সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত: 17)
হরকত ছাড়া:
ولقد خلقنا فوقكم سبع طرائق وما كنا عن الخلق غافلين ﴿١٧﴾
হরকত সহ:
وَ لَقَدْ خَلَقْنَا فَوْقَکُمْ سَبْعَ طَرَآئِقَ ٭ۖ وَ مَا کُنَّا عَنِ الْخَلْقِ غٰفِلِیْنَ ﴿۱۷﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ খালাকনা-ফাওকাকুম ছাব‘আ তারাইকা ওয়ামা-কুন্না-‘আনিল খালকিগা-ফিলীন।
আল বায়ান: আর অবশ্যই আমি তোমাদের উপর সাতটি স্তর সৃষ্টি করেছি। আর আমি সৃষ্টি সম্পর্কে উদাসীন ছিলাম না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. আর অবশ্যই আমরা তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি আসমান(১) এবং আমরা সৃষ্টি বিষয়ে মোটেই উদাসীন নই(২),
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি তোমাদের উপরে সপ্ত স্তর সৃষ্টি করেছি, আমি (আমার) সৃষ্টির ব্যাপারে অমনোযোগী নই।
আহসানুল বায়ান: (১৭) নিশ্চয় আমি তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্ত স্তর[1] এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই। [2]
মুজিবুর রহমান: আমিতো তোমাদের উর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্ত স্তর এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই।
ফযলুর রহমান: আমি তোমাদের ওপরে সাত স্তর আসমান সৃষ্টি করেছি। আর আমি তো সৃষ্টি সম্বন্ধে অমনোযোগী নই।
মুহিউদ্দিন খান: আমি তোমাদের উপর সুপ্তপথ সৃষ্টি করেছি এবং আমি সৃষ্টি সম্বন্ধে অনবধান নই।
জহুরুল হক: আর আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের উপরে সৃষ্টি করেছি সাতটি পথ, আর সৃষ্টি সন্বন্ধে আমরা কখনও উদাসীন নই।
Sahih International: And We have created above you seven layered heavens, and never have We been of [Our] creation unaware.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৭. আর অবশ্যই আমরা তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি আসমান(১) এবং আমরা সৃষ্টি বিষয়ে মোটেই উদাসীন নই(২),
তাফসীর:
(১) মানুষ সৃষ্টির কথা আলোচনা করার পর সাত আসমান সৃষ্টি করার আলোচনা করা হচ্ছে। সাধারণত: যখনই আল্লাহ আসমান যমীনের সৃষ্টির কথা আলোচনা করেন, তখনই মানুষ সৃষ্টির কথা আলোচনা করেন। যেমন, আল্লাহ বলেন, “মানুষ সৃষ্টি অপেক্ষা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি অবশ্যই বড় বিষয়, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সূরা গাফির: ৫৭] অনুরূপভাবে সূরা আস-সাজদাহ এর ৪–৯ আয়াতসমূহ। [ইবন কাসীর] আকাশ সৃষ্টির আলোচনায় বলা হয়েছে যে, “আমরা তো তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি طرائق। এ طرائق শব্দটি طريقة শব্দের বহুবচন। এর মানে পথও হয় আবার স্তরও হয়। [কুরতুবী] যদি প্রথম অর্থটি গ্রহণ করা হয় এখানে রাস্তা বলতে ফেরেশতাদের চলাচলের পথ বুঝানো হয়েছে।
কারণ, সবগুলো আসমান বিধানাবলী নিয়ে যমীনে যাতায়াতকারী ফেরেশতাদের পথ। [বাগভী; কুরতুবী] আর যদি দ্বিতীয় অর্থাটি গ্রহণ করা হয় তাহলে طرائق এর অর্থ তাই হবে যা (سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا) বা সাতটি আকাশ স্তরে স্তরে [সূরা আল-মুলক: ৩; নূহ: ১৫] এর অর্থ হয়। অর্থাৎ স্তরে স্তরে সাত আসমান তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করা হয়েছে, এর দ্বারা যেন এ কথা বলাই উদ্দেশ্য যে, তোমাদের চাইতে বড় জিনিস আমি নির্মাণ করেছি সেটা হলো, এ আকাশ। মুজাহিদ বলেন, এখানে সাত আসমানই বলা উদ্দেশ্য। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “সাত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর অন্তর্বতী সব কিছু তারই পবিত্ৰতা ও মহিমা ঘোষণা করে”। [সূরা আল-ইসরা: ৪৪] [ইবন কাসীর]
(২) এর অর্থ আমি যা কিছুই সৃষ্টি করেছি। তাদের কারোর কোন প্রয়োজন থেকে আমি কখনো গাফিল এবং কোন অবস্থা থেকে কখনো বেখবর থাকিনি। প্রত্যেকটি বিন্দু, বালুকণা ও পত্র-পল্লবের অবস্থা আমি অবগত থেকেছি। আমি মানুষকে শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেইনি। আমি তাদের ব্যাপারে বেখবরও হতে পারি না; বরং তাদের পালন, বসবাস ও সুখের সরঞ্জামও সরবরাহ করেছি। আকাশ সৃষ্টি দ্বারা এ কাজের সূচনা হয়েছে। এরপর আকাশ থেকে বারিবর্ষণ করে মানুষের জন্যে খাদ্য ও ফল-ফুল দ্বারা সুখের সরঞ্জাম সৃষ্টি করেছি। [দেখুন, কুরতুবী]
অথবা আয়াতের অর্থ, আমি আমার সৃষ্টি সম্পর্কে কখনো গাফেল নই। আমি আমার সৃষ্টির সবকিছু জানি। যমীনে যা প্রবেশ করে, যমীন থেকে যা বের হয়, আকাশ থেকে যা নাযিল হয়, যা আকাশে উঠে, তিনি সবই জানেন। তোমরা যেখানেই থাক সেখানেই তোমরা তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত। আর তোমরা যা আমল কর আল্লাহ তা সম্যক দেখছেন। তিনি এমন এক সত্তা, কোন আসমান অপর আসমানের, কোন যমীন অপর যমীনের মধ্যে তার দৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কোন পাহাড়ের কঠিন স্থানে, কোন সমুদ্রের গভীর কোণে কি আছে সবই তাঁর জানা। পাহাড়ে, টিলায়, বালু, সমুদ্রে, মরুভূমিতে, গাছে কি আছে আর পরিমাণ কত সবই তিনি জানেন। [ইবন কাসীর] আল্লাহ বলেন, “স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারসমূহে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসাযুক্ত কিংবা শুস্ক এমন কোন বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” [সূরা আল-আনআমঃ ৫৯]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৭) নিশ্চয় আমি তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্ত স্তর[1] এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই। [2]
তাফসীর:
[1] طَرائِق শব্দটি طَرِيقَة এর বহুবচন। যার ভাবার্থঃ আকাশ। আরবের লোকেরা উপরের জিনিসকে طَرِيقَة বলে থাকে। আর আকাশ যেহেতু উপরে সেই জন্য তাকেও طَرائِق বলা হয়েছে। অথবা طَرِيقَة এর অর্থ পথ। যেহেতু আকাশ ফিরিশতাদের যাতায়াতের পথ বা গ্রহ-নক্ষত্রের গমনাগমনের পথ (ছায়াপথ)। সেই জন্য তাকে طَرائِق বলে অভিহিত করা হয়েছে।
[2] خَلق (সৃষ্টি) থেকে উদ্দেশ্য مَخلُوق (সৃষ্ট)। অর্থাৎ, আসমান সৃষ্টি করার পর পৃথিবীর সৃষ্টি বিষয়ে উদাসীন হয়ে যাইনি। বরং আমি আসমানকে যমীনের উপর ভেঙ্গে পড়া হতে সুরক্ষিত রেখেছি; যাতে সৃষ্টিজগৎ ধ্বংস হয়ে না যায়। অথবা অর্থ এই যে, আমি সৃষ্টি জগতের কল্যাণ ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে উদাসীন নই; বরং আমি তার ব্যবস্থা করে থাকি। (ফাতহুল কাদীর) আবার কেউ বলেন যে, এর অর্থ হল পৃথিবী হতে যা কিছু উদগত হয় বা যা কিছু তাতে প্রবেশ করে এবং এমনিভাবে আকাশ হতে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং যা কিছু উপরে চড়ে সব কিছুর জ্ঞান আল্লাহর রয়েছে। প্রতিটি জিনিস তিনি প্রত্যক্ষ করছেন এবং নিজ জ্ঞান দ্বারা সর্বত্র তোমাদের সাথে রয়েছেন। (ইবনে কাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৭ নং আয়াতের তাফসীর:
মানব জাতির সৃষ্টির কথা আলোচনা করার পর আল্লাহ তা‘আলা আকাশসমূহ সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন। মানব সৃষ্টির তুলনায় আকাশসমূহের সৃষ্টি আরো অধিক কঠিন কাজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, আমি তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্তস্তর। যেমন আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন:
সপ্ত আকাশ, পৃথিবী এবং তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৪৪)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللّٰهُ سَبْعَ سَمٰوٰتٍ طِبَاقًا)
“তোমরা লক্ষ্য করনি আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে সাত আসমানকে স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন?” (সূরা নুহ ৭১:১৫)
এ সকল সৃষ্টির কথাই প্রমাণ করে যে, সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত দ্বিতীয় আর কেউ নেই। এবং আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টির বিষয়ে অসতর্কও নন। বরং তিনি প্রত্যেক বিষয়ের যথাযথ খবর রাখেন। কোথায় কী হয় না হয় সব কিছ্ইু তিনি জানেন। (আল্লাহ তা‘আলা অধিক জ্ঞাত)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।
২. আকাশ ও জমিন সাতটি।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: মানব সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আকাশসমূহের সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন। মানব সৃষ্টির তুলনায় আকাশসমূহের সৃষ্টি বহুগুণে বেশী শিল্প চাতুর্যের পরিচায়ক। সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম সাজদাহতেও এরই বর্ণনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জুমআর দিন ফজরের নামাযের প্রথম রাকআতে এই সূরাটি পাঠ করতেন। সেখানে প্রথমে আসমান ও যমীনের সষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তারপর মানব সৃষ্টির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এরপর পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে।
এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো তোমাদের উর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্তস্তর। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এতোদুভয়ের মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবই তার মহিমা কীর্তন করে।” (১৭:৪৪) অন্য এক স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি দেখেনি যে, কিভাবে আল্লাহ সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন?” (৭১:১৫) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ এবং পৃথিবীও ওগুলোর মতই, ওগুলোর মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; ফলে তোমরা বুঝতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং জ্ঞানে আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” (৬৫: ১২)
আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই। অর্থাৎ তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে ও আকাশে যা কিছু উথিত হয়। তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সাথে আছেন; তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন। আকাশের উচ্চ হতে উচ্চতম স্থানে অবস্থিত জিনিস, যমীনের গোপনীয় জিনিস, পর্বতের শৃঙ্গ, সমুদ্রের তলদেশ ইত্যাদি সবকিছুই তাঁর সামনে প্রকাশমান। পাহাড়-পর্বত-টিলা, মরুভূমি, সমুদ্র, ময়দান ইত্যাদি সবকিছুরই খবর তিনি রাখেন। গাছের এমন কোন পাতা ঝরে পড়ে না যা তাঁর জানা থাকে না, যমীনের অন্ধকারে এমন বীজ নেই যা তাঁর অজানা রয়েছে এবং এমন কোন আর্দ্র ও শুষ্ক জিনিস নেই যা প্রকাশ্য কিতাবে বিদ্যমান নেই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।