সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত: 94)
হরকত ছাড়া:
رب فلا تجعلني في القوم الظالمين ﴿٩٤﴾
হরকত সহ:
رَبِّ فَلَا تَجْعَلْنِیْ فِی الْقَوْمِ الظّٰلِمِیْنَ ﴿۹۴﴾
উচ্চারণ: রাব্বি ফালা-তাজ‘আলনী ফিল কাউমিজ্জা-লিমীন।
আল বায়ান: ‘হে আমার রব, তাহলে আমাকে যালিম সম্প্রদায়ভুক্ত করবেন না।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯৪. তবে, হে আমার রব! আপনি আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাহলে হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে যালিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করো না’।
আহসানুল বায়ান: (৯৪) হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করো না।’ [1]
মুজিবুর রহমান: তবে হে আমার রাব্ব! আপনি আমাকে যালিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেননা।
ফযলুর রহমান: হে প্রভু! তবে আমাকে জালেমদের অন্তর্ভুক্ত করো না।”
মুহিউদ্দিন খান: হে আমার পালনকর্তা! তবে আপনি আমাকে গোনাহগার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত করবেন না।
জহুরুল হক: আমার প্রভু! তাহলে আমাকে তুমি অত্যাচারী জাতির সঙ্গে স্থাপন করো না।
Sahih International: My Lord, then do not place me among the wrongdoing people."
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯৪. তবে, হে আমার রব! আপনি আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।(১)
তাফসীর:
(১) উদ্দেশ্য এই যে, কুরআনের অনেক আয়াতে মুশরিক ও কাফেরদের উপর যে আযাবের কথা উল্লেখিত হয়েছে, কেয়ামতে এই আযাব হওয়া তো অকাট্য ও নিশ্চিতই, দুনিয়াতে হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এই আযাব দুনিয়াতে হয়, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরে হওয়ারও সম্ভাবনা আছে এবং তার যমানায় তার চোখের সামনে তাদের উপর কোন আযাব আসার সম্ভাবনাও আছে। দুনিয়াতে যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর কোন আযাব আসে, তখন মাঝে মাঝে সেই আযাবের প্রতিক্রিয়া শুধু যালেমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সৎলোকও এর কারণে পার্থিব কষ্টে পতিত হয়। তবে হয়ত এ কারণে আখেরাতে তাদের আযাবের ভার লাঘব হবে। তাছাড়া এই পার্থিব কষ্টের কারণে তারা সওয়াবও পাবে।
আল্লাহ বলেনঃ “এমন আযাবকে ভয় করো, যা এসে গেলে শুধু যালেমদের পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে না” [সূরা আল-আনফালঃ ২৫] বরং অন্যরাও এর কবলে পতিত হবে। তাই এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই দো'আ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, আপনি বলুনঃ হে আল্লাহ, যদি তাদের উপর আপনার আযাব আমার সামনে এবং আমার চোখের উপরই আসে, তবে আমাকে এই যালেমদের সাথে রাখবেন না। আমাকে তাদের বাইরে রাখবেন। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯৪) হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করো না।’ [1]
তাফসীর:
[1] সুতরাং হাদিসে এসেছে যে, নাবী (সাঃ) এই বলে দুয়া করতেন, "হে আল্লাহ্! যখন তুমি কোন জাতিকে ফিতনায় ফেলার ইচ্ছা কর তখন তার পূর্বেই তুমি আমাকে (পৃথিবী হতে) তোমার নিকট ফিতনামুক্ত অবস্থায় তুলে নিও।" (তিরমিজিঃ তাফসীর সুরা সা-দ, আহমাদ ৫/২৪৩)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯৩-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর:
কাফির-মুশরিকদের কাছে দলীল-প্রমাণ পেশ করার পরেও যখন তারা ঈমান আনল না এবং আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করে কুফরী বর্জন করল না, তখন তাদের ওপর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেল এবং তাদেরকে যে বিষয়ে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল তা চলে আসা আবশ্যক হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলছেন: হে আল্লাহ, যখন তাদেরকে শাস্তি দেবেন তখন যদি আমাকে দেখাতেন! তবে শাস্তি দানে জালেমদের মাঝে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করবেন না। যেমন হাদীস বর্ণিত হয়েছে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যখন আপনি কোন সম্প্রদায়কে ফেতনায় পতিত করার ইচ্ছা করেন তখন ফেতনায় পতিত করার পূর্বেই আমাকে আপনার নিকট উঠিয়ে নিন। (মুসনাদ আহমাদ ৫/২৪৩, তিরমিযী হা: ৩২৩৩)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি যেন ভাল দ্বারা মন্দের মোকাবেলা করেন। এতে করে যারা শত্র“ থাকবে তারাও বন্ধুতে পরিণত হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَلَا تَسْتَوِی الْحَسَنَةُ وَلَا السَّیِّئَةُﺚ اِدْفَعْ بِالَّتِیْ ھِیَ اَحْسَنُ فَاِذَا الَّذِیْ بَیْنَکَ وَبَیْنَھ۫ عَدَاوَةٌ کَاَنَّھ۫ وَلِیٌّ حَمِیْمٌﭱوَمَا یُلَقّٰٿھَآ اِلَّا الَّذِیْنَ صَبَرُوْاﺆ وَمَا یُلَقّٰٿھَآ اِلَّا ذُوْ حَظٍّ عَظِیْمٍ)
“ভাল এবং মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে, তোমার সাথে যার শত্র“তা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত। এই গুণের অধিকারী করা হয় শুধু তাদেরকেই যারা ধৈর্যশীল, এই গুণের অধিকারী করা হয় শুধু তাদেরকে যারা মহা ভাগ্যবান।” (সূরা হা-মীম-সাজদাহ ৪১:৩৪-৩৫)
সাথে সাথে এ নির্দেশও প্রদান করেছেন যে, শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং জালিমদের সাহচর্য হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিম্নবর্ণিত দু‘আসমূহ পাঠ করতেন:
اللَّهُمَّ إنِّي أَعُوذُ بِك من الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ من هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْثِهِ
আমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ তা‘আলার নিকট বিতাড়িত শয়তানের প্ররোচনা, কুমন্ত্রণা ও ফুঁৎকার হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সহীহ ইবনু হিব্বান হা: ২৬০১) ঘুমন্ত অবস্থায় ভয় পেলে এ দু‘আটি পড়তেন:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ غَضَبِهِ وَشَرِّ عِبَادِهِ، وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ
আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের অসীলায় তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি হতে, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট হতে, শয়তানের প্ররোচনাদি এবং আমার নিকট ওদের হাজির হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (আবূ দাঊদ হা: ৩৮৯৩, তিরমিযী হা: ৩৫২৮, সহীহ)
অতএব যে কোন কাজ করতে গেলে শুরুতে আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে, শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে আরম্ভ করা উচিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. জালিম সম্প্রদায়ের সাহচর্য ও শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে।
৩. মন্দের মোকাবেলা করতে হবে ভাল দিয়ে, মন্দ দিয়ে নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯৩-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-কে নির্দেশ নিচ্ছেন যে, শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার সময় তিনি যেন দু'আ করেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি যদি আমার বিদ্যমানতায় ঐ অসৎ লোকদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করেন তবে আমাকে ঐ শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিন। যেমন হাদীসে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আপনি কোন কওমকে ফিৎনায় পতিত করার ইচ্ছা করেন তখন ফিৎনায় পতিত করার পূর্বেই আমাকে আপনার নিকট উঠিয়ে নেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম তিরিমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন)
আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে এই শিক্ষা দেয়ার পর বলেনঃ আমি তাদেরকে যে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি তা আমি তোমাকে দেখাতে অবশ্যই সক্ষম। অর্থাৎ আমার পক্ষ থেকে ঐ কাফিরদের উপর যে শাস্তি ও বিপদ-আপদ আসবে তা ইচ্ছা করলে আমি তোমাকে দেখাতে পারি।
এরপর মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)-কে এমন কথা শিখিয়ে দিচ্ছেন যা সমস্ত কঠিন সমস্যা ও বিপদ-আপদ দূর করতে সক্ষম। তা হলো, তুমি মন্দের মুকাবিলা কর যা উত্তম তা দ্বারা; তারা যা বলে আমি সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবগত। অর্থাৎ যারা তোমার সাথে মন্দ ব্যবহার করে তুমি তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার কর যাতে তাদের শত্রুতা বন্ধুত্বে এবং ঘৃণা প্রেম-প্রীতিতে পরিবর্তিত হয়। যেমন অন্য আয়াতে তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত। এই গুণের অধিকারী করা হয় শুধু তাদেরকেই যারা ধৈর্যশীল; এই গুণের অধিকারী করা হয় শুধু তাদেরকেই যারা। মহা ভাগ্যবান।” (৪১:৩৪-৩৫)
মানুষের অনিষ্ট থেকে বাঁচবার উত্তম পন্থা বলে দেয়ার পর মহান আল্লাহ, শয়তানের অনিষ্ট হতে বাঁচবার উপায় বলে দিচ্ছেনঃ বল, হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি শয়তানের প্ররোচনা হতে। কেননা, তার প্ররোচনা হতে বাঁচবার অস্ত্র এই প্রার্থনা ছাড়া তোমাদের অধিকারে আর কিছুই নেই। সদাচরণ দ্বারা সে মানুষের বশে আসতে পারে না। আশ্রয় প্রার্থনা করার বর্ণনায় আমরা লিখে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি শ্রোতা ও জ্ঞাতা আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তানের প্ররোচনা, কুমন্ত্রণা ও ফুৎকার হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”
আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার নিকট তাদের উপস্থিতি হতে। শয়তান যেন আমার কোন কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।
সুতরাং প্রত্যেক কাজের প্রারম্ভে আল্লাহর স্মরণ ঐ কাজের মধ্যে শয়তানের প্রবেশকরণকে সরিয়ে রাখে। পানাহার, সহবাস, যবেহ ইত্যাদি প্রত্যেকটি কাজের শুরুতে আল্লাহকে স্মরণ করা উচিত। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের দু'আটিও পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি অতি বার্ধক্য হতে, আশ্রয় চাচ্ছি পিষ্ট হয়ে (আকস্মিকভাবে) মৃত্যুবরণ করা হতে ও ডুবে মরা হতে এবং শয়তান যেন আমাকে আমার মৃত্যুর সময় বিভ্রান্ত করতে না পারে সে জন্যে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কছি।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আমর ইবনে শশাআইব (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে একটি দু'আ শিখাতেন যেন ওটা আমা ঘুমোবার সময় পাঠ করি যাতে উদ্বেগের কারণে নিদ্রা ভঙ্গ হয়ে যাওয়ার রাগে দূর হয়ে যায়। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আল্লাহর নামে তাঁর পূর্ণ কালেমার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করছি তার গযব হতে, তার শাস্তি হতে, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট হতে, শয়তানদের প্ররোচনা হতে এবং আমার নিকট তাদের উপস্থিতি হতে।”
হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর নীতি ছিল এই যে, তিনি তাঁর প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদেরকে উপরোক্ত দু'আটি শিখিয়ে দিতেন এবং এটা লিখে অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের গলায় লটকিয়ে দিতেন। (ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাঊদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।