সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত: 31)
হরকত ছাড়া:
ثم أنشأنا من بعدهم قرنا آخرين ﴿٣١﴾
হরকত সহ:
ثُمَّ اَنْشَاْنَا مِنْۢ بَعْدِهِمْ قَرْنًا اٰخَرِیْنَ ﴿ۚ۳۱﴾
উচ্চারণ: ছু ম্মা আশা’না-মিম বা‘দিহিম কারনান আ-খারীন।
আল বায়ান: তারপর তাদের পরে আমি অন্য প্রজন্ম সৃষ্টি করেছি।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩১. তারপর আমরা তাদের পরে অন্য এক প্রজন্ম(১) সৃষ্টি করেছিলাম;
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর তাদের পর আরেক মানব বংশ (‘আদ সম্প্রদায়কে) সৃষ্টি করেছিলাম।
আহসানুল বায়ান: (৩১) অতঃপর তাদের পর আমি অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিলাম। [1]
মুজিবুর রহমান: অতঃপর তাদের পর আমি অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিলাম।
ফযলুর রহমান: অতঃপর তাদের পরে আমি আরেক প্রজন্মকে (আদ জাতিকে) সৃষ্টি করেছিলাম।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর অন্য এক সম্প্রদায় আমি তার স্থলাভিষিক্ত করেছিলাম।
জহুরুল হক: তারপর আমরা তাদের পরে পত্তন করেছিলাম অন্য এক বংশকে।
Sahih International: Then We produced after them a generation of others.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩১. তারপর আমরা তাদের পরে অন্য এক প্রজন্ম(১) সৃষ্টি করেছিলাম;
তাফসীর:
(১) কোন কোন মুফাস্সির এখানে সামূদ জাতির কথা বলা হয়েছে বলে মনে করেছেন। কারণ সামনের দিকে গিয়ে বলা হচ্ছেঃ এ জাতিকে ‘সাইহাহ’ তথা প্ৰচণ্ড আওয়াজের আযাবে ধ্বংস করা হয়েছিল এবং কুরআনের অন্যান্য স্থানে বলা হয়েছে, সামূদ এমন একটি জাতি যার উপর এ আযাব এসেছিল। [হূদঃ ৬৭; আল-হিজরঃ ৮৩ ও আল-কামারঃ ৩১]। অন্য কিছু মুফাসসির বলেছেন, এখানে আসলে আদি জাতির কথা বলা হয়েছে। কারণ কুরআনের দৃষ্টিতে নূহের জাতির পরে এ জাতিটিকেই বৃহৎ শক্তিধর করে সৃষ্টি করা হয়েছিল। [দেখুনঃ আল-আরাফঃ ৬৯]
এ দ্বিতীয় মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য বলা যায়। কারণ “নূহের জাতির পরে” শব্দাবলী এ দিকেই ইংগিত করে। আর ‘সাইহাহ’ (প্রচণ্ড আওয়াজ, চিৎকার, শোরগোল, মহাগোলযোগ) এর সাথে যে সম্বন্ধ স্থাপন করা হয়েছে নিছক এতটুকু সম্বন্ধই এ জাতিকে সামূদ গণ্য করার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ এ শব্দটি সাধারণ ধ্বংস ও মৃত্যুর জন্য দায়ী বিকট ধ্বনির জন্য যেমন ব্যবহার হয় তেমনি ধ্বংসের কারণ যা-ই হোক না কেন ধ্বংসের সময় যে শোরগোল ও মহা গোলযোগের সৃষ্টি হয় তার জন্যও ব্যবহার হয়। [দেখুনঃ ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩১) অতঃপর তাদের পর আমি অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিলাম। [1]
তাফসীর:
[1] অধিকাংশ মুফাসসিরগণের নিকট নূহ (আঃ)-এর জাতির পর যে জাতির পৃথিবীতে আগমন ঘটেছে ও তাদের মধ্যে আল্লাহ রসূল প্রেরণ করেন, তারা হল আদ জাতি। কারণ, অধিকাংশ স্থানে নূহ (আঃ)-এর জাতির স্থলাভিষিক্ত হিসাবে আদ জাতিরই নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, তারা হল সামূদ জাতি। কারণ তাদের ধ্বংসের বর্ণনায় বলা হয়েছে صَيحَة (বিকট শব্দ) তাদেরকে আঘাত করেছিল। আর এ আযাব সামূদ জাতিকেই দেওয়া হয়েছিল। পক্ষান্তরে অন্য অনেকে বলেন, তারা ছিল শুআইব (আঃ)-এর জাতি মাদয়্যানবাসী। কারণ তাদেরকেও বিকট শব্দ দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্বের আয়াতগুলোতে নূহ (عليه السلام) ও তাঁর জাতি এবং যারা অবাধ্য ছিল তাদেরকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনার পর এখানে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, ‘অতঃপর তাদের পরে অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিলাম’। নূহ (عليه السلام)-এর জাতিকে ধ্বংস করার পর অন্য যে জাতি সৃষ্টি করা হয়েছিল তারা হল সামূদ জাতি, যাদের কাছে সালেহ (عليه السلام)-কে প্রেরণ করা হয়েছিল। কারণ এ ঘটনা তাদের ঘটনার সাথে সাদৃশপূর্ণ। কেউ বলেছেন, তারা হল আদ জাতি। আল্লাহ তা‘আলা তাদের কাছে নাবী হিসেবে শু‘আইব (عليه السلام)-কে প্রেরণ করলেন। পূর্বের নাবীর মত তিনিও তাওহীদের দিকে দাওয়াত দিলেন। কিন্তু জাতির যারা নেতৃস্থানীয় এবং ক্ষমতাসীন তারা কুফরী করল এবং আখিরাতকে অস্বীকার করল। যেমন পূর্বের অন্যান্য জাতির নেতৃস্থানীয় লোকেরা কুফরী করেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যিনি রাসূল হবেন তিনি আমাদের মত খাওয়া, পান করা থেকে অমুখাপেক্ষী হবেন, তিনি আমাদের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবেন। তাই তারা তাদের মত খায়, পান করে এমন রাসূলকে মেনে নিতে পারল না। এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায় পূর্বের যুগের কাফিররাও জানত যে, যাকে তাদের কাছে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে তিনি আমাদের মত রক্ত মাংসের মাটির তৈরি একজন মানুষ, খাওয়া-পান করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে একশ্রেণির মুসলিম রয়েছে যারা আমাদের রাসূলকে মাটির তৈরি বিশ্বাস করতে চায় না। অথচ সকল নাবীকে মানুষের মধ্য হতেই প্রেরণ করা হয়েছে। তাছাড়া কুরআনে অনেক দলীল রয়েছে যা প্রমাণ করে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মত মাটির তৈরি রক্ত মাংসের মানুষ।
(وَأَتْرَفْنٰهُمْ فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا)
অর্থাৎ আখিরাতে বিশ্বাস না করা ও পার্থিব সুখ-বিলাসের আতিশয্য... এ দুটি ছিল রাসূলের প্রতি ঈমান না আনার মূল কারণ। আজও বাতিলপন্থীরা উক্ত দু’কারণে হক পন্থীদের বিরোধিতা ও সত্যের দাওয়াত থেকে বিমুখ হয়।
সুতরাং সালেহ (عليه السلام)-এর জাতিরা বলল, তোমরা যদি তোমাদের মত একজন মানুষের অনুসরণ কর তাহলে তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ মানুষ মানুষকে হিদায়াত দিতে পারে না, সে জন্য তার সাথে কোন ফেরেশতা থাকবে বা বড় কোন নিদর্শন থাকবে।
هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ
অর্থাৎ তোমাদেরকে মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত করা হবে বলে সে যে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছে তা অসম্ভব, কোন দিনও তা হতে পারে না। বরং আমাদের যে দুনিয়ার জীবন এ জীবনই শেষ, জীবিত আছি, মারা যাব, আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে না। এ ব্যক্তি তোমাদেরকে যে পুনরুত্থানের প্রতিশ্র“তি প্রদান করছে, মূলত সে এ কথা বলে আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ করছে।
এভাবে সালেহ (عليه السلام)-কে মিথ্যারোপ করলে নূহ (عليه السلام)-এর মত তিনিও আল্লাহর কাছে দু‘আ করলেনন ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন; কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।’
(قَالَ رَبِّ انْصُرْنِيْ)
অর্থাৎ সালেহ (عليه السلام)-এর দু‘আ কবূল করে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিলেনন অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে কিন্তু সে অনুতাপ কোন কাজে আসবে না। অতঃপর তাদেরকে বিকট আওয়াজ পাকড়াও করল এবং তারাও ধ্বংস হলো। এ সম্পর্কে সূরা হূদসহ অন্যন্য সূরাতে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই তাওহীদের দিকে স্বজাতিকে আহ্বান করেছেন।
২. প্রত্যেক যুগের নেতৃস্থানীয় ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরাই সত্যের বিরোধিতা করেছে এবং রাসূলদের সাথে বেআদবী করেছে।
৩. পৃথিবীর সকল বস্তুবাদীদের জন্য এখানে শিক্ষা রয়েছে যে, পূর্বের যুগের মানুষেরা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করত ফলে তাদের পরিণাম ভাল হয়নি।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।