আল কুরআন


সূরা আল-হজ্জ (আয়াত: 31)

সূরা আল-হজ্জ (আয়াত: 31)



হরকত ছাড়া:

حنفاء لله غير مشركين به ومن يشرك بالله فكأنما خر من السماء فتخطفه الطير أو تهوي به الريح في مكان سحيق ﴿٣١﴾




হরকত সহ:

حُنَفَآءَ لِلّٰهِ غَیْرَ مُشْرِکِیْنَ بِهٖ ؕ وَ مَنْ یُّشْرِکْ بِاللّٰهِ فَکَاَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَآءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّیْرُ اَوْ تَهْوِیْ بِهِ الرِّیْحُ فِیْ مَکَانٍ سَحِیْقٍ ﴿۳۱﴾




উচ্চারণ: হুনাফাআ লিল্লা-হি গাইরা মুশরিকীনা বিহী ওয়া মাইঁ ইউশরিক বিল্লা-হি ফাকাআন্নামাখাররা মিনাছছামাই ফাতাখতাফুহুততাইরু আও তাহওয়ী বিহির রীহুফী মাকা-নিন ছাহীক।




আল বায়ান: আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিম্বা বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩১. আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর কোন শরীক না করে। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করে সে যেন(১) আকাশ হতে পড়ল, তারপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর সাথে শরীক না করে। যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করে সে যেন আকাশ থেকে পড়ে গেল, আর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে দূরবর্তী স্থানে ছুঁড়ে ফেলে দিল।




আহসানুল বায়ান: (৩১) আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে,[1] তাঁর কোন শরীক না করে; আর যে কেউ আল্লাহর শরীক করে (তার অবস্থা) সে যেন আকাশ হতে পড়ল, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। [2]



মুজিবুর রহমান: আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর কোন শরীক না করে। আর যে আল্লাহর শরীক করে সে যেন আকাশ হতে পড়ল, অতঃপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে দূরবর্তী এক স্থানে নিক্ষেপ করল।



ফযলুর রহমান: আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে, তাঁর সাথে শরীক না করে। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে (তার অবস্থা এমন যে,) সে যেন আকাশ থেকে পড়ল, আর পাখিরা তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।



মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহর দিকে একনিষ্ট হয়ে, তাঁর সাথে শরীক না করে; এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করল; সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর মৃতভোজী পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।



জহুরুল হক: আল্লাহ্‌র প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে, তাঁর সঙ্গে কোনো অংশী আরোপ না ক’রে। আর যে কেউ আল্লাহ্‌র সঙ্গে অংশী দাঁড় করায় সে যেন তাহলে আকাশ থেকে পড়ল, তখন পাখিরা তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়, অথবা বায়ুপ্রবাহ তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় এক দূরবর্তী স্থানে।



Sahih International: Inclining [only] to Allah, not associating [anything] with Him. And he who associates with Allah - it is as though he had fallen from the sky and was snatched by the birds or the wind carried him down into a remote place.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩১. আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর কোন শরীক না করে। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করে সে যেন(১) আকাশ হতে পড়ল, তারপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে যারা আল্লাহর সাথে শির্ক করে তারা হেদায়াত থেকে কত দূরত্বে অবস্থান করছে এবং ঈমানের সুউচ্চ শৃংগ থেকে কুফরীর অতল গহ্বরে পতিত হওয়ার মাধ্যমে ধ্বংস ও ক্ষতিগ্ৰস্ততার দিক থেকে তাদের অবস্থা কেমন দাঁড়ায় তার উদাহরণ দেয়া হয়েছে এমন এক ব্যক্তির সাথে যে আকাশ থেকে পড়ে গেল। এমতাবস্থায় হয় সে পাখির শিকারে পরিণত হবে যাতে তার সমস্ত শরীর টুকরো টুকরো হয়ে যায়, অথবা কঠিন ঝড়ো হাওয়া তাকে বয়ে নিয়ে অনেক দুরে নিয়ে ফেলে আসল। [সা’দী] এ অবস্থা যেমন অত্যন্ত খারাপ তেমনি অবস্থা দাঁড়ায় শির্ককারীর অবস্থা। সে শয়তানের শিকারে পরিণত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তার অবস্থা হবে বেসামাল।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩১) আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে,[1] তাঁর কোন শরীক না করে; আর যে কেউ আল্লাহর শরীক করে (তার অবস্থা) সে যেন আকাশ হতে পড়ল, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। [2]


তাফসীর:

[1] حُنَفَاء এটি حَنِيف শব্দের বহুবচন। যার মূল অর্থ এক দিকে ঝুঁকে পড়া, একদিকে, একতরফ বা একনিষ্ঠ হওয়া। এখানে শিরক থেকে তাওহীদের দিকে এবং কুফর ও বাতিল থেকে ইসলাম ও সত্য ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়া। অথবা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা। উদ্দেশ্য হল, ‘‘তোমরা দূরে থাক মূর্তিরূপ অপবিত্রতা হতে----- একনিষ্ঠ হয়ে---।’’

[2] যেমন বড় বড় পাখি ছোট কোন জীবকে অত্যন্ত দ্রুত ছোঁ মেরে নিয়ে যায়, বা বাতাস কিছুকে উড়িয়ে নিয়ে দূরে কোথাও নিক্ষেপ করে এবং যার কোন হদিস পাওয়া যায় না; উক্ত দুই অবস্থাতেই মৃত্যু অবধারিত। ঠিক অনুরূপ যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে, সে সুস্থ প্রকৃতি ও আন্তরিক পবিত্রতার দিক দিয়ে পবিত্রতা ও নির্মলতার এক উচ্চাসনে আসীন হয়। কিন্তু যখনই সে শিরকের পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখনই সে নিজেকে উঁচু হতে একদম নীচে, পবিত্রতা হতে অপবিত্রতায় এবং নির্মলতা হতে কর্দম ও পঙ্কিলতায় নিক্ষেপ করে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৬-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর:



(وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيْمَ):



আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে যারা কাবা ঘরে মূর্তি পূজা করত তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন, তোমরা কাবাগৃহে মূর্তিপূজা করছ, যারা ঐ গৃহে আল্লাহ তা‘আলার সাথে অংশী স্থাপন করছ, তোমরা জেনে রাখ! আমি ইবরাহীম (عليه السلام) -কে নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম কাবাগৃহের স্থান আর সেখানে তার বংশধরের জন্য বসতি স্থাপন করলাম। তখন তাকে এ নির্দেশ দিলাম, তুমি এ ঘর তাক্বওয়া ও আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের ভিত্তির ওপর নির্মাণ কর। ফলে ইবরাহীম (عليه السلام) ও তাঁর সন্তান নাবী ইসমাঈল তা নির্মাণ করেছিলেন। এ থেকে বুঝা যায়, নূহ (عليه السلام)-এর প্লাবনে কাবা ঘরের ভিত্তি ভেঙ্গে গিয়েছিল। আরো নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তিনি যেন এ গৃহকে তাওয়াফকারী, সালাত আদায়কারী, রুকু ও সাজদাকারীদের জন্য শিরক, অপবিত্রতা, বিদ‘আত থেকে মুক্ত রাখেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَعَهِدْنَآ إِلٰٓي إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّا۬ئِفِيْنَ وَالْعٰكِفِيْنَ وَالرُّكَّعِ السُّجُوْدِ)



“আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলের নিকট এ অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই‘তিক্বাফকারী, রুকূকারী এবং সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রেখ।” (সূরা বাক্বারাহ ২:১২৫)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি তাকে আরো নির্দেশ দিলাম যে, তুমি হজ্জের ঘোষণা মানুষের মধ্যে দিয়ে দাও যে, তারা যেন দূর-দূরান্ত থেকে এসে এ ঘরের তাওয়াফ করে। আর তারা তথায় আসবে পায়ে হেঁটে অথবা সাওয়ারীর ওপর আরোহণ করে। এর সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা এ কথাও বলেছেন যে, এ স্থানে উপস্থিত হওয়াতে তাদের কোন ক্ষতি নেই বরং এতে রয়েছে তাদের জন্য কল্যাণ। এ কল্যাণ দীনি হতে পারে। যেমন সেখানে গিয়ে মানুষ সালাত, তাওয়াফ ও হজ্জ-উমরার কার্যাবলী দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন করবে। যেমন হাদীসে বলা হয়েছে:



ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার নিকট এমন কোন দিনের আমল নেই যা অতি মহত্ত্বপূর্ণ এবং অধিক প্রিয় (হাজ্জের) দশ দিনের আমলের চেয়ে। সুতরাং তোমরা বেশি বেশি করে



اَللّٰهُ أَكْبَرُ ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ এবং اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ



পাঠ কর। (মুসানাদ আহমাদ হা: ৫৪৪৬)



আবার এ কল্যাণ দুনিয়াবীও হতে পারে। যেমন হাজ্জের মৌসুমে হজ্জ করতে গিয়ে তার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্থ উপার্জন করা। কেননা হাজ্জের মৌসুমে ব্যবসা করা বৈধ।



(أَيَّامٍ مَّعْلُوْمٰتٍ)



দ্বারা মূলত যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ এবং পরবর্তী তিন দিনকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এগুলো হল: কুরবানীর দিন এবং পরবর্তী তিন দিন। (তাফসীর মুয়াস্সার)



(بَهِيْمَةِ الْأَنْعَامِ)



দ্বারা মূলত উট, গরু, ছাগল এবং ভেড়া বা দুম্বাকে বুঝানো হয়েছে। এদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার নাম স্মরণ করা বলতে বুঝানো হয়েছে যে, তাদের জবাইকালে আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে জবাই করা। কেননা আল্লাহ তা‘আলার নাম ব্যতীত অন্যের নামে জবাই করলে তা হালাল হবে না।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ)



“অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর‎ এবং আহার করাও ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্ত‎কে ও বিনয়ের সাথে ভিক্ষাকারীকে।” এখান থেকে অনেকে দলীল গ্রহণ করেন যে, কুরবানীর গোশত তিনভাগ করতে হবে। একভাগ নিজের জন্য, দ্বিতীয়ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং তৃতীয়ভাগ ফকির-মিসকীনদের জন্য। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এরূপ কোন নির্দেশই জারী করে দেননি। যেমন হাদীসে বলা হয়েছে:



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আমি তোমাদের তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত রাখতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি তোমরা খাও, প্রয়োজন মত জমা রাখ। অন্য বর্ণনায় এসেছেন খাও, সদাকা কর এবং জমা রাখ। অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছেন খাও, খাওয়াও ও সদকা কর। (সহীহ বুখারী হা: ৫৫৬৯, সহীহ মুসলিম হা: ১৯৭১)



সঠিক মত এই যে, কোন আয়াত বা সহীহ হাদীসে এরূপ ভাগাভাগি করতেই হবে এমনটি প্রমাণ পাওয়া যায় না, তাই কেউ যদি ভাগ নাও করে তাতে সে গুনাহগার হবে না। মূলত দেখা হবে তার অন্তরে কী ছিল। তাই আমাদেরকে প্রথমত আমাদের নিয়ত ঠিক করা একান্ত কর্তব্য, তা না হলে কোন আমলই গ্রহণযোগ্য হবে না।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা হাজীদেরকে অনুমতি দিলেন তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে। অর্থাৎ যিলহজ্জের ১০ তারিখে জামরাতুল কুবরায় পাথর মারার পর হাজীরা প্রাথমিকভাবে হালাল হয়ে যায়। তার পর ইহরাম খুলে ফেলে। এক কথায় স্ত্রী সহবাস ব্যতীত ঐ সব কাজ যা ইহরাম অবস্থায় হারাম ছিল তা হালাল হয়ে যায়। আর অপরচ্ছিন্নতা বলতে চুল, নখ কেটে নিয়ে তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার করা, সেলাই করা কাপড় পরিধান করা ইত্যাদি। আর যদি কেউ কোন মানত করে থাকে তাহলে সে যেন তা পূর্ণ করে। আর তারা যেন সর্বশেষ তাওয়াফ তাওয়াফে ইফাযাহ করে যাকে তাওয়াফে যিয়ারাহও বলা হয়। এটি হাজ্জের একটি রুকন যা আরাফায় অবস্থান ও জামরাতুল কুবরায় পাথর মারার পর করা হয়।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এগুলোই হল, (যা আলোচনা করা হয়েছে) আল্লাহ তা‘আলার বিধান। যে এগুলো পালন করবে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার জন্য সে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলার নিকট উত্তম ব্যক্তি বলে গণ্য হবে। হাজ্জের এ সকল বিধি-বিধান সূরা বাক্বারাহ ও সূরা আল ইমরানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন তারা যেন চতুষ্পদ জন্তু যা হালাল করা হয়েছে তা ভক্ষণ করে আর যা হারাম তা থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কে সূরা মায়িদায়ও আলোচনা করা হয়েছে এবং আল্লাহ তা‘আলা এ নির্দেশও দিয়েছেন, তারা যেন অপবিত্র জিনিস যেমন মূর্তিপূজো থেকে এবং মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّـيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوْا بِاللّٰهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِه۪ سُلْطٰنًا وَّأَنْ تَقُوْلُوْا عَلَي اللّٰهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ)



“বল:‎ নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ ও অন্যায় বিরোধিতা এবং কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক করা যার কোন প্রমাণ তিনি প্রেরণ করেননি, এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।’’ (সূরা আ‘রাফ ৭:৩৩)



হাদীসে বলা হয়েছে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন: আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করব না? সাহাবারা উত্তরে বললেন: হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ১. আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করা, ২. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। ঐ সময় তিনি হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। এ কথা বলার সময় তিনি সোজা হয়ে বসলেন: অতঃপর বললেন: জেনে রেখে যে, সেটি হল মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। তিনি এ কথা বারবার বলতে থাকেন শেষ পর্যন্ত সাহাবীরা বলেন, আমরা বলতে লাগলাম, যদি তিনি চুপ থাকতেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৬৫৪, সহীহ মুসলিম হা: ৮৭)



এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সঙ্গে শির্ককারীর একটি উপমা পেশ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত যে আমার সঙ্গে শরীক স্থাপন করে এমন যে, সে যেন আকাশ হতে পড়ল, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল এক দূরবর্তী স্থানে।) উক্ত দুই অবস্থাতেই যেমন মৃত্যু বা ধ্বংস অবধারিত, ঠিক অনুরূপ যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে সে সুস্থ প্রকৃতি ও আন্তরিক পবিত্রতার দিক দিয়ে পবিত্রতা ও নির্মলতার এক উচ্চাসনে আসীন হয়। কিন্তু যখনই সে শির্কের পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে তখনই সে নিজেকে উঁচু হতে একদম নীচে, পবিত্রতা হতে অপবিত্রতায় এবং নির্মলতা হতে কর্দমাতে নিক্ষেপ করে। যার ফলে সে ধ্বংস হয়।



شعائر এটি شعيرة এর বহুবচন। অর্থ বিশেষ চিহ্ন বা নিদর্শন। অর্থাৎ ইসলামের এমন কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আনুষ্ঠানিক বিধান যার দ্বারা প্রকাশ পায় এবং অন্য ধর্মাবলম্বী হতে তাকে সহজে পৃথকভাবে চেনা যায়।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা চতুষ্পদ জন্তুর উপকারিতার কথা বর্ণনা করেছেন যা আমরা ইতোপর্বে সূরা নাহলে আলোচনা করেছি।



المخبتين অর্থ হল متواضنعين لله অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলার জন্য বিনয়ী হয় তাদের مخبتين বলা হয়।



بدن শব্দটি بدنة এর বহুবচন, এর অর্থ হল: মোটা-তাজা দেহবিশিষ্ট পশুটা। এ উটগুলো হল আল্লাহ তা‘আলার দ্বীনের যে সকল নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম নিদর্শন।



صواف শব্দটি مصفوفة অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান অবস্থায়। কেননা উটকে দাঁড়ানো অবস্থায় নহর করা হয়।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না।

২. হাজ্জের কিছু বিধি-বিধান জানতে পারলাম।

৩. মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া হতে বিরত থাকতে হবে।

৪. মূর্তি বা এ জাতীয় কোন কিছুরই পূজা করা যাবে না।

৫. প্রত্যেক উম্মাতের জন্যই কুরবানীর বিধান ছিল।

৬. মু’মিনদের অন্তর আল্লাহ তা‘আলার স্মরণে প্রকম্পিত হয়।

৭. কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করা জরুরী নয়, তবে ভাগ করা উত্তম।

৮. যারা প্রকৃত অর্থে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য জানতে পারলাম।

৯. শির্রকারীর অবস্থা কেমন হবে তা জানা গেল।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩০-৩১ নং আয়াতের তাফসীর:

মহান আল্লাহ বলেনঃ উপরে বর্ণিত হলো হজ্জের আহকাম এবং ওর পুর স্কারের বর্ণনা। এখন জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র অনুষ্ঠানগুলির সম্মান করবে অর্থাৎ গুনাহ্ ও হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকবে তার জন্যে আল্লাহর নিকট বড় প্রতিদান রয়েছে। ভাল কাজ করলে যেমন পুরস্কার আছে তেমনই মন্দ কাজ হতে বিরত থাকলেও পূণ্য রয়েছে। মক্কা, হজ্জ ও উমরাও আল্লাহর হুরমাত বা নির্ধারিত পবিত্র অনুষ্ঠান গুলির অন্তর্ভুক্ত। তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তুগুলি হালাল। তবে যেগুলি হারাম সেগুলি তোমাদের সামনে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে। মুশরিকরা ‘বাহীরা, সায়েবা’, ‘ওয়াসীলা' এবং 'হাম' নাম দিয়ে যে গুলিকে ছেড়ে থাকে ওগুলি আল্লাহ তোমাদের জন্যে হারাম করেন নাই। তার যেগুলি হারাম করবার ছিল সেগুলি তিনি বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন মৃত জানোয়ার, যবাহ করার সময় প্রবাহিত রক্ত শূকরের মাংস, আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকত জন্তু, গলা চিপে মেরে ফেল্য জন্তু ইত্যাদি।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং তোমরা বর্জন কর মূর্তি পূজার অপবিত্রতা এবং দূরে থাকো মিথ্যা কথন হতে। এখানে বায়ানে জি এর জন্যে এসেছে। এই আয়াতে শিরকের সাথে মিথ্যা কথনকে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। যেমন এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ!) তুমি বলঃ আমার প্রতিপালক নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজকে হারাম করেছেন, তা প্রকাশ্যই হোক বা গোপনীয়ই হোক, আর (হারাম করেছেন) গুনাহ্ ও অন্যায়ভাবে সীমালংঘন এবং তোমরা আল্লাহর সাথে এমন কিছুকে শরীক করবে যে সম্পর্কে তিনি কোন দলীল অবতীর্ণ করেন নাই, আর তোমরা আল্লাহর উপর এমন কথা আরোপ করবে যা তোমরা জান না। (এ সব কিছুই তিনি হারাম করেছেন।)” (৭:৩৩) মিথ্যা সাক্ষ্যও এরই অন্তর্ভুক্ত।

হযরত আবু বাকরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহর কথা বলবো না?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (বলুন)।` তিনি। বলেনঃ “(তা হলো) আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা ও পিতা মাতার অবাধ্য হওয়া।” ঐ সময় তিনি হেলান লাগিয়ে ছিলেন। একথা বলার পর তিনি সোজা হয়ে বসেন। তারপর বলেনঃ “আরো জেনে রেখো, (সব চেয়ে বড় গুনাহ্ হলো) মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।` তিনি একথা বারবার বলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সাহাবীগণ পরস্পর বলাবলি করেনঃ “যদি তিনি চুপ করতেন!” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)

হযরত আইমান ইবনু খুরাইম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ভাষণ দিতে দাড়িয়ে বলেনঃ “হে লোক সকল! মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়াকে আল্লাহর সাথে শির্ক করার সমতুল্য করা হয়েছে।” একথা তিনি তিনবার বলেন। অতঃপর তিনি (আরবী) পাঠ করেন। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত খারীম ইবনু ফাতিক আল আসাদী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামায পড়েন। অতঃপর (মুকতাদীদের দিকে) ফিরে দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “(পাপ হিসেবে) মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়াকে মহামহিমান্বিত আল্লাহর সাথে শিরক করার সমান করে দেয়া হচ্ছে। তারপর তিনি উপরোক্ত আয়াত পাঠ করেন।” (এটা ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)

হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) অনুরূপ উক্তি করেন ও উপরোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন।” (এটা সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দ্বীনকে ধারণ কর, বাতিল হতে দূরে থাকো, সত্যের দিকে ধাবিত হও এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।এরপর মহান আল্লাহ মুশরিকদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত দিচ্ছেনঃ যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে সে যেন আকাশ থেকে পড়লো, অতঃপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করলো। এজন্যেই হাদীসে এসেছে? “ফেরেশতারা যখন কাফিরের রূহ্ নিয়ে আকাশে উঠে যান তখন আকাশের দরজা খোলা হয় না। ফলে তারা ঐ রূহ সেখান থেকে নীচে নিক্ষেপ করেন। এই আয়াতে ওরই বর্ণনা রয়েছে। এই হাদীসটি পূর্ণ বাহাসের সাথে সূরায়ে ইবরাহীমের তাফসীরে গত হয়েছে। সূরায়ে আনআমে এই মুশরিকদের আর একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেঃ “(হে নবী সঃ)! তুমি বলঃ আল্লাহ ছাড়া আমরা কি এমন কিছুকে ডাকবো যা আমাদের কোন উপকার কিংবা অপকার করতে পারে না? আল্লাহ আমাদেরকে সৎপথ প্রদর্শনের পর আমরা কি সেই ব্যক্তির ন্যায় পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবো যাকে শয়তান দুনিয়ায় পথ ভুলিয়ে হয়রান করেছে, যদিও তার সহচররা তাকে ঠিক পথে আহবান করে বলেঃ আমাদের নিকট এসো? বলঃ আল্লাহর পথই পথ।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।