সূরা আল-হজ্জ (আয়াত: 54)
হরকত ছাড়া:
وليعلم الذين أوتوا العلم أنه الحق من ربك فيؤمنوا به فتخبت له قلوبهم وإن الله لهاد الذين آمنوا إلى صراط مستقيم ﴿٥٤﴾
হরকত সহ:
وَّ لِیَعْلَمَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ اَنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّکَ فَیُؤْمِنُوْا بِهٖ فَتُخْبِتَ لَهٗ قُلُوْبُهُمْ ؕ وَ اِنَّ اللّٰهَ لَهَادِ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ ﴿۵۴﴾
উচ্চারণ: ওয়া লিইয়া‘লামাল্লাযীনা ঊতুল ‘ইলমা আন্নাহুল হাক্কুমির রাব্বিকা ফাইউ‘মিনূবিহী ফাতুখবিতা লাহূকুলূবুহুম ওয়া ইন্নাল্লা-হা লাহা-দিল্লাযীনা আ-মানূইলা-সিরাতিম মুছতাকীম।
আল বায়ান: এটা এজন্যও যে, যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তারা যেন জানতে পারে যে, এটা অবশ্যই তোমার রবের পক্ষ থেকে সত্য। অতঃপর তারা যেন এর প্রতি ঈমান আনে এবং তাদের অন্তর যেন এর প্রতি অনুগত হয়। আর যারা ঈমান এনেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শনকারী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৪. আর এ জন্যেও যে, যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা আপনার রব-এর কাছ থেকে পাঠানো সত্য; ফলে তারা তার উপর ঈমান আনে ও তাদের অন্তর তার প্রতি বিনয়াবনত হয়। আর যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ নিশ্চয় তাদেরকে সরল পথ প্ৰদৰ্শনকারী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: (আর অপরদিকে) যাতে, যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা জানতে পারে যে, এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে (প্রেরিত) সত্য, অতঃপর তারা যেন তাতে বিশ্বাসী হয় আর তাদের অন্তর নম্রতাভরে তার প্রতি খুলে দেয়া হয়, কারণ আল্লাহ ঈমানদারদেরকে অবশ্যই সঠিক পথে পরিচালিত করেন।
আহসানুল বায়ান: (৫৪) আর এ জন্যেও যে, যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত সত্য; অতঃপর তারা যেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন তার প্রতি অনুগত হয়।[1] যারা বিশ্বাস করেছে তাদেরকে আল্লাহ অবশ্যই সরল পথে পরিচালিত করেন। [2]
মুজিবুর রহমান: এবং এ জন্য যে, যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা (কুরআন) তোমার রবের নিকট হতে প্রেরিত সত্য। অতঃপর তারা যেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন ওর প্রতি অনুগত হয়। যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহ সরল পথে পরিচালিত করেন।
ফযলুর রহমান: এবং (তা) এ জন্যও যে, যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা জানবে যে, এই কোরআন তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে আগত সত্য এবং তারা তা বিশ্বাস করবে ও তাদের অন্তর তার প্রতি অবনত হবে। আর আল্লাহ অবশ্যই মুমিনদের সঠিক পথ প্রদর্শনকারী।
মুহিউদ্দিন খান: এবং এ কারণেও যে, যাদেরকে জ্ঞানদান করা হয়েছে; তারা যেন জানে যে এটা আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে সত্য; অতঃপর তারা যেন এতে বিশ্বাস স্তাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন এর প্রতি বিজয়ী হয়। আল্লাহই বিশ্বাস স্থাপনকারীকে সরল পথ প্রদর্শন করেন।
জহুরুল হক: আর যেন যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা জানতে পারে যে এটি তোমার প্রভুর কাছ থেকে সত্য, কাজেই তারা যেন এতে বিশ্বাস স্থাপন করে আর তাদের হৃদয় যেন তাঁর প্রতি বির্নত হতে পারে। আর নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ তো সহজ-সঠিক পথের দিকে পরিচালক তাদের জন্য যারা ঈমান এনেছে।
Sahih International: And so those who were given knowledge may know that it is the truth from your Lord and [therefore] believe in it, and their hearts humbly submit to it. And indeed is Allah the Guide of those who have believed to a straight path.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৪. আর এ জন্যেও যে, যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা আপনার রব-এর কাছ থেকে পাঠানো সত্য; ফলে তারা তার উপর ঈমান আনে ও তাদের অন্তর তার প্রতি বিনয়াবনত হয়। আর যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ নিশ্চয় তাদেরকে সরল পথ প্ৰদৰ্শনকারী।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫৪) আর এ জন্যেও যে, যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত সত্য; অতঃপর তারা যেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন তার প্রতি অনুগত হয়।[1] যারা বিশ্বাস করেছে তাদেরকে আল্লাহ অবশ্যই সরল পথে পরিচালিত করেন। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, শয়তানের প্রক্ষেপণ যা আসলে তার প্ররোচনা; যা মুনাফিক, মুশরিক ও কাফেরদের জন্য যেমন ফিতনা ও পরীক্ষার কারণ হয়, তেমনি অন্য দিকে যারা জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ মু’মিন মানুষ; তাঁদের ঈমান ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। তাঁরা বুঝতে পারেন যে, আল্লাহর অবতীর্ণ কুরআন সত্য। আর তার ফলে তাঁদের অন্তর আল্লাহর প্রতি অনুগত হয়।
[2] ইহকালে এবং পরকালেও। ইহকালে এইভাবে যে, তাঁদেরকে সত্য পথের দিশা দেন এবং তা অবলম্বন ও অনুসরণ করার প্রয়াস ও প্রেরণা দান করেন। অসত্য ও অন্যায়ের বুঝ দান করেন এবং তা থেকে তাঁদেরকে দূরে রাখেন। আর পরকালে সরল পথে পরিচালিত করার অর্থ জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে বাঁচিয়ে জান্নাত দান করবেন এবং সেখানে আপন অনুগ্রহ ও সাক্ষাৎ দানে ধন্য করবেন। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তাঁদের দলভুক্ত করো।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতে
تَمَنّٰي ও أُمْنِيَّتِه۪
এ শব্দদ্বয়ের দুটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলন আকাক্সক্ষা করা বা অন্তরে কল্পনা করা। অন্যটি হল- পড়া বা তেলাওয়াত করা। এ ভিত্তিতে أُمْنِيَّتِه۪ এর অর্থ হবে রাসূলের আকাক্সক্ষা করা বা তেলাওয়াত করা। যেমন উসমান (রাঃ)-কে যখন হত্যা করা হয় তখন কবি হাসসান বিন সাবেত বলেছিলেন:
تمني كتاب الله أول ليلة ... وآخرها لاقي حِمام المقادر
প্রথম অর্থ অনুযায়ী এর তাৎপর্য হলন যখনই আল্লাহ তা‘আলার রাসূল বা নাবীগণ কোন আকাক্সক্ষা করেন শয়তান তাতে বাধা সৃষ্টি করে, যাতে তা পূর্ণ না হয়। আর রাসূলদের আকাক্সক্ষা এটা হয় যে, সবাই ঈমান আনুক, ইসলাম গ্রহণ করুক। কিন্তু শয়তান বাধা সৃষ্টি করে বেশি সংখ্যক মানুষকে ঈমান আনা হতে দূরে রাখতে চায়।
দ্বিতীয় অর্থ অনুযায়ী এর তাৎপর্য দাঁড়াবে যে, যখনই আল্লাহ তা‘আলার রাসূল ও নাবীগণ ওয়াহী তেলাওয়াত করে শোনান, তখনই শয়তান উক্ত ওয়াহীর কথার সাথে নিজের কিছু কথা মিলিয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা শয়তানের এ চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেন। এ তাফসীর অধিকাংশ মুফাসসিরগণ করেছেন। (ইমাম বুখারী সূরা হজ্জের অত্র আয়াতের তাফসীরে নিয়ে এসেছেন, ইগাসাতুল লাহফান ১:৯৩)
আর আল্লাহ তা‘আলা এ কথার দ্বারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সান্ত্বনা দিলেন যে, শয়তান এরূপ কার্যকলাপ শুধু তোমার সাথেই করেনি বরং তোমার পূর্ববর্তী সকল নাবীদের সাথেই করেছে। সুতরাং তুমি একটুও বিচলিত হবে না। শয়তানের ঐ সমস্ত চক্রান্ত ও দুরভিসন্ধি হতে যেমন আমি পূর্বের নাবীদেরকে রক্ষা করেছি, তেমনি তুমিও সুরক্ষিত থাকবে এবং শয়তানের অনিচ্ছা সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলা নিজের বাণীকে পাকাপোক্ত ও সুদৃঢ় করবেন।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: শয়তানের এ সকল চক্রান্ত করার উদ্দেশ্য হলন যে সকল মানুষের অন্তরে কুফরী ও মুনাফিকীর রোগ রয়েছে এবং যাদের অন্তর অধিক পাপ করতে করতে পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে গেছে এদেরকে তার জালে আটকে ফেলে অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করা। কারণ শয়তান কয়েকটি কথা নাবীদের কথার সাথে মিশ্রণ করতে পারলে সে সব কথাকে দলীল বানিয়ে বাতিলকে শক্তিশালী করার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। আর এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষাও বটে। ফলে যারা কাফির ও মুনাফিক তারা এ পরীক্ষায় ব্যর্থ হয় এবং শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মন্দ কর্মে লিপ্ত হয়। পক্ষান্তরে যারা মু’মিন, জ্ঞানী তারা এ পরীক্ষায় কৃতকার্য হয় এবং সাথে সাথে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।
অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এ আয়াতের তাফসীরে কিসসাতুল গারানীক
قصة الغرانيق
উল্লেখ করেছেন। আর তা হলো এই যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার জীবনে একদা
والنجم إذا থেকে
الثالثة الأخري
(সূরা নাজমের ১-২০ নং আয়াত) পর্যন্ত পাঠ করেন তখন শয়তান তাঁর কথার সাথে এ কথা মিলিয়ে দিয়ে রাসূলের মুখে প্রকাশ করায় যে,
تلك الغرانيق العلي – وإن شفاعتهن لترجي
অর্থাৎ এগুলো হল মহান গারানীক এবং তাদের সুপারিশের আশা করা যায়। যখন সূরার শেষ প্রান্তে চলে গেলেন তখন তিনি সিজদা করলেন, সাথে সাথে মুসলিম ও মুশরিক সবাই সিজদা করল।
মুশরিকরা বলল: আজ তিনি আমাদের দেবতাদের এমন প্রশংসা করেছেন যা তিনি ইতোপূর্বে করেননি। মক্কায় সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল যে, মক্কার মুশরিকগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সিজদা করার মধ্য দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এমনকি এ কথা শুনে হাবশায় যে সকল মুসলিমরা হিজরত করেছিল তারা ফিরে এসেছিল এ ধারণা নিয়ে যে, তাদের সম্প্রদায়ের লোকেরাও হয়তো ইসলাম গ্রহণ করেছে। কিন্তু এসে দেখে তারা কাফির রয়ে গেছে। এ ঘটনাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বাতিল। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন কথা বলবেন না যে, এরা (লাত, উযযা, মানাত ইত্যাদি দেবতা) মহান গারানীক আর এদের সুপারিশ কবুল করার আশা করা যায়, এটা সম্পূর্ণ শিরকী ও কুফরী কথা। তাঁর মুখ দিয়ে এরূপ কথা কোন দিন বের হতে পারে না। এটা যে মিথ্যা তার প্রমাণ পরের আয়াত থেকেই বুঝা যাচ্ছে। কারণ পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
(إِنْ هِيَ إِلَّآ أَسْمَا۬ءٌ سَمَّيْتُمُوْهَآ أَنْتُمْ وَاٰبَآؤُكُمْ مَّآ أَنْزَلَ اللّٰهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ ط إِنْ يَّتَّبِعُوْنَ إِلَّا الظَّنَّ وَمَا تَهْوَي الْأَنْفُسُ)
“এগুলো কতক নাম মাত্র, যা তোমাদের পূর্বপুরুষরা ও তোমরা রেখেছ, এর সমর্থনে আল্লাহ কোন দলীল প্রেরণ করেননি। তারা শুধু অনুমান এবং তাদের প্রবৃত্তি যা চায় তারই অনুসরণ করে।” (সূরা নাজম ৫৩:২৩)
পূর্বের আয়াতগুলোতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের মা‘বূদের প্রশংসা করার পর অত্র আয়াতে নিন্দা করবেন এটা বোধগম্য নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুশরিকরদের মা‘বূদের প্রথমে প্রশংসা করবেন তারপর নিন্দা করা হবে, আর তারা ছেড়ে দিবে? আবার তারা সিজদাও করবে? কখনো হতে পারে না। এছাড়া কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে যা প্রমাণ করে যে, এ ঘটনা মিথ্যা। তা হলন আল্লাহ তা‘আলা কোন নাবী বা রাসূলগণের ওপর শয়তানের কর্তৃত্ব দেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّه۫ لَيْسَ لَه۫ سُلْطٰنٌ عَلَي الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَلٰي رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ - إِنَّمَا سُلْطٰنُه۫ عَلَي الَّذِيْنَ يَتَوَلَّوْنَه۫ وَالَّذِيْنَ هُمْ بِه۪ مُشْرِكُوْنَ)
“নিশ্চয়ই তার কোন আধিপত্য নেই তাদের ওপর যারা ঈমান আনে ও তাদের প্রতিপালকেরই ওপর নির্ভর করে। তার আধিপত্য কেবল তাদেরই ওপর যারা তাকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে এবং যারা আল্লাহর সাথে শরীক করে।” (সূরা নাহাল ১৬:৯৯-১০০) আল্লাহ বলেন:
(وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوٰي)
“এবং সে প্রবৃত্তি হতেও কোন কথা বলে না।” (সূরা নাজম ৫৩:৩)
শাইখ আলবানী
(رحمه الله) نصب المجانيق لنسف قصة الغرانيق
গ্রন্থে এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট দশটি বর্ণনা নিয়ে এসেছেন এবং সে সকল বর্ণনার ত্র“টি উল্লেখপূর্বক বাতিল বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ বিষয়ে সেখানে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. অজ্ঞ লোকেরাই কেবল শয়তানের ধোঁকায় পড়ে, জ্ঞানীরা নয়।
২. নাবীদের আকাক্সক্ষা হল বেশি বেশি মানুষ ঈমান নিয়ে আসুক তা জানলাম।
৩. শয়তানের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানলাম।
৪. কিসসাতুল গারানীক একটি ভ্রান্ত ও সাজানো মিথ্যা ঘটনা।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে তাফসীরকারদের অনেকেই গারানীকের কাতি বর্ণনা করেছেন এবং এটাও বর্ণনা করেছেন যে, এই ঘটনার কারণে আবির য়ায় হিজরতকারী সাহাবীগণ মনে করেন যে, মক্কার মুশরিকরা মুসলমান হয়ে গেছে, তাই তাঁর মক্কায় ফিরে আসেন।” (কিন্তু এই রিওয়াইয়াতটির প্রত্যেকটি সনদেই মুরসাল। কোন বিশুদ্ধ সনদে এটা বর্ণিত হয় নাই। এ সব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)
হযরত সাঈদ ইবনু জুবায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় সূরায়ে নাজম তিলাওয়া করেন। যখন তিনি নিম্নলিখিত স্থানে পৌঁছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা কি ভেবে দেখেছো ‘লাত’ ও ‘উয’ সম্বন্ধে এবং তৃতীয় আরেকটি ‘মানাত সম্বন্ধে?) (৫৩:১৯-২০) তখন শয়তান তাঁর যুবান মুবারকে নিম্নলিখিত কথাগুলি প্রক্ষিপ্ত করেঃ (আরবী) (অর্থাৎ “এগুলো হলো মহান গারানীক এবং এদের সুপারিশের আশা করা যায়। তাঁর একথা শুনে মুশরিকরা খুবই খুশী হয় এবং বলেঃ “আজ তিনি আমাদের দেবতাদের এমন প্রশংসা করলেন যা তিনি ইতিপূর্বে করেন নাই।` অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সিজদায় পড়ে যান এবং ওদিকে তারাও সিজদায় পড়ে যায়। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীর ও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। এটা মুরসাল। মুসনাদে বাযযারেও এটা উল্লিখিত হওয়ার পরে রয়েছে যে, শুধু এই সনদেই এটা মুত্তাসিলরূপে বর্ণিত হয়েছে। শুধু উমাইয়া ইবনু খালেদের মাধ্যমেই এটা মুত্তাসিল হয়েছে। তিনি প্রসিদ্ধ ও বিশ্বাস যোগ্য বর্ণনাকারী। শুধু কালবীর পন্থাতেই এটা বর্ণিত হয়েছে। ইবনু আবি হাতিম (রঃ) এটাকে দুটি সনদে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু দু'টোই মুরসাল। ইবনু জারীরও (রঃ) মুরসাল রূপেই এটা বর্ণনা করেছেন)
কাতাদা (রঃ) বলেন, যে মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) পাশে নামাযরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সঃ) একটু তন্দ্রা এসে যায় এবং ঐ সময় শয়তান তাঁর যুবান মুবারকে নিম্ন লিখিত কথাগুলি প্রক্ষিপ্ত করে এবং তার যুবান দিয়ে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) মুশরিকরা এই কথাগুলি লুফে নেয় এবং শয়তান এটা ছড়িয়ে দেয়। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়।
ইবনু শিহাব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে নজুিম অবতীর্ণ হলো এবং মুশরিকরা বলছিলঃ “যদি এই লোকটি (হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আমাদের দেবতাগুলির বর্ণনা ভাল ভাষায় করতো তবে তো আমরা তাকে ও তার সঙ্গীদেরকে ছেড়ে দিতাম। কিন্তু তার অবস্থান তো এই যে, সে তার ধর্মের বিরোধী ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের চেয়ে বেশী খারাপ ভাষায় আমাদের দেবতাগুলির বর্ণনা দিচ্ছে এবং তাদেরকে গালি দিচ্ছে।” ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে কঠিন বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছিল। মুশরিকদের হিদায়াত লাভ তিনি কামনা করছিলেন। যখন তিনি সূরায়ে নাজুমের তিলাওয়াত শুরু করেন এবং (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন তখন শয়তান দেবতাদের নাম উচ্চারণের সময় তাঁর পবিত্র যুবানে নিম্নলিখিত কথাগুলি প্রক্ষিপ্ত করেঃ (আরবী) এটা ছিল শয়তানের ছন্দযুক্ত ভাষা। প্রত্যেক মুশরিকের অন্তরে এই কালেমা বসে যায়। প্রত্যেকের তা মুখস্থ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এটা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজের পূর্ব ধর্ম হতে ফিরে এসেছেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরায়ে নাজমের তিলাওয়াত শেষ করে সিজদা করেন তখন সমস্ত মুসলমান ও মুশরিকও সিজদায় পড়ে যায়। ওয়ালীদ ইবনু মুগীরা অত্যন্ত বৃদ্ধ ছিল বলে সে এক মুষ্টি মাটি নিয়ে ওটা কপালে ঠেকিয়ে দেয়। সবাই বিস্মিত হয়ে যায়। কেননা, রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে দু'টো দলই সিজদায় ছিল। মুসলমানরা বিস্মিত ছিলেন এই কারণে যে, মুশরিকরা আল্লাহর উপর ঈমান আনে নাই এটা তারা ভালরূপেই জানতেন। অথচ কি করে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও মুসলমানদের সাথে সিজ্দা করলো? শয়তান যে শব্দগুলি মুশরিকদের কানে ফুঁকে দিয়েছিল মুসলমানরা তা শুনতেই পান নাই। এদিকে তাদের অন্তর খোলা ছিল। কেননা, শয়তান শব্দের মধ্যে শব্দ এমনভাবে মিলিয়ে দেয় যে, মুশরিকরা তাতে কোন পার্থক্যই করতে পারছিল না। সে তো তাদের মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়ে দিয়েছিল যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরারই এই দু'টো আয়াত পাঠ করেছেন। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে মুশরিকরা তাদের দেবতাগুলিকেই সিজদা করেছিল। শয়তান এই ঘটনাকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেয় যে, এ খবর হাবশায় পৌঁছে গিয়েছিল। হযরত উছমান ইবনু মাযউন (রাঃ) এবং তার সঙ্গীরা যখন শুনতে পান যে, মক্কাবাসীরা মুসলমান হয়ে গেছে, এমনকি তারা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে নামায পড়েছে এবং ওয়ালীদ ইবনু মুগীরা অত্যধিক বুড়ো হওয়ার কারণে এক মুষ্টি মাটি উঠিয়ে নিয়ে তা তার মাথায় ঠেকিয়েছেন এবং মুসলমানরা এখন পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে রয়েছে তখন তারা সেখান থেকে মক্কায় ফিরে আসার স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অতঃপর তারা খুশী মনে মক্কায় ফিরে আসেন। তাঁদের মক্কায় পৌঁছার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা শয়তানের ঐ শব্দগুলির রহস্য খুলে দিয়েছিলেন এবং তা সরিয়ে ফেলে স্বীয় কালামকে রক্ষিত রেখেছিলেন। ফলে মুশরিকদের শত্রুতার অগ্নি আরো বেশী প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছিল তারা মুসলমানদের উপর নতুন বিপদ আপদের বৃষ্টি বর্ষণ শুরু করে দিয়েছিল।” (এ রিওয়াইয়াতটিও মুরসাল। ইমাম বায়হাকীর (রঃ) কিতাবুল দালায়েলিন নবুওয়াহ’ নামক গ্রন্থেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) এটাকে স্বীয় সীরাত' গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এই সব সনদই মুরসাল ও মুক্কাতা। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন) ইমাম বাগাভী (রঃ) এ সব কিছু হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি গুরুজনের কালাম দ্বারা এভাবেই স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। তারপর নিজেই একটা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) রক্ষক যখন আল্লাহ তাআলা স্বয়ং, তখন কি করে শয়তানের কালাম মহান আল্লাহর পবিত্র কালামের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে? অতঃপর এর বহু জবাব দেয়া হয়েছে। এগুলির মধ্যে একটি সূক্ষ জবাব এও আছে যে, শয়তান এই শব্দগুলি লোকদের কানে নিক্ষেপ করে এবং তাদের মধ্যে এই খেয়াল জাগিয়ে দেয় যে, এই শব্দগুলি রাসূলুল্লাহর (সঃ) পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়েছে। প্রকৃতপক্ষ এরূপ ছিল না। এটা ছিল শুধু শয়তানী কাজ কারবার। এটা রাসূলুল্লাহর (সঃ) মুখের আওয়াজ মোটেই ছিল না। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী এক মাত্র আল্লাহ।
মুতাকাল্লেমীন এ ধরনের আরো বহু জবাব দিয়েছেন। কাযী আইয়াও (রঃ) স্বীয় কিতাবুশ শিক্ষা গ্রন্থে এর জবাব দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমার পূর্বে যে সব রাসূল বা নবী পাঠিয়েছি তাদের কেউ যখনই কিছু আকাংখা করেছে, তখনই শয়তান তার আকাংখায় কিছুই প্রক্ষিপ্ত করেছে। এর দ্বারা রাসূলুল্লাহকে (সঃ) সান্ত্বনা দেয়া হয়ে যে, তার এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনই কারণ নেই। কেননা, তার পূর্ববর্তী নবী রাসূলদেরও এরূপ ঘটনা ঘটেছিল।
মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এর অর্থ হলো (তিনি বলেন)। (আরবী) এর অর্থ (আরবী) (তার পঠনে)। (আরবী) এর ভাবার্থ হলোঃ তিনি পড়েন, লিখেন না। অধিকাংশ তাফসীরকার (আরবী) এর অর্থ (আরবী) করেছেন। অর্থাৎ যখন তিনি আল্লাহর কিতাব পাঠ করেন তখন শয়তান ঐ তিলাওয়াতের মধ্যে কিছু প্রক্ষিপ্ত করে। হযরত উছমান (রাঃ) যখন শহীদ হন তখন কবি তার প্রশংসায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (হ্যরত উছমান (রাঃ) রাত্রির প্রথমভাগে ও শেষ ভাগে। আল্লাহর কিতাব পাঠ করতেন। তিনি তার ভাগ্যে লিখিত মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ করলেন।” এখানেও। (আরবী) শব্দটিকে পাঠ করার অর্থে ব্যবহার করা। হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এই উক্তিটি খুবই নিকটের ব্যাখ্যা বিশিষ্ট।
এর আভিধানিক অর্থ হলো (আরবী) অর্থাৎ সরিয়ে ফেলা ও উঠিয়ে দেয়া। মহামহিমান্বিত আল্লাহ সরিয়ে ফেলেন যা শয়তান প্রক্ষিপ্ত করে। হযরত জিবরাঈল (আঃ) শয়তানের বৃদ্ধিকৃত শব্দগুলিকে উঠিয়ে ফেলেন বা মিটিয়ে দেন। ফলে আল্লাহ তাআলার আয়াতগুলি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ। কোন গোপনীয় কথা তাঁর কাছে অজানা থাকে না। তিনি সবই জানেন। তিনি প্রজ্ঞাময়। তার সব কাজই নিপুণতাপূর্ণ। এটা এই জন্যে যে, যাদের অন্তরে সন্দেহ, শিরক, কুফরী এবং নিফাক রয়েছে তাদের জন্যে যেন এটা ফিৎনা বা পরীক্ষার বিষয় হয়ে যায়। যেমন, মুশরিকরা ওটাকে আল্লাহর পক্ষ হতে অবতারিত মনে করেছিল; অথচ তা তার পক্ষ হতে অবতারিত ছিল না বরং শয়তানী শব্দ ছিল। সুতরাং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে’ এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে।
আর যারা পাষাণ হৃদয়, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে মুশরিকদেরকে। এও একটি উক্তি যে, এর দ্বারা ইয়াহুদীদেরকে বুঝানো হয়েছে।
ঘোষিত হচ্ছেঃ জালিমরা দুস্তর মতভেদে রয়েছে। তারা হক থেকে বহু দূরে সরে গেছে। সরল-সঠিক পথ তারা হারিয়ে ফেলেছে।
আর এটা এ জন্যেও যে, যাদেরকে সঠিক জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা মহান আল্লাহর নিকট হতে প্রেরিত সত্য; অতঃপর তারা যেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন ওর প্রতি অনুগত হয়। এটা আল্লাহর কালাম হওয়ার ব্যাপারে তাদের অন্তরে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক না হয়।
আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করে থাকেন। দুনিয়াতে তিনি তাদেরকে হিদায়াত দান করেন, সরল সঠিক পথের সন্ধান দেন এবং আখেরাতে তিনি তাদেরকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি হতে রক্ষা করে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন এবং সেখানে তারা অফুরন্ত নিয়ামতের অধিকারী হবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।