সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 12)
হরকত ছাড়া:
إذا رأتهم من مكان بعيد سمعوا لها تغيظا وزفيرا ﴿١٢﴾
হরকত সহ:
اِذَا رَاَتْهُمْ مِّنْ مَّکَانٍۭ بَعِیْدٍ سَمِعُوْا لَهَا تَغَیُّظًا وَّ زَفِیْرًا ﴿۱۲﴾
উচ্চারণ: ইযা-রাআতহুম মিম মাকা-নিম বা‘ঈদিন ছামি‘ঊ লাহা-তাগাইয়ুজাওঁ ওয়া যাফীরা-।
আল বায়ান: দূর হতে আগুন যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও প্রচন্ড চিৎকার শুনতে পাবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২. দূর থেকে আগুন যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও হুঙ্কার।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আগুন যখন তাদেরকে বহু দূরবর্তী স্থান থেকে দেখবে, তখন তারা শুনতে পারে তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও হুঙ্কার।
আহসানুল বায়ান: (১২) দূর হতে (জাহান্নাম) যখন ওদেরকে দেখবে, তখন ওরা তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার শুনতে পাবে।[1]
মুজিবুর রহমান: দূর হতে আগুন যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে ওর ক্রুদ্ধ গর্জন ও হুঙ্কার।
ফযলুর রহমান: আগুন যখন তাদেরকে দূর থেকে দেখতে পাবে তখন তারা তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও নিঃশ্বাস শুনতে পাবে।
মুহিউদ্দিন খান: অগ্নি যখন দূর থেকে তাদেরকে দেখবে, তখন তারা শুনতে পাবে তার গর্জন ও হুঙ্কার।
জহুরুল হক: যখন এটি দূর জায়গা থেকে তাদের দেখতে পাবে তখন থেকেই তারা এর ত্রুদ্ধ গর্জন ও হুংকার শুনতে পাবে।
Sahih International: When the Hellfire sees them from a distant place, they will hear its fury and roaring.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১২. দূর থেকে আগুন যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও হুঙ্কার।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১২) দূর হতে (জাহান্নাম) যখন ওদেরকে দেখবে, তখন ওরা তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার শুনতে পাবে।[1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, জাহান্নাম কাফেরদেরকে দূর থেকে হাশরের মাঠে দেখেই রাগে জ্বলে উঠবে এবং তাদেরকে ক্রোধের বেষ্টনে নেওয়ার জন্য তর্জন-গর্জন করবে। যেমন, অন্যত্র বলা হয়েছে, {إِذَا أُلْقُوا فِيهَا سَمِعُوا لَهَا شَهِيقًا وَهِيَ تَفُورُ، تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ} অর্থাৎ, যখন তারা তাতে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন জাহান্নামের গর্জন শুনবে, আর তা (ক্রোধে) উদ্বেলিত হবে। রোষে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে। (সূরা মুলক ৭-৮ আয়াত) জাহান্নামের দেখা, গর্জন করা এক বাস্তব সত্য ব্যাপার। কোন রূপক বর্ণনা নয়। আল্লাহর জন্য জাহান্নামের বোধশত্তি ও অনুভব করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা কঠিন নয়। তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। তিনি তাকে বাকশক্তি দান করবেন এবং সে আল্লাহর {هَلِ امْتَلَأْتِ} (তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ?) এর উত্তরে {هَلْ مِن مَّزِيدٍ} (আরো আছে কি?) বলবে। (সূরা কাফ ৩০ আয়াত)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতগুলোতে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রিসালাতকে অস্বীকারকারী কাফিরদের একটি ভ্রান্ত ধারণার খণ্ডন করা হয়েছে। তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলতন এটা কেমন রাসূল যে খাওয়া দাওয়া করে, বাজারে যায়, আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, রাসূল হবেন ফেরেশতা বা যিনি রাসূল হবেন তার সাথে একজন ফেরেশতা থাকবেন, অথবা তার অনেক ধন-ভাণ্ডার থাকবে বা বিশাল বাগান থাকবে ফলে মানুষ তা থেকে খেতে পারবে। এ সম্পর্কে সূরা মু’মিনূনের ৩৩-৩৪ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আলোচনা করেছেন। সুতরাং যখন মুহাম্মাদের এসব কিছুই নেই, তাই তা জানা সত্ত্বেও যে মুহাম্মাদের অনুসরণ করবে সে জাদুগ্রস্ত ব্যক্তি, মুহাম্মাদ তাকে জাদু করেছে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ বিশ্বাসকে খণ্ডন করে বলেন: শুধু মুহাম্মাদ নয় বরং তার পূর্বে যত রাসূল প্রেরণ করেছি সবাই মানুষ ছিল এবং খাবার খেত ও বাজারে যেত। অত্র সূরার ২০ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ الْمُرْسَلِيْنَ إِلَّآ إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُوْنَ الطَّعَامَ وَيَمْشُوْنَ فِي الْأَسْوَاقِ ط وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةً ط أَتَصْبِرُوْنَ ج وَكَانَ رَبُّكَ بَصِيْرًا)
“তোমার পূর্বে আমি যে সকল রাসূল প্রেরণ করেছি তারা সকলেই তো আহার করত ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করত। হে মানুষ! আমি তোমাদের মধ্যে পরস্পরকে পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমরা ধৈর্য ধারণ করবে কি? আর তোমার প্রতিপালক সমস্ত কিছু দেখেন।”
এরূপ অসংখ্য আয়াত রয়েছে যা প্রমাণ করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন মানুষ, অন্যান্য মানুষের মত খাবার ও প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁকেও বাজারে গমন করতে হত। সুতরাং নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরি একজন মানুষ, পার্থক্য হল তাঁকে আল্লাহ তা‘আলা রিসালাত দান করেছেন, তাঁর কাছে ওয়াহী আসে; আমাদের কাছে আসে না।
অর্থাৎ তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য তারা কিরূপ উদারহণ পেশ করে থাকে! নাবী এরূপ হবে না, এরূপ হবে না, এরূপ হবে ইত্যাদি। আল্লাহ বলছেন, তাদের এসব কথার জন্য তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, তারা নাজাতের কোন পথ পাবে না। তারা যে বাগানের কথা বলে আল্লাহ তা‘আলা চাইলে তোমাকে এর চেয়ে উত্তম বাগান দিতে পারেন, যার তলদেশ দিয়ে নাদী-নালা প্রবাহিত হবে এবং বিশাল অট্টালিকা দিতে পারেন। এরপর আল্লাহ বলছেন, তারা এসব কথা বলে সত্য অনুসন্ধানের জন্য নয় এবং সত্যের অনুসরণ করার জন্যও নয় বরং তা প্রকাশ পায় হিংসার কারণে এবং সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য। এমনকি তারা কিয়ামত দিবসকেও অস্বীকার করে বসেছে। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি এদের জন্যই জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
“যখন বলা হয়: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্র“তি সত্য এবং কিয়ামত এতে কোন সন্দেহ নেই, তখন তোমরা বলে থাক: আমরা জানি না কিয়ামত কী; আমরা মনে করি এটি একটি ধারণা মাত্র এবং আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত নই। তাদের মন্দ কর্মগুলো তাদের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করত তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করবে। আর বলা হবে: আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব যেমন তোমরা এই দিবসের সাক্ষাতকে ভুলে গিয়েছিলে। তোমাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।” (সূরা জাসিয়া ৪৫:৩২-৩৪)
এ সমস্ত লোকেদেরকে জাহান্নাম যখন দেখতে পাবে তখন সে চিৎকার ও গর্জন করতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِذَآ أُلْقُوْا فِيْهَا سَمِعُوْا لَهَا شَهِيْقًا وَّهِيَ تَفُوْرُ لا - تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ ط كُلَّمَآ أُلْقِيَ فِيْهَا فَوْجٌ سَأَلَهُمْ خَزَنَتُهَآ أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيْرٌ)
“যখন তারা তাতে (জাহান্নামে) নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা তার গর্জনের শব্দ শুনতে পাবে, আর তা টগবগ করে ফুটবে। অত্যধিক ক্রোধে তা ফেটে পড়ার উপক্রম হবে।” (সূরা মুলক ৬৭:৭-৮)
অতঃপর যখন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা শুধু মৃত্যু কামনা করবে। কিন্তু তখন তাদেরকে বলা হবে আজ এক মৃত্যুকে ডেকে কোন লাভ নেই বরং বহু মৃত্যুকে ডাক অর্থাৎ তারা সেখানে শুধু শাস্তি ভোগ করবে আর কখনো মৃত্যুবরণ করবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. প্রত্যেক যুগেই মানুষের মধ্য হতেই রাসূল প্রেরণ করা হয়েছে, কোন ফেরেশতা বা জিনকে নয়। সুতরাং খাদ্য খাওয়া ও বাজারে গমন করাটা রাসূল না হওয়ার জন্য কোন দলীল হতে পারে না।
২. একই কথার ওপর অটল না থাকলে তার ওপর বিশ্বাস আসে না বা এ কথা মিথ্যা বলে গৃহিত হয়। যেমন কাফিররা রাসূলকে কখনো কবি, কখনো জাদুকর, কখনো পাগল বলত তাদের এসব কথা প্রমাণ করে যে, তারা ছিল মিথ্যুক।
৩. আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলেই যাকে যা কিছু খুশি দিতে পারেন। এতে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, আল্লাহ তা‘আলাই সকল ক্ষমতার অধিকারী, অন্য কেউ নয়।
৪. কিয়ামত সংঘটিত হবেই।
৫. জান্নাত, জাহান্নাম বিদ্যমান রয়েছে।
৬. জাহান্নামের চিৎকার ও গর্জন থাকবে।
৭. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন মাটির তৈরি মানুষ এবং রাসূল, নূরের তৈরি নন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)
সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।
এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।
পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।
আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),
নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)
অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”
আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে।
হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।”
এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)
(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।