেছো যে তার উপাস্য বানিয়েছে নিজের প্রবৃত্তিকে? তবুও কি তুমি তার জিম্মাদার হবে?
মুহিউদ্দিন খান: আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন?
জহুরুল হক: তুমি কি তাকে দেখেছ যে তার কামনাকে তার উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে? তুমি কি তবে তার জন্য একজন কর্ণধার হবে?
Sahih International: Have you seen the one who takes as his god his own desire? Then would you be responsible for him?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৩. আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্ৰহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন?
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৩) তুমি কি দেখ না তাকে, যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার কর্মবিধায়ক হবে। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যা তাদের মনে ভালো লাগে, তাকেই তারা নিজেদের ধর্ম ও মযহাব বানিয়ে নেয়। তুমি কি এসব লোকদেরকে পথ দেখাতে পারবে? অথবা তাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারবে? এই কথাটি অন্য জায়গায় এভাবে বলা হয়েছে, ‘‘কাউকেও যদি তার মন্দ কাজ শোভন করে দেখানো হয় এবং সে একে উত্তম মনে করে, সে ব্যক্তি কি তার সমান (যে সৎকাজ করে)? আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। অতএব তুমি ওদের জন্য আক্ষেপ করে নিজেকে ধ্বংস করো না। নিশ্চয় ওরা যা করে, আল্লাহ তা খুব জানেন।’’ (সূরা ফাত্বির ৮ আয়াত) ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, জাহেলী যুগে মানুষ এক যুগ ধরে সাদা পাথরের ইবাদত করত। অতঃপর যখন সে এর চেয়ে উত্তম কোন পাথর পেয়ে যেত, তখন সে পুরাতন পাথরটি ফেলে দিয়ে নতুন পাথরের পূজা শুরু করত। (ইবনে কাসীর) অর্থ এই যে, এমন জ্ঞানশূন্য মানুষ শুধুমাত্র নিজ খেয়াল-খুশী ও প্রবৃত্তি পূজায় ব্যস্ত। হে নবী! তুমি কি এদের সুপথ দেখাতে পারবে? অর্থাৎ, পারবে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:
কাফির-মুশরিকরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করত। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِذَا رَاٰكَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْآ إِنْ يَّتَّخِذُوْنَكَ إِلَّا هُزُوًا ط أَهٰذَا الَّذِيْ يَذْكُرُ اٰلِهَتَكُمْ ج وَهُمْ بِذِكْرِ الرَّحْمٰنِ هُمْ كٰفِرُوْنَ)
“কাফিররা যখন তোমাকে দেখে তখন তারা তোমাকে কেবল বিদ্রুপের পাত্ররূপেই গ্রহণ করে। তারা বলে, ‘এ-ই কি সে, যে তোমাদের দেব-দেবীগুলোর সমালোচনা করে?’ অথচ তারাই তো ‘রাহ্মান’-এর উল্লেখের বিরোধিতা করে।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৩৬) আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, তোমরা রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করবে এজন্য তো রাসূল প্রেরণ করিনি। বরং তোমাদের কর্তব্য তাঁর অনুসরণ করবে, তাঁকে মেনে চলবে। কিন্তু তা না করে তোমরা তার বিপরীত করছ।
আর তারা তাদের শির্কী কার্যকলাপের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। যেমন তাদের কথা:
(وَانْطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوْا وَاصْبِرُوْا عَلٰٓي اٰلِهَتِكُمْ)
“আর তাদের নেতারা এ কথা বলে চলে যায় যে, তোমরা চলে যাও এবং অবিচল চিত্তে তোমাদের মা‘দূদের পূজায় লেগে থাক এবং নিজেদের উপাস্যদের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ কর।” (সূরা স্ব-দ ৩৮:৬)
অর্থাৎ শরীয়ত বিরোধী কাজে প্রবৃত্তির অনুসরণ এক প্রকার র্শিক। ইবনু আববাস (رضي الله عنه) বলেন: শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ করা, নিজের মনমত চলা একপ্রকার মূর্তিপূজা। তারপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করেন। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَفَمَنْ زُيِّنَ لَه۫ سُوْٓءُ عَمَلِه۪ فَرَاٰهُ حَسَنًا ط فَإِنَّ اللّٰهَ يُضِلُّ مَنْ يَّشَا۬ءُ وَيَهْدِيْ مَنْ يَّشَا۬ءُ ﱸﺘ فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرٰتٍ ط إِنَّ اللّٰهَ عَلِيْمٌۭ بِمَا يَصْنَعُوْنَ)
“যাকে তার খারাপ কাজ সুন্দর করে দেখানো হয় এবং সে তাকে উত্তম মনে করে (সে কি তার সমান যে মন্দকে মন্দ মনে করে)? নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন। অতএব তুমি তাদের জন্য অনুতাপ করে নিজেকে ধ্বংস করবে না। তারা যা করে আল্লাহ তা‘আলা তা অবশ্যই জানেন।” (সূরা ফাতির ৩৫:৮)
এদের সম্পর্কেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, এরা হচ্ছে চতুস্পদ জন্তুর চেয়েও অধম। কারণ চতুষ্পদ জন্তুকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা তারা শুনে ও মেনে চলে। কিন্তু এ সকল মানুষ তাদেরকে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে তা ভুলে গিয়ে শির্কী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছে। তাই ওরা সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন:
(وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيْرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ ﺘ لَهُمْ قُلُوْبٌ لَّا يَفْقَهُوْنَ بِهَا ز وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُوْنَ بِهَا ز وَلَهُمْ اٰذَانٌ لَّا يَسْمَعُوْنَ بِهَا ط أُولٰ۬ئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ط أُولٰ۬ئِكَ هُمُ الْغٰفِلُوْنَ)
“আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি, তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা দেখে না, এবং তাদের কর্ণ আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা শ্রবণ করে না, তারাই পশুর ন্যায়, বরং তারা অধিক বিভ্রান্ত। তারাই গাফিল।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৭৯)
তাই প্রতিটি মানুষের উচিত আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কার্য সম্পাদন করা ও যথাযথভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূলের কোন বিষয়ে হাসি-তামাশা করা যাবে না, তা করলে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে।
২. শির্কী কার্যকলাপ পরিহার করতে হবে।
৩. প্রবৃত্তির অনুসরণ করার অর্থ হলো তাকে একপ্রকার মা‘বূদ বানিয়ে নেয়া।
৪. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মুশরিকরা যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখে তখন তাঁকে উপহাস ও বিদ্রুপ করে। যেমন তিনি বলেনঃ “যখন কাফিররা তোমাকে দেখে তখন তারা তোমাকে শুধু ঠাট্টা-বিদ্রুপের পাত্র রূপে গণ্য করে।” অর্থাৎ তারা তাকে দোষ-ত্রুটির সাথে বিশেষিত করে। এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা যখন তোমাকে দেখে তখন তারা তোমাকে শুধু ঠাট্টা-বিদ্রুপের পাত্র রূপে গণ্য করে এবং বলে- এই কি সে, যাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ তারা তাঁকে খাটো করার জন্যে একথা বলে। তাই আল্লাহ তাদের দুষ্কৃতি ও বদভ্যাসের বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তোমার পূর্বেও রাসূলদেরকে বিদ্রুপ করা হয়েছিল।” (৬: ১০) মহান আল্লাহর উক্তিঃ সে তো আমাদেরকে আমাদের দেবতাগণ হতে দূরে সরিয়ে দিতো। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা ঐ মুশরিকদের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তারা বলে- আমরা আমাদের দেবতাদের আনুগত্যে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত না থাকলে সে তো আমাদেরকে তাদের ইবাদত হতে সরিয়ে দিতো। আল্লাহ তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন ও হুমকির সুরে বলেনঃ যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন জানবে কে সর্বাধিক পথভ্রষ্ট।
এরপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দেন যে, যার তকদীরে আল্লাহ দুর্ভোগ ও পথভ্রষ্টতা লিখে দিয়েছেন তাকে মহামহিমান্বিত আল্লাহ ছাড়া আর কেউই সুপথ প্রদর্শন করতে পারে না। তাই তিনি বলেনঃ তুমি কি দেখো না তাকে, যে তার কামনা বাসনাকে ইলাহরূপে গ্রহণ করে? অর্থাৎ যে প্রবৃত্তির দাস এবং প্রবৃত্তি যা চায় তাই যে ভাল মনে করে, সেটাই তার দ্বীন ও মাযহাব। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তবে কি যে ব্যক্তির খারাপ কাজ তার জন্যে শোভনীয় করা হয়েছে, অতঃপর সে ওটাকে উত্তম দেখে? নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন।” (৩৫: ৮) এ জন্যেই তিনি এখানে বলেনঃ তবুও কি তুমি তার কর্মবিধায়ক হবে?
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে একজন লোক কিছুকাল যাবত সাদা পাথরের ইবাদত করতো। অতঃপর যখন দেখতো যে, ওটার চেয়ে অন্যটি উৎকৃষ্টতর, তখন পূর্বটির পূজা ছেড়ে দিয়ে ঐ দ্বিতীয়টির পূজা শুরু করে দিতো।
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি কি দেখো না যে, তাদের অধিকাংশ শুনে ও বুঝে? তারা তো পশুরই মত; তারা আরো অধম। অর্থাৎ তাদের অবস্থা বিচরণকারী পশুর চেয়েও খারাপ। কারণ পশুরা ঐ কাজই করে যে কাজের জন্যে ওগুলোকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে এক শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদতের জন্যে। কিন্তু তারা তা পালন করেনি। বরং তারা তাকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদত করে এবং তাদের কাছে দলীল প্রমাণাদি কায়েম হওয়া এবং তাদের নিকট রাসূলদেরকে প্রেরণ করা সত্ত্বেও তারা তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।