সূরা আন-নূর (আয়াত: 64)
হরকত ছাড়া:
ألا إن لله ما في السماوات والأرض قد يعلم ما أنتم عليه ويوم يرجعون إليه فينبئهم بما عملوا والله بكل شيء عليم ﴿٦٤﴾
হরকত সহ:
اَلَاۤ اِنَّ لِلّٰهِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ قَدْ یَعْلَمُ مَاۤ اَنْتُمْ عَلَیْهِ ؕ وَ یَوْمَ یُرْجَعُوْنَ اِلَیْهِ فَیُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوْا ؕ وَ اللّٰهُ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمٌ ﴿۶۴﴾
উচ্চারণ: আলাইন্না লিল্লা-হি মা-ফিছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি কাদ ইয়া‘লামুমাআনতুম ‘আলাইহি ওয়া ইয়াওমা ইউরজা‘ঊনা ইলাইহি ফাইউনাব্বিঊহুম বিমা-‘আমিলূ ওয়াল্লা-হু বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীম।
আল বায়ান: সাবধান, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তা আল্লাহরই; তোমরা যে অবস্থায় আছ তা তিনি অবশ্যই জানেন এবং যেদিন তাদেরকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে নেয়া হবে সেদিন তারা যা করত তিনি তাদেরকে তা জানিয়ে দেবেন। আল্লাহ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৪. জেনে রাখ, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তা আল্লাহরই; তোমরা যাতে ব্যাপৃত তিনি তা অবশ্যই জানেন। আর যেদিন তাদেরকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে নেয়া হবে, সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তারা যা করত। আর আল্লাহ্ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।
তাইসীরুল ক্বুরআন: নিশ্চিত জেনে রেখ, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর। তোমরা যে অবস্থায় আছ তা তিনি জানেন। অতঃপর যেদিন তারা তাঁর কাছে ফিরে যাবে সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তারা যা করত, আল্লাহ সকল বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অবগত।
আহসানুল বায়ান: (৬৪) জেনে রেখো, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা আল্লাহরই।[1] তোমরা যাতে লিপ্ত আছ, আল্লাহ তা জানেন।[2] যেদিন তারা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে, সেদিন তিনি তারা যা করেছে, তা তাদেরকে জানিয়ে দেবেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।
মুজিবুর রহমান: জেনে রেখ, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে তা আল্লাহরই, তোমরা যাতে ব্যাপৃত তিনি তা জানেন; যেদিন তারা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন তারা যা করত; আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।
ফযলুর রহমান: জেনে রাখ, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তা (সবই) আল্লাহর। তিনি তোমাদের অবস্থা জানেন; আর (সে দিনের কথাও তিনি জানেন) যেদিন তাদেরকে তাঁরই কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, সেদিন তিনি তাদেরকে তাদের অতীত কর্মসমূহ অবহিত করবেন। আল্লাহ সবকিছুই ভালভাবে জানেন।
মুহিউদ্দিন খান: মনে রেখো নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা আছে, তা আল্লাহরই। তোমরা যে অবস্থায় আছ তা তিনি জানেন। যেদিন তারা তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে, সেদিন তিনি বলে দেবেন তারা যা করেছে। আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ই জানেন।
জহুরুল হক: এটি কি নয় যে মহাকাশমন্ডলীতে ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা নিশ্চয়ই আল্লাহ্র? তিনি অবশ্য জানেন তোমরা যা-কিছুতে রয়েছ। আর যেদিন তাদের তাঁর কাছে ফেরত নেওয়া হবে সেদিন তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে যা তারা করত। আর আল্লাহ্ সব- কিছু সন্বন্ধে সর্বজ্ঞাতা।
Sahih International: Unquestionably, to Allah belongs whatever is in the heavens and earth. Already He knows that upon which you [stand] and [knows] the Day when they will be returned to Him and He will inform them of what they have done. And Allah is Knowing of all things.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬৪. জেনে রাখ, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তা আল্লাহরই; তোমরা যাতে ব্যাপৃত তিনি তা অবশ্যই জানেন। আর যেদিন তাদেরকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে নেয়া হবে, সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তারা যা করত। আর আল্লাহ্ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬৪) জেনে রেখো, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা আল্লাহরই।[1] তোমরা যাতে লিপ্ত আছ, আল্লাহ তা জানেন।[2] যেদিন তারা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে, সেদিন তিনি তারা যা করেছে, তা তাদেরকে জানিয়ে দেবেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।
তাফসীর:
[1] সৃষ্টির দিক দিয়ে, মালিকানার দিক দিয়ে, অধীনতার দিক দিয়ে সবকিছু তাঁরই। তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করেন। যা ইচ্ছা তাই আদেশ করেন। অতএব তাঁর রসূলের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা উচিত। যার দাবী এই যে, রসূলের কোন আদেশের বিরোধিতা করা যাবে না এবং তিনি যা নিষেধ করেন, তাও করা যাবে না। কারণ, রসূল (সাঃ)-এর প্রেরণের উদ্দেশ্যই হল, তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য করা হবে।
[2] আল্লাহর রসূলের বিরোধীদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা যে আচরণ প্রদর্শন করছ, এটা ভেবে নিও না যে, তা আল্লাহর অজানা থাকতে পারে। বরং সব কিছুই তাঁর অসীম জ্ঞানায়ত্বে রয়েছে, আর সেই মত তিনি কিয়ামতের দিন প্রতিফল ও প্রতিদান দেবেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬২-৬৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আলোচ্য আয়াতে মু’মিনদেরকে আল্লাহ তা‘আলা কয়েকটি শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এক. মু’মিনরা যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে কোন সমষ্টিগত বিষয়েন যেমন জিহাদ, পরামর্শ, আলোচনা বৈঠক অনুরূপ ইত্যাদি ব্যাপারে একত্রিত হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুমতি ছাড়া মাজলিস ত্যাগ করবে না। কোন প্রয়োজন দেখা দিলে তাঁর কাছে যথারীতি অনুমতি গ্রহণ করবে। এরকম সমষ্টিগত বৈঠক থেকে প্রয়োজনে অনুমতি নিয়ে যাওয়াকে ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের প্রতি ঈমানদার তারাই এরূপ সমষ্টিগত মাজলিস থেকে অনুমতি নিয়ে বের হয় যা আয়াতের প্রথম শব্দে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং যারা ঈমানদার নয়, অন্তরে নিফাকী রয়েছে কেবল তারাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুমতি না নিয়ে মাজলিস ত্যাগ করে। তাই কেউ এরূপ সমষ্টিগত মাজলিস থেকে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দুটি শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ১. যিনি অনুমতি চাচ্ছেন তিনি যদি কোন বিশেষ প্রয়োজনে অনুমতি প্রার্থনা করেন যেমনন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়া বা পরিবারের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইত্যাদিন তাহলে অনুমতি দেয়া হবে, বিনা প্রয়োজনে অনুমতি দেয়া যাবে না। ২. তিনি যাকে যাওয়ার অনুমতি দেয়ার ইচ্ছা করবেন এবং তাকে অনুমতি দেয়াটাই কল্যাণ হবে বলে মনে করেন। সুতরাং এ দুটি শর্ত সামনে রেখে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাকে মাজলিস ত্যাগ করার অনুমতি দেবেন সে ব্যক্তিই মাজলিস ত্যাগ করতে পারবে, সে জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলা অনুমতি প্রার্থনাকারী ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিচ্ছেন। (তাফসীর সা‘দী) এরূপ সমষ্টিগত মাজলিস থেকে বিনা অনুমতিতে চলে যাওয়া কি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাজলিসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, না ব্যাপক? এটা শুধু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাজলিসের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উত্তরাধিকারী আলেম, ইমাম ও আমীরদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং কোন আলেম যদি মুসলিমদের নিয়ে সমাবেশ করেন, ধর্মীয় কোন আলোচনা বৈঠক করেন তাহলে সেখান থেকে সে আলেমের বিনা অনুমতিতে চলে যাওয়া বৈধ নয়।
দুই. ‘‘রাসূলের আহ্বানকে” এখানে দুটি অর্থ রয়েছেন
১. اضافة الي الفاعل
আয়াতের অর্থ হলন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ডাকেন তখন একে তোমাদের সাধারণ মানুষের ডাকার মত মনে করো না, যার সাড়া দেয়া, না দেয়া তোমাদের ইচ্ছাধীন নয়। বরং তখন সাড়া দেয়া ওয়াজিব। এমনকি সালাতরত অবস্থাতে থাকলেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ডাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক।
২. اضافة الي المفعول
আয়াতের অর্থ হলন যখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কোন প্রয়োজনে আহ্বান কর অথবা সম্বোধন কর, তখন সাধারণ লোকের ন্যায় তাঁর নাম নিয়ে “হে মুহাম্মাদ, হে মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ” বলবে না। এটা বেআদবী, বরং সম্মানসূচক উপাধি “হে আল্লাহর রাসূল, হে আল্লাহ তা‘আলার নাবী” ইত্যাদি বলে ডাকবে। এরূপভাবে ডাকতে সূরা হুজুরাতেও নিষেধ করা হয়েছে।
التسلل অর্থ বের হয়ে যাওয়া, لواذ কোন কিছু গোপন রাখা যাতে কেউ না দেখে। অর্থাৎ মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বৈঠক থেকে চুপিসারে বের হয়ে যেত যাতে কেউ দেখতে না পায়। এদেরকে আল্লাহ তা‘আলা হুশিয়ারী দিয়ে বলছেন, তোমার যা করছো তা মানুষ দেখতে না পেলেও আল্লাহ তা‘আলা দেখছেন। এর যথার্থ প্রতিদান তিনিই দেবেন।
(عَنْ أَمْرِه۪) “তাঁর আদেশের” তাঁর আদেশ বলতে কার আদেশ বুঝানো হয়েছেন এ নিয়ে দুটি মত পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলার আদেশ; কেউ বলেছেন, রাসূলের আদেশ। তবে উদ্দেশ্য একটাই, কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার আদেশগুলো পৌছে দেন, তাই রাসূলের আদেশ মানে আল্লাহ তা‘আলার আদেশ। সুতরাং যারা রাসূলের আদেশ অমান্য করে তাদের সতর্ক হওয়া উচিত, রাসূলের আদেশকে অমান্য করার কারণে তাদের ওপর ফেতনা আপতিত হবে অথবা কঠিন শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।
فِتْنَةٌ অর্থাৎ শিরক, অকল্যাণ ও অন্তরের সে বক্রতা আপতিত হবে যা ঈমান থেকে বঞ্চিত করে। আর ঈমান থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলাফল হল জাহান্নাম, যাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদেশ, সুন্নাত ও আদর্শ বর্জন করার কোন সুযোগ নেই। যে কেউ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদেশ অমান্য করে সুন্নত বর্জন করে কোন আমল করবে আল্লাহ তা‘আলা তার আমল কবূল করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করবে যা আমাদের নির্দেশিত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। (সহীহ মুসলিম হা: ১৭১৮)
এমনকি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথার ওপর কারো কথা প্রাধান্য দেয়া গুরুতর অপরাধ। সে ব্যক্তি যত বড়ই হোক না কেন। ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন: আমি আশংকা করছি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হবে। আমি বলছি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আর তোমরা বলছ আবূ বকর ও উমার বলেছেন। অর্থাৎ যেখানে আল্লাহ তা‘আলার রাসূলের কথা রয়েছে সেখানে আবূ বকর ও উমারের কথা কিভাবে নিয়ে আসছো?
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেন: আমি ঐ সকল লোকদের ব্যাপারে আশ্চর্যবোধ করি যারা (কোন হাদীসের) সনদ সহীহ হিসেবে জানে তার পরে (তা বাদ দিয়ে) সুফইয়ান সাওরীর কথার দিকে চলে যায়। অর্থাৎ হাদীস সহীহ জানা সত্ত্বেও তা বর্জন করে বিভিন্ন ইমাম সাহেবের কথা গ্রহণ করে। তারপর তিনি এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন এবং বললেন: তোমরা কি জান ফেতনা কী? ফেতনা হলন শিরক, যদি কেউ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা পাওয়ার পর তা বর্জন করে তাহলে তার অন্তরে এমন বক্রতা সৃষ্টি হবে যা তাকে ধ্বংস করে দিবে।
(أَلَآ إِنَّ لِلّٰهِ)
অর্থাৎ সৃষ্টি, মালিক, পরিচালনাসহ সব কিছুর দিক দিয়ে আকাশ-জমিনের যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তা‘আলার। তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা উচিত।
(قَدْ يَعْلَمُ مَآ أَنْتُمْ عَلَيْهِ)
অর্থাৎ আনুগত্য, অবাধ্য বা অন্য যে কোন অবস্থাতে থাক না কেন আল্লাহ তা‘আলা সব জানেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ط وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَّرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِيْ ظُلُمٰتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَّلَا يَابِسٍ إِلَّا فِيْ كِتٰبٍ مُّبِيْنٍ)
“জলে ও স্থলে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত, তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না অথবা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোন বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে (লাওহে মাহফূজে) নেই।” (সূরা আন‘আম ৬:৫৯)
সুতরাং যেদিন তোমরা তাঁর কাছে ফিরে যাবে সেদিন তিনি তোমাদেরকে দুনিয়ার আমল সম্পর্কে জানিয়ে দেবেন, আর সে অনুপাতে প্রতিদান দেবেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য হল তারা সমষ্টিগত কোন বৈঠকে থাকলে নেতার অনুমতি ছাড়া চলে যায় না।
২. যার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করবে সে প্রয়োজন মনে করলে অনুমিত দিবে, অথবা দিবে না।
৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সাধারণ লোকের মত ডাকতে নিষেধ করা হয়েছে।
৪. আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের অমান্য করা যাবে না।
৫. সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
৬. আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সকল বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন।
৭. কিয়ামত দিবসে প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফলাফল দেয়া হবে।
৮. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত অনুযায়ী আমল না করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, যমীন ও আসমানের মালিক, অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা এবং বান্দাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় কার্যাবলীর জান্তা একমাত্র আল্লাহ। (আরবি)-এর (আরবি) শব্দটি তাহকীক বা নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যে এসেছে। যেমন এর পূর্ববর্তী আয়াতে রয়েছে(আরবি)জায়গায় আছেঃ (আরবি) (৩৩:১৮) আর এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) (৫৮: ১) অন্য একটি আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) (৬:৩৩) আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি) (২:১৪৪) ইত্যাদি। এই সমুদয় স্থানে এসেছে বা ক্রিয়ার বা নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যে। যেমন মুআযযিন বলে থাকেন (আরবি) এখানেও (আরবি)শব্দটি নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যেই এসেছে।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা যাতে ব্যাপৃত রয়েছে তিনি তা জানেন। তোমরা যে অবস্থাতেই থাকে না কেন এবং যে আমল ও বিশ্বাসের উপর থাকে না কেন সবই তাঁর কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। আসমান ও যমীনের অণু পরিমাণ জিনিসও তাঁর কাছে গোপন নেই। তোমাদের আমল ও অবস্থা সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম বস্তুও তার কাছে প্রকাশমান। ছোট বড় সমস্ত জিনিস স্পষ্ট কিতাবে রক্ষিত রয়েছে। বান্দাদের ভাল-মন্দ সমস্ত কাজ তিনি পূর্ণভাবে পরিজ্ঞাত রয়েছেন। তোমরা কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকো অথবা গোপনে গোপনে কিছু করো না কেন, আল্লাহর কাছে কিছুই গোপন থাকবে না। প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই তাঁর কাছে সমান। চুপি চুপি কথা এবং উচ্চ স্বরের কথা সবই তাঁর কানে পৌঁছে যায়। সমস্ত প্রাণীর রিযকদাতা তিনিই। প্রত্যেক প্রাণীর প্রত্যেক অবস্থার খবর তিনিই রাখেন। প্রথম থেকেই সব কিছু লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অদৃশ্যের চাবি তাঁরই হাতে আছে, যা তিনি ছাড়া আর কেউই জানে না। জলে ও স্থলে অবস্থানরত সব কিছুর খবর একমাত্র তিনিই রাখেন। গাছের একটি পাতা ঝরে পড়লে সেটাও তাঁর অজানা থাকে না। যমীনের অন্ধকারের মধ্যে কোন দানা নেই এবং শুষ্ক ও সিক্ত এমন কোন জিনিস নেই যা স্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই। এই বিষয়ের বহু আয়াত এবং হাদীস রয়েছে। যখন সৃষ্টজীব আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে, ঐ সময় তাদের সামনে ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম পুণ্য ও পাপ পেশ করা হবে। তারা তাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত আমল দেখতে পাবে। আমলনামা তারা ভীত ও কম্পিতভাবে দেখবে এবং ওর মধ্যে তাদের সারা জীবনের কার্যাবলী দেখতে পেয়ে অত্যন্ত বিস্ময়ের সুরে বলবেঃ “এটা কেমন কিতাব যে, এতে বড় তত বড়ই এমনকি ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম কোন কিছুও বাদ পড়েনি!” যে যা করেছে তার সবই সেখানে বিদ্যমান পাবে। যেমন মহামহিমান্বিত ও প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কি অগ্রে পাঠিয়েছে এবং কি পশ্চাতে রেখে গিয়েছে।” (৭৫: ১৩) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আর হাযির করা হবে আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে আতংকগ্রস্ত এবং তারা বলবেঃ হায়! দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! এটা ছোট বড় কিছুই বাদ দেয় না; রবং ওটা সমস্ত হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে হাযির পাবে; তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।” (১৮:৪৯)
এজন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ যেদিন তারা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন তারা যা করতো। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।