সূরা আল-হজ্জ (আয়াত: 35)
হরকত ছাড়া:
الذين إذا ذكر الله وجلت قلوبهم والصابرين على ما أصابهم والمقيمي الصلاة ومما رزقناهم ينفقون ﴿٣٥﴾
হরকত সহ:
الَّذِیْنَ اِذَا ذُکِرَ اللّٰهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَ الصّٰبِرِیْنَ عَلٰی مَاۤ اَصَابَهُمْ وَ الْمُقِیْمِی الصَّلٰوۃِ ۙ وَ مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَ ﴿۳۵﴾
উচ্চারণ: আল্লাযীনা ইযা-যুকিরাল্লা-হু ওয়াজিলাত কুলূবুহুম ওয়াসসাবিরীনা ‘আলা-মাআসাবাহুম ওয়াল মুকীমিসসালা-তি ওয়া মিম্মা-রাযাকনা-হুম ইউনফিকূন।
আল বায়ান: যাদের কাছে আল্লাহর কথা উল্লেখ করা হলে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে, যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৫. যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয়(১) আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে এবং আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: ‘আল্লাহ’ নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে, যারা তাদের বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে, নামায কায়িম করে, আর তাদেরকে আমি যে রিযক্ দিয়েছি তাত্থেকে তারা ব্যয় করে।
আহসানুল বায়ান: (৩৫) যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে, নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে।
মুজিবুর রহমান: যাদের হৃদয় ভয়-কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদ আপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে।
ফযলুর রহমান: যাদের অন্তরসমূহ আল্লাহর কথা শুনলে ভীত হয়, যারা বিপদ এলে ধৈর্যধারণ করে, নামায কায়েম করে এবং তাদেরকে যা কিছু দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।
মুহিউদ্দিন খান: যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে ভীত হয় এবং যারা তাদের বিপদাপদে ধৈর্য্যধারণ করে এবং যারা নামায কায়েম করে ও আমি যা দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।
জহুরুল হক: তাদের যাদের হৃদয় কাঁপতে থাকে যখন আল্লাহ্কে স্মরণ করা হয়, আর তাদের উপরে বিপদ ঘটা সত্ত্বেও যারা অধ্যবসায়ী, আর নামায কায়েমকারীদের, আর ওদের আমরা যে রিযেক দিয়েছি তা থেকে যারা খরচ করে থাকে তাদের।
Sahih International: Who, when Allah is mentioned, their hearts are fearful, and [to] the patient over what has afflicted them, and the establishers of prayer and those who spend from what We have provided them.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৫. যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয়(১) আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে এবং আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।
তাফসীর:
(১) وجل এর আসল অর্থ ঐ ভয়-ভীতি, যা কারো মাহাত্যের কারণে অন্তরে সৃষ্টি হয়। [ইবন কাসীর] আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহ তা'আলার যিকর ও নাম শুনে তাদের অন্তরে এক বিশেষ ভীতির সঞ্চার হয়ে যায়। এটা তাদের পূর্ণ বিশ্বাস ও দৃঢ় ঈমানী শক্তির প্রমাণ। [ফাতহুল কাদীর] অন্যত্র এসেছে, “মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করা হলে কম্পিত হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে। আর তারা তাদের রব এর উপরই নির্ভর করে।” [সূরা আল-আনফাল: ২] আরও এসেছে, “আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব যা সুসামঞ্জস্য এবং যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয়। এতে, যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের শরীর শিউরে ওঠে, তারপর তাদের দেহ, মন বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে।” [সূরা আয-যুমার: ২৩]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৫) যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে, নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৬-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর:
(وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيْمَ):
আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে যারা কাবা ঘরে মূর্তি পূজা করত তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন, তোমরা কাবাগৃহে মূর্তিপূজা করছ, যারা ঐ গৃহে আল্লাহ তা‘আলার সাথে অংশী স্থাপন করছ, তোমরা জেনে রাখ! আমি ইবরাহীম (عليه السلام) -কে নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম কাবাগৃহের স্থান আর সেখানে তার বংশধরের জন্য বসতি স্থাপন করলাম। তখন তাকে এ নির্দেশ দিলাম, তুমি এ ঘর তাক্বওয়া ও আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের ভিত্তির ওপর নির্মাণ কর। ফলে ইবরাহীম (عليه السلام) ও তাঁর সন্তান নাবী ইসমাঈল তা নির্মাণ করেছিলেন। এ থেকে বুঝা যায়, নূহ (عليه السلام)-এর প্লাবনে কাবা ঘরের ভিত্তি ভেঙ্গে গিয়েছিল। আরো নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তিনি যেন এ গৃহকে তাওয়াফকারী, সালাত আদায়কারী, রুকু ও সাজদাকারীদের জন্য শিরক, অপবিত্রতা, বিদ‘আত থেকে মুক্ত রাখেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَعَهِدْنَآ إِلٰٓي إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّا۬ئِفِيْنَ وَالْعٰكِفِيْنَ وَالرُّكَّعِ السُّجُوْدِ)
“আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলের নিকট এ অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই‘তিক্বাফকারী, রুকূকারী এবং সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রেখ।” (সূরা বাক্বারাহ ২:১২৫)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি তাকে আরো নির্দেশ দিলাম যে, তুমি হজ্জের ঘোষণা মানুষের মধ্যে দিয়ে দাও যে, তারা যেন দূর-দূরান্ত থেকে এসে এ ঘরের তাওয়াফ করে। আর তারা তথায় আসবে পায়ে হেঁটে অথবা সাওয়ারীর ওপর আরোহণ করে। এর সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা এ কথাও বলেছেন যে, এ স্থানে উপস্থিত হওয়াতে তাদের কোন ক্ষতি নেই বরং এতে রয়েছে তাদের জন্য কল্যাণ। এ কল্যাণ দীনি হতে পারে। যেমন সেখানে গিয়ে মানুষ সালাত, তাওয়াফ ও হজ্জ-উমরার কার্যাবলী দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন করবে। যেমন হাদীসে বলা হয়েছে:
ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার নিকট এমন কোন দিনের আমল নেই যা অতি মহত্ত্বপূর্ণ এবং অধিক প্রিয় (হাজ্জের) দশ দিনের আমলের চেয়ে। সুতরাং তোমরা বেশি বেশি করে
اَللّٰهُ أَكْبَرُ ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ এবং اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ
পাঠ কর। (মুসানাদ আহমাদ হা: ৫৪৪৬)
আবার এ কল্যাণ দুনিয়াবীও হতে পারে। যেমন হাজ্জের মৌসুমে হজ্জ করতে গিয়ে তার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্থ উপার্জন করা। কেননা হাজ্জের মৌসুমে ব্যবসা করা বৈধ।
(أَيَّامٍ مَّعْلُوْمٰتٍ)
দ্বারা মূলত যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ এবং পরবর্তী তিন দিনকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এগুলো হল: কুরবানীর দিন এবং পরবর্তী তিন দিন। (তাফসীর মুয়াস্সার)
(بَهِيْمَةِ الْأَنْعَامِ)
দ্বারা মূলত উট, গরু, ছাগল এবং ভেড়া বা দুম্বাকে বুঝানো হয়েছে। এদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার নাম স্মরণ করা বলতে বুঝানো হয়েছে যে, তাদের জবাইকালে আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে জবাই করা। কেননা আল্লাহ তা‘আলার নাম ব্যতীত অন্যের নামে জবাই করলে তা হালাল হবে না।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ)
“অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর এবং আহার করাও ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকে ও বিনয়ের সাথে ভিক্ষাকারীকে।” এখান থেকে অনেকে দলীল গ্রহণ করেন যে, কুরবানীর গোশত তিনভাগ করতে হবে। একভাগ নিজের জন্য, দ্বিতীয়ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং তৃতীয়ভাগ ফকির-মিসকীনদের জন্য। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এরূপ কোন নির্দেশই জারী করে দেননি। যেমন হাদীসে বলা হয়েছে:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আমি তোমাদের তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত রাখতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি তোমরা খাও, প্রয়োজন মত জমা রাখ। অন্য বর্ণনায় এসেছেন খাও, সদাকা কর এবং জমা রাখ। অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছেন খাও, খাওয়াও ও সদকা কর। (সহীহ বুখারী হা: ৫৫৬৯, সহীহ মুসলিম হা: ১৯৭১)
সঠিক মত এই যে, কোন আয়াত বা সহীহ হাদীসে এরূপ ভাগাভাগি করতেই হবে এমনটি প্রমাণ পাওয়া যায় না, তাই কেউ যদি ভাগ নাও করে তাতে সে গুনাহগার হবে না। মূলত দেখা হবে তার অন্তরে কী ছিল। তাই আমাদেরকে প্রথমত আমাদের নিয়ত ঠিক করা একান্ত কর্তব্য, তা না হলে কোন আমলই গ্রহণযোগ্য হবে না।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা হাজীদেরকে অনুমতি দিলেন তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে। অর্থাৎ যিলহজ্জের ১০ তারিখে জামরাতুল কুবরায় পাথর মারার পর হাজীরা প্রাথমিকভাবে হালাল হয়ে যায়। তার পর ইহরাম খুলে ফেলে। এক কথায় স্ত্রী সহবাস ব্যতীত ঐ সব কাজ যা ইহরাম অবস্থায় হারাম ছিল তা হালাল হয়ে যায়। আর অপরচ্ছিন্নতা বলতে চুল, নখ কেটে নিয়ে তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার করা, সেলাই করা কাপড় পরিধান করা ইত্যাদি। আর যদি কেউ কোন মানত করে থাকে তাহলে সে যেন তা পূর্ণ করে। আর তারা যেন সর্বশেষ তাওয়াফ তাওয়াফে ইফাযাহ করে যাকে তাওয়াফে যিয়ারাহও বলা হয়। এটি হাজ্জের একটি রুকন যা আরাফায় অবস্থান ও জামরাতুল কুবরায় পাথর মারার পর করা হয়।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এগুলোই হল, (যা আলোচনা করা হয়েছে) আল্লাহ তা‘আলার বিধান। যে এগুলো পালন করবে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার জন্য সে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলার নিকট উত্তম ব্যক্তি বলে গণ্য হবে। হাজ্জের এ সকল বিধি-বিধান সূরা বাক্বারাহ ও সূরা আল ইমরানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন তারা যেন চতুষ্পদ জন্তু যা হালাল করা হয়েছে তা ভক্ষণ করে আর যা হারাম তা থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কে সূরা মায়িদায়ও আলোচনা করা হয়েছে এবং আল্লাহ তা‘আলা এ নির্দেশও দিয়েছেন, তারা যেন অপবিত্র জিনিস যেমন মূর্তিপূজো থেকে এবং মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّـيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوْا بِاللّٰهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِه۪ سُلْطٰنًا وَّأَنْ تَقُوْلُوْا عَلَي اللّٰهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ)
“বল: নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ ও অন্যায় বিরোধিতা এবং কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক করা যার কোন প্রমাণ তিনি প্রেরণ করেননি, এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।’’ (সূরা আ‘রাফ ৭:৩৩)
হাদীসে বলা হয়েছে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন: আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করব না? সাহাবারা উত্তরে বললেন: হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ১. আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করা, ২. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। ঐ সময় তিনি হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। এ কথা বলার সময় তিনি সোজা হয়ে বসলেন: অতঃপর বললেন: জেনে রেখে যে, সেটি হল মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। তিনি এ কথা বারবার বলতে থাকেন শেষ পর্যন্ত সাহাবীরা বলেন, আমরা বলতে লাগলাম, যদি তিনি চুপ থাকতেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৬৫৪, সহীহ মুসলিম হা: ৮৭)
এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সঙ্গে শির্ককারীর একটি উপমা পেশ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত যে আমার সঙ্গে শরীক স্থাপন করে এমন যে, সে যেন আকাশ হতে পড়ল, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল এক দূরবর্তী স্থানে।) উক্ত দুই অবস্থাতেই যেমন মৃত্যু বা ধ্বংস অবধারিত, ঠিক অনুরূপ যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে সে সুস্থ প্রকৃতি ও আন্তরিক পবিত্রতার দিক দিয়ে পবিত্রতা ও নির্মলতার এক উচ্চাসনে আসীন হয়। কিন্তু যখনই সে শির্কের পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে তখনই সে নিজেকে উঁচু হতে একদম নীচে, পবিত্রতা হতে অপবিত্রতায় এবং নির্মলতা হতে কর্দমাতে নিক্ষেপ করে। যার ফলে সে ধ্বংস হয়।
شعائر এটি شعيرة এর বহুবচন। অর্থ বিশেষ চিহ্ন বা নিদর্শন। অর্থাৎ ইসলামের এমন কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আনুষ্ঠানিক বিধান যার দ্বারা প্রকাশ পায় এবং অন্য ধর্মাবলম্বী হতে তাকে সহজে পৃথকভাবে চেনা যায়।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা চতুষ্পদ জন্তুর উপকারিতার কথা বর্ণনা করেছেন যা আমরা ইতোপর্বে সূরা নাহলে আলোচনা করেছি।
المخبتين অর্থ হল متواضنعين لله অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলার জন্য বিনয়ী হয় তাদের مخبتين বলা হয়।
بدن শব্দটি بدنة এর বহুবচন, এর অর্থ হল: মোটা-তাজা দেহবিশিষ্ট পশুটা। এ উটগুলো হল আল্লাহ তা‘আলার দ্বীনের যে সকল নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম নিদর্শন।
صواف শব্দটি مصفوفة অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান অবস্থায়। কেননা উটকে দাঁড়ানো অবস্থায় নহর করা হয়।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না।
২. হাজ্জের কিছু বিধি-বিধান জানতে পারলাম।
৩. মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া হতে বিরত থাকতে হবে।
৪. মূর্তি বা এ জাতীয় কোন কিছুরই পূজা করা যাবে না।
৫. প্রত্যেক উম্মাতের জন্যই কুরবানীর বিধান ছিল।
৬. মু’মিনদের অন্তর আল্লাহ তা‘আলার স্মরণে প্রকম্পিত হয়।
৭. কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করা জরুরী নয়, তবে ভাগ করা উত্তম।
৮. যারা প্রকৃত অর্থে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য জানতে পারলাম।
৯. শির্রকারীর অবস্থা কেমন হবে তা জানা গেল।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৪-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সমস্ত উম্মতের মধ্যে, সমস্ত মাযহাবে এবং সমস্ত দলে আমি কুরবানীর নিয়ম চালু করে দিয়েছিলাম। তাদের জন্যে ঈদের একটা দিন নির্ধারিত ছিল। তারাও আল্লাহর নামে পশু যবাহ করতো। সবাই মক্কা শরীফে নিজেদের কুরবানীর জন্তু পাঠিয়ে দিতো। যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলির উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।
রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকটও সাদা কালো মিশ্রিত রঙ এর বড় বড় শিং বিশিষ্ট দুটি ভেড়া আনয়ন করা হয়। তিনি ওগুলিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে ওগুলোর গর্দানে পা রেখে বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবার বলে যবাহ করেন।
হযরত যায়েদ ইবনু আসলাম (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এই কুরবানী কি?` জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের পিতা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) সুন্নাত।” তারা আবার জিজ্ঞেস করেনঃ “আমরা এতে কি পরিমাণ পূণ্য লাভ করি?” উত্তরে বলেনঃ “প্রত্যেক চুলের বিনিময়ে এক নেকী।` পুনরায় তারা প্রশ্ন করেনঃ “পশমের হুকুম কি?” তিনি জবাব দেনঃ “ওর প্রত্যেক লোমের বিনিময় এক পূণ্য।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু ইয়াযীদ ইবনু মাজাহ (রঃ) তার সুনানে সালাম ইবনু মিসকীনের (রঃ) হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন)
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের সবারই মা'বুদ একই মা'বুদ। সুতরাং তোমরা তাঁরই নিকট আত্ম সমর্পণ কর। শরীয়তের কোন কোন হুকুমের মধ্যে কিছু কিছু পরিবর্তন হলেও আল্লাহর একত্ববাদের ব্যাপারে কোন রাসূলের মধ্যে ও কোন ভাল উম্মতের মধ্যে কোনই মতানৈক্য নেই। সবাই আল্লাহর একত্ববাদ ও তঁরই ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবান করতে থেকেছেন। প্রত্যেকের উপর প্রথম ওয়াহী এটাই অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমরা সবাই তারই দিকে ঝুঁকে পড়ে তার হুকুম মেনে চল এবং দৃঢ়ভাবে। তার আনুগত্য করতে থাকে।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। যারা মানুষের উপর অত্যাচার করে না, অত্যাচারিত অবস্থায় প্রতিশোধ গ্রহণে ইচ্ছুক নয়, সদা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে তাদেরকে শুভসংবাদ প্রদান কর। তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
মহামহিমান্বিত আল্লাহর উক্তিঃ যাদের হৃদয় ভয়-কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে। সুতরাং তারা আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর তারা তাদের বিপদ আপদে ধৈর্য ধারণ করে।
ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমরা যদি ধৈর্য ধারণে অভ্যস্ত না হও, তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে।
(আরবী) শব্দটি (আরবী) এর সাথে হওয়া জমহুর উলামার কিরআত। কিন্তু ইবনু সামীফা (রঃ) (আরবী) পড়েছেন এবং (আরবী) এর উপর (আরবী) বা যবর দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, এ স্থলে (আরবী) এর নুনকে (আরবী) (হালকা) এর জন্যে লোপ করা হয়েছে। কেননা, যদি (আরবী) এর কারণে নূনকে লোপ করা হয়েছে বলে মেনে নেয়া হয় তবে অবশ্যই তাতে যের হওয়া জরুরী হবে। আবার হতে পারে যে, নুনকে (আরবী) (নিকটবর্তী) এর কারণে লোপ করা হয়েছে। ভাবার্থ এই যে, তারা আল্লাহর বাধ্যতামূলক কাজগুলির পাবন্দ এবং তার হক আদায়ের ব্যাপারে পূর্ণ তৎপর।
মহান আল্লাহর উক্তিঃ আমি তাদেরকে রিযুক দিয়েছি তা হতে তারা ব্যয় করে। তারা আত্মীয় স্বজনকে, অভাবী ও দরিদ্রদেরকে এবং আল্লাহর সৃষ্ট জীবের মধ্যে যারাই অভাবগ্রস্ত তাদেরকে আল্লাহর দেয়া ধন সম্পদ হতে দান করে থাকে। আর তারা সবারই সাথে সদ্ব্যবহার করে। তারা আল্লাহর নির্ধারিত। সীম'র রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। তারা মুনাফিকদের মত নয় যে, একটা করবে এবং একটা ছেড়ে দেবে! সূরায়ে বারাআতেও তাদের এসব বিশেষণের বর্ণনা দেয় হয়েছে এবং সেখানে আমরা এর পূর্ণ তাফসীরও করে এসেছি। অতএব, সমস্ত প্রসংসা আল্লাহর।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।